আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১১)

ভাদুড়িমশাই তাঁর ঘরের মধ্যে একটা ইজিচেয়ারে বসে চুপচাপ সিগারেট খাচ্ছিলেন। আমরা গিয়ে পৌঁছতে হাতের সিগারেট অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে বললেন, “মুখ-হাত ধুয়ে নিয়ে নীচে চলুন, খিদে পেয়ে গেছে। খেয়ে নিয়ে তারপর কথা হবে।”

 

বললুম, “শেখর ঘোষাল কখন চলে গেলেন?”

 

“তা এই ধরুন ঘন্টাখানেক হবে।”

 

“কিছু বোঝা গেল?”

 

“বললুম তো খিদে পেয়ে গেছে।” ভাদুড়িমশাই সামান্য হাসলেন। “চলুন, আগে খেয়ে নেওয়া যাক।”

 

চটপট মুখহাত ধুয়ে অগত্যা ডাইনিং হলে নামতে হল। খাবার টেবিলেও বিশেষ কথা হল না। সাদামাটা পরিচ্ছন্ন খাবার। ভাত, ডাল বেগুনভাজা, একটা সবজি, একটুকরো মাছ আর চাটনি। সঙ্গে এক প্লেট টক দই। খেতে-খেতে সদানন্দবাবু একবার শুধু বলেছিলেন যে, মুগের ডালটা দিব্যি হয়েছে, ভাদুড়িমশাই তাতে স্রেফ মাথা নেড়ে ‘হুঁ’ দিয়ে গেলেন, মুখে কিছু বললেন না। তিনি যে একটা কিছু ব্যাপার নিয়ে ভাবছেন, সেটা তাঁর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। চুপচাপ খেয়ে নিয়ে আমরা আবার দোতলার বারান্দায় উঠে এলুম।

 

পশ্চিমের বারান্দা। বেলা গড়িয়ে গেছে, তিনটে বাজে। অক্টোবর মাসের কড়া রোদ্দুরে এতক্ষণে এই বারান্দাটার ভেসে যাবার কথা। কিন্তু আমরা যখন নীচে নামি, তখন বেয়ারা এসে চিক ফেলে দিয়ে গেছে। তাই আর রোদ্দুর আসছে না। সেই সঙ্গে হাওয়াও অবশ্য আসছে না। তবে বারান্দাতেও ফ্যানের ব্যবস্থা রয়েছে। বেয়ারা সেটা চালিয়ে রাখতে ভোলেনি।

 

আরাম করে সোফার উপরে বসে পড়া গেল। কিন্তু কেউ কোনও কথা বলবার আগেই ক্রিরিরিং ক্রিরিরিং। ভাদুড়িমশাইয়ের ঘরে ফোন বাজছে। সোফা ছেড়ে তিনি উঠে পড়বার উপক্রম করছিলেন, কিন্তু তাঁর আগে সদানন্দবাবুই উঠে গিয়ে ফোন ধরলেন। তারপর মিনিট খানেক বাদে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “মিঃ সেন ফোন করেছিলেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোনও দরকার ছিল?”

 

“কই, তেমন কিছু তো বললেন না। শুধু আপনাকে জানিয়ে দিতে বললেন যে, বিকেল পাঁচটা নাগাদ মিসেস সেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একবার এখানে দেখা করতে আসবেন।

 

ভাদুড়িমশাই তাঁর হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বললেন, “কালীচরণ সেন তো মহা মুশকিলে ফেলে দিলেন দেখছি। যা-ই হোক, সবে তো তিনটে বাজে, পাঁচটা বাজতে এখনও অনেক দেরি।”

 

আমি বললুম, “শেখর ঘোষাল কিছু বললেন?”

 

“কী আর বলবে,” মৃদু হেসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুলিশের লোক তো, নাক-বরাবর যা দেখতে পায়, তা-ই বলল।”

 

“তার মানে?”

 

“তার মানে ওয়ান-ট্র্যাক মাইন্ড হলে যা হয় আর কি। সুরেশ দাশের উপরে নজর পড়েছে তো, বাস, নজরটাকে অন্য-কোনও দিকে ঘোরাতেই চাইছে না।”

 

“সুরেশকে এর মধ্যে অ্যারেস্ট করেছে নাকি?”

 

“এখনও করেনি, তবে কাল-পরশুর মধ্যে করবে নিশ্চয়। বলছে, এ তো অভিয়াস ব্যাপার!”

 

“আপনি কী বললেন?”

 

“কী আর বলব।” ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর জ্বলন্ত কাঠিটাকে শূন্যে বার দুয়েক নেড়ে নিভিয়ে দিয়ে বললেন, “বললুম যে, ওদের যেটা অভিয়াস বলে মনে হচ্ছে, সেটাই যে-সত্যি তা নাও হতে পারে। যা-ই হোক, ও-সব কথা পরে হবে। এখন আপনি কী বুঝলেন, বলুন। মানে এদের কথাবার্তা তো শুনছেন, তার থেকে কী মনে হয়?”

 

“মালহোত্রাদের বাড়িতে গিয়ে যা মনে হল, শুধু তার কথাই বলব?”

 

“না না, শুধু তা-ই কেন? কাল রাত্তির থেকে আজ পর্যন্ত তো অনেক কিছুই দেখলেন শুনলেন। সবটা মিলিয়ে কী মনে হচ্ছে?”

 

হেসে বললুম, “মনে তো অনেক কিছুই হচ্ছে। সে-সব ডিটেলসে বলব, না সংক্ষেপে?”

 

“স্রেফ একটা সামারি দিন। তাও, যদ্দুর সম্ভব, উইদাউট এনি কমেন্টস।”

 

“এটা কেন বলছেন?”

 

“বাঃ, আপনি যদি প্রতিটি কথার সঙ্গে একটা করে কমেন্ট জুড়ে দেন, তো আমি বায়াড হয়ে যাব না? স্রেফ যা ঘটেছে, যা দেখেছেন, তারই কথা বলবেন। জাস্ট ফ্যাক্টস।”

 

“ঠিক আছে, তা হলে শুনুন। মিসেস রেখা দাশকে ছায়ার পার্ট দিয়ে মিসেস বন্দনা সেনকে হেলেনের পার্ট দেওয়া হয়েছিল। মিসেস সেন সেটা পছন্দ করেননি।”

 

“এটা কার কাছে শুনলেন?”

 

“মিসেস আশা মালহোত্রার কাছে।”

 

“তারপর?”

 

“তারপর তো কাল সকালে মিসেস দাশ খুন হয়ে গেলেন। ফলে, মিসেস সেন যা চাইছিলেন, তা-ই হল। হেলেনের পার্টটা মিসেস মালহোত্রার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ছায়ার পার্টটা তিনি নিয়ে নিলেন।”

 

সদানন্দবাবু উশখুশ করতে শুরু করেছিলেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল? শরীর খারাপ লাগছে?”

 

“না না, সে-সব কিচু নয়,” সদানন্দবাবু বললেন, “আসলে আমি একটা কতা ভাবছিলুম।”

 

“বলে ফেলুন।”

 

“কেউ খুন হলেই তো আপনারা মোটিভ খুঁজেতে লেগে যান। তা এই যে খুনটা এখানে হয়ে গেল, এর পিছনে কি কারও কোনও মোটিভ নেই?”

 

“কেন, আপনি কোনও মোটিভ খুঁজে পেলেন নাকি?”

 

“না মানে বলছিলুম যে, ছায়ার পার্টটা পাবার জন্যে মিসেস সেনই ওঁকে…মানে মিসেস দাশকে … কথাটা শেষ হবার আগেই ভাদুড়িমশাই হোহো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “স্রেফ একটা পার্ট পাবার জন্যে খুন? না মশাই, এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আর তা ছাড়া, শুধু মোটিভ থাকলেই তো হয় না, খুন করার সুযোগটাও তো থাকা চাই। মিসেস সেনের কি সেটা ছিল? তিনি ওই সাত-সকালে গাড়ি হাঁকিয়ে সাবর্ডিনেট স্টাফের কোয়ার্টার্সে ঢুকে একজনকে খুন করে চলে এলেন, আর কাকপক্ষী সেটা টের পেল না, তাও কি হয় নাকি? তার উপরে আবার সেটা আলাদা একটা বাড়িও নয়, চারতলা বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাট।”

 

আমি বললুম, “তা ছাড়া, মার্ডারটা কীভাবে হয়েছে, সেটাও ভাবুন। গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারা হয়েছে। বিষ-টিশ খাইয়ে যদি মারত তো বোঝা যেত। কিন্তু ফাঁস লাগিয়ে মারা…না মশাই, এটা কোনও মেয়ের কাজ বলে মনে হচ্ছে না। মাস্ট বি আ ম্যান। তাও বেশ হট্টাকট্টা জোয়ান লোক হওয়া চাই।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ছেলেবেলায় ঠাকুর্দার মুখে ফাঁসুড়েদের গপ্পো শুনিচি। শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরতি-পথে তিনি নিজেই একবার এক ফাঁসুড়ের খপ্পরে পড়েছিলেন। তা সে-ব্যাটা খুব জুত করতে পারেনি। পেছন থেকে ফাঁস লাগাবার তালে ছিল, কিন্তু ঠাকুর্দা সেটা টের পেয়ে গিয়ে আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে অ্যায়সা ধোলাই দেন যে, জঙ্গলের মধ্যেই আড়াই হাত নাকখত্তা দিয়ে সে ‘বাপ বাপ’ ডাক ছাড়তে-ছাড়তে পালিয়ে যায়। তা ঠাকুর্দা তো বলেন যে, লোকটা মোটেই জোয়ান-মদ্দ ছিল না। গায়ে হয়তো জোর ছিল, তবে চেহারা একেবারেই দড়ি-পাকানো।”

 

ভাদুড়িমশাই দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে সদানন্দবাবুকে বললেন, “আপনার ঠাকুর্দা যে একজন নমস্য ব্যক্তি, তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর কাছে নিশ্চয় এই রকমের আরও অনেক গপ্পো আপনি শুনেছেন, তাই না?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তা তো শুনিইচি। বলব?”

 

“আজ নয়, পরে একদিন শুনব। আজ বরং কিরণবাবুর কথাই শোনা যাক।…

 

কিরণবাবু, কালকের ডিনার পার্টিতে আরও তো কয়েকজন ছিলেন, তাঁদের কার সম্পর্কে কী জানা গেল?”

 

বললুম, “অ্যাকাউন্টস অফিসার সুবীর নন্দী এখানে…মানে এই পলাশডাঙায় হাঁফিয়ে উঠেছেন।”

 

“কেন? হাঁফিয়ে ওঠার কারণ সম্পর্কে কিছু বললেন?”

 

“যা বললেন তার মোদ্দা কথাটা হল, এখানে সোসাইটি নেই, কালচার নেই। মানুষটি সম্ভবত একটু ভিতু টাইপেরও। তাই, এই জায়গাটা যে তাঁর পছন্দ নয়, এখান থেকে পালাতে পারলেই যে বাঁচেন, খুব স্পষ্ট করে সেটা বলতেও চান না। ভয়ে ভয়ে আছেন যে, ওপরওয়ালারা এটা জেনে ফেললে তাঁর চাকরির ক্ষতি হবে। দু-একটা কথা বলেই কেমন যেন গুটিয়ে গেলেন।”

 

শুনে, একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “ডাক্তার গোকুল ঘোষকে কেমন লাগল?”

 

বললুম, “যারা বয়েস ভাঁড়ায়, তাদের আবার কেমন লাগবে। খারাপ লাগল।”

 

“বয়েস ভাঁড়াবার ব্যাপারটা বুঝেছেন তা হলে?”

 

“না বুঝবার তো কিছু নেই।” হেসে বললুম, “চুল এত কুচকুচে কালো যে, ওটা জেনুইন কালার হতেই পারে না। স্রেফ কলপ। তার উপরে আবার লাল রঙের শার্ট পরেছেন। কিন্তু ওই করে কি ছোকরা সাজা যায়? চামড়া যে কুঁচকে গেছে, সেটা তো লুকোতে পারেননি।”

 

“সঞ্জীব মালহোত্রা?”

 

“মদটা একটু বেশি মাত্রায় খান। অ্যালকোহলিক টাইপ। ডাক্তার ঘোষকে পছন্দ করেন না। বললেন, ‘র্স অব আ ডক্টর।’ ডাক্তারির কিসসুই নাকি গোকুল ঘোষ বোঝেন না। তবে হ্যাঁ, মিসেস সেনের রান্নার খুব তারিফ করলেন। অবিশ্যি মদই তো সারাক্ষণ খেয়ে গেলেন, মিসেস সেন যে এত সব আইটেম করলেন, তা আর চেখে দেখলেন কই। মিসেস সেনেরও দেখলুম ওঁর সম্পর্কে বেশ একটু দুর্বলতা রয়েছে। দুর্বলতা না-বলে সেটাকে অনুকম্পাও হয়তো বলা যায়।…এটাকে অবিশ্যি খুব একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার বলে আমি ভাবছি না।”

 

“কেন?”

 

“দাম্পত্য জীবনে যে-সব পুরুষ খুব সুখী নয়, তাদের সম্পর্কে অন্য মেয়েদের ওই রকমের একটা অনুকম্পার ভাব ইন মোস্ট কেসেস থাকেই।”

 

“সঞ্জীব মালহোত্রা দাম্পত্য জীবনে সুখী নয়, এটা কী করে বুঝলেন?”

