বেসুরো বেহালার পরের কাহিনি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
এক
আমার এক স্টুডেন্ট অ্যাসিস্টেন্ট আছে, নাম ওডিন সেকো। আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ছাত্র হলেও ওডিনের বয়স হয়েছে। আমার থেকে মাত্র বছর কয়েকের ছোটো। নানা ঘাটের জল খেয়ে আবার কলেজে ঢুকেছে। অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি নিয়ে মেরিল্যান্ডে এক এনার্জি রিসার্চ সেন্টারে ল্যাব অ্যাসিস্টেন্টের কাজ করত। বেশ কয়েক বছর ছিল সেখানে, তারপর কী মনে হয়েছে আবার ডিগ্রি কোর্সে ঢুকেছে। কথাবার্তায় ভদ্র। মন দিয়ে কাজ করে। এবার আমার গ্রান্টে ফুল-টাইম অ্যাসিস্টেন্টশিপের টাকা নেই। ফুল-টাইম অ্যাসিস্টেন্টরা সপ্তাহে কুড়ি ঘণ্টা কাজ করে, সেই সঙ্গে পড়াশুনো। আমার এ্যান্টে যা আছে, তাতে অর্ধেক দেওয়া যায়। ওই টাকায় ওর চলছিল না। প্রমথর কেম-ল্যাবের এক অ্যাসিস্টেন্ট তিনমাসের মেটার্নিটি-লিভ নিয়েছিল। ডিপার্টমেন্ট হেডের সঙ্গে কথা বলে প্রমথ ওকে আরও দশ ঘণ্টার কাজ ম্যানেজ করে দিল। ফলে আমাদের প্রতি ওডিনের কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। দরকারে অ-দরকারে এগিয়ে এসে সাহায্য করে। আমার তরফ থেকে যেটা করতে পেরেছি, আমার ঘরের এক কোণে ওর জন্য ডেস্ক আর চেয়ার রাখা।
.
কিছুদিন আগের কথা। ওডিন আর আমি অফিসে কাজ করছি, আমার বন্ধু প্রীতম এল। প্রীতমের সঙ্গে কলকাতায় বি এসসি পড়েছিলাম। পাশ করেই ও আমেরিকাতে চলে এসেছিল, তবে যোগাযোগটা ছিন্ন হয়নি। আমি যখন নিউ ইয়র্কে প্রথম এলাম, প্রীতমই খোঁজখবর করে আমার সঙ্গে এসে দেখা করেছিল। অফিসের কাজে মাঝেমাঝেই ওকে এদিকে আসতে হয়, সময় থাকলে আমাকে ‘হ্যালো’ বলে যায়।
.
আমার বন্ধু হলেও প্রীতম অন্য জগতের ছেলে। থাকত আলিপুরে, অভিজাত পল্লীর একটা বিশাল বাড়িতে। অঢেল পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র সন্তান। মায়ের পরিবার আরও বড়লোক। মায়ের ঠাকুরদা, অর্থাৎ প্রীতমের দাদুর বাবা যৌবনকালে কেনিয়াতে গিয়ে একটা ছোটোখাটো দোকান খুলেছিলেন। সেখান থেকেই রকেটের গতিতে তাঁর উত্থান। ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রি এখন একটা বিশাল কনগ্লমারেট অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, প্লাস্টিক থেকে শুরু করে আইটি, বায়োটেক –কী নেই তার মধ্যে! ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির অফিস শুধু কেনিয়াতে নয়, ইউরোপ, জাপান, আমেরিকা, অস্ট্রলিয়া– সব জায়গাতেই ছড়িয়ে আছে! হেড কোয়ার্টার নাইরোবিতে। প্রীতম রয়েছে কোম্পানির নিউ ইয়র্ক অফিসে। দাদু মারা যাবার পর প্রীতমের বড়মামা গুরুবচন সিংই ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির প্রধান। কয়েক বছর হল নিউ ইয়র্কে এসেছেন এদিকের অপারেশনটা বাড়ানোর জন্য। আমার ধারণা প্রীতমকে ট্রেনিং দিচ্ছেন যাতে নর্থ আমেরিকার ভারটা প্রীতমকে দিয়ে যেতে পারেন। প্রীতমের মামা হবার সুবাদে উনি আমাদেরও আঙ্কল, ওঁর স্ত্রী আন্টি। ওঁরা থাকেন ট্রাইবেকা অঞ্চলে একটা পেন্টহাউসে।
.
প্রীতম এসেছিল ওঁর মামার হয়ে আমাদের নেমন্তন্ন করতে। ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির স্ট্রং রুমে রাখা কিছু কিছু গোপন নথি নাকি চুরি হচ্ছিল! কী ভাবে সিকিউরিটিকে ধোঁকা দিয়ে কাগজপত্র সরানো হচ্ছিল, সেটা খুঁজে বার করার জন্যে প্রীতমের বড়মামা প্রাইভেট ডিটেকটিভের খোঁজ করছিলেন। কারো কাছ থেকে একেনবাবুর নাম শুনে যোগাযোগ করেন। তখন অবশ্য প্রীতমের সঙ্গে আমাদের পরিচয়ের কথা উনি জানতেন না। আর ব্যাপারটা এতই গোপনীয় ছিল যে প্রীতমও এই চুরির খবর জানত না। রহস্যটা উদ্মাটন করতে একেনবাবুর লেগেছিল মাত্র দু’দিন! চোরকে হাতে নাতে ধরেননি ঠিকই, কিন্তু সিকিউরিটি ব্যবস্থায় একটা বড়সড় গলদ আবিষ্কার করেছিলেন। সেই সুযোগটাই চোর নিয়েছিল সন্দেহ নেই। একেনবাবুর সাহায্য নিয়ে সিকিউরিটির সেই ফাঁকটা সুরক্ষিত হল। যেসব তথ্য চুরি হয়ে গেছে, সেগুলো তো গেছে। কিন্তু আরও চুরি হওয়া তো আটকানো গেল!
এত তাড়াতাড়ি একেনবাবু সমস্যার সমাধান করবেন প্রীতমের বড়মামা স্বপ্নেও ভাবেননি! তারপর যখন দেখলেন, একেনবাবু টাকা নিতে চাচ্ছেন না, তখন তো বিস্ময়ে হতবাক! সেই প্রথম জানলেন আমরা ওঁর ভাগ্নের বিশেষ পরিচিত! প্রীতমের আজ নেমন্তন্ন করতে আসাটা সেই সূত্রেই। দুপুরে লাঞ্চের নেমন্তন্ন, এই রবিবার। প্রীতমকে বললাম, “একেনবাবু আর প্রমথ ফ্রি আছে কি না দেখি। থাকলে তো আসবই। যাই হোক, বিকেলের মধ্যেই জানাব।”
.
প্রীতম যেতে না যেতেই একেনবাবু অফিসে এলেন। সকালে তাড়াহুড়ো করে অ্যাপার্টমেন্টের চাবি না নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। পরে খেয়াল হওয়াতে আমাকে ফোন। এটা নতুন কিছু নয়, প্রতি মাসেই একাধিক বার হয়। ওঁর চাবিটা সঙ্গে নিয়েই এসেছিলাম, বরাবরই তা করি। চাবিটা হাতে দিয়ে বললাম, “কয়েক সেকেন্ড আগে এলে প্রীতমের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। আপনার জন্য রবিবার সবাই লাঞ্চের নেমন্তন্ন পেয়েছি ওর মামার বাড়িতে।”
“আমার জন্য স্যার?”
“বাঃ, আপনি ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির চুরি ধরলেন যে?”
“চোর ধরলাম কই স্যার, সিকিউরিটির ফাঁকটা ধরলাম শুধু।”
“ওই হল, সেইজন্যই তো নেমন্তন্ন! আপনি ফ্রি তো?”
“আমি তো ফ্রি স্যার। কিন্তু প্রমথবাবু?”
“আমি ওকে ধরব, একটু বাদেই আসবে।”
একেনবাবুর বাড়ি যাবার তাড়া ছিল, আর বসলেন না।
.
একেনবাবু চলে যেতে ওডিন জিজ্ঞেস করল, “ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রি … মানে, আফ্রিকার ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রি?”
“হ্যাঁ, তুমি ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির নাম শুনেছ?”
ক্যাম্পর ইণ্ডাস্ট্রি বড় হলেও আইবিএম, জেনারেল মোটর্স বা এক্সনের মতো বিশাল নয়… ওরকম অজস্র কোম্পানি নিউ ইয়র্কে রয়েছে। কিন্তু নাম না শুনে থাকলে প্রশ্ন করবে কেন? আমার প্রশ্নটাই স্টুপিডের মতো!
ওডিন মাথা নাড়ল।
আমার একটা ক্লাস ছিল, এ নিয়ে আর কথা হল না।
দুই
প্রমথ আমাদের সঙ্গে যাবে বলেছিল, শেষ মুহূর্তে কাটল। আমি অবশ্য আশ্চর্য হইনি। রবিবার ওকে পাওয়া কঠিন… গার্ল ফ্রেন্ড ফ্রান্সিস্কার সঙ্গে সময় কাটায়। তাও আগে থেকে বলবে তো!
.
পেন্টহাউসে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এর আগে একবারই হয়েছিল। সেবার গিয়েছিলাম ম্যানহাটানের রিয়েল এস্টেট ম্যাগনেট বিপাশা মিত্রের কাছে। পেন্ট-হাউস কী সবাই হয়তো জানেন না… অন্তত আমি এদেশে আসার আগে জানতাম না। হাইরাইজ বিল্ডিং এর সবচেয়ে উঁচু তলার অ্যাপার্টমেন্টকে বলা হয় পেন্টহাউস। এগুলোই সাধারণত হয় সবচেয়ে দামি আর লাজুরিয়াস।
প্রীতমের মামার অ্যাপার্টমেন্ট অবশ্য বিপাশা মিত্রের বাড়ির মতো বড় নয়, কিন্তু অনেক ছিমছাম। লোকেশনটাও ভালো, হাডসন নদীর লাগোয়া ব্যাটারি পার্কের ঠিক পাশে! তিরিশ তলায় পেন্টহাউসে ওঠার জন্য সার্ভিস এলিভেটর বাদ দিয়ে তিন তিনটে এলিভেটর বা লিফট! সেইসঙ্গে সিঁড়ি তো আছেই ফায়ার কোড-এর জন্যে। বাড়িতে আগুন লাগলে ফায়ার-প্রুফ সিঁড়ি দিয়ে লোকে যাতে নেমে আসতে পারে।
আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলাম প্রীতমের বড়মামা তখন অফিসঘরে দরজা বন্ধ করে কাজে ব্যস্ত। প্রীতমই আমাদের লিভিংরুমে নিয়ে গিয়ে বসাল। বিশাল লিভিং রুম। আমি বলব চওড়ায় প্রায় কুড়ি ফুট, লম্বায় তো কম-সে-কম পঞ্চাশ ফুট হবে! সামনে একটা লম্বা টেরাস আর দু’দিকে দুটো ব্যালকনি বা বারান্দা। এখানে বলেই ফেলি– টেরাস আর ব্যালকনির তফাৎটা আগে ঠিক বুঝতাম না। ভুলের মধ্যে সেটা একদিন বলে ফেলে প্রমথর কাছে গাল খেয়েছি।
“এটাও জানিস না! টেরাস হল ছাত, তার নীচে ঘরটর থাকে। ব্যালকনির নীচের একটা দিকে অন্তত কিছু থাকে না।”
প্রমথ অবশ্য অনেক সময়েই সবজান্তার মতো অনেক উলটো পালটা বলে। এটা সম্ভবত ভুল নয়।
.
খানিক বাদেই আন্টি ঘরে এলেন। প্রীতমের কাছে শুনেছিলাম আঙ্কল গুরুগম্ভীর লোক। অফিসের লোকেরা তো ওঁর ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকে। আন্টি কিন্তু একেবারেই উলটো, হাসিখুশি, ঘরোয়া… ভারী স্নেহশীলা।
আমাদের জন্যে দেখলাম ঢালাও অ্যাপেটাইজারের বন্দোবস্ত করেছেন যার টেন পার্সেন্টও আমরা শেষ করতে পারব না। এটা নাও, ওটা নাও’ করতেই থাকলেন। যতটা পারলাম খেলাম। অ্যাপেটাইজারের ধাক্কাটা কাটলে একেনবাবু বললেন, “সত্যি ম্যাডাম, এত উঁচুতে এত বড় বাড়ি, একেবারে অ্যামেজিং!”
“বাড়িটা দেখবে?” আন্টি ভদ্রতা করেই মনে হল প্রশ্নটা করলেন।
একেনবাবু হ্যাংলার মতো বললেন, “দেখাবেন ম্যাডাম, এমন বাড়ি দেখার সুযোগ আর কবে পাব?” বলেই আমাকে তাড়া দিলেন, “চলুন স্যার, চলুন!
সত্যি, একেনবাবুকে নিয়ে আর পারা যায় না!
আন্টি আমাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে অ্যাপার্টমেন্টটা দেখালেন। প্রীতমও আমাদের সঙ্গ দিল। মোট চারটে জাম্বো সাইজের বেডরুম, প্রত্যেকটাই উইথ অ্যাটাচড বাথ আর টেরাস। দুটো টেরাস পশ্চিম দিকে মুখ করে। সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে চোখে পড়বে হাডসন নদী। স্পীড-বোট, ক্রুজার, ক্যাটামারান, যাত্রীবাহী স্টিমার, কী নেই সেখানে! নদীর এদিকে ব্যাটারি পার্ক, অন্যদিকে জার্সি সিটির নতুন কাঁচে ঢাকা আলোয় ঝলমল হাই রাইজগুলো। ওই টেরাসে বসেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো যায়।
.
ডাইনিং রুমটাও খুব বড়। যে টেবিলটা সেখানে পাতা, সেখানে গোটা বারো চেয়ার সাজানো আছে দেখলাম। কিন্তু হাত পা ছড়িয়ে জনা কুড়ি গেস্ট সেখানে বসতে পারে। পাশেই প্রশস্ত কিচেন। সাদা কোট পরা একজন রান্না করতে ব্যস্ত, মাথায় শেফের ক্যাপ। কিচেনের লাগোয়া একটা প্যানট্রি আর তার পাশে বোধহয় হাবিজাবি জিনিসপত্র রাখার স্টোর রুম। সেটা বন্ধ।
ডাইনিং রুমের একদিকে মোটা কাঁচের দেয়াল। তার মাঝখানে বিশাল স্লাইডিং দরজা, টেরাস গার্ডেনে যাওয়ার জন্য।
এত বিশাল বাড়ি, অথচ থাকেন মাত্র ওঁরা দু’জন! একমাত্র মেয়ে বল্লরী ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, বাড়িতে আসে শুধু কোয়ার্টার ব্রেকে। আন্টির কথাবার্তা শুনে যা মনে হল রাতেও ওঁরা একাই থাকেন থাকেন, কোনও গার্ড বা হেল্প থাকে না। দিনের বেলায় একজন কুক আর একটি হাউসকিপার আসে। আন্টির বাগানের শখ বলে একজন গার্ডনার মাঝেমাঝে এসে টেরাস গার্ডেন তদারক করে যায়। একটা ছোট্ট গ্লাস-হাউসও ওখানে আছে। নিশ্চয় টেম্পারেচার কনট্রোলড… নইলে কি আর শীতকালে গাছ পালা বাঁচবে?
আন্টি বললেন, কয়েকটা গোলাপি আর হলুদ লেডিজ স্লিপার অর্কিড ফুটেছে গ্লাসহাউসে। সেটা শুনে একেনবাবু সুপার এক্সাইটেড। একেনবাবুর ওই অবস্থা দেখে আন্টি প্রীতমকে বললেন, একেনবাবুকে গ্লাসহাউসটা দেখিয়ে দিতে। প্রীতম ওঁকে নিয়ে গেল। অর্কিডে আমার এ্যালার্জি নেই, কিন্তু একেনবাবুর মতো ওরকম উৎসাহও নেই। আমি আন্টির সঙ্গে ডাইনিং রুমে বসে গল্প করতে লাগলাম। এমন সময়ে আঙ্কল ঘরে ঢুকলেন।
আন্টি পরিচয় করিয়ে দিতেই বললেন, “আমি একটা ফোন এক্সপেক্ট করছি। চলো, অফিস-ঘরে তোমার সঙ্গে কথা বলি।”
“তোমরা যাও, আমি লাঞ্চের ব্যাপারটা একটু দেখি।” বলে আন্টিও উঠে গেলেন।
.
আঙ্কলের অফিস-ঘর বেডরুমগুলোর তুলনায় ছোটো, কিন্তু লোকেশনটা চমৎকার — একেবারে কর্নারে। দুটো দেয়াল পুরো কাঁচের। উলটো দিকের দুই দেয়ালে দুটো দরজা, একটা হলে যাবার, অন্যটা মনে হয় বাথরুমের। এক্সিকিউটিভ অফিস ডেস্কটা ওই দুটো দেয়ালে কোনাকুনি এমন ভাবে বসানো যে পেছনে চেয়ার বসেই হাডসন নদী পরিষ্কার দেখা যায়। ডেস্কের সামনে দুটো চেয়ারের একটাতে বসলাম। ডেস্কে কাগজপত্রের জঞ্জাল ঘাঁটতে ঘাঁটিতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকে আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ে আছি?
এ ধরণের প্রশ্নের কোনও উত্তর হয় না। তবে বুঝলাম আমরা কে কী করি, এ ব্যাপারে খোঁজখবর কিছু নিয়েছেন। আমি উত্তরে বলার চেষ্টা করলাম, পড়াতে আমার ভালো লাগে।
তখন জিজ্ঞেস করলেন, আগে অন্য কিছু করেছি কি না।
যখন বললাম ‘না’, তখন বললেন তাহলে সেটা যে আরও ভালো লাগবে না, কী ভাবে বুঝলাম? তারপর একটা লেকচার ঝাড়লেন। যার সার কথা, অ্যাডভেঞ্চারাস না হলে পৃথিবীতে কিছু পাওয়া যায় না। ভাগ্যিস প্রমথ সঙ্গে ছিল না। সঙ্গে থাকলে পাওয়া যায় না’ বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন… সেই নিয়ে সাত রকম তর্ক জুড়ত। ফলে বিচ্ছিরি ভাবে ব্যাপারটা শেষ হত। আমি ‘রা’ কাড়লাম না বলেই বোধহয় আমার ওপর একটু করুণা হল। বললেন, “না, তোমাদের মতো ভালো শিক্ষকের প্রয়োজন আছে। মানুষ তো তোমরাই গড়বে। কিন্তু কিপ ইওর মাইন্ড ওপন, অপরচুনিটি একবারই আসে জীবনে।”
ঠিক কী অপরচুনিটি সেটা অবশ্য পরিষ্কার হল না। এরপর যতক্ষণ ওঁর ঘরে ছিলাম, নিজের জীবনের কথাই বললেন। কী ভাবে বিজনেসটা বড় করে তুলেছেন, কোম্পানিকে ডাইভার্সিফাই করতে কত রিস্ক নিতে হয়েছে, কাট-থ্রোট কম্পিটিশনের ভয়ে পিছিয়ে যাননি, ইত্যাদি। কিন্তু রিস্ক নিয়েছেন বলে রিওয়ার্ডও এসেছে। আধঘণ্টা বাদে আন্টি যখন খেতে ডাকলেন, তখন পিঠটা চাপড়ে বললেন, “উই আর ডুইং গড’স ওয়ার্ক, কিপ ইট আপ!” অর্থাৎ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি উলটো!
.
এই অদ্ভুত আচরণের কারণটা পরে প্রীতমের কাছে জেনেছিলাম। ওঁর একমাত্র ছেলে বাপের ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও বিজনেসে না ঢুকে মিউজিক নিয়ে পড়াশুনো করে স্কুলের টিচার হয়েছিল। ভালো বেহালা বাজাত। পরে কোনও দুর্ঘটনায় মারা যায়। সেটা শুনে আর একটা ব্যাপার ক্লিয়ার হল। আঙ্কলের অফিস ঘরে একটা শো-কেসে বেশ কয়েকটা জিনিস চোখে পড়েছিল। এখন বুঝলাম সেগুলো পরলোকগত ছেলের স্মৃতি চিহ্ন। কয়েকটা তারের যন্ত্র। ছোটোটা বেহালা, অন্য দুটো একটু বড় সাইজের। একটা তো মনে হল ভায়োলা, আরেকটা নিশ্চয় চেলো– একটা এন্ড পিনের ওপর দাঁড় করানো। উনি আমাকে বসিয়ে রেখে কয়েক মিনিটের জন্যে বাথরুমে গিয়েছিলেন। তখন উঠে শো কেসটা ভালো করে দেখছিলাম। শেষ প্রান্তে একটা ভেলভেটের বাক্স, নিশ্চয়ই দামি কিছু আছে সেখানে। আর একবারে শেষে আরেকটা বেশ পুরোনো বেহালা। শো-কেসে কোনও লক নেই। তবে জিনিসগুলো সিকিওরড, একটা সিকিউরিটি ক্যামেরা দেখলাম ওদিকে তাক করে আছে। হয়তো একাধিক ক্যামেরা নানান দিকে লুকিয়ে আছে, বড়ো লোকদের ব্যাপার।
তিন
সোমবার কলেজে গেছি। ওডিন এসে বলল, “রবিবার ফোন করে ডিস্টার্ব করতে চাইনি, কিন্তু যে কাজটা দিয়ে গিয়েছিলে, সেটাতে এক জায়গায় আটকে গেছি, শেষ করতে পারিনি।”
একটা রেফারেন্স। আমারই দোষ, ভুল তারিখ দিয়েছি বলে বেচারা আর খুঁজে পায়নি।
“ফোন করলেই পারতে। আমি তো লাঞ্চ খেতে গিয়েছিলাম।”
“তা হোক, মিস্টার সিং তো খুব বিখ্যাত লোক, আমি সাহস পাইনি ওখানে ফোন করতে।”
“তুমি কি চেন ওঁদের?”
“না, না, চিনি না। তবে আমার চেনা জানা অনেকে কাজ করতেন এঁদের কোম্পানিতে। তাঁদের কাছে ওঁর কথা শুনেছি।”
“তোমার চেনা জানা লোক.. এখানকার কেউ?”
“না, আফ্রিকার।”
একটু অবাক হলাম। আমি ওডিনকে ব্ল্যাক আমেরিকান বলেই জানি। এখানেই জন্ম, এখানেই বড় হয়েছে। মিডওয়েস্টার্ন অ্যাকসেন্টে কথা বলে। হয়তো সেকেন্ড জেনারেশন।
“আফ্রিকার? আঙ্কল তো সারাজীবন আফ্রিকাতেই ছিলেন, উনি নিশ্চয় চিনবেন। প্রীতমের কাছে শুনেছি, কোম্পানির অনেক লোককেই পার্সোনালি চেনেন।”
ওডিন হাসল, “হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে ওঁদের কোম্পানিতে।”
“তা ঠিক। কিন্তু ওডিন, আমি তো ভেবেছিলাম তুমি এদেশের ছেলে, তোমার সঙ্গে আফ্রিকার এত কানেকশন হল কী করে? কবে তোমার বাবা-মা এদেশে এসেছেন?”
“সে অনেক বছর।” মনে হল উত্তরটা একটু এড়াতেই চাচ্ছে। ব্যাক্তিগত ব্যাপার, আমিও আর বেশি প্রশ্ন করলাম না। এদেশে প্রাইভেসিটা সবাই মেনে চলে।
.
সামার শেষ হতে মাত্র সপ্তাহ তিনেক বাকি। অফিসে ঢুকে দেখলাম, ডেস্ক-এ একটা
নোট…
May I get a three-week break to find my roots?
Best, OS.
নোটটা ওডিনের। সবসময় OS লেখে। ওডিন আর সেকো-র প্রথম দুটো অক্ষর। যাঁরা Best’ দেখে অবাক হচ্ছেন, তাঁদের বলি, এদেশে অনেকেই ‘With best wishes’ না লিখে সংক্ষেপে ‘Best’ লেখে।
বেভকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী ব্যাপার?” বেভ আমাদের অফিস অ্যাসিস্টেন্ট, ভালো বন্ধুও।
“ওর কী একটা জানি জরুরী কাজ, সারাদিন বাইরে বাইরে কাটাবে, তাই নোটটা লিখে রেখে গেছে।”
“Find my roots!’…আমার তো মনে হচ্ছে অ্যালেক্স হেইলির কুন্তা কান্তের কথা… নিজের পূর্ব পুরুষকে খুঁজতে যাওয়ার মতো কোনও ব্যাপার…”
একটা ফোন আসাতে বেভ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমার কথাটা ঠিক ধরতে পারল কিনা কে জানে!
অ্যালেক্স হেইলির বইটার কথা অনেকে নাও জানতে পারেন। আমি নিজেই জানতাম না। বইটার কথা প্রথম শুনেছিলাম দিনুকাকার কাছে, যিনি প্রায় চার-পাঁচ দশক ধরে এদেশে আছেন। সাতের দশকে অ্যালেক্স হেইলির Roots: The Saga of An American Family বইটা একটা আলোড়ন তুলেছিল। মার্কিন মুলুকের বেশির ভাগ কালো বা ব্ল্যাক লোকদের পূর্বপুরুষরা এসেছিল কৃতদাস হিসেবে। বইটা ছিল লেখকের পূর্বপুরুষকে খোঁজার কাহিনি। এ নিয়ে বড় একটা টেলিভিশন সিরিজও হয়েছিল। আফ্রিকান-আমেরিকান জিনিওলজি নিয়ে তখনই প্রথম একটা আগ্রহের শুরু, ঝড়ের বেগে সেটা তুঙ্গে ওঠে। তারপর যা হয়, ধীরে ধীরে সেই আগ্রহ স্তিমিত। ওডিনের নোট পড়ে মনে হল আগ্রহ স্তিমিত হলেও লুপ্ত হয়নি।
আমার কাজ মোটামুটি ভালোই এগিয়ে রেখেছে ওডিন। তিন সপ্তাহ ছুটি নিলে অসুবিধার কোনও কারণ নেই। ফিরে এসে কয়েক ঘণ্টা এক্সট্রা কাজ করলেই রিপোর্টের ডেডলাইন মিস হবে না।
বিকেলে ফিরে এসে ওডিন জানাল, একটা দরকারি কাজে ওকে বাইরে যেতে হবে। ইমেল-এ যোগাযোগ করা যাবে, কিন্তু ফোনে পাওয়া যাবে না।
“টু ফাইন্ড ইওর রু?” ওর নোট থেকেই লাইনটা বলে ওর দিকে তাকালাম।
চাইলে উত্তর দিতে পারত, কিন্তু দিল না। শুধু একটু হাসল। কেন জানি না মনে হল একটু বিষণ্ণ। এ নিয়ে আর প্রশ্ন করা উচিত নয়। শুধু জিজ্ঞেস করলাম, “সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো?”
“হ্যাঁ।”
বললাম, “ও-কে, হ্যাভ এ নাইস ট্রিপ।”
ফিরল সপ্তাহ তিনেক বাদেই, কিন্তু দেখি বেশ মনমরা। কী হয়েছে দুয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম। প্রতিবারই ওর উত্তর, ‘আই উইল বি ওকে।’
বারবার একই প্রশ্ন করা যায় না। প্রেম-ঘটিত কিছু হতে পারে। ধীরে ধীরে কথাবার্তা বলা কমাল… সব সময়েই অন্যমনস্ক। আমি ডাক্তার নই, তবে বুঝতে পারছি ডিপ্রেশনে ভুগছে।
.
বেভ ডিপার্টমেন্টের সবার হাঁড়ির খবর রাখে। ওর আকর্ষণীয় চেহারা আর ফ্লার্টি পার্সোনালিটির জন্যে অনেকেই সঙ্গ পেতে ওর কাছে আসে, হৃদয় উজার করে দেয়। বেভও ওডিন সম্পর্কে কু-লেস। একদিন ওডিন যখন ঘরে নেই, বেভ এসে বলল “ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে হেলথ সেন্টারে পাঠাও। ওকে ডাক্তার দেখানো দরকার।”
আমি উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমাকে কিছু বলেছে?”
