এগার
গাড়িটা ত’ বাঘের বাচ্চার মত চলছে রে রুদ্র? কে বলবে, অত বড় গাড্ডায় পড়েছিল। তবে, মনে হচ্ছে, সাসপেনসানটা গেছে।
তা যাক্। আমি বললাম। আমরাই যে যাইনি এই ঢের! এখানে আসা অবধি থেকে এই আজ চলে যাওয়া পর্যন্ত একটার পর একটা ব্যাপার যা সব ঘটল সবই যেন হেঁয়ালী। তুমিও সেরকম। কে যে কে! আর কে যে কেন কি করছে তার কিছুই যদি বললে এখনও অবধি। মধ্যে দিয়ে প্রাণই যেতে বসেছিল। তার উপর এন্টারোষ্ট্রেপ।
বলেই, বললাম, মার কাঁচিটা? এনোছো ত’ ঋজুদা?
ঋজুদা গাড়িটা থামিয়ে, পাইপটা ধরালো। তারপর বলল, তুই-ই চালা রুদ্র। আমি তোর পাশে বসে তোর ধাঁধার উত্তর দিতে দিতে যাই। ক্ষিদেও পেয়েছে খুব। বাজে কটা?
রাত একটা।
চল্ তোকে গরম জিলিপী, শিঙাড়া খাওয়াব কোথাও, ভোরবেলা।
আমি বললাম, জানো,–প্রথম থেকেই আমি ভাবছি, বিষেণদেওবাবু-ই যত গোলমালের গোড়া। আর শেষে কী না ভানুপ্রতাপ!
–তোর দোষ কি? প্রথমে আমিও তাই-ই ভেবেছিলাম। এবার তুই জিজ্ঞেস কর, তোর যা যা প্রশ্ন আছে।
অ্যালবিনোটা কোথায় গেল? রোজই ত’ ডাকাডাকিও করত। এই সব ঝামেলাতে পড়ে মাঝখান দিয়ে আমার অ্যালবিমো বাঘটাই মারা হল না।
অ্যালবিনো কেন, এই জঙ্গলে কোনো বাঘই নেই এখন। একটা বুড়ো হায়না আছে শুধু।
নেই মানে? এত পায়ের দাগ। ডেকে ডেকে মাথা গরম করে দিল রোজ সন্ধেবেলাতে।
না। বাঘ নেই। যে-বাঘের ডাক শুনেছিস তা চিড়িয়াখানার বাঘের ডাক। টেপকরা।
ভানুপ্রতাপ কিংবা তার কোনো লোক টেপ-রেকর্ডারের বোতাম টিপে জঙ্গলে ওটা নিয়ে হাঁটত রোজ সন্ধেবেলাতে।
তারপর বলল, স্বাভাবিক অবস্থাতে বাঘ হাঁটতে হাঁটতে কখনও ডাকে না। হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ে, মুখ ঘুরিয়ে ডাকে। প্রথমদিন ডাক শুনেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। ডাকটা অমনভাবে জায়গা বদলাচ্ছে শুনে। যাক বাঘের ডাকের টেপ সঙ্গে করেই ত’ নিয়ে এসেছি। কোলকাতা গিয়ে তোকে শোনাব।
–আর পায়ের দাগ?
–সেটা তোর বোঝা উচিত ছিল কাথবার্টসন হার্পারের হালদারবাবুর কাছে যখন পাঠিয়েছিলাম তোকে, তখনই। বেচারী বিষেণদেওবাবু! ঘাড়ের দাদ চুলকোবার জন্যে যা বানিয়েছিলেন তাতে যে তাঁর নিজের ঘাড়টিই চলে যেতো তা উনি কি আর জানতেন? রাজা-রাজড়ার ব্যাপার। কেউ কখনও শুনেছো, না শুনলেও বিশ্বাস করবে যে দাদ চুলকোবার জন্যে বাঘের থাবা স্টাফ করিয়ে, থাবার নীচে ভেলভেট দিয়ে, তাতে হ্যান্ডেল লাগিয়ে এমন জিনিস বানানো যায়?
ভেলভেট দিয়ে মানে?
নদীর বালিতে বাঘের থাবার দাগে ভেলভেটের দাগ পরিষ্কার ফুটে উঠেছিল–তাছাড়া পাতার মধ্যেটা অস্বাভাবিক উঁচু করে দিয়েছিলেন হালদারবাবুর লোকেরা স্টাফ করবার সময়। ওটা বানিয়েছিলেন বিষেণদেওবাবু। কিন্তু চুরি করেছিল ভানুপ্রতাপ অ্যালবিনোর গল্প বানাবার জন্যে।
আচ্ছা ঋজুদা, হালদারবাবুকে তুমি একটা বড় খামে করে কি পাঠিয়েছিলে?
তোর মায়ের বড় কাঁচিটা দিয়ে দেওয়াল থেকে ঝোলানো বাঘের চামড়াটার অন্য থাবাটাও কেটে পাঠিয়েছিলাম ওঁর কাছে, যাতে উনি শ্যুওর হন। অন্য থাবাটি ত’ আগেই কেটে বিষেণদেওবাবু ওঁকে পাঠিয়েছিলেন। স্টাফ করার জন্যে।
আমি বললাম, এবার বুঝেছি। এই জন্যেই তুমি বাঘটাকে কাছ থেকে দেখতে যেতেই ওঁরা দুজনেই হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন।
তা বটে। তবে দুজনের না’ করার পেছনে কারণ কিন্তু আলাদা আলাদা ছিল।
বললাম, হুঁ।
কিন্তু অ্যালবিনোর সঙ্গে বিষেণদেওবাবুর মৃত্যুভয়ের কি সম্পর্ক ছিল? তাছাড়া বিষেণদেওবাবুকে মারতেই যদি চাইবে ভানুপ্রতাপ, তাহলে ও আমাদের এ্যাভয়েডও করতে পারত। আমাদের দিয়েই বাঘ মারবার আয়োজন করল কেন সে?
স্যান্ডি, মানে সুরিন্দার আর শুভার অল্পদিনের ব্যবধানে অস্বাভাবিক মৃত্যুতে অনেকেরই সন্দেহ হচ্ছিল যে, ওদের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। অথচ দেখলি ত’? টুটিলাওয়ার হাজীসাহেব থেকে শুরু করে অনেকেরই ধারণা হয়েছিল যে, বিষেণদেওই খুন করেছেন ওদের। খুনের ব্যাপারে মোটিভটাই আসল। ভানুপ্রতাপই ত’ একমাত্র বংশধর–তার কি দরকার মা বাবাকে খুন করবার। আমিও কনফিউজড হয়েছিলাম এ কারণেই প্রথম থেকে। কারণ, ভানুপ্রতাপকে মারতে বিষেণদেওর যে মোটিভ, বিষেণদেওকে মারতে ভানুপ্রতাপেরও সেইই মোটিভ। একজন মারা গেলেই অন্যজন সমস্ত সাম্রাজ্যের মালিক হত। এই জিনিসটারই পুরো সুযোগ নিয়েছিল ভানুপ্রতাপ। কিন্তু ভানুপ্রতাপ যে পরিমাণ ড্রাগ খাচ্ছিল এবং লানডানে যে সমস্ত বন্ধুবান্ধব জুটিয়েছিল তাতে সম্পত্তির জন্যে তার আর একদিনও অপেক্ষা করবার তর সইছিলো না। অল্প সম্পত্তিতেও তার মন ভরছিল না, সবই চাইছিল সে।
তোদের জেনারেশানের এই-ই দোষ। যা তোরা চাস সব এক্ষুনিই চাস্। তর সয় না তোদের। যা তোদেরই, তা পেতেও একটুও দেরী সয় না। সম্পত্তি ওর হাতে এলেই ও বিদেশে পাড়ি দিত। ওদের এক্সপোর্টের ব্যবসা। আন্ডার-ইনভয়েসিং, জাল-জয়াচুরি করে বিদেশে ফরেন-এক্সচেঞ্জ ওরা জমাতে পারত। যে টাকার জন্যে নিজের মা-বাবাকে দু মাসের মধ্যে খুন করতে পারে; তার পক্ষে অসাধ্য কিছুই ছিলো না। লানডানের বেইজ-ওয়াটার স্ট্রীটে বেড-সীটার মহল্লাতে ছাত্র-ছাত্রীদেরই ভীড়। নানারকম কাণ্ডই হয় সেখানে। আমার নিজের চোখে দেখা। টাকা, অনেক টাকা, অনেক টাকার দরকার ছিলো ভানুপ্রতাপের। তুই তখন কোলকাতা গেছিলি, তখন ওর সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম, ও লানডানের প্লে-বয় ক্লাবের মেম্বার হয়েছিল। ঐ ক্লাবে আবু-দাবী আর দুবাইয়ের শেখরা আর সারা পৃথিবীর প্লে-বয়রা এক রাতে লক্ষ লক্ষ টাকার জুয়া খেলে। সব গুণই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল ও ইংল্যান্ড থেকে আসার সময়। হয়ত অনেক ধারও হয়েছিল সেখানে। জুয়া যাকে একবার পেয়েছে, তাকে ছাড়ে না সহজে। আসলে কি যে হয়েছিল, তা পুলিশের জেরায় আর ইনভেস্টিগেশানেই বেরোবে। এমনি এমনি ও আসেনি। মাবাবা-মামাকে মেরে সর্বেসর্বা হয়ে ফিরে যাবার জন্যেই এসেছিল। ওখানে ফিরে গিয়ে ও ফুর্তি করত–মাঝে মাঝে ফিরে আসত বন্ধু বান্ধবী নিয়ে। কিছুদিন খনির কাজ দেখে, টাকার সংস্থান করে আবার ফিরে যেত। এই হয়ত ছিল ওর ধান্দা!
বললাম, ঋজুদা, ভানুপ্রতাপ কি ওষুধ খেতেন? ওগুলো কি ঘুমের ওষুধ?
ঠিক ঘুমের নয়। শুনেছি, নানারকম ট্যাবলেটস আছে, নেম্বুটালস; এ্যামিকটামাইনস বারবিচুরেট। তাছাড়া, আরও নানারকম নেশা করে, যেমন হেরোইন, মেসকালিন; মাড়িজুয়ালা। জানি না, ও হয়ত মারিজুয়ালাই খেত–আমাদের দেশের গাঁজার মত ব্যাপার। ওর মধ্যে ডেলটা-নাইন-টেট্রাক্যানাবিনল বা সংক্ষেপে, টি-এইচ-সি বলে একরকমের রাসায়নিক উপাদান থাকে। এ সব বেশী খেলে, মানুষের মানসিক বিকৃতিও ঘটে। ভানুপ্রতাপ যে মানসিক বিকারগ্রস্ত নয়; এমন কথাও জোর করে বলতে পারি না আমি। ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখলে, জানতে পারবেন।
আমি বললাম, কিন্তু অ্যালবিনোর নাম করে ছুলোয়া শিকার করিয়ে ওর কি লাভ হত?
লাভ হত এই যে, বীটাররা যখন বীটিং করত, হৈ-হল্লা শোরগোল, তার মাঝে টেপ-রেকর্ডারে বাঘের ডাক ডাকিয়ে ও বিষেণদেওবাবুকে অন্যমনস্ক করে দিত–দিয়ে, নিজেই হেঁটে গিয়ে বিষেণদেওবাবুকে মাচা থেকে নামতে বলত, মাচাটাও ভেঙে পড়তে পারত যে-কোনো সময়ে অন্তত একটা মাচা যেভাবে বাঁধিয়েছিল ও, তাতে কেউ বসলে যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ত তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। তারপর হয়ত ওর বেহেড়ীয়া চর হায়নাটাকে লেলিয়ে দিত পিছন থেকে হায়নাটা ঘাড় কামড়ে ওঁকে শেষ করত। হায়নাটা উনি মাটিতে নামলে আগেও ওঁকে কামড়াতে পারত। এবং যেখানে হায়না কামড়াত সেখানে ও গুলিও করতে পারত দূর থেকে। এমনিতেও গুলি করতে পারত। বাঘের ডাক, গুলির শব্দ ও জংলী জানোয়ারের কামড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখে কারোই সন্দেহ থাকত না যে বিষেণদেওবাবুকে বাঘেই মেরেছে। নদীতে এত পায়ের দাগ বাঘের!
একটু চুপ করে থেকে ঋজুদা বলল, আসলে ঠিক কি যে করত, তা ওইই কেবল জানত, আর হয়ত জানত ব্রিজনন্দন। অ্যালবিনোর গল্পটা চালু করত না ভানুপ্রতাপ তার সঙ্গে বিষেণদেওবাবুকে মারার কোনো সম্পর্ক না থাকলে।
তাই যদি হবে, তা উনি আমাদের ডাকতে যাবেন কেন? আমাদের ডেকে কি লাভ হল?
–আমাকে অনেকেই চেনে-জানে। আসলে, আমাকেই সাক্ষী মানতে চেয়েছিল ও। বিষেণদেওবাবুর কাছে, আমি মুলিমালোয়াঁতে আসছি শুনেই অ্যালবিনোর গল্প চালু করেছিল। শিকারী আসোয়া আর তার ছেলে রত্নাকে অনেক টাকা ঘুষ দিয়ে মিথ্যে কথা বলিয়েছিল বিষেণদেওবাবুর কাছে, ওরা বাঘ দেখেছে বলে। তবে, আসোয়ারা হয়ত আসলে ভানুপ্রতাপ কোন্ উদ্দেশ্যে এই মিথ্যা বলাচ্ছে না জানতোই না। পুলিশ ওদের জেরা করলেই তখন সত্যি কথা বেরুবে। আমি আর তুইই যে ভানুর কাল হবো, তা বেচারা একটুও বুঝতে পারেনি। যে-মুহূর্তে ও তা বুঝতে পেরেছিল; সেই মুহূর্তে আমাদেরও শেষ করে দিতে একটুও পিছপা হয়নি। তবে ওর বোঝাবুঝির আগেই অ্যালবিনোর চালটা ও চেলে দিয়েছিল। ওর রক্তে জুয়া ঢুকে গেছিল। চাল দেবার পর পাকা জুয়াড়ির মতই ভেবেছিল খেলাটা ওইই জিতবে।
জানালা দিয়ে পাইপের ছাই ঝেড়ে ঋজুদা বলল, তোকে বলিনি, যখন তুই ছিলি না–মানে যেদিন তুই কোলকাতা চলে গেলি, সেদিনই খুব বৃষ্টি হয় বিকেলে। খুব ঠাণ্ডা পড়ে যায়, সোয়েটার গায়ে দেওয়ার মত। পাঙ্খাপুলারদের পাখা টানতে মানা করে দিই আমি। ঘুমিয়ে আছি, গায়ে চাদর দিয়ে, হঠাৎ কী রকম অস্বস্তি বোধ হল। চোখ মেলে দেখি, ঘরে চাঁদের আলো এসে পড়েছে আর ঠিক আমার মাথার উপরে-যে-ফুটো দিয়ে টানা-পাখার দড়ি ঘরে ঢুকেছে সেই ফুটো দিয়েই একটা সরু সাপ ঢুকে, পাখার দড়ি বেয়ে নেমে আসছে। একেবারে আমার বুকে লাফিয়ে পড়বে, ঠিক সেই সময়ই সেন্স কাজ করায় ঘুম ভেঙে গেছিল আমার। তড়াক করে বিছানা থেকে নেমেই দরজার খিল খুলে নিয়ে তাকে বিছানাতেই পিটিয়ে মারি। সবুজ, পরিধিতে এক-আঙুল মত একটা সাংঘাতিক সাপ। একবার কামড়ালে, আর দেখতে হত না। রাতে কি ঘটেছিল, তা পরদিন আমার মুখ দেখে কেউই বুঝতে পারেনি। কিন্তু সেখানেই আমার একটু ভুল হয়ে গেছিল চালে। ব্যাপারটা যে কি ঘটেছিল, তা সাপটা ফিরে না-যেতেই ভানুপ্রতাপ বুঝেছিল। কিন্তু আমি ওকথা প্রকাশ না করাতেই ওর সন্দেহ ঘনীভূত হয়। আমার মতলব অন্য কিছু না থাকলে, সেই রাতেই চেঁচামেচি করে আমি বাড়ি মাথায় তুলতাম–নয়ত পরদিন সকালেই বলতাম সাপের কথাটা অন্তত সকলকে। তাই-ই করা উচিত ছিল–তাহলে ফাইন্যাল-অপারেশনটা অনেক কম ডেঞ্জারাস হতে পারত।
আমি বললাম, ভানুপ্রতাপের বাবা কি করে মারা যান? মানে, তোমার ধারণা কি?
দ্যাখ, স্যান্ডিকে আমি চিনতাম। ওঁর মত ভালো পোলো প্লেয়ার দেশে বেশী ছিলো না। ওর মত ওস্তাদ ঘোড়সওয়ার ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যেতে পারে বলে আমার এখনও বিশ্বাস হয় না। স্যান্ডির মাথায় ভারী কোনো জিনিস, হাতুড়ি-টাতুড়ি দিয়ে হয় ভানুপ্রতাপ নিজে, নয় ব্রিজনন্দন অথবা ওর কোনো শাগরেদ বাড়ি মেরেছিল। তারপর এমন করে শুইয়ে দিয়েছিল পাথরের উপর সেই পাথরে ওরই রক্ত লাগিয়ে যে, কারোই সন্দেহের কারণ ছিলো না।
আর শুভাবাঈ? আমি বললাম। নিজের মাকে? ঈসস……
শুভাবাঈ-এর জ্বর হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু ঠিক সেদিনই তার এখানকার পুরনো আয়া ওর জ্বর হওয়া সত্ত্বেও বাড়ি ফিরে যায়। সে আর কখনও ফিরে আসেনি। এই ব্যাপারটাও রহস্যময়। শুনেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। সে ভানুপ্রতাপের কাছ থেকে অনেক টাকা পেয়ে পালিয়ে গেছিল, না ভানুপ্রতাপই তাকেও সরিয়ে দিয়েছিল পৃথিবী থেকেই, তাও বলতে পারব না–কিন্তু যেদিন শুভাবাঈ মারা যায় সেদিন সে একাই শুয়েছিল তার ঘরে। আমার ঘরেরই মত কোনো না কোনো সাংঘাতিক বিষধর সাপ টানা-পাখার দড়ি-ঢোকার ফুটো দিয়ে এসে তাকে কামড়ে চলে যায় বলেই আমার বিশ্বাস। এপ্রিলের প্রথমে মারা যায় শুভাবাঈ। তখনও এখানে খুব প্লেজেন্ট ওয়েদার। টানা-পাখা চলে না তখন।
আমি বললাম, অস্বাভাবিক মৃত্যু; কোনো পোস্টমর্টেম হলো না? আশ্চর্য?
ঋজুদা একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর গলায় বলল, সন্দেহের কোনো কারণ না থাকলে এখনও খুব বড়লোক, আর রাজা-রাজড়ার বাড়িতে সহজে পোস্টমর্টেম হয় না। যাঁদের পয়সা আছে, তাঁদের সকলেই খাতির করেন। আইন ত’ তামাশা! আইনের প্যাঁচে পড়লেও একমাত্র বড়লোকরাই পয়সা খরচ করে সে তামাশা দেখতে পারে। গরীবরা সে তামাশার খরচ জোগাতে পারে না। দুটি মৃত্যুই স্বাভাবিক ভেবেছিল সকলেই প্রথমেই। কিন্তু গত ক’মাসে যে বেহেড়ীয়াদের এনে নাচঘরকে একেবারে স্নেকহাউস করে তুলেছিল ভানুপ্রতাপ, সে আর কে জানত?
একটু চুপ করে থেকে, ঋজুদা বলল, আমাদের মত রেসপেকটেবল সাক্ষীর উপস্থিতিতে যদি বাঘের বীটিং-এ বাঘের হাতেই বিষেণদেওবাবু মারা যেতেন–তাহলেও পোস্টমর্টেম ভানুপ্রতাপ করতে দিতো না এবং আমাদেরই সাক্ষী মানত। আর এইখানেই ভানুপ্রতাপ মারাত্মক ভুল করেছিল। আমাদের কাছে ওর এই অ্যালবিনোর চালটা না চাললে, বিষেণদেওবাবুকে ও নির্বিঘ্নেই মারতে পারত অন্যভাবে, আমরা চলে যাবার পর।
আমি বললাম, তাহলে ভূত-পেত্নীর বাপারটা? নাচঘরের?
সেটা ত’ খুবই সোজা! এটা তুই জিজ্ঞেস করবি আমাকে তা ভাবিনি। যাতে কেউ নাচঘরের দিকে ভুলেও না যায় দিনের বেলাতেও, তাইই টেপ-রেকর্ডারে বাঈজীর গান বাজিয়ে আর নিজে ঐ সাদা ঘোড়াটাতে রাতে চেপে বেরিয়ে পুরো জায়গাটাকে একটা ভৌতিক আবরণে মুড়ে দিতে চেয়েছিল ভানুপ্রতাপ। নইলে, পেত্নী কখনও সারেঙ্গী তবলচি নিয়ে গান গায়? এবং শুধু গানই নয়, একেবারে আলাপ, বিস্তার তান দিয়ে? এ এক অভাবনীয় ব্যাপার। তাছাড়া, তুই যাওয়ার রাতে এবং পরদিন রাতেও এ গানই শুনেছিলাম। ঐখানেও একটা নীরেট বোকামি করেছিল ভানুপ্রতাপ। কোনো নামকরা গাইয়ের একটিমাত্র গানই টেপ করেছিল। ভানুপ্রতাপ নিজে নিশ্চয়ই গানবাজনা ভালবাসে না– বাসলে, অমন করতো না, অন্তত কিছু ভাল গান শোনাতে পারত আমাদের। আর গান ভালোবাসত না বলেই ত’ ও খুনী।
একটু চুপ করে থেকে আবার ঋজুদা বলল, ভূতেরা নিজেরা যে অন্য ভূতদের ভয় পায়; এ কথাটা ভানুপ্রতাপের আমাদের সম্বন্ধে ভাবা এবং জানা উচিত ছিল। সকলেই দেঁহাত-জঙ্গলের কুসংস্কারাবদ্ধ মানুষ নয়। বিষেণদেওবাবুর কথা আলাদা। চিরদিনই এইরকম জায়গায় থেকেছেন, ধার্মিক, সরল প্রকৃতির লোক। ভূত-পেত্নীর ব্যাপারে ভয় পেয়ে বারবার নানারকম পুজো চড়াতেন উনি। নানা জায়গায়। এখানেও বনদেওতার আর বজরঙ্গবলীর মন্দিরে। তাতেও, তাঁর বোন-ভগ্নিপতীর আত্মা শান্ত হচ্ছে না দেখে খুবই মনমরা হয়ে থাকতেন বেচারী সবসময়। এ কথাটাও সত্যি যে, বিষেণদেওবাবুর বাবা খুব অত্যাচারী, দুশ্চরিত্র লোক ছিলেন। সত্যি সত্যিই গয়ার এক বাঈজীকে তিনি ঐ নাচঘরে খুনও করেছিলেন। একথা আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট সোর্স থেকে ভেরিফাই করে নিয়েছিলাম। বিষেণদেও সেকথা জানতেন বলেই ভাবতেন, সেই বাঈজী হয়ত সত্যিই পেত্নী হয়ে এসেছে, আর অপঘাতে মারা যাওয়ায় সুরিন্দারও ভূত হয়ে গেছে। বিষেণদেওবাবু হলেন এরকম চরিত্রের লোক। আর তায় ভাগ্নে পেল তার দাদুর চরিত্র। একেবারে নর্থ পোল্ সাউথ পোল-এর ব্যাপার। সুরিন্দারও ফারস্ট-রেট জেন্টেলম্যান ছিল। বুঝলি না, একেই বলে জিন্। কার মধ্যে যে পুর্বপুরুষদের কার জিন্ প্রভাব ফেলে, এবং কেন ফেলে, এই রহস্যের সমাধান করতে এখনও বিজ্ঞানীরা হিমশিম্ হচ্ছেন।
আমি বললাম, আচ্ছা ঋজুদা, বাঘের থাবার কাছে যে জুতোর দাগ দেখেছিলে–সেই ডাকব্যাক কোম্পানীর জুতো? সেটা কার?
শুনলি না? বিষেণদেওবাবু বললেন, ওঁদের দুজনের জুতোর মাপই এক। যেদিন আমি চটি নেওয়ার অছিলাতে বিষেণদেওবাবুর ঘরে যাই, সেদিন ঐ জুতোজোড়াকে বিষেণদেওবাবুর ঘরে দেখে আমি অবাক হই। কিন্তু জুতোর তলায় যে বালি লেগেছিলো তা চেঁচে নিয়ে আমি কাগজে মুড়ে নিই–পরে মেলাবো বলে। নদীর বালির সঙ্গে তা মেলে। জুতোটা কিন্তু গাম-বুট নয়–অন্যরকম জুতো–একমাত্র ডালব্যাকই বানায় তা। ভানুপ্রতাপ এমনই ধূর্ত যে, পরতো মামারই জুতো, বাঘের পায়ের-ছাপ নদীর বালিতে লাগাবার সময় কিন্তু জুতো-জোড়া খুলে রেখে আসত আবার মামারই ঘরে। আমরা থাকতে থাকতে এবং ঐ দাগ দেখার সময় বিষেণদেওবাবু বাড়ির বাইরেই যাননি এবং গেলেও গাড়িতেই গেছেন, সঙ্গে অন্যান্য পাঁচমিশেলী লোক নিয়ে। ঐদিকেও যাননি, তা আমি চেক্ করেছি। আই এ্যাম এ্যাবসোলুটলী শ্যুওর।
ঋজুদা বলল, সামনে আলো জ্বলছে, দ্যা ত’, এককাপ চা পাওয়া যায় কি-না, কোথাও!
তাই-ই ত’। হাজারীবাগ শহরের বাজারের অনেক দোকানেই আলো জ্বলছে। ব্যাপারটা কি? আমি বললাম।
ও হো। কাল ত’ মুসলমানদের পরব আছে রে একটা। বাঃ আমাদের বরাতই ভাল। দাঁড়া দাঁড়া।
গরম রুটি আর চাঁব দিয়ে আমরা চা খেলাম। চায়ের লিকারটা বড্ড স্ট্রং আর বড় বেশী চিনি; এই-ই যা। তাও পাওয়া যে গেল রাত তিনটেতে এই-ই ঢের!
হাজারীবাগ শহর ছাড়িয়ে আমরা বগোদরের রাস্তা ধরলাম।
আমি বললাম, আচ্ছা ঋজুদা, ব্রিজনন্দনকেও মারল কেন ভানুপ্রতাপ?
আসলে, ব্রিজনন্দন লোকটাও খুব ধূর্ত এবং লোভী ছিল। তা না হলে বিষেণদেওবাবুর সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করত না। এবং ভানুপ্রতাপের সমস্ত ক্রিয়াকাণ্ডর সাক্ষীও ছিল ও প্রথম থেকেই। প্রত্যেক খুনের আগে ভানু ব্রিজনন্দনকে আনিয়ে নিত উজজাননগর থেকে। আনাবার আরও একটা কারণ ছিল। যদি সন্দেহ কারো হয়ই তা যেন ব্রিজনন্দনেরই উপর হয়। ভানুপ্রতাপ বুঝতে পেরেছিল, কোলকাতা থেকে তুই ফিরলেই কিছু একটা করব আমরা। খুনীরা খুব বুদ্ধিমান হয়। তাছাড়া ভানু ত’ বিলেতে পড়াশুনা-করা বাপ-মায়ের সু-পুত্তুর!
ঋজুদা তারপর বলল, পিসকি নদীর ওদিক থেকে আমরা গাড়ি নিয়ে ওল্ড-রাতরা রোড হয়ে মালোয়াঁ-মহলকে বাইপাস না-করে গেলে, হয়ত ব্রিজনন্দন বেঁচে যেত। কারণ, আমাদের যাওয়ার পথেই ত’, পড়ত। নিজে লুকিয়ে না-পড়লে আমরা ওকে তুলেও নিতাম হয়ত গাড়িতে, যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে। মৃত্যু ছিল ওর কপালে! কি আর কথা যাবে?
অমি বললাম, তাই-ই যদি হয়, তাহলে ঐ সাপ আর হায়নার জিম্মাদার বেহেড়ীয়াদেরও ত’ উনি মারতে চাইতেন।
বেহেড়ীয়াদের মেরে দেওয়া বা অনেক টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া ভানুর পক্ষে কঠিন ছিলো না কিন্তু ব্রিজনন্দন ছিল অসম্ভব লোভী। ওর চোখেই সেই লোভ চকচক করত। ও হয়ত শেষে ভানুপ্রতাপকেই সরিয়ে দিতে চাইত কিংবা পঙ্গু করে দিয়ে সবকিছু নিজে দখল করে নিতো এমন একটা সন্দেহও ভানুর মনে হয়েছিলো। অথবা ওর কৃতকর্মের একজনও সাক্ষী ভানুপ্রতাপ রাখতে চায়নি হয়ত। প্রথম দিন সাপটা যখন আমাদের আক্রমণ করল নাচঘরের রাস্তায় এবং কামড়াতে না-পেরে ফিরে গেল, তখন থেকেই ভানুর মনে নানারকম ভয় দানা বাঁধতে শুরু করে। তাই ব্রিজনন্দনের সব কাজ শেষ হওয়াতে এবং আমরা আজ রাতেই একটা হেস্তনেস্ত করব তাও হয়ত বুঝতে পারাতে ও তাকেও সরিয়ে দিল পৃথিবী থেকে। আমরা যখন আজ রাতে নাচঘরে ঢুকলাম, তার একটু আগেই ব্রিজনন্দনকে কামড়ে আসার পর সাপটাকে খাঁচায় পুরে দিয়েছিল বেহেড়ীয়ারা।
অতগুলো সাপ দিয়ে ওরা কি করত ঋজুদা!
উল্টোদিক থেকে আসা একটা ট্রাককে পাস দিয়ে, আমি শুধোলাম।
বাঃ। ওফিফাগাস্ সাপ ত’ সাপ খেয়েই বাঁচে। ওর খাওয়ার কাজও হতো–আর বেহেড়ীয়াদের ট্রেনিং-এ ঐসব সাপের মধ্যে কিছু সাপ দিয়ে মৃত্যুদূতের কাজও হতো–যেমন শুভাবাঈকে মারা; আমার ঘরে আমাকে মারতে পাঠানো।
আমি বললাম, আচ্ছা, বিষেণদেওবাবুর ঘর থেকে যে সুড়ঙ্গ চলে গেছে নাচঘরে তা তুমি জানতে পেলে কি করে?
ঋজুদা একটুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল দ্যাখ, একেই বলে ভাগ্য। আর ভানুপ্রতাপের নিয়তি। এটা একটা কো-ইনসিডেন্ট। অনেকদিন আগের কথা, আমি যাচ্ছি কানাডাতে আর স্যান্ডি যাচ্ছে ইউরোপে। বোম্বেতে দুজনেই কাস্টমস্ ক্লীয়ার করে যার যার প্লেনের জন্যে ওয়েট করছি। ও যাবে লুৎফহানসাতে, আমি যাব এয়ার-ইন্ডিয়ায়। হঠাৎ দেখা হওয়াতে অনেক গল্প হল। স্কুলের বন্ধু। বৌ-ছেলেমেয়ের কথা উঠল। ও বলল, আমার আর শুভার একটিই মাত্র সন্তান। বলতে পারি, প্রিন্স-অফ-ওয়েলস। তবে, ব্যাটা যে কি হবে ভগবানই জানেন। থাকে ত’ আমার শ্বশুর মশায়, মানে শুভার বাবার কাছে–আদর দিয়ে দিয়ে একেবারে মাথায় চড়াচ্ছেন। জানিসই ত, আমাদের ফ্যামিলীতে আমিই একমাত্র ছেলে, কাজিন পর্যন্ত নেই কোনো। তাই আমার ছেলেই, আমাদের ফ্যামিলীর একমাত্র বংশধর। তার উপর আমার শ্বশুর মশায়ের ব্যাপারই আলাদা–বেডরুমের থেকে সুড়ঙ্গ চলে গেছে নাচঘরে–সেখানে নাচ-গান হয় রাতের বেলা, বুঝলি। বলেই, আমার দিকে চেয়ে দুষ্টুমীর হাসি হেসেছিল। তাই, এখানে এসে, ঘটনার পর ঘটনা ঘটতে থাকায় একদিন বিষেণদেওবাবুকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম : আপনার বাবা কোন্ ঘরে শুতেন? উনিই বলেছিলেন যে, ওঁর বাবার ঘরেই এখন উনি শোন।
আমি বললাম, আচ্ছা ঋজুদা, বিষেণদেওবাবুকেও ত’ ভানুপ্রতাপ সাপ দিয়েই মারতে পারত।
তা পারত। কিন্তু ভানুপ্রতাপের সাপের খেলা পুরনো হয়ে যাওয়ায়, বিষেণদেওবাবুকে অন্য কায়দায় মারতে চেয়েছিল ও। এবং প্রায় সাকসেসফুল হয়েও ছিল।
আসলে, শুভা আর সুরিন্দার দুজনেরই এমন হঠাৎ মৃত্যুর কথা বিষেণদেওবাবুর কাছে শুনে আমার মনে কেমন একটা সন্দেহ হয়েছিল। সন্দেহটা অবশ্য হয়েছিল বিষেণদেওবাবুরই উপর। এখানে আসতে রাজী হওয়ার আসল কারণও ছিলো এটা।
ঋজুদা বলল, আমার মনটা খুবই খারাপ লাগছে। শুভা আমার প্রিয় বান্ধবী ছিল। বড় ভালো মেয়ে আর স্যান্ডি ত’ ছিল স্কুলেরই বন্ধু–ওর কথাই আলাদা। এমন ভদ্র, সভ্য, মার্জিত মানুষ খুব কম হয়। তাদেরই একমাত্র ছেলেকে আমি……।
তারপর বলল, অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলে বলতে হয়, আমার বড় প্রিয় কাছের লোকদের যে খুন করেছে, তাকে এক্সপোজ করে দিয়ে নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে বড় করলাম।
আমি বললাম, যাই-ই বলল, অ্যালবিনোটা সত্যি হলে, আমি কিন্তু খুবই খুশী হতাম। সব বেঁচে গেল!
ঋজুদা একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর গলায় বলল, রুদ্র, শুধু বাঘই কি অ্যালবিনো হয়? আমরা? মানুষরা? এই ভানুপ্রতাপ? বা বিষেণদেওবাবু? বাইরের রঙ আমাদের যা, তাই-ই কি আমাদের আসল রঙ? মনে মনে আমরা অনেকেই অ্যালবিনো। হয়ত সকলেই। বাইরের চামড়ার পিগমেন্টেশানের ত্রুটিটাই আমাদের চোখে পড়ে; আর মনের আসল রঙ চিরদিন চামড়ার আড়ালেই থাকে।
ভোর হওয়ার আগে আগে, অন্ধকার বনে ভোরকে পথ-দেখিয়ে জঙ্গলের মধ্যে যে একটা হাওয়া চলে, জঙ্গলের হবজাই গন্ধ বয়ে নিয়ে, ভোরের পাখিদের ঘুম-ভাঙিয়ে; রাতের পাখিদের ঘুম-পাড়িয়ে সেই হাওয়াটা চলতে শুরু করেছে। বনে বনে মচমচানি, ঝরঝরানি আওয়াজ তুলে সে তার চলাচল জানান দিচ্ছে, যারা জানতে চায়, তাদের।
খোলা জানলা দিয়ে হু হু করে হাওয়া আসছে। দূরে টাটীঝারীয়ার ডাকবাংলোটার দেওয়াল দেখা যাচ্ছে, গাড়িটা চলেছে। টপ গীয়ার ফেলে জানলায় কনুই আর স্টীয়ারিং-এ হাত রেখে বসে আছি, চোখ, হেডলাইট-পড়া আঁকা-বাঁকা উঁচু-নীচু জঙ্গলের পথে।
ঋজুদা এখন একদম চুপ করে গেছে। পাইপের ধুঁয়োয় আর গন্ধে গাড়ি ভরে উঠেছে। মালোয়াঁ-মহলের দুঃস্বপ্ন আর অ্যালবিনোর স্বপ্ন পিছনের লুলিটাওয়া আর গীমারীয়ার মধ্যের জঙ্গলের গভীরে ফেলে রেখে দ্রুত দূরে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।
এই মুহূর্তে পিসকি নদীর সাদা বুকে অথবা তার দু’পাশের আলো-ছায়া-ভরা জঙ্গলের মধ্যে হাতে খোলা রিভলবার আর রাইফেল নিয়ে একটি অ্যালবিনো বাঘকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন পুলিশের লোকেরা।
যদি ভানুপ্রতাপ পুলিশদের বাঘের ডাক-শুনিয়ে ভয় পাওয়াবার জন্যে টেপ-রেকর্ডার বাজান, তবে সঙ্গে সঙ্গেই ধরা পড়ে যাবেন পুলিশদের হাতে। কারণ, এ টেপ-রেকর্ডারে বাঘ আর কোনদিনও ডাকবে না! চাবি টিপলেই; জঙ্গল সরগরম করে বাঘের ডাকের বদলে, মেয়েলী গলায় বেজে উঠবে :সাধের লাউ বানাইলা মোরে বৈরাগী!
ঐ উত্তেজনা, ক্লান্তি, মন-খারাপের মধ্যেও আমার হাসি পেয়ে গেল সাধের লাউ-এর কথা ভেবে।
কি রে? হাসছিস যে!
বললাম, না। এমনিই!
তুইও মারিহুয়ানা ফারিহুয়ানা খেতে শুরু করেছিস না কি? ভানুপ্রতাপের সঙ্গে মিশে? পাগলের মত এমনি এমনি হাসছিস।
আমার তখন উত্তর দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো না। ভটকাইকে ফিরে গিয়ে এমন দেব। ছারপোকা বিধ্বংসী পাঁচন ওকেই গেলাব এবার। বুঝবে ভটকাই।