 

হেসে বললুম, “মিসেস বন্দনা সেনের কথা থেকে। ভদ্রমহিলা এমনও ইঙ্গিত করলেন যে, এর জন্যে আশা মালহোত্রাই দায়ী।”

 

“বটে?” ভাদুড়িমশাইয়ের ডান চোখের ভুরু একটু উপরে উঠে গেল। সেটা আবার যথাস্থানে নেমে আসার পরে তিনি বললেন, “আর বন্দনা সেন সম্পর্কে আশা মালহোত্রার ধারণাও নিশ্চয় ভাল নয়?”

 

“সেই রকমই তো মনে হল। অবশ্য শুধু আশা মালহোত্রা বলে কথা নেই, সুলেখা ঘোষের… আই মিন গোকুল ঘোষের স্ত্রীর অ্যাটিচিউডও বিশেষ সুবিধের ঠেকল না। সঞ্জীবের সঙ্গে মিসেস সেনকে জড়িয়ে দিয়ে বিচ্ছিরি একটা ইঙ্গিতও করলেন।”

 

“ছোট জায়গা, সবাই সবাইকে চেনে, ডিসট্র্যাকশন বলতে কিছু নেই, এখানে ও-সব হয়। এ ছাড়া এরা সময় কাটাবেই বা কী করে?…যাই হোক, আর কী দেখলেন বলুন। আশা মালহোত্রাকে দিয়ে চলবে?”

 

“কী চলবে?”

 

“হেলেনের পার্ট?”

 

“অসম্ভব। নাটকের স্থান কাল পাত্র বিষরবস্তু, কোনও কিছুর সম্পর্কেই কোনও ধারণা নেই। ওর ফার্স্ট সিনটা যে সেলুকাসের সঙ্গে, এইটে শুনে কী বলল জানেন?”

 

“কী বলল?”

 

“সে আপনি ভাবতেও পারবেন না। বলল, হু ইজ দিস সেলুকাস?…না মশাই, ইমপসিবল, ওকে দিয়ে চলবে না!”

 

“আলবাত চলবে!” সদানন্দবাবু তাঁর বাঁ হাতের তালুর উপরে ডান হাতের একটা ঘুসি মেরে বললেন, “একশোবার চলবে, হাজারবার চলবে। আরে মশাই, নাটক করতে-করতে চুল পাকিয়ে ফেললুম, আর আপনি কিনা আমাকে নাটক শেকাতে এয়েচেন। স্টেজে নেবে উনি যদি ওই রকমের বাংলা ঝাড়েন তো আর দেকতে হবে না, সেকেন্ড অ্যাক্টের ওই ফার্স্ট সিন থেকেই ব্যাপারটা একেবারে কুলপি বরফের মতন জমে যাবে। লোকে বলবে, ওরেব্বাবা, এ তো দেকচি ফিমেল এডিশন অফ ভূমেন রায় ইন দি রোল অফ কার্ভালো। এ আমি বেট ফেলে বলতে পারি।”

 

শুনে আমি আশ্বস্ত হলুম না ঠিকই, কিন্তু এটা বুঝতে পারলুম যে, সদানন্দবাবুর কথাটা ভাদুড়িমশাইয়ের বেশ পছন্দ হয়েছে। ফলে, চটপট প্রসঙ্গ পালটে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, কাল নাহয় লক্ষ্মীপুজোর জন্যে এখানকার কাজকর্ম বন্ধ ছিল। কিন্তু আজ থেকে তো কনস্ট্রাকশনের কাজকর্ম ফের শুরু হয়েছে, আপিসও কি খোলা?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুধু লক্ষ্মীপুজোর জন্যে কেন, কাল তো রবিবার গেছে, সেইজন্যেও অ্যাডমিনিস্টেশন আপিস কাল বন্ধ ছিল। তবে কনস্ট্রাকশনের কাজ কালও হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ এ-কথা উঠল কেন?”

 

“না, ভাবছি যে…”

 

“কী ভাবছেন?”

 

“ভাবছি যে, পুলিশ যখন সন্দেহ করছে, তখন আপিস থেকে সুরেশের হাতে না সাসপেনশন অর্ডার ধরিয়ে দেয়।”

 

“এক্ষুনি ও-কথা উঠছে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মহকুমা সদর থেকে ডেডবডি এখনও রিলিজ করেনি। সেটা বোধহয় কাল দুপুরে করবে। তারপর রয়েছে ডেডবডি শ্মশানে নিয়ে দাহ করবার ব্যাপার। সেটা শেষ হতে-হতে বিকেল। তারপর ধরুন ন্যাচারাল ডেথ তো নয়, তাই ফোর্থ ডে’তে শ্রাদ্ধশান্তি করতে হবে। রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ—ওই বুধবারেই শ্রাদ্ধের কাজ। তো তার আগে আর ও-সব সাসপেনশন টাসপেনশনের কথা উঠবে বলে মনে হয় না। আর তা ছাড়া, উঠবার কোনও কারণও তো নেই। শেখর ঘোষালের সঙ্গে কথা বলে যদ্দুর যা বুঝলুম, সুরেশকে ওরা সন্দেহ করছে ঠিকই আর এখানকার লোকেরা সেটা নিশ্চয় আঁচও করেচে, কিন্তু পুলিশ তো এখনও অফিসিয়ালি এদের কিছু জানায়নি।”

 

বললুম, “কিন্তু পুলিশ যদি ওকে অ্যারেস্ট করে?”

 

“নিছক সন্দেহের বশে সেটা করবে না। ঘোষালের সঙ্গে কথা বলে অন্তত সেইরকমই মনে হল। প্রমাণ-টমান পেলে অবশ্য করতেই পারে। কিন্তু সেটা এমন প্রমাণ হওয়া চাই, যা ধোপে টিকবে। নইলে তেমন-তেমন ডিফেন্স লইয়ারের পাল্লায় পড়লে পুলিশ তো বোকা বনে যাবে, মশাই।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েচে?”

 

“তা দেওয়া হয়েছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুলিশই ওয়্যারলেসে খবর দিয়েছে। সুরেশ দাশের এক দাদা আছেন জলপাইগুড়িতে। তাও শহরে নয়, গাঁয়ে। তার উপরে আবার অসুস্থ। তিনি সম্ভবত আসতে পারবেন না। রেখা দাশের বাপের বাড়ি অবশ্য কলকাতার মুচিপাড়া থানা এলাকার শশিভূষণ দে স্ট্রিটে। সেখানে ওর বিধবা মা আর এক অবিবাহিতা দিদি থাকেন। দিদিটি হয়তো আজই রাত্তিরের ট্রেন ধরে কাল সকালে এসে পৌঁছবেন।”

 

বললুম, “এ-সব খবর কে বলল।”

 

“পুলিশ। তা ছাড়া আর কে বলবে?”

 

সকাল থেকেই একটা প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে ঘুরছিল। এতক্ষণ সেটা জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু এবারে আর জিজ্ঞেস না করে পারা গেল না। বললুম, “একটা কথা কিন্তু বুঝতে পারছি না।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের ভুরু ঈষৎ কুঁচকে গেল। বললেন, “কী বুঝতে পারছেন না?”

 

“এখানে একটা খুন হয়ে গেছে, অথচ তাই নিয়ে আপনি নিজে কাউকে কিছু জিজ্ঞেসাবাদ করছেন না কেন?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কিরণবাবু এটা ঠিকই বলেচেন, আপনার মশাই নিজেরই এবার ফিল্ডে নেমে পড়া উচিত।”

 

“বাঃ, আমি এখানে সভাপতিত্ব করতে এসেছি না?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোথায় ফুলের মালা গলায় পরে, কপালে চন্দনের তেলক চড়িয়ে একটা ভাষণ দেব, তা নয়, আপনারা আমাকে গোয়েন্দাগিরি করতে বলছেন।”

 

“বাঃ, আপনি নিজেই তো বললেন যে, ঢেঁকি সগ্‌গে গেলেও ধান ভানে! তা হলে এখন পালাবার তাল করচেন কেন? একটা মেয়ে খুন হয়ে গেল, আর কে খুনি, সেটা আপনি খুঁজে বার করবেন না?”

 

“করব, করব। কিন্তু তার আগে ব্যাপারটা একটু বুঝে নিতে দিন। বুধবারের প্রীতি-সম্মিলনীতে যারা যারা নাচবে, গাইবে, অভিনয় করবে, এস. ডি.পি. ও. শেখর ঘোষালকে বলে বুকানন ইন্ডিয়ার এই আপিসের পার্সোনেল ম্যানেজারের হেফাজত থেকে তাদের বায়ো-ডাটা আনিয়ে নিয়েছি, তো সেই লোকগুলোর নাম-ধাম, বয়েস, পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস ইত্যাদির উপরে ভাল করে একবার চোখ বুলিয়ে নিতে দিন। তারপর তো মাঠে নামব।”

 

“তা-ই বলুন,” সদানন্দবাবু একগাল হেসে বললেন, “কিরণবাবু হয়তো বুঝতে পারেননি, কিন্তু আপনি যে হাত গুটিয়ে বসে নেই, সে আমি ঠিকই আন্দাজ করেছিলুম।”

 

নীচে গাড়ির শব্দ হল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কালীচরণ সেন এসে গেলেন বোধহয়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *