এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

বৃষ্টিসন্ধ্যার বিভীষিকা

হিমাদ্রির পিঠে নোখের আঁচড় কাটতে কাটতে ঊর্মি শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দে বলল, চুপ। কারণ হিমাদ্রি ফিসফিস করে অনর্গল প্রেমের কথা বলছিল। বলার সময়। ঘনিষ্ঠতার এই চরম পর্যায়ে কতসব কথা বলতে ইচ্ছে করে। সময় ও পরিবেশ এত নিরাপদ। আজ জুলাই মাসের ১১ তারিখের সন্ধ্যাবেলায় এখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছে। কয়েকমিনিট আগে লোডশেডিং হয়ে গেছে এবং একটু তফাতে টেবিলের ওপর সরু একটা মোম জ্বলছে। আর সেই রাগী ও নির্বোধ ব্যবসাদার লোকটা, যে এই ফ্ল্যাটের মালিক–এখন দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে আরবসাগরের উপকূলে বসে আবুধাবির দিকে তাকিয়ে আছে। দশতলা বাড়িটার সাততলার এই ফ্ল্যাটে খুবই প্রাকৃতিক একটা স্বাধীনতা চনমন করছে আবেগে। হিমাদ্রি চিন্তাভাবনাহীন, নির্বিকার।

 

মোমের আলোটা কাঁপছে। এপাশের দেয়ালে নিজের লম্বাটে ছায়াটা দেখতে পাচ্ছিল হিমাদ্রি। নিজের ছায়া দেখে নিজের শরীরটাকে অবিকল দেখার ইচ্ছে তাকে পেয়ে বসল। তখন সে বাঁদিকে কিছুটা তফাতে ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকাল। আয়নায় প্রতিবিম্বিত শরীরের দিকে আচ্ছন্ন চোখে সে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তার চেয়ে ঊর্মি বহুগুণ ফর্সা। এতক্ষণে সে নিছক শরীরের সৌন্দর্য জিনিসটাও আবিষ্কার করল। এ একটা আবিষ্কার এবং সব পুরুষের কাছেই ঠিক তাই। ঊর্মির মুখটাকে সেদিকে ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করে সে বলল, দেখ, দেখ ঊর্মি! আহা, দেখ না!

 

ঊর্মি বলল, আঃ! চুপ করো!

 

আর ঠিক তখনই পর-পর তিনবার কেউ নক করল জোরে পাশের ডাইনিং–কাম-ড্রয়িংরুমের ওদিকে সদর দরজায়। একটু পরে আবার তিনবার। এবারকার নকে অধৈর্য যেমন, তেমনি কোনো সাংকেতিক কথাও বুঝি বা স্পষ্ট।

 

কয়েক সেকেন্ডের জন্য কাঠ হয়ে গিয়েছিল দুটিতে। তারপর ঊর্মি ঠেলে হিমাদ্রিকে সরিয়ে উঠে বসল। মেঝেয় লুটিয়ে আছে অন্তর্বাস, নাইটি। হিমাদ্রির পোশাকের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। ঝটপট নিজের পোশাক খুঁজে নিয়ে ঊর্মি হিমাদ্রিকে ইশারায় পোশাক পরে নিতে বলল।

 

হিমাদ্রির মুখ আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। ঊর্মি। পোশাক পরেই ড্রেসিং টেবিলে গেল। ব্রাস টেনে চুল ঠিকঠাক করে বিছানা গোছাতে এল তখন হিমাদ্রি তার পোশাক পরতে শুরু করেছে। তার চোখ ঊর্মির দিকে। ঊর্মির মুখে এখন শান্ত একটা দৃঢ়তা। সে হিমাদ্রির জুতোদুটো। দেখিয়ে পরে নিতে ইশারা করল। তখন আবার তিনবার শব্দ হল বাইরের দরজায়। কিন্তু আগের জোরটা নেই, কেমন যেন ক্লান্ত।

 

হিমাদ্রি বিভ্রান্ত হয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে ভেতর থেকে ছিটকিনি এঁটে দিল। ঊর্মি বারণ করার আগেই সে এটা করে বসল। ঊর্মি ফিসফিস করে তাকে কিচেনের পাশে স্টোররুমে যেতে বলছিল।

 

মোটামুটি আধমিনিট সময় লাগল এই ঘর সামলানোতে। তারপর মুখে বেপরোয়া একটা ভাব ফুটিয়ে ঊর্মি স্লিপার ফটফটিয়ে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে দিল। মৃগাঙ্কের কলিংবেল বা লোডশেডিং থাকলে দরজায় নক করার রীতি তার জানা। পরপর তিনবার। মৃগাঙ্ক সংসারী ও সতর্ক মানুষ। তার সবকিছুতে এরকম হিসেবের ছাপ আছে।

 

বাথরুমের ভেতর হিমাদ্রি দরজা খোলার শব্দটা শুনতে পেল না, শুনল বন্ধ হওয়ার শব্দ। বেশ জোরে বন্ধ হল দরজা। তার মানে হারামজাদা মৃগাঙ্ক দরজা। খুলতে দেরি হওয়ায় রেগে গেছে।

 

কিন্তু আজ সকাল সাড়ে দশটার প্লেনে যে বোম্বে গেছে, সে আজই সন্ধ্যা সাতটায় কেন এবং কীভাবে ফিরে এল, বুঝতে পারছিল না হিমাদ্রি। নাকি বউকে ফাঁদে ফেলার জন্য এ এক চক্রান্ত?

 

তবে ঊর্মি বুদ্ধিমতী। তার বুদ্ধির ওপর বিশ্বাস আছে হিমাদ্রির। মৃগাঙ্ককে অন্য বাথরুমের দিকেই–যদি ওর এখন বাথরুমে যাবার দরকার হয়, গাইড করবে ঊর্মি। তারপর একটা কিছু করবে, যাতে হিমাদ্রি ওর অলক্ষ্যে বেরিয়ে যেতে পারে। হিমাদ্রি অন্ধকারে ঘামতে লাগল দরদর করে।

 

কিন্তু মৃগাঙ্কের কথা শুনতে পেল না সে। ঊর্মিরও না। তেমনি স্তব্ধতা গুমোট হয়ে আছে। বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ শোনা যাচ্ছে। এত উঁচুতে নিচের রাস্তার কোনো শব্দ এমনিতে শোনা যায় না, তাতে এখন বৃষ্টি। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছে। বাথরুমের আয়নায় নিজের ভূতের মতো মূর্তি আবছা ভেসে উঠতে দেখছিল হিমাদ্রি। এতক্ষণে নিজের ওপর রাগে দুঃখে খেপে উঠছিল সে। কেন ঊর্মির কথায় এই ফ্ল্যাটে চলে এল সে? বরং তার পক্ষে একটা নিরিবিলি ফ্ল্যাট পাওয়া কঠিন ছিল না। সুব্রতর একটা ফ্ল্যাট নেওয়া আছে থিয়েটার রোডে। সেটা স্ফুর্তির জন্যই রেখেছে সুব্রত! তাকে বললে ঘণ্টাখানেকের জন্য ওই ফ্ল্যাটটা পেতে পারত। সুব্রতর কাছে তার গোপন করার কিছু নেই।

 

মৃগাঙ্ককে বোকা ভেবেছিল। এখন হিমাদ্রি টের পাচ্ছে, নিজেই সে রাম বোকা। মৃগাঙ্কের পেতে রাখা ফাঁদে পা দিয়ে বসে আছে। সময় যেন থেমে গেছে। দরজায় কান রেখে ভেতরে কী ঘটছে বোঝার চেষ্টা করল হিমাদ্রি। অবাক হয়ে গেল। মৃগাঙ্ক ও ঊর্মি কোনো কথা বলছে না। কোনো চলাফেরার শব্দও শোনা যাচ্ছে না। এই অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে যাওয়ার কারণ কী?

 

কষ্টকর একমিনিট….দুমিনিট….পাঁচ মিনিট কাটল। তবু কোনো শব্দ নেই। সাত মিনিট….আট…দশ….বারো….পনের মিনিট। কোনো শব্দ নেই। শুধু একবার মনে হল, কেউ যেন জোরে শ্বাস ছাড়ল।

 

হঠাৎ হিমাদ্রি মরিয়া হয়ে গেল।

 

একটানে দরজা খুলে বেডরুমে পা বাড়িয়ে থমকে দাঁড়াল সে। তেমনি মোম জ্বলছে। তলায় ঠেকেছে শিখাটুকু। ঘরের ভেতরটা তেমনি হয়ে আছে। খাটে বেড কভার চাপানো রয়েছে। ঊর্মি নেই। মৃগাঙ্কও নেই।

 

সে অবাক হয়ে বেডরুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং-কাম-ড্রইংরুমে পা দিল। বেডরুমের মোমের দপদপে ক্ষীণ আলোর ছটা পর্দার ফাঁক দিয়ে একটুখানি ছড়িয়ে গেছে। সেই সামান্য আলোয় সদর দরজার কাছে কী একটা সাদা হয়ে পড়ে আছে।

 

চোখের দৃষ্টি একটু পরিষ্কার হতেই হিমাদ্রি ঊর্মির সাদা নাইটির অংশ দেখতে পেল। সঙ্গে সে প্যান্টের পকেটে সহজাত বোধ-বশে হাত ভরে লাইটার খুঁজল।

 

লাইটারটা তখন তাড়াহুড়োয় প্যান্ট খোলর সময় বেডরুমেই হয়তো পড়ে গেছে। সে দুঃস্বপ্নের ঘোরে বেডরুমে ঢুকে মোমটুকু নিয়ে এল। তারপর তার সারা শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে গেল। দুহাতে মুখ ঢাকল সে।

 

ঊর্মি চিত হয়ে পড়ে আছে। তার শ্বাসনালী কাটা। ভয়াবহ চাপচাপ রক্ত।

 

হিমাদ্রির হাত থেকে মোমটা পড়ে গেছে। সে ঊর্মিকে ডিঙিয়ে সদর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। নির্জন করিডোর। পাশের ফ্ল্যাটে একটা কুকুর গর্জন করছিল। হিমাদ্রির সিঁড়ি বেয়ে টলতে টলতে নামতে থাকল।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *