একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
(৭)
কৌশিক বলল, “আমার বন্ধু নিরুপম লাহিড়িকে চেনো তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোর সঙ্গে একই ইস্কুলে পড়ত, সেই নিরুপম তো? যতীন বাগচি রোডের ফ্ল্যাটে এক আধবার তাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে।”
“হ্যাঁ, সেই নিরুপম। জোকা থেকে ম্যানেজমেন্ট পাশ করে গত বছর সে ব্যাঙ্ক অব নেদারল্যান্ডসের ট্রেনি এগজিকিউটিভ হয়ে ঢুকেছে। তা সে যে রেনবো ক্লাবের মেম্বার সেটা জানি। কালই তাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি যে, তার গেস্ট হিসেবে একদিন রেনবো ক্লাবে যাওয়া যায় কি না। তা সে বলে, “আজই চলে আয়। এমনিতে অবশ্য রোববার ক্লাব বন্ধ থাকে, তবে আজ তো ক্লাবের ফাউন্ডেশন ডে, তাই গ্যালা নাইটের ব্যবস্থা।’ শুনে, আটটা নাগাদ নিরুপমের বাড়িতে গিয়ে তাকে তুলে নিয়ে আমি ক্লাবে চলে যাই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কই, কাল যে গিয়েছিলি, তা তো আমাকে বলিসনি।”
“আজ দুপুরেও ফের গিয়েছিলুম তো। ভেবেছিলুম, যা বলার, আজ বিকেলে ফিরে এসে সব একসঙ্গে বলব।”
“কিছু জানা গেল?”
“অনেকের সঙ্গেই তো কথা বলেছি। জানকী ঘোষ সম্পর্কে তাঁরা অনেক কথা বললেনও। যা বললেন, তা থেকে একটা ছবি পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, মানুষটি একটু মনমরা গোছের ছিলেন। সকলের সঙ্গেই কথা বলতেন, কিন্তু কারও সঙ্গেই খুব বেশি কথা বলতেন না। মাঝে-মাঝে তাঁকে লাউঞ্জের এক কোণে একটা আর্মচেয়ারে চুপচাপ বসে থাকতেও দেখা যেত। মনে হত, আপন মনে কিছু ভাবছেন। সকলের সঙ্গেই মেলামেশা করতেন, কিন্তু কারও সঙ্গেই খুব যে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করতেন, তা নয়। বাট নান সেড আ ব্যাড ওয়ার্ড অ্যাবাউট হিম। না মামাবাবু, ক্লাবে তাঁর সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল বলে মনে হয় না।”
“খেলাধুলো কিছু করতেন?”
“তাস ছাড়া অন্য-কিছু খেলতেন না। তাও রামি আর কনট্রাক্ট ব্রিজ।”
“কেমন খেলতেন?”
“রামিটা খুবই যাচ্ছেতাই খেলতেন। ফলে হারতেনও যাচ্ছেতাইভাবে। ওখানে খুবই হাই স্টেকে রামি খেলা হয় তো, তা জানকী ঘোষ যেদিনই খেলতে বসতেন, তিন-চার হাজার টাকার কম দণ্ড দিতেন না। বাট দেন হি ওয়াজ আ ভেরি গুড লুজার। হাসিমুখে চেক কেটে দিতেন, এ নিয়ে কেউ নাকি তাঁকে কখনও একটুও বেজার হতে দেখেনি।”
“আর ব্রিজ?”
“সেই কথাই তো বলছিলুম, তা তুমি বলতে দিলে কই! ওরে বাবা, এই যে সেই জানকী ঘোষ, তা তো ভাবতেও পারিনি!”
“ইউ মিন জে. ঘোষ?” ভাদুড়িমশায়ের চোখ দেখলুম দপ করে জ্বলে উঠেছে, “মানে গত বছর এঁরই টিম কনট্রাক্ট ব্রিজে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল? এঁরই সম্পর্কে পুরো এক-পাতার একটা রাইট-আপ বেরিয়েছিল স্পোর্টসওয়ার্ল্ডে?”
কৌশিক বলল, “হ্যাঁ, হি ওয়াজ আ টেরিফিক ব্রিজ প্লেয়ার! শুধু গত বছর নয়, তার আগের বছরও ওঁরই টিম ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।”
আমি ব্রিজ খেলি। কনট্রাক্ট নয়, অকশন। খুব যে ভাল খেলি, তা নয়, কিন্তু তাই বলে জে. ঘোষের নাম জানব না? বললুম, “তিনি তো বিরাট খেলোয়াড়। শুনেছি স্যাটার্ডে ক্লাবে ব্রিজ খেলতে এসে জিয়া মামুদও তাঁর কার্ড-সেনস আর প্লে-আউটের খুব তারিফ করে গিয়েছিলেন।”
“সেই জে. ঘোষই আমাদের জানকী ঘোষ।” কৌশিক বলল, “এবারও যদি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হতেন তো সেটা হ্যাটট্রিকের ব্যাপার হত। তার জন্যে নাকি খাটছিলেনও খুব। আজ দুপুরে তো ক্লাবের স্টুয়ার্ড, মালি, দরোয়ান, বেয়ারা, কাউকেই বাদ দিইনি। তা সবাই ওই একই কথা বলল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারা আর-কিছু বলেনি?”
কৌশিক বলল, “সবাই বলল, হি ওয়াজ আ ভেরি জেনারাস ম্যান। দরাজ হাতে বকশিস করতেন সব্বাইকে।”
আমি বললুম, “আচ্ছা, এই যে উনি পরপর তিনবার ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছিলেন, এটা আটকাবার জন্যে ওঁকে সরিয়ে দেওয়া হল না তো?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ভেবে দেখব। তবে তার আগে মহেশ কুলকার্নিকে একবার ফোন করা দরকার।”
“তিনি আবার কে?” প্রশ্নটা সদানন্দবাবুর।
“কম্প্যানি ল এক্সপার্ট।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইন ফ্যাক্ট, ওয়ান অভ দ্য বেস্ট ইন হিজ লাইন। একগাদা নামজাদা কম্প্যানির ডিরেক্টরও বটেন।”
“তাঁকে ফোন করবেন কেন?”
ভাদুড়িমশাই মৃদু হাসলেন। “সেটা আর এখন জানতে চাইবেন না। যদি জানাবার মতো কিছু হয়, তো আমিই আপনাদের জানিয়ে দেব।”
এটা যে বিদায় জানাবার ইঙ্গিত, সেটা বুঝে নিয়ে আমরা উঠে পড়ছিলুম। কিন্তু ‘আজ তবে চলি’ বলে দরজার দিকে পা বাড়াতেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে, দাঁড়ান দাঁড়ান, সদানন্দবাবুকে তো একটা কথা জিজ্ঞেসই করা হয়নি।”
সদানন্দবাবু ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “আর কী কথা?”
“একটাই মাত্র কথা। রঘুবীর ঘোষের বাড়িতে আপনি শেষ যান নাইনটিন সিক্সটিতে। তবে সেবারে যদিও তাঁর বাড়িতে আপনি ঢোকেননি, তার আগে তো বার কয়েক ঢুকেছিলেন। তাই না?”
“তা ঢুকেছিলুম বই কী।”
“কবে প্রথম ঢুকেছিলেন, মনে পড়ে? মানে মোটামুটি একটা আন্দাজ দিতে পারবেন?”
“তা কেন পারব না?” সদানন্দবাবু বললেন, “এই ধরুন ফিফটিএইট-ফিফটিনাইনে।”
“ফিফটিএইট-ফিফটিনাইনে?” মনে-মনে একটা হিসেব কষে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানকী ঘোষের বয়েস এখন পঁয়তাল্লিশ। তা হলে তো তখন তাঁর বয়েস ছিল নেহাতই আট-ন’ বছর। তা ওই বয়সের কোনও ছেলেকে তখন ও-বাড়িতে দেখেছিলেন?”
“যাচ্চলে, থাকলে তো দেখব।”
“তার মানে?” ভাদুড়িমশাইয়ের চোখ হঠাৎ সরু হয়ে গেল। বললেন, “ছেলে তার বাপের কাছে থাকত না?”
“ছেলেও থাকত না, তার মা’ও থাকত না।”
“একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
“বলচি, সবই বলচি।” সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “আরে মশাই, আমি কি আর এত সব জানতুম তখন? বসের বাড়িতে যাচ্চি, তাঁকে খুশি করতে হবে তো, কিন্তু সরাসরি তো আর তাঁর জন্যে কিছু নিয়ে যাওয়া যায় না, সেটা বড্ড তোষামোদের মতন দেখায়, তাই ভাবলুম যে, বসের তো বাচ্চাবয়েসি একটা ছেলে রয়েচে বলে শুনিচি, তো তার জন্যে একবাক্সা বিলিতি চকোলেট নিয়ে যাই। তা পার্ক স্ট্রিটের একটা সায়েবি দোকান থেকে ও-বস্তু কিনে নিয়ে গেসলুমও। কিন্তু ঘোষসাহেবের হাতে সেটা তুলে দিতে তিনি হেসে খুন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘করেছ কী হে! আমি কি বাচ্চা ছেলে যে চকোলেট চুষব?’ আমি বললুম, ‘না স্যার, খোকন খাবে।’ তাতে তিনি আবার হেসে উঠে বললেন, ‘খোকন? ইউ মিন মাই সন? কিন্তু সে তো দার্জিলিংয়ের কনভেন্টে থাকে। তাঁর মা’ও থাকেন দার্জিলিংয়ে। তাঁর আবার গরম সয় না। উইন্টার ভেকেশনে ছেলেকে নিয়ে কলকাতায় এসে কয়েকটা দিন এখানে কাটিয়ে যান, বাস্।’ তো এই হচ্ছে ব্যাপার।”
সদানন্দবাবু হাসতে লাগলেন। মজার ব্যাপার, তাই আমি আর কৌশিকও হাসছিলুম খুব। ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে কিন্তু হাসি নেই। গম্ভীর মুখে বললেন, “মা আর ছেলে কলকাতায় থাকত না! আশ্চর্য!”
বুঝলুম, এখন আর ওঁর সময় নষ্ট করা ঠিক নয়। আমরা আর বসলুম না। নীচে নেমে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে সদানন্দবাবুকে বললুম, “চকোলেটের গতি শেষ পর্যন্ত কী হল?”
সদানন্দবাবু বললেন, “কী আর হবে, বাকসোভর্তি চকোলেট নিয়ে বাড়ি ফিরতে হল। ফিরে এসে আপনাদের বউদি মানে মিসেস বোসকে বললুম যে, তাঁরই জন্যে কিনে এনিচি। শুনে তিনি তো দারুণ খুশি। মানে বাতে ভুগে ভুগে তাঁর মেজাজ তখনও এত তিরিক্ষি হয়ে যায়নি কিনা।”
কাঁকুড়গাছির আইল্যান্ড ঘুরে মানিকতলার রাস্তা ধরে বললুম, “খেয়ে খুশিও হয়েছিলেন তো?”
সদানন্দবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তা আর হলেন কোথায়! এক কামড় খেয়েই থুথু করে ফেলে দিয়ে বললেন, ম্যাগো, এই জিনিসও কেউ পয়সা দিয়ে কেনে? এর চাইতে আমাদের বাগবাজারের রসগোল্লার সোয়াদ অনেক ভাল!”
