একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১)

রবিবারের সকাল। ন’টা না বাজতেই আমি আর সদানন্দবাবু আজ অরুণ সান্যালের কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে এসে হাজিরা দিয়েছি। তবে আড্ডা তেমন জমছে না। তার কারণ, ব্যাঙ্গালোর থেকে যে কাজটা নিয়ে ভাদুড়িমশাই এবারে কলকাতায় এসেছিলেন, সেটা শেষ হয়েছে বটে, কিন্তু কাজ শেষ হবার পরে ক্লায়েন্টের হাতে তো তার একটা রিপোর্ট তুলে দিতে হয়, ড্রয়িং রুমের এককোণে যে ছোট্ট একটা রাইটিং টেবিল আর চেয়ার রয়েছে, সেইখানে বসে ভাদুড়িমশাই চুপচাপ সেই রিপোর্টটা লিখে যাচ্ছেন। তাঁর মুখ আপাতত দেয়ালের দিকে, ফলে কথা বলতে আমরা কেউই খুব-একটা উৎসাহ পাচ্ছি না।

অরুণ সান্যাল একটি মেডিক্যাল জার্নালের পাতা ওলটাচ্ছেন, আমি ‘সানডে’র পাতায় মাতঙ্গ সিং অর্থাৎ বেহারি যে সাংসদটিকে সদ্য আমাদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ঢোকানো হল তাঁর প্রোফাইলটির উপরে চোখ বোলাচ্ছি, কৌশিক পড়ছে খবরের কাগজের খেলার পাতা, আর সদানন্দবাবু অনেকক্ষণ ধরেই উশখুশ করছেন বটে, তা ছাড়া এক-আধ মিনিট অন্তর অন্তর গলা খাঁকরে এটা বুঝিয়েও দিচ্ছেন যে, এ-রকম নৈঃশব্দ্য তাঁর খুবই অপছন্দের ব্যাপার, কিন্তু মুখ খুলছেন না তিনিও

মুখ কৌশিকই প্রথম খুলল। খবরের কাগজখানাকে ভাঁজ করে সরিয়ে রেখে বলল, “কোনও মানে হয়?”

মেডিক্যাল জার্নাল থেকে মুখ না-তুলে অরুণ সান্যাল বললেন, “কীসের?”

“কীসের আবার, আমাদের ময়দানি কাণ্ডকারখানার। অ্যাবসলুটলি মিনিংলেস। পাঁচ লাখ টাকা অফার করা হয়েছিল, তাও নাকি লোকটা থাকবে না। ভাবা যায়?”

অরুণ সান্যাল এবারেও মুখ তুললেন না। জার্নালের পাতায় চোখ রেখেই বললেন, “কেউ হয়তো ছ’লাখের অফার দিয়েছে।”

সদানন্দবাবু আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বললেন, “ব্যাপারটা কী বলুন তো, এত সব লাখ-লাখ টাকা কীসের জন্যে?”

“কেন, ফুটবলের জন্যে।” কৌশিক বলল, “বড় ক্লাবের জার্সি গায়ে যারা মাঠে নামবে, দু-পাঁচ লাখের কমে কি তাদের সঙ্গে কথা কওয়া যায় নাকি?”

“অ্যা, বলো কী হে, ফুটবল খেলার জন্যে এরা টাকা পায়?”

ভাদুড়িমশাইয়ের রিপোর্ট লেখা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেটাকে ভাঁজ করে একটা ম্যানিলা এনভেলাপের মধ্যে ঢোকাতে-ঢোকাতে চেয়ারখানাকে আমাদের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে তিনি বললেন, “আগে পেত না, কিন্তু এখন পায়। ইউরোপ আর ল্যাটিন আমেরিকায় কোটি-কোটি টাকা পায়, এরা সেখানে লাখ-লাখ পাচ্ছে। তা পাক না, তাতে আপনার আপত্তি কীসের?”

“আপত্তি হবে না?” অবাক হয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সদানন্দবাবু। তারপর বাঁ হাতের তালুতে ডান হাতের একটা ঘুসি মেরে বললেন, “একশোবার হবে। ইন ফ্যাক্ট, দু’পাঁচ লাখের বদলে এদের যদি দু-পাঁচ হাজারও দেওয়া হত, তাতেও আমি আপত্তি করতুম। …দাঁড়ান, দাঁড়ান, আগে তো এ-সব জানতুম না, কিন্তু এখন যকন জেনিচি, তখন এই নিয়ে আমি কাগজে চিঠি লিখব। তাতে কী বলব জানেন? বলব যে, দে শুড নট বি পেড এ সিঙ্গল ফার্দিং!”

কৌশিক বলল, “এটা আপনার কেমন যুক্তি হল জ্যাঠামশাই? টিকিট কেটে লোকে এদের খেলা দেখছে, আর আপনি এদের টাকা দেবেন না?”

মেডিক্যাল জার্নালের পাতা ওলটানো শেষ হয়েছিল। হাত থেকে সেটা নামিয়ে রেখে অরুণ সান্যাল বললেন, “তা হলে এরা খেলবে কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সকলের না হোক, খেলাটা যে এদের অনেকেরই রুজি-রোজগারের উপায়, বলতে গেলে একমাত্র সোর্স অব ইনকাম, সেটা তো আর ভুলে যাওয়া চলে না?”

তিন দিক থেকে প্রশ্ন ছুটে এল, কিন্তু তাতেও সদানন্দবাবু দমলেন না। বললেন, “রুজি-রোজগারের অন্য কোনও ব্যবস্থা করে নিলেই তো হয়। অনেকেই তো চাকরি-বাকরি করচে বলে শুনতে পাই। আর যাদের চাকরি নেই, তারা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ছিট-কাপড়ের দোকান দিক।”

কৌশিক বলল, “ওরে বাবা, ব্যাবসার ওরা বোঝে কী? দোকানে দু’দিনে লালবাতি জ্বলবে। তার চাইতে বরং খেলাটা যখন জানে, তখন খেলতে দিন।”

“খেলা?” সদানন্দবাবু নাক সিঁটকে বললেন, “আরে ছ্যাছ্যা, টিভিতে মাঝেমধ্যে দেখি তো, তা এ যা হচ্ছে, একে তো খেলা বলতে ঘেন্না হয় হে! খেলা যা দেখবার, সে আমরা দেখে নিইচি। তার পাশে এ তো ছেলেখেলা!”

অরুণ সান্যাল বললেন, “কার পাশে? মানে আপনি যা বলছেন, তার থেকে তো কনট্রাস্টটা ঠিক ক্লিয়ার হচ্ছে না। একটু বুঝিয়ে বলবেন বোসদা?”

কথাটার স্পষ্ট কোনও উত্তর না দিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “ওঃ, সে যা একটা দিন গেচে, ভাবতেও এখন গায়ে কাঁটা দেয়, মশাই। ব্যাপারটা একবার কল্পনা করুন তো। ওরে বাপ রে বাপ্, হুমদো-হুমদো সায়েবগুলো সব বুট বাগিয়ে চাদ্দিক থেকে ঘিরে ধরেচে, আর তারই মদ্দিখান থেকে শাঁ করে বেরিয়ে গিয়ে বলটাকে শিবে তার ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিলে! কী বলব মশাই, বলের গায়ে যেন অ্যাড্রেসটা একেবারে লিখে দিয়েছিল! শিবে যেমন ঝপ্ করে বল বাড়াল, বিজেও তেমনি খপ্ করে ধরল সেটাকে। ধরেই লাইন-বরাবর ছুটতে লাগল। তাকে আটকাবে কী, কাণ্ড দেখে সায়েবরা তো হতভম্ব!”

কৌশিক বলল, “সবই তো বুঝলুম জ্যাঠামশাই, কিন্তু আপনার এই শিবেটাই বা কে, আর তার ভাই বিজেটাই বা কে, সেটা তো ঠিক বুঝতে পারলুম না!”

“কী করে বুঝবে!” সদানন্দবাবু খুবই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাঁর হাতের পাতা উলটে বললেন, “তোমরা হচ্চ এ-কালের ছেলে, যদি বলতুম আনচেরি কি বাইচুং ভুটিয়া, তা হলে ঠিকই বুঝতে পারতে। আরে, শিবে আর বিজে হচ্চে দু’ভাই, দুটোয় মিলে সেদিন ষাঁড়ের ডালনা-খাওয়া সায়েবগুলোর মুকে একেবারে ঝামা ঘষে দিয়েছিল!”

অরুণ সান্যাল বললেন, “আপনি কি শিবদাস ভাদুড়ি আর তাঁর ভাইয়ের কথা বলছেন নাকি?”

সদানন্দবাবু বললেন, “যাক, আপনি অন্তত ধরতে পেরেচেন। কী কিক্, কী পাসিং, কী হেড, কী ঝট্‌কা, কী ড্রিবলিং! উঃ, দু’ভাই মিলে লালমুখোদের সেদিন কী নাচানটাই না নাচালে!”

কৌশিক বলল, “আপনি কি নাইনটিন ইলেভেনের কথা বলছেন? আই মিন মোহনবাগান যেবারে ইস্ট ইয়র্ককে হারিয়ে শিল্ড পেয়েছিল?”

“অফ কোর্স!”

“আপনি সে-খেলা দেখেছেন?”

সদানন্দবাবু বিমল হাসলেন। “দেকিচি বই কী বাবা। শুধু আমি কেন, তখন তো আর টিভি ছিল না, ঘরে বসে খেলা দেখবে কী করে, কলকাতার আদ্ধেক মানুষই জয়ঢাক রামশিঙে আর কাঁসর-ঘন্টা নিয়ে সেদিন ময়দানে গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে ছিল। শুধু কি তা-ই? শয়ে শয়ে মানুষ কালীঘাটে গিয়ে জোড়া-পাঁটা মানত করে এসেচিল হে!”

ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ একটিও কথা বলেননি, শুধু মিটিমিটি হাসছিলেন। এবারে বললেন, “আপনিও জোড়া-পাঁটা মানত করেছিলেন নাকি?”

সদানন্দবাবু বললেন, “মিচে কথা কইব না মশাই, তা আমি করিনি। তবে হ্যাঁ, যতক্ষণ মাঠে ছিলুম, একমনে মা-দুগ্গার নাম জপ করিচি। বলিচি, ‘হে মা দুগ্গা, এই সায়েব-ব্যাটাদের আম্বা আর সত্যি হয় না, এক ওই আমাদের আপিসের বড়সায়েব ছাড়া বাদবাকি সব ক’টার খোঁতামুখ ভোঁতা করে দাও মা।’ তা মা যে সেদিন মুখ তুলে চেয়েছিলেন, সেটা মানতেই হবে।”

“তা খেলা কেমন দেখলেন?”

“সেই কথাই তো বলছিলুম।” সদানন্দবাবু বললেন, “অবিশ্যি যা দেকলুম, তাকে খেলা বললে তো কিছুই বলা হয় না। উরেব্বাপরে বাপ, খেলা তো নয়, ইট ওয়াজ দি ব্যাট্ল অফ হলদিঘাট। সে যাকে বলে বাঘ-সিঙ্গির লড়াই! এখনও যেন চোখের সামনে ভাসচে!”

কৌশিক বলল, “একটা কথা বলব জ্যাঠামশাই?”

“বলো।”

“তখন আপনার বয়েস কত?”

“তা এই ধরো বছর কুড়ি।”

“তা হলে তো একটা হিসেবের গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে।”

“কেন, কেন?”

কৌশিক হেসে বলল, “নাইনটিন ইলেভেনে আপনার বয়েস ছিল কুড়ি বছর। সেই হিসেবে এই নাইনটিন নাইনটিফাইভে আপনার বয়েস কিন্তু একশো চার বছর হয়ে যাবার কথা।”

শুনে আমতা-আমতা করে সদানন্দবাবু বললেন, “না, মানে কী জানো, খেলাটা যে আমিই দেখেছিলুম, তা নয়। তবে হ্যাঁ, আমার বাবা আর ন’মামা দেখেছিলেন তো, তাঁদের কাচে যা শুনিচি, সে একেবারে ভিভিড ডেসক্রিপশান।”

“আর সেই শোনা কথার উপরে নির্ভর করে আপনি বলছেন যে, খেলাটা আপনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন? ছিঃ জ্যাঠামশাই, এটা কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?”

এর উত্তরেও সদানন্দবাবু কিছু একটা বলতেন নিশ্চয়, কিন্তু সেটা আর আমাদের শোনা হল না, কেন না ঠিক সেই মুহূর্তেই ডোর-বেল বেজে উঠল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *