এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

রোবোটের দাম্পত্য জীবন

একঘণ্টা পরে লেকভিলার সামনে অরিজিৎ লাহিড়ীর শাদা ফিয়াট গাড়িটা থামল। কর্নেল ফুটপাতে নেমে প্রথমে বাড়ির উচ্চতা এবং তারপর চারপাশটা দেখে নিয়ে বললেন, যে বাড়ির নাম দেওয়া উচিত ছিল খাপছাড়া, তার নাম লেকভিলা। অরিজিৎ, নাম জিনিসটার চেয়ে বিভ্রান্তিকর আর কিছু নেই।

 

অরিজিৎ গাড়ির চাবি এঁটে গেটের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, আপনি পাশেই লেক দেখার আশা করেছিলেন কি? দেখা যায়–চারতলা অব্দি উঠলে। তবে এর স্থাপত্যের প্রশংসা করা উচিত।

 

প্রশংসার কিছু দেখছি না। কর্নেল একটু হাসলেন। কিপলিং এই মেট্রপলিসের একটা পর্যায়ে পভার্টি অ্যান্ড প্রাইড সাইড বাই সাইড দেখেছিলেন। আমরা এখন দেখছি দ্বিতীয় পর্যায়। কিপলিংয়ের মাথা ঘুরে যেত নির্লজ্জতা দেখে।

 

নিচের তলাটা গ্যারেজ। মৃগাঙ্কের সঙ্গে কর্নেলের ফ্ল্যাট থেকে ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার সময় অরিজিৎ নিশ্চিত হয়েছেন, বিদ্যুৎ বারোটা অব্দি থাকবে। অটোমেটিক লিফট তরতর করে উঠছিল। অরিজিৎ কর্নেলের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। বললেন, আপনি বাড়িটা দেখে রিক্ত হয়েছেন মনে হচ্ছে!

 

হয়েছি বলতে পারো ডার্লিং!

 

কারণ?

 

প্রথম কথা লেকভিলা নামটা, তারপর–স্কুল প্রয়োজন যখন সৌন্দর্যের ভান করে, তখন আসলে তা আরও কুৎসিত হয়ে ওঠে। এসথেটিকস সম্পর্কে আমার ধারণা স্বতন্ত্র।

 

সাততলায় লিফট থেকে নেমে চোখে পড়ল সামনেই ফ্ল্যাট তিন। কলিং বেল টেপার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। মৃগাঙ্ক প্রতীক্ষা করছিল।

 

ডাইনিং-কাম-ড্রয়িংরুমে সোফায় ওঁদের বসিয়ে সে বলল, আপনারা আসছেন বলে আমি থানায় এখনও জানাইনি। কিছুক্ষণ আগে মিঃ লাহিড়ীর ফোন পাবার পর আবিষ্কার করেছি ঊর্মির ছোট্ট স্যুটকেসটা নেই। ওই র‍্যাকের তলায় ছিল ওটা। কাল রাত্তিরেও দেখেছি।

 

অরিজিৎ বললেন, কী ছিল স্যুটকেসে?

 

জানি না। বিয়ের কিছুদিন পরে ঊর্মিকে নিয়ে সেতাপগঞ্জ গিয়েছিলুম। আসার সময় ও সুটকেশটা নিয়ে এসেছিল। আমি জানতে চাইনি কিছু।

 

আজ ঘুম থেকে ওঠার পর আপনি কি বেরিয়েছিলেন?

 

সাড়ে আটটায় একটা জরুরি চিঠি পোস্ট করতে গিয়েছিলাম। ডাকবাক্স বাড়ির সামনেই ফুটপাতে আছে। কারেন্ট ছিল। বড়জোর মিনিট পাঁচেকের বেশি বাইরে ছিলুম না। ঊর্মির ডুপ্লিকেট চাবিটাও আলমারির লকারে আছে।

 

ফ্ল্যাটে কে ছিল তখন?

 

কেউ না। কাজের মেয়েটি ঊর্মি মার্ডার হবার পর এসে বলে গেছে আর আসবে না। তার দরকারও হত না। আমি বাইরে খেতেই অভ্যস্ত বরাবর। শুধু চা-ফা আর ব্রেকফাস্টটা।

 

কর্নেল আস্তে বললেন, ফ্ল্যাটের দরজায় চাবি এঁটে বেরিয়েছিলেন তো?

 

অবশ্যই। মৃগাঙ্কের মুখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল। সে উঠে দাঁড়াল। বসুন, আসছি। বলে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল।

 

কর্নেল তাকে দেখছিলেন। লম্বা, একটু রোগা, ফর্সা চেহারা মৃগাঙ্কের। নাকটা বেশ বড়ো, চাচা গাল, চিবুক সংকীর্ণ। চোখে কড়া পাওয়ারের স্টিল ফ্রেমের চশমা। কিন্তু রোগা হলেও মোটা শক্ত হাড়ের কাঠামো। আঙুলগুলো লম্বাটে আর মোটা। ঠোঁটের কোনায় সূক্ষ্ম একটা ভাজে আত্মবিশ্বাসের ছাপ আছে। কর্নেল অনুমান করছিলেন, একসময় খুব লড়াই করে জিতে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গি আছে যেন ওর ব্যক্তিত্বে।

 

কর্নেল অরিজিৎকে মৃদু স্বরে বললেন, তোমরা ঊর্মির জিনিসপত্র সার্চ করোনি?

 

অরিজিৎ মাথা দোলালেন। ওঁর কিছু চিঠিপত্র চেয়েছিলাম মৃগাঙ্কবাবুকে। সবই আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের চিঠি। বন্ধুদের মধ্যে কোনো পুরুষমানুষের চিঠি দেখিনি। তারপর একটু হেসে বললেন, কোনো কু পাইনি এটুকু বলতে পারি।

 

এ বাড়িতে ফ্ল্যাটের সংখ্যা কত?

 

নিচের ফ্লোরে গ্যারেজ। দারোয়ান আর কোঅপারেটিভ আপিসের গোটা তিনেক ঘর আছে। বাকি নটা ফ্লোরে সাতাশটা ফ্ল্যাট। দুটো এখনও খালি। বাকি পঁচিশটা ভর্তি। মৃগাঙ্কবাবুকে বাদ দিলে চব্বিশজনের নামধাম পেশা এসব তথ্য আমরা জেনেছি।

 

কোঅপারেটিভের কর্মচারী কজন?

 

দুজন। একজন ক্লার্ক, একজন পিওন। সেক্রেটারির নাম দুলাল গুপ্ত! থার্ড ফ্লোরে দুনম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন। তিনিই এই হাউসিং কোঅপারেটিভের প্রধান উদ্যোক্তা।

 

মৃগাঙ্ক ঝটপট চা করে আনল। তারপর বসে বলল, বলল, এঁকে চিনতে পারলাম না–

 

অরিজিৎ বললেন, সরি। ইনি আমার ফ্রেন্ড ফিলসফার অ্যান্ড গাইড বলতে পারেন। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

 

মৃগাঙ্ক জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে নমস্কার করল। কর্নেল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, বাঃ! অপূর্ব!

 

মৃগাঙ্ক একটু হাসল। কিছু কিছু ব্যাপারে আমি এখনও স্বাবলম্বী। পুরনো অভ্যাস আর কী! যেমন চা করা। নিজের হাতের চা না হয়ে আমার তৃপ্তি হয় না। তবে বুঝতেই পারছেন, যে কারবারে আছি, ক্রমশ সব শৌখিনতা ছাড়তে হয়েছে। ছুটোছুটি দৌড়ঝাঁপ সারাক্ষণ। আপনারা না এলে আমি এতক্ষণ বেরিয়ে যেতাম।

 

গাঙ্কের চেহারায় শোকের ছাপ এরই মধ্যে মুছে গেছে। হয়তো ভেতরে রেখে দিয়েছে শোকটাকে। কর্নেল তাকে দেখছিলেন। যত দেখছিলেন, তত একটা চরিত্রের আদল স্পষ্ট হচ্ছিল। ছত্রিশ-সাঁইত্রিশের মধ্যে বয়স। এখনই এমন পরিণত শক্তির আভাস সচরাচর আশা করা কঠিন। লড়াই করেছে, ঘা খেয়েছে। হয়তো বিস্তর। কিন্তু প্রেম করে পাওয়া বউয়ের এমন ভয়ঙ্কর মৃত্যুর ধাক্কা সামলানো সহজ কি? অথচ ওর মুখে নির্বিকার উদাসীন ওই ভাব। ঊর্মির স্যুটকেসটা এমন অদ্ভুতভাবে চুরি যাওয়াতেও তত বিচলিত নয়। হুঁ, সব কিছুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে দেরি করে না এমন এক চরিত্র মৃগাঙ্ক ব্যানার্জি।

 

অরিজিৎ চুপ করে আছেন। কারণ কথা বলার কথা কর্নেলেরই। মৃগাঙ্ক চায়ের কাপে চোখ রেখে কিছু ভাবছে। কর্নেল তার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পরিবেশটা আবার দেখে নিলেন। কোথাও বিলাসিতার চিহ্ন নেই। একালীন রুচি হয়তো আছে। ছবি, ভাস্কর্য এসব বলতে যৎকিঞ্চিৎ। সোফার অংশে সাধারণ একটা কার্পেট। এই ঘরের ঘরণী সম্পর্কেও প্রশ্ন জাগে! সাজিয়ে নিতে জানার মতো শিক্ষা বা রুচি কি তারও ছিল না? নাকি মনের ভেতর অনিচ্ছা, বিদ্রোহ বা ঘৃণা ছিল? অথচ নাকি প্রেম করে বিয়ে!

 

কর্নেল বললেন, আপনার শ্বশুর রুদ্রেন্দুবাবুও একইভাবে খুন হয়েছিলেন, তাই না মৃগাঙ্কবাবু?

 

মৃগাঙ্ক সোজা হয়ে বসল। হ্যাঁ। সেজন্যই আমি মিঃ লাহিড়ীদের বলেছি এর পেছনে কোনো পারিবারিক প্রতিহিংসার ব্যাপার আছে। অশ্রদ্ধা মনে হবে, কিন্তু আমি ফ্যাক্টস বলছি–শ্বশুরমশাই মোটেও ভালমানুষ ছিলেন না। না– আমার সঙ্গে ওঁর মেয়ের বিয়েতে রাজি ছিলেন না বলেও বলছি না। খুব উদ্ধত রাগী প্রকৃতির লোক ছিলেন। জমিদারবংশের ব্যাপার আর কী! কোন যুগে কী সব ছিল-টিল, তারই দেমাক। তাছাড়া এলাকায় ওঁর সুনামও ছিল না। মামলাবাজ ছিলেন ভীষণ। অবশ্য আমি বিয়ের পর ঊর্মির তাগিদেই মাত্র একবার গেছি। তখন উনি পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী। আমার সঙ্গে একটা কথাও বলেননি।

 

মৃগাঙ্ক একটা শ্বাস ছেড়ে চুপ করল। কর্নেল বললেন, ঊর্মিদেবীর সঙ্গে আপনার আলাপ কীভাবে?

 

শ্যামবাজারে আমার এক বন্ধুর বোনের বিয়েতে গিয়েছিলাম। সেখানেই ওর সঙ্গে আলাপ হয়।

 

কেউ আলাপ করিয়ে দিয়েছিল নাকি…

 

মৃগাঙ্ক মুখ নামিয়ে কথা বলছিল। আস্তে বলল, হ্যাঁ। আমার আরেক বন্ধু হিমাদ্রি রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল ঊর্মির। হিমাদ্রিই আলাপ করিয়ে দেয়। হিমাদ্রিও সেতাপগঞ্জের ছেলে, সেদিনই জানতে পেরেছিলাম।

 

হিমাদ্রিবাবু কোথায় থাকেন?

 

সাউদার্ন এভেনিউতে। ওর বাসায় কখনও যাইনি। নাম্বারও জানি না।

 

কী করেন?

 

কোল ইন্ডিয়া অফিসে পার্সোনেল ডিপার্টের অফিসার।

 

ঊর্মিদেবী খুন হওয়ার পর আপনার বন্ধুরা নিশ্চয় এসেছিলেন আপনার কাছে?

 

মৃগাঙ্ক একটু হাসবার ভঙ্গি করে মাথাটা দোলাল। সত্যি বলতে কী, আমার সে অর্থে কোনো বন্ধুই নেই। জাস্ট কাজকর্মের সূত্রে পরিচয়। তারপর একটুখানি মেলামেশা বড়জোর। আসলে কোনোরকম সামাজিকতা বা মেলামেশার মতো অঢেল সময় আমি পাই না। সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয়।

 

হিমাদ্রিবাবুর দেশের মেয়ে ছিলেন ঊর্মি?

 

হ্যাঁ প্রতিবেশী ছিল। তবে হিমাদ্রিরা নাকি চলে এসেছিল ওখান থেকে বাড়ি-টাড়ি বেচে দিয়ে।

 

হিমাদ্রিবাবু আসেননি বলছেন?

 

না। সেটাই একটু অবাক লাগছিল। পরশু ওর অফিসে তাই ফোন। করেছিলাম। শুনলাম ছুটিতে আছে। বাইরে কোথায় গেছে নাকি।

 

হিমাদ্রিবাবু এ ফ্ল্যাটে এসেছেন কখনও?

 

বিয়ের পর বউভাতের দিন এসেছিল। তার মানে, একবছর আগে। মৃগাঙ্ক সিগারেট অফার করল প্রথমে অরিজিৎকে। অরিজিৎ নিলেন। কর্নেল থ্যাংকস, বলে পকেট থেকে চুরুটের কৌটো বের করলেন।

 

চুরুট ধরিয়ে বললেন, আপনার শ্বশুর খুন হবার খবর পেয়েও আপনি যাননি সেতাপগঞ্জ?

 

সময় পাইনি। ঊর্মি গিয়েছিল ওর মামার সঙ্গে।

 

তিনি তো ভবানীপুরে থাকেন?

 

অরিজিৎ বললেন, এখান থেকে আমরা ওঁর কাছে যাব। ওঁর নাম বনবিহারী চক্রবর্তী।

 

মৃগাঙ্ক বলল, ঊর্মির মামা অসাধারণ মানুষ। ঊর্মি হয়তো শেষ পর্যন্ত বিয়েতে রাজি হত না–অন্তত আমার সেটাই মনে হয়েছিল ওর মতিগতি দেখে। উনি ওকে রাজি করান। আসলে ঊর্মির দ্বিধার কারণ হল ওরা তিন বোন, ভাই-টাই নেই। ও মেজ। বড় শ্রাবন্তীতার বিয়ে হয়নি এখনও। অদ্ভুত একটা অসুখে ভুগছে ছোটবেলা থেকে। ওখানকার লোকের ধারণা কোন দেবীর ভর হয়েছে–আমি জানি, ওটা হিস্টিরিয়া ছাড়া আর কিছু নয়।

 

কর্নেল চোখ বুজে শুনছিলেন। চোখ খুললেন। আপনি দেখেছেন তো?

 

দেখেছি। হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে। তারপর মাথা দোলাতে থাকে। বিড়বিড় করে কী-সব বলে। মাথামুণ্ডু কিছু বোঝা যায় না। বিশ-তিরিশ মিনিট পরে শুয়ে পড়ে। তারপর উঠে বসে। শ্রাবন্তী একটা প্রবলেম।

 

আপনার শাশুড়ি বেঁচে আছেন কি?

 

না। মৃগাঙ্ক সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে বলল, বছর সাতেক আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। ওদের ফ্যামিলিটা দেখে মনে হবে যেন অভিশপ্ত। বাড়ির পরিবেশও কেমন অস্বস্তিকর। আমি জাস্ট তিনটে দিন ছিলাম। আমার দম আটকে যাচ্ছিল। অতবড় একটা পুরনো বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে যেন পোড়োবাড়ি।

 

ঊর্মির ছোট বোনের নাম কী?

 

অপালা। ওদের মধ্যে বয়সের ফারাক বেশি নয়। ঊর্মির বাইশ ছিল। শ্রাবন্তীর চব্বিশ। আর অপালার উনিশ। মৃগাঙ্ক একটু পরে ফের বলল, ঊর্মির মামার কাছে ওদের বাড়ির কথা সামান্যই শুনেছি। ঊর্মি কোনো কথা বলতে চাইত না। এড়িয়ে যেত। নিজের ফ্যামিলি সম্পর্কে ওর কেমন একটা যেন আড়ষ্টতা ছিল।

 

শ্রাবন্তী, অপালা–এসেছিলেন তো বোনের মৃত্যুর খবর পেয়ে?

 

অপালা এসেছিল। ওর মামার কাছে উঠেছিল। মামার সঙ্গে এসেছিল। আধঘণ্টা থেকেই চলে গেল।

 

কান্নাকাটি করছিল খুব?

 

মৃগাঙ্ক শক্ত মুখে বলল, ওরা সত্যি অদ্ভুত প্রাণী–আপনি ক্ষমা করবেন কর্নেল সরকার! আমার।

 

কর্নেল ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, বলুন!

 

আমার ভুল হয়েছিল ডিসিশন নিতে!

 

বিয়ের?

 

আবার কিসের? মৃগাঙ্কের মুখের রেখা বিকৃত দেখাল। ওরা তিন বোনই কমবেশি অ্যাবনর্মাল-বাবার মতোই।

 

কথাটা সম্ভবত ঝোঁকের বশে বলেছে। তখনই সংযত হয়ে হাসবার চেষ্টা করল সে। অবশ্য ঊর্মি একটু অন্যরকম ছিল। বাইরে থেকে লেখাপড়া শেখার দরুনও হতে পারে সেটা, খানিকটা ইমোশনাল আর হঠকারী বুদ্ধির মেয়ে হলেও ওর মধ্যে সিভিলাইজড ম্যানার ছিল। শ্রাবন্তী তো স্কুলের গণ্ডি পার হয়নি-নাকি ওই অসুখের জন্য। আর অপালা কলেজে ভর্তি হয়েই পড়াশুনো ছেড়ে দেয়। ভীষণ প্রিমিটিভ টাইপ। দেখলে হিন্দুস্থানী মেয়ে মনে হবে।

 

অরিজিৎ হাসলেন। সম্ভবত বিহারের জলবায়ুর গুণ।

 

আই এগ্রি।

 

কর্নেল বললেন, বিয়ের পর এই একবছরে আপনার শ্যালিকারা কেউ আসেনি বোনের কাছে–মানে ঊর্মির মৃত্যুর পরে ছাড়া?

 

নাঃ।

 

মামার কাছে?

 

এসে থাকবে। জানি না।

 

আপনার শ্বশুরের আর্থিক অবস্থা কেমন?

 

মন্দ না। জমিজমা আছে কিছু। দেখাশুনো করার লোক আছে।…

 

কর্নেল একটু পরে বললেন, আপনি এ ফ্ল্যাট কিনেছেন কতদিন?

 

বছর দুই হল প্রায়। গোড়া থেকেই আমি অন্যতম প্রমোটার।

 

এর আগে কোথায় থাকতেন?

 

বেহালায়।

 

আপনার বাবা-মা বেঁচে আছেন?

 

না।

 

ভাইবোন?

 

আমি বাবা-মায়ের এক সন্তান। বাবা স্কুলটিচার ছিলেন।

 

ফোন বাজল। মৃগাঙ্ক উঠে গিয়ে ফোন ধরল। মৃদুস্বরে কথা বলে ফোন রেখে ফিরে এল সোফায়। ঘড়ি দেখে একটু হাসল সে। ডাক এসেছে। বেরুতে হবে। অবশ্য আর কিছু জানবার থাকলে জিগ্যেস করতে পারেন।

 

কর্নেল বললেন, আপনার তো এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের কারবার? কোথায় অফিস?

 

চৌরঙ্গীতে। সে উঠে গিয়ে একটা কার্ড এনে দিল কর্নেলকে।

 

আপনাকে তাহলে বেশির ভাগ সময় বাইরে কাটাতে হয়।

 

হয়। কখনও একসপ্তাহ বোম্বেতে কাটাতে হয়।

 

ঊর্মি একা থাকতেন ফ্ল্যাটে?

 

উপায় ছিল না। মৃগাঙ্ক গম্ভীর হল। অবশ্য ঊর্মি সাহসী মেয়ে ছিল– বেপরোয়াও বলা যায়।

 

একা থাকার জন্য অভিযোগ করতেন না ঊর্মি?

 

করত। কিন্তু উপায় ছিল না।

 

আপনার ফ্ল্যাট একবার দেখতে চাই। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর অরিজিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ডেডবডি কোথায় পড়ে ছিল, এবং সিগারেট লাইটারটা? তুমি দেখিয়ে দেবে অরিজিৎ! তবে আগে ফ্ল্যাটটা দেখে নিই।

 

মৃগাঙ্ক উঠল। আসুন! বলে সে বেডরুমে নিয়ে গেল প্রথমে।

 

কর্নেল একটু অবাক হলেন। দম্পতির শোবার ঘর বলে মনে হয় না। বিয়ের ছবি তো দূরের কথা, কোনো ফোটোই নেই। আসবাবপত্রও কিঞ্চিৎ। ড্রেসিং টেবিলে তত কিছু প্রসাধনসামগ্রী নেই। আশা করেছিলেন, আমদানি, রফতানির কারবারীর বউয়ের ড্রেসিং টেবিলে দেখবেন বিদেশী হরেক প্রসাধনদ্রব্য থরেবিথরে। ড্রয়ার টেনেও নিরাশ হলেন। মৃগাঙ্ক এগিয়ে নিজেই বাকি ড্রয়ারগুলো টেনে দেখাল। বলল, ঊর্মি সাজতে ভালবাসত না। কিছু এনে দিলে পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েদের বিলিয়ে দিত। শেষে আর কিছু আনতাম না।

 

অরিজিৎ খাটের মাথার দিকে মেঝে দেখিয়ে বললেন, লাইটারটা এখানে পড়েছিল।

 

কর্নেল মৃগাঙ্কের মুখের দিকে তাকালেন। মৃগাঙ্ক মুখ নামিয়ে আস্তে বলল আগেই বলেছি, আমার ডিসিশনে ভুল হয়েছিল। ঊর্মিকে আমি চিনতে পারিনি।

 

কর্নেল একটু হাসলেন। একটা লাইটার তত কিছু প্রমাণ করে না, যদি না আরও কোনো ফ্যাক্ট–

 

মৃগাঙ্ক কথা কেড়ে বলল, লাইটারটা আমি দেখেছি। জাপানি। অন্তত কুড়ি ডলার দাম।

 

এবাড়ির অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকেদের সঙ্গে আপনার স্ত্রীর আলাপ ছিল নিশ্চয়?

 

ছিল। অবশ্য এক ফ্ল্যাটের সঙ্গে অন্য ফ্ল্যাটের লোকেদের মধ্যে রেষারেষিও প্রচণ্ড। আলাপ আছে–ভাব নেই তত। ভদ্রতাটুকু। আর ঊর্মি তেমন আলাপী মেয়ে ছিল না। ওর আলাপের গণ্ডি ছিল লিমিটেড। পাশের দুনম্বর ফ্ল্যাটের রঞ্জনবাবুর স্ত্রী বা তার মেয়েরা, নাইনথ ফ্লোরের তিন নম্বর ফ্ল্যাটের পাঞ্জাবি ভদ্রলোকের বউ, আর থার্ড ফ্লোরের স্কুলমিস্ট্রেস মহিলা–এক নম্বর ফ্ল্যাটের। এর বাইরে কারুর সঙ্গে আলাপ থাকার কথা আমি জানি না। ঊর্মির কাছে শুনিনি অন্তত আর কারুর কথা।

 

কর্নেল অ্যাটাচড বাথরুমে উঁকি মেরে পাশের একটা ঘরে গেলেন। একেবারে খালি! এবার ড্রইং-কাম-ডাইনিং রুমের অন্য পাশের ঘরে উঁকি দিলেন। একটা স্টোর রুম, তার লাগোয়া কিচেন। পাশে একটা ছোট্ট সার্ভেন্টস রুম সম্ভবত সেটাও একেবারে খালি। দরজার পাশেই দ্বিতীয় বাথরুম। এটা অব্যবহৃত মনে। হল। আসলে টুরুম ফ্ল্যাট বলা যায়। ছোট ফ্যামিলির পক্ষে যথেষ্টই।

 

অরিজিৎ দরজার সামনে একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, এখানে ডেডবডি পড়েছিল। আশ্চর্য ব্যাপার, মেঝেয় যা একটু রক্ত পড়েছিল। খুব এক্সপার্ট হাতের কাজ।

 

কর্নেল বললেন, আপাতত এই। মৃগাঙ্কবাবু, আপনি এবার বেরুতে পারেন। অরিজিৎ, আমি একবার রঞ্জনবাবুর সঙ্গে কথা বলতেই চাই।

 

অরিজিৎ কিছু বলার আগে মৃগাঙ্ক বলল, ওঁকে এখন পাওয়া যাবে কি? এখন অফিসে থাকার কথা।

 

ওঁর স্ত্রী সঙ্গে কথা বলব বরং!

 

মৃগাঙ্ক বেরিয়ে দু নম্বর ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজাল। কর্নেল ও অরিজিৎ তার পেছন পেছন বেরিয়ে এলেন। দরজা একটু খুলে এক মহিলা কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করে কর্নেল ও অরিজিৎকে দেখে থমকে গেলেন। মৃগাঙ্ক বলল, রঞ্জনদা বেরিয়েছেন নাকি?

 

অনেকক্ষণ।

 

বউদি, এঁরা লালবাজার থেকে এসেছেন। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চান।

 

রঞ্জনবাবুর স্ত্রী বললেন, ভেতরে আসুন! এস মৃগাঙ্ক!

 

মৃগাঙ্ক বলল, আমি আর যাচ্ছি না বউদি। এখনই বেরুতে হবে। তারপর কর্নেল ও অরিজিতকে নমস্কার করে বিদায় জানিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে গেল। কর্নেল বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মৃগাঙ্ক যেন যন্ত্রমানুষ।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *