অন্য শিকার (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

এদিকের জঙ্গলে কখনও আসিনি ঋজুদার সঙ্গে। ঋজুদাও যে এর আগে খুব বেশি এসেছে মধ্যপ্রদেশে, এমনও নয়। তবে, বার দশেক এসেছে। ঋজুদার ভালবাসার জায়গা ছিল হাজারিবাগ, পালামৌ, রাঁচি এবং ওড়িশার মহানদীর অববাহিকা। সুন্দরবন এবং আফ্রিকার কথা বাদ দিয়েই বলছি। এখন তাকে মধ্যপ্রদেশে পেয়েছে। দারুণ লাগে! ঋজুদা বলে।

মিস্টার ভটকাইয়ের মেজকাকা বহুদিন হল মধ্যপ্রদেশে আছেন। ঋজুদা অ্যান্ড কোম্পানিকে বহুবার দাওয়াতও দিয়েছেন। তিনি জবলপুরের পাচপেডিতে থাকেন, সিভিল লাইন্সে। আর্মিতে ফুলকর্নেল ছিলেন। রিটায়ার করে নর্মদায় মাছ ধরছেন আর বড় নাতিকে বাংলা পড়াচ্ছেন। এই তাঁর হোলটাইম অকুপেশান। পার্টটাইম অকুপেশান কাকিমার সঙ্গে ঝগড়া করা। কাকিমা ভাল গান গাইতেন একসময়। এখন মোটে রিয়াজ করেন না। তাই মেজোকাকা ব্যাপারটাকে ঝগড়া না বলে কণ্ঠ-চর্চা বলেন, স্ত্রীকে প্র্যাকটিস দেন, যাতে গলাটা থাকে। কাকার গলা ‘তারা’য় বলে।

ঋজুদাকে তিনি একাধিক চিঠি দিয়েছিলেন আসার আগে নিমন্ত্রণ জানিয়ে। তাই আমাদের এই আগমন। কাকার ভাষায়, ধন্য হলাম আমরা। কাকা ধন্য হলেন অথবা ঋজুদা ধন্য করলেন, তা জানি না। আমি আর ভটকাই রিয়্যালি হ্যাপি।

যতই ঘুরছি, ততই দেখছি ভারী সুন্দর রাজ্য এই মধ্যপ্রদেশ। অনেক জায়গাই দেখা হয়ে গেল এর মধ্যে। মাৰ্বল রক, কানহা, কিসলি, মুক্কি, সুফকর, পাঁচমারি, ইন্দোর, উজ্জয়িন, ভোপাল ইত্যাদি ইত্যাদি।

তিতির আসেনি, তাই ঋজুদা একটু গিলটি ফিল করছে। কিন্তু ভটকাই প্রথম থেকেই তার মতামতে দৃঢ়। সে বলেছে, তোমরা যখন গুগুনোগুম্বারের দেশে এবং রুআহাতে গেলে আফ্রিকায়, তখন তিতিরকেই নিয়ে গেলে। আমার মতো এমন এক কোয়ালিফায়েড জাঙ্গল এক্সপার্ট এবং ক্রাইম-বাস্টারকে রেখে গেলে। আমাকে বললেও না পর্যন্ত একবার। এবার আমারই বন্দোবস্ত। নো মেয়ে-ফেয়ে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বই পড়িসনি? কী রে রুদ্র? মেন উইদাউট উইমেন। মেয়েদের নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার করা যায়? ছোঃ। পথি নারী বিবর্জিতা।

ঋজুদা বান্ধবগড়ের রাজাদের পুরনো শুটিং লজের বারান্দায় বসে সামনের একটি তেপায়াতে পা তুলে জম্পেশ করে পাইপটা ধরিয়ে একটু হেসে বলল, একেই বলে অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী। ফর হুম দ্য বেল টোলস বুঝি পড়িসনি ভটকাই? অথবা স্লেজ অব কিলিমানজোরো? সেগুলো বুঝি হেমিংওয়ে নয়?

তা পড়েছি। তাতে মেয়েরা আছে। কিন্তু ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি? তাতে? তাতে তো শুধু একটা বুড়ো, একটা ছোট্ট ছেলে আর একটা মস্ত মাছ। সমুদ্র। সমুদ্রই তো আসল।

তাইই বুঝি? ঋজুদা বলল। তারপর বলল, সমুদ্র মোটেই আসল নয়। কী যে আসল, তা তোকে নিজেকেই বের করতে হবে বারবার পড়ে। বিভিন্ন সময়ে পড়ে। সাহিত্য তো ব্যাকরণ নয় রে ভটকাই! সাহিত্য টেম্পারা বা ওয়াশের কাজের ছবির মতন। অথবা অয়েল পেন্টিংয়েরই মতো কোনও ছবি। সময়ের সঙ্গে এর তাৎপর্য ফুটতে থাকে, পরতে-পরতে খুলতে থাকে, সাহিত্য যদি সত্যিকারের সাহিত্য হয়। একই বই, বিভিন্ন বয়সে পড়ে বিভিন্ন মানে আবিষ্কার করবি। আফ্রিকার গোবরাংগোরোর বা মাণ্ডুর প্রাগৈতিহাসিক বাওবাব গাছগুলির মতনই যে-কোনও মহৎ সাহিত্যের মধ্যেই বোধহয় প্রাগৈতিহাসিকতার সঙ্গে মিশে গেছে ভবিষ্যৎ। একসময়ে, একবার পড়ে, কোনও মহৎ সাহিত্যই বোঝা যায় না। হিরেরই মতো চমকে দেয় তা, বিভিন্ন কোণ থেকে চাইলে। একটু থেমে ঋজুদা বলল, কী রে? বুঝলি কিছু ভটকাই?

বেশি জ্ঞান হয়ে গেল। বুঝলে না ঋজুদাদা, আমাদের জেনারেশনের ছেলেমেয়েদের এই জ্ঞান-ফ্যানে ভীষণ অ্যালার্জি। তাও স্মল ডোজে দিলে হয়, টু মিলিগ্রাম মতো। এ যে স্যালাইন ইনজেকশনের সিরিঞ্জে জ্ঞান। বাপস্।

কাকার রাজ্যে বেড়াতে-আসা ভটকাইয়ের জ্যাঠামো দেখে আমরা সকলেই হেসে উঠলাম।

ঋজুদাও। বলল, থাক, তাহলে তোরা অজ্ঞানই থাক। মন থেকে যে জ্ঞান নিতে না চায়, তাকে জ্ঞান কি কেউ দিতে পারে?

সবে ব্রেকফাস্ট করেছি ঋজুদা। স্টম্যাক ফুল। চারটে ডিমের স্ক্র্যাম্বল খেয়েছি। এখন, দেয়ার নো রুম ফর এনি জ্ঞান। প্লিজ। সাম আদার টাইম। পেট যখন খালি থাকবে।

আমি বললাম, ব্রেকফাস্ট তো হয়েই গেল। এবার চলো না ঋজুদা, আমরা বান্ধবগড় ফোর্টে যাই। সেখানেই তো বাঘেদের আড্ডা। আসলে আমি কথা ঘোরাতে চাইলাম।

ভটকাই তো ঋজুদাকে অত ভাল চেনে না। বড্ড বাড়াবাড়ি করছে। ফট করে যদি ঋজুদা রেগে যায় তো পালিয়ে বাঁচবে না। ঋজুদার মেজাজ বাঘের মতো। এমনিতে কুলফি, রাগলে উরিব্বাবা!

ওঁদের নিয়মকানুন আছে না সব? ঋজুদা বলল।

আরে! পাওয়ারসাহেব, দত্তসাহেব; এখানকার সবাইকে বলে দিয়েছেন। মিস্টার ঋজু বোস বলে কতা। আমাদের বেলা কানুনফানুন খাটবে না, ভটকাই বলল, আমরা হলাম গিয়ে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অনার্ড গেস্ট।

আমি বললাম, গিয়ে কী হবে? বাঘের গুহায় ঢুকে বাঘ দেখবি? বাঘেদের আড্ডায়? আগে চিড়িয়াখানায় দেখে দেখে অভ্যস্ত হ। কটা এনেছিস?

কী? কটা?

আন্ডারওয়্যার।

শাট আপ য় ব্র্যাগিং ব্রাট, বলে ভটকাই বলল, না। তার চেয়ে বাঘেদের আড্ডাখানায় বসে আমরা একটু আড্ডা মেরে আসি। কথা ঘুরিয়ে তারপর বলল, ঋজুদার দিকে চেয়ে, কী করব স্যার, সুন্দরীমোহন অ্যাভিনুর রকবাজ লাইফ মেম্বার, একটু আড্ডা-ফাড্ডা না হলে পেট যে ফুলে উঠছে। তোমার জ্ঞান বন্ধ করো এখন, প্লিজ।

ঋজুদা হেসে ফেলল, ও. কে.। নো জ্ঞান। মানে অজ্ঞানই।

দেখলাম, আজ ফার্স্ট ক্লাস মুডে আছে ঋজুদা।

ওঠা হল সকলের। বান্ধবগড় দুর্গের পেছনে খাড়া উঠতে সময়ও লাগল কিছুটা। উপরে উঠে চোখ জুড়িয়ে গেল। শিকার করার জন্যে দুর্গের নীচের এই লজ বানিয়েছিলেন রাজারা। সামনে একটি ঝিল। পদ্ম, কুমুদিনী সব ফুটে আছে। শীতের হাওয়ায় পাতারা মাথা নাড়াচ্ছে, হেলছে, দুলছে; জলে বিলি কেটে সেই উত্তুরে রুখু-হাওয়া-হিহি-জলে চিতসাঁতার দিয়েই বসন্তের হাওয়া হয়ে এসে এপারে উঠছে। কখনও বা ডুবসাঁতারে। আর গভীর ব্যঞ্জনাময় অস্ফুট সব স্বগতোক্তি করছে নানা জাতের পরিযায়ী হাঁসেরা। ম্যালার্ড, পোচার্ড, নানা ধরনের টিলস্, রাশিয়ান এবং সাইবেরিয়ান রাজহাঁস। সব বছর নাকি আসে না এরা। এদের এই স্বগতোক্তিতে ঘুম পেয়ে যায়। সোপোরিফিক এফেক্ট বয়ে আনে এই পরিবেশ। স্নায়ুগুলো শীতের সাপের মতো নেতিয়ে পড়ে। চোখ বুজে আসে আবেশে।

একটা মস্ত শালগাছের নীচের বড় পাথরে শুকনো পাতা-টাতা সরিয়ে আরাম করে বসলাম আমরা। গাছে পিঁপড়ে বা ফোকর আছে কি নেই দেখে নিয়ে, গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসল ঋজুদা, পায়জামা-পাঞ্জাবির উপর শাল জড়িয়ে নিয়ে; যেন বিয়েবাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে এসেছে। শীতটাও বেশ জাঁকিয়েই পড়েছে। উপর থেকে চারধারের গভীর জঙ্গল-পাহাড়ের গায়ের শীত-শীত গন্ধের সঙ্গে মেশা চামচিকের ও বাঘের চিমসে গন্ধ মাঝে-মাঝে ভেসে আসছে ঝলক ঝলক হাওয়ায়। রোদ এসে পড়েছে ঘাড়ে। কী এক গভীর সুখের নিবিড় সুগন্ধি আমেজে দু চোখ সত্যিই বন্ধ হয়ে আসছে। ঘুমিয়েই পড়তে ইচ্ছে করছে একেবারে।

হঠাৎ ভটকাই শান্তি ভঙ্গ করে বলে উঠল, একটা গল্প বলো না ঋজুদা। জঙ্গলের।

এমনই ভাব, ও যেন পাঁচ বছরের খোকা। ঠাকুরমার কাছে গল্প শুনতে চাইছে। এদিকে গত বছর কলেজের স্পোর্টসের দিন সিগারেট খেতে দেখেছে রাজীব ওকে। ন্যাকা! এই জন্যেই চটকাতে ইচ্ছে করে ভটকাইকে।

কী গল্প? ঋজুদা পাইপ ভরতে ভরতে নীচের ঝিলের দিকে চেয়ে বলল।

ওখানে পাখিরা উড়ছে আর বসছে। মাথার উপরে উড়ে বেড়াচ্ছে। বাজ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে। কোনও অশক্ত, বৃদ্ধ বা শিশুপাখি দেখলে আর রক্ষে নেই।

আমি বললাম, সেই যে অনেক বছর থেকে তুমি বলছ, তোমার মাথার মধ্যে একটা গল্প খালি ঘোরে। বারবারই ঘুরেফিরে আসে। সেই যে, একজন বুড়ো সাদা-দাড়ি পাইপমুখো, শিকারি আর একটি অল্পবয়সী আদিবাসী ছেলে, আর এক বুড়ো বাঘের গল্প। যে-বাঘ সাংঘাতিক। অনেক বাঘা বাঘা শিকারি যার হাতে ঘায়েল হয়েছিল, অথচ বাঘাকে ঘায়েল করতে পারেনি তারা কেউই। এবং আশ্চর্য, সেই বাঘটি মানুষখেকো ছিল না। মানুষের বা তার গৃহপালিত কোনও পশুরই কোনও ক্ষতি কখনও সে করত না। সেই ভূতুড়ে গল্প। বলবে?

ভটকাই বলল, তাহলে তো দারুণ হয়। জমে যাবে। ফিরে গিয়ে সুন্দরীমোহন অ্যাভিনুর রকে যা ছাড়ব না! ইক্কেরে রক্ শেল্টার হয়ে যাবে।

থামা তো আর ইকির-মিকির ভাষা ভটকাই। আমি বললাম। তারপর বললাম, তা হলে বলল ঋজুদা। তিতির থাকলে খুশি হত খুব। ওরই বেশি ইচ্ছে ছিল শোনার।

গল্পটা কোনওদিন কাগজে কলমে লেখার ইচ্ছে আছে। মাথার মধ্যে এখনও জমাট বাঁধেনি। বলছি তোদের, শোন। যতক্ষণ এই গল্প বলব, তোরা কেউ কোনও প্রশ্ন করবি না আমাকে। প্রশ্ন করলেই গল্প ছিঁড়ে যাবে। এ-মালা এখনও গাঁথা হয়নি। খড় করেছি শুধু, এরপর মাটি লাগবে, চোখ মুখ থুতনি ভুরু–সব গড়তে হবে। তারও পর রঙ।

ভটকাই বলল, প্রমিস। কথা বলব না একটাও। শুরু করো তুমি, ঋজুদা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *