(২২)
সাত নম্বর পপলার অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে পৌঁছতে-পৌঁছতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। নেপালি দরোয়ান গেট খুলে দিল। রাস্তায় গাড়ি রেখে আমরা ভিতরে ঢুকলুম। গোটা বাড়িটা অন্ধকারের মধ্যে ডুবে ছিল এতক্ষণ। মালকিন যে আজই ছাড়া পাবেন, এটা বোধহয় কেউ বুঝতে পারেনি। এবারে তাঁকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে ভেতর থেকে কেউ ঘরে আর বারান্দায় পরপর আলো জ্বেলে দিচ্ছে। মিনিট খানেকের মধ্যেই সবকিছু আবার আলোয় ঝলমল করে উঠল।
বাগানের রাস্তা পেরিয়ে একতলার বারান্দায় উঠে এলুম আমরা। ফুলকুমারী বললেন, “একটুক্ষণ বসুন আপনারা, আমি ততক্ষণে স্নান করে ঠাকুরঘর থেকে একবার ঘুরে আসি। নিজেকে ভীষণ নোংরা লাগছে।”
ভদ্রমহিলার চোখ দেখলুম জবাফুলের মতন লাল। সিঁড়ির ধাপে আস্তে-আস্তে পা রেখে দোতলায় উঠে গেলেন। দরোয়ান এসে ড্রয়িংরুমের দরজা খুলে দিয়েছিল। আমরা ভিতরে গিয়ে বসলুম।
সদানন্দবাবু বললেন, “থানা থেকে সারাটা পথ কাঁদতে-কাঁদতে এসেছেন।”
ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালুম। তিনি কিছু বললেন না। যেভাবে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছেন, তাতে মনে হল কিছু ভাবছেন।
মিনিট দশেক বাদে উর্দি-পরা একটি বেয়ারা একটা বস্তু বড় ট্রে হাতে করে ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকল। ট্রে’র উপরে কফির পট, পেয়ালা, পিরিচ। আলাদা দুটি প্লেটে কিছু বিস্কুট ও কাজুবাদাম। সেন্টার টেবিলের উপরে ট্রে নামিয়ে রেখে সে বলল, “মাইজি পাঠিয়ে দিলেন। আপনারা কফি খান, তিনি একটু বাদেই আসছেন।
বেয়ারাটি বেরিয়ে গেল।
ফুলকুমারী এলেন আরও মিনিট দশেক বাদে। স্নান করেছেন, ময়লা থানখানা পালটে ধবধবে সাদা একটি কাপড় পরেছেন, কপালে চন্দনের ফোঁটা। বললেন, “ঠাকুরঘরে শীতল দিয়ে এলুম। আজ তো পায়েস রাঁধতে পারিনি। শুধু বাতাসা আর ফল। ভাগ্যিস আপনারা গিয়ে হাজত থেকে আমাকে ছাড়িয়ে আনলেন, নইলে তো ঠাকুরকে উপোস দিতে হত, ওইটুকুও জুটত না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “এই হচ্চে আমাদের পুলিশ! যাকে ধরতে হবে, তাকে ধরবে না, আর যার কোনও দোষ নেই, তাকে হাজতে পুরে দেবে। আমাকেও একবার দিয়েছিল।”
বুঝলুম, সেই কবেকার শ্যামনিবাস-রহস্যের কথাটা তাঁর আবার মনে পড়ে গিয়েছে।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দাশুকে যে দেখছি না। সে কোথায়?”
“তাকে আজ সকালেই আমাদের এক বন্ধুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি।” ফুলকুমারী বললেন, “আপনারা কাল রাত্তিরে এখান থেকে চলে যাবার পরেই আমার ভীষণ ভয় করতে থাকে। ব্যাপারটা নিয়ে যত ভাবি, ততই আরও ভয় বেড়ে যায়।”
“কীসের ভয়?”
ফুলকুমারী ম্লান হাসলেন। বললেন, “তাও বুঝিয়ে বলতে হবে? ভয় আমার নিজের জন্যে নয়, মিঃ ভাদুড়ি, ভয় দাশুর জন্যে?”
“দাশুকে নিয়েই বা ভয় কেন?”
“বলছি। আপনি বললেন, জানকীর বউ পুলিশকে গিয়ে বলতে পারে যে, আমিই খুনি। আর পুলিশ সে-কথা বিশ্বাস করে ভাবতে পারে যে, দাশুরও সেক্ষেত্রে আমার কাছে থাকাটা মোটেই নিরাপদ নয়। ফলে, দাশুকে তারা আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিতে পারে। তখনই আমি ভয় পেয়ে যাই। তার কারণ আমি তো জানি যে, আমার কাছেই দাশু সবচেয়ে নিরাপদ। আমার ভাবনাটা আবার অন্য দিকে ঘুরে যায়। আমি ভাবতে থাকি যে, জানকীকে যারা খুন করেছে তারা যদি সম্পত্তির লোভেই খুনটা করে থাকে তো দাশুকেও তারা ছাড়বে না। তারা নিশ্চয় জানে যে, এই বাড়িতে দাশুকে আমি আগলে রেখেছি। তাই, হয় তারা দাশুকে এখান থেকে সরিয়ে নেবে, আর নয়তো আমাকেই সরে যেতে বাধ্য করবে এই বাড়ি থেকে।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ফুলকুমারী। তারপর বললেন, “সারা রাত্তির এই নিয়ে আমি ভেবেছি। ভাবতে-ভাবতে ভোরবেলার দিকে মনে হল, আমার কাছ থেকে দাশুকে আলাদা করার আগে আমিই দাশুকে এখান থেকে সরিয়ে দেব। এমন জায়গায় সরিয়ে দেব, যাতে কেউ তার খোঁজ না পায়।”
“কোথায় সরিয়ে দিলেন?”
“আমাদের এক পারিবারিক বন্ধুর বাড়িতে। ভদ্রলোক আর্মি অফিসার, ফোর্ট উইলিয়ামের কোয়ার্টার্সে থাকেন। আজ ভোরবেলায় বিছানা থেকে উঠেই আমি দাশুকে জাগিয়ে দিই। তার বইপত্তর আর জামাকাপড় গুছিয়ে নিতে বলি। তারপর সেই ভদ্রলোককে ফোন করে সংক্ষেপে আমার সমস্যার কথা জানাই। সব বুঝতে পেরে সকাল সাতটার মধ্যেই তিনি এখানে চলে আসেন। দাশুকে তিনি তাঁর কোয়ার্টার্সে নিয়ে গেছেন। তাঁকে বলে দিয়েছি, দাশু এখন বেশ কিছুদিন তাঁর ওখানেই থাকবে। তাকে যেন একা-একা কোথাও যেতে দেওয়া না হয়। এমন কী, তার কলেজেও না।”
ভদ্রমহিলা হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু তার আগেই শোভন চৌধুরি এসে ঘরে ঢুকে বললেন, “সইকেসের মধ্যে রিভলভার তো পাওয়া গেল। কিন্তু রিভলভারের মধ্যে কী মিসিং সেটা জানেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানি না, তবে আন্দাজ করতে পারি। একটা বুলেট। যেটা তোমরা জানকী ঘোষের শরীরের মধ্যে পেয়েছ।”
কথাটা বলেই ফুলকুমারীর দিকে তাকালেন ভাদুড়িমশাই। কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “আই’ম সরি, ম্যাডাম, এ-সব কথা আপনার সামনে বলাটা আমার উচিত হয়নি।”
ফুলকুমারী বললেন, “না না, আমি কিছু মনে করছি না। সবই আমি জানতে চাই। আমার ছেলেকে কারা মেরেছে, কীভাবে মেরেছে, কেন মেরেছে, স-ব।”
শোভন বললেন, “মেরেছে তো বীরেশ্বর সেন। মেরেছে ওই রিভলভার দিয়ে। কিন্তু কেন মেরেছে, তা তো জানি না। ওটা বোধহয় মিঃ ভাদুড়ি বলতে পারবেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমিও তো স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারব না, আমি শুধু আন্দাজই করতে পারি। আপনার পুত্রবধূ যে এই লোকটার সঙ্গেই ঘর ছেড়েছিল, সেটা তো ঠিক?”
“থানায় যে-লোকটাকে দেখলুম, তার কথা বলছেন তো?” ফুলকুমারী বললেন, “হ্যাঁ, আমার ছেলের কাছে ওর কথা শুনেছি বটে। তবে আমার ছেলে যে ওকে চিনত, এমন আমার মনে হয় না। আমিও এর আগে ওকে কখনও দেখিনি।”
“কী করে দেখবেন?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও তো এ-বাড়িতে আসত না। যা-কিছু উশকানি দেবার সেটা বাইরে থেকে দিত। আপনার পুত্রবধূকে এ-বাড়ি থেকে বার করেছিল ফিল্মে নামাবার লোভ দেখিয়ে। পরে নিশ্চয় বিয়েও করতে চেয়েছিল। কিন্তু বেলা দেবী তাতে রাজি হননি। …এ-সবই অবশ্য আমার আন্দাজ। একটা কথা জিজ্ঞেস করি, বেলা দেবী এই বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন কী নিয়ে? মানে আমি টাকাকড়ির কথা বলছি।”
“টাকাকড়ি বিশেষ নেয়নি। তবে ব্যাঙ্কের লকারে গয়নাগাঁটি তো কম ছিল না, তার সবই তুলে নিয়েছিল। …তা প্রায় লাখ ছ’সাত টাকার গয়না। তার সবই নিশ্চয় ওই লোকটা হাতিয়ে নিয়েছে?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “মনে হয় না। তা যদি নিত, তা হলে বেলা দেবী ওই ফ্ল্যাটটা কিনলেন কী করে? ফিল্মে নেমে তো কানাকড়িও পাননি, আর যাত্রা করার জন্যেও যে বীরেশ্বর সেন ওঁকে বিশেষ-কিছু দিত, এমন মনে হয় না। ফ্ল্যাটটা বোধহয় গয়না বেচে সেই টাকাতেই কিনেছিলেন। ওটা ওঁর নিজের নামে কেনা।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা হলে কি ওই ফ্ল্যাটটা হাতাবার জন্যেই বীরেশ্বর ওঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিল?”
“সেটাই সম্ভব। তবে না, বেলা দেবী ওকে বিয়ে করতে রাজি হননি। জানকী ঘোষের সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যাবার পরেও না।”
“কেন?”
“হতে পারে যে, বীরেশ্বর সেনের আসল চরিত্রটা উনি বুঝে গিয়েছিলেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওর অর্থলোভ, যাত্রা-পার্টির অন্য সব মেয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক, এ-সবের কিছুই নিশ্চয় বেলা দেবীর অজানা ছিল না। তা ছাড়া কিছু-কিছু সংস্কারও হয়তো ওঁর মনে কাজ করে থাকবে।”
শোভন চৌধুরি বললেন, “কীসের সংস্কার?”
“ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও ওঁর একটি ছেলে তো রয়েছে। সেই সঙ্গে এটাও নিশ্চয় জানতেন যে, ডিভোর্স পাওয়া সত্ত্বেও ওঁর স্বামী আর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি। হয়তো ভাবতেন যে, পরে আবার কখনও তিনি তাদের কাছে ফিরে যেতে পারবেন। বীরেশ্বরকে বিয়ে না-করার যুক্তি হিসেবে এটাও হয়তো তাকে বলে থাকবেন তিনি।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর, প্রায় আত্মগতভাবে বললেন, “সম্ভবত বলেছিলেন। আর তখনই হয়তো বীরেশ্বর ঠিক করে যে, জানকীকে সে খুন করবে। সে ধরে নেয়, জানকী মারা না-গেলে বেলা দেবী ওকে বিয়ে করবেন না। সম্ভবত একই কারণে, পরে কখনও দাশুকেও ও খুন করতে পারত। যা-ই হোক, এ ছাড়া তো এই খুনের অন্য-কোনও মোটিভ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু বীরেশ্বরই যে খুনি, এটা আপনি প্রথম কখন বুঝলেন?”
“বুঝিনি তো, আন্দাজ করেছিলুম।”
কৌশিক বলল, “আন্দাজটাই বা কখন করলে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বীরেশ্বর তো গত রবিবার প্রথম আমার কাছে এসেছিল। এসে বলে যে, জানকী ঘোষকে সে নিজের চোখে খুন হতে দেখেছে। তবে জানকীকে নয়, তাকে খুন করাই নাকি ছিল উদ্দেশ্য।”
“তাতেই তুমি ধরে নিলে যে, সে-ই খুনি?”
“না রে কৌশিক,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তা কেন ধরে নেব? সত্যি বলতে কী, খুনের কথা বলতে গিয়ে এমন একটা কথা সে বলেছিল, যার তাৎপর্য তখন আমি ধরতে পারিনি। সেটা পারলুম সিকিমে পৌঁছবার পরদিন। তাও পারলুম সদানন্দবাবুর একটা কথা শুনে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “সে কী, আমি আবার কী বললুম?”
“নামচি থেকে রানিপুল যাবার পথে এক জায়গায় হলুদ রঙের ফুল দেখেছিলুম, মনে পড়ে?”
“তা পড়ে।”
“ফুলের ভিতর থেকে হঠাৎ একঝাঁক হলুদ প্রজাপতিকে উড়ে যেতে দেখে আপনি বলেছিলেন যে, প্রজাপতিগুলো যে ওই ফুলের মধ্যেই ছিল, তা তো বোঝাই যায়নি। বাস্, সঙ্গে-সঙ্গে বীরেশ্বরের একটা কথা আমার মনে পড়ে যায়।”
বললুম, “কী বলেছিল বীরেশ্বর?”
“যা বলেছিল, সে তো আমাদের সকলের সামনেই বলেছিল। কিন্তু ঠিক তক্ষুনি তার তাৎপর্য আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। বীরেশ্বর বলেছিল, গুলির শব্দ হবার পরেই জানকী ঘোষ বুকের বাঁ দিকটা চেপে ধরে মাটির উপরে লুটিয়ে পড়েন। এটা দেখে সে বেঞ্চি থেকে উঠে জানকীবাবুর দিকে ছুটে যায়। যেতে-যেতে লক্ষ করে, জানকীর কার্ডিগানটা রক্তে ভিজে গেছে। …মনে পড়ছে?”
কৌশিক বলল, “তা পড়ছে, কিন্তু এর থেকে তুমি কী বুঝলে?”
“বুঝলুম যে, এটা মিথ্যে কথা। …ওরে, হলুদ প্রজাপতিকে ফুল থেকে আলাদা করে দেখা যায়নি কেন? এইজন্যে যায়নি যে, ফুলগুলির রংও হলুদ। আর তা-ই যদি হয় তো লাল কার্ডিগান যে রক্তে ভিজে গেছে, এটাই বা বীরেশ্বর দেখল কী করে। তাও দূর থেকে ছুটে যেতে-যেতে? ওরে, রক্তের রংও যে লাল!”
শোভন চৌধুরি বললেন, “রাইট! অ্যাবসলুটলি রাইট!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা বুঝবার সঙ্গে-সঙ্গেই আমার মনে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, বীরেশ্বর মিথ্যে কথা বলছে কেন? আমার মনে একটা ভুল ধারণা জাগিয়ে দিয়ে সে কি খুনিকে আড়াল করতে চাইছে? নাকি সে নিজেই খুনি?”
সদানন্দবাবু বললেন, “বুঝলুম। কিন্তু আর-একটা কথা জিজ্ঞেস করি। সুটকেসের মধ্যে যে রিভলভার আছে, এটাও কি আপনি বুঝতে পেরেছিলেন?”
“বুঝতে পেরেছিলুম বললে বাড়িয়ে বলা হবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসলে এটাও আন্দাজ। ফ্ল্যাট থেকে বেরোবার সঙ্গে-সঙ্গেই বীরেশ্বরের হাত থেকে সুটকেসটা আমি নিয়ে নিই। তার পরেই ওটা তুলে দিই কৌশিকের হাতে। …কী রে কৌশিক, তোর কিছু মনে হয়নি?”
কৌশিক বলল, “কই, না তো।”
“মনে হওয়া উচিত ছিল। শুধু জামাকাপড় আর কিছু কাগজপত্তর থাকলে কি একটা সুটকেস অত ভারী হতে পারে?”
“তাই তুমি ধরে নিলে যে, সুটকেসের মধ্যে রিভলভার রয়েছে?”
“না রে কৌশিক, তা আমি ধরে নিইনি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফ্ল্যাটে ঢুকবার জন্যে বীরেশ্বর যে-রকম ঝুলোঝুলি করছিল, তাতে আমার সন্দেহ হয়েছিল যে, নেহাত জামাকাপড় নয়, কাগজপত্তর কি চেক-বইও নয়, অন্য এমন-কিছু ওই ফ্ল্যাটের মধ্যে রয়েছে যা সে বার করে আনতে চায়। তবে সেটা যে মার্ডার-ওয়েপন; অতটা আমি আন্দাজ করিনি।”
হাতঘড়ি দেখে শোভন চৌধুরি বললেন, “দশটা বাজে। এবারে আমাকে উঠতেই হচ্ছে। আপনারাও তো উঠবেন, তাই না?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তুমি এগোও, আমরা আর-একটু পরে উঠব।”
শোভন চৌধুরি বেরিয়ে গেলেন। খানিকক্ষণ কোনও কথা হল না। তারপর ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি আমাকে যে-কাজ দিয়েছিলেন, সেটা শেষ হয়েছে, মিসেস ঘোষ। এরপরে যা করার, তা পুলিশ করবে। আমার আর কিছু করবার নেই। কিন্তু যাবার আগে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। বলব?”
“বলুন।”
“দাশুকে নিয়ে আমার কোনও ভাবনা নেই। আপনার চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় সে আর কোথাও পাবে না। কিন্তু দু’জনকে নিয়ে আমার একটু ভাবনা রয়ে গেল।”
“কোন দু’জনকে নিয়ে?”
“বেলা দেবীকে নিয়ে, আর তেজবাহাদুরকে নিয়ে। আপনি যদি না কিছু করেন তো ওরা ভেসে যাবে।”
“কী করতে পারি?” ফুলকুমারী ম্লান হাসলেন। “বেলাকে আমি ফিরিয়ে নিতে পারি ঠিকই, কিন্তু দাশু তো জানে তার মা বেঁচে নেই। তার কথাটাও ভাবুন। বেলা ফিরে এলে কি একটা সমস্যার সৃষ্টি হবে না?”
“বেলা দেবী যে ওর মা, দাশুকে তা জানাবার দরকার কী?”
“তা ঠিক। দেখি কী করা যায়।”
“আর তেজবাহাদুর? তার সম্পর্কে কী করবেন?”
“ওটাও ভেবে দেখতে হবে।” ফুলকুমারী বললেন, “টাকা-পয়সাটা কোনও ব্যাপার নয়, কিন্তু তাতে তো ওর সমস্যা মিটবে না, বরং বেড়েই যাবে। তবে হ্যাঁ, রানিপুলের বাড়িটা ওকে আমি বেচতে দিচ্ছি না।”
“যা ওর পৈতৃক সম্পত্তি, সেটা কি দিয়ে দেবেন?”
“পুরোটা দেব না। বেন্-এর সম্পত্তি তো আমি পেয়েছি। বড়জোর তার অর্ধেকটা ওকে দেব। বাকি অর্ধেক দাশু পাবে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ফুলকুমারী। তারপর একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “তেজকে বোধহয় আমার কাছে রাখলেই ভাল হত। দিদির আদরে তা হলে ওর মাথা বিগড়ে যেত না। দিদিও আমার কথা ভেবে বিয়ে করল না, এ-দিকে তেজটাও উচ্ছন্নে গেল!”
ভাদুড়িমশাই উঠে পড়লেন। বললেন, “আজ তা হলে চলি। কিন্তু একটা কথা বলে যাই। বেলা দেবী আর তেজবাহাদুর সম্পর্কে যা-কিছুই করুন, একটু তাড়াতাড়ি করলে ভাল হয়। আপনি বুদ্ধিমতী মহিলা, কী করবেন সেটা ঠিক করে নিতে আপনার দেরি হবে কেন।”
ঘর থেকে আমরা বেরিয়ে এলুম। বাগান পেরিয়ে, রাস্তায় নেমে গাড়িতে উঠবার আগে একবার পিছন ফিরে তাকিয়েছিলুম। দেখলুম ফুলকুমারী বারান্দায় স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। যেন মানুষ নন, সাদা পাথরের একটা মূর্তি।
রচনাকাল : ১৪০২
