ঠাকুরদার সিন্দুক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

জয়গোপালবাবু খুশি হয়ে বললেন,পরেশ টেলিফোন করেছিল আপনাকে? তাহলে আর আমি ওর কাছে যাচ্ছিনে। বারোটা পাঁচের লালগোলা প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরব। রানাঘাট জংশনে নেমেই বাস পাব।

 

বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর কর্নেলকে নমস্কার করে পা বাড়িয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন, –ওঁদের সঙ্গে তো আলাপ হল না! দেখছ কাণ্ড? ছ্যা-ছ্যা! আমার ভদ্রতাবোধটুকুও হারিয়ে ফেলেছি।

 

কর্নেল আগে হালদারমশাইয়ের পরিচয় দিতেই জয়গোপালবাবু বিস্ফারিত চোখে নমস্কার করে বললেন,–ওরে বাবা! প্রাইভেট ডিটেকটিভ? জানেন স্যার, হৈমন্তী আমাকে একবার বলেছিল–

 

তার কথা থামিয়ে কর্নেল আমার পরিচয় দিলেন। জয়গোপালবাবু আমাকে নমস্কার করে বললেন,–আমার কী সৌভাগ্য! ওরে বাবা! আপনারা সব কত নামজাদা মানুষ। আমি সামান্য এক চুনোপুঁটি!…

 

জয়গোপালবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি একটু হেসে বললুম,–হালদারমশাই কি এখন ওঁকে ফলো করতে চান?

 

গোয়েন্দাপ্রবর একটিপ নস্যি নিচ্ছিলেন। রুমালে নাক মুছে বললেন,–কর্নেলস্যার যা করতে বলেন, তা করব।

 

কর্নেল হাসলেন না। নিভে যাওয়া চুরুটটা জ্বেলে বললেন,–বাবুগঞ্জে হালদারমশাই যদি যেতে চান, আপত্তি করব না। বরং খুশি হব। তবে ছদ্মবেশে গেলেই ভালো হয়।

 

হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন,–যামু!

 

–আপনি তো সবচেয়ে ভালো পারেন সাধু-সন্ন্যাসী সাজতে।

 

–সাধুর বেশেই যামু!

 

–কিন্তু ঝুলির ভিতরে আপনার লাইসেন্সড রিভলভার থাকবে। আপনার সরকারি আইডেন্টিটি কার্ডও সঙ্গে থাকা দরকার।

 

আমি বললুম,–কিন্তু সেখানে প্রচণ্ড শীত!

 

প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাসলেন,–সাধুরা কম্বল গায়ে জড়ায় না? ধুনি জ্বালে না?

 

–আপনার সেই সিন্থেটিক কাপড়ে তৈরি বাঘছাল, ত্রিশূল আর প্লাস্টিকে তৈরি মড়ার খুলি নিতে ভুলবেন না যেন!

 

হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–বাড়ি গিয়া খাওয়াদাওয়া কইরাই বারাইয়া পড়ুম। বাবুগঞ্জে গিয়া সন্ধ্যার পর সাধুর ছদ্মবেশ ধরুম। জয়গোপালবাবুর বাড়ির কাছাকাছি জায়গা হইলে ভালো হয়। চলি কর্নেলস্যার। চলি জয়ন্তবাবু!

 

কর্নেল বললেন,–যথাসময়ে আমাদের দেখা পাবেন। কিন্তু সাবধান হালদারমশাই! কুকুরের মুণ্ডু যে বা যারা কেটেছে, সে বা তারা শুধু ধূর্ত নয়, নৃশংসও বটে।

 

কর্নেলস্যার! পঁয়তিরিশ বৎসর পুলিশ ছিলাম। ভাববেন না।–বলে গোয়েন্দাপ্রবর সবেগে বেরিয়ে গেলেন।…

 

আমার ফিয়াট গাড়িটা কিছুদিন থেকে বেগড়বাঁই করছিল। গত সপ্তাহে মেকানিকের পাল্লায় পড়ে জব্দ হয়েছে। পরদিন সোমবার সকাল আটটায় বেরিয়ে চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কে গাড়িটা যেন পক্ষীরাজের মতো উড়ে যাচ্ছিল। কর্নেল আমার বাঁদিকে বসেছিলেন। তার গলা থেকে ঝোলানো ক্যামেরা আর বাইনোকুলার। পিঠে যথারীতি আঁটা তাঁর প্রসিদ্ধ কিটব্যাগ, যার ভিতর একজন মানুষের জন্য দরকারি অসংখ্য জিনিস ঠাসা। কোণা দিয়ে উঁকি মারছিল প্রজাপতি ধরার জন্য অদ্ভুত একরকম জালের লম্বা হাতল। মাঝে-মাঝে তিনি বাইনোকুলারে পাখি দেখছিলেন, নাকি অন্য কিছু তা বলা কঠিন। এটা ওঁর এক বাতিক। মাঝে-মাঝে তিনি আমাকে সাবধান করে দিচ্ছিলেন, যেন গতি কমাই।

 

এই রাস্তায় কর্নেলের সঙ্গে কতবার কত জায়গায় গেছি। কিন্তু আমার কিছু মনে থাকে না। ঘণ্টা আড়াই চলার পর তিনি বললেন,–সামনে ডাইনে একটা পিচরাস্তায় ঘুরতে হবে জয়ন্ত।

 

রাস্তাটা সঙ্কীর্ণ। কখনও যাত্রী-বোঝাই বাস, কখনও ট্রাক-লরি-টেম্পো, কখনও বা সাইকেলভ্যানের আনাগোনা। তাই এবার সাবধানে যেতে হচ্ছিল। রাস্তাটা বাঁক নিতে-নিতে চলেছে। দুধারে কখনও গ্রাম, কখনও পাকাধানে ভরা আদিগন্ত মাঠ, দূরে নীলাভ কুয়াশা আর মাঝে-মাঝে জলাভূমি, জঙ্গল, তারপর হঠাৎ ছোট্ট বাজার, বাসস্ট্যান্ড। আধঘণ্টা পরে বাঁ-দিক থেকে আরেকটা পিচরাস্তা এসে এই রাস্তার সঙ্গে মিশে একটু চওড়া হল। কর্নেল বাইনোকুলারে সামনেটা দেখে নিয়ে বললেন,–বাবুগঞ্জ এসে গেছি বলতে পারো। ওই দেখো, বাঁদিকে একটা ছোট্ট নদী। বেহুলা নদীই হবে।

 

বলে তিনি মাথার টুপি খুলে টাকে হাত বুলিয়ে নিলেন। বললুম,–সামনে যা ভিড়ভাট্টা দেখছি, ওর ভিতরে ঢুকলে কি সহজে বেরুতে পারব?

 

কর্নেল বললেন, আমরা বাবুগঞ্জের ভিতরে ঢুকব না।

 

–তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়?

 

–বাবুগঞ্জের পূর্বপ্রান্তে একটুখানি এগোলেই নদীর ধারে সেচদফতরের বাংলো।

 

একটু অবাক হয়ে বললুম,–আপনি কি আগে কখনও এসেছেন?

 

–নাঃ!

 

–তাহলে কেমন করে জানলেন…

 

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–জানা খুবই সোজা। কলকাতার সেচদফতরের এক বড়কর্তাকে ফোন করে রাস্তার হালহদিশ সব জেনে নিয়েছি। তুমি যখন কাল দুপুরে খাওয়ার পর । ডিভানে চিত হয়ে ভাতঘুমে ডুব দিয়েছিলে, তখন এইসব জরুরি কাজ সেরে নিয়েছিলুম। হ্যাঁ–এবার বাঁ-দিকে মোরামবিছানো পথে চলো।

 

বাঁদিকে গাছপালার ভিতরে একতলা-দোতলা বাড়ি আর ডানদিকে শাল-সেগুনের জঙ্গল। জিজ্ঞেস করলুম,–এই জঙ্গলটা কি সরকারি বনসৃজন প্রকল্পের রূপায়ণ?

 

কর্নেল হাসলেন,–বাঃ! বেশ বলেছ। এটা তা-ই। শাল-সেগুন এই মাটির স্বাভাবিক উদ্ভিদ নয়।

 

–তাহলে এ জঙ্গলে বাঘ-ভালুক নেই।

 

–নাঃ! নিরামিষ জঙ্গল বলতে পারো! তবে শীতের প্রকোপে জঙ্গলের তাজা ভাবটা নেই। শরৎকালে এলে ভালো লাগত।

 

কিছুক্ষণ পরে সামনে উত্তরে একটা উঁচু জমির ওপর মনোরম বাংলোটা দেখা গেল। নিচু পাঁচিলের ওপর কাঁটাতারের বেড়া। ভিতরে রঙবেরঙের ফুলের উজ্জ্বলতা। আমাদের গাড়ি দেখতে পেয়েই উর্দিপরা একটা লোক গেট খুলে দিল। নুড়িবিছানোলন পেরিয়ে ডাইনের চত্বরে গাড়ি দাঁড় করালুম। একজন প্যান্ট-শার্ট পরা লোক নমস্কার করে বলল,–কর্নেলসায়েব কি আমাকে চিনতে পারছেন?

 

কর্নেল গাড়ি থেকে নেমে বললেন,–কী আশ্চর্য! সুবিমল, তুমি এখানে এসে জুটলে কবে?

 

–আজ্ঞে গত মার্চ মাসে। মালঞ্চতলার ক্লাইমেট সহ্য হচ্ছিল না। তাই বড়সায়েবকে ধরাধরি করে বাড়ির কাছে বদলি হয়ে এসেছি।

 

–তোমার বাড়ি কি বাবুগঞ্জে?

 

–না স্যার! নদীর ওপারে ওই যে দেখছেন, ঝাঁপুইহাটিতে। তো গত রাত্তিরে ইঞ্জিনিয়ারসায়েব ফোন করে জানালেন, আপনি আসছেন। শুনেই মনটা নেচে উঠল। চলুন স্যার! এদিকটা বেজায় ঠান্ডা!

 

কর্নেল বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই! জয়ন্ত! সুবিমল হাজরা এই বাংলোর কেয়ারটেকার। জলচর। জলচর পাখির খবর ওর নখদর্পণে। সুবিমল! জয়ন্ত চৌধুরীর নাম তুমি শুনে থাকবে। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার বিখ্যাত সাংবাদিক।

 

সুবিমল হাজরা আমাকে নমস্কার করে বলল,–কী সৌভাগ্য! আপনার ক্রাইমস্টোরির আমি ফ্যান!

 

একটু অবাক হয়ে বললুম,–এখানে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা আসে?

 

–কোন পত্রিকা আসে না তাই বলুন স্যার! কর্নেলসায়েব আমাকে আপনার কথা বলেছিলেন যেন! অনুগ্রহ করে এদিকে আসুন আপনারা। গাড়ির চাবি নিশ্চিন্তে চণ্ডীকে দিন। চণ্ডী! সায়েবদের গাড়ি গ্যারেজে ঢুকিয়ে জিনিসপত্র পৌঁছে দাও।

 

একজন গাঁট্টাগোট্টা চেহারার লোক কখন এসে পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল লক্ষ করিনি। সে আমাদের সেলাম দিয়ে গাড়ির ডিকি খুলতে যাচ্ছিল। বললুম,–ডিকিতে কিছু নেই। আমাদের ব্যাগেজ ব্যাকসিটে আছে।

 

বাংলোর দক্ষিণের বারান্দায় রোদ পড়েছে। বেতের কয়েকটা চেয়ার আর টেবিল আছে। কর্নেল সেখানে বসে বললেন,–আচ্ছা সুবিমল! কাগজে পড়েছি, বাবুগঞ্জে কারা নাকি কুকুর-বলি দিয়েছে?

 

সুবিমল হাসতে-হাসতে বলল,–এক ভদ্রলোক রেলে চাকরি করতেন। রিটায়ার করে বাড়ি ফিরে কীসব কাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন। খামোকা যাকে-তাকে ধরে তম্বি করেন, তুমি আমার জুতো চুরি করেছ! পাগল স্যার! পাগল আর কাকে বলে? তার বোন প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করেন। একটা পেল্লায় গড়নের কুকুর পুষেছিলেন। গোপালবাবু–মানে সেই টিচারের দাদা, যিনি রেলে চাকরি করতেন, এসে অবধি যার-তার দিকে কুকুর লেলিয়ে দিতেন। আর কুকুরটাও ছিল বজ্জাত। বাড়ির সামনে দিয়ে কেউ গেলেই তাকে কামড়াতে আসত।

 

–কাউকে কি কামড়েছিল?

 

–কামড়ায়নি। তবে চ্যাঁচামেচি করত। দাঁত বের করে তেড়ে আসত! তাই হয়তো দুষ্টু ছেলেরা রাত্তিরে কুকুরকে কোনো কৌশলে বেঁধে বলি দিয়েছিল। আর তাই নিয়ে গোপালবাবু থানাপুলিশ করে হইচই বাধিয়ে ছাড়লেন। মাথায় ছিট আছে স্যার!

 

এই সময়ে একটা রোগা চেহারার লোক ট্রেতে কফি আর পটাটোচিপস এনে টেবিলে রাখল। সুবিমল বলল,–ঠাকমশাই!

 

ঠাকমশাই নমস্কার করে বললেন,–সুবিমল! আমি তো ইংরিজি জানি না। তুমি সায়েবকে জিজ্ঞেস করা উনি কী খাবেন।

 

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–আমি ঠাকমশাইয়ের মুণ্ডু খাব!

 

ঠাকমশাই সবিনয়ে বললেন,–সায়েব তো ভালো বাংলা জানেন। আর সুবিমল, তুমি গত রাত্তির থেকে আমাকে ভয় দেখাচ্ছ, এক সায়েব আসবেন। তার সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলতে হবে। তা স্যার! আমার মুণ্ডু খেতে তেতো লাগবে। তেতো বোঝেন তো স্যার?

 

কর্নেল তার বিখ্যাত অট্টহাসি হেসে বললেন,–ঠাকমশাই! আমি কলকাতার এক ভেতো-বাঙালি। আমার চেহারা পোশাক-আশাক দেখে লোকে সায়েব বলে ভুল করে।

 

ঠাকমশাই ভাঙা দাঁত বের করে হাসলেন,–কী কাণ্ড! এখন চেহারা দেখে বুঝতে পারছি। তবে হঠাৎ করে দেখলে বোঝবার উপায় নেই কিছু! বাঁচা গেল। সুবিমল! আজ তোমার পাতে কী পড়বে বুঝলে? কচু।

 

বলে বুড়োআঙুল দেখিয়ে তিনি চলে গেলেন। সুবিমল বলল,–ঠাকমশাইয়ের নাম নরহরি মুখুজ্যে। বাড়ি বাবুগঞ্জে। মানুষটি বড় সরল স্যার!

 

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–শুনেছি বাবুগঞ্জের জমিদার ছিলেন মুখুজ্যেরা। ঠাকমশাই তাদের বংশের কেউ নাকি?

 

–সঠিক জানি না স্যার! তবে মুখে তো বড়াই করে বলেন! সম্পর্ক থাকতেও পারে, না-ও পারে। বাবুগঞ্জে অনেক মুখুজ্যে-চাটুজ্যে-বাঁড়ুজ্যে আছেন। কফি ঠিক হয়েছে তো স্যার?

 

–হ্যাঁ। শীতের সময় গরম কিছু দিয়ে গলা ভেজানোই যথেষ্ট। তো তুমি কি বাংলোয় সারাক্ষণ থাকো, নাকি বাড়ি-টাড়ি যাও?

 

সুবিমল একটু হেসে বলল,–বাংলোয় কেউ এলে বাড়ি যাওয়া হয় না। অন্যদিন সন্ধ্যার সময় কেটে পড়ি। সকালে আসি। সাইকেল আছে।

 

–কিন্তু নদী পার হও কী করে? নৌকায়?

 

–না স্যার! আর সে-বাবুগঞ্জ নেই। নদীতে ব্রিজ হয়েছে। বাবুগঞ্জ এখনও ছোটবাবু, মেজবাবু বড়বাবুদের টাউন। এই বাংলোয় বিদ্যুৎ এসে গেছে। টেলিফোনও।

 

বাঃ! আচ্ছা সুবিমল, মুখুজ্যেবংশের জমিদারদের কে নাকি কৃষিফার্ম করেছে এখানে? তোমাদের কলকাতার বড়সাহেব বলছিলেন।

 

–প্রমথ মুখুজ্যে স্যার! ওঁর ফার্মহাউস ওই জঙ্গলের ওধারে। ওখানে নদী বাঁক নিয়ে দক্ষিণে গেছে। সেই বাঁকের ওপরদিকে প্রমথবাবুর ফার্ম। দোমোহানির ওয়াটারড্যাম ওখান থেকে প্রায় পাঁচ কি.মি. পূর্বে।

 

কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে বললেন, তুমি দোমোহানির ড্যামের পাখির খবর বলো সুবিমল। আর জয়ন্ত! ততক্ষণ তুমি ঘরে গিয়ে পোশাক বদলে জিরিয়ে নিতে পারো! তিনঘণ্টা টানা ড্রাইভ করেছ।

 

সত্যিই আমি ক্লান্ত। ঘরে ঢুকে দেখলুম মেঝেয় কার্পেট। দুধারে দুটো নিচু খাট। একটা সোফাসেট। সেন্টার টেবিলে ফুলদানিতে তাজা ফুল, একদিকে ওয়াড্রোব। ঘরটা প্রশস্ত। লাগোয়া বাথরুম উঁকি মেরে দেখে নিলুম গিজার আছে। গরম জলে স্নান করা যাবে।

 

পোশাক বদলে বিছানায় লম্বা হলুম। টের পাচ্ছিলুম, রোদ কমে এলে শীত কী সাঙ্ঘাতিক হয়ে উঠবে। আর শীতের কথা ভাবতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাইয়ের কথা। ভদ্রলোক গতকাল এখানে এসেছেন। সাধু-সন্ন্যাসীর বেশে কোথায় ধুনি জ্বেলে রাত কাটিয়েছেন কে জানে! তবে ওঁর পক্ষে অসাধ্য কিছু নেই। পুলিশজীবনের কত রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি তিনি শুনিয়েছেন। অবশ্য কর্নেলের সঙ্গে তাকে এযাবৎ অনেক অ্যাডভেঞ্চারে বেপরোয়া পা বাড়াতে দেখেছি।

 

এবারকারটা কেমন হবে, এখনও বুঝতে পারছি না। জয়গোপালবাবু যে ছিটগ্রস্ত লোক, তা ঠিক। সুবিমলবাবুর কথায় মনে হল, জুতোচুরি নিয়ে ওঁর একটা পাগলামি আছে। অথচ কর্নেল এত গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপারটা ভেবেছেন কেন কে জানে! কী আছে জয়গোপালবাবুর ঠাকুরদার দলিলে?

 

দেড়টার মধ্যে স্নানাহার সেরে নিয়ে কর্নেল বলেছিলেন,–আজ দোমোহানি জলাধারে পাখি দেখার মতো সময় পাব না। বরং বাবুগঞ্জের ভিতরটা দেখে নেওয়া যাক! সুবিমলকে সঙ্গে নিয়ে বেরুব।

 

আমি বলেছিলুম,–মফস্বলের শহরের যা অবস্থা! ওর ভিতরে আপনার দর্শনযোগ্য কিছু আছে। বলে মনে হয় না। তার চেয়ে গোয়েন্দামশাই কী অবস্থায় কোথায় আছেন, দেখা উচিত।

 

কর্নেল একটু হেসে বলেছিলেন,–পাশে একটা নদী, তখন শ্মশানঘাট সেই নদীর ধারে কোথাও নিশ্চয়ই আছে। সাধুবাবার বেশে হালদারমশাই শ্মশানঘাট বেছে নিতেও পারেন!

 

সেই সময় সুবিমল এসে গেল,–এবেলা কী প্রোগ্রাম করেছেন স্যার?

 

–জয়ন্ত এখানকার শ্মশানঘাট দেখতে চাইছে!

 

সুবিমল গম্ভীর হয়ে বলল,–বাবুগঞ্জের শ্মশানঘাট খুব প্রাচীন। জমিদারবাবুদের পূর্বপুরুষরা জায়গাটা নদীর তলা থেকে পাথরে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে নদীর স্রোতে ধসে না যায়। বুঝুন স্যার! মালগাড়িতে চাপিয়ে বিহার থেকে সেই পাথর আনা হয়েছিল। তারপর গরু-মোষের গাড়িতে চাপিয়ে বাবুগঞ্জ। বুঝুন কী এলাহি কাণ্ড! তারপর ওই শ্মশানকালীর মন্দির! জয়ন্তবাবু দেখার মতো জায়গাই দেখতে চেয়েছেন। স্যার!

 

কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন,–দেখার মতো জায়গা মানে?

 

সুবিমল চাপা গলায় বলল,–শ্মশানকালীর মন্দিরে নরবলি দিত জমিদারের পূর্বপুরুষেরা। শুনেছি, কাকে বলি দেওয়া হবে, তার খোঁজ দিত জমিদারের নায়েব। যে প্রজার খাজনা সবচেয়ে বেশি বাকি পড়েছে, সেই হতভাগাকে রাত্তিরে পাইকরা বেঁধে আনত, স্যার! সে মন্দির ভেঙে গেছে। বটগাছটা গিলে খেয়েছে মন্দির। প্রতিমা তুলে নিয়ে বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেছে ওরা। আর বটগাছের গোড়ায় মন্দিরের ধ্বংসস্তূপে কত যে মড়ার খুলি আছে-না দেখলে বিশ্বাস করবেন না। কখনও-সখনও কোনো সাধুবাবা এসে খুলিগুলি জড়ো করে বসে থাকে। ধুনি জ্বেলে চোখ বুজে মন্ত্র পড়ে।

 

কথাটা শুনতে পেয়ে চণ্ডী বলল,–কাল সন্ধ্যাবেলায় দেখেছিলুম এক সাধুবাবা এসে জুটেছেন।

 

কর্নেল আমার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন,–তাহলে জয়ন্তের ইচ্ছে পূর্ণ হোক। সুবিমল! কোথায় সেই শ্মশানঘাট? শর্টকাটে যেতে চাই কিন্তু!

 

সুবিমল বলল,–তাহলে নদীর ধারে বাঁধের পথে চলুন। ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে একটুখানি এগোতে হবে।

 

পূর্ববাহিনী বেহুলার দক্ষিণ তীরে বাঁধের দুধারে ঘন গাছপালা আর ঝোঁপঝাড়, একটা জেলেবসতি বাঁদিকে চোখে পড়ল। একটা একতলা ঘরের মাথায় টাঙানো আছে ‘বাবুগঞ্জ-ঝাঁপুইহাটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, লেখা সাইনবোর্ড। কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পর নদীর ব্রিজের এদিকটায় দুধারে দোকানপাট আর ভিড়। ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে আবার বাঁধ এবং গাছের সারি। তারপর নদী যেখানে উত্তরে বাঁক নিয়েছে, সেখানে উঁচু জমির ওপর একটা বিশাল বটগাছ। কর্নেল মাঝে-মাঝে বাইনোকুলারে হয়তো পাখি দেখছিলেন। সুবিমল বলল,–এসে গেছি স্যার!

 

চওড়া উঁচু জায়গাটা ছাইভর্তি। ঘাসে ঢাকা বটতলার ওদিকটায় ইতস্তত চিতার ছাই। সেই ছাই উত্তরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। বাঁধ থেকে সেখানে কয়েক পা এগিয়ে তারপর ‘সাধুবাবা’ কে চোখে পড়ল। সামনে ধুনি জ্বেলে গায়ে কম্বল জড়িয়ে তিনি বসে আছেন। হা-গোয়েন্দাপ্রবরই বটে! আমাদের দেখামাত্র তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন।

 

সুবিমল একটু দূরে হাঁটু মুড়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করছে দেখে হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু · কর্নেল চোখের ইঙ্গিতে আমাকে দূরে থাকতে বললেন। আমি আস্তে বললুম,–সুবিমলবাবু! সাধুবাবা খুব রাগী মানুষ মনে হচ্ছে। পাশেই ত্রিশূল পোঁতা। কিছু বলা যায় না, হঠাৎ ত্রিশূল ছুঁড়ে মারতে পারেন। চলুন, ওপাশে ওই নিমগাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। কর্নেলের ব্যাপার তো জানেন! উনি সাধুদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তুলতে পারেন।

 

নিমতলায় দাঁড়িয়ে লক্ষ করলুম। কর্নেল অবিকল সুবিমলের মতো হাঁটু মুড়ে নমো করলেন। তবে টুপিপরা মাথা মাটিতে ঠেকানোর অসুবিধে আছে। তারপর দেখলুম, দুজনে কী সব কথা হচ্ছে।

 

সুবিমল সতর্কভাবে একটু হেসে ফিসফিস করে বলল,–বুঝলেন জয়ন্তবাবু! সাধুবাবা কর্নেলসায়েবকে বিদেশি সায়েব ভেবেছেন। আমি সাধুবাবাদের এই ব্যাপারটা দেখেছি। সায়েব-মেমদের খাতির করে।

 

একটু পরে কর্নেল এসে বললেন,–সাধুবাবার আশীর্বাদ নিয়ে এলুম।

 

আমি বললুম,–তাহলে আমিও আশীর্বাদ নিয়ে আসি?

 

কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–সাধুবাবা প্রতিদিন মাত্র একজনকে আশীর্বাদ করেন। তারপর যারা যায়, তাদের অভিশাপ দেন। ভাগ্যিস আজ সারাদিন ওঁর কাছে কেউ যায়নি। নইলে আমাকে অভিশাপ দিতেন। এ এক সাঙ্ঘাতিক সাধু। চলোলা সুবিমল। এখান থেকে কেটে পড়ি।

 

সুবিমল বাঁধে উঠে বলল,–জয়ন্তবাবু নিশ্চয় মড়ার খুলিগুলো দেখতে পেয়েছেন?

 

বললুম,–হ্যাঁ! দেখলুম, কত খুলি গাছের শেকড়ে আটকে আছে।

 

সুবিমল হঠাৎ ফুঁসে উঠল। ওই হতভাগা প্রজাদের অভিশাপেই তো মুখুজ্যেদের জমিদারি ধ্বংস হয়ে গেছে।

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জমিদারিপ্রথা উচ্ছেদ করা হয়েছিল স্বাধীনতার পরে, হতভাগ্যদের অভিশাপ দেরি করে লেগেছিল।

 

–দেরি কী বলছেন স্যার! প্রথম মুখুজ্যের ঠাকুরদার আমলেই নাকি সাংঘাতিক কাণ্ড হয়েছিল। তখন আমার জন্মই হয়নি। ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের কথা বইয়ে পড়েছি। আপনারা তো আমার চেয়ে বেশি জানেন। বাবার মুখে শুনেছিলুম, আগস্ট মাসে তখন প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল ক’দিন ধরে। একরাত্রে স্বদেশিবাবুরা জমিদারের খাজাঞ্চিখানা লুঠ করেছিলেন। অনেক ধনরত্নও নাকি লুঠ হয়েছিল। শোনা কথা, জয়গোপালবাবুর ঠাকুরদা ছিলেন খাজাঞ্চিবাবু। ঝড়জলের জন্য তিনি বাড়ি যেতে পারেননি। তাঁকে বেঁধে রেখে লুঠ চলেছিল। শেষরাত্তিরে বিনয়বাবু-খাজাঞ্চি, কোনোভাবে বাঁধন খুলে পালিয়ে আসেন। তবে শোনা কথা স্যার। খাজাঞ্চিবাবু নাকি বিপ্লবীবাবুদের লুঠ-করা জুয়েলসের কিছুটা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। তাই নিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড বেধেছিল। পুলিশ বিনয়বাবুকে জেল খাটাতে চেয়েছিল। প্রমাণের অভাবে তিনি খালাস পান। তবে জমিদারবাবুদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন।

 

কর্নেল বললেন,–তারপর?

 

–বছর আট-দশ পরে বিনয়বাবু বাবুগঞ্জে ফিরে আসেন। জমিদারবাবুদের অবস্থা ততদিনে পড়ে গেছে। দালানকোঠা মেরামতের অভাবে ধ্বসে পড়েছে। ওই যে বলছিলুম, অভিশাপ!

 

–তাহলে জয়গোপালবাবুর ঠাকুরদা নিরাপদে বাড়ি-ঘর তৈরি করে বসবাস করতে পেরেছিলেন?

 

–হ্যাঁ স্যার। এখনও সেই তিনকামরা একতলা বাড়ি আছে।

 

–চলো সুবিমল! সেই বাড়িটা বাইরে থেকে দেখে বাবুগঞ্জের ভিতর দিয়ে বাংলোয় ফিরব। ব্রিজের কাছে আসতেই দেখলুম, একটা লোক লাঠি হাতে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে এদিকে আসছে। গায়ে সোয়েটার। মাথায় মাফলার জড়ানো। আর পরনে যেমন-তেমন প্যান্ট, পায়ে চপ্পল, লোকটা যে নেশা করেছে, তা বোঝা যাচ্ছিল। সুবিমলকে দেখেই সে বলে উঠল,–এই যে বাবা হারাধন।

 

সুবিমল ধমকের সুরে বলল,–মাতলামি করবে না প্রবোধদা! দেখছ না আমার সঙ্গে কারা আছেন?

 

জয়গোপালবাবুর মুখে তার পিসতুতো ভাই প্রবোধের কথা শুনেছিলুম। এই সেই প্রবোধ। সে জড়ানো গলায় হেসে বলল,–মাইরি সুবিমল! আমার খালি ভুল হয়! ছেলেকে দেখলেই বাপের নাম বলে ফেলি। হ্যাঁ! তুমি ঝাঁপুইহাটির হারাধনের ছেলে সুবিমল। বাবা সুবিমল! সাবধান! জুতো হারিয়ো না যেন! জুতো হারাতে-হারাতে শেষে নিজেই হারিয়ে যাবে! মাইরি বলছি! আমাদের গোপাল! জয়গোপালের জুতা হারাত না? শেষে আজ শুনি সে নিজেই হারিয়ে গেছে। হিমি কেঁদেকেটে থানাপুলিশ করে বেড়াচ্ছে। এই বাবা সায়েব! গিভ মি টেন রুপি! ওনলি টেন।

 

কর্নেল বললেন,–জয়গোপালবাবু হারিয়ে গেছেন। আপনি তাকে খুঁজে বের করুন।

 

মাতাল প্রবোধ হিহি করে হেসে উঠল।–ওরে বাবা! এ তো দিশি সায়েব দেখছি! ধুস!

 

কর্নেল আমাকে অবাক করে তাকে একটা দশটাকার নোট দিয়ে বললেন,–জয়গোপালবাবু। আপনার মামার ছেলে। তাকে খুঁজে বের করে সুবিমলকে গোপনে জানালে একশো টাকা বকশিশ পাবেন। কেউ যেন জানতে না পারে।

 

টাকা পেয়ে প্রবোধ যেন হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপর সে সেলাম ঠুকে চাপাস্বরে বলল,–মাইরি, একশো টাকা দেবেন?

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–দেব।

 

–মা কালীর দিব্যি?

 

–মা কালীর দিব্যি।

 

মাতাল প্রবোধ ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে ভিড়ের মধ্যে গিয়ে মিশল। শেষ-বিকেলে তখন ব্রিজের মুখে যানবাহন আর তুমুল ভিড়। কারণ বাবুগঞ্জের উত্তরপ্রান্তে ব্রিজের কাছাকাছি দুধারে দোকানপাট। নদীর ওপারের গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে লোকেরা এসে শেষবেলায় কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত। গরু-মোষের গাড়ি, সাইকেলভ্যান, টেম্পো, লরি-বাস ব্রিজের মুখে এসে জট পাকিয়েছে।

 

ভিড় পেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর সুবিমল কর্নেলকে বলল,–ওই মাতালটাকে টাকা দিলেন স্যার! ও আবার মদের দোকানে গিয়ে মদ গিলবে।

 

কর্নেল বললেন,–সুবিমল! এবার জয়গোপালবাবুর বাড়ি চলে!

 

–সামনে ডানদিকের গলিরাস্তায় ঢুকতে হবে। কিন্তু আপনি কি প্রবোধদার কথা বিশ্বাস করেছেন?

 

-কিছু বলা যায় না। প্রবোধের কথা সত্য হতেও পারে।

 

বিকেলের আলো দ্রুত কমে আসছিল। গলির দুপাশে মাটি বা ইটের একতলা বাড়ি। কিন্তু গলিপথটা নির্জন। একটু পরে দুধারে পোড়ো জমি চোখে পড়ল। ঝোঁপ-জঙ্গল গজিয়ে আছে। তারপর একটা পুরোনো একতলা ইটের বাড়ি দেখতে পেলুম। সামনে খানিকটা জায়গায় মাটি নগ্ন।

 

সেখানে দাঁড়িয়ে সুবিমল বাঁদিকে নিচু পাঁচিলে ঘেরা জমিটা দেখিয়ে বলল,–ওখানে স্যার মুখুজ্যেমশাইয়ের এক শরিক অবনীবাবু গার্লস স্কুল তৈরি করবেন। কিন্তু জমিটা জবরদখল। জয়গোপালবাবু যখন রেলে চাকরি করতেন, তখন হিমিদি–মানে হৈমন্তীদি, উনি স্যার প্রাইমারি স্কুলের টিচার–তো উনি অবনীবাবুর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেননি। মামলা করার সাহস হয়নি। পঞ্চায়েতে নালিশ করেছিলেন। শেষে পঞ্চায়েত বলেছিল, জমিটা খালি পড়ে আছে। ওটা গার্লস স্কুলের জন্য দান করে দাও।

 

এই সময় বাড়ির দরজা খুলে একজন প্রৌঢ়া বেরিয়ে বলল,–ওখানে কারা গো?

 

সুবিমল এগিয়ে গিয়ে বলল,–সরলামাসি! আমি সুবিমল! হিমিদি বাড়ি নেই বুঝি?

 

–অ! সুবিমল? এই দ্যাখো না বাবা কী বিপদ! আমাকে পাহারায় রেখে বাবুদিদি গেছেন থানায়। সেই দুপুরে গেছেন। এখনও ফিরছেন না। আমি শুধু ঘর-বার করছি।

 

–কী বিপদ সরলামাসি?

 

–তুমি শোনোনি? সারা বাবুগঞ্জ, শুনেছে। বিপদ বলে বিপদ! অমন এক জলজ্যান্ত লোক গোপালবাবু কলকাতা গেলেন। গিয়ে ফেরার পথে হারিয়ে গেলেন!

 

–হারিয়ে গেলেন মানে?

 

–হ্যারিয়ে গেলেন বইকী। রানাঘাট ইস্টিশনে বাবুদাদাকে ট্রেন থেকে কাল বিকেলে নামতে দেখেছিল হরেন-গয়লা। শুধু সে একা দেখেনি। আরও দেখেছিল মুসলমান পাড়ার মকবুল। বাবুদিদির কান্নাকাটি আর থানা-পুলিশ করার খবর পেয়ে তারা এসে বলে গিয়েছে। পুলিশকেও বলেছে। এদিকে সারাটা রাত্তির গেল। সকাল গেল। বাবুদাদার খবর নেই। বাবুদিদির মাসতুতো দাদা কলকাতার পুলিশ। তাকে বাবুদিদি টেলিফোনে খবর দিয়েছিলেন। তিনি দুপুরবেলা এসে বাবুদিদিকে নিয়ে আবার থানায় গেছেন।-বলে প্রৌঢ়া আমাদের দিকে তাকাল।

 

সুবিমল বলল,–এনারা কলকাতার সায়েব। এখানে বেড়াতে এসেছেন। আমি যেখানে কাজ করি, সেই বাংলোতে উঠেছেন। স্যার! সরলামাসির জেলেপাড়ায় বাড়ি। দেখলে বুঝবেন না মাসির কী ক্ষমতা! ওদের মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অফিসে দিনের বেলা ডাকাত পড়েছিল। মাছ বিক্রির টাকা সেদিন বিলি হওয়ার কথা। খবর পেয়ে নৌকায় চেপে ডাকাত এসেছিল। আর এই মাসি এক ডাকাতকে ধরে উপুড় করে ফেলেছিল। বেগতিক দেখে অন্য ডাকাতরা পালিয়ে যায়।

 

সরলা বলল,–ওসব কথা থাক বাবা সুবিমল। এই বিপদ নিয়ে আমার মাথার ঠিক নেই। অ্যাদ্দিন বাবুদাদা যেখানে যেতেন জুতো হারিয়ে আসতেন। ছেলেছোকরারা ঠাট্টা-তামাশা করত। এখন বাবুদাদা নিজেই কোথায় হারিয়ে গেলেন! রানাঘাট হাসপাতাল থেকে বাবুগঞ্জ পর্যন্ত যত ছোট-বড় হাসপাতাল আছে খোঁজ নিয়েছে পুলিশ। পাত্তা নেই।

 

কর্নেল বললেন,–জয়গোপালবাবুর কি কোনো শত্রু আছে এখানে?

 

–অমন ভোলাভালা মানুষের কে শত্রু থাকবে সায়েবকবা? বাবুদাদা রেলের চাকরি শেষ করে নিজের বাবার বাড়িতে এসে ঠাই নিয়েছিলেন। ওনার বোন অ্যাদ্দিন বাড়িখানা যত্ন করে আগলে রেখেছেন। ধরুন, বাবুদিদিরও তো বয়েস হয়েছে। ছেলেপুলে নেই। আর কদ্দিন চাকরি করবেন? আপদে-বিপদে পড়লে আমাকে খবর পাঠান, আসি। পাশে এসে দাঁড়ালে উনিও মনে জোর পান। কিন্তু এ কী হল বুঝতে পারছি না।

 

কর্নেল বললেন,–সুবিমল! এই বাড়ির দরজায় কারা নাকি কুকুরের মুন্ডু কেটে ঝুলিয়ে ছিল–তুমিই বলছিলে!

 

সুবিমল কিছু বলার আগেই সরলা বলল,–আজ্ঞে হ্যাঁ সায়েববাবা। বাবুদিদির পোষা কুকুর। কালো রঙের জন্য কালু নামে তাকে ডাকতেন। রাতবিরেতে বাড়ি পাহারা দিত, পেল্লায় কুকুর গোয় বাঘের মতো গজরাত।

 

কর্নেল বললেন,–সুবিমল বলছিল দুষ্টু ছেলে-ছোকরাদের কীর্তি।

 

সরলা চোখ বড় করে ক্রুদ্ধস্বরে বলল,–ছেলে-ছোকরাদের সাধ্য কী রাত্তিরে তার কাছে যায়? সায়েববাবা! এ কাজ বজ্জাত লোকেদের। পাশেই দশকাঠা জায়গা গিলে খেয়ে আশ মেটেনি। এখন বাড়িখানা গিলে খাওয়ার মতলব করেছে।

 

সুবিমল বলল,–কালুকে মেরে বাড়ি দখল করবে কী করে? সরলামাসি! তুমি কী বলছ?

 

সরলা চাপাস্বরে বলল,–বাবুদিদি বলছিল, কালুকে মারার পর রোজ রাত্তিরে জানালার পিছনে কারা এসে ভূতপেরেতের গলায় কীসব বলে। তখন বাবুদিদি বাড়িতে ইলেকটিরি আলো জ্বেলে দিয়ে বাবুদাদাকে ডাকাডাকি করেন। বুঝলে বাবারা? কাল সন্ধে হয়ে গেল, বাবুদাদা কলকাতা থেকে ফিরলেন না। তখন ওই গলির মুখে মন্ডলবাবুর ছেলে বিট্টুকে বাবুদিদি পাঠিয়েছিলেন। ওঁর ছাত্তর বিট্টু। সে আমায় ডেকে এনেছিল। তারপর রাত্তিরে ওই ভূতপেরেতের উৎপাত। জানলা খুলেই টর্চবাতি জ্বালালুম। কাকেও দেখতে পেলুম না, দৌড়ে পালানোর শব্দ শুনলুম। তখন চেঁচিয়ে বললুম, ওরে বদমাশের দল! আমি সেই ডাকাত-ধরা মেয়ে সল্লা-মেছুনি! এবার চেপে ধরব না, মাছবেঁধা করে বিধব।

 

কর্নেল বললেন, ভূতপেরেতের গলায় কী বলছিল তারা, বুঝতে পেরেছ?

 

সরলা বলল,–সবকথা বুঝতে পারিনি। একটা কথা কানে আসছিল। জুতো।

 

–জুতো?

 

–আজ্ঞে হ্যাঁ সায়েববাবা! জুতো!

 

সুবিমল হাসল,–তাহলে দুষ্টু ছেলেদের কাজ!

 

–ছেলেদের অমন গলার স্বর হয় না। আর পায়ের শব্দও অত জোরালো হয় না। পিছনের দিকে গলির মুখে ততক্ষণে আলো জ্বলে উঠেছে। কাছে ও দূরে শাঁখ বাজছিল।

 

কর্নেল বললেন,–সরলা! বাড়ির আলো জ্বালবে না?

 

সরলা এতক্ষণে কাপড়ের আড়াল থেকে টর্চ আর একটা ধারাল হেঁসো বের করে বলল, ঘরের ভেতর আলোর সুইচ। বাবুদিদি সব ঘরে তালা এঁটে গিয়েছেন।

 

বলেই সে আঙুল তুলল,–ওই বাবুদিদিরা আসছেন!

 

ঘুরে দেখলুম, সরলার বয়সি এক মহিলা আর একজন প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার পরা ভদ্রলোক গলিপথে এগিয়ে আসছেন। কাছে এসে সেই ভদ্রলোক কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন, স্যার আপনি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *