এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

উপসংহার

 

মাসদুই পরের কথা। কর্নেল এলিয়ট রোডে তার অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে বিকেলবেলায় সেতাপগঞ্জ থেকে সংগৃহীত একটা অর্কিডের পরিচর্যা করছিলেন। যষ্ঠী এসে বলল, বাবামশাই, ফোং!

 

সর্বনাশ! তোর নালবাজারের নাহিড়ীসায়েবের নয় তো রে?

 

ষষ্ঠী দাঁত বের করল। আজ্ঞে না বাবামশাই, পাগলাগারদের।

 

কী বলছিস হতভাগা?

 

হ্যাঁ গো! পাগল ভাল করেন, সেই ডাক্তারবাবুর। দেখুন না গিয়ে!

 

ডাঃ ভাদুড়ীর ফোন! হাসতে হাসতে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন কর্নেল। থা, তোকে ওঁর পাগলাগারদে পাঠাবার ব্যবস্থা করে আসি।

 

ষষ্ঠী বলল, আগে আপনি গিয়ে ঢুকবেন। পেছন পেছন বরঞ্চ আমি গিয়ে ঢুকব।

 

আমাকে তুই পাগল বলছিস?

 

সবাই বলে।

 

বড় সাহস বেড়েছে দেখছি। বলে হাসতে হাসতে কর্নেল ড্রইং রুমে ঢুকলেন।

 

ফোন তুলতেই সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ ভাদুড়ীর সাড়া পেলেন। কর্নেল! আপনার পেমেন্টের সাইকো-অ্যানালেটিক রেজাল্ট শুনুন। একডজন সিটিংয়ের পর সাকসেসফুল হয়েছি। ভেরি ইন্টারেস্টিং!

 

বলুন ডাঃ ভাদুড়ী!

 

বারো বছর বয়সে একদিন সন্ধ্যাবেলা প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির সময় বাড়ির একতলার একটা ঘরে পেসেন্ট ওয়াজ ব্লুট্যালি রেপড বাই এ ম্যান বুঝলেন তো? যাকে সে কাকা বলত। ভয়ে লজ্জায় কাউকে বলতে পারেনি। সেদিন তার বাবা-মা বাড়িতে ছিলেন না। পুওর গার্ল! ভীষণ শক পেয়েছিল। তারপর ক্রমশ হিস্টেরিক সিম্পটম ডেভলাপ করতে থাকে। অবদমনের প্রতিক্রিয়া।

 

বুঝতে পারছি। আর কিছু?

 

একটা সাংঘাতিক কথা ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। আপনার কাজে লাগতে পারে।

 

কী?

 

ওর বাবাকে যে ছুরি দিয়ে মার্ডার করা হয়েছিল, সেটা কুড়িয়ে পেয়ে লুকিয়ে রেখেছিল।

 

জানি। আর কিছু?

 

খিড়কির দরজা দিয়ে ঠিক ওইসময় একপলকের জন্য ওর মামাকে দেখতে পেয়েছিল–জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক। সেই থেকে মামার প্রতি আতঙ্ক এবং ঘৃণা।

 

এনিথিং এলস?

 

দিস ইজ মোর ইমপর্ট্যান্ট। আজ দুপুরে হিপোটিজম প্রয়োগ করেছিলাম। বাবা মার্ডার হবার আগের দিন সন্ধ্যায় দোতলার জানালা থেকে মামাকে পেছনের জঙ্গলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। পরে ভেবেছিল, চোখের ভুল। কারণ ভদ্রলোক তখনই ঝোঁপের আড়ালে সরে যান। কিন্তু সন্দেহটা থেকে গিয়েছিল, তার মামা কেন ওভাবে লুকিয়ে থাকবে? আমি বারবার প্রশ্ন করে জানতে পারলাম, ওর মামা লোকটি মোটেও সৎ লোক ছিল না। জিগ্যেস করলাম, বাবাকে ব্যাপারটা জানিয়েছিল কি না। বলল, জানায়নি। কাউকে জানায়নি। কারণ ফিটের ঘোরে আবোল তাবোল কথা বলত বলে কেউ ওর কথা গ্রাহ্য করত না। তাই এসব কথা চেপে রেখেছিল। আসলে এসব– পেসেন্টের অসুখের উৎপত্তি সাপ্রেশান থেকে এবং যত দিন যায়, সাপ্রেশান তত বাড়তে থাকে। সজ্ঞান অবস্থায় আর মুখ খুলতেই চায় না। যা কিছু দেখে, সবই সাপ্রেসড হয়ে যায়–চলে যায় অবচেতনায়। ফলে একটা আগে দেখা কোনো ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যায়। সাইকলজি শাস্ত্র বড়–

 

ধন্যবাদ ডাঃ ভাদুড়ী! ছাড়ি।

 

ভাববেন না। মাস তিনেকের মধ্যে নর্মাল করে তুলব। মিস প্যাটির ব্যাপারটা দেখেছেন তো?

 

কর্নেল ফোন রেখে ছাদে উঠে গেলেন। পড়ন্ত বেলার শেষ আলোয় হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, শরৎকাল আসন্ন। এবার শরতে সেতাপগঞ্জেই যাচ্ছেন। কালো ডানার ওপর লাল-হলুদ ফুটকিওলা প্রজাপতিগুলো–তাছাড়া হিমাদ্রি ও সুনেত্রার বিয়ের নেমন্তন্নও আছে। সত্যি, প্রজাপতি বড় রহস্যময় জীব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *