অ্যালবিনো (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

দশ

ডি-এস-পি রহমান সাহেব এবং অন্যান্যদের নিয়ে বিষেণদেওবাবু বসার ঘরে বসেছিলেন মুখ নীচু করে। সঙ্গে ঋজুদাও ছিল। সকলকে নাস্তাপানি দিচ্ছিল খিদমদগার ও বেয়ারারা।

ঘর থেকে অন্য একটা পাইপ এনে ঋজুদা চুপচাপ পাইপ খাচ্ছিল। আর কি যেন ভাবছিল। রহমান সাহেবের ফোর্স তিনজন লোককে এ্যারেস্ট করেছেন। একজন উন্ডেড। ওঁদের একজন কনস্টেবলও উন্ডেড হয়েছে। পায়ে এল-জি লেগেছে। উন্ডেডদের নিয়ে একটি পুলিশ ভ্যান চলে গেছে সদরের পুলিশ হসপিটালে। তবে ভানুপ্রতাপকে পাওয়া যায়নি। ব্রিজনন্দনকেও নয়।

একটু আগেও রহমান সাহেব ঋজুদাকে বলেছেন মিস্টার বোস মাই আই-জি হ্যাজ স্পোকেন ভেরী হাইলী অফ ঊ্য টু আমরা সবই ত’ বুঝতে পাচ্ছি কিন্তু এভিডেন্স ত’ একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। আজকে উজজানপুরের জমিদার সুরিন্দারবাবু আর তাঁর স্ত্রী শুভাবাঈ-এর মৃত্যু যে মার্ডার, তা প্রমাণ করবেন আপনি কি করে? সাক্ষীও পাবেন না। এভিডেন্সও নেই কোন। যদি কোনো ফ্রেশ-মার্ডার হত, তবে না-হয়……।

ঋজুদা পাইপের ধুঁয়ো ছেড়ে বলল, তাহলে বলছেন, আপনাদের সুবিধে হত যদি বিষেণদেওবাবুও মার্ডার হওয়া অবধিই অপেক্ষা করতাম আমরা?

তারপর বলল, ওঁকে বাঁচিয়ে তাহলে আমরা সকলে খুবই অন্যায় করে ফেলেছি বলুন?

রহমান সাহেব একটু বিরক্ত হলেন। এদেশের পুলিশ, তাঁদের মুখের ওপর কেউ কোনো কথা বললে তা বরদাস্ত করতে পারেন না।

রহমান সাহেব বললেন, স্যার। আপনি একটু আনরীজনেবল হচ্ছেন।

–মোটেই নয়।

ঋজুদা বলল। আমি এতেই খুশী। বিষেণদেওবাবুকে বাঁচাতে পেরেছি, এটাই আমার মস্ত লাভ। ভানুপ্রতাপ ধরা পড়ুক আর নাই-ই পড়ুক। এত কিছুর পরও যদি আপনারা বলেন যে, প্রমাণ-সাবুদের অভাব আছে; তাহলে নাই-ই বা ধরলেন তাকে। তবে, না-ধরলে বিষেণদেওবাবুর বাকি জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনাদেরই নিতে হবে। তাতে কি আপনারা রাজী আছেন?

এ ত’ আনপ্র্যাকটিকেল কথা হল। রহমান সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন।

এমন সময় ঋজুদা বলল, রুদ্র! তুই এঁদের জীপেই চলে গিয়ে আমার ট্রান্সমিটারটা আর নদীর বেড থেকে টেপ-রেকর্ডারটা তুলে নিয়ে আসবি। যা! চলে যা।

তারপর রহমান সাহেবকে একটা জীপ দিতে অনুরোধ করলো ঋজুদা।

রহমান সাহেব আমার সঙ্গে একজন দারোগাকেও যেতে বললেন।

আমরা মালোঁয়া-মহল থেকে পাঁচশ গজও যাইনি, দেখি, যেখানে নাচঘরের দিকের পায়ে-হাঁটা পথটা এসে মিশেছে বড় রাস্তায় ঠিক সেই মোড়েই ব্রিজনন্দন পড়ে আছে মুখ থুবড়ে। পথের ধুলোর উপর। দুদিকে দু হাত ছড়িয়ে।

দারোগা সাহেব লাফিয়ে নামলেন। বললেন, মার্ডার।

সাপে কামড়েছিল ব্রিজনন্দনকে। ডান হাতের বাহুতে গোলাপী টেরিলীনের পাঞ্জাবীর উপরে দু’দিকে দুটি গভীর ক্ষত। মুখে গ্যাঁজলা। মরতে বোধহয় সময় লাগেনি বেশী!

জীপ ঘুরিয়ে মালোয়াঁ-মহলে এলাম আমরা লাশ নিয়ে।

ঋজুদা বলল, রহমান সাহেব আপনি যা চাইছিলেন, তাই-ই হল। ফ্রেশ মার্ডারই হল শেষ পর্যন্ত। এখন ইমিডিয়েটলী ঐ সাপটাকে আর ব্রিজনন্দনকে হাজারীবাগ সদরে নিয়ে যান। ফরেনসিক ও মেডিক্যাল এক্সপার্টরা পরীক্ষা করে দেখুন, ব্রিজনন্দন এই সাপের কামড়েই মারা গেছে কী না। তাহলেই……

রহমান সাহেব বললেন, এটা ভাল বলেছেন। এ ত’ করতেই হবে। তারপর ঋজুদাকে খুশী করার জন্যে বললেন, এই কেস ঠিকমত ইনভেস্টিগেট না করলে আমার নোকরী যাবে। ওয়েস্ট বেঙ্গলের আই-জি সাহাব আমাদের আই-পি-জি সাহাবকে যখন বলেছেন।

ঋজুদা আবারও বলল, তুই আবার যা অন্য জীপে করে রুদ্র, কাউকে নিয়ে–ঐগুলো নিয়ে আয়।

আমি আবারও উঠলাম। আজই সেই ভোরে কোলকাতা থেকে ট্রেনে চড়ে ধানবাদ এসে এতখানি গাড়ি চালিয়ে পৌঁছেছি। তারপর ত’ কাণ্ডর পর কাণ্ড। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কাণ্ড। এখন রাত প্রায় এগারোটা বাজে। ঘুম পেয়ে গেছে আমার।

আবারও বেরিয়ে যাওয়ার আগে আমার হঠাৎ মনে হল ব্রিজনন্দনের কোমরে ত’ সব সময় একটা রিভলবার থাকত; সেটা আছে ত’?

পুলিশদের বলতেই সঙ্গে সঙ্গে ওঁরা খুঁজলেন।

না। নেই। হোলস্টার আছে, কিন্তু রিভলবারটি নেই। কেউ নিয়ে গেছে।

ঋজুদাকে বললাম কথাটা। ঋজুদা পাইপের একগাল ধুঁয়ো ছাড়ল শুধু আমার দিকে তাকিয়ে।

ঋজুদা বলল, চলুন রহমান সাহেব। আমরাও দুজনে জায়গাটা একবার দেখে আসি।

দুটি জীপে করে ঐখানে পৌঁছেই ঋজুদা ভালো করে টর্চের আলো ফেলে ব্রিজনন্দন যেখানে পড়েছিল তার চারপাশ–নাচঘরে যাওয়ার পথ এবং গীমারিয়ার পথে ভালো করে কী যেন খুঁজতে লাগল।

তারপর রহমান সাহেবকে বলল, এ্যাই দেখুন।

রহমান সাহেবের সঙ্গে আমরাও দেখলাম যে একজনের জুতো-পরা পায়ের ছাপ–নাচঘর থেকে দৌড়তে দৌড়তে এসে গীমারিয়ার পথে চলে গেছে। আর পথের উপরে নাচঘর থেকে আসা ও ফিরে যাওয়া বিরাট সাপের দাগও স্পষ্ট।

ঋজুদা জুতোর দাগের দিকে চেয়ে বলল, ভানুপ্রতাপ! রহমান সাহেব, আপনার ফোর্স নিয়ে পিসকি নদীতে গেলে এখনও ভানুপ্রতাপের সঙ্গে দেখা হতে পারে। চলুন, আমরাও আপনাদের সঙ্গে গীমারীয়ার রাস্তার মোড় অবধি যাই–ওখান থেকে ট্রান্সমিটারটা তুলে নিয়ে আসব।

তারপর নিজের মনেই বলল, টেপ রেকর্ডারটা আর পাবি না রুদ্র। যাই-ই হোক। ক্যাসেটটা ত’ আছেই। তাতেই আমার কাজ হবে। এতক্ষণে ভানুপ্রতাপ টেপ রেকর্ডারটা খুঁজে বের করে জঙ্গলের গভীরে গা-ঢাকা দিয়েছে। ও ত’ আর জানে না যে, তুই ক্যাসেট খুলে নিয়েছিস!

–কোথায় যেতে পারেন ভানুপ্রতাপ এখান থেকে জঙ্গলে? আমি বললাম।

যেখানে খুশী। জঙ্গলে জঙ্গলে পালামৌ, গয়া, চাতরা; হান্টারগঞ্জ জৌরী, কত জায়গায় যেতে পারে। যেদিকে ইচ্ছে। চারদিকেই ত’ জঙ্গল!

ঋজুদাকে বললাম, ঋজুদা! আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে।

কি?

সাধের লাউ।

কি? ব্যাপারটা কি? ঋজুদা অধৈর্য গলায় বলল।

আরে, যে-ক্যাসেটটা রেকর্ডারে চেঞ্জ করে দিয়েছিলাম, তার মধ্যে সাধের লাউ বানাইলো মোরে ডুগডুগি গানটা ছিল।

উঃ রুদ্র! তুই ইনকরিজিবল। তোকে অনেক বড় বড় লাউ কিনে দেব। এখন ফর গডস্ সেক, চুপ কর।

কি বলব? ঋজুদা আমার কথার ফাইন পয়েন্টটাই বুঝলো না। গানটা কখনও শুনলে, ত’ বুঝবে। লাউ কিনে আমি কি তরকারী খাবো? যত্ব….

ট্রান্সমিটারটা তুলে নেবার পর একটি জীপ আমাদের মালোয়াঁ-মহল-এ পৌঁছে দিল। রহমান সাহেব পুলিশ ভ্যান ভর্তি আমর্ড কনস্টেবল এবং জীপে দারোগাদের নিয়ে চলে গেলেন পিসকি নদীর দিকে। হেডলাইট ও স্পটলাইট জ্বেলে।

মালোয়াঁ-মহলের বসবার ঘরের প্রকাণ্ড সোফাতে বিধ্বস্ত বিষেণদেও সিং বসেছিলেন। ভিজে চোখ দুটি জবাফুলের মত লাল। মনে হচ্ছিল, গত একঘণ্টাতে ওঁর বয়স দশ বছর বেড়ে গেছে।

পুলিশের একটা ব্রেক ডাউন ভ্যান ঋজুদার ফিয়াট গাড়িটাকে টেনে নিয়ে এল ফটকের মধ্যে দিয়ে। এঞ্জিন বা রেডিয়টরের কিছুই হয়নি। ডানদিকের কিছুই হয়নি। ডানদিকের মাডগার্ড এবং বাম্পার একদম তুবড়ে গেছে, যদিও চাকাতে আটকাচ্ছে না। অনেক স্ক্র্যাচ পড়েছে দুদিকেই। ডানদিকের জানালার কাচটাও ভেঙে গেছে।

ঋজুদা বিষেনদেওবাবুর দুটি হাত ধরে নরম গলায় বলল, আমরা এখনই বেরিয়ে পড়তে চাই বিষেণদেও বাবু। সারারাত চালিয়ে ভোরে আসানসোল কি ধানবাদ পৌঁছে যাব। তারপর কিছুটা রেস্ট করে, কোলকাতা।

তারপর একটু থেমে বলল, আমি খুব দুঃখিত। আপনার জন্যেই দুঃখটা সবচেয়ে বেশী।

বিষেণদেওবাবু দাঁড়িয়ে উঠে ঋজুদার দু হাত ধরে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললেন, বাচ্চা ছেলের মত।

বললেন, ঋজুবাবু, যে মালিক, সে কখনও নিজেরটাই চুরি করে? যে, বংশের একমাত্র বাতি–যে আমার আঁখোকা রোওশনী–সে কিসের জন্যে এমন হয়ে গেল? ভানু আমাকেও কেন শেষ করে দিলো না। আমাকে আপনি বাঁচিয়ে দিয়ে মরারও অধম করে রেখে গেলেন ঋজুবাবু! এখন কি করে আমি বাঁচব বাকি জীবন? এ বাঁচা কি বাঁচা?

ঋজুদা মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল, ঐ ড্রাগ-এডিকশানই ওর সর্বনাশের মূল। ও একটা ইভিল-জিনিয়াস্ হয়ে উঠেছিল।

হ্যাঁ। প্রথম দিকে, লানডানে, পড়াশুনায় ও খুবই ভাল ছিল। বলুন ত’! এ কী বরবাদীর রাস্তা বেছে নিল এত বড়া খানদানের ছেলে? নিজের বাবাকে মারল, মাকে মারল? আমি না-হয় বাইরের লোকই হলাম।

বাইরের লোকই হলাম! বলে, আবারও জোরে কেঁদে উঠলেন বিষেণদেওবাবু।

আমার চোখে জল এসে গেল।

গাড়িতে আমি মালপত্র উঠিয়ে, গুছিয়ে নিচ্ছি। ঋজুদা বিষেণদেওবাবুকে কোলকাতায় ঋজুদার বাড়িতে কিছুদিন এসে থাকবার জন্যে অনুরোধ জানাল। এবার ঋজুদাও গাড়িতে উঠবে।

বিষেণদেওবাবু বাইরে অবধি এলেন। গাড়ির দরজায় হাত রেখে দাঁড়ালেন।

বললেন, ঈসস্ গাড়িটার কি হাল।

তারপর বললেন, আমাদের ঐ মার্সিডিস গাড়িটা আপনি নিয়ে যান ঋজুবাবু।

কে চড়বে? এ ত’ ইম্পোর্টেড গাড়ি। আমি ত’ ডিজেল-এঞ্জিন বসানো জীপে চড়ে–ভাগ্নের জন্যে পয়সা জমাচ্ছিলাম। এজ আ ট্রাস্টী!

ঋজুদা বলল, আমি সাধারণ লোক বিষেণদেওবাবু, আমার এই সাধারণ গাড়িই ভাল সেই সময় হঠাৎ আমার মনে পড়ল বাথরুমের মধ্যে বন্ধ লোকগুলোর কথা।

তাড়াতাড়ি একটা পুলিশকে ডেকে বললাম সেকথা।

ঋজুদা যে তালা দিয়ে বাথরুম বন্ধ করা হয়েছে তার চাবিটা বের করে দিল। পুলিশরা দল পাকিয়ে উপরে চলল রাইফেল ও হাতকড়া নিয়ে।

বিষেণদেওবাবু আবার একটা ধাক্কা খেলেন।

বললেন, আপনাদের ঘরে? বাথরুমে? তিনজন?

আমি বললাম, হ্যাঁ! আমাদের ছোরা নিয়ে খুন করতে গেছিল।

হায় বজরঙ্গবালী, হায় বজরঙ্গবালী-মেহেমানোকোভি এহি…

ঋজুদা একটা কার্ড দিয়ে ওকে বলল, রহমান সাহেবকে দেবেন। সবরকম সহযোগিতা আমি করব। ওর দরকার হলে, ফোনও করতে বলবেন আমাকে। আর আপনি এসে থাকুন কদিন আমার কাছআগা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *