একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৩)

কৌশিক বলল, “তাজ্জব কাণ্ড! একজনকে খুন করতে চেয়েছিল, অথচ আর-একজনকে খুন করে বসল? তাও কি হয় নাকি?”

 

আবার একটা সিগারেট ধরালেন বীরেশ্বর সেন। গলগল করে আবারও খানিক ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “হবে না কেন, হয়। আইডেন্টিফিকেশানের ব্যাপারে সামান্য কিছু ভুলচুক ঘটে গেলেই সেটা হতে পারে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পরিষ্কার করে বলুন।”

 

“বলছি।” বীরেশ্বর সেন বললেন, “যে আমাকে খুন করতে চায়, সে আমাকে চেনে। যদি সে নিজের হাতে আমাকে খুন করতে আসত, তা হলে তার কোনও ভুলচুক হত না। কিন্তু নিজের হাতে খুন করতে হলে যে ঝুঁকি নিতে হয়, তা হয়তো সে নিতে চায়নি। সে লোক লাগিয়ে খুন করিয়েছে। কিন্তু কাজটা যাকে দিয়ে করিয়েছে, সে আমাকে চেনে না। চিনলে কি আর এইখানে বসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারতুম আমি? জানকী ঘোষের বদলে সেদিন আমারই শরীরটাকে তা হলে মর্গে চালান করা হত।”

 

“কিন্তু ভুলটা হল কেন? খুনিকে কি আপনার ডেসক্রিপশান দিয়ে দেওয়া হয়নি? মানে আপনাকে দেখতে কীরকম, আপনি ফর্সা না ময়লা, ঢ্যাঙা না বেঁটে না মাঝারি হাইটের, মোটা না রোগা না দোহারা, চশমা আছে কি নেই, তারপর ধরুন পোশাক-আশাক, তাই দিয়েও তো একটা লোককে চিনিয়ে দেওয়া যায়। তা খুনিকে নিশ্চয় এ-সব বলে দেওয়া হয়েছিল?”

 

“তা নিশ্চয় হয়েছিল।”

 

“তা হলে?”

 

“বলছি। আজ হল পাঁচুই মার্চ, রবিবার। আর খুনটা হয় দোসরা মার্চ বেস্পতিবার সকালে। তা কলকাতায় ইতিমধ্যে গরম পড়ে গেলেও সকালের দিকটায়…আই মিন খুব সকালে, এই ধরুন ছ’টা সাড়ে ছ’টা নাগাদ তো বাতাস বেশ ঠাণ্ডাই থাকে…বিশেষ করে জলের ধারের বাতাস…তাই না?”

 

“তা থাকে, কিন্তু তাতে কী হল?”

 

“একটু বাদেই সে-কথায় আসছি, মিঃ ভাদুড়ি, কিন্তু তার আগে আর-একটা কথা বলা দরকার। কী ব্যাপার জানেন, শীতবোধটা সকলের সমান নয়। এই ধরুন এখন তো মার্চ মাস পড়ে গেছে, তা এই মার্চের গোড়াতেও অন্তত ভোরবেলার দিকে বাইরে বেরুতে হলে আমার একটা গরম জামা পরা চাই-ই চাই, কিন্তু আমার স্ত্রীকে দেখুন, ফেব্রুয়ারি মাস পড়লেই হল, তখন শাল তো দূরের কথা, হাল্কা একটা সোয়েটারেরও তাঁর দরকার হয় না; ওই ফেব্রুয়ারির গোড়াতেই তাবৎ উলেন গার্মেন্টস তিনি শালকরের দোকানে পাঠিয়ে দেন।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “শীতবোধ তো এক-এক জনের এক-এক রকম হতেই পারে। সকলের কনস্টিটিউশন তো সমান নয়, ইট ভ্যারিজ ফ্রম পার্সন টু পার্সন।”

 

বীরেশ্বর সেন বললেন, “রাইট। একদম খাঁটি কথা। ইট ভ্যারিজ ফ্রম পার্সন টু পার্সন। কিন্তু মুশকিল কী জানেন, আমার স্ত্রী এটাই বোঝেন না। শুধু নিজেরগুলো পাঠালে তো হত, সেই সঙ্গে আমারগুলোও…মানে গরম বলতে যা-কিছু আমার আছে…প্যান্ট, জ্যাকেট, পুলোভার, জাম্পার…আই মিন দ্য হোল লট…সবই ওই একই সঙ্গে শালকরের দোকানে পাঠিয়ে ছাড়েন। কিছু বলতে গেলেই বলেন, ‘বাজে বোকো না, গরম পড়ে গেছে, এখন আর এগুলো দিয়ে কী হবে?’ বুঝুন ব্যাপার!”

 

কৌশিকের মুখ দেখে মনে হল, হাসি চেপে রাখতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে। অরুণ সান্যালের মুখে অবশ্য হাসি নেই। ডাক্তার মানুষ, তাই চিন্তিত গলায় বললেন, “তা হলে তো খুবই সমস্যার কথা! এক কাজ করুন, একটু বেলা না হলে বরং বাইরে বেরুবেন না।”

 

বীরেশ্বর সেন বললেন, “না-বেরুলে চলে? মর্নিং ওয়াক তো তা হলে বন্ধ রাখতে হয়!”

 

“মর্নিং ওয়াক!” অনেকক্ষণ একেবারে চুপচাপ বসে ছিলেন সদানন্দবাবু, কিন্তু এবারে আর পারলেন না। বললেন, “আপনি মর্নিং ওয়াক করেন? বাঃ, বাঃ, চমৎকার! সর্দি-কাসি জ্বরজ্বারি ডায়াবিটিস ব্লাডপ্রেশার ম্যালেরিয়া ফাইলেরিয়া, কিচ্ছুটি আপনাকে ছুঁতে পারবে না, শরীর একেবারে চাবুকের মতো ফিট্ থাকবে! চালিয়ে যান, মশাই, চালিয়ে যান! একদিনও যেন বাদ দেবেন না!”

 

“বাদ দিতে চাই না বলেই তো আমাকে একটু চালাকি করতে হয়।” বীরেশ্বর সেন বললেন, “উলেন গার্মেন্টসগুলো আমার স্ত্রী যখন শালকরের দোকানে পাঠিয়ে দেন, তখন একটা হাল্কা কার্ডিগান আমি সরিয়ে রাখি। এবারেও রেখেছিলুম। না-রেখে উপায় কী, ওই সাত-সকালে আমাকে লেকের ধারে গিয়ে মর্নিং ওয়াক করতে হয় যে! সেখানে তো আরও ঠাণ্ডা!”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের চোখ দেখলুম সরু হয়ে এসেছে। বললেন, “দোসরা মার্চের ভোরবেলাতেও আপনি লেকের ধারে হাঁটতে গিয়েছিলেন, কেমন?”

 

“তা গিয়েছিলুম, কিন্তু…”

 

“কিন্তু আপনার গায়ে তখন কার্ডিগানটা ছিল না, এই তো?”

 

“গোড়ায় ছিল, কিন্তু পরের দিকে ছিল না।”

 

‘কেন ছিল না?”

 

“বলছি। আমি যেখানে মর্নিং ওয়াক করি, সেখানে এক-এক চক্কর হাঁটতে আমার মিনিট পনেরো লাগে। তা সেদিন প্রথম চক্কর হাঁটবার পরেই আমি একটু ঘেমে যাই। তখন একটা বেঞ্চিতে বসে কার্ডিগানটা আমি খুলে ফেলি।”

 

“তারপর?”

 

“বেঞ্চিতে বসেই লক্ষ করি যে, জানকী ঘোষ মশাইও লেকের ধারে এসে গেছেন। তাঁর গায়েও দেখলুম ঠিক আমারই মতন একটা কার্ডিগান। তিনি আমাকে দেখতে পেয়েছিলেন কি না বলতে পারব না। কিন্তু তিনি হাঁটতে শুরু করার খানিক বাদেই একটা শব্দ শুনতে পাই। সেটা যে গুলির শব্দ, গোড়ায় তা বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলুম, টায়ার পাংচার হয়ে থাকবে। তা ছাড়া একজস্ট পাইপ থেকেও তো ওইরকম শব্দ হয়, তেমন কিছু হবে হয়তো।”

 

“তা যে নয়, সেটা কখন বুঝলেন?”

 

“যখন দেখলুম যে, হাঁটতে-হাঁটতেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন জানকীবাবু, তারপর ডান হাত তুলে বুকের বাঁ-দিকটা চেপে ধরে সেইখানেই…আই মিন সেই পথের উপরেই শুয়ে পড়লেন। ইন ফ্যাক্ট, গুলির ব্যাপারটা তখনও আমি বুঝিনি। ভেবেছিলুম ম্যাসিভ একটা হার্ট-অ্যাটাকের ব্যাপার। বেঞ্চি থেকে উঠে তক্ষুনি আমি জানকীবাবুর দিকে ছুটে যাই। যেতে-যেতেই লক্ষ করি তাঁর কার্ডিগানটা রক্তে ভিজে গেছে। আসল ব্যাপারটা তখন বুঝতে পারি।”

 

“আর-কেউ সেখানে ছিল না?”

 

“অত সকালে খুব কম লোকই লেকের ও-দিকটায় হাঁটতে আসে। এই ধরুন দু’পাঁচজন লোক। মার্চের গোড়ায় তার বেশি লোক ওই ভোরবেলায় ওদিকে বড় একটা দেখিনি। তবে হ্যাঁ, দু-একজন চা-ওয়ালাকে অবশ্য দেখা যায়। কেটলিতে করে গরম চা নিয়ে তারা ঘুরে বেড়ায়।”

 

“অল্প হলেও কিছু লোক তো আসে। জানকীবাবুকে ওইভাবে পড়ে যেতে দেখে তারা ছুটে আসেনি?”

 

“এসেছিল। আমার সঙ্গে-সঙ্গেই এসেছিল। তাদেরই একজন জানকীবাবুর নাড়িতে হাত রেখে বলে যে, ভদ্রলোক মারা গেছেন। তখন একটা হইচই লেগে যায়। ভিড় জমে উঠতে থাকে। আমি বুঝতে পারি যে, এবারে পুলিশ আসবে। পুলিশ এসে সবাইকে জেরা করবে। হয়তো থানায় যেতে বলবে। তা যদি যেতে হয়, তো চট করে ছাড়া পাব না। অথচ সেদিন সকাল ন’টায় আমার বাড়িতে ফিরে আসার কথা। এক ভদ্রলোক দেখা করতে আসবেন, জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, সেটা না-রাখলেই নয়। ভিড় ঠেলে আস্তে-আস্তে আমি তাই বেরিয়ে আসি। পথে লেক মার্কেটে কিছু কেনাকাটা করার দরকার ছিল। কিন্তু তখন আমার মনের যা অবস্থা…আই মিন বড্ডই ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম তো, তাই আর কোথাও না-থেমে একেবারে সোজা বাড়ি চলে যাই।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “গুলিটা যে করল, তাকে দেখতে পেয়েছিলেন?”

 

“না। তবে হ্যাঁ, যে-মুহূর্তে গুলির শব্দটা শুনি, ঠিক সেই সময়েই আর-একটা শব্দও শুনতে পেয়েছিলুম। …মোটরবাইকের শব্দের মতন। যেন কেউ ভীষণ জোরে মোটরবাইক চালিয়ে চলে গেল।”

 

“আপনার ধারণা, আপনাকেই সে মারতে এসেছিল, কিন্তু লোক চিনতে ভুল করে অন্য লোককে মেরে দিয়েছে।”

 

“হ্যাঁ।”

 

“এটা আপনার এই জন্যে মনে হচ্ছে যে, যদ্দুর আন্দাজ করতে পারছি, আপনাদের দু’জনের চেহারা মোটামুটি একইরকম। তা ছাড়া, আপনার কার্ডিগানটির রংও সম্ভবত লাল। ভুল বললুম?”

 

“না, আপনি ঠিকই বলেছেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু গুলি যখন চলে, কার্ডিগানটি তখন আপনার গায়ে ছিল না। যদি আপনার সন্দেহ ঠিক হয়, তা হলে বুঝতে হবে যে, স্রেফ একটা লাল কার্ডিগান গায়ে ছিল বলেই আপনার বদলে আর-একটা লোককে বেঘোরে মরতে হল।”

 

বীরেশ্বর সেন বললেন, “এখন আমি কী করব?”

 

ভাদুড়িমশাই ম্লান হাসলেন। “কিছু করতে হবে না, স্রেফ আপনার ঠিকানা… আর হ্যাঁ, যদি টেলিফোন থাকে তো তার নম্বরটা একটা কাগজে লিখে দিয়ে বাড়ি চলে যান। দরকার বুঝলে আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *