এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

ছুরি ও চাবুক

 

সুনেত্রা স্টেশনে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরেছে কয়েকটা দিন। সকাল-দুপুর-বিকেল সন্ধ্যা কত আপ ট্রেন এসে থামছে। কত যাত্রী নামছে। কিন্তু কোথায় সেই সৌমদর্শন বৃদ্ধ, মুখে সাদা একরাশ দাড়ি, মাথায় চুপি, কাঁধে প্রকাণ্ড কিটব্যাগ, বুকে ঝুলন্ত বাইনোকুলার আর ক্যামেরা, হাতে ছড়ি, উজ্জ্বল ফর্সা মুখে অমায়িক হাসি-লম্বা-চওড়া এক মানুষ!

 

বিকেলে বেজারমুখে ফিরে আসছিল সুনেত্রা। অভ্যাসমতো রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফটক পেরিয়ে মন্দিরতলায় আসতেই দেখল, শ্রাবন্তী চুপচাপ বসে আছে।

 

গত পরশু সন্ধ্যার ট্রেনে অপালা কলকাতা চলে গেছে। বসন্ত নিবাসের আনাচেকানাচে ঘুরে এসেছে সুনেত্রা। ভেতরে ঢোকেনি। কাল একবার দেখেছিল ইন্দু ভটচায দোতালার বারান্দা থেকে কাকে বকাবকি করছে। ওকে এত ঘেন্না। করছিল বলেই সুনেত্রা ঢোকেনি ও বাড়িতে।

 

আজ শ্রাবন্তীকে দেখে সে এগিয়ে গেল। তারপর আঁতকে উঠল। শ্রাবন্তী একটা লম্বাটে ছুরি নিয়ে বসে আছে। সুনেত্রা থমকে দাঁড়াল। শ্রাবন্তী তার দিকে অদ্ভুত চাউনিতে তাকিয়ে হি হি করে হেসে বলল, আয় আয়। তোর গলা কাটি!

 

সুনেত্রা ভয়ে ভয়ে বলল, ও কী বলছ খুকুদি? আমার গলা কাটবে কেন? কী করেছি তোমার?

 

শ্রাবন্তী একই সুরে বলল, তোর গলা কাটব। অপুর গলা কাটব। সব্বাইর গলা কাটব। তারপর উঠে দাঁড়াল।

 

সুনেত্রা পিছিয়ে এল। বলল, খুকুদি! ভাল হবে না বলছি! ছুরি ফেলে দাও।

 

শ্রাবন্তী তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। অস্বাভাবিক দৃষ্টি চোখে, ঠোঁটের কোনায় বিকৃত হাসি। সুনেত্রা ভীষণ ভয় পেয়ে খোয়াঢাকা এবড়োখেবড়ো রাস্তায় হন্তদন্ত হাঁটতে থাকল বাড়ির দিকে। মাঝে মাঝে সে পিছু ফিরে দেখছিল, শ্রাবন্তী সমানে এগিয়ে আসছে। বসন্তনিবাসের কাছাকাছি আসতেই শ্যামার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সুনেত্রা ব্যস্তভাবে বলল, শ্যামা! খুকুদিকে জলদি পাকড়ো। ওই দেখ, ছুরি নিয়ে আমার গলা কাটতে আসছে।

 

শ্যামা হ্যা হ্যা করে হেসে বলল, আরে না না দিদিজী! গলা কাটবে কেন? ভয় দেখাচ্ছে।

 

না ওই দেখ আসছে ছুরি নিয়ে।

 

শ্যামা শ্রাবন্তীকে দেখে নিয়ে হাঁক দিল, ছোটবাবু! ছোটবাবু!

 

দোতলা থেকে ইন্দু ভটচাযের সাড়া এল, কী হয়েছে রে শ্যামা?

 

বড়দিদি আবার পাগলামি করে বেড়াচ্ছে!

 

ইন্দু ভটচায হন্তদন্ত বেরিয়ে এলেন। সুনেত্রা শিউরে উঠে দেখল, ওঁর হাতে একটা চাবুক। ইন্দুবাবু চাবুকটা সপাং সপাং করে এপাশে ওপাশে আস্ফালন করতে করতে এগিয়ে গেলেন। তাকে দেখে শ্রাবন্তী দাঁড়িয়ে গেল। ইন্দুবাবু বললেন, ফেলে দাও ছুরি! নইলে চাবকে ছাল ছাড়িয়ে নেব। ফেলো বলছি!

 

শ্রাবন্তী হঠাৎ রাস্তার ওপাশে আগাছাভরা জমির ভেতর দিয়ে দৌড়তে শুরু করল। ইন্দুবাবুর হাঁক-ডাক শাসানি গ্রাহ্য করল না। একটু পরে তাকে আর দেখা গেল না। তখন ইন্দু ভটচায বললেন, এস তুমি বাড়ি, তারপর দেখাচ্ছি মজা। বড়বাবু নেই। আমি তো আছি।

 

শ্যামা বলল, ছোটবাবু, বড়দিদির একটা ব্যবস্থা করুন। পাগলাগারদে পাঠিয়ে দিন। নইলে কখন কী সাংঘাতিক কাণ্ড করে ফেরে যে?

 

ইন্দু ভটচায বললেন, তাছাড়া আর উপায় কী? তারপর ঘুরে বাড়ির গেটের দিকে যেতেই সুনেত্রাকে দেখতে পেলেন। বিবি, তোমার সঙ্গে একটা কৃথা আছে। বলে এগিয়ে গেলেন ইন্দুবাবু।

 

সুনেত্রা গম্ভীর মুখে বলল, বলুন!

 

কাছে এসে ইন্দুবাবু চাপা গলায় বললেন, অপুকে দেখেছ? পরশু বিকেল থেকে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেলেঙ্কারির ভয়ে এখনও চেপে রেখেছি। দেখনি অপুকে?

 

সুনেত্রা বলল, না।

 

তাহলে দেখছি, পুলিশে খবর দিতেই হবে।

 

সুনেত্রা বলল, কেন? কলকাতায় ওর মামার বাড়িও তো যেতে পারে। আগে খোঁজ নিন সেখানে।

 

ইন্দুবাবু হাসলেন। হ্যাঁ–তাও যেতে পারে। তুমি ঠিকই বলেছ। বলে চলে গেলেন।

 

সুনেত্রা বাড়ির দিকে পা বাড়াল। ইন্দুবাবুর সঙ্গে কথা বলেছে বলে যেন তার মুখটা বিষিয়ে গেছে। ঘৃণায় সে থুথু ফেলল। এই শয়তানটাকে বাধা দেবার কেউ নেই ভেবে রাগে তার মাথার ভেতরটা গরম হয়ে উঠছিল। সে এবার বুঝতে পেরেছে, ইন্দু ভটচা শ্রাবন্তাকে চাবুক পর্যন্ত মারে। এত স্পর্ধা তার হল কিসের জোরে? অপালা কলকাতা গিয়ে মামাকে সব কথা কি বলেনি এখনও?

 

বললে তো ওর মামার ছুটে আসা উচিত ছিল। হয়তো বলেনি, অপালা যা মুখচোরা বোকা মেয়ে! মাঠঘাট ঘুরে আর দেহাতীদের সঙ্গে মিশে ও ভীষণ গেঁয়ো হয়ে গেছে। এতদিন ধরে ইন্দু ভটচায ওকে জ্বালিয়েছে, অথচ সব মুখ বুজে সহ্য করেছে অপালা।

 

তাহলেও ওর মামার সব বোঝা উচিত ছিল। অন্তত শ্রাবন্তীকেও তো উনি নিয়ে গিয়ে কলকাতায় চিকিৎসা করাতে পারতেন। অথচ ভদ্রলোক একেবারে চুপচাপ বসে আছেন। সুনেত্রা ভীষণ আশা করেছিল, উনি এসে ভাগ্নীদের মাথার ওপর দাঁড়াবেন। কিন্তু সেই একবার এসেছিলেন রুদ্রবাবু খুন হবার পর। তারপর আর এলেনই না।

 

সুনেত্রা বাড়ি ঢুকেই থমকে দাঁড়াল।

 

তার মা লনের ওধারে পেয়ারাতলায় বেতের চেয়ারে বসে আছেন আর শ্রাবন্তী একটু তফাতে ঘাসের ওপর পা দুমড়ে বসে সুস্থ মানুষের মতো কথা বলছে। সুনেত্রা ওর হাতে এখন ছুরিটা দেখতে পেল না। কিন্তু তার বুক কেঁপে উঠল। যদি হঠাৎ মায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

 

তাকে দেখে সুনয়নী বললেন, শুনেছিস বিবি? ইন্দু খুকুকে চাবুক মারতে তাড়া করেছিল! লোকটার স্পর্ধা কী রে বিবি! দেশে কি আইন বলতে কিছু নেই?

 

সুনেত্রা একটু তফাতে দাঁড়িয়ে হাসবার চেষ্টা করে বলল, খুকুদি ছুরি নিয়ে আমার গলা কাটতে আসছিল, সেটা বলছে না বুঝি!

 

শ্রাবন্তী ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে বলল, না জেঠিমা! বিবি মিথ্যা বলছে। আমি ওর গলা কাটব কেন?

 

সুনয়নী হাসলেন। কখন কী করে, ও কি জেনেশুনে করে? ওকে করান, তাই করে। দেবদেবীদের লীলা। বলে ঘুরলেন শ্রাবন্তীর দিকে। হু, শোন খুকু! অপু কলকাতা চলে গেছে। তুইও চলে যা। আর বাড়ি ঢুকিসনে। হাবুলবাবুকে ডেকে পাঠাচ্ছি। তোকে সঙ্গে করে তোর মামার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে। এখানে থাকলে তুই যে মরে যাবি, মা! একেবারে কংকাল হয়ে গেছিস যে!

 

শ্রবন্তী মাথাটা আস্তে নাড়ল।

 

যাবি না?

 

না।

 

ইন্দুর হাতে মার খাবি, তাও ভাল?

 

শ্রাবন্তী চুপ করে বসে রইল। সুনেত্রা বলল, খুকুদি, ছুরিটা কী করলে?

 

জানি না।

 

কাপড়ের ভেতর লুকিয়ে রাখোনি তো?

 

সুনয়নী ধমক দিলেন, কী আজেবাজে বলছিস ওকে, বিবি? ওকে ওপরে নিয়ে যা। মুখ দেখে মনে হচ্ছে, ওর খাওয়া জোটেনি আজ। গরিকে বলেছি, খানকতক গরমগরম পুরি ভেজে দিতে। তুই ওপরে যা মা খুকু! গিয়ে গল্প কর বিবির সঙ্গে। আমি যাচ্ছি।

 

সুনেত্রা ইতস্তত করছে দেখে ফের তাড়া দিলেন, আঃ! হাঁ করে দেখছিস কী? নিয়ে যা। খুকু, যাও ওর সঙ্গে।

 

শ্রাবন্তী হঠাৎ দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল। আমাকে তোমরা লুকিয়ে রাখো জেঠিমা। আমার বড় ভয় করছে। আমি আর বাড়ি যাব না।

 

সুনয়নী উঠলেন। শ্রাবন্তীকে টেনে তুললেন। তারপর ওকে নিয়ে যেতে যেতে বললেন, চলো, আগে খেয়ে নেবে। তারপর দেখছি, কী করা যায়। এর একটা বিহিত করতেই হবে।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *