দুই
পুব-আফ্রিকার সেরেঙ্গেটিতে ভুষুণ্ডা গুলিতে আহত হওয়ার পর আরও যা-যা ধকল গেছিল ঋজুদার উপর দিয়ে তা সামলে ওঠা আর কারো পক্ষে সম্ভব হতো কী না জানি না। কিন্তু ঋজুদা সামলে উঠেছে। মাসাইদের সর্দার, মানে নাইরোবি সর্দারের কাছে আমাদের যা ঋণ জমা হয়েছে সে এ-জন্মে হয়ত শোধা যাবে না। কিন্তু সেসব কথা এখানে নয়। টেডিকে খুন করার আর ঋজুদার উপর গুলি চালাবার শাস্তি ভুষুণ্ডাকে পেতেই হবে। আজ আর কাল! তবে, কবে ঋজুদা আবার যাবে আফ্রিকাতে জানি না। এবং গেলেও আদৌ নেবে কি-না আমাকে, তাও নয়। সে কারণেই, এখন থেকে বিশেষ পরিমাণে তৈলদান করে রাখছি ঋজুদাকে; চান্স পেলেই।
বিশপ লেফ্রয় রোডের ফ্ল্যাটে যখন গিয়ে পৌঁছলাম, তখন প্রায় সাতটা বাজে। বেল দিতেই গদাধরদা এসে দরজা খুলেই ফিসফিস করে বলল, তোমার পেরার্থনা মঞ্জুর। বাবু বইললেন, রুদ্র বইলেচে, তা আবার আমাকে জিইগ্যেস কইরবার প্রেয়োজনটা কি ছেল?
বললাম, তবে! দেখেছো ত! তুমিই কেবল পাত্তা দাও না আমাকে।
ঘরে ঢুকতেই দেখি ঋজুদা লেখাপড়ার টেবল ছেড়ে সোফায় বসে, সামনে একটা কুশান্-চাপানো মোড়ায় দুপা তুলে দিয়ে খুব মনোযোগ সহকারে অটোমোবিল এ্যাসোসিয়েশানের মোটরিং গাইডের পাতা ওল্টাচ্ছে।
আমি ঘরে ঢুকবার পরও মুখ তুলল না। উটোদিকের সোফায় বসলাম যথাসম্ভব কম শব্দ করে। আরও মিনিট পাঁচেক কেটে গেল।
হঠাৎ মুখ তুলে বলল, লুলিটাওয়া আর গীমারিয়ার মাঝামাঝি! বুঝলি?
বোকার মত ঋজুদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ঋজুদা বলল, আমি কিছুই বলছি না। তুই এখন কি বলিস তার উপরই ত যাওয়া-না-যাওয়া নির্ভর করবে।
সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম। বললাম, কোথায়?
ঋজুদা হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিল, বোধহয় আমার উত্তেজনা বাড়াবার জন্যেই।
বলল, তুই যে খবরটা নিয়ে এসেছিস, সেটা বল আগে। তারপর যাওয়ার কথা হবেখন।
অবাক হয়ে বললাম, তুমি জানলে কি করে যে; খবর নিয়ে এসেছি?
এতটুকুই না জানলাম এতদিনে, তাহলে আর……।
বললাম, আজকে চিঠি এসেছে। আমি ন্যাশনাল স্কলারশিপ পেয়েছি। তবে যাদের বাবার রোজগার মাসে পাঁচশ টাকার বেশী তাদের স্কলারশিপ দেবে না। একশ টাকা প্রাইজ দেবে। আর সার্টিফিকেট।
ঋজুদা বলল, ঐ চিঠিটাই বাঁধিয়ে রেখে দে। টাকা আর সার্টিফিকেট পেতে পেতে তোর পড়াশুনার জীবন শেষ হয়ে যাবে। হয়ত কোনোদিনও না-ও পেতে পারিস। আর এই নে। এক্ষুনি তোকে এই একশ টাকা আমিই দিলাম বোৰ্ড অফ সেকেন্ডারী এডুকেশনের হয়ে।
বললাম, না না, এ কি! মা-বাবা খুব রাগ করবে।
ঋজুদা বলল, তোর পাকামি করতে হবে না। সে আমি বুঝব। তোর পছন্দমত বই কিনিস।
তারপরই বলল, তোকে বলাই হয়নি, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার নতুন এডিশান আসছে আমার লাইব্রেরীতে। একবারে পারলাম না। ইনস্টলমেন্টেই কিনলাম।
আমি বললাম, দারুণ। আমার আর ভাবনা নেই। তবে, বারবার দৌড়ে আসতে হবে তোমার কাছে, এই যা।
ঋজুদা বলল, যাই-ই বল রুদ্র, আমি খুব খুশী হয়েছি। এত কম পড়াশুনা করে, আমার সঙ্গে বনে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে তোর ত’ বকে যাওয়ারই কথা ছিল, তুই যখন সাতশ সাতষট্টি পেলি স্কুল ফাইন্যালে, ভেবেছিলাম টুকে-ফুকে পেয়েছিস। এখনও ব্যাপারটা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমাদের সময়ে……
বললাম, বিশ্বাস করতে হবেও না। তোমাদের সময়ের ব্যাপারই আলাদা। তোমাদের সময় কেউ টোকাটুকি জানত না, প্রত্যেকেই পরীক্ষায় ফারস্ট হতো।
প্রত্যেকেই কি করে ফারস্ট হয়? ঋজুদা বলল।
তা জানি না কিন্তু আমার বন্ধুরা বলে, ওদের প্রত্যেকের বাবাই নাকি ফারস্ট হতেন, সেকেন্ড যে কারা হতেন তোমাদের সময়ে তা তোমরাই জানো।
ঋজুদা হো হো করে হেসে উঠল। তারপর বলল, এটা ভাল বলেছিস।
কিছুক্ষণ হাসি হাসি মুখে বসে থেকে ঋজুদা বলল–আজ খিচুড়িই খা। কিন্তু পরে একদিন পোলাও-মাংস খাওয়াব। না, তার চেয়ে বিরিয়ানীই ভালো। চল আমার সঙ্গে মুলিমালোয়া, তোকে ফারস্ট ক্লাস বিরিয়ানী খাওয়াব।
সে জায়গাটা কোথায়?
হাজারীবাগ জেলায়।
হাজারীবাঘ? আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।
হাজারীবাঘ নয় রে ন্যাশনাল স্কলার। হাজারীবাগ। বাগ, মানে, বাগিচা।
–সরি, সরি। আমি ভাবতাম হাজারীবাঘ।
সাধে কি মনে হয় আমার যে, টুকে পাশ করেছিস।
–ঋজুদা! ভালো হচ্ছে না কিন্তু।
কলেজ কবে খুলবে? কথা ঘুরিয়ে ঋজুদা বলল।
বাইশে জুন।
–আজ পয়লা। ফারস্ট ক্লাস। পরশুই আমরা বেরোব। বাঁধা-ছাদা করে নে।
আমি বললাম, তোমার পা? এখন একদম ঠিক ত? খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটাহাঁটি করবে?
একদম ঠিক কি আর হবে কখনও? ভুষুণ্ডাকে সর্বক্ষণই মনে করতে হবে। ভুলতে দেবে না ও নিজেকে। তবে যেমন আছে এখন, সামান্য খুঁড়িয়ে-চলা ছাড়া আর কোন অসুবিধাই ত’ নেই।
রাইফেল-বন্দুক। আমি উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
একদম না।
ভুষুণ্ডার গুলিটা দেখছি, তোর গায়েই লাগা উচিত ছিলো। এখন এক বছর নো-রাইফেল-বন্দুক। ভুষুণ্ডা-শিকার না করে আর কোনো শিকারের নাম পর্যন্ত নয়!
–যা বলেছ। অনুতাপের গলায় আমি বললাম।
-জামাকাপড়, টর্চ, হাঁটার জুতো, থার্মোফ্লাসক। এক্কেবারে বেড়াতে যাওয়া–চেঞ্জার মাখমবাবুদের মত। দুজনেই শরীর গোলগাল করে আসব। শুধু খাওয়া-দাওয়া আর ঘুম।
সঙ্গে কে যাবে? গদাধরদা?
কেউ নয়। শুধু আমরা দুজন।
অবিশ্বাসী গলায় বললাম, তুমি শুধুই খাবে, হাঁটবে আর ঘুমোবে? সত্যি সত্যি?
ব্যসস—স-স …। বললামই ত।
–তাহলে আমি যাবো না।
–তোকে যেতেই হবে। আফটার অল, তুই হলি গিয়ে আমার সেভিয়র। আফ্রিকার সেরেঙ্গেটি থেকে আমায় বাঁচিয়ে আনলি তুই–তোকে ফেলে রেখে আমি একা স্বাস্থ্য ভালো করতে যেতে পারি? আমাকে কি এতই অকৃতজ্ঞ ভাবিস!
দুসস বন্দুক রাইফেল ছাড়া গিয়ে লাভ কি? খালি-খালি লাগে।
আরে, চলই না। বর্ষাকালের সাঁওতাল পরগণার যা চমৎকার ওয়েদার! কোথায় লাগে সুইটজারল্যান্ড।
এমন যা-তা বলো না তুমি!
আরে! ঠাট্টা নয়। সত্যি বলছি।
আমরা যাব কিসে?
–কেন? গাড়িতে?
–কে চালাবে? তুমি? ডাক্তার সেন না মানা করেছেন।
–ডাক্তারদের সব কথা কক্ষনো শুনতে আছে? সব কথা শুনেছিস কী মরেছিস। তারপর বলল, না-হয় তুই-ই চালাবি। গাড়ি ছাড়া ঐ অঞ্চলে গিয়ে মজা নেই।
থাকব কোথায়?
-তুই ত’ মহা ঝামেলা করিস! বলছি না, চুপচাপ থাক। যাচ্ছিস আমার সঙ্গে, তোর কিসের মাথাব্যথা?
তারপর হেসে বলল, তোকে কষ্ট দেবো না। রুদ্রবাবু বলে ব্যাপার।
আমি চুপ করে গেলাম।
ঋজুদা বলল, এক কাজ কর ত’। দ্যাখ, ঐ ডানদিকের ড্রয়ারে একটা ক্যাসেট আছে। চণ্ডীবাবুর। বের করে, টেপ-রেকর্ডারে লাগা।
-কে চণ্ডীবাবু?
–আরে চণ্ডীদাস মাল। গুণী লোক। নিধুবাবুর টপ্পা টেপ করা আছে। নিধুবাবুর শিষ্য ছিলেন কালীপদ পাঠক। আর কালীপদ পাঠকের শিষ্য চণ্ডীদাস মাল। তোরা ত’ এসব শুনবি না। শুধু বনি এম, বী-জীস আর দ্যা পোলিস্।
আমি বললাম, আমাদের উদারতা আছে। আমরা তোমাদের মত নই। খারাপ বলি না কিছু। আমাদের কাছে টাকও ভালো; টিকিও ভালো।
গদাধর এসে বলল, টেবল লাইগে দিচি।
খেতে বসেই ঋজুদা বলল, তোর জন্যে আজ সারা রাত ঢক ঢক্ করে জল খেয়েই মারা যাব। কোলকাতা শহরে পয়লা জুন আকাশে মেঘ দেখেই যে কেউ খিচুড়ি খেতে পারে তা আমার জানা ছিলো না। এ রকম বর্ষামঙ্গল ভাবা যায় না। ভ্যাপসা গরমের মধ্যে কাউকে জোর করে খিচুড়ি খাওয়ানোর মত শাস্তিও বোধ হয় আর কিছুই হয় না। ধন্য তুই! আর ধন্য তোর খেচুড়ি!
বললাম বৃষ্টিটা নেমেও যে আবার উঠে পড়ল। এমন করবে তা কি করে জানব? সন্ধের দিকে আকাশের অবস্থা যে রকম ছিল তাতে ত’ মনে হয়েছিল…।
-ঋজুদা হেসে বলল, যাকগে আজকে তোকে মাপ করা গেল। আকাশকেও তোর ন্যাশনাল স্কলারশিপের খাতিরে ভবিষ্যতে কখনও আর এমন শাস্তি দিস না।
