এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

শ্রাবন্তী সংবাদ

 

সুনেত্রা শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, তুমি স্রি বুদ্ধ বুড়বক থেকে গেলে হিমুদা! তুমি সঙ্গেসঙ্গে থানায় গেলে না কেন?

 

হিমাদ্রি হাসবার চেষ্টা করল। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফিরেও ডিসিশন নিতে ঘণ্টা দেড়েক লাগল। তারপর লেক প্লেস এরিয়ার থানায় রিং করলাম।

 

বললে, তোমার সামনে খুন হয়েছে?

 

সামনে তো হয়নি।

 

কী বললে তাহলে?

 

নিজের নাম বলি নি। শুধু বললাম লেকভিলার সাততলার তিন নম্বর ফ্ল্যাটে এক ডেডবডি পড়ে আছে। আর কিছু বললাম না।…হিমাদ্রি একটু চুপ করে থাকার পর ফের বলল, শুধু একটা ব্যাপার তখন বুঝতে পারিনি। ঊর্মি দরজা খুলতে গিয়ে কিন্তু জিগ্যেস করেনি পর্যন্ত, কে নক করছে। তাহলে শুনতে পেতাম। এমন কী লোকটা যে ওর গলায় ছুরি চালাল, চিৎকার পর্যন্ত করেনি!

 

সুনেত্রা ক্ষুব্ধভাবে বলল, তুমি ভীষণ ব্লান্ডার করেছ! দেখবে, সব দোষ তোমার ঘাড়ে পড়বে।

 

হিমাদ্রি মাথা দোলাল। আমি ওদের ফ্ল্যাটে ওই প্রথম আর শেষবার গেছি। লোডশেডিং ছিল। কারুর সঙ্গে দেখা হয়নি। সেদিক থেকে নিশ্চিন্ত।

 

এই হিমুদা! সুনেত্রা চাপা গলায় বলল। কিছু ফেলে আস নি তো টুকুর ফ্ল্যাটে?

 

সিগারেট লাইটার ফেলে এসেছি শুধু। মৃগাঙ্কও সিগারেট খায়। কাজেই ওটা নিয়ে পুলিশ মাথা ঘামাবে না মনে হয়।

 

সুনেত্রা চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। দুপুরে জোর বৃষ্টি হয়ে বিকেলে রোদ্দুর ফুটেছে। ঝলমল করছে চারদিক। ওরা দেতালার একটা ঘরে বসে কথা বলছিল। উত্তরের জানালা দিয়ে পোড়ো মাঠের ওধারে বাঁধের সড়ক এবং তার পেছনে ভরা গঙ্গা দেখা যাচ্ছে। বিস্তীর্ণ হলুদ জলের ওপর রোদ্দুর। মহাজনী নৌকোর পালে হাওয়া লেগেছে। হিমাদ্রি বলল, বিবি, চলো না বসন্তনিবাসে যাই একবার! ওদের ব্যাপারটা দেখে আসি।

 

ইন্দুকাকাকে সকালে তোমার কথা বললাম। শুধু বললেন, তাই নাকি? বললেন না, নিয়ে এস ওকে।

 

হিমাদ্রি দুঃখিতভাবে হাসল। ও বাড়িতে অভিশাপ আছে। ওখানে যারাই থাকে, তারাই অ্যাবনর্মাল! ইন্দুকাকাকেও ওদের বাড়ির ভূতটা কীভাবে পেয়ে বসছিল, দেখেছি তো চোখের সামনে।

 

সুনেত্রা গম্ভীর মুখে বলল, আমার তা মনে হয় না! ওদের মধ্যে একমাত্র উনিই হোশিয়ার আদমি।

 

কেন একথা বলছ?

 

বাঃ! ইন্দুকাকা না থাকলে খুকু-অপুর কী অবস্থা হত ভাবো একবার? জমিনগুলোও সব দখল করে ফেলত বাচ্চু সিংরা। রঘুয়ার কীর্তি তো তুমি জান না। সেও ভি নকশাল মুভমেন্টের ঘাঁটি করেছিল এরিয়ায়। ইন্দুকাকা রাছুজীর সঙ্গে ফয়শালা করে ওদের ভাগিয়ে দিয়েছিল, জান?

 

হিমাদ্রি জানালার পাশেই বসে ছিল। হঠাৎ বলল, বিবি! দেখ, দেখ। ওই মেয়েটা অপু না?

 

সুনেত্রা উঁকি মেরে দেখে একটু হাসল। হ্যাঁ। তুমি কেমন করে চিনলে? দেখেছ তো স্রিফ খোখি বয়সে!

 

হিমাদ্রিও হাসল। ঊর্মির মুখের সঙ্গে খুব মিল আছে মনে হল।

 

পোড়ো জমির ওপর দিয়ে অপালা হনহন করে আসছিল। বাড়ির নিচে। আসতেই সুনেত্রা ডাকল, অপু! এই অপু!

 

অপালা মুখ তুলল। নির্বিকার ঠাণ্ডা চাউনি।

 

আ যা! সুনেত্রা হাসতে হাসতে হাতে নেড়ে ডাকল। দেখকে যা কৌন আয়া!

 

অপালা একটু ইতস্তত করে বাড়ি ঢুকল। হিমাদ্রি বলল, অপু কি বাংলা বলে না নাকি?

 

কেন বলবে না? আমি ইচ্ছে করেই ওর সঙ্গে হিন্দুস্থানী বলি।

 

নিচে সুনেত্রার মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলে অপালা ওপরে এল। দরজার পর্দা তুলে হিমাদ্রিকে দেখে থমকে দাঁড়াল। সুনেত্রা বলল, ক্যা রী? নেহি পছনতি?

 

অপালা বলল, ভ্যাট! খালি এইসব। যাচ্ছি।

 

সুনেত্রা ওকে টেনে এনে হিমাদ্রির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলল, কী দারুণ মেয়ে হয়েছে দেখতে পাচ্ছ? একেবারে দেহাতী খোট্টামার্কা। তাই না? বলে সে অপালার পাঁজরে খুঁচিয়ে দিল। হাঁ করে কী দেখছিস তুই? বল্ তো এ কে?

 

অপালা হিমাদ্রিকে ফের ঠাণ্ডা নিষ্পলক চোখে দেখে নিয়ে মাথা দোলাল। চিনতে পারছি না।

 

হিমুদা রে! খিলখিল করে হেসে উঠল সুনেত্রা। গঙ্গায় ডোবা থেকে তোকে কে বাঁচিয়েছিল মনে নেই? তখন তো তুই খোখি ছিলি না, অপু!

 

অপালা চুপ করে থাকল। হিমাদ্রি বলল, দশটা বছর খুব কম নয়। তাছাড়া আমরা ছিলাম ওদের শত্রু। রুদ্রজ্যাঠা আমাকে গুলি করতে এসেছিলেন। এখন–

 

সুনেত্রা ধমকাল। শাট আপ! ওসব কথা ওকে ভী বলছ?

 

সরি। হিমাদ্রি একটু হাসল। অপু, কিছু মনে কোরো না। তোমার বড়দি কেমন আছে বলো।

 

অপালা আস্তে বলল, ভাল।

 

সেই অসুখটা সারেনি এখনও শুনলাম?

 

অপালা কিছু বলল না। সুনেত্রা বলল, খুকুদির সঙ্গে পরশু দেখা হয়েছিল। একা মন্দিরের ওখানে বসে ছিল। বললাম, এখানে কী করছ-বাড়ি এস। জবাব দিল না। হাত ধরলাম তো ছাড়িয়ে নিয়ে এমন চোখ কটমট করে তাকাল যে ভয় পেয়ে ভেগে এলাম। হ্যাঁ রে অপু, ও কী করছে? বাড়িতে আছে, না মন্দিরতলায় গিয়ে বসে আছে?

 

অপালা বলল, শুয়ে ছিল দেখেছি।

 

বস্ অপু! চা খেয়ে যাবি। বলে আসি। ততক্ষণ তুই হিমুদার সঙ্গে গপসপ কর।

 

সুনেত্রা চলে গেলে হিমাদ্রি ডাকল, অপু!

 

উঁ?

 

তুমি বুঝি বেশি কথা বলো না মেজদির মতো?

 

অপালা এতক্ষণে ঠোঁটের কোনায় একটু হাসল। না বলার কী আছে?

 

আমার কথা তোমার মনে পড়া উচিত, অপু।

 

মনে পড়বে না কেন?

 

আচ্ছা! হিমাদ্রি সিগারেট ধরাল। একটু পরে আস্তে বলল, মেজদির খবর পেয়ে তোমরা কেউ যাওনি কলকাতা?

 

মামাবাবু এসে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে।

 

ও। তাহলে বডি দেখতে পাওনি?

 

অপালা আস্তে মাথাটা দোলাল।

 

শুনেছি তোমার বাবাও তো একইভাবে

 

অপালা মুখ নামিয়ে বলল, ওসব কথা থাক। তারপর একটু পরে মুখ তুলে ফের বলল, আপনি কলকাতায় থাকেন? মামাবাবু বলছিলেন।

 

থাকি। এবার কলকাতা গেলে দেখা কোরো যেন তোমার মামা ঠিকানা জানেন। যাবে তো?

 

গেলে যাব।

 

হিমাদ্রি ওর হাবভাব দেখে একটু অস্বস্তিতে পড়েছে। কী কথা বলবে ওর সঙ্গে, খুঁজে পাচ্ছে না। ধোঁয়ার রিং পাকিয়ে বলল, বিবির কাছে শুনলাম, কলেজে ঢুকেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছ। ঠিক করোনি। আজকাল মেয়েদের একটা ডিগ্রি থাকা ভাল। নিজের পায়ে দাঁড়ানো যায়। তাছাড়া ধরো, এই বাজে পরিবেশ। এখানে পচে মরার কোনো মানে হয় না। তুমি মামার কাছে থেকে ফের পড়াশোনা শুরু করো, অপু! কী?

 

অপালা কপাল থেকে রুক্ষ চুলের গোছা সরিয়ে নিঃশ্বাসের সঙ্গে বলল, কী হবে?

 

হাসল হিমাদ্রি। এই লাইফ তোমার পছন্দ?

 

আমার খারাপ লাগে না।

 

আসলে সবই অভ্যাস। তুমি এই লাইফে অভ্যস্ত হয়ে গেছ। হিমাদ্রি কথা বলার জন্য কথা বলছিল। আমার কথাই ধরো। আমার বেলা শাপে বর হয়েছিল। আমিও ভাবতাম, সেতাপগঞ্জ ছেড়ে কোথাও গিয়ে একবেলা থাকতে পারব না। শেষে যখন বাধ্য হয়ে চলে যেতে হল, তখন দেখলাম কী ওয়ার্সট প্রিমিটিভ পরিবেশে পচে মরছিলাম!

 

সবাই আপনার মতো নয়।

 

তা নয় ঠিকই। তবু তুমি তো এখন সাবালিকা–বয়স কত তোমার? আই থিঙ্ক টোয়েন্টি–বা কাছাকাছি। সামনে অগাধ লাইফ পড়ে আছে।

 

হিমাদ্রি হঠাৎ চুপ করে গেল। ওকে কি সে সিডিউস করছে, যেমন করত দিনের পর দিন ওর মেজদিকে? কিন্তু ঊর্মির সঙ্গে চেহারা আর এই স্মিতভাষিতায় যেটুকু সামান্য মিল, বাকি সবটাই বিপরীত মনে হচ্ছে। রুক্ষ দেহাতী আদিম একটা যৌবনের সামনে বসে আছে সে। কমিউনিকেট করা হয়তো অসম্ভব। আর ঊর্মি ছিল স্মার্ট, ছিমছাম, এবং তার ব্যক্তিত্বে সারাক্ষণ মেঘের ভেতর। থেকে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিত সেক্স। বড় নিষ্ঠুর সেক্সি মেয়ে ছিল ঊর্মি!

 

অপালা নোখ খুঁটছিল। কী বলতে ঠোঁট ফাঁক করল, কিন্তু বলল না। সুনেত্রা ট্রে সাজিয়ে চা আর স্ন্যাকস নিয়ে ঘরে ঢুকে বলল, কথা বলাতে পারলে। কাঠপুতলিকে?

 

হিমাদ্রি হাসল। যৎকিঞ্চিৎ! ওর মেজদির মতোই। অবশ্য ঊর্মির কথা বলার স্বভাব ছিল চোখে।

 

সুনেত্রা পট থেকে চা ঢালতে ঢালতে বলল, বন্যেরা বনে সুন্দর। ওকে দেহাতে ওদের ফার্মে গিয়ে ছেড়ে দাও, দেখবে অন্য মূর্তি। সেবার বাবার সঙ্গে চৌথিয়া ঝিলে হাঁস মেরে ফিরে আসছি–আমি না, বাবা দুটো হাঁস মেরেছিলেন, তো আসার পথে ওদের ফার্ম হয়ে এলাম। তখন প্রায় সন্ধ্যা। দেখি কী, একদঙ্গ ল মেয়ে গেঁহু বাছাই করছে আর মধ্যিখানে বসে অপু তাদের সঙ্গে মৈথিলী। চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেখেই সরম বাজল। কী রে? মিথ্যা বলছি?

 

অপালা স্ন্যাকসের প্লেট তুলে নিয়ে নির্বিকার মুখে চিবুচ্ছে। হিমাদ্রি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ওর খাওয়ার মধ্যেও কেমন যেন আদিমতা। একটু পরে সুনেত্রার চোখে পড়ল যেন। একটু হেসে বলল, আমার প্লেটটাও খাবি কিন্তু অপু। বিকেলে কিছু খেলেই আমার কেমন গা-বমি করে। কী? দেব?

 

অপালা একটু হাসল। ক্ষিদে পেয়েছিল।

 

দুপুরে খাসনি বুঝি?

 

না। মাঠে গিয়েছিলাম। এখন ফিরছি।

 

একা গিয়েছিলি?

 

না। ইন্দুকাকার সঙ্গে।

 

উনি ফেরেননি?

 

মাঠ থেকে আসছি বলে কেঁওডিহি গেল। আমি চলে এলাম।

 

তাই তোকে অমন শুখা-রুখা দেখাচ্ছে। মরবি ছোঁকড়ি! ভদ্রলোকের মেয়ে কে বলবে রে তোকে? অমনি করে দিনভর ক্ষেতি করে বেড়াচ্ছিস! ইন্দুকাকা তোর মাথাটা খাবে।

 

অপালা চুপচাপ খাচ্ছিল। তেমনি নির্বিকার মুখ। শ্বাস ছেড়ে সুনেত্রা ফের বলল, কী অবস্থা বুঝতে পারছ হিমুদা?

 

হিমাদ্রি একটু হাসল শুধু। এতক্ষণে তার চোখে পড়ছিল অপালার রুক্ষ চুলে একচিলতে শুকনো কাদা, ব্লাউসের কাঁধের কাছে একটু ফাটা অংশ, যেমন তেমন একটা ধূসর রঙের প্রিন্টেড শাড়ি, এবং খালি পা! চোখের তলায় ক্ষীণ কালো ছোপ আর নাকের ডগা, গলায় নুনের কণা। জুলাই মাসের কড়া রোদে মাঠ-ঘাটে ঘুরে আসা এক যুবতীর শরীরে প্রকৃতির নোখের আঁচড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

হিমাদ্রি বলল, বৃষ্টির সময় কোথায় ছিলে?

 

অপালা বলল, ফার্মে।

 

সুনেত্রা বলল, ফার্ম না কিছু! দুখানা কুঁড়ে ঘর ক্যানেলের ধারে। গভমেন্ট থেকে ফেসিলিটি পাওয়া যায় ক্ষেতিতে। তাই ইন্দুকাকা ফার্ম-টার্ম করে। শোন অপু কাল থেকে ও সব ছেড়ে দে। এত বড় মেয়ে হয়েছিস, কত বড় বংশের মেয়ে তুই, সরম বাজে না?

 

হিমাদ্রি মন্তব্য করল, বেঙ্গলে থাকলে এ সব পারত না। মেন্টালিটিই বদলে যেত। আসলে বিহারের অ্যাটমসফিয়ারই অন্যরকম–বিশেষ করে এ সব ছোটখাট গঞ্জে। ঊর্মির ব্যাপারটা দেখ না! ও এটা কাটাতে পেরেছিল বলেই

 

অপালা ফোঁস করে উঠল হঠাৎ। সে জন্যেই খুন হয়ে গেল মেজদি!

 

সুনেত্রা খিলখিল করে হেসে উঠল। কাকে কী বলা হচ্ছে? ডাকুরানী অপু, তুই রঘুয়ার দলে ভিড়ে যা। ফুলনদেবী হয়ে যা।

 

অপালা এতক্ষণে চায়ের কাপ তুলল। চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ঢকঢক করে গিলে আঁচলে ঠোঁট মুছে একটু হাসল। বাড়ি ফিরে আর খাচ্ছিনে এবেলা–চলি বিবিদি!

 

বস্। গল্প করি। অনেকদিন আসিস নি।

 

অপালা উঠে দাঁড়াল। উঁহু। ইন্দুকা এতক্ষণে এসে গেলে বকবে। আমি যাই।

 

সে দরজার কাছে গিয়ে ঘুরল। হিমুদাকে নিয়ে যেও। বড়দিকে বলছি গিয়ে। বলে বেরিয়ে গেল হাল্কা পায়ে।

 

সুনেত্রা তাকাল হিমাদ্রির দিকে। কী বুঝলে?

 

তুমি যা বলছিলে–মানে, ফুলনদেবীর আগের স্টেজ।

 

ভ্যাট! সুনেত্রা জানালায় গিয়ে নিচে অপালাকে দেখতে দেখতে বলল, ওর একটা আশ্চর্য স্বভাব–কিছুতেই রাগ করে না। একেবারে পান্থরকা মাফিক। ওর জন্য কষ্ট হয়, জানেনা হিমুদা?

 

হিমাদ্রি অন্য কথা ভাবছিল। ডাকল, বিবি?

 

কী?

 

শ্রাবন্তীদি–মানে খুকুদির কথা বলছি। সে অপুকে শাসন-টাসন করে না?

 

তাকেই কে শাসন করে ঠিক নেই। তাছাড়া শাসন করার কী আছে? অপু আর যাই হোক, ওর স্বভাবচরিত্র ভাল। টুকুর সঙ্গে আকাশপাতাল ফারাক। মুখ টিপে হাসল সুনেত্রা। টুকুকে তো তুমি ভাল চিনতে। তোমার ছোটবেলার প্রেমিকা।

 

হিমাদ্রি ঠাট্টায় কান করল না। গলার ভেতর বলল, আমার ভয় হয়–

 

কিসের ভয়?

 

অপুর জন্য।

 

অপুর জন্য তোমার ভয়-ডর মাথাব্যথা–কিছু করতে হবে না। নিজের কথা ভাবো।

 

হিমাদ্রি যেন দেয়ালকে শুনিয়ে বলল, ঊর্মির একটা কথা মাথা থেকে যাচ্ছে না। বরং

 

সুনেত্রা ভুরু কুঁচকে তাকাল। কী কথা?

 

ওর বড়দি সম্পর্কে।

 

সুনেত্রা বিরক্ত হয়ে বলল, আমার দিকে তাকিয়ে বলবে না কি? পরিষ্কার করে বলো!

 

হিমাদ্রি গলা চেপে বলল, কথাটা এমন অবিশ্বাস্য লেগেছিল। অথচ এখন মনে হচ্ছে, ঊর্মি হয়তো ঠিকই আঁচ করেছিল। কাউকে বোলো না যেন মাকেও না।

 

সুনেত্রা অধৈর্য হয়ে রেগে গেল। ছোড় দো জী! মাৎ বোলো।

 

বিবি, গত মাসে ঊর্মির সঙ্গে একখানে কিছুক্ষণ কাটিয়েছিলাম। কথায় কথায় হঠাৎ ঊর্মি বলল, ওর বরের সঙ্গে এখানে এসেছিল বাবাকে প্রণাম করতে। তখন ওর বাবা ওকে চুপিচুপি সাবধান করে দিয়েছিলেন ওর বড়দি সম্পর্কে।

 

সে কী?

 

হ্যাঁ। শ্রাবন্তীদি নাকি একদিন দুপুর রাতে ওর বাবার দরজায় নক করেছিল। তখনও রুদ্রজ্যাঠার প্যারালেসিস হয়নি। দরজা খুলেই দেখেন, শ্রাবন্তীদি একটা ড্যাগার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে চাচামেচি করেছিলেন। তারপর অপালা পাশের ঘর থেকে এসে শ্রাবন্তীদিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। অজ্ঞান হয়ে যায় শ্রাবন্তীদি। তারপর–ঊর্মি বলছিল, ওর ভর ওঠে। ভরের সময় বলে, কাউকে রাখবে না। সক্কলের গলা কাটবে।

 

টুকু বলেছিল এ সব কথা?

 

হিমাদ্রি চুপ করে থাকল। সুনেত্রা ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, আমি বিশ্বাস করি না। অ্যাবসার্ড! তুমি কি ভাবছ, তুমি যখন টুকুর সঙ্গে আসনাই করছিলে, তখন খুকুদি গিয়ে দরজায় নক করেছিল? ইমপসিবল! ইয়ে কভি নেহি হো সকতা। দুবলা শরীরে সেই কলকাতা গিয়ে বোনকে খুন করেছে সে? টোটালি ইমপসিবল!

 

হিমাদ্রি উঠে দাঁড়াল। মাথা ঝিমঝিম করছে। একটু বেরোই।

 

অপুদের বাড়ি যাবে তো চলো।

 

তাই চলো।..

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *