এক
বেশ কিছুদিন আমি একেনবাবুর কীর্তিকলাপ নিয়ে কিছু লিখে উঠতে পারিনি। আমি লেখক নই। তরতর করে লেখা হাত থেকে বেরোয় না। কষ্টেসৃষ্টে যা লিখি, পরে সেটা পড়ে মনে হয় ছেলেমানুষী। তবে প্রমথ আমার লেখা নিয়ে যেরকম বিদ্রূপ করে, তত বাজে বোধহয় আমি লিখি না। প্রমথ আমার ছেলেবেলার বন্ধু নিউ ইয়র্কে আমরা একটা অ্যাপার্টেমেন্ট শেয়ার করি। অ্যাপার্টমেন্টের তৃতীয় বাসিন্দা, যাঁর গুণকীর্তনের চেষ্টা আমি করি, সেই একেনবাবু কিন্তু সবসময়ে আমাকে উৎসাহ দেন, “স্যার, সকলে তো আর আগাথা ক্রিষ্টি বা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় হতে পারেন না, আর আপনি স্যার সাহিত্য লিখছেন না, লিখছেন ঘটনা।”
এ ব্যাপারে প্রমথর একটাই বক্তব্য, মুখে স্বীকার না করলেও একেনবাবু পাবলিসিটি চান, শুধু অজিত বা হেস্টিংস-এর মতো ওঁর কোনও লিপিকার নেই –অক্ষম আমিই একমাত্র ভরসা।
ম্যানহাটানে মুণ্ডুহীন ধর বলে একটা লেখা শুরু করেছিলাম, কিন্তু দু’মাসে দেড়পাতাও এগোল না। তারই মধ্যে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে স্যাবাটিক্যাল নিয়ে এক বছরের জন্য কলকাতায় চলে এলাম। আমার মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। আর আমিও নিউ ইয়র্কে একটু হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। চলে এসে অবশ্য নিউ ইয়র্কের কিছু কিছু জিনিস মিস করছিলাম, বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস, স্টারবাক্স-এর কফি, হাগেনডস-এর আইসক্রিম, আর ভিলেজ, অর্থাৎ নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির আশেপাশের রাস্তাঘাট-দোকানপাট। কিন্তু সেটা কয়েক সপ্তাহ মাত্র। তারপর দেখলাম দেশের চিনি-লেবু মেশানো চা কিংবা কামধেনুর মিষ্টির কাছে স্টারবাক্সের কফিই বলুন বা হাগেনডসের আইসক্রিমই বলুন, কোনওটাই দাঁড়াতে পারবে না। যেমন পারবে না প্রমথর রান্না আমার মায়ের রান্নার কাছে। দেশের শাকসজি বা মাছের অমন স্বাদ নিউ ইয়র্কে মিলবে কী করে? নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর অবশ্য বিকল্প নেই। কিন্তু কলকাতার বাংলা দৈনিকগুলোর একটা আলাদা স্বাদ আছে। গরম গরম খবর দিয়ে তথ্যের দিক থেকে না পারলেও, রস-কথনে নিউ ইয়র্কের যে কোনও পত্রিকাকে টেক্কা দিতে পারে। মোটকথা নিউ ইয়র্ককে বলতে গেলে প্রায় ভুলেই গেলাম।
.
কলকাতায় আসার মাস দুয়েকের মধ্যে বাসস্থান নিয়ে একটা সমস্যা হল। আমাদের বাড়িটা বহুদিনের পুরোনো, ঠাকুরদার আমলে তৈরি। আজ ছাত থেকে জল পড়ছে, কাল দেয়ালের পলেস্তারা খসে যাচ্ছে, পরশু মর্চে-ধরা ভ্রু ভেঙ্গে জানলার কবজা খুলে আসছে– একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে। তার ওপর মা একলা এত বড় বাড়িতে থাকেন–নিরাপত্তার দিক থেকেও সেটা বাঞ্ছনীয় নয়। এইসব ভেবে বেশ কিছুদিন ধরেই প্রমোটারদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। এবার এসে দেখলাম প্ল্যানট্যান সব অ্যাপ্রুভড হয়ে গেছে। চারতলা ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হবে। আমরা পাব দুটো বড় ফ্ল্যাট। তবে সেটা কমপ্লিট হতে সাত-আটমাস লেগে যাবে। ওই সময়টা আমাদের অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে হবে। প্রমোটার ভদ্রলোকই একটা অ্যাপার্টমেন্ট ঠিক করে দিলেন গড়িয়ার কাছাকাছি। অ্যাপার্টমেন্টটা নতুন, আমাদের প্রোমোটারই তৈরি করেছেন। বাড়ির বেশির ভাগ জিনিসপত্র গুদামজাত করে অল্প কিছু জিনিস নিয়ে আমি আর মা সেখানে এসে উঠলাম।
.
গড়িয়ার এই অঞ্চলটার সঙ্গে আমার একেবারেই পরিচিতি নেই। অত্যন্ত সরু রাস্তা, কাঁচা ড্রেনগুলোকে সবে পাকা করা শুরু হয়েছে। জাম্বো সাইজের মশায় জায়গাটা অধ্যুষিত। অল্প জমির উপর গায়ে গায়ে লাগানো সব বাড়ি, যার অনেকগুলো ভেঙ্গে এখন অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং হয়ে গেছে। বেশির ভাগ জমিই বোধহয় জবরদখলি ছিল। সেইজন্য রাস্তাঘাটের ব্যাপারে কোনও প্ল্যানিং নেই, এঁকেবেঁকে নানান দিকে ছড়িয়ে আছে। সাইকেল রিকশার ক্ষেত্রে তাতে অসুবিধা নেই, কিন্তু এখন সেখানে ট্যাক্সি আর প্রাইভেট গাড়ি চলে। দু’দিক থেকে গাড়ি এলেই সর্বনাশ! বেশ কিছুক্ষণ কসরত এবং দুই ড্রাইভারের মধ্যে বিস্তর আলোচনার পর গাড়ি পাস করতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে সাউথ এন্ড পার্কের সুন্দর পাড়া ছেড়ে এখানে এসে থাকাটা খুবই পীড়াদায়ক।
আমাদের প্রতিবেশী কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হল। বিজয়বাবু আর তাঁর স্ত্রী থাকেন আমাদের উলটো দিকের ফ্ল্যাটে। বিজয়বাবুর বয়স বছর চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হবে। মেদবহুল শ্যামবর্ণ দেহ। চুলে একটু একটু পাক ধরেছে। ভদ্রলোক কথা খরচা করতে ভালোবাসেন না। আর একটা মুদ্রাদোষ আছে, কথায় কথায় ‘ওর নাম গে’ বলার। প্রথমদিন আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ওর নাম গে, থ্রি সি-তে?”
ঝট করে প্রশ্নটা ধরতে পারিনি। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে আবার বললেন, “থ্রি সি-তে তো?”
এবার বুঝলাম অ্যাপার্টমেন্ট থ্রি-সি-তে এসেছি কিনা জানতে চাইছেন। বললাম, “হ্যাঁ।”
“ব্যাচেলার?”
প্রশ্নের পারম্পর্য বুঝলাম না, তাও উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ।”
“একা?”
ইচ্ছে হল বলি, তাতে আপনার কী মশাই?” কিন্তু নতুন জায়গায় এসে প্রথমেই প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া করতে ইচ্ছে হল না। বললাম, “না, মায়ের সঙ্গে থাকি।”
“বেশ। ওর নাম গে, আসি,” বলে ভদ্রলোক হনহন করে চলে গেলেন।
ভেরি স্ট্রেঞ্জম্যান।
.
বিজয়বাবুর স্ত্রীর সঙ্গেও আলাপ হল, মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কথাবার্তায় সপ্রতিভ, সুন্দরী না হলেও চেহারায় একটা অলগা শ্ৰী আছে। বোঝা যায় বয়সে বিজয়বাবুর চেয়ে অনেক ছোটো, নাম দীপা। ছেলেপুলে নেই, স্বামী-স্ত্রীর সংসার। বিজয়বাবুর পেশাটাও জানা গেল ওঁর স্ত্রীর কাছ থেকে। নেতাজি সুভাষ রোডের উপরে পুরোনো বান্টি সিনেমার কাছে বিজয়বাবুর একটা ওষুধের দোকান আছে।
দীপা চলে যাবার মা বললেন, যখন বলে গেল মেয়েটা, ওই দোকান থেকেই আমার ওষুধপত্র কিনিস।
.
আরও দুয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হল। কিন্তু না হলেও কোনও ক্ষতি ছিল না। এ বাড়ি ছেড়ে গেলে এদের কারোর সঙ্গেই যোগাযোগ থাকবে না, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। প্রতিবেশীদের মধ্যে যাকে আমার ভালো লাগল, সে হল বারীন। লম্বা, ফরসা, চোখে গোল্ড রিমের চশমা। ব্যাকব্রাশ করা বেশ লম্বা চুল। মুখটা খুবই সুন্দর, কেবল নাকটা একটু থ্যাবড়া। ওইটিই চেহারায় বেমানান। প্রায় আমারই বয়সি। কোনও একটা ইন্সিওরেন্স এজেন্সিতে কাজ করছে। সেটা শুনে আমার সতর্ক ভাব দেখে বারীন আশ্বস্ত করল, “চিন্তা নেই ব্রাদার, আপনাকে পলিসি কিনতে বলব না। সবাইকে ক্লায়েন্ট বানালে, বন্ধু পাব কোথায়?” বলে হা হা করে হাসল কিছুক্ষণ।
কথাটা শুনে লজ্জা পেলাম। মুখে বললাম, “না, না আমি মোটেই তা ভাবছিলাম না।”
উত্তরে বারীনের মুচকি হাসি দেখে বুঝলাম ধরা ঠিকই পড়েছি।
আধঘণ্টার মধ্যেই আমাদের সম্পর্ক তুমি-তে এসে দাঁড়াল। বারীন আমার কলেজের বন্ধু অনিমেষকে খুবই ভালো চেনে। অনিমেষ পালিত স্ট্রিটের যে বাড়িতে থাকে, সেটা যে বারীনের পৈত্রিক বাড়ি সেটা অবশ্য প্রথমে জানতে পারিনি। আসলে বছর পাঁচেক আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়িতে আর পা দেবে না বলে বেরিয়ে এসেছিল, তারপর বারীন আর ওমুখো হয়নি। দু’বছর আগে বাবা মারা গেলেন। বারীন নিজে ওখানে যাবে না, তাই মা-কে দেখভাল করার জন্য বন্ধু অনিমেষকে ওখানে গিয়ে থাকতে অনুরোধ করে। এখন অবশ্য মা-ও নেই। তবে শেষদিন পর্যন্ত অনিমেষ বারীনের অসুস্থ মা-কে দেখাশুনা করেছে। অনিমেষ ছাড়াও আরও দুয়েকটা কানেকশন বেরিয়ে গেল।
কথাচ্ছলে বারীন বলল, “আমি তোমাকে পলিসি বেচলুম না বটে, কিন্তু দীপাবউদি হয়তো বেচে দেবেন, সতর্ক থেকো।”
“দীপাবউদিও ইন্সিওরেন্সের এজেন্ট নাকি?”
“এই কিছুদিন হল হয়েছে। এখন আমরা ফিয়ার্স কম্পিটিটর। এই যে তোমার সঙ্গে আড্ডা মারছি, দীপাবউদি নিশ্চয় ভাবছে, তোমাকে কবজা করার চেষ্টা করছি।”
আমি বললাম, “তাহলে তো ভালোই হল, আমাকে ইন্সিওরেন্স বেচতে এলে বলে দেব, তুমি অলরেডি কিনিয়ে দিয়েছ।”
“ওরে বাবা, ওটি কোরো না, তাহলে আমার লাইফ হেল করে দেবে।” বলে বারীন আবার হা হা করে হাসলো।
.
বিজয়বাবুদের সঙ্গে বারীনের খুবই বন্ধুত্ব, সেটা অবশ্য ক’দিনের মধ্যেই বুঝলাম। মাঝেমাঝেই সন্ধ্যাবেলায় বিজয়বাবুদের বাড়ি থেকে হই-হুঁল্লোড়ের আওয়াজ আসে, তাতে বারীনের গলাও পাওয়া যায়। এর মধ্যে একদিন সন্ধ্যায় বারীন এসে বলল, “এই বাপি, কী করছ?”
“বই পড়ছিলাম, কেন বল তো?”
“তাহলে এসো।”
“কোথায়?”
“বিজয়দার বাড়িতে। তুমি নিউ ইয়র্কে থাক শুনে শেখরদা তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চায়।”
“শেখরদা কে?”
“আমার বহুদিনের চেনাজানা। ওঁর ছোটো শালা নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাচ্ছে। যেই বললাম তুমি ওখানে পড়াও, শেখরদা আর শীলা দুজনেই চেপে ধরল, এক্ষুনি আলাপ করিয়ে দাও। সুতরাং দেরি নয়, এসো আমার সঙ্গে।”
ওর ব্যস্ততা দেখে আমি হেসে ফেললাম, “তা আসছি, কিন্তু ছেলেটি যখন নিউ ইয়র্কে যাবে, আমি তো তখন এখানে?”
“হু কেয়ার্স! আর কিছু না হোক, আচ্ছা তো হবে!”
বুঝলাম, এটা একটা ছুতো, আমাকে ওখানে টেনে নিয়ে যাবার অজুহাত খুঁজছে বারীন।
.
খানিকবাদে বিজয়বাবুর ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখলাম কয়েকটি অপরিচিত মুখ। বারীনের শেখরদা বেশ দিলখোলা লোক। আমাদের থেকে বয়সে খুব একটা বড় নন। কিন্তু হাবেভাবে মনে হয় জ্যাঠামশাই! আপনি ফাপনি নয়, সোজা তুমি দিয়েই শুরু করলেন। তারপর বললেন, “কী চটলে নাকি?”
“কেন বলুন তো?”
“এই যে “তুমি’ বলছি।”
আমি হেসে বললাম, “আমি আপত্তি করলে আপনি শুনবেন?”
“শুনতে চেষ্টা করব, তবে মাঝে মাঝে ভুল হবে। আসলে এখানে আপনি বলার মতো রয়েছে শুধু বিজয়দা। তাও বিয়ের ব্যাপারে আমি বিজয়দার থেকে সিনিয়র, বুঝলে? আমাদের বিয়ে হয়েছে এইটিন ইয়ার্স। দাঁড়াও দাঁড়াও, সেখান থেকে আবার শীলার বয়স হিসেব করার চেষ্টা কোরো না, বিয়ের সময় শীলার বয়স ছিল মাত্র ষোলো। তারপর চোখ টিপে বললেন, বিয়েটা বে-আইনী বুঝতেই পারছ।”
“ক্রেডল স্ন্যাচার!”
এতক্ষণ নজরে পড়েনি। ঘরের কোণে জিনস আর হালকা-সবুজ টপ পরা একটা মেয়ে বই মুখে দিয়ে বসেছিল। বেশ মিষ্টি চেহারা। বড় বড় চোখ, ঘন কোঁকড়া চুল, গাঢ় করে লিপস্টিক মাখায় ঠোঁটটা একটু পুরু লাগছে। বয়স ষোলো-সতেরোর মধ্যেই হবে। মন্তব্য করেই আবার বইয়ে চোখ রাখল।
শেখরদা আমাকে বললেন, “আমার মেয়ে, ভাস্বতী।”
আমি হাতটা একটু তুলে ‘হ্যালো’ বললাম।
“হ্যালো,” অত্যন্ত দায়সারা ভাবে উত্তর দিয়ে মেয়েটা আবার বইয়ে মুখ গুঁজল।
.
এই বয়সে বাবা-মায়ের বন্ধুদের পার্টিতে কেউ উৎফুল্ল হয়ে আসবে আশা করি না। কিন্তু ভাস্বতাঁকে মনে হল একটু বেশি চুপচাপ। যতক্ষণ ছিলাম বই মুখে দিয়ে বসে রইল। যে বইটা পড়ছিল, সেটা আমারও আছে। অক্সফোর্ড প্রেস-এর এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইণ্ডিয়ান সিনেমা, পাঁচ-ছশো পাতার একটা বিশাল বই। নিশ্চয় সিনেমার পোকা। সেই সূত্র ধরেই বেশ কয়েকবার ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলাম, তারপর হাল ছেড়ে দিলাম। ও-ও বোধহয় হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
বারীন আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ভাস্বতী এখন এ জগতে নেই। সিনেমা ভালোবাসে বলে কী কুক্ষণে ক’দিন আগে বইটা ওর জন্মদিনে দিয়েছিলাম!”
বইটা সস্তা নয়। হার্ড কভারের এই বইটা আমিই সেল-এ প্রায় ৫০ ডলার দিয়ে কিনেছিলাম। এখানেও নিশ্চয় কয়েক হাজার টাকা দাম হবে। ইন্সিওরেন্স বেচে বারীন মনে হয় ভালোই টু-পাইস কামাচ্ছে।
“উপহারটা তো ভালোই দিয়েছ।”
“যা বলেছ। শীলা এখন আমাকে শাসাচ্ছে। আগে যদিও বা দুয়েকটা কথাবার্তা বলত, এখন বইটা মুখেই পড়ে থাকে।“
.
ভাস্বতীর মা শীলা অবশ্য তার উলটো। শেখরদার মতোই হইচই করতে ভালোবাসে। “আমিও কিন্তু তোমাকে আপনি, টাপনি বলতে পারব না, যতই প্রফেসর হও।” প্রথমেই ঘোষণা করল শীলা। “আর তুমিও আপনি আজ্ঞে করবে না, নাম ধরে ডাকবে। এই শর্ত যদি মানতে না পারো, তাহলে আর কথা বোলো না।”
এর পর আর আপনি বলা যায় কী করে?
.
চেহারার দিকে থেকে শেখরদা আর শীলা– দু’জনেই মডেল হবার উপযুক্ত। শীলার দুয়েকটা ছবি, মনে হল বিজ্ঞাপনে বোধহয় দেখেওছি। একটু আমতা আমতা করে কথাটা জিজ্ঞেসই করে ফেললাম।
শীলা শেখরদাকে দেখিয়ে বলল, “ওকে বলো না, আজেবাজে মেয়েদের ছবি না দিয়ে বউয়ের ছবি দিতে!”
“শেখরদা একটা অ্যাড-এজেন্সিতে কাজ করেন, বারীন বলল।
শীলাকে কেন দেখেছি মনে হচ্ছিল পরে অবশ্য বুঝলাম। একটা বাংলা চ্যানেলে শীলা মাঝে মাঝে খবর পড়ে।
.
আড্ডাকে জমিয়ে তোলার জন্য খাদ্য ও পানীয়ের আয়োজনও দেখলাম প্রচুর। গরম গরম শিঙাড়া, মিটরোল, আর চিকেন টিক্কার পাশে সাজানো রয়েছে হুইস্কি, আর রামের বোতল।
পানীয়-সেবন আগে থেকেই চলছে। প্রত্যেকের হাতেই একটা করে গ্লাস।
দীপাবউদি বললেন, “দেশের হুইস্কি আপনার কেমন লাগবে জানি না। ট্রাই করতে পারেন। ফ্রিজে বিয়ারও আছে। কী দেব আপনাকে?”
যেটা খেতে ইচ্ছা করছিল সেটা হল গরম শিঙাড়ার সঙ্গে চা। কিন্তু গৃহকত্রীকে তার জন্য বিব্রত করতে চাইলাম না।
“না, আমার কিছু লাগবে না।”
শীলা আমার দিকে কটাক্ষ হেনে বলল, “গুডবয়, মদ্যপান কর না– ঠিক?”
“তা ঠিক নয়, আজ ইচ্ছে করছে না।”
“তাহলে কোল্ড ড্রিংক নাও।”
টেবিলের এক কোণে কয়েকটা সফট ড্রিংক-এর বোতল ছিল, আগে নজরে পড়েনি। শীলাকে সন্তুষ্ট করতেই তার থেকে একটা তুলে নিলাম।
শেখদা দেখলাম হুইস্কির বোতল আর বরফের পাত্রটা নিয়ে শীলা আর দীপাবউদির গ্লাস দুটো ভর্তি করছেন। নিজের পাত্রে বরফের থেকে হুইস্কিই ঢাললেন বেশি। বারীন রেফ্রিজারেটর থেকে একটা বিয়ারের বোতল বার করে এনে বিজয়বাবু আর নিজের জন্য দুটো গ্লাসে ঢালল।
“আবার তোমরা ড্রিংকস মিক্স করছ?” দীপাবউদি বারীন আর বিজয়বাবুকে ধমকের সুরে বললেন।
“সরি ম্যাডাম,” মুচকি হেসে বাঁ-হাতে দীপাবউদির কোমর জড়িয়ে ডান হাতে নিজের গ্লাসটা তুলে বারীন বলল, “চিয়ার্স।”
“চিয়ার্স।”
“বাপি, শিঙাড়াটা খান,” দীপাবউদি বললেন। “গোপালের শিঙাড়া। ফুলকপির এমন শিঙাড়া আমেরিকাতে পাবেন না।”
খেয়ে দেখলাম সত্যিই চমৎকার! আমেরিকা কেন, কলকাতাতেও এমন খাইনি।
“দীপাবউদিকে ক্রেডিট দিও না। দোকানটা আমার আবিষ্কার।” বারীন বলল।
মিটরোল আর চিকেন টিক্কার স্বাদও মনে রাখার মতো।
খেতে খেতেই বললাম, “নাঃ, এই জায়গাটা সম্পর্কে আমার ধারণাটা পালটাতে হচ্ছে।”
বিজয়বাবু আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। “ওর নাম গে, তার মানে?” এই প্রথম উনি মুখ খুললেন।
“মানে এখানে এসে মশার কামড়ে এত বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম, যে ভালো দিকগুলো চোখে পড়েনি। যেমন, এইরকম খাবার।”
“শুধু খাবার, আমরা বুঝি বাদ?” শীলা হুইস্কির গ্লাসটা গালের পাশে ধরে মধুর হেসে আমার দিকে তাকাল।
বারীন শীলার পাশে বসেছিল। কানে কানে কিছু বলাতে শীলা ব্লাশ করল। কী বলল জানি না, আমি একটু অপ্রস্তুত বোধ করলাম।
শীলা হঠাৎ উঠে এসে আমার কনুইটা ছুঁয়ে বলল, “পালিও না, আমি এক্ষুনি আসছি।” বলে পাশের ঘরে অদৃশ্য হল।
বিজয়বাবু শীলার শূন্য চেয়ারে বসে বারীনকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওর নাম গে, প্রমোটারের সঙ্গে তোমার ডিল ফাইনাল? ক’টা ফ্ল্যাট পাচ্ছো?”
“দুটো। কিন্তু আপনারা আমার হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। আমি কোথাও যাচ্ছি না, এখানেই থাকব আর আপনাদের জ্বালাব।”
“বেশ তো, জ্বালাও না।”
“কোম্পানি, বুঝলে বাপি কোম্পানি– সেটাই হল মোস্ট ক্রিটিক্যাল।” শেখরদা একটু ঢুলু ঢুলু চোখে বললেন, মনের মতো লোক না থাকলে, আড্ডা দেওয়া যায় না। আর আড্ডাই জীবন।”
নেশাটা ধীরে ধীরে সবারই চড়ছে।
বারীন ইতিমধ্যে ভাস্বতীর পাশে ধপ্ করে বসে কী একটা বলতে গেল।
“গো অ্যাওয়ে।” মাছি তাড়ানোর মতো করে ভাস্বতী বারীনকে তাড়াল। মেয়েটা ডেফিনেটলি অবনক্সাস।
দীপাবউদি আমার পাশে বসেছিলেন। তিনিও লক্ষ্য করলেন ব্যাপারটা। নীচু গলায় আমাকে বললেন, “শীলা একদম বোঝে না, এতদিন ধরে মেয়েটাকে বাড়িতে রেখে বাইরে বাইরে পার্টি করে বেড়িয়েছে, এখন হঠাৎ সঙ্গে এনে নজরদারি করতে চাইলে মানবে কেন?”
আমি এঁদের কাউকেই তেমন চিনি না, সুতরাং চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে হল।
শীলা ইতিমধ্যে ফিরে এসেছে। “এই, তুমি এদিকে একটু এসো,” বলে আমার হাত ধরে প্রায় টেনে আমায় জানলার পাশে নিয়ে গিয়ে কাজের কথাটা পাড়ল। ওর ভাই। নেক্সট উইকেই নিউ ইয়র্ক যাচ্ছে। আমি প্রমথর ফোন নম্বর দিলাম যোগাযোগ করার জন্য। প্রমথকে ওর ভাইয়ের যাবার কথাটা জানিয়ে দেব সেটাও বললাম।
“ভুলে যাবে না তো? আমি কিন্তু তোমায় ফোন করব।”
“ভুলব কেন!”
“তাও যদি ফোন করি?”
“নিশ্চয় করবে, কী আশ্চর্য!”
“বেশি গায়ে পড়া ভাববে না তো?”
আমি হাসলাম।
শুনতে পেলাম শেখরদা বারীনকে ডাকছেন, “এই বারীন, কোথায় তুমি?”
বারীন একটু দূরে, বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভাস্বতীর সঙ্গে কথা বলছিল। আমরা যেখানে সেখান থেকে বাথরুমের দরজা একটুখানি দেখা যায়। শেখরদা যেখানে সেখান থেকে কিছুই যায় না। ওখানে দাঁড়িয়েই বারীন উত্তর দিল, “আসছি, বলুন।”
“আমাদের বোট-এ আর জায়গা নেই? বাপিকে আসতে বল না?”
“কেষ্টবাবুকে জিজ্ঞেস করতে হবে।”
আমি শেখরদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী ব্যাপার?”
ইতিমধ্যে বারীন বসার ঘরে ফিরে এসেছে। বারীনই উত্তর দিল, “এই শনিবার একটা হাউসবোট ভাড়া করেছি দু’দিনের জন্য। গঙ্গায় বেড়াব– শুধু আমরা। ইন্টারেস্টেড? তাহলে দেখব আরেকটা জায়গা ম্যানেজ করা যায় কিনা। অবশ্য নো গ্যারান্টি।”
“এখানে হাউসবোট ভাড়া পাওয়া যায়?” আমি একটু অবাক হলাম।
“আগে যেত না, এখন যায়। কেরল থেকে বেশ কয়েকটা এসেছে। চমৎকার বোটগুলো। যাবে কিনা বল?”
“ইচ্ছে খুবই করছে, কিন্তু এ যাত্রায় হবে না। মাকে নিয়ে এক জায়গায় যাবার কথা আছে।”
“তাহলে তো আর হল না। কিন্তু পরের বার কোনও অজুহাত চলবে না।”
দুই
মা’কে সাত দিনের জন্য বাণীপুরে মাসির বাড়িতে রেখে সোমবার ট্রেন ধরে ফিরছি। সকাল সকাল বলে ট্রেনটা একটু ফাঁকা। হাত-পা ছড়িয়ে পত্রিকা উলটোতে উলটোতে একটা ছোট্ট খবর চোখে পড়ল।
প্রমোদতরি থেকে নিখোঁজ
গঙ্গায় হাউসবোটে বেড়ানোর সময়ে সতেরো বছরের
একটি মেয়ে অদৃশ্য হয়েছে। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
খবর বলতে এইটুকুই। প্রথমে এ নিয়ে কিছু ভাবিই নি। হঠাৎ মনে পড়ল, বারীনরা তো ওই সময়ে গঙ্গায় বেড়াচ্ছিল! মেয়েটা কি ভাস্বতী হতে পারে? অশুভ চিন্তা একবার পেয়ে বসলে যেতে চায় না। সেটা দূর করার জন্যেই বারীনকে ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম। ফোনটা সুইচড অফ। বাকি পথটা কিছুটা উৎকণ্ঠার মধ্যেই কাটল। বাড়িতে পৌঁছলাম সাড়ে ন’টা নাগাদ। বারীনের অ্যাপার্টমেন্টে দেখলাম তালা ঝুলছে। সিঁড়ি দিয়ে যখন উঠছি, বিজয়বাবু নামছেন। চেহারা দেখেই বোঝা যায়, একটা ঝড় বয়ে গেছে ওঁর উপর।
আমাকে দেখে দোতালার ল্যান্ডিং-এ দাঁড়ালেন। “ওর নাম গে, শুনেছেন তো?”
আমার মুখ দিয়ে ফট করে বেরিয়ে গেলো, “ভাস্বতী?”
“নেই। নিখোঁজ!”
“নিখোঁজ মানে?”
বিজয়বাবুর তাড়া ছিল, দোকান খুলতে যাচ্ছেন। যেটুকু জানলাম, সেটা হল শনিবার রাত সাড়ে বারোটার একটু আগেও লঞ্চের পেছনে বসে মেয়েটা বই পড়ছিল। তার একটু পরেই বিজয়বাবু যখন সেখানে যান, ওর কোনও চিহ্ন নেই। ভ্যানিশ্চ!
অনেক প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কিন্তু বিজয়বাবু আর দাঁড়াতে পারলেন না।
জিজ্ঞেস করলাম, “দীপাবউদি বাড়িতে আছেন?”
উনি নামতে নামতে বললেন, “ওর নাম গে, ও আর বারীন একটা ট্রেনিং প্রোগ্রাম-এ তিন দিনের জন্য দুর্গাপুর গেছে।”
বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলাম। ভাস্বতীর মুখটা বারবার চোখে ভাসছিল। অল্পক্ষণের জন্যেই ওকে দেখেছি, তাও মুখটা একেবারে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছিল। শীলা আর শেখর-দা নিশ্চয় ডিভাস্টেটেড। মনে পড়লো শীলাকে কথা দিয়েছিলাম, প্রমথকে ওর ভাইয়ের কথাটা জানাব। এই মুহূর্তে দ্যাট মাস্ট বি লাস্ট থিং ইন হার মাইন্ড। তবু প্রমথকে ফোন করলাম। কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভালো বোধ করব। প্রমথ নেই, ফোন ধরলেন একেনবাবু।
“কেমন আছেন স্যার?”
“ভালো নেই।”
“কেন স্যার?”
“আমার চেনা একটি মেয়ে গঙ্গায় বেড়ানোর সময়ে হাউসবোট থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়েছে।”
একেনবাবু আমার কথাটা ঠিক ধরতে পারলেন না। “কতদূরে গিয়েছিল বোটটা সমুদ্রের কাছাকাছি?”
“আরে না, বোটের কিছু হয় নি। শুধু মেয়েটা বোট থেকে অদৃশ্য হয়েছে।”
“কী করে?”
“গড নোজ। হয়তো সুইসাইড। অন্য সম্ভাবনা হল খুন, যদি না অ্যাকসিডেন্টালি জলে পড়ে গিয়ে থাকে।”
“সবই সম্ভব স্যার, যদি মনে করেন শি ইজ ডেড।”
“তার মানে?”
মানে স্যার, নিখোঁজ তো অন্য কারণেও হওয়া সম্ভব। হয়তো কোনও লোকের সঙ্গে মেয়েটা পালিয়েছে।”
“হাউ ইজ ইট পসিবল, গঙ্গার মাঝখানে?”
“কখন অদৃশ্য হয়েছে স্যার?”
“মাঝরাতে।”
“বোটটা চলছিল?”
জানি না, তবে অত রাতে বোধহয় নয়।”
“আগে থেকেই হয়তো প্ল্যান করা ছিল স্যার। হাউসবোটে কেউ এসে নৌকো লাগিয়েছে, তাতে উঠেই মেয়েটা চলে গেছে।”
“পালাতে চাইলে তো মেয়েটা বাড়ি থেকে পালাতে পারত! মাঝগঙ্গা থেকে এত কষ্ট করে পালানোর মানেটা কী?”
“গুড পয়েন্ট স্যার। তবে কিনা এক্ষেত্রে পুলিশ আর হয়তো তেমন খোঁজ খবর করবে না। বডি না পাওয়া গেলে ধরে নেবে জলে ভেসে গেছে।”
এই অ্যাঙ্গেল থেকে অবশ্য আমি ভাবিনি।
“কিন্তু এই ভাবে তো মেয়েটাকে একা পেয়ে কেউ অ্যাবডাক্টও করতে পারে!”
“তাও পারে স্যার।”
“তাহলে তো আরেকটা পসিবিলিটি বাড়ল?”
“তা বাড়ল স্যার।”
ভেরি ট্রাবলিং… আর যদি মার্ডার হয়, তাহলে ওই হাউসবোটে যারা ছিল তাদেরই কেউ নিশ্চয় করেছে। সবাই চেনাজানার মধ্যে।”
“এখনই এত দুশ্চিন্তা করছেন কেন স্যার, পুলিশ নিশ্চয় ইনভেস্টিগেট করছে।”
“ধরে নিচ্ছি করছে। আপনার তো সব চেনাজানা লোক, একটু খোঁজ করবেন?”
একেনবাবু এককালে কলকাতা পুলিশে বেশ কয়েক বছর কাজ করেছেন। এখন অবশ্য নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ক্রিমিনোলজি ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যুক্ত, গেস্ট লেকচারার। সাইডে কিছু কিছু গোয়েন্দাগিরি করেন। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সঙ্গেও বেশ ভালো যোগাযোগ আছে।
“আপনি যখন এত দুর্ভাবনা করছেন স্যার, তখন খোঁজ নেব।”
“থ্যাঙ্ক ইউ। ভালো কথা, প্রমথকে বলবেন আমাকে ফোন করতে। একটি ছেলে আমাদের ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাচ্ছে। যদি কোনও সাহায্যের দরকার হয়, একটু যেন দেখে।”
“ছেলেটি কে স্যার?”
“যে মেয়েটার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, তার মামা।”
“আমাকে নামটা দিয়ে দিন। দরকার হয় আমি দেখব।”
নামটা দিয়ে বললাম, “থ্যাঙ্ক ইউ, আপনি ব্যস্ত মানুষ।”
“কী যে বলেন স্যার, কলকাতার ছেলে, তাকে একটু দেখতে পারব না?”
.
স্নানটান সেরে রেডি হয়ে বেরোতে বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেল। অফিসের কাছাকাছি যখন পৌঁছেছি, তখন ডিপার্টমেন্টের ক্লার্ক নিতাইবাবুর ফোন পেলাম।
“আপনি কি আজ আসছেন?”
“হ্যাঁ। কেন বলুন তো?”
“আপনার জন্য এক ভদ্রলোক বেশ কিছুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন।”
“আমার জন্য! কে?”
“বললেন তো আপনার বন্ধু, অনিমেষ দত্ত।”
“আমার ঘরে বসান, আমি পাঁচ সাত মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাব। কিন্তু বলে দেবেন দুটোর সময় আমার সেমিনার আছে, বেশিক্ষণ কথা বলতে পারব না।”
.
গতবার এসে অনিমেষের সঙ্গে কয়েকবার দেখা হয়েছে। অনিমেষের মামার বাড়ি আমাদের পুরোনো পাড়ায়। মাঝেমাঝেই ও সেখানে আসত। ছেলেটা পড়াশুনোয় ব্রিলিয়ান্ট ছিল, গানও ভালো গাইত। কিন্তু এম.এসসি পড়তে পড়তেই রাজনীতিতে এমন মাতল, পড়াশুনো উঠল মাথায়। কোনওমতে সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে পাশ করে কিছুদিন এদিক ওদিক করে এখন একটা স্কুলে ফিজিক্স পড়াচ্ছে। টাকাকড়ির অবশ্য অভাব নেই। স্কুলের মাইনের থেকে অনেক বেশি আয় টিউশানিতে। বাড়ির ছাদে একটা বড় ঘর ছিল। সেখানে গ্যালারির মতো চেয়ার বসিয়ে একসঙ্গে কুড়িজনকে পড়ায়! তার সঙ্গে তুলনা করলে আমার নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির দুটো গ্র্যাজুয়েট ক্লাসেও বারোজনের বেশি ছাত্র জোটে না।
.
ঘরে ঢুকে দেখি অনিমেষ বসে আছে। মুখ দেখেই বোঝা যায় বেশ চিন্তিত।
“কীরে, তুই? কেমন আছিস?”
“নট শিওর, তোর একটু সাহায্যের দরকার।”
“কী ব্যাপার?”
“কালকে দুর্ঘটনার কথা শুনেছিস তো?”
“কালকের দুর্ঘটনা!” আমি চট করে ধরতে পারলাম না। তারপরেই খেয়াল হল অনিমেষ বারীনের বন্ধু। “তুই কি ভাস্বতীর…।”
আমায় কথাটা শেষ করতে দিল না অনিমেষ। বলল, “আমিও ছিলাম ওদের সঙ্গে।”
“মাই গড, কী হয়েছিল বল তো?”
“অ্যাবসোলুটলি স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার। রাত সাড়ে বারোটার একটু আগেও ভাস্বতী ডেকে বসেছিল। তার অল্প কিছুক্ষণ বাদে বিজয়দা গিয়ে ওকে দেখতে পাননি। তবে ও যে বোটে নেই সেটা জানতে পারা যায় প্রায় ভোর চারটের সময়ে, যখন শেখদা মেয়েকে ঘরে না দেখে বাইরে আসেন। খোঁজাখুঁজি করে কোথাও না পেয়ে আমাদের সবাইকে ডেকে তোলেন।”
“দাঁড়া দাঁড়া, অত রাত্রে মেয়েটা ওখানে একাই বসেছিল?”
“হ্যাঁ, আমরা সামনের ডেকে গল্পগুজব করছিলাম। কিছুক্ষণ ও আমাদের সঙ্গে ছিল, একটা কোণে বই নিয়ে বসেছিল। তারপর একসময়ে উঠে পেছনের ডেকে চলে যায়।”
“কখন?”
“বলতে পারব না, খেয়াল করিনি।”
“তারপর?”
“তারপর আর কী? বারীনদের পার্টিতে যা হয়, অজস্র মদ্যপান আর ঢলাঢলি। গিয়েছিলাম নিতান্ত বারীনের চাপে পড়ে। আমি ওদের মতো মদও গিলতে পারি না, আর তোকে ফ্র্যাঙ্কলি বলছি, শীলা আর ওর মেয়েকে আমি একটু এড়িয়েই চলি।
কথাটা খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ। তাই বোধহয় বলেই অনিমেষ একটু লজ্জা পেল। আই মিন ড্রিংক করলে শীলা বড্ড গায়ে এসে পড়ে। খারাপ কিছু নয়, শুধু আমার অস্বস্তি হয়।”
“তা তো বুঝলাম, কিন্তু ভাস্বতী কী দোষ করল?”
“আমি ওকে মাস দুই প্রাইভেট পড়িয়েছিলাম। ওর একটু ইয়ে আছে।”
“তার মানে?”
“মানে পড়াশুনোর থেকে ছেলেদের দিকেই ওর বেশি ইন্টারেস্ট। আমার সঙ্গেও ফাজলামির চেষ্টা করত। একবার তো একটা বাজে ক্যারেক্টারের সঙ্গে… যাই হোক, ওটা শোনা কথা।”
ওসব নোংরামি নিয়ে আর প্রশ্ন বাড়াতে চাইলাম না। “ঠিক আছে, ঠিক আছে, বুঝলাম, কিন্তু আমার কাছে কী সাহায্য চাইছিস?”
“সেটাই বলছি। ভাস্বতাঁকে লঞ্চে শেষ দেখি আমি আর বারীন। তারপর থেকে ও অদৃশ্য। পুলিশের যে কর্তাটি তদন্ত করছেন, তিনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন আমরা ওঁর কাছে অনেক কিছু লুকোচ্ছি। বারবার একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করছেন। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক জেরা করার পরে বলেছেন, আমরা যেন ওঁকে না জানিয়ে কোথাও না যাই। বারীনকে পারমিশন দিয়েছেন ট্রেনিং প্রোগ্রামে যেতে, কিন্তু আমার কলকাতার বাইরে যাওয়া বারণ।”
“কিন্তু পুলিশ তো এইভাবেই তদন্ত করে। তুই ক্লিন, তুই এত চিন্তা করছিস কেন। আর তুই একা তো নোস, বারীনও তো ছিল।”
“তুই বুঝছিস না। পুলিশ কেয়ার লেস অ্যাবাউট সলভিং দ্য কেস। কিন্তু এই ফাঁকে আমাদের ভয় দেখিয়ে যদি টু-পাইস কামাতে পারে, তারই ধান্ধায় আছে।”
“তুই বলছিস ক্লিন চিট পেতে তোকে পয়সা দিতে হবে?”
“ঠিক ধরেছিস।”
“মাই গড! কিন্তু এ ব্যাপারে আমি কী সাহায্য করতে পারি? তুই তো জানিস এখানে আমার কোনও কানেকশন নেই, আমি সাধারণ একজন প্রফেসর।”
আমার ভয় হচ্ছিল অনিমেষ পাঁচ-দশ হাজার ডলার চেয়ে বসবে। এর আগেও অন্য একটা ব্যাপারে ধার চেয়েছিল। সেবার কোনও মতে কাটিয়েছিলাম।
“তোর বন্ধু একেনবাবুর সাহায্য চাই। আমি শিওর হি উইল ফিগার আউট ঠিক কী হয়েছে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এখানকার পুলিশের উঁচু মহলে ওঁর সুনাম আছে। উনি ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজখবর করছেন জানলে খুদে অফিসাররা এইভাবে হ্যারাস করতে পারবে না।”
“একেনবাবুর সঙ্গে আজ সকালে আমার কথা হয়েছে। কিন্তু…।”
“কিন্তু না ভাই, তোকে এটা করতেই হবে। একেনবাবুর প্রাপ্য ফি দেবার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু ভাস্বতীর কী ঘটেছে, তা আমরা সবাই জানতে চাই। একটা সম্মান দক্ষিণা নিশ্চয় সবাই মিলে আমরা দেব।”
“তা না হয় দিবি, কিন্তু উনি তো এখানে নেই। অত দূরে বসে কী করতে পারেন?”
“তাও তুই ওঁকে বল। উনি যা জানতে চান, সব আমরা জানাব। তুই ওঁর হয়ে আমাদের প্রশ্ন কর।”
“আচ্ছা দেখি, এখন তো নিউ ইয়র্কে রাত। আজ রাতে ধরার চেষ্টা করব।”
“কখন ফোন করবি?”
“ধর আটটা নাগাদ। ওখানে তো এখন ডে-লাইট সেভিংস চলছে, তার মানে নিউ ইয়র্কে তখন সকাল সাড়ে দশটা… কথা বলার ভালো সময়।”
“ডে-লাইট সেভিংস’ কী?”
“এক ঘণ্টা সময় এগিয়ে দেওয়া। ওটা নিয়ে ভাবিস না।”
“তাহলে আমি ঠিক আটটার সময়ে তোর বাড়িতে আসব। তুই তো বারীনের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এ আছিস, তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“আমি ওখানেই যেতাম, কিন্তু মনে হল এখানেই তোকে সহজে ধরতে পারব।”
দুটো প্রায় বাজে। আমি ঘড়ি দেখছি দেখে অনিমেষ নিজেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল, “ওই যাঃ, তোর সেমিনারে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন চলি, রাতে দেখা হবে।”
.
সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় আমি একেনবাবুকে স্কাইপে ধরলাম। স্কাইপ-এর সঙ্গে হয়তো সবাই পরিচিত নন। এটা একটা ফ্রি সফটওয়্যার। যাদের কম্পিউটারে ক্যামেরা আর ব্রডব্যান্ড কানেকশন আছে, তারা এটা ব্যবহার করে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্ত থেকে নিজেদের মধ্যে ভিডিওতে কথা বলতে পারে।
আমি সংক্ষেপে অনিমেষের পরিচয় দিলাম। তারপর ওর সঙ্গে সকালে যা কথা হয়েছে। সংক্ষেপে বলে ওর অনুরোধটা জানালাম। একেনবাবুকে অবশ্য সংক্ষেপে কিছু বলা কঠিন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানান প্রশ্ন করলেন। তারপর বললেন, “আপনার বিশেষ বন্ধু স্যার?”
“বিশেষ না হলেও বন্ধু তো বটেই।”
“আপনি স্যার কী বলেন?”
“আমি আর কী বলব?”
একেনবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “আপনি যদি সঙ্গে থাকেন, আমি আছি স্যার।”
পেছন থেকে শুনি প্রমথ টিপ্পনী কাটছে, “বাপিকে অ্যাসিস্টেন্ট বানিয়ে লং ডিস্টেন্স ডিটেকটিভগিরি করবেন, আপনার সাহস আছে বটে।”
আমি বললাম, “লুকিয়ে লুকিয়ে কমেন্ট করছিস কেন, সামনে এসে কর।”
প্রমথ গলা বাড়িয়ে ক্যামেরার সামনে মুখটা এনে বলল, “গো টু হেল!”
বলেই আমাকে কোনও উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়ে অদৃশ্য হল। টিপিক্যাল প্রমথ।
আমি একেনবাবুকে বললাম, “আটটার সময় অনিমেষ এখানে আসবে। আপনি কি ওঁর সঙ্গে কথা বলবেন?”
“নিশ্চয় স্যার। তার আগে, আপনি এদের সবার ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে এখন পর্যন্ত যা যা ঘটেছে বলুন।”
আমি পার্টিতে সবার সঙ্গে পরিচয় হওয়া থেকে শুরু করে যা যা মনে পড়ল সবকিছুই বললাম।
“ইন্টারেস্টিং গ্রুপ,” একেনবাবু মন্তব্য করলেন। তারপর বললেন, “যাই বলুন স্যার, আপনার গড়িয়ার লাইফটা তো মনে হচ্ছে নিউ ইয়র্কের থেকে অনেক বেশি এক্সাইটিং।”
“তা যা বলেছেন। এরকম হ্যাঁজার্ডাস ড্রিঙ্কিং এই ধরণের মধ্যবিত্ত পাড়ায় দেখব কল্পনা করিনি। পুরুষ-মহিলা কেউই কম যান না।”
“আপনি মনে হচ্ছে স্যার একটু ডিসগাস্টেড?”
“তা ঠিক নয়, তবে এ ধরণের পার্টি ইজ ব্যাড ফর মাই স্টমাক এন্ড হার্ট।”
কথা বলতে বলতে দেখি আটটা বেজে দশ হয়ে গেছে। বললাম, “বুঝছি না অনিমেষের কি হল, আটটার সময় আসার কথা।”
ঠিক এমন সময়ে ডোর বেল। দরজা খুলে দেখি অনিমেষ।
“দেরি করলি যে?”
“দেরি কোথায়?”
আমারই বোঝা উচিত ছিল। কলকাতায় টাইম মাফিক কেউ চলে না। যাই হোক, আমি বাইরের ঘর থেকে একটা চেয়ার নিয়ে এসে অনিমেষের সঙ্গে কম্পিউটারের সামনে বসলাম। অনিমেষ তো স্কাইপ দেখে মুগ্ধ। মনিটরে একেনবাবুর মুখ দেখে বলল, “এ তো টেলিভিশনের সামনে বসে আছি!”
আমি একেনবাবুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম।
অনিমেষ ওর বিপদের কথা বিশদ করে বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু একেনবাবু বললেন, “আমি সব শুনেছি স্যার। আমার যেটুকু করার আমি করব। কিন্তু তার আগে আমায় পুরো ব্যাপারটা বুঝতে হবে।”
“আমাকে স্যার বলবেন না। নাম ধরেই ডাকবেন।”
“ওটা আমার হ্যাবিট স্যার।”
অনিমেষকে আমি বললাম, “তুই ওটা পালটাতে পারবি না, এখন উনি যা জানতে চাচ্ছেন বল।”
“বলুন, কী জানতে চান?”
“আমি স্যার সব কিছুই জানতে চাই… যা যা ঘটেছ, দরকারি অদরকারি সবকিছু।”
অনিমেষ একটু ভেবে শুরু করল। হপ্তাতিন আগে আমার বন্ধু বারীন, বাপি ওকে চেনে, এসে বলল যে, ওরা দু’দিনের জন্য বোট-পার্টি করছে। দু’হাজার টাকা লাগবে, খাওয়া থাকা সবকিছু ঐ টাকার মধ্যেই। তবে ড্রিংকস আলাদা। কিন্তু সেটার জন্য আমায় ভাবতে হবে না। আমি আসব কি না। আমি প্রথমে যেতে চাইনি। দু’দিনের জন্য দু’হাজার টাকা খরচ করতে গা খচখচ করছিল। তাছাড়া যে গ্রুপটা যাচ্ছে, তাদের সবার সঙ্গে আমার খুব বনেও না। কিন্তু বারীন এত জোরাজুরি করল যে, ‘না’ বলতে পারলাম না। যাই হোক, পরশুদিন, অর্থাৎ শনিবার সকালে আমরা হাউসবোটে উঠি।”
“কত বড় হাউসবোট স্যার?”
“ছোটো নয়, বেশ বড়ই।”
“একটু ডেসক্রিপশন দিন স্যার। ক’টা কেবিন, কতটা জায়গা…”
“গেস্টদের জন্য পাশাপাশি তিনটে বড় কেবিন, সবগুলোতেই অ্যাটাচড বাথরুম।”
“দাঁড়ান স্যার, পাশাপাশি মানে কী? অ্যালং না অ্যাক্রস?”
“অ্যালং। মানে বলতে চাচ্ছি, বোটের লম্বা দিক ধরে সারি করে তিনটে কেবিন।”
“এবার বুঝেছি স্যার।”
“বোটের সামনে একটা বড় ডেক। সেখানে খাবার আর বসার জায়গা। রান্নাবান্না করার কিচেন গেস্ট কেবিনগুলোর পেছনে। কিচেনের একদিকে ব্যাটারি আর জেনারেটরের ছাউনি, অন্যদিকে বোটের লোকেদের থাকার জায়গা। বোটের একদম পেছনে একটা ছোটো ডেক, সেখানেও কয়েকজন বসতে পারে। সামনে আর পেছনের ডেকে যাবার জন্য কেবিনগুলোর দু’পাশ দিয়ে ছোটো দুটো প্যাসেজ।”
“থ্যাঙ্ক ইউ সার। তারপর?”
“আমাদের পার্টিতে ছিল মোট সাত জন। আমি, বারীন, শেখরদা, বিজয়দা, গীতাবউদি, শীলা, আর ভাস্বতী। ভাস্বতী শীলা আর শেখরদার মেয়ে, যে নিখোঁজ হয়েছে।”
“হ্যাঁ স্যার, ওঁদের পরিচয় আমি বাপিবাবুর কাছে পেয়েছি। তিনটে কেবিন বললেন, আপনারা কে কোথায় ছিলেন?”
“একেবারে পেছনের কেবিনে আমি আর বারীন, মাঝের কেবিনে দীপাবউদি আর বিজয়দা, সামনের কেবিনে শীলা, শেখর-দা আর ভাস্বতী।”
“ঠিক আছে স্যার। বোটে আর কারা ছিলেন?”
বোটের পাইলট কেষ্টবাবু ছিলেন। মিডল-এজড ম্যান, বারীনের পরিচিত। শুনেছি বি.এ. পাশ করা বড়লোকের ছেলে। বাপের টাকাকড়ি খুইয়ে এখন এই ব্যাবসায় নেমেছেন। আর ছিল উনিশ কুড়ি বছরের একটা ছেলে, নাম মন্টু। একটু বোকাসোকা। ওর কাজ রান্না করা, বাসন মাজা, ঘরদোর পরিষ্কার রাখা আর গেস্টদের জন্য অন্যান্য খিদমত খাটা।”
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, বলতে থাকুন।”
“গঙ্গাবক্ষে বিহার মানে গঙ্গাবক্ষে বিহারই। কোথাও নামার কথা ছিল না। প্রোগ্রাম ছিল শনিবার সকাল ন’টায় রওনা দিয়ে বেশ কিছু দূর গিয়ে কোথাও নোঙর করে দাঁড়ানো। সেখানে রাত্রিটা কাটিয়ে রবিবার বিকেলে কলকাতায় ফিরে আসা। আমি প্রথমে না আসতে চাইলেও খুবই এনজয় করছিলাম সারাটা দিন। মন্টু রান্না খারাপ করে না। আর কেষ্টবাবুও বেশ মজাদার লোক। সামনের ডেক যেখানে শেষ হয়েছে, বোটের একদম মুখে পাইলটের জায়গা। সেখানে বসে বোট চালাতে চালাতে নানান গল্পে আমাদের মাতিয়ে রাখছিলেন। সন্ধেতে ঠিক কোথায় আমরা নোঙর করলাম বলতে পারব না, তবে গঙ্গা সেখানে বেশ চওড়া। দূরে একটা ঘাট দেখা যাচ্ছিল, কয়েকজন সেখানে স্নানটান করছিল মনে আছে। দুপুরে প্রচুর খেয়েছিলাম সবাই। রাত্রে খাবারের থেকে পানীয়ের আয়োজনটাই ছিল বেশি। বোট নোঙর করা হয়ে গেছে। আজকের মতো কেষ্টবাবুর পাইলটিং-এর কাজ শেষ। নিজের ঘরে যাবার আগে কেষ্টবাবু ঘোষণা করলেন, রাত ন’টার সময়ে জেনেরেটার বন্ধ করে দেওয়া হবে। তার আগেই যেন রাতের খাওয়া খেয়ে নিই।
“তারমানে? এখানে আলো থাকবে না?’ আমরা সবাই হইহই করে উঠলাম।
‘তা নয়, আলো থাকবে, হ্যারিকেনের আলো। ন’টার একটু আগে মন্টু এসে কয়েকটা হ্যারিকেন রেখে যাবে। সেগুলোও মন্টু এসে ঠিক সাড়ে বারোটার সময়ে নিয়ে যাবে।‘
শেখরদা সেটা শুনে প্রতিবাদ করলেন, এ আবার কী নিয়ম? ডেকে সাড়ে বারোটার পর থাকতে পারব না?’
‘তা পারবেন না কেন? কিন্তু আলো থাকবে না।‘
বারীনও বিরক্ত হয়ে বলল, না, সেটা হয় না। মহিলারা আছেন, একটা হ্যারিকেন অন্ততঃ জ্বলুক।’
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। মন্টুকে বলে দেব একটা হ্যারিকেন রেখে দেবে।“
“আর ঘরের আলো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
কেষ্টবাবু বললেন, ‘ঘরের কমজোরি আলো সবসময়েই থাকবে, ওটা ব্যাটারিতে চলে।”
“আমি একটু কনফিসড স্যার,” একেনবাবু অনিমেষের কথার মাঝখানেই বললেন, “হ্যারিকেন তো নিভিয়ে দিলেই হয়, সেগুলো তুলে নিয়ে যাবার কারণটা কী?”
“কেষ্টবাবু চলে যাবার পর সেটা নিয়েই আমাদের মধ্যে একটু আলোচনা হল। বারীন বলল, হয়তো চুরি হয়ে যাবে বলে।
মাঝগঙ্গায় কে হ্যারিকেন চুরি করতে আসবে? হোয়াট ননসেন্স!’ শেখরদা বললেন।
‘আমার কিন্তু ভয় করছে,’ দীপাবউদি বললেন, ‘জায়গাটা সেফ তো?’
‘খুবই নিরাপদ, বারীন সবাইকে আশ্বস্ত করল। কেষ্টবাবু দু’বছর ধরে এই ব্যাবসা করছেন, কোনও সমস্যা হয়েছে বলে তো শুনিনি।’
যাইহোক রাতের খাওয়াটা গৌণ। খাওয়া দাওয়ার পর পানীয়ের আসর বসল। শেখরদা আর বারীন গান ধরল। আমিও দুয়েকটা গান গাইলাম। ন’টা বাজার ঠিক কয়েক মিনিট আগে মন্টু এসে চারটে হ্যারিকেন রেখে গেল। কেষ্টবাবু আমাদের গুডনাইট বলতে এলেন।
বারীন কেষ্টবাবুকে বলল, “আপনিও বসুন না, আমাদের সঙ্গে?”
‘না, আমি যাই।‘ বুঝলাম সংকোচ বোধ করছেন।
‘খালি হাতে যাবেন কেন,’ বারীন একটা গ্লাসে মদ ঢেলে কেষ্টবাবুকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা নিয়ে যান।‘
কেষ্টবাবু সেটা নিতেও অস্বস্তি বোধ করছেন দেখে বারীন বলল, ‘আরে মশাই, আপনি তো আর মদ খেয়ে বোট চালাচ্ছেন ন। অফ ডিউটিতে খাচ্ছেন। কালকে যখন চালাবেন, এক ফোঁটা অ্যালকোহলও থাকবে না শরীরে।‘
তাতেই কাজ হল, গ্লাসটা হাতে নিয়ে ‘গুডনাইট’ বলে কেষ্টবাবু বিদায় নিলেন। এর কয়েক মিনিট বাদেই আলো নিভে গেল।
তখন বোধহয় শীলার খেয়াল হল, ভাস্বতী নেই। ‘ভাস্বতী কোথায়?
ভাস্বতী পেছনের ডেকে চলে গেছে অনেক আগেই। আমি মধ্যে একবার বাথরুমে গিয়েছিলাম। ফেরার সময়ে দেখেছিলাম ও পেছনের ডেকে বসে বই পড়ছে। আমায় দেখতে পেয়ে হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল। ভাস্বতাঁকে আমি একটু এড়িয়েই চলি। কিন্তু ডাকলে তো আর না গিয়ে পারা যায় না।”
“আমি একটু কনফিউসড স্যার,” একেনবাবু বাধা দিয়ে বললেন, “কেন আপনি মিস ভাস্বতাঁকে এড়িয়ে চলেন?”
“আসলে”… অনিমেষ একটু আমতা আমতা করল। মনে হল যে নিখোঁজ বা মৃত, তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে অসুবিধা বোধ করছে। “আই মিন ও একটু গায়ে পড়া… আর কিছু নয়।”
“আই সি, তারপর?”
“আমি কাছে যেতেই ও বলল, তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। ও আপনি টাপনির ধার ধারে না, প্রায় সবাইকেই তুমি করে বলে।
‘কী সারপ্রাইজ?’
“এখানে বলা যাবে না, তোমার বন্ধু রাগ করবে। পরে তোমার বাড়ি গিয়ে বলব।”
“দাঁড়ান স্যার, ‘আপনার বন্ধু’ বলতে কাকে মেয়েটি মিন করেছিল?”
“বোধহয় বারীন, কিন্তু নাম করে বলেনি।”
“বন্ধুটি কে, আপনি জিজ্ঞেস করেননি স্যার?”
“না, সত্যি কথা বলতে কি, আমার সঙ্গে যখন কথা বলছিল ওর চোখেমুখে একটা কিছু ছিল, যেটা আমার ভালো লাগেনি।”
“কী ছিল স্যার?”
“ঠিক বলতে পারব না। আসলে ও খুব মুডি আর আনপ্রেডিক্টেবল। মনে হচ্ছিল হঠাৎ কিছু বলে বসবে বা করে ফেলবে, যার জন্য আনপ্লেজেন্ট সিচুয়েশনের মধ্যে পড়ব। আমি আর ওখানে দাঁড়াইনি।”
“মিস ভাস্বতী কি ড্রিংক করছিল স্যার?”
“মনে হয় না। মদের বোতলগুলো সব সামনের ডেকে ছিল। এমনিতে ও ড্রিংক করে বলে তো শুনিনি।”
“যেটা আমায় বললেন, সেটা কি আপনি পুলিশকে জানিয়েছেন?”
“না। এটা কি খুব রেলেভেন্ট?”
“হু নোজ স্যার! ভালো কথা, মিস ভাস্বতাঁকে আপনি কতদিন চেনেন?”
“তা প্রায় এক বছর হবে। বারীন একদিন এসে বলল, ওর পরিচিত একটি মেয়ে স্কুলে ভীষণ বাজে রেজাল্ট করছে। ফাইনাল ইয়ার, কিন্তু টিউটর ছুটিতে। আমি যদি এই সময়টাতে একটু পড়িয়ে দিই। বারীন বিশেষ করে বলাতে ওকে মাস দুই প্রাইভেট পড়িয়েছিলাম। সেই থেকে ওর বাবা-মা শেখরদা আর শীলার সঙ্গেও আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায়।”
“ঠিক আছে, বলুন স্যার।”
“আমি শীলাকে বললাম, একটু আগেই পেছনে ডেকে দেখলাম বই পড়ছে।
শীলা বলল, “বুঝেছি, বারীনের সেই সিনেমার বই। কী উপহারই যে মেয়েটাকে দিয়েছে!
‘দাঁড়াও আমি একবার দেখে আসি,’ বলে শেখরদা উঠে পিছনে গেলেন। খানিক বাদেই ফিরে এসে বললেন, ‘ঠিকই বলেছে অনিমেষ, ডেকে বসে বই পড়ছে।‘
শীলা অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যারিকেনের আলোয়?”
শেখরদা উত্তর দিলেন, ‘মেয়েকে তো চেনো।‘
“ও, একটা কথা কথা বলতে ভুলে গেছি, সেদিন পূর্ণিমা ছিল। হ্যারিকেনের আলো না থাকলেও আমাদের চলাফেরাতে তেমন অসুবিধা হচ্ছিল না।”
এ পর্যন্ত বলে, অনিমেষ একটু চুপ করে থেকে বলল, “আমি কি বেশি ডিটেল-এ বলছি?”
“এতটুকু না স্যার, প্লিজ বলুন।”
“তারপর সবারই নেশা চড়তে শুরু করেছে। বারটেন্ডার হচ্ছে বারীন। মজার ব্যাপার, আমি যে বেশি মদ খেয়েছি তা নয়। কিন্তু নিজেকে একটু জানি আনস্টেডি লাগতে শুরু করেছে। ইনফ্যাক্ট শেখরাও বললেন, বারীন, এটা এই বোটের গুণ না চাঁদের আলো জানি না, কিন্তু আজ এক গেলাসেই দু’গেলাসের নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে!
বারীন ফাজলামি করল, কেন, আমার হাতের জাদু বলছেন না কেন?
‘তাও বলছি,’ শেখরদা হাসতে হাসতে বললেন।
শীলা একটু ‘হাই’ হয়ে গেলে কী যে করে ঠিক ঠিকানা নেই। হঠাৎ এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ওর সঙ্গে গাইতে হবে।
‘কী গান?’
‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ!’
বললাম ‘সব কথা আমার মনে নেই।
‘মনে না থাকলে বানাও… তাই দিয়েই আমার সঙ্গে গাও। না গাইলে তোমাকে আজ ছাড়ব না।’ বলে আরও টাইট করে আমায় জড়িয়ে ধরল।
যে রেটে বারীন সবাইকে মদ গিলিয়েছে, বেশ বুঝতে পারছিলাম নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়েছি। আমিও শীলাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। শীলা কানে কানে বলল, ‘গাওয়ার পরও যদি না ছাড়ি?’ এর পর ঠিক কী ঘটেছিল পরিষ্কার করে বলতে পারব না। শুধু মনে পড়ছে গাইতে গিয়ে দুজনেই কথা ভুলে যাচ্ছিলাম, যা খুশি তাই লাগিয়ে দিচ্ছিলাম। দীপাবউদি গানের মাঝখানেই বলে উঠলেন, ‘শীলা, তুই বড় বাড়াবাড়ি করছিস, এবার ঘরে যা।‘
এরপর যেটা মনে আছে, বারীন আমার চোখেমুখে জলের ঝাঁপটা দিচ্ছে। বারীনকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী রে আউট হয়ে গিয়েছি?”
‘তা একটু গিয়েছিস। এখন কেমন বোধ করছিস?’
‘আমি ঠিক আছি। ওরা সবাই কোথায়?’
‘যে যার ঘরে, এখানে শুধু তুই আর আমি।‘
‘ক’টা বাজে?’
‘অনেক রাত। চল, ঘরে চল।’ বলে আমাকে ধরে বারীন তুলল।
আমি ঘড়িতে দেখলাম বারোটা কুড়ি। ‘ছাড়, আমি নিজেই হাঁটতে পারব।‘
কেবিনের দরজার সামনে যখন এসেছি বারীন বলল, “দাঁড়া, ভাস্বতী কি এখনও পিছনে বসে আছে?”
একটু সরে উঁকি দিয়ে দেখলাম ঠিক তাই। বারীন তখন এগিয়ে গিয়ে ভাস্বতাঁকে কী যেন বলল। ভাস্বতী মাথা নাড়ল।
‘ওকে এক্ষুনি ঘরে যেতে বললাম, বারীন বলল। সবাই শুয়ে পড়েছে। এভাবে একা একা বসে থাকা সেফ নয়।’
‘আমি ঘরে যাচ্ছি, আর দাঁড়াতে পারছি না, বলতে বলতে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম, বারীন চট করে ধরে ফেলল। তারপর আমাকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। পেটটা ভীষণ গোলাচ্ছিল, এত খারাপ আগে কখনও বোধ করিনি। আজ মরেই যাব রে, বারীনকে বললাম।
‘অত সহজে মরবি না,’ বারীন অভয় দিলো, ‘গা গোলাচ্ছে?’
‘ভীষণ।’
‘বাথরুমে যা, বমি করলে একটু ভালো লাগবে।‘
বেশ খানিক্ষণ বমি করার পর চোখে মুখে জল দিয়ে যখন ফিরলাম, তখন একটু ভালো ফিল করছি। দেখলাম বারীনের হাতে একটা ফেনাচ্ছল গ্লাস।
‘এটা খেয়ে দেখতে পারিস, একটু রিলিফ পাবি।‘
‘দে,’ বলে ঢক ঢক করে খেলাম। বারীনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হ্যাঁ রে, আমি বেশি মাতলামো করিনি তো?’
বারীন বলল, ‘তা একটু করেছিস, শীলাও করেছে। বাট ইট ইজ অ্যামং ফ্রেন্ডস, কেউ মাইন্ড করেনি।’
‘কী করেছি বল তো?”
‘এখন শোনার দরকার নেই, ঘুমো।‘
‘না, বল।’
‘শুনে লাভটা কী হবে, যা হয়েছে তা হয়েছে। আর বলছি তো সবাই জানে যে তোরা একটু বেশি আউট হয়ে গিয়েছিলি। আউট তো অল্পবিস্তর আমরা সবাই হয়েছিলাম। মদ খাব অথচ নেশা হবে না, তাহলে আর মদ খাওয়া কেন!’
এইরকম আরও কিছু কথা হয়তো হয়েছিল, আমার এখন মনে নেই। শুধু মনে আছে, বারীন যখন বলল, ‘চোখ বোজ, ঘরের বাতি নেভাচ্ছি, তখন ঠিক সাড়ে বারোটা।‘
“আপনি শিওর স্যার?”
“হ্যাঁ, ঘুমোতে যাবার সময় আলো নেভার আগে আমি সব সময়ে ঘড়ি দেখি, ওটা আমার বরাবরের অভ্যাস।”
“আই সি, স্যার, তারপর?”
“তারপর যখন ঘুম ভাঙল, তখন ভোর প্রায় চারটে। দরজায় ভীষণ ধাক্কা। সবাই উদ্ৰান্ত, ভাস্বতাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না! এটাই হল ঘটনা।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার, আপনার কথায় যা বুঝলাম, সাড়ে বারোটার একটু আগেও মিস ভাস্বতী ডেকে বসেছিলেন। ঠিক?”
“হ্যাঁ। আর সাড়ে বারোটার পরে ওকে দেখতে পাওয়া যায়নি। বিজয়দা সাড়ে বারোটা নাগাদ পেছনের ডেকে গিয়েছিলেন, তখন ভাস্বতী ছিল না। প্রায় একই সময়ে মন্টুও হ্যারিকেন নিতে পেছনের ডেকে যায়। বিজয়দার সঙ্গে ওর দেখাও হয়।”
“আমি একটু কনফিউসড স্যার, বিজয়বাবু ওখানে কেন গিয়েছিলেন?”
“বিজয়দার কাছে যা শুনেছি, ওঁরও গা গোলাচ্ছিল। কেবিনের বদ্ধ বাতাসে দম আটকে আসছিল, ঘুমোতে পারছিলেন না। হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনে কীসের আওয়াজ দেখতে প্রথমে সামনের ডেকে যান। সেখানে কিছু দেখতে না পেয়ে পেছনের ডেকে আসেন।”
“বিজয়দা ওখানে আগে গিয়েছিলেন, না মন্টু?”
“তা বলতে পারব না, বোধহয় প্রায় একই সময়ে।”
“কী ধরণের আওয়াজ বিজয়বাবু শুনেছিলেন?”
“ধপ করে একটা আওয়াজ আর জলে কিছু পড়ার শব্দ। আর সেই সঙ্গে পায়ের আওয়াজ। মন্টু তখন হ্যারিকেনগুলো নিয়ে হাঁটছিল, সুতরাং পায়ের আওয়াজ শুনতে পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।”
“আপনি কোনও শব্দ শুনেছিলেন?”
“না, তখন বোধহয় আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।”
“বারীনবাবু?”
“বারীনও শোনেনি। ও-ও ঘুমোচ্ছিল।”
“বিজয়বাবুর সঙ্গে কি কথা বলা যাবে?” আমায় জিজ্ঞেস করলেন, একেনবাবু।”
“এখুনি ওঁকে পাব না। দোকান বন্ধ করে আসতে আসতে ওঁর ন’টা বেজে যায়। উনি এলেই ধরার চেষ্টা করব। আপনি বাড়িতে থাকবেন?”
“থাকব স্যার।”বলে অনিমেষের উদ্দেশ্যে বললেন, “আর কিছু মনে পড়ছে স্যার ভাস্বতীর ব্যাপারে?”
“ও হ্যাঁ, একটা কথা। জানি না কতটা রেলেভেন্ট। ভাস্বতাঁকে কেউ কিছুদিন ধরে খুব উত্ত্যক্ত করছিল।”
“উত্ত্যক্ত বলতে?”
“লোকটি ভাস্বতাঁকে বিয়ে করতে চায়। না বললে শুনবে না, না চাইলেও ওর হাতেই ভাস্বতাঁকে ধরা দিতে হবে, ওর সন্তানের মা হতে হবে… এইসব আজেবাজে কথা।”
“লোকটি কে?”
“তা বলতে পারব না। তবে বারীনকে ও বলেছিল। বারীনের কাছ থেকেই কথাটা শুনেছি।”
“মিস ভাস্বতী মা-বাবাকে এটা জানায়নি?
“না। বারীনের ধারণা ভাস্বতী এ কথা বাড়িতে বললে শীলা ওকে বাড়ি থেকে বেরোতে দেবে না। এমনিতেই শীলা সবসময়ে চোখে চোখে রাখে।”
“আই সি স্যার, তার মানে ধরে নিচ্ছি বারীনবাবুও জানাননি।”
“না, কিন্তু আমার বিশ্বাস এ ব্যাপারে বারীন একটা অ্যাকশন নিয়েছিল। তবে সেটা কী, ঠিক জানি না।”
“ইন্টারেস্টিং, পুলিশ এ কথা জানে?”
“বারীন নিশ্চয় বলেছে। তবে পুলিশ আমাদের কারোর কথাই খুব বিশ্বাস করছে বলে মনে হচ্ছে না।”
“তদন্ত করছেন কে?”
“মলয় রায় বলে একজন ইনস্পেক্টর। আপনি চেনেন?”
“মনে করতে পারছি না। তবে খোঁজ নেব।”
“কাইন্ডলি একটু খোঁজ করুন। মনে হচ্ছে ওঁর হাত থেকে আমরা সহজে ছাড়া পাব না। কালকে আবার সকাল ন’টায় আমায় হাজিরা দিতে হবে।”
.
অনিমেষ চলে যাবার খানিকবাদেই পাশের অ্যাপার্টমেন্টে তালা খোলার আওয়াজ এল। অর্থাৎ, বিজয়বাবু ফিরেছেন। গিয়ে ডোরবেল বাজাতেই দরজা খুললেন। খুবই ক্লান্তশ্রান্ত, কিন্তু তাও মনে হল একেনবাবুর কথাটা ওঁকে জানাই। আমার কাছে সব শুনে বললেন,
পুলিশ ওঁকেও হ্যারাস করছে।
আমি বললাম, “আপনি কি এখন একটু আসতে পারবেন? একেনবাবু আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।”
“ওর নাম গে, ফোনে?”
“ঠিক ফোনে নয়। আসুন না, দেখতে পাবেন।”
“চলুন।”
আমি ওঁকে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে আবার স্কাইপে একেনবাবুকে ধরলাম। একেনবাবুর মুখ মনিটরে দেখতে পেয়ে বিজয়বাবু বললেন, “ওর নাম গে, এত ম্যাজিক!”
বিজয়বাবু সম্পর্কে আমি আগেই একেনবাবুকে সতর্ক করে দিয়েছিলাম। স্বল্পভাষী, বেশি কোনও বর্ণনা আশা করবেন না। একেনবাবু গুটিকতক প্রশ্নই করলেন। তাতে অনিমেষ যা বলেছিল, সেটাই কনফার্মড হল। নতুন যা জানলাম, তা হল শীলা আর শেখর-দা শুতে চলে যাবার একটু পরেই পৌনে বারোটা নাগাদ বিজয়বাবুরা নিজেদের ঘরে যান। দীপাবউদি ঘরে ঢোকার পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েন, বিজয়বাবু মিনিট পাঁচেক বাদে। সোয়া বারোটা নাগাদ ওঁর ঘুম হঠাৎ ভেঙ্গে যায়। শরীরটা ভালো লাগছিল না, বিছানাতে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলেন। খানিক বাদে একটা ধপ আওয়াজ শোনেন আর জলে কিছু পড়ার শব্দ। পায়ের আওয়াজও পান।
এছাড়া অন্য কোনও শব্দ বা আওয়াজ উনি শোনেননি। এমনিতে উনি বেরোতেন না। কিন্তু ছোট্ট কেবিনের মধ্যে এত দমবন্ধ লাগছিল… বাইরের বাতাসে একটু ভালো বোধ করবেন ভেবে বেরিয়েছিলেন। বেরিয়ে অবশ্য কিছু চোখে পড়েনি। মন্টু হ্যারিকেন নিয়ে সামনের ডেক থেকে আসছিল, বুঝলেন ওর পায়ের আওয়াজই শুনেছিলেন। সময়টা সাড়ে বারোটার কয়েক মিনিট এদিক-ওদিক হয়তো হবে, নিজে ঘড়ি মিলিয়ে দেখেননি। তবে মন্টুর সাড়ে বারোটার সময় হ্যারিকেন নিয়ে যাবার কথা ছিল, তাই ধরে নিচ্ছেন সাড়ে বারোটাই হবে। জলের আওয়াজটা সম্ভবত কোনও বড় মাছের ঘাইয়ের আওয়াজ, সেটাই তখন মনে হয়েছিল।
বিজয়বাবুর কথা শেষ হতেই একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “একটা প্রশ্ন স্যার, আপনি ঘর থেকে বেরিয়ে কোনদিকে গিয়েছিলেন, সামনের ডেকে না পেছনের ডেকে?”
“পেছনের।”
“সামনের ডেকে নয় কেন স্যার, ওদিকটাই তো খোলামেলা বেশি ছিল?”
“ওর নাম গে, অত ভেবে কোথাও যাইনি। মন্টু পেছনের ডেকে যাচ্ছিল, আমিও ওর সঙ্গে যাই।”
“গিয়ে কী দেখলেন স্যার?”
“কিছুই না, পুরোপুরি অন্ধকার।”
“আমি একটু কনফিউসড, স্যার। আপনি বলছেন অন্ধকার, কিন্তু পেছনের ডেকে একটা হ্যারিকেন জ্বলছিল না?”
“না।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং, কোথায় গেল সেটা?”
“ওর নাম গে, কে জানে! মন্টু ওটা খুঁজছিল।”
“পেয়েছিল?”
“বোধহয় না। ঘুম পাচ্ছিল বলে বেশিক্ষণ দাঁড়াইনি, কেবিনে গিয়ে শুয়ে পড়ি।”
তিন
পরের দিন সারা দিনই কাটল আমেরিকান সেন্টারে একটা কাজে। সেখান থেকে বেরোলাম প্রায় সাতটা নাগাদ। সেন্টারের ভিতরে মোবাইল ফোন নিতে দেয় না। বেরিয়ে দেখি অনিমেষের তিন তিনটে মিসড কল। নিশ্চয় আবার অনেক হেনস্তা হয়েছে পুলিশের কাছে। বাড়ি ফিরে ফোন করব। এরমধ্যে একেনবাবুর সঙ্গেও একটু কথা বলতে হবে, কতটা এগিয়েছেন জানার জন্যে। অনিমেষের একটা কথা ওয়াজ ট্রাবলিং মি। একজন কেউ ভাস্বতাঁকে পাবার জন্য পাগল। সে-ই কি রাত্রে এসে ভাস্বতাঁকে অ্যাবডাক্ট করেছে? অসম্ভব নয়। তবে বাইরের কারোর পক্ষে কোনও রকম সাহায্য ছাড়া এভাবে নিঃশব্দে কাউকে অপহরণ করা সম্ভব নয়। প্রশ্ন, বিজয়বাবু কেবিন থেকে বেরবার আগে মন্টু কি পেছনের ডেকে গিয়েছিল? সে কি ভাস্বতীর অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে কোনও ভাবে যুক্ত? পেছনের ডেক থেকে হ্যারিকেনটাই বা কোথায় গেল? পুরো ব্যাপারটাই একটা রহস্য।
.
বাড়িতে ঢুকে কম্পিউটার খুলে দেখি, একেনবাবুও স্কাইপে আমাকে ধরার চেষ্টা করেছেন। স্কাইপে পেলাম না, কিন্তু ফোনে ধরতে পারলাম। একেনবাবু এর মধ্যেই মলয় রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
“ছেলেটা ভালো, একেনবাবু বললেন, “ওকে ঠিক প্লেস করতে পারছিলাম না, কিন্তু আমার অফিসে কিছুদিন ছিল। নতুন কিছু ডেভালপমেন্ট হয়েছে শুনলাম। কিন্তু বাইরের কেউ সঙ্গে ছিল, তাই আর কিছু বলতে পারল না। আমার সঙ্গে কথা হয়েছে, আজ রাতে বা কাল সকালে যদি মলয়ের বাড়িতে যান, আপনাকে বলে দেবে।”
“আমাকে?” কথাটা বুঝলাম না, আমাকে কেন, আপনি নিজেও তো ফোন করে জেনে নিতে পারেন?”
“ওর স্কাইপ নেই।”
তখনই ব্যাপারটা ক্লিয়ার হল। একেনবাবু হাড় কেপ্পন। এই কাজটা করে দিচ্ছেন আমার সুবাদে। কিন্তু এর জন্য টেলিফোনে কানাকাড়িও খরচ করবেন না। তবে নিজের থেকে যে মলয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তাতেই আমি চমৎকৃত।
“আমাকে উনি বলবেন তো?” চিন্তা ছিল আমি একজন অপরিচিত লোক।
“হ্যাঁ স্যার, নিশ্চয়। বললাম তো, আমার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে।”
মলয়ের ঠিকানা আর ফোন নম্বর দিলেন। লাকিলি মলয় রায়ের বাড়ি নাকতলাতে, আমার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে হাঁটা পথে মাত্র মিনিট পাঁচেক।
.
একেনবাবুর কথা মতো ফোন করলাম। মলয় রায়ই ফোনটা ধরলেন। নাম বলতেই বললেন, “ও আপনি স্যারের বন্ধু। আমার সঙ্গে আজকেই কথা হয়েছে। আমি বাড়িতেই আছি। চাইলে আজই আসতে পারেন।”
এরকম অভ্যর্থনা পাব বুঝিনি। বললাম, “আধঘণ্টার মধ্যেই আসছি।”
.
মলয় রায়ের চেহারা একেনবাবুর ঠিক উল্টো। একেনবাবু টিংটিঙে রোগা, বেঁটেখাটো, আন-ইম্প্রেসিভ চেহারার একটি লোক। পোশাক-পরিচ্ছদও তথৈবচ। মলয় রায় সুপুরুষ, প্রায় ছ’ফুট লম্বা। চওড়া কব্জি, এক্সারসাইজ-করা ফিট বডি। পুলিশ হবারই উপযুক্ত চেহারা।
একেনবাবু নিশ্চয় খুব ফলাও করে আমার কথা বলেছেন। যথেষ্ট আপ্যায়ন করলেন। স্ত্রীকেও ডাকলেন, “আমার স্ত্রী মল্লিকা।”
খুবই মিষ্টি চেহারা। নমস্কার করলাম।
“এঁর কথাই স্যার বলছিলেন আজ। ডঃ দে, আমেরিকায় প্রফেসরি করেন।”
“আপনি বেড়াতে এসেছেন?” মল্লিকা নমস্কার করে জিজ্ঞেস করলেন।
“ঠিক বেড়াতে নয়, এক বছরের ছুটি নিয়ে এখানে রিসার্চ করছি।”
“আমাদের একটু চা খাওয়াও না?”
“তা তো খাওয়াবোই। মিষ্টি খান তো?”
“শুধু চাই যথেষ্ট, না হলেও চলবে।”
“তা হয় নাকি!” বলে উনি ভিতরে গেলেন।
আমি মলয় রায়কে বললাম, “একেনবাবু বললেন, কিছু নাকি নতুন ডেভালপমেন্ট হয়েছে?”
“তা হয়েছে। কিন্তু একটা কথা বলুন তো, এই অনিমেষ আপনার কী রকম বন্ধু?”
“ওর সম্পর্কে যা জানি বললাম।”
“কিছু মনে করবেন না, ভদ্রলোক কিন্তু হ্যাঁবিচুয়াল লায়ার। একটু সতর্ক থাকবেন।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
“আজ সকালে ডেকেছিলাম। বললাম ঠিক ন’টার সময়ে আসবেন। আমাদের অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার সাহেবও কেসটাতে ইন্টারেস্ট নিচ্ছেন, তিনি থাকবেন। এলেন দশ মিনিট বাদে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, দেরি করলেন যে?”
অম্লান বদনে বললেন, ‘ঠিক টাইমেই তো এসেছি।’
কথাটা শুনে আমি অবাক। ‘ক’টা বাজে আপনার ঘড়িতে?’
ঘড়ির দিকে প্রায় না তাকিয়েই বললেন, ‘ন’টা।’
পরিষ্কার দেখতে পেলাম ওঁর হাতঘড়িতে নটা বেজে দশ।
তখন একটু ধমক দিয়েই বললাম, আপনার ঘড়ি তো বলছে নটা দশ!
এবার দেখলাম থতমত খেয়েছেন। তাও বোঝাবার চেষ্টা করলেন, “ওটা দশ মিনিট ফাস্ট।“
আমি বলতে বাধ্য হলাম, “দেখুন এটা সিরিয়াস ইনভেস্টিগেশন, থানায় এসে এরকম রহস্য করার চেষ্টা করলে ফল ভুগতে হবে।”
“টাইমের ব্যাপারে ও একটু ঢিলেঢালা,” আমি বললাম। কিন্তু এটা ঠিক নয়, আপনাদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে এইভাবে লেট করে যাওয়াটা।”
“ভদ্রলোক একটু ওভার-স্মার্ট! যাইহোক, স্যারকে বলবেন, দুটো ইন্টারেস্টিং খবর আছে। কিন্তু এটা আপনি আর স্যার ছাড়া কেউ যেন না জানে। আপনার বন্ধু তো নয়ই।”
আমি বললাম, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আমি একেনবাবুর অনেক কাজেই সাহায্য করি।”
“সেটা স্যার বলেছেন, আপনাকে বলাও যা ওঁকে সোজাসুজি বলাও তাই। তাও আমি টেকিং এ রিস্ক। হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, নাম্বার ওয়ান হল, ভাস্বতীর ঘড়িটা মন্টুর কাছে থেকে উদ্ধার করেছি।”
“মন্টুর কাছ থেকে?”।
“হ্যাঁ। মন্টুর বয়ান অনুযায়ী ভাস্বতী ওটা ওকে দিয়েছিল। ভাস্বতী পেছনে একা বসেছিল, আর খুব ভালো দিদিমণি বলে মন্টু ওর দেখভালটা বেশিই করছিল। ভাস্বতী যখন যা চাইছিল এনে দিচ্ছিল। ভাস্বতী ওর সঙ্গে অনেক গল্পও করেছে। মন্টুর এক বোন আছে শুনে ভাস্বতী নাকি ঘড়িটা খুলে মন্টুকে দেয়। মন্টু নাকি নিতে চায়নি, ভাস্বতীই জোর করে দিয়েছিল।”
“আপনি বিশ্বাস করেন?”
মলয় রায় মুচকি হাসলেন।
“সেকেন্ড ইনফরমেশন হল, ভাস্বতী ওয়াজ প্ল্যানিং টু ইলোপ।”
“ইলোপ! এটা কোত্থেকে জানলেন?”
“ওর স্কুলের এক বন্ধুর কাছ থেকে। শুক্রবার, অর্থাৎ বোটে ওঠার আগের দিন ভাস্বতী বন্ধুটিকে জানিয়েছিল।”
“মাই গড, কার সঙ্গে পালাবার প্ল্যান করেছিল?”
“বন্ধু সেটা জানে না। আর এই প্ল্যানটা বোধহয় হঠাৎ করে করা, আগে এ ব্যাপারে কিছু বলেনি।”
“মাত্র সতেরো বছর বয়স মেয়েটার… ওর তো ভালো বোধ-বুদ্ধিও হয়নি।”
“যেটুকু জেনেছি, মেয়েটা স্বপ্নের রাজত্বে থাকত। তবে সত্যি সত্যিই ইলোপের কোনও প্ল্যান ছিল কিনা, সেটা আর জানাও যাবে না।” মলয়বাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “শি ইজ ডেড, ভাস্বতী আর বেঁচে নেই।”
আমি নির্বাক।
মলয়বাবু বলে চললেন, “ওর বডিটা ভেসে যাচ্ছিল। একটা মাঝি দেখতে পেয়ে খবর দেয়। লোকাল পুলিশ বডিটা উদ্ধার করেছে। ভাস্বতীর চেহারা আর জামাকাপড়ের যে বর্ণনা পেয়েছি, তার সঙ্গে ম্যাচ করছে। আমি শিওর বডিটা ভাস্বতীর, কিন্তু ফর্মাল আইডেন্টিফিকেশন এখনও হয় নি। ওর বাবা-মাকে খবর দেওয়া হয়েছে।”
.
ইতিমধ্যে চা, নিমকি আর দু’রকমের সন্দেশ এসে গেল। কিন্তু এসব শোনার পর কিছু আর খেতে ইচ্ছে করছিল না।
বললাম, “শুধু যদি চা খাই কিছু মনে করবেন?”
মল্লিকা বুদ্ধিমতী। আমার মুখচোখ দেখে মনের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন।
“কিচ্ছু মনে করব না, আপনারা কথা বলুন,” বলে চলে গেলেন।
“আপনার কি মনে হচ্ছে মিস্টার রায়, এটা মার্ডার? ওই মন্টু ছেলেটা ইনভলভড? ঘড়ির লোভে কাজটা করেছে?”
উত্তর না দিয়ে, “আসছি” বলে মলয় রায় ভিতরে চলে গেলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এলেন একটা ফটো নিয়ে। ভাস্বতী, শীলা আর দীপাবউদির ফটো, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
“এটা ভাস্বতীর বাবার তোলা, হাউসবোটে। ভাস্বতাঁকে দেখুন।”
প্রশ্নের তাৎপর্যটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। বেশ সেজেগুজে বেড়াতে গিয়েছিল এইটুকুই চোখে পড়ল।
“মেয়েটার গলার হার আর দুলটা দেখছেন?”
“হ্যাঁ।”
“সেটটা খুব সস্তা নয়, দাম এক লাখ না হলেও কাছাকাছি। ঘড়ির দাম বড়জোর দু তিনশো টাকা। ওটার জন্য কেউ খুন করবে না। করলে করবে সেটটার জন্যে।”
“সেটটা কি মিসিং?”
“হ্যাঁ, কিন্তু মন্টুর কাছে পাওয়া যায়নি।”
“মন্টু তো এরমধ্যে সেটটাকে পাচার করে ফেলতে পারে?”
“তা পারে। হি ইজ আওয়ার প্রাইম সাসপেক্ট, বিশেষ করে যদি প্রমাণ হয় ভাস্বতী খুন হয়েছে। তবে কিনা আমাদের কাছে এভরি ওয়ান ইজ এ সাসপেক্ট, ইনক্লিউডিং আপনার বন্ধু।”
চার
মলয় রায়ের বাড়ি থেকে ফিরে একেনবাবুকে রিপোর্ট করলাম।
“ভেরি ইন্টারেস্টিং। মলয় কিছু বলল, ডেডবডির প্রিলিমনারি এক্সামিনেশনে কী পাওয়া গেছে?”
“না। তবে একটা কথা বলি, আপনি ডিরেক্টলি মলয়বাবুর সঙ্গে কথা বলুন। আর প্লিজ, এরা তো আপনাকে ইন্সিডেন্টাল এক্সপেন্স দেবে আর ফি-ও দেবে বলেছে। যা খরচা করার দরকার করুন।”
একেনবাবু একটু লজ্জা পেলেন।
“আরে না স্যার, একটা ফোন করব, তাতে কী হয়েছে? আর আপনার বন্ধুর বিপদে সাহায্য করছি। এতে ফি নেওয়ার প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে? আপনি ভাববেন না স্যার, আমি খোঁজ যা নিতে হয় নেব। কালকে আপনার টাইম রাত আটটার সময়ে স্কাইপে কথা বলব।
.
একেনবাবুর সঙ্গে কথা বলার পর অনিমেষের সঙ্গে কথা হল। অনিমেষ ভীষণ নার্ভাস। ওকে নাকি পুলিশ স্টেশনে ইনস্পেক্টর আর অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার মিলে প্রচণ্ড জেরা করেছে। অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনারকে যখন আনা হয়েছে। তখন অনিমেষ কনভিন্সড যে, ওকে ফাঁসানো হবে। জিজ্ঞেস করল একেনবাবুর সঙ্গে আর কথা হয়েছে কি না।
বললাম, “হয়েছে। তবে প্রোগ্রেস কী হয়েছে জানি না।”
মলয় রায়ের ইনফরমেশনগুলো অবশ্যই চেপে গেলাম।
.
পরের দিন সকালে অনিমেষ দু’-দু’বার ফোন করল আমাকে। বললাম, “এখন শুধু শুধু ফোন করছিস, রাতের আগে একেনবাবুর সঙ্গে কথা বলতে পারব না।” ওর কাছ থেকে তৃতীয় ফোনটা পেলাম দুপুর বেলা। উত্তেজিত স্বরে বলল, “গঙ্গায় একটা বডি পাওয়া গেছে। শীলা আর শেখরদা দেখতে গেছেন ওটা ভাস্বতীর কিনা।” তারপর জিজ্ঞেস করল, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি কি না।
উত্তর না দিয়ে উলটে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই শিওর বডি পাওয়া গেছে?”
“হ্যাঁ,” এক্ষুণি বিজয়দাকে ফোন করে জানলাম।
আমি একেনবাবুকে রাতে জিজ্ঞেস করব বলে অনিমেষকে কাটালাম।
.
রাত ঠিক আটটার সময়ে একেনবাবুই আমায় স্কাইপে ধরলেন। ওঁর গলার স্বরে একটু উৎফুল্ল ভাব। বললাম, “কী ব্যাপার, মনে হচ্ছে আপনি অনেকটা এগিয়েছেন?”
“বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি স্যার।”
এটা গুড সাইন। রহস্যের প্রায় কিনারা হয়ে এলে একেনবাবু এইসব ফিলসফি ঝাড়েন। আমি বললাম, “মনে হচ্ছে কিছু নিশ্চয় জানেন। কিন্তু এদিকে তো অনিমেষের নার্ভাস ব্রেকডাউন হবার অবস্থা।”
“ওঁকে বলবেন হি ইজ দ্য মোস্ট হেল্পফুল পার্সন ইন দিস ইনভেস্টিগেশন।”
“কী বলছেন যা-তা?”
“আমার তো স্যার যা-তা বলাই স্বভাব।”
“তার মানে আসল কারণটা আমায় বলবেন না, তাই তো?”
“কী যে বলেন স্যার, তবে আগে একটা ইম্পর্টেন্ট তথ্য আপনাকে দিই। মেয়েটার মুখে কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল, তাতে নাকটা ভেঙ্গে যায়।”
“এটা তো মলয়বাবু আমাকে বলেননি!”
“অতক্ষণ ধরে বডিটা জলে ছিল, ভালো করে এক্সামিন না করে চট করে ভুল ইনফরমেশন হয়তো দিতে চায়নি।”
“তার মানে আপনি বলছেন, শি ওয়াজ মার্ডারড?”
“আমার তাই ধারণা, মিস ভাস্বতাঁকে খুনই করা হয়েছে। ভারী কিছু দিয়ে মুখে আঘাত করে ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মুখে আচমকা ধাক্কা খেয়ে শি ওয়াজ স্টান্ড, চিৎকার করার সুযোগ মেলেনি।”
“তাহলে কি মন্টু? টাকার জন্যে?”
“পসিবল স্যার। তবে শুধু টাকার জন্যেই তো খুন হয় না।”
“অন্য আর কী দেখছেন এখানে?”
“আমার একটা থিওরি আছে স্যার,” একেনবাবু বললেন, “তাতে এখনও কয়েকটা ফাঁক রয়ে গেছে। মলয় সেগুলো ভরাতে পারবে। ওর সঙ্গে একটু আগেই কথা হয়েছে। ও আসছে আপনার বাড়িতে। স্কাইপে একসঙ্গে সবাই কথা বলব।”
“কথাটা শেষ হতে না হতেই ডোর বেল বাজল। মলয় রায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। এঁকে নিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসলাম।
“কেমন আছেন স্যার?”
“চমৎকার ভাই। এক্ষুনি বাপিবাবুকে বলছিলাম, কয়েকটা লুজ এন্ড আছে, তোমাকে সেগুলো দেখতে হবে।”
“তা তো দেখব, কিন্তু বলুন কী ব্যাপার? আপনার কথা মতো মন্টুকে এখনও অ্যারেস্ট করিনি দেখে অ্যাসিস্টেন্ট কমিশন তো আমার ওপরে খাপ্পা!”
“কেন করতে বলিনি সেটা নিয়ে তোমাদের সঙ্গে এখন আলোচনা করব। তার আগে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, অনিমেষবাবুর সময় নিয়ে এত সমস্যা হল কেন? তোমার ওখানেও দশ মিনিট লেট, বাপিবাবুর বাড়িতেও। দশ মিনিট লেট অথচ ওঁর ধারণা উনি ঠিক টাইমেই এসেছেন।”
মলয় আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকালেন। বোঝার চেষ্টা করলেন একেনবাবু কী বলতে চাইছেন?
একেনবাবু বললেন, “জানি মলয়, তুমি অবাক হচ্ছ, কিন্তু এটা ইম্পর্টেন্ট। আর দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, ভাস্বতীর বইটা কোথায় গেল?”
আমি ভাবলাম, একেনবাবুর কি মাথা খারাপ হয়েছে! মলয় রায়ও আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। তারপর একেনবাবুকে বললেন, “স্যার, আপনি প্রায়ই নিজেকে কনফিউসড বলতেন, এখন কিন্তু আমিও কনফিউসড।”
“কনফিউশনের কোনও দরকার নেই, আমি আমার থিওরি বলছি। সেটা শুনে বল এরমধ্যে ফাঁক কোথায় আছে?”
“বলুন।”
“তুমি জানো কিনা জানি না মলয়, কিন্তু বাপিবাবুর কাছে আমি শুনেছি, বারীনবাবু তিন-চার হাজার টাকা দামের একটা বই ভাস্বতাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। সেটা শুনেই আমার খটকা লেগেছিল। একটা সতেরো বছরের মেয়েকে এত দামি জিনিস কোনও বিশেষ কারণ ছাড়া কেন কেউ উপহার দেবে? ফ্যামিলি কানেকশন? হয়তো। কিন্তু খটকাটা আরও জোরদার হল যখন বাপিবাবুর কাছে শুনলাম, একটা পার্টিতে মিস ভাস্বতী পাশে-বসা বারীনবাবুকে ‘গো-এওয়ে’ বলে তাড়িয়ে দিচ্ছে, আর তার একটু পরেই বাথরুমের সামনে আড়ালে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।” এইটুকু বলে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “ঠিক বললাম তো স্যার?”
সায় দিলাম, “হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।”
“আরেকটা পয়েন্ট, মিস ভাস্বতাঁকে কেউ একজন হ্যারাস করছিল, আর কাউকে না বলে বারীনবাবুকেই মিস ভাস্বতী সেটা জানিয়েছেন, আর বারীনবাবুও অ্যাকশন নিয়েছেন, অর্থাৎ ওঁরা দু’জন খুবই ক্লোজ। অনিমেষবাবুর কাছে শুনলাম, হাউসবোটে মিস ভাস্বতী ওঁকে একান্তে ডেকে বলেছিলেন, একটা সারপ্রাইজ আছে, কিন্তু এখানে বলা যাবে না, তোমার বন্ধু রাগ করবে। এই বন্ধু নিশ্চয় বারীনবাবু। কিন্তু সারপ্রাইজটা কী? ওটা কি ইলোপ সংক্রান্ত, যেটা করতে যাচ্ছে বলে আগের দিন স্কুলের বন্ধুকে বলেছে? আর করতে যাচ্ছে কার সঙ্গে? বারীনবাবু?”
এবার একেনবাবু আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে চললেন, “স্যার, বয়ঃসন্ধিকালটা একটা গোলমেলে সময়। প্রেম বলুন, যৌন আকর্ষণ বলুন, এই সময়েই জাগতে শুরু করে। তার প্রাবল্যে ছেলেমেয়েরা অনেক সময়েই বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। এই সময়ে অভিভাবদের দায়িত্ব ওদের মনকে বোঝার চেষ্টা করা এবং গাইড করা। লাগাম ছেড়ে বড় হতে দিলে পরে পস্তাতে হয়। আপনার নাকতলার পার্টির বর্ণনা থেকে যেটুকু বুঝতে পেরেছি, শিলাদেবী এই গাইডেন্সটা প্রথম দিকে দেননি। আপনার দীপাবউদির কমেন্টটা মনে আছে স্যার? আগে মেয়েকে বাড়িতে রেখে শীলাদেবীরা পার্টি করে বেড়াতেন, ইদানীং হঠাৎ নজরদারি করার জন্য সঙ্গে নিয়ে ঘুরছেন। অবশ্যই মেয়ে তাতে বিরক্ত হচ্ছে। ঠিক বললাম কি?”
“হাঁ, প্রায় সেরকমই বলেছিলেন।”
“আমার তো এটা শুনে মনে হল, মিস ভাস্বতাঁকে একা বাড়িতে রেখে ওঁরা যখন বাইরে পার্টিতে যেতেন, তখন কোনও অপ্রীতিকর ব্যাপার নিশ্চয় ঘটেছিল। তারপর থেকে শীলাদেবী যেখানেই যেতেন, ভাস্বতাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। তবে কারও পক্ষেই একজনকে সব সময়ে চোখে চোখে রাখা সম্ভব নয়। এই রকম ইমোশানাল আর ভালনারেবল মেয়েকে কেউ যদি কামনা করে, অঘটন ঠেকানো যায় না। বারীনবাবু ওয়াজ এ ফ্রেন্ড অফ দ্য ফ্যামিলি। সেই সুবাদে বারীনবাবুর সঙ্গে মিস ভাস্বতীর মেলামেশার অবাধ সুযোগ ছিল এবং ভাইস-ভার্সা।”
“আপনি কী বলতে চাইছেন, বারীনের সঙ্গে ভাস্বতীর একটা দৈহিক সম্পর্ক হয়েছিল? আর ওরা ইলোপ করার কথা ভাবছিল?”
“অসম্ভব কি স্যার?”
“দ্যাট ইজ ক্রেজি,” আমি বললাম। “সতেরো বছর বয়স, ভাস্বতাঁকে তো আইনত বিয়েও করা যায় না। ওকে নিয়ে বারীন ইলোপ করার কথা ভাববে কেন? হি ইজ নট স্টুপিড!”
“ঠিক ধরেছেন স্যার, আমার কনফ্লুশন হল, বারীনবাবু ভাস্বতাঁকে নিয়ে ফ্যাসাদে পড়েছিলেন। ভাস্বতী নিশ্চয় চাপ দিচ্ছিল।”
একেনবাবু মুখে না বললেও ফ্যাসাদটা কী বুঝতে অসুবিধা হল না।
“এবার বারীনবাবুর অবস্থাটা ভাবুন স্যার। ভাস্বতী যদি ওদের দৈহিক সম্পর্কের কথা পুলিশকে জানায়, হি উইল এন্ড-আপ ইন জেল। আইনের চোখে ভাস্বতী নাবালিকা, পালিয়ে গিয়ে তাকে বিয়ে করাও সম্ভব নয়। আর বিয়ে না করলে ভাস্বতী যদি অপমানে লজ্জায় সুইসাইড করে বসে, তাহলেও ওঁর প্রবল সমস্যা হতে পারে, যদি সুইসাইড নোটে ওঁর নাম থাকে। উনি হিসেব করলেন ওঁর সামনে দুটো পথ খোলা। এক মেয়েটাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে মিথ্যে পরিচয়ে সারাজীবন কাটানো। যেটা মোটেই আজকাল সহজ নয়। অথবা মিস ভাস্বতাঁকে খুন করা। আমার ধারণা ইতিমধ্যে মিস ভাস্বতী সম্পর্কে বারীনবাবুর মোহভঙ্গও হয়েছিল। তাই উনি ভাবনা চিন্তা করছিলেন, কী ভাবে ওকে সরানো যায়। তখন এই প্রমোদতরীর আইডিয়াটা মাথায় এল। অনিমেষবাবুকে প্রায় জোর করে দলে নিলেন একটা অ্যালিবাইয়ের জন্যে। মিস ভাস্বতাঁকে বলে রেখেছিলেন রাত সাড়ে বারোটায় সবাই ঘুমিয়ে পড়লে বারীন আসবেন। নিভৃতে বসে প্রেম, পালানোর প্ল্যান বা কিছু একটা করতে। এই সময়ে উনি দুটো কাজ করলেন। একটা হল অনিমেষবাবুর মদে কিছু মিশিয়ে প্রায় বেহুশ করে দিলেন। অন্য সবাইকেও মদের মাত্রা বাড়িয়ে অল্পবিস্তর মাতাল করলেন, যাতে সবাই তাড়াতাড়ি কেবিনে চলে যায়। সবাই ডেক থেকে চলে গেলে অনিমেষবাবুর ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে বারোটা কুড়ি করলেন। তারপর জলের ঝাঁপটা দিয়ে অনিমেষবাবুকে জোর করে জাগিয়ে প্রায় ধরে ধরে ভাস্বতী বসে রয়েছে দেখালেন, তারপর কেবিনে নিয়ে এলেন। বমিটমি করার পর অনিমেষবাবু যাতে চট করে ঘুমিয়ে পড়েন, তার জন্য শরীর চাঙ্গা হবে বুঝিয়ে আর এক ডোজ ঘুমের ওষুধও অনিমেষবাবুকে দিলেন। ঘুমিয়ে পড়ার আগে অভ্যাস বশে অনিমেষবাবু ঘড়ি দেখলেন। ওঁর ধারণা হল সাড়ে বারোটা বেজেছে, আসলে নয়। অনিমেষবাবু ঘুমোতেই বারীনবাবু ভাস্বতীর কাছে। গেলেন। মিস ভাস্বতী বই পড়ছিল। বইটা পাশে রাখতেই, ওই ভারী বইটা তুলে আচমকা দড়াম করে ভাস্বতীর মুখে মারলেন। হঠাৎ ওই আঘাতেই মিস ভাস্বতী নিশ্চয় সংজ্ঞা হারায়। তখন মিস ভাস্বতাঁকে জলে ফেলে দ্রুত গতিতে নিজের কেবিনে ফিরে এলেন। বইটাও জলে ফেলে দিয়েছিলেন, সম্ভবত সেই সময়ে হ্যারিকেনটাও জলে পড়ে যায়। পুরো ব্যাপারটাই ঘটেছে সাড়ে বারোটার একটু আগে। বই দিয়ে আঘাত করার আওয়াজ আর জলে মিস ভাস্বতীর দেহ পড়ার শব্দে বিজয়বাবু বেরিয়েছিলেন। তিনি এবং মন্টু গিয়ে মিস ভাস্বতাঁকে দেখেননি। কারণ তার আগেই তাকে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আরেকটা পয়েন্ট, বিজয়বাবু সোয়া বারোটার সময়ে জেগে থাকা সত্বেও অনিমেষবাবুর বমি করার শব্দ বা অনিমেষবাবু আর বারীনবাবুর কথাবার্তা শুনতে পাননি। অথচ ওঁদের দু’জনের ঘর পাশাপাশি। তার মানে বিজয়বাবু যখন ঘুমোচ্ছিলেন, তখনই অনিমেষবাবু বাথরুমে বমিটমি করছিলেন, বারীনবাবুর সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমার ধারণা ওইসব আওয়াজেই বিজয়বাবুর ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু উনি যখন পুরোপুরি জেগে উঠেছেন তখন অনিমেষবাবু ঘুমিয়ে পড়েছেন।
“যাই হোক, বারীনবাবুর কথায় ফিরে আসি। এইবার শুরু হল বারীনবাবুর সমস্যা। মিস ভাস্বতাঁকে জলে ফেলে ফিরে এসে অনিমেষবাবুর ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিলেন। কিন্তু সময়টা মেলালেন নিজের ঘড়ির সঙ্গে। এদিকে অনিমেষবাবু সব সময়ে ঘড়ি দশ মিনিট ফাস্ট রাখতেন। ফলে এর পরে সব জায়গাতে যেতেই ওঁর দেরি হচ্ছিল। মলয়, তুমি আর বাপিবাবু সময় নিয়ে খুব সচেতন বলে সেটা লক্ষ্য করেছ এবং বিরক্তও হয়েছ। কিন্তু অন্যরা এ নিয়ে ভাবেনি। পাঁচ-দশ মিনিটের এদিক ওদিক নিয়ে অনেকেই ভাবে না, যদি না ট্রেন বা প্লেন ধরতে হয়। তাই উনি নিজেও ধরতে পারছিলেন না সময়ের সমস্যাটা। ডাস ইট মেক সেন্স স্যার?” একেনবাবু আমায় জিজ্ঞেস করলেন।
“যা বলছেন সবই তো লজিক্যাল। কিন্তু টাকার জন্য খুনের পসিবিলিটি কিন্তু এলিমিনেট করলেন না।”
“তা করলাম না, আমি শুধু আরেকটা পসিবিলিটির কথা বললাম। মলয়ের কাজ হবে চুরির জিনিস উদ্ধার করা, আর দেখা মেয়েটার কোনও চিঠিপত্র, ডায়রি বা খাতায় বারীনবাবুর উল্লেখ আছে কি না।”
.
মলয় রায় কাজ করেন খুব দ্রুতগতিতে। পরের দুপুরের মধ্যে উদ্ধার করে ফেললেন ভাস্বতীর গলার হার আর কানের দুল। যে মাঝি ডেড বডিটা জল থেকে তুলেছিল, তার বাড়ি থেকেই মিলেছে। দুর্গাপুর থেকেই বারীনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে জেরা করার জন্যে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে বা পিছিয়ে দিয়ে অ্যালিবাই সৃষ্টি করা ক্রাইম নভেলের একটা ক্লসিক মেথড। সেটা কেন আমি ভাবিনি, নিজেই অবাক হচ্ছিলাম। বেচারা ভাস্বতী… মাত্র সতেরো বছরের তরতাজা জীবনের কী শোচনীয় পরিণতি ঘটল! বারীনকে আমি অল্পই দেখেছি, কিন্তু একবারও মনে হয়নি এরকম জঘন্য কাজ সে করতে পারে! কামনার তাড়নায় মানুষ কী না করে, সেই অন্যায় ঢাকা দিতে আরও কত ঘোরতর অন্যায় করে ফেলে, এটাই বোধহয় এর থেকে শিক্ষণীয়। তবে অনিমেষ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। বার বার ফোন করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। একদিন খেতে নিয়ে যাবে কথা হয়েছে। এগুলো সব একেনবাবুর প্রাপ্য আমার নয়।
পাঁচ
ক’দিন বাদে কলেজে একটা ফোন পেলাম একেনবাবুর কাছ থেকে। নিউ ইয়র্কে এখন রাত্রি সাড়ে বারোটা। এত রাত্রে পয়সা খরচ করে একেনবাবুর ফোন!
“কী ব্যাপার?”
“আই ওয়াজ এ ফুল স্যার, আই ওয়াজ এ ফুল!”
“কী যা-তা বলছেন আপনি?”
“আমাকে শুধু বলুন, প্রথম দিন অনিমেষবাবু কি ঠিক দুটোর সময় আপনার কাছ থেকে চলে গিয়েছিলেন?”
আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, একেনবাবু কীসের কথা বলছেন।
“আপনার সেমিনারের দিন স্যার?”
“ও হ্যাঁ, আমার একটা সেমিনার ছিল, তাই।”
“সেটা জানি স্যার। উনিই কি ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন আর বলেছিলেন আপনার সেমিনারের দেরি হয়ে যাচ্ছে?”
“তাই তো বলেছিল, কারণ তখন প্রায় দুটো বেজেছিল।”
“কিন্তু স্যার, ওঁর ঘড়ি অনুসারে তখনও তো দশ মিনিট সময় ছিল, এত তাড়াহুড়ো করলেন কেন?”
“আমার কোনও ধারণাই নেই।”
“আপনার বন্ধু অত্যন্ত ক্লেভার স্যার, এ ভেরি ক্লেভার এন্ড ডেঞ্জারাস ম্যান। আমি মলয়কে ফোন করে বলছি, টু টেক ইমিডিয়েট অ্যাকশন।”
লাইনটা হঠাৎ কেটে গেল। মোবাইল ফোনের টিপিক্যাল সমস্যা। চেষ্টা করেও একেনবাবুকে ধরতে পারলাম না।
.
রাত্রে অর্থাৎ নিউ ইয়র্কের সকালে একেনবাবুকে পেলাম।
“কী ব্যাপার, সাসপেন্সের মধ্যে ফেলে রেখে হঠাৎ ফোন কেটে দিলেন যে কাল?”
“ব্যাটারিতে চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছিল, স্যার। কিন্তু সাসপেন্স কেন, মলয় কিছু বলেনি আপনাকে?”
“নাঃ!”
“হয়তো অন্য কোনও তদন্তে জড়িয়ে পড়েছে।”
.
যাইহোক একেনবাবুর কাছ থেকে যা যা ঘটেছে সব কিছুই জানলাম। একেনবাবুর কথা শুনেই অন্য অ্যাঙ্গেল থেকে বারীনকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন মলয়বাবু। জানতে পেরেছেন, বারীন যে পৈত্রিক বাড়িটা প্রমোটারকে বিক্রি করে দিচ্ছে, অনিমেষ সেই বাড়িতেই থাকে। এই তথ্য আমার অজানা নয়, নাকতলার পার্টিতেই জেনেছিলাম, আর একেনবাবুকে জানিয়েও ছিলাম। কিন্তু এর তাৎপর্যটা কী হতে পারে খেয়াল করিনি। অনিমেষ শুধু বারীনের বাড়িতে ফ্রি থাকে তা নয়, ওই বাড়িতেই টিউটোরিয়ালের রমরমা ব্যাবসা চালায়। বাড়ি বিক্রি হলে সেই ব্যাবসা লাটে উঠবে। অনিমেষ বারীনকে বলেছিল বিক্রির ব্যাপারে অপেক্ষা করতে, কিছুদিন বারীন করেছিল। কিন্তু হঠাৎ একটা ভালো ডিল পেয়ে যাওয়ায় বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
হার্ড ফ্যাক্ট বলতে এটুকুই। এবার শুরু হচ্ছে লজিক। সেটাই একেনবাবু বিশদ করলেন।
“এই বিক্রিটা একমাত্র বন্ধ করা যায় যদি সুপারি কিলার দিয়ে বারীনবাবুকে সরানো যায়। কিন্তু তাতে সন্দেহের তির অনিমেষবাবুর ওপর পড়বে, যেহেতু ওঁর ফাইনানশিয়াল ইন্টারেস্ট আছে। তখনই এই ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়াটা অনিমেষবাবুর মাথায় আসে। যদি বারীনবাবুকে কোনও মতে খুনের মামলায় জড়ানো যায়, তাহলে ফাঁসি না হলেও বহুদিনের জন্য বারীনবাবুকে শ্রীঘরে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে অনিমেষবাবুর বাড়ি ছাড়ার কোনও প্রশ্নই উঠবে না। ভাস্বতাঁকে অনিমেষবাবু খুব ভালোভাবেই চিনতেন, ওকে মাস দুই পড়িয়েছিলেন। শিক্ষক-ছাত্রীদের মধ্যে অনেক সময় যা হয়, একটু প্রেম প্রেম ভাব হয়তো এক সময়ে হয়েছিল। এইটেই অনিমেষবাবু কাজে লাগালেন। বোটে যাবার আগে একদিন কোনও এক ফাঁকে অনিমেষবাবু ভাস্বতাঁকে প্রেম নিবেদন করে ইলোপ করার প্রসঙ্গটা তুললেন। নিশ্চয় বলেছিলেন এটা খুব প্রাইভেট, বারীনবাবুকেও যেন না জানে। তবে কোনও এক বন্ধুকে জানিয়ে রাখতে বলেছিলেন, অবশ্যই অনিমেষবাবুর নাম না করে। তাহলে পালিয়ে যাবার পরে বাবা-মা বেশি দুশ্চিন্তা করবেন না। আসল উদ্দেশ্য, পরে তদন্তের সময় পুলিশ যেন এই তথ্যটা পায়। ভাস্বতী সত্যি সত্যিই অনিমেষবাবুর সঙ্গে পালাত কি না বলা শক্ত। কিন্তু একজন যুবাপুরুষ ওকে এরকম ভাবে কামনা করছে … খবরটা ভাস্বতী ওর এক বন্ধুকে না জানিয়ে পারেনি।
“বোটে উঠে সবাই যখন বাইরের ডেকে বসে আছে, অনিমেষবাবু চট করে ভাস্বতীর সঙ্গে দেখা করে আসেন। নিশ্চয় বলেন সাড়ে বারোটার আগেই ওর কাছে অনিমেষবাবু আসবেন। অন্যদের ড্রিংকস-এ ঘুমের ওষুধ অনিমেষই মেশান। তারপর ইচ্ছে করে আউট হয়ে যাবার ভান করেন। হাউসবোটে সময়ের হিসেব অনেকগুলোই হয়তো অনিমেবাবুর বানানো। তবে এটা মনে হয় ঠিক, সবাই চলে গেলে বারীনবাবুকে নিয়ে অনিমেষবাবু কেবিনে গিয়েছিলেন। তারপর বারীনবাবু শুয়ে চোখ বুজতেই গিয়েছিলেন ভাস্বতীর কাছে। ভাস্বতীর হাত থেকে কোনও এক ছুতোয় বইটা নিয়ে আচমকা দড়াম করে মুখে বা মাথায় মেরেছিলেন।…”
“খুন করার জন্য?”
“না স্যার, আমার ধারণা উদ্দেশ্য ছিল অজ্ঞান বা হতবুদ্ধি করে দেওয়া, যাতে ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দেওয়ার সময় ভাস্বতী চেঁচাতে না পারে। তারপর বই আর হ্যারিকেন দুটোই জলে বিসর্জন দিয়ে কেবিনে এসে শুয়ে পড়েন।”
একেনবাবুর কাছে এতটা শুনে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বইয়ে না হয় রক্ত লেগে থাকতে পারে, কিন্তু হ্যারিকেনটা ফেলে দেবার কারণ কী?”
“আমার ধারণা স্যার, হ্যারিকেনের আলোয় বসে মেয়েটা পড়ছিল। মেয়েটাকে জলে ফেলে দেবার সময়ে হ্যারিকেনটাও উলটে জলে পড়ে যায়। বুঝতে পারছি এক্ষেত্রে ‘বিসর্জন’ কথাটা ঠিক খাটে না। কিন্তু যেটা ইন্টারেস্টিং, সেটা হল এর পরে অনিমেষবাবুর অভিনয় এবং আমাদের ভুল পথে চালানোর চেষ্টা। টুকরো টুকরো নানান ইনফরমেশন দিয়ে বারীনবাবুর ওপর সন্দেহ জাগানো, সবার যেন মনে হয় ভাস্বতীর এই অন্তর্ধান বা খুনের পেছনে বারীনবাবুর হাত আছে। না স্যার, সোজাসুজি নয়, তবে সেই তথ্যগুলোর যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খাড়া করে সেই সিদ্ধান্তেই সবাই যেন আসি। যেমন ধরুন, দশ মিনিট বাদে মিটিং-এ এসে ঠিক সময়ে এসেছি ভান করা। মলয় তাতে বিরক্ত হলেও দেরিটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াই ছিল অনিমেষবাবুর প্ল্যান। দেরিটা আমরা সবাই লক্ষ্য করেছি। যাতে পরে আমরা ভাবি, এটা বারীনবাবুর টাইম-অ্যালিবাই তৈরি করার চেষ্টা.. হাউসবোটে অনিমেষবাবুর ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দেওয়া এবং পরে সময় মেলানোতে ভুল করা… সবকিছুই পারফেক্ট। কিন্তু একটা ভুল করেছিলেন অনিমেষবাবু, সেটাই কাল হল। প্রথমদিন অসতর্ক ভাবে ঘড়ি দেখে দুটোর সময় দুটো বলা। এত করেও শেষ রক্ষা হল না।”
শেষ কথা
তবে দোষী প্রমাণ শুধু লজিক দিয়ে হয় না। জেরার চাপে অনিমেষ অপরাধ স্বীকার করেছে। জেরা করার সময়ে মলয়বাবু মিথ্যে করেই ভাস্বতীর ডায়রিতে অনিমেষের উল্লেখ রয়েছে বলেছিলেন, তাতেই কাজ হয়েছে। বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে অনিমেষের ঘোরতর আপত্তির কথা বারীন জানিয়েছে। বারীনকে সরানোর জন্য অনিমেষ একজন কনট্রাক্ট কিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, সেটাও জানা গেছে। তদন্তের জাল মোটামুটি গুটিয়ে এসেছে।
