অলক্ষ্মীর গয়না (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ 

কর্নেল কেন নিজেকে বোকা এবং বাহাত্তুরে ধরেছে বললেন, বিস্তর প্রশ্ন ছুঁড়েও আদায় করা গেল না। ট্র্যাকিং ডগ যেমন করে গন্ধ শুঁকে খুনির আনাগোনার রাস্তায় ছোটে, তেমনি করে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরলেন–নিচের দিকে দৃষ্টি। বারকতক অলক্ষ্মীর চত্বরে চক্কর দিলেন। তারপর সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে চুরুট ধরালেন।

 

হাল ছেড়ে দিয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইলুম। সামনের ঝোপে থরেবিথরে বুনো ফুল ফুটে কেমন একটা গন্ধ ছড়াচ্ছে। তার নিচে ভরা নদী কলকলিয়ে বয়ে যাচ্ছে। নদীর প্রসার মিটার তিরিশের বেশি নয়। ওপারে কাশবন ফুলে-ফুলে সাদা হয়ে আছে। তারপর ঢেউ-খেলানো ধানের মাঠ এবং এখানে-ওখানে একটা করে টিলা-পাহাড়। প্রকৃতির মধ্যে এলে যখন কর্নেলের কথামতো মগজ পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা, তখন আশা করি আমিও রহস্যটা বুঝে উঠতে পারব।

 

হুঁ–নেলপালিশটা একটা রহস্য বটে। নদীর ধারে এ জিনিস ঝোপের মধ্যে পড়ে থাকাটা কাজের কথা নয়।

 

নয় কি? ওই তো কিছুটা দূরে বাঁকের মাথায় আদিবাসীদের একটা বস্তি দেখা যাচ্ছে। কোনও আদিবাসী বালিকা এ পথে লোহাগড়ার বাজারে গিয়েছিল এবং শখ করে একটা নেলপালিশ কিনেছিল। ফেরার পথে সেটা কীভাবে এখানে পড়ে গেছে।

 

মনে-মনে খুশি হয়ে বললুম, ইউরেকা! তারপর ঘুরে দেখি, বাহাত্তরে-ধরা ভদ্রলোকটি অদৃশ্য। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওঁকে খুঁজে পেলুম না। তখন অলক্ষ্মীর উঁচু চত্বরে উঠলুম। এবার ওঁর টুপিটি দৃষ্টিগোচর হল। কালো বাইনোকুলার চোখে রেখে হাঁটু দুমড়ে বসে নিশ্চয়ই কোনও দুর্লভ পক্ষিবরকে দর্শন করছেন। বোঝা গেল, এবেলার মতো ওঁকে আর পাওয়া যাবে না।

 

চত্বর থেকে নেমে বোট-হাউসের দিকে সাবধানে এগিয়ে গেলুম। প্রফেসর তানাচার মড়াটা জনাই-পাগলা যদি সত্যি লুকিয়ে রেখে থাকে, এতক্ষণে খানিকটা অংশ ব্রেকফাস্ট খাওয়া হয়ে গেছে তাহলে। ত্রিসীমানায় পুলিশ নেই। অতএব জনাই নিশ্চিন্তে আস্তানায় ফিরে রাতের ঘুমটা পুষিয়ে নিতেও পারে।

 

যা ভেবেছিলুম, ঠিক তাই। বোট-হাউসের ভেতর জনাই-পাগলার ঠ্যাংদুটো দেখতে পেলুম। তারপর পুরো শরীরটা। ভাঙা পানসির আড়ালে ছায়ায় ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিলুম। জনাই ঠ্যাং নাচাচ্ছে। চোখদুটো বুজে রয়েছে। উঁহু, ঘুমোচ্ছেন। কোথায় যেন পড়েছিলুম, ঘুমোলে। পাগলামি সেরে যায়। তাই পাগলরা ঘুমোয় না।

 

সাহস করে একটু কাশতেই জনাই তড়াক করে উঠে বসল। বোট-হাউসের মেঝে থেকে এক টুকরো ইটও হাতে নিল। তখন পকেট থেকে রিভলভার বের করে বললুম, –সাবধান জনাই! গুলি ছুড়ব বলে দিচ্ছি।

 

জনাই ইট ফেলে হাঁউমাউ করে উঠল। –ওরে বাবা! মরে যাব! মাইরি বলছি, মরে যাব! এই! এই!

 

বোট-হাউসে ঢুকে বললুম, ম্যাজিকবাবুর মড়া কোথায়?

 

জনাই রিভলভারটার দিকে ভয়ে-ভয়ে তাকিয়ে বলল, –পাইলে গেছে। তোমার দিব্যি।

 

–পালিয়ে গেছে? মড়া কখনও পালায়? নিশ্চয়ই তুমি খাওয়ার জন্য লুকিয়ে রেখেছ।

 

–যাঃ! কী যে বলে। ম্যাজিকবাবু আফিং খায়। ওর মড়া তেতো।

 

–জয়গোপালবাবুর কুকুরটার মড়া বুঝি মিষ্টি ছিল?

 

জনাই-পাগলা হাত বাড়িয়ে বলল, –একটা সিগ্রেট দেবে? দাও না।

 

রিভলভারটা পকেটে ঢুকিয়ে ওকে একটা সিগারেট দিলুম। দেশলাই জ্বেলে সেটা ধরিয়ে দিলে জনাই চো-চো করে কয়েকটা টান দিল। তারপর কাশতে লাগল। বললুম, –জনাই! ম্যাজিকবাবুর মড়াটা কোথায় গেল?

 

সিগারেটটা নিভিয়ে সে জটাচুলের ভেতর খুঁজে বলল, -মা অলক্ষ্মীর দিব্যি, পাইলে গেল। ধরতে গেছি, আর অমনি পাইলেছে!

 

পাগলামি করো না জনাই! তাহলে সত্যি গুলি ছুড়ব। –বলে ওকে ভয় দেখাবার জন্য যেই পকেটে হাত ভরেছি, অমনি জনাই আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে গুলতির মতো বেরিয়ে গেল। ধুলোময়লা ঝাড়তে-ঝাড়তে বোট-হাউস থেকে বেরিয়ে আর তাকে দেখতে পেলুম না।

 

ফটকের কাছে গোয়েন্দাপ্রবরের সঙ্গে দেখা হল। বললুম, –আপনার পাখিটিও বুঝি প্রফেসর তানাচার মড়ার মতো পাইলে গেল?

 

কর্নেল একটু হাসলেন। জনাই-পাগলাকে যেভাবে পালাতে দেখলুম, ঠিক সেভাবেই। তবে আমি তাকে ভয় দেখাইনি।

 

–আপনি কী করে দেখলেন, আমি ওকে ভয় দেখাচ্ছিলুম?

 

কর্নেল বাইনোকুলারটি দেখিয়ে বললেন, -এই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে বহু দূরের ঘটনা দৃষ্ট হয়, ডার্লিং! যাই হোক, জনাই দেখলুম তোমাকে খুব খাতির করছিল!

 

প্রফেসর তানাচার মড়া পালানোর গল্প শুনে কর্নেল খুব হাসলেন। তারপর বললেন, চলো! রোদ্দুর বড় চড়া। ফেরা যাক।

 

রাজবাড়ি পৌঁছে কর্নেল রাঘবকে ডাকলেন। রাঘবের ডিউটি আমাদের ফাইফরমাশ খাটা। তাই সে হলঘরে মোতায়েন ছিল। কর্নেল বললেন, -রাঘব! রাজবাড়িতে কেউ তাস খেলেন না?

 

রাঘব বলল, -রাজাবাহাদুর খেলেন দেখেছি। তবে একা-একা খেলেন।

 

পেশেন্স খেলা!–কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, হুঁ, আর কেউ খেলেন না? ম্যানেজারবাবু?

 

–আজ্ঞে না স্যার। ওনার খালি ওই কুকুর।

 

–এক প্যাকেট তাস জোগাড় করতে পারো?

 

রাঘব মাথা চুলকে বলল, -তাহলে সেই বাজার থেকে কিনে আনতে হয়। ম্যাঞ্জারবাবুকে বলি।

 

-না। রাজাবাহাদুরের তাসের প্যাকেট বুঝি পাওয়া যাবে না?

 

–আপনার নাম করে বললে সে কি আর দেবেন না স্যার? এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।

 

রাঘব চলে গেলে সন্দিগ্ধভাবে বললুম, –তাস কী হবে? আপনাকে তো কখনও তাস খেলতে দেখিনি।

 

কর্নেল হাসলেন। ম্যাজিক দেখাব জয়ন্ত! থটরিডিংয়ের খেলা দেখিয়ে তোমাকে তাক লাগিয়ে দেব।

 

একটু পরে রাঘব এক প্যাকেট তাস নিয়ে হাসিমুখে ঘরে ঢুকল। রাজাবাহাদুর ঠাকুরঘরে ঢুকেছেন। সেই ফাঁকে নিয়ে এলুম স্যার! জানতে পারলে কিন্তু আমার রক্ষে থাকবে না।

 

কর্নেল তাকে আশ্বস্ত করলেন।

 

রাঘব চলে গেলে কর্নেল নিজের বিছানায় বসে তাসগুলো নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কীসব খেলতে শুরু করলেন, যেন কচি খোকা। ছড়াচ্ছেন, আবার তুলে শাফল করছেন। আবার ছড়াচ্ছেন। সাজাচ্ছেন। দেখতে-দেখতে বিরক্তি ধরে গেল। চোখ বুজে সিগারেট টানতে থাকলুম। একসময় ভেতরে আসতে পারি বলে ডাঃ ঢোল ঘরে ঢুকলেন। কর্নেলকে তাস নিয়ে খেলতে দেখে বললেন, –পেশেন্স খেলছেন নাকি কর্নেলসায়েব?

 

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, –আসুন ডাক্তার ঢোল! আপনাদের আমি ম্যাজিক দেখাব।

 

-খুব ভালো, খুব ভালো। দেখান! ভেবেছিলুম আজই কেটে পড়ব। হল না। ম্যাজিক দেখেই সময় কাটাই।

 

–এখানে আসুন। জয়ন্ত, তুমিও এসো।

 

এ বুড়োখোকার এ-ধরনের পাগলামি বিস্তর দেখেছি। কাছে গেলে বললেন, –ডাক্তার ঢোল! আমি হাত দেব না। ঘুরে বসছি। দেখবও না কিছু। দশজোড়া তাস আপনারা বাছুন। বাকি তাস সরিয়ে রাখুন। এই দশজোড়ার মধ্যে আপনি একজোড়া আর জয়ন্ত একজোড়া মনে-মনে বেছে। নিন। স্মরণে রাখুন। তারপর কুড়িটে তাস একত্র করে রেখে দিন।

 

সে তো প্রফেসর তানাচার ম্যাজিক! জয়গোপালবাবু বলছিলেন!–না বলে পারলুম না কথাটা।

 

ডাঃ ঢোল কুড়িটা তাস নিয়ে দশটা জোড়া করে ফেললেন। বললেন, আমি একজোড়া বাছলুম। জয়ন্তবাবু, আপনি বাছুন।

 

আমি ইস্কাপনের বিবি আর একটা রুহিতনের তিরি বাছলুম। ডাঃ ঢোল দশজোড়া তাস একত্র করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল ঘুরে বসেছিলেন এতক্ষণ। বললেন, -হয়েছে? ফু-মন্তর লেগে যা!

 

বলে তাসগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে উনি সুর ধরে আওড়ালেন, -কবে যাবি রে সেই সমাজে, ছাড় কুইচ্ছে পোড়া পাম রে।

 

আমি তো অবাক।

 

পাঁচটা করে তাস এক সারিতে রেখে চারটে সারিতে সাজালেন কর্নেল। তারপর বললেন, –ডাক্তার ঢোল, আপনার তাসজোড়া এক সারিতে আছে, নাকি দুই সারিতে একটা করে আছে?

 

–প্রথম সারিতে একটা, তৃতীয় সারিতে একটা।

 

কর্নেল প্রথম সারি থেকে হরতনের গোলাম আর তৃতীয় সারি থেকে চিড়িতনের দশ তুলে বললেন, -রাইট?

 

ডাঃ ঢোল অবাক হয়ে বললেন, -বাঃ! এ তো ভারি অদ্ভুত!

 

আমি বললুম, –আমার জোড়াটা শেষ সারিতে আছে।

 

কর্নেল শেষ সারি থেকে ইস্কাপনের বিবি আর রুহিতনের তিরি তুলে বললেন, -রাইট?

 

–হুঁ। কিন্তু…

 

কোনও কিন্তুর ব্যাপার নেই ডার্লিং! এ হল মন্তর-তন্তরের ব্যাপার। কর্নেল তাসগুলো গুটিয়ে রেখে চুরুট ধরালেন।

 

ডাঃ ঢোল বললেন, আপনি দেখছি মশাই প্রচণ্ড গুণী লোক। জয়গোপালবাবুর কাছে আপনার অনেক গল্প শুনছিলুম। তবে ম্যাজিকের কথাটা তো উনি বলেননি।

 

-তবে আরও একটা ম্যাজিক দেখাই?

 

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই!–ডাঃ ঢোল খুব উৎসাহ দেখালেন।

 

কর্নেল বললেন, -পুরো এক প্যাকেট তাস এখানে আছে। আপনারা জানেন, প্যাকেটে মোট তাস থাকে বাহান্নখানা। জোকার দুটো বাদ দিন। কেমন তো!

 

-খুব জানি।

 

কর্নেল তাসগুলো ডাঃ ঢোলকে দিয়ে বললেন, -একটা তাস এ থেকে আমি অদৃশ্য করে দিয়েছি। দেখুন তো কোনটা!

 

ডাঃ ঢোল তাসগুলো খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন। আমি কর্নেলের দিকে তাকিয়ে ছিলুম। কর্নেলের মুখে রহস্যময় হাসি। তাসগুলো দেখে ডাঃ ঢোল বললেন, -ইস্কাপনের টেক্কাটা তো দেখছি না? লুকিয়ে রেখেছেন বুঝি?

 

কর্নেল হাত বাড়িয়ে বললেন, –জয়ন্ত, তোমার পকেটে মন্ত্রবলে চালান করে দিয়েছি? দাও।

 

চমকে উঠেছিলুম। কিন্তু কিছু বললুম না। ইস্কাপনের টেক্কাটা বের করে দিলুম। আশ্চর্য! একই কোম্পানির তৈরি তাস। তাহলে রাজাবাহাদুরই কি ডাঃ জেকিল এবং মিঃ হাইডের কাহিনির মতো রাতের বেলা অন্যরকম হয়ে ওঠেন? তিনিই কি তাহলে প্রফেসর তানাচার খুনি?

 

গা শিউরে উঠল। কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, দেখলেন তো ডাক্তার ঢোল? জয়ন্ত কেমন বোকা বনে গেছে?

 

ডাঃ ঢোল তারিফ করে বললেন, –রিয়ালি! আপনি দারুণ গুণী লোক! তুলনা হয় না।

 

কর্নেল তাসের প্যাকেট একপাশে সরিয়ে রেখে বললেন, -তারানাথ চাটুজ্জে–মানে প্রফেসর তানাচা প্রথম খেলাটা আবিষ্কার করেছিলেন, জানেন ডাক্তার ঢোল? দ্বিতীয়টা অবশ্য আমার আবিষ্কার। দুঃখের বিষয় প্রফেসর তানাচাকে কে শুধু খুন করল তাই নয়, ওঁর ডেডবডিটাও লুকিয়ে ফেলল।

 

ডাঃ ঢোল ভুরু কুঁচকে বললেন, –কিছু ক্লু পেলেন?

 

–পেয়েছি। একটা নেলপালিশের শিশি। এই দেখুন।

 

খুনে শিশিটা নিয়ে ডাঃ ঢোল নাড়াচাড়া করার পর ছিপি খুলেই চমকে উঠলেন। সর্বনাশ! এ তো লিকুইড ক্লোরোফর্ম! নাকে লাগালেই মানুষ অজ্ঞান হয়ে যাবে। বলে উনি ঝটপট ছিপি এঁটে দিলেন। একটা ঝাঝালো মিঠে গন্ধ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছড়িয়ে পড়ল।

 

কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, -হা, ক্লোরোফর্ম। নেলপালিশের সঙ্গে মেশানো। নির্বোধ প্রফেসর তানাচা! ব্যাপারটা টের পাননি। আচ্ছা ডাক্তার ঢোল, জয়গোপালবাবুর সঙ্গে আপনার কতদিনের পরিচয়?

 

পরিচয় মোটেও ছিল না। উনিই আমার ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন কাগজে দেখে ট্রাংককলে যোগাযোগ করেছিলেন। সময় পাচ্ছিলাম না। শেষে তাড়া দিলেন। অ্যাডভান্স টাকাও পাঠালেন। তখন চলে এলুম। –ডাঃ ঢোল মুখে বিস্ময় ফুটিয়ে বললেন, কিন্তু একথা জিগ্যেস করছেন কেন বলুন তো! আমার ওপর কি কোনও সন্দেহ আছে আপনার?

 

কর্নেল হাত তুলে বললেন, -না, না। জাস্ট জানতে চাইছি।

 

কী জানি মশাই, আপনার সম্পর্কে যা সব শুনছি, বড্ড ভয় করে। শুকনো হাসলেন ডাঃ ঢোল।

 

কর্নেল চাপাগলায় বললেন, আপনার একটু সাহায্য চাই ডাক্তার ডোল! পাব তো!

 

–অবশ্যই পাবেন। বলুন, কী করতে হবে।

 

-জয়গোপালবাবুর দুটো কুকুর আছে। একটা মোটামুটি শান্ত, মানুষ-ঘেঁষা স্বভাবের। ওটাকে নিয়ে সমস্যা নেই। অন্য কুকুরটা–যেটা লম্বাটে ছিপছিপে গড়নের, মানে ডোবারম্যন পিঞ্চার জাতের কুকুরটার কথা বলছি। …

 

-ওরে বাবা! সে যে ধড়িবাজ বদমাশ! দুর থেকে খালি আমাকে দাঁত দেখায়।

 

-ডাঃ ঢোল, মানুষের বুদ্ধিই মানুষকে সব প্রাণীর প্রভু করেছে। আপনি বিচক্ষণ মানুষ। দ্বিতীয় কুকুরটাকে যেভাবেই হোক ইঞ্জেকশান দিয়ে আজ রাতে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হবে।

 

ডাঃ ঢোল চমকে উঠে নাক চুলকে বললেন, -সর্বনাশ! সে তত বড্ড রিস্কি।

 

আমি আপনাকে অ্যাসিস্ট করব ডাক্তার ঢোল! কিন্তু সাবধান, জয়গোপালবাবু যেন না টের পান।

 

তা আর বলতে? –ডাঃ ঢোল চিন্তিতভাবে বললেন, কিন্তু কথাটা হল, যদি হঠাৎ কামড়ে দেয়! বলা যায় না, কুকুরের লালায় সাংঘাতিক সব ভাইরাস গিজগিজ করে।

 

কর্নেল বললেন, -মনে রাখবেন ডাক্তার ঢোল, ওই কুকুরটাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার ওপরই সব রহস্যের সমাধান নির্ভর করছে।

 

ডাঃ ঢোল অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, -আচ্ছা।

 

এই সময় রাঘব পরদা তুলে বলল, স্যার! রাজাবাহাদুর আপনাদের দুজনকে তলব করেছেন।

 

ডাঃ ঢোল নিজের ঘরে গেলেন। আমরা দুজনে রাজাবাহাদুরের কাছে গেলুম। পুজো সেরে রাজাবাহাদুর তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসেছিলেন। হেসে বললেন, –আসুন কর্নেল! আসুন সাংবাদিকবাবু!

 

কর্নেল তাসের প্যাকেট দিয়ে বললেন, আপনার তাস রাজাবাহাদুর! আশা করি, এ অনধিকার চর্চার জন্য ক্ষমা করবেন।

 

ক্ষমা করতে পারি এক শর্তে। যদি হারানো তাসটা উদ্ধার করতে পারেন।

 

করেছি।

 

–তাহলে ক্ষমা করে দিলুম।

 

–আমার আরেকটা ছোটো প্রশ্ন আছে, রাজাবাহাদুর।

 

জবাব দেওয়ার মতো হলে দেব। নইলে দেব না।

 

-জয়গোপালবাবু জনাইকে এমন মার মেরেছিলেন যে মাথায় সাংঘাতিক চোট লেগে পাগল হয়ে গেল। কেন মেরেছিলেন?

 

জনাই ওর অ্যালসেশিয়ানকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশান দিয়ে মেরে ফেলেছিল।

 

কর্নেল একটু হাসলেন। আর প্রশ্ন করছি না। কিন্তু জনাইকে হুকুমটা গোপনে সম্ভবত আপনিই দিয়েছিলেন। রাজাবাহাদুর, জয়গোপালবাবুকে আপনি ভয় করেন, জানি, অথচ এত ভয়ের কারণ ছিল না। এখনও হয়তো নেই।

 

রাজাবাহাদুর চাপাগলায় উত্তেজিতভাবে বললেন, –আছে। ও ডাক্তার এনেছে। জোর করে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চাইছে। কারণ সে দেখছে, আমি আপনাকে ডেকে এনেছি–তার সব কারচুপি ধরে ফেলেছি।

 

কর্নেল চোখ বুজে টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, –হুঁ, দরজায়-দরজায় টোকা, উত্তর-পূর্ব ঘরটার ভেতর কাঁসার বাসন ছুঁড়ে ফেলার ঝনঝন শব্দ, ভারী পায়ে হেঁটে যাওয়া…

 

রাজাবাহাদুর সায় দিয়ে বললেন, -ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ… যেন দু পেয়ে হাতি হাঁটছে।

 

–আজ রাতে যদি আমার প্ল্যান সফল হয়, তাহলে দরজায় টোকা কেউ দেবে না এবং কাসার বাসনও কেউ ছুড়বে না।

 

আর ওই দু পেয়ে হাতিটাকে বুঝি বেঁধে রাখা যায় না?–রাজাবাহাদুর খিকখিক করে হাসলেন।

 

চেষ্টা করব। –বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন, তাহলে আসি রাজাবাহাদুর। একটু সাবধানে থাকবেন।

 

রাজাবাহাদুর আমার দিকে তাকিয়ে রগুড়ে ভঙ্গিতে বললেন, কী সাংবাদিকমশাই! কেমন সব গরমাগরম রহস্য! নোট নিচ্ছেন তো! সময়মতো দৈনিক সত্যসেবকে লিখবেন কিন্তু।

 

ওঁকে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়ে এলুম। আমাদের ঘরে পৌঁছে কর্নেলকে বললুম, বাপস! মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে। কিছু ঢুকছে না।

 

-কোনটা ঢুকছে না বলো তো বৎস!

 

–কোনটার কথা বলব! ধরুন, প্রফেসর তানাচার তাসের থটরিডিং এবং ওই মন্ত্রটা!

 

কর্নেল হাসলেন। আরে, ওটা ওই তাসের খেলার একটা সূত্র। জয়গোপালবাবু দশজোড়া তাসের খেলার কথা বলার পর অনেক ভেবে রহস্যটা ধরেছি। মন্ত্রটা লক্ষ করো মোট দশজোড়া বর্ণ আছে। ক ব য (জ) র ই স ম ছ ড় প। প্রত্যেকটির বর্ণ দুটো করে। তাহলে কুড়িটে হল। ধরো তুমি ইস্কাপন আর রুহিতনের দুটো টেক্কার জোড়া মনে রাখলে। আমি ক-য়ে রাখলুম ইস্কাপনের টেক্কা। পরের ক পাচ্ছি তৃতীয় লাইন তৃতীয় অক্ষরে। ছাড় কুইচ্ছে লাইনে পাঁচটা অক্ষরের তৃতীয় হল ক। সেখানে রাখলুম তোমার মনে রাখা সজোড়ার দ্বিতীয়টা-রুহিতনের টেক্কা। তুমি যখনই বলবে তোমার তাস প্রথম ও তৃতীয় লাইনে আছে, তখনই আমি জানতে পারছি কোন-কোন তাস জোড়া বেঁধেছিল। … কর্নেল একটা কাগজে সাজানোর পদ্ধতি লিখে দেখালেন।

 

হতাশ হয়ে বললুম, –তাহলে নিছক ম্যাজিক! ধুস! আমি ভেবেছিলুম গুপ্তধনের সংকেত।…

 

.

 

দুপুরে খাওয়ার পর দেখি, ঘুঘুমশাই একটা জরাজীর্ণ বই পড়ছেন খুব মন দিয়ে। কুলকারিকা : লৌহগড় রাজবংশের ইতিহাস। শ্রীমন্মহারাজ অসিতেন্দ্র নারায়ণ দেবশর্মা প্রণীত।

 

কর্নেল সন্ধ্যা পর্যন্ত বইটা নিয়েই কাটালেন। বিকেলে আমি এবং ডাঃ ঢোল পশ্চিমের ঝিলে হাঁস দেখতে গিয়েছিলুম। রাজবাড়ির গেটে ঢুকে চোখে পড়ল, জয়গোপালবাবু রাঘবকে শাসাচ্ছেন, কুকুর দিয়ে খাওয়াব তোকে। জনাইকে দেখেও শিক্ষা হয়নি?

 

ঘরে ফেরার পর রাঘব যখন চা দিতে এল, তার মুখ ভার। কর্নেল তখনও বইটা পড়ছেন। হলঘরের ঘড়িতে সাতটা বাজলে বই বন্ধ করে বললেন, –আজ তেসরা নভেম্বর। আজ রাত দুটোয় প্রফেসর তানাচার আত্মার আবির্ভাব। মল্লযুদ্ধের সম্ভাবনা। নায়েব ব্রজনাথের হারানো কবচ উদ্ধার। কটা আইটেম হল, জয়ন্ত? –আরেকটা আছে। সেটা বলব না। তৈরি থাকো, ডার্লিং! অবশ্য তোমার তো নেমন্তন্নই আছে…।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *