একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
(৪)
বীরেশ্বর সেনকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এল কৌশিক। তারপর নিজের জায়গায় বসে পড়ে বলল, “আ স্ট্রেঞ্জ ক্যারেকটার!”
সদানন্দবাবু বললেন, “বড্ড আগড়ম-বাগড়ম বকে!”
অরুণ সান্যাল বললেন, “যা বলেছেন! আরে, তোকে মারতে চেয়েছিল, কিন্তু মেরে দিয়েছে আর-একজনকে, সারাক্ষণ শুধু এই কথাই তো বলে গেলি। এদিকে যেটা আসল কথা, সেটা হল কে তোকে মারতে চায়, আর মারতে চায়ই বা কেন। তা সে-সব তো কিছুই বললি না।”
আমি বললুম, “একটু ছিটেল বলে মনে হল মশাই।”
ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার সঙ্গে শোভনের বেশ মিল আছে দেখছি।”
“তার মানে?”
“কাল রাত্তিরে যখন ফোন করে এই ভদ্রলোকের কথা জানায়, তখন শোভনও ঠিক এই একই কথা বলেছিল।”
“সেই জন্যেই আপনি ও-সব কথা জানতে না-চেয়ে বীরেশ্বর সেনকে বিদেয় করে দিলেন?”
“কোন্ সব কথা?”
“বাঃ, এইমাত্তর অরুণবাবু যা বললেন। মানে কে ওঁকে খুন করতে চায়, আর সেটা চায়ই বা কেন, জিজ্ঞেস করলে সেটা উনি জানাতেন নিশ্চয়। কিন্তু আপনি তো দেখলুম ও-সব কিছু জানতেই চাইলেন না।”
“কেন চাইব?” ওঁর কেসটা যখন নিইনি, তখন এক্ষুনি অতসব কথা জানবার দরকার কী?”
“কেসটা তা হলে নিচ্ছেন না?”
“একটু ভেবে দেখি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “দরকার বুঝলে নেব। এখন শোভনকে একটা ফোন করা দরকার। আজ তো ছুটির দিন। আশা করি বাড়িতেই পাওয়া যাবে।”
হালে অরুণ সান্যালের বাড়িতে একটা কর্ডলেস সেটের আমদানি হয়েছে। সেটা তুলে অন্ করে নিলেন ভাদুড়িমশাই। ডায়াল করে একটুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। তারপর বললেন, ‘কে, শোভন? … হ্যাঁ, এসেছিলেন। …না না, বিরক্ত হব কেন, কিন্তু তুমি যা ভাবছ, তা বোধহয় ঠিক নয়। একটু বেশি কথা বলেন ঠিকই, কিন্তু লোকটিকে আমার মোটেই ছিটেল বলে মনে হল না। …তা তো হল, এখন জানকী ঘোষের, ওই মানে যিনি লেকে মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে সেদিন খুন হয়েছেন, তাঁর সম্পর্কে দুটো খবর আপাতত জানতে চাই। এক, ভদ্রলোক কোন কোম্পানিতে কাজ করতেন; দুই, তাঁর বাড়ির ঠিকানা কী। লোকাল থানায় ফোন করে যদি জেনে দাও তো খুব ভাল হয়। ওরা নিশ্চয়ই বলতে পারবে। …কী বললে, থানায় ফোন করার দরকার নেই? দুটো খবরই তোমার জানা আছে? তা হলে তো ভালই হল। … না না, লিখে নেবার দরকার নেই, আমি মনে রাখতে পারব। বলো। …বাঃ, চমৎকার। থ্যাঙ্কস আ লট। পরে আবার যোগাযোগ করব, এখন রেখে দিচ্ছি।”
কর্ডলেসটাকে অফ্ করে দিয়ে সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোম্পানির নাম জেঙ্কিন্স অ্যান্ড জেঙ্কিস। আর থাকতেন সাত নম্বর পপলার অ্যাভিনিউয়ে। …ও কী, সদানন্দবাবু, আপনি কি ভূত দেখলেন নাকি?”
সদানন্দবাবু একেবারে বিস্ফারিত চোখে এতক্ষণ ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মনে হল যেন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। হঠাৎ চট্কা ভেঙে গেলে যেমন হয়, ভাদুড়িমশাইয়ের শেষ কথাটা কানে যেতে সেইভাবে হঠাৎ ধড়মড় করে সিধে হয়ে বসে বললেন, “জেঙ্কিন্স অ্যান্ড জেঙ্কিস! আমি তো ওখেনেই কাজ করতুম!”
“জানকী ঘোষকেও চিনতেন নাকি?”
“না, তবে ঠিকানা যা বললেন, তাতে মনে হচ্ছে রঘুবীর ঘোষের কেউ হবে। সাত নম্বর পপলার অ্যাভিনিউ বললেন না?”
“হ্যাঁ।”
“ওটা তো আমাদের রঘুবীর ঘোষের বাড়ি মশাই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই রঘুবীর ঘোষই বা কে? একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
“নিশ্চয়, নিশ্চয়।”
সদানন্দবাবু অতঃপর ঝাড়া মিনিট পাঁচেক ধরে ননস্টপ যা বলে গেলেন, তার সারমর্মটা হচ্ছে এই যে, জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিসের যে বিভাগে সদানন্দবাবু কাজ করতেন, রঘুবীর ঘোষ ছিলেন সেই শিপিং ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার। খুব ‘মাই ডিয়ার’ লোক ছিলেন, কিন্তু রেগে গেলে জ্ঞানগম্যি থাকত না। সদানন্দবাবুর উপরে অবশ্য রাগ করার কোনও কারণ কখনও ঘটেনি। রঘুবীর ঘোষ সায়েরদের নেকনজরে ছিলেন। বড়সায়েব তাঁকে নাকি আদর করে বলতেন ‘রোঘো’। চাকরি করলে কী হয়, রঘুবীর ঘোষ নিজেও নেহাত কম বড়লোক ছিলেন না। জমিদারবাড়ির ছেলে, মুর্শিদাবাদের ওদিকে বিস্তর জমিজমা ছিল। শীত পড়লেই ‘বার্ডশুটিং’ করবার জন্যে সায়েবদের সেখানকার ‘কান্ট্রিহাউস’-এ নিয়ে যেতেন। “আর ওই পপলার অ্যাভিনিউ-এর বাড়ি? ও তো রাজবাড়ি, মশাই। প্যালেসিয়াল বিল্ডিং। ফূর্তিফার্তা কি ওখেনে কম হয়েচে? বড়সায়েব যেতেন, বাছা-বাছা দু’চারজন ছোটসায়েব যেতেন, তাঁদের মেমসায়েবরাও যেতেন। শুনিচি শেরি-শ্যাম্পেনের ফোয়ারা ছুটত তখন। নিজেও ছিলেন মালদার লোক। আর হ্যাঁ, তেমনি দিলদরিয়া। পয়সাটাকে পয়সা বলে গেরাহ্যিই করতেন না। যেন ওটা নেহাতই হাতের ময়লা।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “রঘুবীর ঘোষ এখনও বেঁচে আছেন?”
“না।” সদানন্দবাবু বললেন, “দেশ স্বাধীন হবার পরেও সায়েবরা কিছুদিন এ-দেশে ছিল, তারপর নাইনটিন ফিফটি এইটে কোম্পানিটাকে এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীর কাছে বেচে দিয়ে তারা দেশে চলে যায়। রঘুবীর ঘোষের সঙ্গে নতুন মালিকের বনিবনা হল না। কিছুদিন কাজ করেছিলেন, তা রগচটা মানুষ তো, কী একটা কথায় রেগে গিয়ে একদিন দমাস করে একটা ঘুসি মেরে মালিকের শালার নাক ফাটিয়ে দিয়ে তিনি আপিস ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। সেই যে গেলেন, আর ফিরলেন না। দিন তিনেক বাদে শুনলুম, বাড়ি থেকেই রেজিগনেশান লেটার পাঠিয়ে দিয়েছেন।”
“তা তো হল, কিন্তু তিনি মারা গেলেন কবে?”
“আপিস ছাড়ার পরে আর বেশিদিন বাঁচেননি। নাইনটিন সিক্সটিতে আপিস ছাড়লেন আর মারা গেলেন সিক্সটিথ্রিতে। ইস্টার্ন কুরিয়ারের পার্সোনাল কলামে তিন লাইনের একটা খবর পড়ে সেটা জেনেছিলুম। তখন আর তাঁর কতই বা বয়েস হবে, এই ধরুন বছর পঞ্চাশ।”
“তা হলে বেঁচে থাকলে আজ রঘুবীর ঘোষের বয়স হত একাশি-বিরাশি। তবে তো পঁয়তাল্লিশ বছরের একটা ছেলে তাঁর থাকতেই পারে।” একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। মনে হল, মনে-মনে একটা সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে নিচ্ছেন। তারপর অস্ফুট গলায়, যেন নিজেকে শুনিয়ে বললেন, “ঠিকানাও যখন মিলে গেল, তখন জানকী ঘোষ যদি রঘুবীর ঘোষের ছেলে হয়, তো আমি অবাক হব না।”
বললুম, “কাগজে তো জানকী ঘোষের বয়েস দেখলুম পঁয়তাল্লিশ বছরই লিখেছে।”
ভাদুড়িমশাই আমার কথাটা যেন শুনতেই পেলেন না। কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “নতুন ফোন-গাইড তো বেরিয়েছে, একবার পাতা উলটে দ্যাখ তো জানকী ঘোষের নামটা ওখানে লিস্টেড কি না।”
কিন্তু তার আর দরকার হল না। কৌশিক গিয়ে তার বাবার শোবার ঘর থেকে গাইডটা নিয়ে আসার আগেই ফোন বেজে উঠল। কর্ডলেসটা তুলে কৌশিক বলল, “হ্যালো…,” তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে যন্ত্রটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “মামাবাবু, তোমার ফোন।”
রিসিভারে মুখ রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চারু ভাদুড়ি কথা বলছি…কী আশ্চর্য, আমিই আপনাদের ফোন করতে যাচ্ছিলুম। কিন্তু আমি যে এখন কলকাতায় আছি, তা আপনারা কী করে জানলেন?…কী বললেন? ব্যাঙ্গালোরে এসটিডি করেছিলেন, সেখান থেকে জানিয়েছে?…ঠিক আছে, আমি আজ বিকেলেই আপনাদের ওখানে যাচ্ছি। …না না, গাড়ি পাঠাতে হবে না। আপনাদের ঠিকানা আমি জানি, লেকের কাছেই তো, ও আমরা রাস্তা চিনে যেতে পারব।”
বোতাম টিপে যন্ত্রটা নামিয়ে রাখলেন ভাদুড়িমশাই। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বললেন, “ব্যাপারটা জমে গেছে।”
বললুম, “জানকী ঘোষের বাড়ি থেকে আপনাকে চাইছিল?”
“হ্যাঁ, বিকেলে ওখানে যাচ্ছি। আপনিও চলুন না। … আর হ্যাঁ, জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিন্স কোম্পানির নামটা যখন এসেই পড়েছে, তখন সদানন্দবাবুও যদি যান তো ভালই হয়।”
সদানন্দবাবু বললেন, “যাব বই কী, আমি গেলে যদি ইনভেস্টিগেশানের সুবিদে হয়, তো নিশ্চয় যাব।”