“না, বাট আই নো।”
হাউ ডু ইউ নো, জিজ্ঞেস করতে পারতাম, কিন্তু আমি নিজেও তো একই কথা ভাবছিলাম।
বেভ ইজ রাইট। সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্বটা আমাকেই নিতে হবে। ওডিন প্রথমে কথাটা কানেই তুলছিল না। শেষে প্রায় জোর করে ওকে ইউনিভার্সিটি হেলথ সেন্টারে পাঠালাম।
.
এদেশে ডাক্তাররা পেশেন্টদের সম্পর্কে বাইরের কাউকে কিছু বলে না। আমার এক বিশেষ পরিচিত সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্টে রেসিডেন্সি শেষ করে হেলথ সেন্টারে পার্ট-টাইম ডাক্তার হিসেবে কাজ শুরু করছে। ওর কাছ থেকেও কিছু আদায় করতে পারলাম না। শুধু এটুকুই জানলাম, ওডিনের মনের মধ্যে বিস্তর জট, ডাক্তাররাও খানিকটা অন্ধকারে। তবে অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট দেওয়া হয়েছে, সেগুলো খাচ্ছে।
ওষুধ কী দিয়েছে জানি না, তাতে কিছুটা ফল মনে হয় হচ্ছে। ইদানীং আবার একটু একটু কথাবার্তা শুরু করেছে। কাজকর্ম আগের মতো করতে না পারলেও পারছে।
এর মধ্যে একদিন একেনবাবু আর আমি অফিসে বসে গল্প করছি, একটু বাদে লাঞ্চে যাব। ওডিনের আজ অফ ডে, নইলে অনেক সময় ওকেও পাকড়াও করে নিয়ে যাই। হঠাৎ বেভ ঘরে ঢুকে বলল, “তোমরা জানো, ওডিন অ্যাডপ্টেড?”
বেভ মাঝে মাঝে এরকম চমক-দেওয়া খবর আনে।
“তুমি কী করে জানলে?” জিজ্ঞেস করলাম।
“ওর বাবা মিস্টার জনসন কালকে এসেছিলেন ওর খোঁজে?”
“মিস্টার জনসন?” আমি বিস্মিত চোখে বেভের দিকে তাকালাম।
“হ্যাঁ, হি ইজ হোয়াইট। সেকো’ পদবী ওডিন নিজের থেকে নিয়েছে।”
এবার বুঝলাম।
“আমার ধারণা ওডিন আফ্রিকা গিয়েছিল ওর বায়োলজিক্যাল পেরেন্টদের খোঁজে।”
আগেই বলেছি হ্যাঁনো খবর নেই বেভ রাখে না।
তাও আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কী করে জানলে?”
“মিস্টার জনসনই বলছিলেন। কয়েক বছর আগে… ওঁর স্ত্রী মারা যাবার পর থেকে ওডিন মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত, ওর বায়োলজিক্যাল বাবা-মা সম্পর্কে উনি কী জানেন? উনি সত্যিই খুব ডিটেন্স জানতেন না… জানতেন সেকো ছিল ওডিনের বাবার পদবী। যখন খুব ছোটো তখনই ওর বাবা-মা একটা বাজে ক্যানসার মেসোথেলিওমা-তে মারা গিয়েছিল। যে কাকা দেখভাল করেছিল, তারও ক্যানসার ধরে পড়ে। বলতে গেলে ও পাঁচ বছর বয়স থেকেই একেবারেই অনাথ। একটা অনাথ আশ্রম থেকে মিস্টার আর মিসেস জনসন ওকে আমেরিকা নিয়ে আসেন।”
“তা বুঝলাম, কিন্তু আফ্রিকা গেছে, সে খবরটা পেলে কোত্থেকে?”
“মিস্টার জনসনই বললেন। ওঁর এক বন্ধুর ল্যাবে ওডিন কিছুদিন কাজ করেছিল। এই বন্ধু বহুদিন নাইরোবিতে ছিলেন, ওডিনের পুরো হিস্ট্রি জানতেন। তাঁর সঙ্গে নাকি এ নিয়ে ওডিনের অনেক আলোচনা হয়েছে। তিনিই নাকি সেই অনাথ আশ্রমের সঙ্গে ওডিনের যোগাযোগ করিয়ে দেন। মিস্টার জনসন এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না, এই কিছুদিন হল জেনেছেন। ওডিন যে ওর পদবি পালটেছে, সেটাও একই সময় জেনেছেন।”
কথা শেষ করতে না করতেই বেভের ফোন বাজল, সেটা ধরতে আবার ছুটল।
আশ্চর্য! ওর রেসিউমিতে নিশ্চয় এগুলোর উল্লেখ আছে, আমি খেয়ালও করিনি। ফাইল ক্যাবিনেট থেকে ওর রেসিউমিটা বার করে চোখ বোলালাম। একেনবাবুও আগ্রহ নিয়ে দেখলেন।
“ঠিকই বলেছেন বেভ ম্যাডাম, এই তো এখানেই আছে নাম বদলানোর সার্টিফিকেট। এনারজেটিক্স ল্যাবে কাজ করার সময়। টাইমিংটাও মিলছে।”
.
সত্যি কথা বলতে কি, এই স্টুডেন্ট অ্যাসিস্টেন্টদের ব্যাপারে আমি তেমন মাথা আমি ঘামাই না। ডিপার্টমেন্ট যাকে পাঠায় তাকেই নিয়ে নিই। ভালো করে ওডিনের রেসিউমিও দেখিনি।
“আফ্রিকায় যাওয়ার ব্যাপারটা আমারও মনে হয়েছিল,” একেনবাবুকে বললাম, “কিন্তু অন্য একটা জিনিস ভেবে।”
“বুঝলাম না স্যার, তার মানে?”
“আমাকে একটা নোট লিখেছিল।”
“কী নোট স্যার?”
“এখানেই আছে সেটা।”
ডেস্ক ড্রয়ারের মধ্যে ওডিনের নোটটা ছিল। বার করে একেনবাবুর হাতে দিলাম।
নোটটা পড়ে একেনবাবু বললেন, “এইজন্যেই স্যার, মিস্টার ওডিনকে ভালো লাগে। কোনও লুকোছাপা নেই। সরাসরি লেখেন। নিজের রুক্স খুঁজতেই তো গিয়েছিলেন।”
“তা ঠিক, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম অ্যালেক্স হেইলির কথা… দেড়শো দুশো বছর আগের পূর্বপুরুষকে খুঁজতে যাওয়া… ক্রীতদাস হিসেবে যাঁদের আনা হয়েছিল। পঁচিশ তিরিশ বছর আগের কথা ভাবিনি।”
“সে তো স্যার মিস্টার ওডিনের দোষ নয়, আপনার বোঝার দোষ।” হাসিহাসি মুখে একেনবাবু বললেন।
চার
দত্তক বা অ্যাডপ্টেড ছেলেমেয়েদের নানান সমস্যার কথা আমি এর-ওর মুখে কিছু শুনেছি। প্রমথর ল্যাবে কাজ করে এরিক ঐবিং, সেও অ্যাডপ্টেড। এরিক গল্প করতে ভালোবাসে। প্রমথর ল্যাবে গেলেই একটা না একটা ছুতো করে কিছুক্ষণ গল্প করে যায়। মজা করেই বলে ওর সমস্যার কথা। এদেশে কোনও ডাক্তারের অফিসে গেলে ফর্ম ফিল আপ করতে হয়। ফ্যামিলিতে কারো ডায়াবিটিস আছে কিনা, হার্ট ডিজিজ আছে কিনা, ক্যানসার হয়েছিল কিনা, ইত্যাদি নানান প্রশ্ন থাকে সেখানে।
“কী করে এর উত্তর জানব?” এরিক গল্প করত, “যাকে বাবা বলে জানি, তার তো চোদ্দপুরুষের কোনও ডায়াবিটিস ছিল না, আর আমার তো তেইশ বছরেই ধরা পড়ল! ওইসব প্রশ্নের উত্তরে আমি লিখি জি-ও-ডি… গড ওনলি নোজ। ডাক্তারের অফিসের লোকেরা বিরক্ত হয়, ভাবে আমি মজা করছি!”
.
ইদানীং অবশ্য ন্যাচারাল পেরেন্টসের মেডিক্যাল রেকর্ড জোগাড় করা হয় চিকিৎসা সংক্রান্ত কারণে। আগে সেভাবে হত না। সত্যি কথা বলতে কি, অ্যাডপ্টেড ছেলেমেয়েদের এই সমস্যাগুলো আমরা অনেকেই বুঝি না। আর এগুলো তো শুধু দেহ-সংক্রান্ত, মনের দিকটা আরও বেদনাময়। একটা তীব্র চাপা ক্ষোভ অ্যাডপ্টেড ছেলেমেয়েদের পীড়িত করে… কেন নিজের বাবা-মা ওদের পরিত্যাগ করলেন? কী দোষ ওরা করেছিল? বিশেষ করে শেষ প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনও উত্তর নেই। আজীবন এই প্রশ্নগুলো নিয়েই ওদের কাটাতে হয়… কষ্টটা কারও কম, কারও বেশি।
.
এরিক খুব মজা করেই কথাগুলো বলত, কিন্তু পেছনে চোখের জলটা ঠিক লুকোতে পারত না। প্রায় চল্লিশ বছর বয়সে জন্মদাতা বাবা-মায়ের সন্ধান করতে নিউ ইয়র্ক ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিল দক্ষিণ দিকে। ফিরেছিল বিমর্ষ হয়ে। অনেক খুঁজতে খুঁজতে শেষে অ্যালাবামাতে পৌঁছে এরিক জেনেছিল ওর মা অ্যালকোহলিক, থাকে হোমলেস শেল্টারে। বাবা জেল খাটা আসামি, বহুদিন জেল খাটার পর অল্প সময়ের জন্য ছাড়া পেয়ে আবার জেলে। সেখানেই মৃত্যু। অর্থাৎ বাপ-মা’র দিকে নাথিং টু বি প্রাউড অফ, না জানলেই বোধহয় ভালো হত। সে রকম কিছু হলেও হতে পারে ওডিনে ক্ষেত্রে, কে জানে? যেটা পজিটিভ, সেটা হল ওডিন ধীরে ধীরে নর্মাল হচ্ছে। কথাবার্তাও অনেক বেশি বলছে।
.
ইতিমধ্যে একদিন প্রীতম এল। ইংল্যান্ডে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল। ঠিক বেড়াতে যাওয়া নয়। একটি ভারতীয় ব্রিটিশ মেয়েকে ডেট করছিল বেশ কিছুদিন ধরে। তার আমন্ত্রণেই গিয়েছিল বার্মিংহামে, মেয়েটির বাবা মার সঙ্গে দেখা করতে। রথ দেখা কলা বেচা দুটোই হয়ে গেল। একেবারে বিয়েটাই সেরে ফেলল। ধুমধাম যা কিছু ওখানেই হয়েছে। প্রীতমের মেজোমামা লন্ডনে থাকেন। লন্ডনেই ওদের ইউরোপিয়ান হেড কোয়ার্টার। পাত্রপক্ষের তরফ থেকে রিসেপশনটা মেজোমামাই দিয়েছেন লন্ডনে। এখানকার আয়োজন ছোটোখাটো, মূলত আন্টির উদ্যোগে। পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, যারা লন্ডনে যেতে পারেনি তাদের জন্য। নিমন্ত্রণ পত্র অবশ্য আগেই পেয়েছি, RSVP-র উত্তরও দিয়েছি। একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্টে হওয়ার কথা ছিল। কোনও কারণে সেখানে হচ্ছে না। সেটা জানাতেই প্রীতম এসেছে। নিমন্ত্রিতের সংখ্যা বেশি নয়, বাড়িতেই ম্যানেজ করা যাবে।
.
আমার একটাই সমস্যা, পরের সপ্তাহে এ্যান্টের ইন্টারিম রিপোর্ট জমা দিতে হবে। প্রচুর কাজ বাকি আছে। অর্ধেক দিন নষ্ট করার সময়ও আমার নেই, অথচ প্রীতমের বিয়ের রিসেপশনে না গেলেও চলবে না। ওডিনকে বললাম ও যদি গ্রাফ আর টেবিলগুলো রিপোর্টে বসিয়ে দেয়। মুশকিল হল, সেগুলো সংখ্যায় অনেক, ঠিক মতো ফোরম্যাট করে বসাতে সময় লাগবে। তবে ওডিন দেখেছি কাজটা ভালো পারে। তাও আমি সতর্ক– যদি কিছু গুবলেট করে, তাই লেখার একটা কপি রেখে কাজটা ওকে দিলাম।
কাজটা নিতান্তই ব্যক্তিগত কাজ, সেটা আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম। অনুরোধ করতে একটু সংকোচই হচ্ছিল, কিন্তু ছেলেটা সত্যিই ভদ্র। বলল, “কোনও সমস্যা নেই।” তারপর জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছি?”
বললাম। তখনই জানলাম, ওদের পরিবারে ঠাকুরদা থেকে শুরু করে অনেকেই প্রীতমের মামাদের কোম্পানিতে কাজ করতেন। তাতে অবশ্য অবাক হলাম না। প্রীতমের কাছেই শুনেছি, ইস্ট আফ্রিকার বহু লোকই ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছে বা করেছে।
“ভালো হল,” আমাকে বলল, “উনি এখানে আছেন শুনে আমার আঙ্কল আর আন্টি ওঁকে দেবার জন্য আমার সঙ্গে একটা গিফট দিয়েছেন। বুঝতে পারছিলাম না, কী করে ওঁদের হাতে পৌঁছে দেব।”
“এতে কী আছে, আমাকে দিয়ে দিতে পার। আমি তো যাচ্ছিই।”
.
যেদিন রিসেপশন সেদিনই সকালে এসে ও আমার হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট দিল প্রীতমের মামাকে দেবার জন্যে। বলল, “আঙ্কল আন্টির ভালো নাম ওঁর মনে থাকার কথা নয়, তবু যদি ডাক নাম মনে থাকে।”
সুন্দর রংচঙে রাংতা কাগজে মোড়া একটা উপহার। সঙ্গে একটা চিরকুট। চিরকুটটা ভালো করে দেখিওনি, যাবার আগে নজরে পড়ল। স্কচটেপ দিয়ে রাঙতার ওপর লাগানো।
Dear Sir,
I am the youngest nephew of Binni and Jackie Seko. You may know them as
Best
OS
একেনবাবুকে চিরকুটটা দেখিয়ে বললাম, “কী কাণ্ড দেখুন, তাড়াহুড়োতে আঙ্কল-আন্টির ডাকনামটাই লেখেনি।”
“তা তো দেখছি স্যার। একবার ফোন করুন না, আপনিই না হয় লিখে দিন নামটা।”। একবার ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম। পেলাম না।
পাঁচ
চারটে নাগাদ আঙ্কল-আন্টির বাড়িতে ঢুকতেই হলওয়েতে আঙ্কলের সঙ্গে দেখা। অচেনা একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন।
“এসো এসো, তোমাদের আন্টি চিন্তা করছিল ভেনু পালটে যাবার খবরটা পেয়েছিলে কিনা।”
“না না, প্রীতম জানিয়ে দিয়েছিল।”
প্রমথর হাতে বিয়ের উপহারটা ছিল। আগের বার আসেনি বলে উপহার কেনা ও আনার দায়িত্ব প্রমথর ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল। বাক্সটা সাইজে বড় এবং ভারী। যে প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখা ছিল, সেটা আবার ছিঁড়ে গেছে। প্রমথ হিমিসিম খাচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই প্রমথর সঙ্গে আঙ্কলের পরিচয় করিয়ে দিলাম।
“বাঃ, খুশি হয়েছি তুমি এসেছো।” প্রমথর অবস্থা দেখে হলওয়ের একদিকে একটা বড়সড় টেবিল দেখিয়ে আঙ্কল বললেন সেখানে রাখতে।
ওডিনের গিফটটা আঙ্কলকে দিয়ে বললাম, “এটা আমার এক অ্যাসিস্টেন্ট ওডিন আপনাকে দিতে বলেছে। ওর আঙ্কল আর আন্টি আপনার কোম্পানিতে কাজ করত। তারা এটা আপনাকে পাঠিয়েছে।”
আঙ্কল একটু বিস্মিত হয়ে প্যাকেটটা নিলেন। চিরকুট পড়ে নামটা চিনেছেন বলে মনে হল না।
“ডাকনাম বললে চিনবেন ওডিন বলেছিল, কিন্তু তাড়াহুড়োতে সেটা লিখতেই ভুলে গেছে!”
“হতে পারে। তোমার অ্যাসিস্টেন্টকে আমার ধন্যবাদ জানিয়ে দিও। পরে তোমাকে একটা থ্যাঙ্ক ইউ নোট পাঠিয়ে দেব। ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিও।”
“নিশ্চয় আঙ্কল।”
“ভালো কথা, তুমি যে বল্লরীকে পড়িয়েছিলে আমি জানতাম না। কালকেই শুনলাম, গুড।”
বল্লরী একটা টার্ম পেপার নিয়ে হিমসীম খাচ্ছিল। তখন প্রীতম ওকে নিয়ে আমার অফিসে এসেছিল। খুব অল্পই সাহায্য করেছিলাম। সেটাই কারো কাছে শুনে বোধহয় আঙ্কলের ধারণা হয়েছে আমি বল্লরীকে পড়িয়েছি! এই ভ্রান্ত ধারণাটা ভাঙার সুযোগ পেলাম না। কিছু বলার আগেই এলিভেটরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে বললেন, আমাদের টেরাসে নিয়ে যেতে।
.
ডাইনিং রুমের টেরাসে ককটেল ও স্ন্যাকস-এর বন্দোবস্ত। সেখানে অনেকগুলো টেবিল আর চেয়ার সাজানো। তারই একটা দখল করে আমরা বসলাম। আর একজন সেখানে বসে ছিল, ধোপ-দুরস্ত পোশাক, আমাদেরই মতো বয়স। চেহারাটা চেনা চেনা লাগল, কিন্তু কোথায় আগে দেখেছি মনে করতে পারলাম না। হ্যালো’ বলে উনিই আলাপ সুরু করলেন। নাম অমল মিত্র। নিজের পরিচয় দিলেন ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির সেলস ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভ বলে। আমরা সবাই নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত শুনে বললেন, উনিও এদেশে এসে প্রথমে ভেবেছিলেন গ্র্যাজুয়েট স্কুলে যাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
“তাতে খুব ক্ষতি হয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না!”
প্রমথর এটা বলার কোনও দরকার ছিল না। এমনিতেই ও ডিপ্লোমেসির ধার ধারে না, তার ওপর এতটা পথ ভারী গিফট বইতে হয়েছে, মেজাজটা প্রসন্ন ছিল না। টেরাসে ঢুকে মেজাজটা আরও বিগড়েছে। এটা যে এত ফর্মাল ব্যাপার আমরা কেউই বুঝিনি। সবাই দামি স্যুটবুট পরা, আমরাই শুধু হংস মধ্যে বক যথা। সাধারণ সার্ট আর প্যান্ট। একেনবাবুর পোষাকের বিবরণ না দেওয়াই ভালো।
.
আমাদের পরিচয়টা জানার পর অমল মিত্র দেখলাম জানার চেষ্টা করছেন, আমরা কার আমন্ত্রণে এখানে এসেছি। সরাসরি প্রশ্ন নয়, নানান অ্যাঙ্গেল থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। বুঝতে পারছিলাম প্রমথ তাতে আরও চটছে। তাই বেশি প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে কানেকশনটা বলে দিলাম। সেটা শুনে অমল মিত্র উঠে কোথায় জানি গেলেন।
.
প্রীতম আর ওর নববধূ মল্লিকা সবাইকে অপ্যায়ন করছে। মল্লিকাকে আমরা বিয়ের আগে থেকেই চিনি। অক্সফোর্ড থেকে বি এ পাশ করে এখন নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ল’ পড়ছে। খুব হাসিখুশি মিষ্টি মেয়ে। ইংল্যান্ডে জন্মেছে বলে ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে কথা বলে। ‘শেইম’ বলে না, বলে ‘শাইম’। র-এর উচ্চারণ প্রায় শোনাই যায় না, গার্ল, ফার্স্ট–এইসব কথাতে।
.
প্রীতমের মামাতো বোন বল্লরীও ফুরফুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘাঙ্গি, ঢলঢলে মুখ। টানা উজ্জ্বল চোখ। দু’কাঁধ বেয়ে নেমে আসা লম্বা ঘন চুল, সচ্ছন্দে শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন দেওয়ার মতো। এমনিতেই সুন্দর দেখতে, আজকে একটু বেশী সাজায় স্টানিং লাগছে। শাড়িটাই শুধু একটু– কোথায় জানি শুনেছিলাম কথাটা, ঝাল্লা মাড়োয়াড়ি ওভার-ব্রাইট টাইপের। ওর সঙ্গে ঘুরছে গুচি’র ডেনিম জিন-জ্যাকেট পরা একটা হলিউডি চেহারা। চকচকে মুখ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আর ব্যাকব্রাশ করা জেল-মাখা চুল। গলায় রুপোর চেন, বুক-খোলা লাল রঙের সার্টের মাঝখানে সেটা চকচক করছে। হাতে রুপোর ব্রেসলেট। ছেলেটাকে আগে দেখিনি। বল্লরী যখন আমাদের টেবিলে ‘হ্যালো’ বলতে এল, তখন পরিচয় করিয়ে দিল। ওর বন্ধু বিপ্লব।
.
ইতিমধ্যে অমল মিত্র ফিরে এসেছেন। দেখলাম বল্লরীকে ভালো করেই চেনেন, বিপ্লবকেও। ওরা চলে যেতে নিজের থেকেই জানালেন ম্যানহাটানে বিপ্লবের বাবার একটামিউজিক্যাল ইনস্ট্রমেন্টের স্পেশালিটি স্টোর আছে। বিপ্লবের আগে একটা ব্যান্ড ছিল। সেখানে সুবিধা না করতে পেরে এখন মডেলিং করছে। কথার সুরেই বুঝলাম বিপ্লবকে খুব একটা পছন্দ করেন না।
.
কিছু কিছু লোক আছেন যাঁরা গল্প করতে ভালোবাসেন। অমল নিঃসন্দেহে তাঁদের একজন। ওঁরা তিন পুরুষ আফ্রিকায় সেটল্ড। ঠাকুরদা যে প্রীতমের দাদুর উকিল ছিলেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে জেনে গেলাম! সেই সূত্রেই প্রীতমের পরিবারের সঙ্গে পরিচয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইংল্যান্ডেও গিয়েছিলেন। সেখানে কী হল না হল জানানোর কোনও দরকার ছিল না.. কান একেবারে ঝালাপালা! সত্যিকথা বলতে কি, কী করে এই বক্কেশ্বরকে টেবিল থেকে ভাগাব, সেটাই ভাবছিলাম। ভাগ্যক্রমে একটু বাদেই আন্টি এসে অমলকে ডেকে নিয়ে গেলেন কী একটা কাজ করানোর জন্যে। অমল চলে যেতেই প্রমথ আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, “হ্যাঁরে, বিপ্লবকে হটিয়ে তুই ফিল্ডে নেম পড় না! বল্লরীর মতো বউ পাবি, আর বিশাল রাজত্ব।”
ভাগ্যিস কেউ শুনতে পায় নি, রাস্কেল একটা! কিন্তু তাতে কি নিস্তার আছে! একেনবাবু ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “কী গোপন কথা হচ্ছে স্যার?”
প্রমথ অম্লান বদনে বলল, “বাপিকে একটু সেল করানোর চেষ্টা করছি।” আমি বললাম, “শাট আপ! তুই নিজে আগে সে হ।”
“একটু বুঝিয়ে বলুন স্যার, কী নিয়ে সে?”
“ওর কথায় কান দেবেন না একেনবাবু, প্রমথ বাজে বকছে।”
“কী যে বলেন স্যার, প্রমথবাবু কখনও বাজে বকেন না।”
একেনবাবুর একটা অনুসন্ধিৎসা জাগলে, সেটা না মেটা পর্যন্ত সন্তুষ্ট হবেন না। ঘ্যানঘ্যান করে মারবেন আর তখন বিশ্বশুদ্ধ লোক আমাদের দিকে তাকিয়ে বোঝবার চেষ্টা করবে কী ঘটেছে! সেটা বন্ধ করার জন্যেই একেনবাবুকে কানে কানে প্রমথর স্টুপিড মন্তব্যটা শুনিয়ে দিলাম।
একেনবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “এটা প্রমথবাবু ভালো বলেছেন। হলে তো খুবই ভালো হত স্যার।”
“দুম করে কথাটা বলে দিলেন? তাহলে বেভ ম্যাডামের কী হত?”
বেভের পরিচয় আগেই দিয়েছি, আমাদের ডিপার্টমেন্টের কাজ করে, অফিস অ্যাসিস্টেন্ট। আমাকে পছন্দ করে, আমিও করি। তার বেশি কিছু নয়। প্রমথ সেটাকেই তিল থেকে তাল করে আমাকে হেনস্তা করার জন্য। একেনবাবুও মাঝে মাঝে সায় দেবার চেষ্টা করেন।
“তাও তো বটে স্যার।”
“ব্যাস, এ নিয়ে আর কোনও কথা নয়!” আমি ধমক লাগালাম।
.
এর মধ্যে দুটো ছেলে এসে একসঙ্গে বৃটিশ উচ্চারণে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কে?”
বোধহয় যমজ, বয়স বড় জোর দশ এগারো হবে। বোঝা যায় বেশ বজ্জাত। উত্তর দিলাম, “আমরা ব্রাইডগ্রুমের বন্ধু, তোমরা কে?”
“আমরা?” হা হা করতে করতে পালাল, আর কাউকে জ্বালাতে!
“নিশ্চয়, প্রীতমের মামা বাড়ির কেউ হবে। বজ্জাত দ্য গ্রেট!” একেনবাবু আর প্রমথকে বললাম।
প্রমথ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। সময়ে আমাদের পাশের টেবিল থেকে ড্রিংকস-ভর্তি একটা গ্লাস ফেলে দিয়ে ছোঁড়াদুটো আবার পালাল।
“আরে, আরে!” সবার মনোযোগ সেদিকে গেল। কাঁচের কয়েকটা টুকরো ছিটকে এসে আমার জুতোর ওপরেও পড়েছিল। দাঁড়িয়ে উঠে প্যান্টটা আর জুতোটা একটু ঝাঁকিয়ে টেবিল থেকে সরে এলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা ব্রাশ, হ্যাণ্ড-ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে পরিষ্কার করার লোক এসে হাজির। বাঁচা গেল!
ছয়
ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ঘড়ঘড়ের মধ্যেই অমল হাসি হাসি মুখে ফিরে এসেছেন, “আজকে একটা দারুণ ব্যাপার হবে। একটু বাদেই রবার্ট দত্ত আসছেন।”
“রবার্ট দত্ত? যিনি বেহালা বাজান?” নামটা আমি জানতাম।
“হ্যাঁ, মিউজিক প্ৰডিজি রবার্ট দত্ত। বিপ্লবের বাবার কাছ থেকে আঙ্কল একটা ‘ডেল গেসু’ কিনেছেন এক মাস আগে। আমি রবার্ট দত্তকে খুব করে রিকোয়েস্ট করেছিলাম, যদি একবার এসে বাজিয়ে দেখেন বেহালাটা কী রকম? কথা দিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কে যখন আসবেন তখন বাজিয়ে দেখবেন। গতকাল নিউ ইয়র্কে এসে ফোন করেছিলেন আজকে আসার চেষ্টা করবেন বলে। কনফার্ম করলেন, এক্ষুনি আসছেন… কিন্তু খুব তাড়া আছে, একেবারেই বসবেন না।”
আমরা কিছু বলার আগেই কাকে জানি দেখতে পেয়ে ‘এই যে, হ্যালো বলতে বলতে ছুটলেন।
একেনবাবুর মুখ দেখে মনে হল অমল মিত্রের কথাটা বোধহয় বুঝতে পারেননি। ডেল গেসু যে বেহালার একটা বিখ্যাত ব্র্যান্ড, সেটা না জানা আশ্চর্যের কিছু নয়। আমি নিজেও কিছুদিন আগে পর্যন্ত জানতাম না। কথায় কথায় প্রমথর গার্লফ্রেন্ড ফ্রান্সিস্কা পুরোনো দিনের ভালো বেহালা প্রসঙ্গে নামটা তুলেছিল বলে জেনেছি।
অমল মিত্র চলে যেতেই একেনবাবু যেই ‘ডেল গেসু’ কী জিজ্ঞেস করলেন, আমি আমার জ্ঞানভাণ্ডার উজার করে দিলাম!
“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার। এখন বুঝতে পারছি সামনে উঁচু পোডিয়ামটা কেন রাখা হয়েছে। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো বর-বউ বসবে। কিন্তু উঁচু চেয়ার ছাড়া তো ওখানে আর কিছুই নেই। আচ্ছা স্যার, এই রবার্ট দত্ত কি খুব ফেমাস বেহালা বাজিয়ে নামটা কেন জানি চেনা চেনা লাগছে?”
“ইসাক পার্লম্যান বা ইহুদী মেনুহিনের মতো নিশ্চয় নন। তবে একজন উঠতি প্রতিভা।”
“আপনি চেনেন স্যার?”
“না, তবে নাম শুনেছি। আরও শুনেছি কারণ কিছুদিন আগে ওঁকে নাকি খুন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আপনিও হয়তো সেই সূত্রেই নামটা শুনেছেন।”
“ও হ্যাঁ স্যার, মনে পড়েছে। আপনি একটা ন্যাশেনাল এনকোয়ারার’ এনেছিলেন, সেখানে পড়েছিলাম।”
.
‘ন্যাশেনাল এনকোয়ারার’ সাধারণ ভাবে বিশ্বাসযোগ্য নয়। নানান উলটোপালটা উত্তেজক খবর ওতে থাকে। কে জানি আমার অফিসে একটা কপি ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম। সেখানেই ছিল একটা কোরিয়ান গ্যাং নাকি রবার্ট দত্তকে খুন করার চেষ্টা করছে। কারণ? রবার্ট দত্তকে সরাতে পারলে কয়েকজন উঠতি কোরিয়ান মিউজিশিয়ানের পসার হবে। তাতে লাভ? তার উত্তরও ওখানে দেওয়া ছিল। জুলিয়ার্ড বা বড় বড় মিউজিক স্কুলে পড়তে পয়সা লাগে। আরও অনেক পয়সা লাগে ভালো ভালো কোয়ালিটির কোনও ইনস্ট্রমেন্ট কিনতে। সত্যিকারের ভালো বেহালা বা চেলোর দাম হাজার হাজার ডলার। একজন ছাত্রের পক্ষে সেসব কেনা সাধ্যের বাইরে। যেসব ছাত্রদের মধ্যে সম্ভাবনা আছে ইনভেস্টররা তাদের পেছনে টাকা ঢালে। কনট্রাক্ট থাকে, তারা রোজগার করতে শুরু করলে একটা পার্সেন্টেজ ওদের দিতে হবে। সুতরাং মিউজশিয়ানের পসারের সঙ্গে ইনভেস্টারদের রিটার্নের একটা স্বার্থ জড়িত। এইসব ইনভেস্টরদের আবার আন্ডারগ্রাউন্ড কানেকশন আছে।
আমার বিশ্বাস এটা পুরোপুরি গঞ্জিকাসেবন করে লেখা… বিন্দুমাত্র সত্য এতে নেই, কিন্তু পড়তে ইন্টারেস্টিং।
মনে মনে নিশ্চয় সেই খবরটাই ঝালাচ্ছিলেন একেনবাবু। আমাকে ছেড়ে এবার প্রমথকে ধরলেন।
“স্যার, আপনি চেনেন রবার্ট দত্তকে?”
“কেন মশাই, বাঙালি বলেই চিনতে হবে?”
“তা নয় স্যার, পাঞ্জাবিরাও তো দত্ত হয়।”
“তাহলে জিজ্ঞেস করছেন কেন?” খোঁটা না দিয়ে প্রমথ পারে না!
খানিক বাদেই একজন মেমসায়েবের সঙ্গে যিনি ওপরে এলেন, তিনিই নিশ্চয় রবার্ট দত্ত। অমল মিত্র শশব্যস্ত হয়ে ওঁকে অভ্যর্থনা করতে ছুটলেন। শ্যামলা রঙ, বেঁটেখাটো চেহারা। মেমসায়েব খুব সেজেগুজে, ফর্মাল ড্রেস পরা। রবার্ট দত্ত পরেছেন সাদা শার্ট, কালো বোটাই আর টাক্সেডো। পায়ে ঝকঝকে কালো অক্সফোর্ডের জুতো। বোঝাই যাচ্ছে কোনও ব্ল্যাক-টাই ডিনারে যাচ্ছেন। পথে এখানে কিছুক্ষণের জন্য এসেছেন। কোনও দিকে না তাকিয়ে কারও সঙ্গে কথা না বলে পোডিয়ামের সামনে দুটো চেয়ারে দু’জন বসলেন। একজন অ্যাসিস্টেন্টকেও দেখলাম একটা বেহালার বাক্স হাতে। তিনিও পাশের চেয়ারে বসলেন। অমলের সঙ্গে কী কথা হচ্ছে আমরা বুঝলাম না, তবে হাতঘড়ি দেখা আর হাত-পা নাড়া দেখে মনে হল ওঁর খুবই তাড়া আছে। অমল ওঁকে কিছু বলে দ্রুতগতিতে বাড়ির ভিতরে গিয়ে আঙ্কলকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলেন। আঙ্কলের হাতে একটা বেহালা, নিশ্চয় ওটাই ডেল গেসু-র সেই বেহালা। আঙ্কলের সঙ্গে রবার্ট দত্তর পরিচয় পর্ব শেষ হবার পর আঙ্কলের আমন্ত্রণে রবার্ট দত্ত পোডিয়ামে উঠলেন, কিন্তু চেয়ারে বসলেন না। বেহালার বাক্সটা ওঁর অ্যাসিস্টেন্ট খুব সাবধানে টেবিল-এর ওপর রাখলেন।
আঙ্কলের হাত থেকে বেহালাটা নিয়ে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে টেবিলে রাখা বেহালার বাক্স থেকে একটা ছড় তুলে বেহালায় টান দিতে যাবেন, হঠাৎ দুম করে আওয়াজ! সঙ্গে সঙ্গে টেরাসের সাইডে বসানো একটা বড় গ্লোবলাইট ফেটে কাঁচগুলো ছিটকে পড়ল! সেই ধাক্কা কাটতে না কাটতেই আরেকটা আওয়াজ! এবার ওর পাশের গ্লোব লাইটটা ফাটল! আলো-অন্ধকারের মধ্যে প্রায় প্যান্ডেমোনিয়াম! পত্রপত্রিকায় আর টিভিতে বন্দুকবাজদের আচমকা হানা দেবার খবর শুনে শুনে আজকাল সবাই সতর্ক এবং ভীত। কেউ কি গুলি চালাচ্ছে? দেখে কাজ নেই… সবার সাথে আমিও পড়ি কি মরি করে ডাইনিং রুমের দিকে দৌড়েছি। প্রমথ আমার পেছনে। ধাক্কাধাক্কি করে কোনওমতে ডাইনিং রুমে পৌঁছে দেখি বুক ধড়াস ধড়াস করছে। এর মধ্যে যাঁরা আগে ছিলেন তাঁদের বেশ কয়েকজন দরজা দিয়ে হলওয়েতে চলে গেছেন। সেখানেই লিফট এবং সিঁড়ি। প্রমথ আমার পাশে, কিন্তু একেনবাবু নেই। টেরাসের দিকে সাহস করে তাকাতে চোখে পড়ল রবার্ট দত্ত কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তখনও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। মেমসাহেব সঙ্গিনী বেহালার বাক্স হাতে নিয়ে ওঁর হাত ধরে টানাটানি করছেন। অ্যাসিস্টেন্টটি উধাও, আঙ্কলকেও দেখতে পাচ্ছি না। পুরো টেরাসে ওঁরা দু’জন ছাড়া গোটা কয়েক লোক। যাঁরা আছেন, তাঁদের কয়েকজন আত্মরক্ষার জন্য মাটিতে শুয়ে পড়েছেন। আমাদের একেনবাবুও টেরাসে আছেন। তবে মাটিতে শুয়ে নয়, চেয়ারেই বসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন–বলিহারি সাহস ওঁর! ইতিমধ্যে জনা কয়েক সিকিউরিটির লোক রিভলবার হাতে ডাইনিং রুমের কাঁচের দরজায় সামনে এসে গেছে। তারা দ্রুত গতিতে টেরাসে ঢুকে রবার্ট দত্ত আর বাকি সবাইকে ভিতরে নিয়ে এসেছে। একেনবাবুও সবার পেছন পেছন এসেছেন। সবকিছুই কয়েক মিনিটের মধ্যে। কেউ বোধহয় পুলিশকেও খবর দিয়েছে। সাইরেন বাজিয়ে বেশ কয়েকটা পুলিশের গাড়ি এখন বিল্ডিং-এর নীচে, রাস্তায়।
ভাবছি এখন কী ঘটবে! অতিথিদের কেউ গুলি চালিয়েছে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এরমধ্যে অভ্যাগতদেরই একজন প্রস্তাব দিলেন সবাইকেই সার্চ করা হোক, সকলের নিরাপত্তার জন্যেই এটা প্রয়োজন। কিন্তু এভাবে অতিথিদের সার্চ করতে বলাটাও তো গৃহস্বামীর পক্ষে লজ্জাজনক। কাছেই দেখলাম আঙ্কল খানিকটা বিধ্বস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। সিকিউরিটির একজন ওঁকে কিছু বলছে, উনি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছেন। পেছন থেকে এক ভদ্রলোককে নীচু গলায় কাউকে বলতে শুনলাম, “গুলিটা রবার্ট দত্তকে মারার জন্যেই করা হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে দু’বারই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।” যাঁকে কথাটা বললেন, তিনিও কেমন যেন সায় দিলেন, “হ্যাঁ, আগেও তো চেষ্টা করা হয়েছিল।”
কেন এখানে এসে কেউ রবার্ট দত্তকে খুন করতে চাইবে আমার কাছে সেটা স্পষ্ট নয়। তবে যদি সত্যিই কেউ সেই চেষ্টা করে থাকে, তাহলে নিশ্চয় টেরাসে ঢোকার মুখে বাঁদিক থেকে করেছে। সেখানে একটা টেম্পোরারি গ্রিল-এ কেটারারদের কিছু লোক সাদা কোট পরে কাবাব গ্রিল করছিল। একমাত্র সেক্ষেত্রেই টার্গেট মিস করে ওই দুটো গ্লোবলাইট চুরমার হতে পারে। কেটারিং-এর লোকদেরই কি কেউ সেই কোরিয়ান গ্যাং এর? সেক্ষেত্রে মাত্র কয়েকজনকে সার্চ করলেই চলবে। রবার্ট দত্তকেও দেখতে পেলাম। তাঁর সঙ্গিনীকে নিয়ে অমল মিত্রের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। অত্যন্ত ব্যাজার মুখ, একটু যেন ভীতও। অল্পক্ষণের জন্যে বাজাতে এসে এই ঝামেলার মধ্যে পড়বেন বোধহয় ভাবেননি! ইতিমধ্যে কয়েকজন পুলিশও নীচ থেকে ওপরে উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে একজন সার্জেন্ট বিল। তিনি দেখলাম একেনবাবুকে খুব ভালো করে চেনেন। একেনবাবুকে দেখে তিনি এগিয়ে যেতেই আড়ালে ডেকে একেনবাবু তাঁকে কিছু বললেন। তারপর দুজনে মিলে টেরাসে সেই ফাটা বাতি দুটো পরীক্ষা করে ফিরে এলেন। সার্জেন্ট বিল-এর নির্দেশে একজন অফিসার গিয়ে একটা ছোট্ট কৌটোয় কিছু পুরে নিয়ে এল। বিল গলা উঁচু করে সবাইকে বললেন, “ইন্স অলরাইট, আপনারা এখন পার্টি করতে পারেন। দেয়ার ওয়াজ নো শু্যটিং।”
“তাহলে কাঁচটা ভাঙল কী করে?” একজন প্রশ্ন তুললেন। “কেউ প্র্যাক্টিক্যাল জোক করেছে, বাট নো বডি গট হার্ট। সো ম্যাটার্স এন্ড।”
ইতিমধ্যে একেনবাবু আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
“কী ব্যাপার?”
“কেউ স্যার গ্লোব দুটো বেস থেকে তুলে ভিতরে বড়সড় পটকা রেখেছিল। বাতির গরমে পটকা দুটো ফেটেই এই বিপত্তি।”
আমার কেমন মনে হল, এটা নিশ্চয় ওই দুই যমজ ভাইয়ের কীর্তি। সেটা বুঝলাম যখন দেখলাম একজন বয়স্ক মহিলা কিচেনের সামনে দুটোকে ধরে আচ্ছাসে বকছেন আর ছেলেদুটোর কাঁদো কাঁদো মুখ। পুলিশ-টুলিশ দেখে ভয় পেয়ে বোধহয় দোষ স্বীকার করেছে! এসব ক্ষেত্রে পুলিশ অ্যারেস্ট করে, জুভেনাইল ডেলিঙ্কোয়েন্ট বলে ছাড় পায় না। বিলের সঙ্গে আঙ্কল দেখলাম কথা বলছেন। শেষমেশ পুলিশ কাউকে অ্যারেস্ট না করেই চলে গেল। ছোঁড়া দুটোকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে কোথাও রাখা হল। নিশ্চিন্তি!
.
আমরা আবার টেরাসে ফিরে গেলাম বটে, কিন্তু ছন্দপতন যা ঘটার ঘটে গেছে। একটি কাজের লোক এসে দ্রুত ভাঙা কাঁচগুলো তুলে জায়গাটা ভ্যাকুয়াম করে চলে গেল। রবার্ট চলেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু অমলের সনির্বন্ধ অনুরোধ এড়াতে না পেরে বাচ্-এর সোনাটা নম্বর ওয়ান থেকে একটু অংশ বাজাতে রাজি হলেন। বেহালাটা টেবিলেই ছিল। সেটা তুলে চিবুকের নীচে ভালোভাবে বসিয়ে ছড়ের একটা টান দিয়েই বললেন, “দিস ইজ নট এ ডেল গেসু।”
“হোয়াট?” কথাটা শুনে আঙ্কল দেখলাম উত্তেজিত হয়ে পোডিয়ামে উঠে পড়েছেন।
অমল উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আর ইউ শিওর?”
“আমি ডেল গেসু-র আওয়াজ জানি, শুধু ডেল গেসুই আমি বাজাই। এই বেহালা ডেল গেসু হতে পারে না।” বলে হাতের বেহালাটা নামিয়ে টেবিলে রাখলেন।
“কিন্তু এটার এমব্লেম তো ডেল গেসু-র?” এবার কথাটা বললেন আঙ্কল।
“মাস্ট বি ফেক!” বেশ চাঁছাছোলা ভাবেই রবার্ট দত্ত তাঁর রায় দিলেন।
“আই পেইড মোর দ্যান এ মিলিয়ন ফর দিস!” বেশ রাগত স্বরেই আঙ্কল কথাটা বললেন।
“ওয়েল,” কাঁধটা ঝাঁকিয়ে রবার্ট নিজের বেহালার বাক্সটা হাতে তুলে নিলেন। তারপর আঙ্কলকে বললেন, “এ জেনুইন ডেল গেসু ইজ নট চিপ।”
পোডিয়াম থেকে নেমে ইশারায় সঙ্গিনীকে ডেকে রবার্ট বেরিয়ে যাবার জন্যে ডাইনিং রুমের দিকে পা বাড়ালেন। তারপর বোধহয় আঙ্কলের জন্য একটু করুণা হল। একটু থেমে আঙ্কলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আই অ্যাম টুলি সরি। যার কাছ থেকে কিনেছেন, তাঁকে ফেরৎ দিয়ে টাকাটা নিয়ে নেবেন। দিস ইজ চিটিং!”
পুরো ব্যাপারটা ঘটে গেল এত দ্রুত লয়ে যে অতিথিদের অনেকেই মনে হল বোঝেননি কী ঘটেছে। আমরা নিতান্ত সামনে ছিলাম বলে সব কিছু শুনেছি। একটু দূরে বল্লরী আর বিপ্লব। বিপ্লবের মুখ কালো, বোঝাই যাচ্ছে ঘটনার আকস্মিকতায় স্টান্ড হয়ে গেছে। বল্লরীর মুখটাও ফ্যাকাশে। হঠাৎ বিপ্লব বল্লরীকে কিছু বলে দ্রুত চলে গেল। বল্লরী ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে দেখে অমল মিত্র বোধহয় সান্ত্বনা দিতে গেল। আঙ্কল ইতিমধ্যেই টেরাস থেকে অদৃশ্য হয়েছেন। আন্টিই একমাত্র হাসিমুখে সবাইকে সামলাচ্ছেন। প্রীতম এরমধ্যে একবার এসে আমাদের বলে গেল, “কী বিচ্ছিরি ব্যাপার হল! অমলের কী দরকার ছিল বল তো সর্দারি করে আজকে রবার্ট দত্তকে ডাকার?”
সাত
পরের দিন সকালে কফি মেকারে জল ঢালছি, দেখলাম একেনবাবু সোফায় বসে খুব মন দিয়ে ল্যাপটপে কী জানি দেখছেন।
“সাত সকালে কী পড়ছেন এত মন দিয়ে?”
“বেহালার ওপর একটা আর্টিকল স্যার।”
“বেহালা?”
“খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার স্যার। ট্র্যাডিভারির বেহালা সঙ্গে নতুন পুরোনো ভালো ভালো বেহালার তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু সে রকম ভাবে কোনও তফাৎ ধরা পড়েনি।”
.
কাগজের ফিল্টারে এখন ছ’চামচ কফির গুঁড়ো দিতে হবে। একটু কম-বেশি হলেই প্রমথ চেঁচামেচি জুড়বে উইক বা স্ট্রং হয়েছে বলে! আমার অ্যাটেনশানটা তাই সেদিকে। প্রায় বলতে যাচ্ছিলাম, তাতে হয়েছেটা কি?
এরমধ্যেই একেনবাবু সোফা থেকে উঠে ল্যাপটপটা খুলে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। উত্তেজিত ভাবে বললেন, “এই যে দেখুন স্যার, ১৯৭৭ সালে বিবিসি রেডিওর প্রোগ্রামে চারটে বেহালা আনা হয়েছিল। একটা স্ট্রাডিভারিয়াস, একটা গুয়ার্নেরির ১৭৩৯ সালে বানানো ডেল গেসু। অন্য দুটো অত পুরোনো নয়– ১৮৪৬ আর ১৯৭৬ সালের তৈরি। ভালো বেহালা বাদকদের দিয়ে সেগুলো বাজানো হয়েছিল পর্দার আড়ালে। বিচারক ছিলেন আইজ্যাক স্টার্ন, পিঞ্চাস জাকারম্যান আর বেহালা বিশেষজ্ঞ চার্লস বিয়ারক। এঁরা সবাই বিখ্যাত, তাই না স্যার?”
আইজ্যাক স্টার্নের নাম আমি আগে শুনেছি। অন্য দু’জনও নিশ্চয় বিখ্যাত হবেন। সেটাই জানালাম।
“তাহলেই বুঝুন স্যার, এঁরা কেউই চারটের মধ্যে দুটো ঠিক করে বলতে পারেননি। এঁদের মধ্যে দু’জন আবার ভেবেছিলেন ১৯৭৬ সালের বেহালাটা স্ট্রাডিভারিয়াস!”
আমি কফি মেশিনটা চালু করে বললাম, “চলুন আগে বসি, তারপর বলুন আপনার পয়েন্টটা কি?”
সোফায় বসতে বসতে একেনবাবু বললেন, “আমি বলতে চাচ্ছি স্যার, ওই দুম করে যে রবার্ট দত্ত ছড়ে একটা টান দিয়েই বললেন এটা ডেল গেসু নয়, সেটা সত্যি হতে পারে না!”
“তাহলে?”
“একটা গল্প মনে পড়ছে স্যার। একটা আসরে আলো নিভে যাবার সুযোগ নিয়ে এক মহিলা অতিথির হিরের আঙটি খুলে নিয়েছিল এক চোর। তারপর মুখ থেকে চুইংগাম বার করে সেটাতে লাগিয়ে ডেল গেসুর মতো দামি কোনও বেহালার সাউন্ড বক্সে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। চুইংগামের জন্য আঙটিটা বেহালার ভিতরেই আটকে গেল।
আলো যখন জ্বলল, তখন তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আঙটিটা পাওয়া গেল না। পুলিশ এসে সবাইকে সার্চ করেও কিছু পেল না। ইট ওয়াজ এ মিস্ট্রি স্যার। শুধু বেহালার আওয়াজটা আগের মতো খুলছিল না।”
“গল্পটা ইন্টারেস্টিং। কিন্তু শেষে লাভবান হলেন কে? বেহালার মালিক না চোর?”
“সেটাই ভুলে গেছি স্যার।”
“তা এখন কী করতে চান?”
“ভাবছি স্যার… একবার খোঁজ করলে হয়, সেদিন ওখানে কারও কিছু খোয়া গিয়েছিল কিনা।”
“এর থেকে অনেক সহজ এক্সপ্লানেশন আছে। নিজে কত বড় বোঝদার প্রমাণ করার জন্যে রবার্ট দত্ত একটা ফালতু স্টেটমেন্ট করেছেন।” আমি বললাম।
“তার থেকেও সিনিস্টার এক্সপ্লানেশন হল নিজের রদ্দি ডেল গেসু রেখে দিয়ে গোলমালের মধ্যে আঙ্কলের ভালো মালটা নিয়ে কেটে পড়েছেন।” প্রমথ কখন ঘরে এসেছে খেয়াল করিনি।
“এটা মন্দ বলেননি স্যার। কিন্তু এটা ডেল গেসু নয়’ বলার কী দরকার ছিল? আপনার থিওরি ঠিক হলে স্যার, উনি তো প্যান্ডেমোনিয়ামের মধ্যে এক্সচেঞ্জটা করেই ফেলেছিলেন। নিজের বেহালাটাই না হয় একটু বাজিয়ে, তারপর রেখে দিয়ে চলে যেতেন। কারও সন্দেহের কোনও প্রশ্ন থাকত না। কিন্তু আরও ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন স্যার, উনি কী করে জানলেন আঙ্কলের বেহালা শুধু জেনুইন নয়, একটা ভালো ডেলগেসু… যার জন্য ওই এক্সচেঞ্জটা উনি করতে গিয়েছিলেন?”
একেনবাবুর এই যুক্তিটা প্রমথ নাকচ করতে পারল না। ব্যাজার মুখে বসে রইল।
একেনবাবু কয়েক মিনিট চুপ করে বসে থাকার পর পা নাচাতে নাচাতে প্রমথকেই জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা স্যার, চুরির মোটিভ কী হতে পারে?”
“সিম্পল অর্থোপার্জন। কিন্তু প্রসঙ্গটা আসছে কোত্থেকে?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“ঠিক স্যার, অথবা কারও ক্ষতি করা, নিজের তেমন লাভ হোক বা না হোক।”
“এত হেঁয়ালি করে কথা বলছেন কেন?”
“মাঝে মাঝে সব কিছু খুব কনফিউসিং লাগে স্যার।”
প্রমথ বিরক্ত হয়ে বলল, “আমার তো আপনার এখনকার কথাই কনফিউসিং লাগছে। কী বলতে চান বা করতে চান বলুন তো?”
“ভাবছি আঙ্কলকে একটা ফোন করব।”
.
আমি অনেকবারই এই কথা লিখেছি, একেনবাবুর মাথায় কিছু চাপলে যতক্ষণ সেটা না হচ্ছে, ততক্ষণ আশেপাশে সবার লাইফ হেল করতে দ্বিধা করেন না। আমাকে দিয়েই ফোন করানোর চেষ্টা করছিলেন, লাকিলি প্রীতমের ফোন এল। প্রীতম আমাদের এদিকে এসেছে, আমাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়। এতে আবার সমস্যা কি? চলে আসতে বললাম।
.
একটুবাদে ও একাই এল। ওর কাছে শুনলাম, বাড়িতে প্রবল গোলমাল চলছে। আঙ্কল রেগে আগুন হয়ে রয়েছেন, বিপ্লবের বাবাকে ফোন করে যাচ্ছতাই গালাগালি করেছেন ঠকাবার জন্য। যেসব কাগজপত্র বেহালার অথেনটিসিটির প্রমাণ হিসেবে বিপ্লবের বাবা দিয়েছেন, সেগুলো সব ভুয়ো বলে কেস করার কথা বলেছেন। বল্লরী কান্নাকাটি করছে।
শেষ করল এই বলে, “অমল কী যে একটা ঝামেলা পাকাল?”
“আচ্ছা স্যার, এই অমল মিত্র ভদ্রলোকটি কে?”
“ও-র ঠাকুরদা আমার মায়ের দাদুর উকিল ছিলেন। আমার আন্টির দুর সম্পর্কের আত্মীয়। বলতে গেলে ফ্যামিলিরই একজন। তবে..”
কী জানি বলতে গিয়ে প্রীতম থেমে গেল।
“তবে কী স্যার?”
“ও আন্টির খুব প্রিয়, কিন্তু আঙ্কলের সঙ্গে একটু সমস্যা আছে। অমলের ধারণা আঙ্কলদের এই বিশাল ব্যাবসায়ে ওর ঠাকুরদার প্রচুর অবদান। বিশেষ করে অ্যাসবেস্টসের বিজনেসটা উনিই দাঁড় করিয়েছিলেন। সেই বিজনেসটা অবশ্য এখন নামে মাত্র আছে। কিন্তু এক সময় তো বিরাট আয় হত। তার প্রতিদানে ওকে চাকরির ক্ষেত্রে সেরকম সুযোগ বা সম্মান দেওয়া হচ্ছে না। আমাকে একদিন বলেছিল আঙ্কলদের এক কম্পিটিটর ওকে অনেক স্টার্ট-আপ বোনাস আর মাইনে দিয়ে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু ও পারিবারিক সম্পর্কটা নষ্ট হতে দিতে চায় না।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার।”
“বুঝলাম না,” প্রমথ বলল।” ওর কোম্পানি ছেড়ে যাবার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হবার প্রশ্ন উঠছে কেন। ও চলে গেলে যদি ইন্ডাস্ট্রি লাটে উঠত, তাহলে এসব কনসিডারেশন আসতে পারত!”
“তা নয়।”
“তা হলে আর কী হতে পারে… বল্লরীকে পাবার চান্স চলে যাবে? সরি, তোমার বোন… এভাবে কথাটা বলা উচিত নয়।”
“তুমি আবার কবে রেখে ঢেকে কথা বল!” প্রীতম হেসে ফেলল। “আন্টির তরফ থেকে সে চান্স দিতে আপত্তি হবে না। তবে বল্লরী আঙ্কলের চোখের মণি। আঙ্কলের কাছে বল্লরীর উপযুক্ত এখনও কেউ জন্মায়নি।”
‘সর্বনাশ! এর পরে জন্মালে তো বয়সের ডিফারেন্স বেড়ে যাবে!” প্রমথ বলে উঠল।
“ও কথা থাক। আসলে ব্যাপারটা এত বিচ্ছিরি অবস্থায় চলে যাচ্ছে। কিছু একটা করে স্টিমটা আউট করা দরকার।”
“সেই জন্যেই তুমি এই সকালবেলা একেনবাবুর কাছে এসেছ?”
“তোমাদের সবার কাছেই পরামর্শের জন্যে এসেছি। মল্লিকাও পুরো ব্যাপারটাতে খুব আপসেট।”
“তা তো বুঝতে পারছি স্যার। তার আগে আসুন, কফি খাওয়া যাক, সবারই মাথা তাতে খেলবে। সেই ফাঁকে আরও দুয়েকটা কথা জেনে নিই, তারপর না হয় যাওয়ার কথা ভাবা যাবে।”
প্রীতমের তাতে কোনও আপত্তি আছে বলে মনে হল না। প্রমথ এক পট কফি বানালো। বাড়িতে ডোনাট ছিল। সেই নিয়ে আমরা বসলাম।
“কাল আমার মাথাতে কতগুলো প্রশ্ন জেগেছিল স্যার, সেগুলো আগে ক্লিয়ার করি। এই যে রবার্ট দত্ত, এঁকে কি আপনি আগে কোথাও দেখেছেন?”
“হ্যাঁ, বেশ কিছুদিন আগে জুবিন মেহেতার একটা কনসার্টে বাজিয়েছিলেন লিড ভায়োলিনিস্ট হিসেবে। সেটাই ওঁর প্রথম ব্রেক। মল্লিকাও ওঁকে দেখেছে গতবছর লন্ডনের একটা কনসার্টে। খুব আত্মম্ভরি লোক।”
“আই সি। অমল মিত্র ওঁকে চিনলেন কী ভাবে স্যার?”
“তা বলতে পারব না। তবে অমলের অসীম ক্ষমতা লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারে। বহু সেলিব্রেটিকে ও চেনে।”
“বুঝলাম স্যার, কিন্তু উনি হঠাৎ রবার্ট দত্তকে নিয়ে এসে একটা ভায়োলিন পরীক্ষা করতে বললেন কেন, আর রবার্ট দত্তই বা তাতে রাজি হলেন কেন?”
“এই প্রশ্নটা আমার মাথাতেও এসেছিল যখন শুনলাম অমল ওঁকে আনার চেষ্টা করছে। পরে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হল।”
“কী ক্লিয়ার হল স্যার?”
“আঙ্কলের মনে একটা সন্দেহ হচ্ছিল ভায়োলিনটা সত্যিই কতটা ভালো। কাগজপত্রে তো অনেক কিছুই লেখা থাকে। ভাবছিলেন কাকে দিয়ে পরীক্ষা করাবেন। অমলই তখন রবার্ট দত্তের কথা বলেছিল। রবার্ট দত্ত রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু সেটা করার জন্য পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন। তারপর আমার রিসেপশনে যখন আসবেন ঠিক হল, তখন সেই পারিশ্রমিকের ওপর একটা অ্যাপিয়ারেন্স ফী-ও আঙ্কল দিয়েছিলেন। এক্সাক্ট অ্যামাউন্ট আমি জানি না। কিন্তু ভালো টাকাই হবে মনে হয়।”
“আমি একটু কনফিউসড স্যার। আঙ্কল নিজে তো বাজান না, কিন্তু এরকম একটা দামি বেহালা কিনলেন কেন? সেটা কি ইনভেস্টমেন্টের জন্য?”
“তা হতে পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে মনে হয় অন্য একটা কারণ কাজ করেছিল।”
“অন্য কী কারণ স্যার?”
“আমার মামাতো ভাই, এই আঙ্কলের একমাত্র ছেলে, বেহালা বাজাত। ওর খুব সাধ ছিল ডেল গেসু বা স্ট্রাডিভারিয়াস কিনবে। বেশ কয়েক বছর আগে ও দুর্ঘটনায় মারা
যায়। সেটাও হয়তো মনের মধ্যে ছিল… কে জানে?”
“অমলবাবুর সঙ্গে কি এর মধ্যে আপনার কথা হয়েছে?”
“না।”
“ঠিক আছে স্যার, আমি যাব। আপনারাও চলুন না স্যার?”
“আমরা গিয়ে কী করব?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“আমি যাচ্ছি না। আমি গেলে স্টিম-আউট হবার বদলে স্টিমের চাপ বেড়ে যাবে… যত্তসব!” প্রমথ অনড়।
অগত্যা আমি আর একেনবাবুই গেলাম। কিন্তু একেনবাবুকে সতর্ক করলাম, “আমি যাব আর আসব। আমাকে আজকেই এ্যান্টের রিপোর্ট শেষ করতে হবে, নো ইফ অর বাট।”
.
প্রীতম আন্টির সঙ্গে কথা বলেই এসেছিল। টেরাস তখনও পরিষ্কার করা হয়ে ওঠেনি। দু’জন লোক সেখানে কাজ করছে। বল্লরী আর মল্লিকা আন্টির সঙ্গে বসে আছে ফ্যামিলি রুমে। আঙ্কল বাড়িতে নেই। মনে হল বেহালার কাগজপত্র পরীক্ষা করানোর জন্যে একজন বিশেষজ্ঞ-উকিলের কাছে গেছেন।
একেনবাবু আন্টিকে কোনও ভনিতা না করেই জিজ্ঞেস করলেন, “আন্টি, আমি কি আঙ্কলের ডেল গেসু বেহালাটা একটু দেখতে পারি?”
সবাই বিস্মিত। আন্টি জিজ্ঞেস করলেন, “কেন বল তো?”
“একটা জিনিস পরীক্ষা করতাম। কিন্তু একটা জেমস ক্লিপ বা চুলের কাঁটা দরকার।”
জেমস ক্লিপ, চুলের কাঁটা! বিস্ময়টা একেবারে তুঙ্গে। বল্লরীই চট করে কোত্থেকে চুলের কাঁটা নিয়ে এসেছে।
.
আঙ্কলের অফিসে গেলাম। আগেও এসেছি, সেই একই রয়েছে। ওডিনের উপহারটা যেভাবে দিয়েছিলাম সেভাবেই ডেস্কের ওপর। কাল রাতে যা ঘটেছে, তারপর আর ওটা দেখার সময় পাননি। ডেল গেসু বেহালা বাক্স-শুদু ডেস্কের আরেক কোণে। সেটাকে আর ডিসপ্লে ক্যাবিনেটে ঢোকানো হয়নি।
বেহালাটা বাক্স থেকে উঠিয়ে পকেট থেকে একটা ছোট্টো ফ্ল্যাশ-লাইট বের করে একেনবাবু কী জানি দেখার চেষ্টা করলেন।
তারপর চুলের কাঁটাটা একটু বেঁকিয়ে সোজা করে বেহালার ছোট্ট মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে… ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যে জিনিসটা বার করলেন, সেটা আমি যেন এক্সপেক্টই করছিলাম, একটা চুইংগাম!
“এর মানে?” প্রীতম আর বল্লরী প্রায় একসঙ্গেই জিজ্ঞেস করল।
“ম্যাডাম, কেউ এটার আওয়াজ নষ্ট করার চেষ্টা করেছিল… আরও কিছু গাম হয়তো আটকে আছে, কিন্তু খোঁচাখুঁচি করে বেহালাটা ড্যামেজ করতে চাই না।”
.
এই কীর্তি কে করেছে একেনবাবু মনে হল বুঝতে পেরেছেন। আমিও মনে হয় একই লোককে সন্দেহ করেছি। বল্লরীর চোখ দেখলাম জ্বলছে, সে ঠিকই ধরেছে।
“আঙ্কলকে বলবেন ম্যাডাম, বেহালা সারাই করার ভালো লোক ডেকে এটাকে ঠিক মতো ক্লিন করতে।” বল্লরীকে বললেন একেনবাবু। আন্টি আমাদের চা খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আমরা বসলাম না।
ফেরার পথে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার কী করে সন্দেহ হল যে অমল মিত্র এর সঙ্গে জড়িত? এইভাবে বিপ্লবকে ফিল্ড থেকে হটিয়ে দেওয়া… এত একেবারে মাস্টার স্ট্রোক!”
“এটা একেবারেই ঝড়ে বক পড়ে স্যার। চুইং গামটা হঠাৎ পেয়ে গেলাম, নইলে তো এটা চিটিং কেস! ভালো বলে বাজে মাল গছানো!”
“সে যাই হোক, যে বম্বশেল ফাটিয়ে এলেন, এবার দেখুন কী দাঁড়ায়! একটা পারিবারিক অশান্তির পরিবেশ যে হবে সেটাতে সন্দেহ নেই।”
আট
সন্ধেতে যে খবরটা পেলাম, তার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না! আঙ্কল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, এবার আর পটকা ফটকা নয়, বম্ব ব্লাস্ট! ভয়ার্ত প্রীতমের করা ফোন থেকে যা বুঝলাম। পুলিশ জায়গাটা কর্ডন করে রেখেছে। ফরেন্সিক এক্সপার্টরা তন্নতন্ন করে চত্বরটা পরীক্ষা করছে। দুটো ডেলিভারি এসেছিল সকালে। সেগুলো ট্র্যাক করা হচ্ছে। বল্লরীকে নিয়ে আন্টি আপাতত কোম্পানির গেস্ট হাউসে।
মৃত্যুর আগে একেনবাবুর চুইংগাম ডিসকভারির কথাও বোধহয় শুনে যাননি। অবশ্য সেটা জিজ্ঞেস করার সময় এখন নয়।
.
ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির মালিকের এভাবে খুন হওয়াটা একটা বিগ নিউজ। একেনবাবুও খোঁজখবর করছেন। যেটুকু জানলাম বেশ সোফিস্টিকেটেড প্ল্যাস্টিক বম্ব। যেই বানাক না কেন, বম্ব বানানোর বিজনেসটা জানে, অ্যামেচারের কাজ নয়।
ওডিনও খবরটা শুনেছে। জিজ্ঞেস করল প্রেজেন্টটা মিস্টার সিংকে দিতে পেরেছিলাম কি না। বিড় বিড় করল, ওটা ইতিমধ্যে না দেখে থাকলে তো আর দেখতেও পাবেন না।
“হোয়াট ডিফারেন্স ইট মেকস ওডিন। তোমার আঙ্কল-আন্টি মনে করে পাঠিয়েছেন, সেটাই তো যথেষ্ট!”
মাঝে মাঝে লোকেদের প্রায়োরিটি দেখে বিস্মিত হতে হয়!
আঙ্কলের ফিউনারেলটা হচ্ছে লোয়ার ম্যানহাটানের একটা ফিউনারেল হোমে। লন্ডন থেকে প্রীতমের দুই মামা এসেছেন মামিদের নিয়ে। প্রাইভেট অ্যাফেয়ার, ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির সবাই এলে তো তিল ধারণের জায়গা থাকবে না। শুধু সিনিয়র কিছু এক্সিকিউটিভ। অনেকেই ফুল নিয়ে এসেছেন। মেজোমামা আর ছোটোমামা ফুলগুলোকে খুলে খুলে ক্যাসকেডের চার পাশে সাজিয়ে রাখছেন। আমি আর প্রমথ ফুল নিয়ে গিয়েছিলাম। একেনবাবু একটু পরে আসবেন বলেছিলেন। হঠাৎ অমল মিত্র এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলেন, “একেনবাবু কোথায়?”
“একটু বাদেই আসছেন।”
তারপর প্রায় অনুনয়ের ভঙ্গিতে বললেন, “আপনাদের একটু সাহায্য করতে হবে আমাকে?”
আমি আর প্রমথ দুজনেই বিস্মিত চোখে তাকালাম।
“বল্লরী কথা বলা বন্ধ করেছে। ওর ধারণা আমি চুইংগাম বেহালায় ঢুকিয়েছি বিপ্লব আর বিপ্লবের ফ্যামিলিকে হেনস্থা করার জন্য। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি এর মধ্যে জড়িত নই। কেন এরকম নোংরা কাজ আমি করব? আপনারা একেনবাবুকে সেটা বলুন।”
আমার সত্যিই বিরক্তি লাগল। আঙ্কলের ফিউনারেলে এসেছি, একটা বিষাদপূর্ণ অনুষ্ঠান… এর মধ্যে এসব কী কথা!
“ঠিক আছে বলব,” বলে কাটালাম।
“ছোঁড়াটা বাঁশ খাচ্ছে দেখে ভালো লাগছে।” অমল চলে যেতেই প্রমথর মন্তব্য।
এর মধ্যে ভিড়টা বেশ বেড়েছে। ক্যাসকেডের চারপাশে ফুল রাখার আর জায়গা নেই। প্রীতমের দুই মামা ফুলগুলো নিয়ে পাশের একটা টেবিলে রাখছেন। হঠাৎ দেখি ওডিন। হাতে কাগজে মোড়া এক গুচ্ছ ফুল। সেটা প্রীতমের ছোটোমামার হাতে দিতেই পিছন থেকে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আর দু’জন পুলিশ সেটা হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে ওডিনের হাত পেছন করে হাতকড়া লাগিয়েছে। পুরো ব্যাপারটা বড়োজোর পনেরো সেকেন্ড! দেখলাম একেনবাবুও সেখানে দাঁড়িয়ে। ওডিনকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হচ্ছে। বাইরে বম্ব স্কোয়াডের গাড়ি। ফিউনারেল হোমে সবাই সন্ত্রস্ত। কোনও মতে নমো নমো করে ব্যাপারটা শেষ হল। শুধু আমি না প্রমথও কমপ্লিটলি কনফিউসড।
একেনবাবু বাড়ি ফিরলেন বিকেলে।
“কী ব্যাপার মশাই বলুন তো? ওডিনকে ওরকম করে অ্যারেস্ট করা হল কেন?”
“খুবই স্যাড স্যার, তার কারণ আঙ্কলের মৃত্যুর জন্য মিস্টার ওডিনই দায়ী। এঁকে সময় মতো না ধরলে আরেকটা বিস্ফোরণ হত। আমরা সবাই খতম হয়ে যেতে পারতাম।”
“হেঁয়ালি ছেড়ে, প্রথম থেকে বলুন।”
“বলছি স্যার, বলছি.. সেই সঙ্গে একটু কফিও হোক। স্টুয়ার্ট সাহেবের অফিসে ওটি ভালো পাওয়া যায় না।”
প্রমথ রোস্টেড কফি বিন ইলেকট্রিক গ্রাইন্ডারে গুঁড়ো করতে বসল। একেনবাবুর গল্পও শুরু হল…
“স্যার এখানে ডিটেকশনের দুটো গল্প আছে। প্রথমে প্রাণঘাতি গল্পটাই বলি। এও বলি স্যার, আমি যা বলছি তা আপনারা সবই জানেন। প্রমথবাবু যদি বা না জানতে পারেন, আপনি কিন্তু স্যার, জানেন।”
“বাপি জানলেও ব্যাপারটার আসল অর্থ বুঝতে পারে না, একটু গবেট আছে।”
“চুপ কর তুই, বলুন।”
“দাঁড়া দাঁড়া, কফিটা একেবারে নিয়ে তারপর শোনা যাক, কয়েক মিনিটের তো ব্যাপার।”
.
সোফায় বসে গরম কফিতে চুমুক দিয়ে একেনবাবু আমার দিকে তাকিয়ে শুরু করলেন, “আপনি স্যার নিশ্চয় খেয়াল করেছিলেন, আফ্রিকার ক্যাম্পর ইনডাস্ট্রি নিয়ে মিস্টার ওডিনের একটা বিশেষ আগ্রহ ছিল।”
“তা করেছিলাম, একটু অবাকই হয়েছিলাম। পরে অবশ্য জেনেছিলাম ওদের পরিবারের অন্নদাতা ছিল ওই কোম্পানি।”
“এক্সাক্টলি স্যার। মিস্টার ওডিন অবশ্য সেটা জেনেছিলেন খুব বেশিদিন হয়নি.. জন্মদাতা বাবা-মা’র খোঁজ শুরু করার সময় ওঁর পালক-পিতার এক বন্ধুর কাছ থেকে। তিনি মনে হয় মিস্টার ওডিনের বাবা-মা’র খবর মিস্টার জনসন, মানে ওডিনের পালক পিতার থেকে বেশি জানতেন। এছাড়া সাবালক হয়ে গেলে অ্যাডপশন এজেন্সি থেকেও নিজের জন্মগত পরিচয় খানিকটা পাওয়া যায়, যদি আইনের কোনও বাধা না থাকে। অনুমান করি স্যার, মিস্টার ওডিন ওখান থেকেই জানতে পারেন কোন অনাথ আশ্রমে তিনি থাকতেন। তারপর সেই অনাথ আশ্রমের সঙ্গে তো বটেই, পরে সেকো ফ্যামিলির কারও কারও সঙ্গে মিস্টার ওডিনের যোগাযোগ হয়েছিল। হয় চিঠিতে অথবা ফোনে। আর সেই পরিবারকে আরও ভালো ভাবে জানার জন্যেই তিনি তিন সপ্তাহের জন্য আফ্রিকা গিয়েছিলেন।
“প্রমথবাবু, আপনি এটা জানেন না, কিন্তু মিস্টার ওডিন খুব পরিষ্কার করেই বাপিবাবুকে লিখেছিলেন কেন আফ্রিকা যাচ্ছেন.. To find my roots. বাপিবাবু অবশ্য এটাকে একটু অন্যভাবে নিয়েছিলেন। লেখাটাতে দুটো অর্থই লুকিয়েছিল, যিনি যেভাবে নেবেন। তাই না স্যার?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“আসলে স্যার, অ্যাডপ্টেড ছেলেমেয়েদের মানসিক অবস্থা আমরা তো নিজেরাই দেখেছি এরিক সাহেবের সঙ্গে কথা বলে। মনের গভীরে ওঁদের মানসিক কষ্ট কী নিদারুণ, আমাদের পক্ষে কল্পনা করা কঠিন। কেন ওঁদের নিজের বাবা-মা ওঁদের পরিত্যাগ করলেন… এই কষ্ট ওঁদের কুরে কুরে খায়। মিস্টার ওডিনের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে একটা বাইরের কারণে…ওঁর বাবা-মা ওঁকে ফেলে দেননি স্যার, মৃত্যুই হঠাৎ এসে ওঁর বাবা-মা’কে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। দু’জনেই মারা গেছেন ক্যান্সারে…মেসোথেলিওমা।
“আপনারা জানেন কিনা জানি না স্যার, এটা একটা মারাত্মক ক্যান্সার। যার অন্যতম প্রধান কারণ অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে বহু সময়ের জন্যে থাকা। শুধু ওঁর বাবা-মা নন, কাকারও মৃত্যু ওই একই ক্যান্সারে। সেদিক থেকে স্যার, বাবা-মা’র ওপর অভিমান না করে, মিস্টার ওডিন রাগ করতে পারেন ভগবানের ওপর। এর মধ্যে বেহালা নিয়ে ওই ব্যাপারটা ঘটল। মিস্টার প্রীতম এসে অমল মিত্রের কথা বললেন। মনে আছে স্যার?”
“কী কথা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“মিস্টার মিত্রের ঠাকুরদার কথা। ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রির অ্যাসবেস্টসের ব্যাবসাটা তিনিই দাঁড় করিয়েছিলেন। এখন অবশ্য সেটা পড়তি অবস্থায়, কারণ বেশির ভাগ দেশই ওটার ব্যবহার বন্ধ করেছে মেসোথেলিওমার ভীতিতে। তখনই মনে পড়ল মিস্টার ওডিনের সেই নোট, যেটা প্রীতমের আঙ্কলকে পাঠানো গিফটের সঙ্গে আটকানো ছিল। আপনার মনে আছে স্যার?”
আমাকে জিজ্ঞেস করলেন একেনবাবু।
আমি ভাবার চেষ্টা করলাম। “ওঁর আঙ্কল আর আন্টির নাম?”
“হ্যাঁ স্যার, কিন্তু ডাক নামটা লিখতে ভুলে গিয়েছিলেন।”
“খুবই মনে আছে। known as..’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমরা তো কথাও বললাম সেই নিয়ে।”
“কিন্তু তার পরের শব্দগুলোও ভাবুন স্যার… “Best, OS।”
“হ্যাঁ, কিন্তু ওতো সব সময়েই নোটের শেষে Best, OS কথাটা লেখে।”
“তা লেখেন। কিন্তু এখানে সেটা অন্য মাত্রা পেয়েছিল। শেষ তিনটে শব্দ এখন এক সঙ্গে পড়ন স্যার, As Best OS, অর্থাৎ অ্যাসবেস্টস। কী তীব্র রাগ আর ক্ষোভ নিয়ে মিস্টার ওডিন ওই নোটটা লিখেছিলেন! বক্তব্যে কোনও ঢাকা চাপা নেই, কিন্তু গুরুবচন আঙ্কলের সাধ্য হবে না তার অর্থ বোঝার। আমরাও বুঝিনি। এখানেও ওঁর সেই roots খোঁজার মতো… যে যেভাবে বোঝে!”
.
প্রমথ এবার মুখ খুলল, “এবার কিন্তু আপনার গল্পের গরু গাছে উঠছে! এর সঙ্গে আঙ্কলের মৃত্যুর সম্পর্ক কী? আঙ্কল মারা গেছেন একটা সোফিস্টিকেটেড প্লাস্টিক বোমায়। সেটা তো যে-কেউ বানাতে পারবে না!”
“একদম ঠিক স্যার। তবে কিনা বাপিবাবু আরেকটা জিনিস খেয়াল করেননি, আমিও প্রথমে করিনি। আমাদের ধারণা ছিল মিস্টার ওডিন এনার্জি সেক্টরের একটা ল্যাবে কাজ করেছেন। সেটা ঠিক নয় স্যার, উনি কাজ করেছিলেন এনার্জেটিক্স ল্যাবে। বাপিবাবু সেদিন যখন ওঁর রেসিউমিটা দেখালেন, তখন এনার্জেটিক্স শব্দটা পড়েছিলাম, কিন্তু সেভাবে ওটা নিয়ে ভাবিনি। এনার্জি আর এনার্জেটিক্সের মধ্যে অনেক তফাত। এনার্জেটিক্স হল বিস্ফোরক নিয়ে কারবার। উনি আগে কাজ করতেন সেখানে রিসার্চ করা হত বিস্ফোরক নিয়ে।”
.
একেনবাবু বলে চললেন, “সেদিন আরও দুটো প্যাকেজ আঙ্কলের কাছে এসেছিল বটে, কিন্তু সেগুলো নির্দোষ… অ্যামাজন আর ওয়ালমার্টের অন-লাইন অর্ডার। ওডিনের প্যাকেজটা খুলতে গিয়েই এক্সপ্লোশানটা হয়। ফরেন্সিক অ্যানালিসিসে দেখা যায় ব্যাটারি অপারেটেড কোনও ট্রিগারিং মেকানিজম ব্যবহার করা হয়েছিল। আমিও চিন্তা করতে শুরু করি, কোথায় মিস্টার ওডিন এটা বানাতে পারেন। বাইরে কোথাও বানাবার চেষ্টা করলে করলে ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে… করতে পারবেন ইউনিভার্সিটিরই কোথাও। কোথায় আবার? প্রমথবাবু ওঁকে ল্যাবে একটা কাজ জোগাড় করে দিয়েছেন। সেই ল্যাবে প্ল্যাস্টিক বোম বানাবার সব রসদই মজুত আছে, বাইরে থেকে কিছুই কেনার দরকার নেই। পুলিশ ইতিমধ্যেই সেটা ভেরিফাই করেছে।”
“মাই গড!” প্রমথ বলল।
“ওঁর দিক থেকে ভাবুন স্যার, বাবা-মা ওঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন ক্যানসারে মৃত্যুর জন্য, অন্য কোনও কারণে নয়। আর ক্যানসার হয়েছে অ্যাসবেস্টসের জন্য। ক্যাম্পর ইন্ডাস্ট্রি, যার মালিক হচ্ছেন আঙ্কল গুরুদয়াল সিং আর তাঁর ভাইরা, অ্যাসবেস্টস নিয়ে এত হইচই সত্ত্বেও মুনাফার লোভে সেই ব্যাবসা বন্ধ করেননি। যদ্দিন খরিদ্দার পেয়েছেন, মাল তৈরি করেছেন, বিক্রি করেছেন। এই সিং ভাইরাই জেনেশুনে ওঁর বাবা-মা’কে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন। রাগ থাকা তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার স্যার।
“মুশকিল হল স্যার, এগুলো সবই পরোক্ষ প্রমাণ। ওঁকে বোমা বানাতে দেখা যায়নি। বোমা উনি নিজে ডেলিভারি করেননি। যে চিঠি লিখেছেন… সেটার ওপর ভিত্তি করে কিছুই এগোয় না। কিন্তু আমি জানতাম স্যার, একজন সিং-এর মৃত্যুতে উনি সন্তুষ্ট হবেন না। তারপর এই ফিউনারেলের ব্যাপারটা এল। অন্য দুই ভাইও আসবেন, পত্রিকাতেই খবর পাওয়া গেল।
.
“মিস্টার ওডিন আবার কাজে লাগলেন। এবার উনি জানতেন না, ওঁর ওপর নজর রাখা হচ্ছে, প্রত্যেকটা মুভ রেকর্ড করা হচ্ছে। ফুলের গুচ্ছ কিনে কাগজের মোড়কে যখন প্ল্যাস্টিক এক্সপ্লোসিভ জড়াচ্ছেন.. এসব ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে কঠিন, অর্থাৎ ট্রিগারিং মেকানিক্স, যাতে কাগজগুলো খুললেই সেটা তৎক্ষণাৎ কাজ করে, সেটাকে যখন বসাচ্ছেন– সেটাও ফোকাস করে তোলা হল। তারপরের ঘটনা তো আপনারা জানেনই। ওঁর পিছন পিছন আমরা গেলাম, ফুলটা হাতে দিতে না দিতে ওঁকে অ্যারেস্ট করলাম।… সবই স্বীকার করেছেন উনি। অত্যন্ত ট্র্যাজিক। পুলিশের কাজ স্যার, নচ্ছার!”
.
আমরা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। একটা প্রশ্ন অবশ্য মাথায় এল, এত দেরি করে পুলিশ ওকে গ্রেফতার করল কেন! বোমা বানানোর সময়েও করতে পারত। কিন্তু তার আগেই প্রমথ বলে উঠল, এবার একটা হালকা প্রসঙ্গ তুলি। “আপনি তো মশাই, অমল মিত্রের কেস কাঁচ্চা করে দিয়ে এলেন।”
“কেন স্যার?”
“ওই যে বল্লরীর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছেন, অমল মিত্র আঙ্কলের ডেল গেসু বেহালার সাউন্ড-বক্সে চুয়িংগাম ফেলেছেন, আওয়াজটা ড্যাম্প করতে। উদ্দেশ্য বল্লরীর বয়ফ্রেন্ডের বাবার ওপর আঙ্কল যাতে এত রেগে যান যে বল্লরীর বিয়েতে আপত্তি করেন!”
“কী মুশকিল স্যার, আমি কি তাই বলে এসেছি?”
“প্লেন ইংলিশে বলেননি, কিন্তু ইশারায় তো বলেছেন।”
“বলে থাকলে ভুল বলেছি, স্যার।”
“মানে?”
“মানে স্যার, ওই বিস্ফোরণের পরে পুলিশ সিকিউরিটি ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো সব পরীক্ষা করেছে। কীর্তিটা ওই যমজ দুটো ভাইয়ের। এটা অবশ্য স্যার, আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, এইভাবে বিপ্লবকে হেনস্থা করার চেষ্টা– শুধু চাইল্ডিশ নয়, রিস্কি।”
“কিন্তু বেচারা অমল, ওর জন্যে তো কিছু করতে হবে?” আমি বললাম।
“ও-তত দু’দিক থেকেই শেষ। বল্লরী ভালোবাসে বিপ্লবকে… অমল বেহালা নষ্ট করুক বা না করুক। আর আঙ্কলও গন। আমার শুধু একটাই দুঃখ, একেনবাবু, প্রমথ বলল, “বাপিটার কিছু হল না। বিপ্লব গন হলে বাপির তবু একটা চান্স থাকত।”
“কেন স্যার, বেভ ম্যাডাম তো আছেন।”
একেনবাবুকে মাঝে মাঝে খুন করতে ইচ্ছে করে।
