আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১০)

মালহোত্রা দম্পতি তাঁদের বাংলোর গেটের ধারেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমরা গিয়ে বাংলোর হাতার মধ্যে ঢুকতে সঞ্জীব মালহোত্রা নিজেই এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে একগাল হেসে বললেন, “নমস্তে।” তারপর আমাদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে বললেন, “আশা ইখানে রইল। আপনারা বাতচিত কোরেন, ওকে যেটা-যেটা শিখাবার আছে, সেটা শিখিয়ে দিন, আমাকে ফির একবার বাহার যেতে হোবে।”

 

কাল রাত্তিরে মিঃ সেনের বাড়িতে যাঁকে দেখেছিলুম, ইনিই কি সেই সঞ্জীব মালহোত্রা? এঁর এখনকার চেহারা দেখে আর কথাবার্তা শুনে সেটা বুঝবার জো নেই। রাত্তিরে যিনি বেহেড মাতাল হয়ে সবাইকে ঘাবড়ে দিয়েছিলেন, সকালে তাঁকে দেখে কে বলবে যে, ইনিই সেই লোক। এখন ইনি একজন দায়িত্বশীল গৃহকর্তা, কর্তব্যপরায়ণ অফিসার। সত্যি, একই মানুষের মধ্যে যে কত রকমের ব্যক্তিত্ব আত্মগোপন করে থাকে!

 

বললুম, “কোথায় যাবেন?”

 

“সাইটে। সুবে আট বাজে একবার গিয়েছিলাম। কাজকাম কী হোবে, সেটা বলে দিয়ে এসেছি। তো সেটা ঠিকমতো চলছে কি না, একবার দেখা দরকার। যদি না নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব দেখলেন, তো কাজে গলতি থেকে যায়, কুছু ঠিকঠাক …আই মিন অ্যাকর্ডিং টু স্পেসিফিকেশন হোয় না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তো সেইজন্যে এখন আবার আপনাকে ছুটতে হবে?”

 

“বাঃ, আমি এখানকার ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার আছি না? অ্যান্ড দ্য চিফ ইঞ্জিনিয়ার ইজ আউট অভ স্টেশন। লন্ডনে গেছেন, ওন্ট কাম ব্যাক বিফোর দ্য এন্ড অভ দিস মান্‌থ। তো এখোন যে ইনস্টলেশনের কাম চলছে, তাতে যদি কুনো গলতি থেকে গেল, তো সেটার জন্যে তো আমাকেই জবাবদিহি করতে হোবে। ঠিক না?”

 

কথাটা শেষ করে স্ত্রীর দিকে তাকালেন সঞ্জীব মালহোত্রা। বললেন, “আশা, ইউ প্লিজ লুক আফটার আওয়ার গেস্টস। আমি দেড় বাজে ফিরব।”

 

বলে আর দাঁড়লেন না, ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

 

সদানন্দবাবু বললেন, “এ ভেরি হার্ডওয়ার্কিং ম্যান। ঠিক আমাদের জেঙ্কিস সায়েবের মতন।”

 

আশা মালহোত্রা বললেন, “আপনারা থোড়া আরাম করুন, ম্যয় আভি চায় বনাকে লাতি হুঁ।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কিসসু দরকার নেই, ম্যাডাম। সকালে আমি দু’কাপ চা খাই, তা সেই দু’কাপ অলরেডি আমার খাওয়া হয়ে গেচে, আভি আর হাম চা নেহি খায়েগা।”

 

মিসেস মালহোত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপ?”

 

বললুম, “আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু আপনার কি এটাই চা খাওয়ার সময়?”

 

“সুবে আমি চায় খাই না, ব্রেকফাস্টও করি না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কেন কেন? ডাক্তারের নিষেধ আচে?”

 

“ডাগদারের না, বিউটিশিয়ানের।” আশা মালহোত্রা হেসে বললেন, “বিউটিশিয়ানের প্রেসক্রিপশন সুবে সির্ফ এক গ্লাস ফ্রুট জুস ছাড়া আর কুছু খাওয়া চলবে না, অ্যান্ড আ স্মল গ্ল্যাস অ্যাট দ্যাট। তো বাস, তা-ই খাই, দ্যাট’স অল আই হ্যাভ ইন দ্য মর্নিং। সির্ফ ফ্রুট জুস।”

 

“অ্যা, স্রেফ এক গ্লাস ফলের রস? খিদে পায় না?” প্রশ্নটা সদানন্দবাবুর।

 

আশা মালহোত্রা হেসে বললেন, “পায়। কিন্তু কী করব? গট টু ওয়াচ মাই ফিগার। নেহি তো মিসেস ঘোষ…আই মিন আমাদের ডাগদারবাবুর ওয়াইফের মতন মোটি হয়ে যাব। তখুন তো রাচ্ছসির মতন দেখাবে। ঠিক না?”

 

প্রতিবাদ করাটাই ভদ্রতা, তাই দু’দিকে ঘাড় নেড়ে বললুম, “না না, কী যে বলেন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু দুপুরে চাট্টি খাবেন তো? নাকি ব্রেকফাস্টের মতন সেটাও বাদ?”

 

“না না, সেটা কেনো বাদ পড়বে?” আশা মালহোত্রা বললেন, “ইন ফ্যাক্ট লাঞ্চের আগেও এক দফে খাব। তার টাইম তো এসে গেল। ওই যাকে আপনারা ইলেভেনসেস বোলেন আর কি। চায় উইথ টু বিস্কিটস। তা হলে চায় বানিয়ে আনি?”

 

বললুম, “আনুন, আমিও খাব। তবে বিস্কুট খাব না, স্রেফ চা।…ও হ্যাঁ, হাতে তো আর একটুও সময় নেই, যেজন্যে এলুম, সেই কাজটা কিন্তু চা খেয়েই শুরু করে দিতে হবে। নাটকের একটা কপি এখানে আছে তো?”

 

“হাঁ হাঁ, কিতাব তো জরুর আছে।” আশা মালহোত্রা ভিতর থেকে এককপি ‘চন্দ্রগুপ্ত’ এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “আপনারা এটা স্টাডি কোরেন, আমি চায় নিয়ে আসছি। আভি আয়ি।”

 

বলে আবার ভিতরে চলে গেলেন।

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ওঃ, ওয়ান্ডারফুল ওয়ান্ডারফুল!”

 

“কী ওয়ান্ডারফুল?”

 

“এনার বাংলা। হেলেন সেজে স্টেজে নেবে এইরকমের বাংলা যদি ছাড়তে পারেন তো আর দেকতে হবে না। জমে যাবে, মশাই, দারুণ জমে যাবে!”

 

জিজ্ঞেস করলুম, “সত্যি সত্যি আপনি তা-ই বিশ্বাস করেন?”

 

শুনে সদানন্দবাবু হাঁ করে আমার দিকে তা প্রায় পাঁচ-সাত সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারপর হাঁ বন্ধ করে বললেন, “কেন, আপনি বিশ্বাস করেন না?”

 

উত্তরে নিশ্চয় জোরগলায় বলা উচিত ছিল যে, ‘না মশাই, বিশ্বাস করি না, কিন্তু ভিতরে-ভিতরে বোধহয় আমিও একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিলুম, ভাবতে শুরু করেছিলুম যে, কে জানে, এঁরাই বোধ হয় ঠিক কথা বলছেন, তাই নিস্তেজ গলায় বললুম, “কী জানি, ভাদুড়িমশাই আসতে বললেন, আর কার্ভালো-টার্ভালোর নাম করে আপনিও খুব তোল্লাই দিলেন, তাই কী আর করব, বাধ্য হয়ে আমাকে আসতে হল। কিন্তু আমার তো মনে হয়…কী মশাই, ভয়ে বলব, না নির্ভয়ে বলব?”

 

“বলে ফেলুন, বলে ফেলুন,” পা দোলাতে-দোলাতে সদানন্দবাবু বললেন, “এটা কি সেই ইংরেজ আমল নাকি যে, ভয়ে ভয়ে কতা বলতে হবে!”

 

সদানন্দবাবুর ইংরেজ-ভক্তির তুলনা নেই। এই নিয়ে ওঁর আড়ালে আমরা একটু হাসাহাসিও করে থাকি। আবার এখন দেখছি, ইংরেজ আমলে যে নির্ভয়ে কথা বলা চলত না, এই রকমের একটা স্বীকারোক্তি তিনি করে বসলেন। ভদ্রলোককে বোঝা সত্যিই শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে!

 

বললুম,”কথাটা তা হলে বলেই ফেলি, কেমন?”

 

“বিলক্ষণ।”

 

“তা হলে শুনুন। আপনার বিশ্বাস নাটক জমে যাবে, আর আমার বিশ্বাস, লোকে কুকুর-বেড়াল ডাকবে, চাই কি ইট-পাটকেলও ছুড়তে পারে!”

 

“কোই আদমি ইঁটা ফেঁকবে না!” চায়ের ট্রে হাতে করে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন আশা মালহোত্রা। তারপর ড্রয়িং রুমের সেন্টার টেবিলে ট্রেটা নামিয়ে রেখে বললেন, “আপনি কুত্তা অওর বিল্লির কথা বলছিলেন না? ঠিক বোলছিলেন। হর্ রাত ইখানে কুত্তা চিল্লায়, বিল্লি ভি চিল্লায়। এইসা চিল্লায় যে, আমার নিন্দ হোয় না। লেকিন কুছু কোরবার নাই। চৌকিদারকে বলি, দো-চার ইঁটা ফেঁকো, নেহি তো ওরা ভাগবে না। তো সে কী বোলে জানেন?”

 

যেন ঘাম দিয়ে আমার জ্বর ছাড়ল। বুঝলুম যে, আমার কথাটা ইনি শুনেছেন বটে, তবে অর্থটা ধরতে পারেননি। ঢোক গিলে বললুম, “কী বলে?”

 

“বোলে যে, নেহি মাইজি, হামি ইঁটা-উটা ফেঁকবে না। ফেঁকলে পাপ হোবে।…নাউ লুক অ্যাট দ্য ফান। কুত্তা চিল্লাবে, বিল্লি চিল্লাবে, আপনার নিন্দ হোবে না, বাট ইউ কান্ট ডু-এনিথিং অ্যাবাউট ইট। ইউ জাস্ট কান্ট।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ঠিক বলেছেন ম্যাডাম। আমরা তো গেস্ট হাউসে আচি, সেখানেও একই রকমের ঝামেলা। কাল হোল নাইট কুকুর ডেকেছিল। ওরে বাপ রে বাপ, কান একেবারে ঝালাপালা হবার জোগাড়। আমি অবশ্য তারই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে পেরেছিলুম, কিন্তু কিরণবাবু তো শুনলুম একদম ঘুমোতে পারেননি।”

 

বললুম, “একেবারে শেষরাতে ঘুমিয়েছিলুম, উঠতে তাই বেশ বেলা হয়ে গেসল।”

 

আশা মালহোত্রা বললেন, “সেটা তো আমি জানি। সুবে সাড়ে ছে বাজে টেলিফোন করেছিলাম না? তো শুনলাম যে, আপনি ঘুমাচ্ছেন। …নিন, চায় পিয়ে নিন।”

 

পেয়ালা তুলে ঘন ক্বাথের মতো যে-পদার্থটিতে চুমুক দিলুম, সত্যি সেটা চা, নাকি ছেলেবেলায় সর্দিজ্বর হলে গরম জলে মিছরির সঙ্গে লবঙ্গ দারচিনি গোলমরিচ বচ ইত্যাদি বেশ উত্তমরূপে ফুটিয়ে নিয়ে যে থকথকে বস্তুটি মা আমাদের খাওয়াতেন, সেই ঝাঁঝালো পাঁচন, তা ঠিক বুঝতে পারা গেল না। কোনওক্রমে সেটা শেষ করে বললুম, “তা হলে আর দেরি করে লাভ নেই, আমাদের তো আবার লাঞ্চের জন্যে গেস্ট হাউসে ফিরতে হবে, কাজটা শুরু করা যাক।”

 

“সে কী,” আশা মালহোত্রা বললেন, “লাঞ্চকে লিয়ে আপনাদের কেনো গেস্ট হাউসে লৌটতে হোবে, সেটা তো আপনারা ইখানেই করতে পারেন।”

 

সদানন্দবাবু নিজে চা খাননি বটে, তবে চা-পর্বটা যে বিশেষ সুবিধের হয়নি, আমার মুখচোখ দেখে সেটা নিশ্চয় আন্দাজ করে থাকবেন, তাই আর লাঞ্চের ব্যাপারে ঝুঁকি না নিয়ে বললেন, “না না, লাঞ্চের জন্যেই যে ফিরতে হবে, তা নয়, আসলে মিঃ ভাদুড়ির সঙ্গে আমাদের একটা জরুরি কাজ পড়ে গিয়েচে কিনা, তিনি বোধহয় দেড়টা নাগাদ আমাদের নিয়ে একবার ইস্টিশানের ওদিকে যাবেন, মিঃ সেনকে গাড়ির কতাও বলে রাখা হয়েচে, তাই…মানে বুঝতেই তো পারচেন, দেড়টার মধ্যে না ফিরে উপায় নেই।”

 

আমি বললুম, “কাজটা তাই আর ফেলে রাখা ঠিক হবে না। তা প্রথমে কি ডায়ালোগগুলো পড়ে শোনাব? নাকি নাটকের যেটা কাহিনি, সেইটে আগে বলে নিলে ভাল হয়?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “পুরোটা বলবার দরকার নেই, তার সময়ই বা কোতায় পাচ্চেন, শুধু ব্যাকগ্রাউন্ডটা বললেই চলবে। হেলেনের কোন কতাটা যে কেন আসচে, মিসেস মালহোত্রা তাতেই সেটা বুজে নিতে পারবেন।”

 

আশা মালহোত্রা বললেন, “ঠিক আছে, কহানিটাই আগে বোলেন।”

 

তো যতটা সংক্ষেপে সেটা বলা যায়, বলতে হল। শূদ্রাণীর গর্ভে জন্মেছেন বটে, তবে চন্দ্ৰগুপ্ত যে আসলে রাজপুত্রই, মগধরাজ মহাপদ্মের ছেলে, সেটা বললুম। বৈমাত্রেয় ভাইয়ের তাড়া খেয়ে তিনি যে এই নাটকের গোড়ায় মগধ ছেড়ে দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, সেটা বললুম। সেলুকাসের কাছে যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করে চাণক্যের কূটবুদ্ধির সাহায্যে তিনি হৃতরাজ্য উদ্ধার করেছিলেন, তাও বললুম। বলে, সদ্য যখন সোফায় হেলান দিয়ে একটু দম ফেলবার উপক্রম করছি, মিসেস মালহোত্রার প্রশ্নটা তখনই বুলেটের মতো ছুটে এল।

 

“হু ইজ দিস সেলুকাস।”

 

উত্তরটা সদানন্দবাবুই দিলেন। একগাল হেসে বাংলা ইংরেজি ও হিন্দিতে পরপর তিনটি বাক্যে বললেন, “আপনার বাবা। ইয়োর ফাদার। আপকা পিতাজি।”

 

আশা মালহোত্রা কিছুই বুঝলেন না। বিভ্রান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেয়া মতলব?”

 

বললুম, “বুঝিয়ে বলছি। কিন্তু তার আগে ভুলে যান যে, আপনি আশা মালহোত্রা। আপনি তো হেলেনের ভূমিকায় নামছেন, সুতরাং এখন শুধু এই কথাটাই মনে রাখুন যে, আপনি হেলেন। ঠিক আছে?”

 

“হাঁ হাঁ, সেটা তো আমি জানি।”

 

“বাস, তা হলে শুনুন। হেলেন অর্থাৎ আপনি হচ্চেন সেলুকাসের মেয়ে, আর সেলুকাস হচ্ছেন আলেকজান্ডারের সেনাপতি।”

 

আশা মালহোত্রার বিভ্রম কিছুমাত্র কমেছে বলে মনে হল না। বললেন, “এর মধ্যে আবার আলেকজান্ডার কেনো আসবে?”

 

বললুম, “বাঃ, এটা আলেকজান্ডাবের সময়কার ঘটনা যে। সেই যখন তিনি ইন্ডিয়া অ্যাটাক করেছিলেন, তখনকার ব্যাপার। ফোর্থ সেঞ্চুরি বি.সি.।”

 

“মাই গড! সেটা তো বহোত পুরানো বেপার হল। তো ডি. এল. রায় সেইটা নিয়ে ড্রামা লিখতে গেলেন কেনো? মডার্ন একটা কিছু বেপার নিয়ে লিখতে পারতেন!”

 

শুনে আমার চক্ষুঃস্থির। বললুম, “তা নিশ্চয় পারতেন, তবে কিনা তিনি চন্দ্রগুপ্তকে নিয়ে এই নাটকখানাই লিখতে চেয়েছিলেন, আর অভিনয়ের জন্যে এটাই আপনারা সিলেক্ট করেছেন। সুতরাং কী তিনি লিখতে পারতেন, এখন তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে তো কোনও…”

 

সদানন্দবাবু আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, “লাভ নেই, ম্যাডাম, কিচু লাভ নেই। আপনি যখন হেলেন হতে রাজি হয়েচেন, তখন আর ও-সব কতা ভেবে লাভ কী, এই নাটকের কতাই ভাবুন। ডায়ালোগগুলো ভাল করে ফলো করুন দিকিনি। কোতায় হেসে কতা কইতে হবে, কোতায় একটু ব্যাজার হতে হবে, কোতায় নিজের বাপকেও বেশ দাবড়ে দিতে হবে…মানে বাপের আল্লাদি মেয়ে তো, তাই একটু দাবড়ে-টাবড়ে দিলে সে কিচু খারাপ হবে না.. আর হ্যাঁ, ইন্ডিয়ানদের সাপোর্টে কতা কইবার সময় কোতায়-কোতায় গলা কাঁপিয়ে ভয়েসটাকে থ্রো করতে হবে, সেটা দেকে নিন। দেকবেন, হাততালিতে হল একেবারে ফেটে পড়বে।”

 

আশা মালহোত্রা বললেন, “ইয়ে সচ হ্যায়? আই মিন যারা নাটক দেখতে আসবে, তারা খুশি হোবে? তালি বাজাবে?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “বিলকুল সচ হ্যায়। এ তো আমি পষ্ট দেকতে পাচ্চি। এ-নাটক আমিও করিচি তো, তাই নিজের এক্সপিরিয়েন্স থেকে বলচি যে, অন্তত পাঁচ-ছটা জায়গায় আপনার ক্ল্যাপ একেবারে বাঁদা। কেউ ঠেকাতে পারবে না, ম্যাডাম, আপকো কোই নেহি রুকনে সেকেগা। আমি গ্যারান্টি দিচ্চিএ আপনি লিকে রাকতে পারেন।”

 

আশা মালহোত্রা এতক্ষণ একটা দোটানার মধ্যে ছিলেন। সম্ভবত এমনও ভাবছিলেন যে, মূল নাটকটির সম্পর্কেই কোনও ধারণা যখন নেই, তখন এত হুজ্জুতের মধ্যে যাওয়া মোটেই সুবুদ্ধির কাজ হবে না। কিন্তু সদানন্দবাবু যেভাবে হাততালির লোভ দেখিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বকে তোল্লাই দিতে-দিতে একেবারে মগডালে তুলে দিলেন, তাতে কাজ হল। ভদ্রমহিলার চোখ দুটো দেখলুম চকচক করছে। মৃদু হেসে বললেন, “ওতো বোলবেন না, ওতো বোলবেন না। অগর হাঁ, রাজি যোখোন হয়েছি, তোখোন ইয়ে কাম তো করনা হি পড়েগা।…চাটার্জিসাব, ইউ প্লিজ স্টার্ট। হেলেন যেখানে অ্যাপিয়ার করবে, সেইখানটার কথাগুলো একবার বোলেন।”

 

বললুম, “হেলেনের ফার্স্ট অ্যাপিয়ারেন্স সেকেন্ড অ্যাক্টের ফার্স্ট সিনে। আলেকজান্ডার তো নর্থ-ওয়েস্ট ইন্ডিয়ার অনেকটা জায়গা দখল করে, সেলুকাসকে সেখানকার গবর্নর বানিয়ে দেশে ফিরে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ফিরতি পথেই তিনি মারা যান। তো সেলুকাস…”

 

কথাটা শেষ করতে পারলুম না। আশা মালহোত্রা আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, “হেলেন কেনো সেকেন্ড অ্যাক্টে নামবে? কেনো সে ফার্স্ট অ্যাক্টেই নামবে না?”

 

“তা আমি কী করে বলব? নাটকের মধ্যে কার কখন ফার্স্ট অ্যাপিয়ারেন্স হবে, ডি. এল. রায় যে এইভাবেই তার প্ল্যানিং করেছিলেন। তিনি ফার্স্ট অ্যাক্টে ছায়াকে নামিয়েছেন বলেই হয়তো হেলেনকে নামাননি। ভেবেছিলেন যে, একই অঙ্কে দু’দুজন হিরোইনকে দেখিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।”

 

আশা মালহোত্রা গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “আব সমঝি।”

 

“কী বুঝলেন?”

 

“বুঝলাম যে, হেলেনের পার্ট ছোড়ে দিয়ে মিসেস সেন কেনো ছায়ার পার্ট নিয়ে নিল।” সদানন্দবাবু বললেন, “তার মানে?”

 

“মানে সে তো চিফ এগজিকিউটিভ অফিসারের ওয়াইফ, তাই তার আগে কাউকে অ্যাপিয়ার হতে দিবে না।” আশা মালহোত্রা রহস্যময় হেসে বললেন, “রেখা…আই মিন মিসেস দাশ মরতে তার সুবিধা হয়ে গেল। মানে ফ্রম দ্য বিগিনিং ক্ল্যাপ নিবার লাইন ক্লিয়ার হয়ে গেল আর কি।”

 

সদানন্দবাবু আবার হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন, অনেক কষ্টে হাঁ বুজিয়ে ফের সেই একই কথা বললেন, “তার মানে?”

 

আশা মালহোত্রাও আবার সেই একই রকমের রহস্যময় হেসে বললেন, “মানে যা বুঝেন। …এনিওয়ে, চাটার্জিসাব, ইউ প্লিজ প্রসিড।”

 

ঢোক গিলে বললুম, “ও হ্যাঁ, হেলেনকে সেলুকাস বললেন যে, আলেকজান্ডার মারা গেছেন, আর তাই তিনিই…মানে সেলুকাসই এখন ইন্ডিয়াতে গ্রিকদের জয়-করা তাবৎ জায়গাজমির একচ্ছত্র অধিপতি। সেলুকাস আরও বললেন, আলেকজান্ডার যা করতে পারেননি, তিনি এবার তা-ই করবেন, অর্থাৎ কিনা গোটা ইন্ডিয়া জয় করবেন। তাই শুনে হেলেন বললেন, তাতে কী লাভ হবে?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ভার আগেও অবিশ্যি হেলেনের একটা কতা রয়েচে। আলেকজান্ডার যে দেশে ফেরার আগেই মারা গেসলেন, এই খবর শুনে হেলেন বলবে, সে কী, তিনি নিজের দেশেও মরতে পেলেন না?…এই যে সব কতা, এর স্পিরিটটা আপনাকে ধরতে হবে। সে আপনি পেরে যাবেন। তবে হ্যাঁ, মরা না বলে যদি ‘গুজর গিয়া’ কি ‘ফৌত হো গিয়া” বলেন আর ‘তাতে কী লাভ হবে’ না-বলে যদি ‘উসমে ক্যা নাফা হোগা’ বলেন তা হলে কিন্তু আরও জমে যাবে, ম্যাডাম।”

 

আশা মালহোত্রাকে সংলাপগুলো পড়ে শোনাতে এসেছিলুম, তবে সদানন্দবাবু যে একইসঙ্গে তাঁকে অ্যাক্টিংয়েরও তালিম দিতে থাকবেন, সেটা আমার জানা ছিল না। তবে এ পর্যন্ত যা বলেছি, তার থেকেই আন্দাজ করা যাবে যে, আমার কাজটা কীভাবে এগোচ্ছিল। তাও কাজ এগোল সামান্যই। দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্য শেষ হতে না হতেই দেড়টা বাজার উপক্রম। ফলে, ‘পারি তো কাল আসব’ বলে উঠে পড়তে হল। গাড়িতে উঠে জানলায় মুখ রেখে সদানন্দবাবু বললেন, “ঘাবড়াবেন না ম্যাডাম। হেলেনের স্পিরিটটাই হচ্চে আসল কতা। তো সেটা যখন ধরতে পেরেচেন তখন আর চিন্তা কীসের?”

 

উত্তরে ভদ্রমহিলা প্রথমে সামান্য ঘাড় নাড়লেন। তারপর একটু এগিয়ে এসে গলা একেবারে খাদে নামিয়ে যা বললেন, তাতে আমিই বিলক্ষণ ঘাবড়ে গেলুম। “চিন্তা তো আমার কুছু নাই, চিন্তা আপনারা কোরেন। আপনারা যেটা বললেন, সেটা আমি শুনলাম। এখোন আমার অ্যাডভাইস যদি শুনেন তো বলি, রেখা মরলে কার সুবিধা সেটা আপনাদের ভাবতে হোবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *