সুন্দর বিভীষিকা (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

আমার এই বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার সম্পর্কে সব বলতে গেলে একখানা আঠারো পর্ব মহাভারত হয়ে পড়ার ভয় আছে। আইন-আদালত সংক্রান্ত পত্র পত্রিকা এবং নানান জায়গায় পুলিশ জার্নালে যারা চোখ বুলিয়েছেন, তারাই জানেন লোকটা কে বা কী।

 

আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরনো দলিল-দস্তাবেজ হাতড়ে যাঁরা যুদ্ধের ইতিহাস লিখতে চান, আফ্রিকা ও বর্মাফ্রন্টে মাঝে মাঝে এক যোদ্ধার উল্লেখ পাবেন–তার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। উনিশশো বিয়াল্লিশে বর্মায় যে মার্কিন গেরিলাদলটি জাপানিদের পিছনে গিয়ে চোরাগোপ্তা লড়াই করেছিল, তাদের রেকর্ডেও এই নাম পাওয়া যাবে। তখন উনি ছদ্মবেশে বর্মিদের গ্রামে থাকতেন এবং গেরিলাদলটিকে প্রচুর খবরাখবর যোগাতেন।

 

যুদ্ধ শেষ হল। তারপর একদা ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। তারপর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার অবসর নিলেন। এবার তার খ্যাতি ছড়াল প্রকৃতিবিদ হিসেবে। শিকারের নেশা বরাবর ছিল। সেই সুবাদে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে উদ্ভিদ, পোকা মাকড় আর পাখি নিয়ে খোঁজখবর করতেন। অবসর নেবার পর এটাই হয়ে দাঁড়াল একটা বড় নেশা। দেশবিদেশের পত্রপত্রিকায় এসব ব্যাপারে প্রবন্ধ লিখতেন। বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিতেন। অনেক তর্কবিতর্ক হত। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার তাদের সরজমিনে নিয়ে গিয়ে নিজের প্রতিপাদ্য বিষয় প্রমাণ করে ছাড়তেন–এমনি জেদী মানুষ তিনি।

 

তখন অবশ্য আমার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। হবার কথাও না। আমি কলকাতার এক প্রখ্যাত দৈনিক কাগজের রিপোর্টার। কাজের সূত্রেই এমন এক সাংঘাতিক ঘটনার মুখোমুখি গিয়ে পড়লুম, যার পরিণামে নিজেরই প্রাণ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ল এবং কর্নেল ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল।

 

সে ছিল একটা আন্তর্জাতিক গুপ্তচর চক্রের ব্যাপার। স্থানীয় এক প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাদের যোগসাজশ ছিল। সেটা দৈবাৎ আমি আবিষ্কার করি এবং আমার সহকর্মী এক ফটোগ্রাফার খুন হয়ে যায়। আমাকেও শাসানো হয়। পুলিশ খুব একটা সুবিধে করতে পারছিল না। কারণ ওই নেতার প্রভাব ছিল প্রচণ্ড। অথচ আমার কাছে তেমন কোনো প্রমাণ ছিল না। যেটুকু ছিল, তা ফটোগ্রাফার বন্ধুটির ক্যামেরার মধ্যে ফিল্মে। সে খুন হবার সময় ফিল্মটাও খুনীরা হাতিয়ে নেয়।

 

যাই হোক, পুলিশ যখন খুনটা নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে, তখনই প্রথম কর্নেলের নাম আমি শুনি। প্রথমে ভেবেছিলুম, উনি কোনো গোয়েন্দা অফিসার। পরে জানলুম, না–শৌখিন গোয়েন্দা। কিন্তু পুলিশ মহলে ওঁর সুনাম প্রচণ্ডশেষ অব্দি কর্নেলের সহায়তায় আন্তর্জাতিক গুপ্তচরচক্র ধরা পড়ল এবং সেই রাজনৈতিক নেতাকেও পাকড়াও করা হল। আমাদের কাগজের বিক্রিসংখ্যা দু’লাখ থেকে রাতারাতি তিন লাখে দাঁড়াল। কর্নেলের নাম এবার সাধারণ মানুষও জানতে পারল। এবং দেখতে দেখতে আমিও ওঁর ন্যাওটা হয়ে উঠলুম।

 

ঠিক কবে থেকে এবং হঠাৎ কীভাবে উনি গোয়েন্দা হয়ে উঠলেন, আমাকে খুলে বলেননি। প্রশ্ন করলে রহস্যময় হেসেছেন শুধু। তবে আমিও উঁদে রিপোর্টার। আবছা অনুমান করেছি–অন্তত কীভাবে উনি ঘুঘু গোয়েন্দা হয়ে গেলেন।

 

প্রকৃতিবিদের পক্ষে সেটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। পোকামাকড়ের আচরণ পর্যবেক্ষণ কিংবা দুর্লভ জাতের পাখির পিছনে ঘুরে বেড়ানোতে তাদের প্রায় গোয়েন্দাগিরিই করতে হয়। কত সময় যায়, কত ধূর্তামির দরকার হয় এসব কাজে, কহতব্য নয়।

 

অবশ্য উনি বলেন–দেখ জয়ন্ত, একবার একটা মাকড়সার আচরণ দেখতে দেখতেই আমার গোয়েন্দাগিরি শেখা হয়ে গেছে। আমার কতকগুলো দুর্লভঁজাতের পোকামাকড়ের সংগ্রহ ছিল। সেবার প্রায়ই দেখতুম, একটা করে উধাও হয়ে • যাচ্ছে। কিন্তু সারাক্ষণ পাহারা দিয়েও ধরতে পারতুম না, এর রহস্যটা কী। অবশেষে আবিষ্কার করলুম, আমার কোটের মধ্যেই একটা মাকড়সা থাকে। এবং আশ্চর্য জয়ন্ত, আমার হাত দিয়েই সে খুনটা সেরে লাশ গুম করে। বুঝতে পারলে না? কোটের হাতা বেয়ে সে এগিয়ে কাঁচের জারে ঢোকে এবং…

 

বাকিটা বলার দরকার ছিল না। তবে কর্নেল প্রায়ই খুনের প্রসঙ্গে তাঁর বিচিত্র মাকড়সাতত্ত্ব আওড়ান। এইসব তত্ত্বটত্ব আমার সয় না। যদি নিছক তত্ত্ববাগীশ হতেন, তাহলে তো বন্ধুত্ব টিকতই না। আসলে উনি একজন ভ্রমণরসিকও বটে। আমার মধ্যেও এই ভ্ৰমণবাতিক আছে প্রচণ্ড। মাঝে মাঝে আমরা দু’জনে আজকাল বেরিয়ে পড়ি। জঙ্গলে পাহাড়ে সমুদ্রে যাই। কিন্তু কথায় আছে? অমুক যায় বঙ্গে তো কপাল যায় সঙ্গে। গিয়েই পড়তে হয় খুনের পাল্লায়। কর্নেল বলেন–আমার খুনের কপাল। তারপর গোয়েন্দাপ্রবর আর চুপ করে থাকেন না। স্বমূর্তিতে বেরিয়ে পড়েন।

 

এমনি একটি ঘটনা এখানে বলছি।…

 

তখন আমি তরাই অঞ্চলের বনেজঙ্গলে ভুতুড়ে চরিত্রের এই সঙ্গীর পাল্লায় পড়ে টোটো করে ঘুরছি। খাওয়া নেই, নাওয়া নেই, পিঠে পয়েন্ট দুশো পঞ্চাশ হাল্কা ম্যাগনাম অ্যান্ড ম্যাগনাম রাইফেল বেঁধে শুধু ঘোরা আর হন্যে হওয়া। সামনে কোনো বধ্য জানোয়ার দেখলেও রাইফেল তাক করার উপায় নেই। আমার বিদঘুটে সঙ্গীটি অমনি কাঁধে থাবা হাঁকড়ে কড়া দৃষ্টিতে তাকান। অবাক লাগে। এই বুড়ো বয়সে ভদ্রলোক অমন দৈত্যের মতো জোর পেলেন কোথায়… আর মোটে এক ফ্লাস্ক চা ও কয়েকটা রুক্ষ বিস্কুট গিলে তিনি কখনো হুমড়ি খেয়ে, কখনো বুকে হেঁটে, কখনো লাফ দিয়ে হীরাকুণ্ডার জঙ্গল পাহাড় তুলকালাম করে ফেলেন। উদ্দেশ্য এক দুর্লভ জাতের পাখির আস্তানা আবিষ্কার। বাইনোকুলার, ক্যামেরা আর কী সব আজগুবি যন্ত্র ওঁর সঙ্গে রয়েছে। প্রত্যেকটাই সর্বশেষ মডেলের এবং বিদেশী জিনিস। আমাকে ক্লান্ত দেখলেই উনি একটু হেসে বলেন–ডার্লিং জয়ন্ত, সামনের ওই পাহাড়টা দেখছ-ওটার সানুদেশে নির্মল জলের ঝর্না আছে। সেখানে গিয়ে আমরা বসব এবং বিশ্রাম করব।

 

এমন করে সেই স্যাঁতসেঁতে সেপ্টেম্বর মাসের এক বিকেলে তিনি আমাকে এমন এক জায়গায় তুললেন, যা সেই বিশাল জঙ্গলে এক আশ্চর্য বস্তু।

 

প্রথমেই থ বনে গেলুম, যখন দেখলুম একফালি চমৎকার পিচের রাস্তায় আমরা এসে পড়েছি। রাস্তাটা অবিশ্বাস্য লাগছিল। সারাদিন কোথাও যেখানে সভ্যতার এতটুকু চিহ্ন দেখিনি, সেখানে যেন আলাদিনের জাদু-পিদিমের কারচুপিতে আমার বৃদ্ধি বন্ধুটি এই চমৎকার সভ্যতা সৃষ্টি করে বসলেন। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে উনি বললেন-জয়ন্ত, এই জঙ্গলে আরো অনেক আশ্চর্য জিনিস তোমাকে দেখব। চলে এস।

 

রাস্তাটা সংকীর্ণ। ঘুরে ঘুরে একটা পাহাড়ের গা-বেয়ে উঠে উত্তরে মিলিয়ে গেছে। কিন্তু উনি আমাকে আরও অবাক করে হঠাৎ দৌড়তে শুরু করলেন। বুঝলুম, সেই উড্ডাক নামক দুর্লভ প্রজাতির পাখিটি–যাকে অনুসরণ করে সারাটি দিন কেটে গেল, আবার তাকে দেখতে পেয়েছেন। পাখিটার স্বভাব বড় অদ্ভুত। খুব জোর উড়তে পারে না এবং বার বার উঁচু গাছের মগডালে বসে পড়ে। সেইসঙ্গে বারকতক ডেকে নিজের অস্তিত্বও ঘোষণা করে। আমার বন্ধুর মতে, বেচারা সঙ্গিনীর খোঁজে বেড়াচ্ছে। যাই হোক, এবার যখন উনি দৌড়লেন, বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলুম। এই রাস্তা ছেড়ে আর একচুল নড়তে রাজি নই।

 

তারপর দেখলুম, উনি হঠাৎ রাস্তা ছেড়ে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া খাদের দিকে চলেছেন। সবখানেই ঝোঁপঝাড় আর উঁচুগাছের জঙ্গল। একটু পরে ওঁকে হারিয়ে যেতে দেখলুম। ভেবেছিলাম, পিছু ফিরে আমাকে ডাকবেন কিন্তু একবারও পিছু ফিরলেন না। বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

 

তখন আমি রাস্তার ধারে একটা পাথরের ওপর বসে সিগারেট ধরালুম এবং বিকেলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে চোখ রাখলুম। সেই সকালে বনদফতরের বাংলো থেকে বেরোবার পর এতক্ষণ অব্দি এই সৌন্দর্যের দিকে তাকাবার সুযোগ পাইনি। মনও ছিল না। পশ্চিমের পাহাড়শ্রেণীর চূড়া ছুঁয়ে সূর্য নরম গোলাপী রোদ ছুঁড়ে দিচ্ছে আমার দিকে। উত্তরের পাহাড়টা ন্যাড়া। তার ধূসর পাথুরে চেহারা খুব শান্ত আর অমায়িক দেখাচ্ছে। কেউ বলে না দিলেও মনে হল, খুব সম্ভব ওদিকে আর একটু এগোলেই নেপালের সীমানা পড়বে।

 

সূর্য পাহাড়ের আড়ালে নামল। ধূসর হয়ে উঠল সব আলো। এবার একটু উদ্বিগ্ন হলুম। বুড়ো তো এখনও ফিরলেন না। আমাদের এখন সাত মাইলের বেশি পথ ভেঙে বাংলোয় পৌঁছতে হবে। আর পথ মানে কী? পথটথের। কোনো ব্যাপার নেই। তার ওপর জন্তুজানোয়ার বেমক্কা হানা দিতে পারে। রাইফেল আর টর্চ অবশ্য আছে সঙ্গে। কিন্তু আচমকা কিছু ঘটলে তা কাজে। লাগাতে পারব কি না বলা কঠিন।

 

দিনের আলো খুব শিগগির ফুরিয়ে যাচ্ছিল। ক্রমশ উদ্বেগ বাড়ছিল আমার। হঠাৎ মনে পড়ল, ওঁর সঙ্গে তো কোনো অস্ত্রশস্ত্র নেই! সচরাচর কিছু জন্তু ঠিক এই সময় রাতের শিকারের বউনিতে বেরিয়ে পড়ে। জঙ্গলের অভিজ্ঞতা যতই থাক, নিরস্ত্র মানুষের পক্ষে কি এমন ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হচ্ছে? তাছাড়া, গাছপালার ওপর এখন অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। উড্ডাকটা দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। আর চুপ করে থাকা গেল না। মরিয়া হয়ে ডাক দিলুম কর্নেল! কর্নেল-সায়েব! আমার ডাক পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলল। কিন্তু কোনো সাড়া এল না।

 

এমন মানুষ কর্নেল যে বোকার মতো এখনও পাখির পিছনে ঘুরছেন, মনে হয় না। নাকি উনি পথ হারিয়ে ফেলেছেন? পথ হারাবার সম্ভাবনা ওঁর খুবই কম। কারণ এই অরণ্য এলাকার প্রতি ইঞ্চি যে ওঁর চেনা, তার প্রমাণ আজ দুদিন ধরে পেয়ে যাচ্ছি। তবে কি উনি পা ফসকে খাদে পড়ে গেছেন? ভাবতেই গা শিউরে উঠল। রাস্তার যেখানটা দিয়ে উনি নেমেছেন, সেখানটা বেশ ঢালু হয়ে গেছে। বোঝা যাচ্ছিল, ওদিকে গভীর খাদ আছে। কিন্তু দেখতে দেখতে অন্ধকার এত ঘন হয়ে উঠল যে সেপথে আমার পক্ষে যাওয়া এখন অসম্ভব। এতক্ষণে বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ করে উঠল।

 

আবার মরিয়া হয়ে হাঁক দিলুম কর্নেল! কর্নেল-সায়েব! আবার পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলতে তুলতে ডাকটা মিলিয়ে গেল। কোনো সাড়া পাওয়া গেল না! রাস্তাটা অস্বাভাবিক নির্জন। এতক্ষণ ধরে কোনো মানুষ বা গাড়িও আসেনি। টর্চটা বের করে উপরে নিচে চারপাশে আলো ফেলে আর একটা হাঁক দিলুম-কর্নেলসায়েব! তবু কোনো সাড়া নেই। এবার উদ্ভ্রান্ত হয়ে উত্তরের দিকে রাস্তা ধরে ডাকতে ডাকতে দৌড়লুম। এসময় কেউ আমাকে দেখলে ঠিক পাগলই ভাবত।

 

কিছুটা এগিয়ে রাস্তা পাহাড়ের দেয়াল পাশে নিয়ে এবার পশ্চিমে ঘুরেছে। তারপর পূর্বে মোড় নিয়েছে। যেখানে পাহাড়টা শেষ হয়েছে, তার ওপাশে কিছু সমতল কিছু উঁচু ঘন ওকবনে ঢাকা খানিকটা জমি দেখা গেল। তার পিছনে একটা টিলা আকাশে মাথা তুলেছে। সেখানে একটা আলো লক্ষ্য করলুম। আলোটা দেখামাত্র সাহস বেড়ে গেল। সেইসঙ্গে টের পেলুম, আসলে এতক্ষণ কারো সাহায্য পাব আশা করেই এই সিকি মাইল পথ দৌড়ে এসেছি। ওকবনের দিকে আলো ফেলে দেখলুম, একফালি এবড়োখেবড়ো সরু পথ চলে গেছে টিলাটার দিকে। আলোটা যে ইলেকট্রিক, তাতে কোনো ভুল নেই। কিন্তু ওকবনের রাস্তার ধারে কোনো খুঁটিখাটা নেই। তাই মনে হল, নিশ্চয় টিলার ওদিকে কোনো বড় রাস্তা আছে, যেখান থেকে আলোর সংযোগটা ঘটেছে।

 

আপাতত যে কোনো একজন মানুষ আমার দরকার। তাকে সঙ্গে নিয়ে কর্নেলের খোঁজে বেরিয়ে পড়ব। এ এলাকার কোনো জায়গাই আমার চেনা। নয়। সেজন্যেই এমন কাকেও দরকার, যে এলাকাটা ভালভাবে চেনে।

 

ওকজঙ্গলটা ঢালু হয়ে নেমে আবার টিলার দিকে উঠেছে। প্রায় দৌড়ে পিচের রাস্তা থেকে নেমে ওই জঙ্গলের রাস্তায় গেলুম। তারপর জঙ্গলটা আমাকে গিলে নিল। খুব সরু রাস্তা–মনে হল, প্রাইভেট রোড। বড় বড় পাথর বসিয়ে কোনরকমে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে যেন।

 

এই পথটুকু পেরোতে খুব বেশি সময় লাগল না। তারপর দেখলুম, আমি মোটামুটি ফাঁকা একটা জায়গায় পৌঁছে গেছি। রাস্তাটা ঘুরে টিলার গায়ে উঠেছে। এবং আন্দাজ দেড়শো থেকে দুশো ফুট উঁচুতে একটা বাড়ি আবছা দেখা যাচ্ছে। ওই বাড়ির একটা জানলাতেই আলোটা দেখা যাচ্ছে। বাকি অংশ অন্ধকার।

 

হাঁফাতে হাঁফাতে যখন ওই দেড়শো বা দুশো ফুট উঁচুতে বাড়িটার গেটে পৌঁছেছি, তখন বড় বাস্তার দিকে যেন গাড়ির শব্দ শুনতে পেলুম। একঝলক আলোও গাছপালার মাথায় শিসিয়ে উঠল। তারপর মিলিয়ে গেল। তাহলে রাস্তায় অপেক্ষা করলেও চলত।

 

যাই হোক, যখন এসে পড়েছি, স্থানীয় লোকের সাহায্যই ভাল হবে। গেট খুলে লনে দাঁড়ালাম। একটু ইতস্তত করলুম। নিশ্চয় অনধিকার প্রবেশ করছি। আবছা যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, বাড়ির মালিক শৌখিন এবং পয়সাওলা মানুষ। নিশ্চয় কোনো শৌখিন পুঁজিপতির শৈলাবাসে হানা দিতে যাচ্ছি। লোকটা ধমক দিয়ে ভাগিয়ে দেবে না তো? আরেকটা ভয় আবশ্য ছিল–তা কুকুরের। কিন্তু গেটে টর্চের আলো ফেলেও কোনো কুকুর গজাল না যখন, তখন বাড়িতে কোনো কুকুর নেই তা নিশ্চিত।

 

মরিয়া হয়ে এগোলুম। নুড়িবিছানো রাস্তায় আমার গামবুট দেবে যাচ্ছিল। শব্দ হচ্ছিল জোর। কিন্তু কোনো লোকের সাড়া পেলুম না তখনও।

 

সামনে কয়েক ধাপ কাঠের সিঁড়ির ওপর বারান্দা দেখতে পেলুম। তিনটে হাল্কা চেয়ার রয়েছে। বারান্দাভর্তি অজস্র টব। টবে গাছপালা আছে। আলো ফেললেও কেউ ধমক দিয়ে তেড়ে এল না। অথচ একটা ঘরে আলো জ্বলছে। পর্দা থাকায় ভিতরটা দেখা যাচ্ছে না। আমি বারান্দায় ইচ্ছে করে জুতোর শব্দ তুললুম। তারপর কাশলুম। তবু কোনো সাড়া নেই। ব্যাপার কী?

 

এবার একটু ইতস্তত করে ইংরিজিতে বলে উঠলুম–কেউ আছেন কি। স্যার?

 

তবু কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকলুম। তবু জবাব নেই। তখন খুব জোরে বাঁদিকে আলোজ্বলা ঘরটার দরজায় ধাক্কা দিলুম।

 

এতক্ষণে মেয়েলি গলার চাপা ভিতু ধরনের সাড়া এল–কে?

 

তখন খানিকটা রাগ হয়েছে আমার। অদ্ভুত ব্যাপার তো! এই সবে সন্ধ্যা হল। এরি মধ্যে নাক ডাকিয়ে ঘুমোনা হচ্ছিল? একটু ক্ষুব্ধ স্বরে বললুম-বাঘ ভালুক নই, একজন বিপন্ন মানুষ। দয়া করে বেরোবেন কি?

 

পরিষ্কার কথা ভেসে এল–না।

 

কী আশ্চর্য। আপনি না বেরোন, কোনো পুরুষমানুষকে ডেকে দিন।

 

–কোনো পুরুষমানুষ নেই এখন।

 

–সে কী! আপনি একা আছেন?

 

–হ্যাঁ।

 

–কে আপনি?

 

–আপনি কে?

 

পাল্টা প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেলুম। ঠিকই তো! নিজের পরিচয়টা আগে দেওয়া উচিত। কণ্ঠস্বর ভদ্র ও বিনয়ী করে বললুম–দেখুন আমার নাম জয়ন্ত চৌধুরী। কলকাতা থেকে এসেছি। বিখ্যাত দৈনিক সত্যসেবকের একজন সাংবাদিক।

 

–আমি তো কোনো ভি আই পি নই। আমার কাছে কী চান?

 

–আহা! কথাটা শেষ করতে দিন! আমি এসেছিলুম হীরাকুণ্ডা ফরেস্ট বাংলোয়। শিকারের হবি আছে, তাই। আমার সঙ্গে এসেছিলেন প্রখ্যাত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর এবং হত্যাসংক্রান্ত অপরাধবিজ্ঞানী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার…

 

বাধা এল।–কী বললেন?

 

কর্নেল সরকার।

 

–হত্যা না কী বললেন?

 

আজ্ঞে হ্যাঁ। উনি খুনটুনের ব্যাপারে শৌখিন গোয়েন্দাগিরি করেন।

 

–এখানে কেউ খুন হয়নি! আপনারা চলে যান এখান থেকে।

 

–আহা, কথাটা আগাগোড়া তো শুনবেন! কর্নেল একটু আগে জঙ্গলে হারিয়ে গেছেন। খুঁজে পাচ্ছি না, তাই… ।

 

–মিসিংস্কোয়াডে খবর দিন না! হীরাকুণ্ডা টাউনশিপের থানায় চলে যান। মাত্র তিন মাইল রাস্তা!

 

–আপনি তো ভারি অদ্ভুত! দরজাটা খুলে আগে সবটা শুনুন।

 

–আপনি যে চোরাডাকাত নন, তার প্রমাণ কী?

 

–প্রমাণ? ভীষণ খাপ্পা হয়ে পকেটে হাত ভরলুম। তারপর আমার সরকারি প্রেসকার্ড এবং অফিসের পরিচিতিপত্র (ছবিসমেত) বের করে বললুম–এই কার্ডদুটো দেখুন। দরজা ফাঁক করুন, ফেলে দিচ্ছি।

 

–ওপাশে জানলা খোলা আছে, ফেলে দিন!

 

কী অদ্ভুত! বারান্দার আলোটা জ্বেলে দিন না। আমার টর্চের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেল যে।

 

বারান্দা আর ওদিকের ঘরের কানেকশান কাটা। আলো জ্বলছে না।

 

–কাটা মানে।

 

-হ্যাঁ, কেউ কেটে দিয়েছে! বলে কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকার পর ফের শোনা গেল–আমিও আপনার মতো বিপন্ন।

 

একলাফে নেমে গিয়ে জানলা দিয়ে কার্ডদুটো ভিতরে ছুঁড়ে দিলুম। তারপর বারান্দায় ফিরলুম। বললুম–এবার বিশ্বাস হল?

 

দীর্ঘ দুটি মিনিট চুপচাপ থাকার পর দরজাটা একটু ফাঁক হল তারপর একটি শরীরের ওপরের দিকটা একটুখানি উঁকি মারল। টর্চের ব্যাটারি সত্যি ফুরিয়ে এসেছিল। তাই চেহারাটা স্পষ্ট বোঝা গেল না।

 

মহিলাটি ডাকলেন–আসুন।

 

আমি প্রায় হুড়মুড় করে ভিতরে গেলুম। অমনি উনি দরজা বন্ধ করে দিলেন।

 

ঘরে একটা উজ্জ্বল বাল্ব জ্বলছে। ওঁর দিকে তাকিয়ে আমার চোখদুটো সঙ্গে সঙ্গে ঝলসে গেল। এক আশ্চর্য সুন্দরী যুবতী আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু মুখে কেমন চাপা উদ্বেগ, চেহারা বেশ খানিকটা বিস্ত, চুল এলোমেলো, শাড়ির ওপর একটা ড্রেসিং গাউন চড়ানো আছে কিন্তু ফিতে খোলা। তাহলেও বোঝা গেল, উনি শুয়ে ছিলেন না–সম্ভবত ঘরের মধ্যে শ্রমসাপেক্ষ কোনো কাজ করছিলেন এতক্ষণ। সেই শ্রমের চিহ্ন ওঁর কপালে চিবুকে ও নাকের ডগায় বিন্দুবিন্দু ঘামে প্রতিভাত হচ্ছে। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে উনি বললেন-বসুন মিঃ চৌধুরী।

 

বসলুম। ততক্ষণে কর্নেলের কথা চাপা দিয়ে এই যুবতীর সম্পর্কে একটা তীব্র কৌতূহল এসে পড়েছে। কে ইনি? এমন একা কেন? কোনো লোকজন আয়া পরিচারিকা বা চাকরবাকর কেউ নেই। তার ওপর ওপাশের ঘরের ও বাইরের বারান্দায় নাকি কেউ আলোর তার কেটে রেখেছে। তারের কথা। ভাবতে গিয়ে আমার চোখে পড়ল কোনার টেবিলে একটা ফোনও রয়েছে। ফোনটা দেখে আশ্বস্ত হলুম। তারপর বললুম–আমার ব্যাপার নিয়ে আপাতত আর কিছু বলতে চাইনে, কারণ, মনে হচ্ছে বিপদ আপনারাই বেশি। কী হয়েছে বলবেন কি? আর ইয়ে আপনার পরিচয় এখনও আমি পাইনি কিন্তু!

 

যুবতী সোফার অন্যদিকটায় বসে পড়লেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন দেখতেই তো পাচ্ছেন, আমি এ বাড়ির একজন মানুষ। আমার নাম মিসেস আরাধনা সিং। এটা আমাদের শৈলাবাস বলতে পারেন। মধ্যে মধ্যে স্বামীর সঙ্গে এখানে এসে থাকি।

 

বাধা দিয়ে বললুম-কিন্তু আপনি এখন একা কেন?

 

একটু ইতস্তত করার পর আরাধনা বললেন–আপনি একজন সাংবাদিক জেনেই আমার সাহস হল। সব কথা খুলে বলতে কোনো সংকোচের কারণ দেখছিনে। মিঃ চৌধুরী, আপনি শিলিগুড়ির বিখ্যাত টিম্বার মার্চেন্ট মিঃ শৈলেশ সিংয়ের নাম কি শোনেননি? সেই যে একবার নিউজপেপারে ওঁর নামে খবর বেরিয়েছিল।

 

তক্ষুনি মনে পড়ে গেল। শৈলেশ সিং গতবছর নিজের জীবন বিপন্ন করে এক আন্তর্জাতিক স্মাগলিং র‍্যারেট পুলিশকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। জনসাধারণ খবরের কাগজে এই অমিতসাহসী নেপালি ভদ্রলোকের কীর্তিকাহিনী কয়েকটি কিস্তিতে পড়েছিল। সেই শৈলেশ সিং! আর ইনি তার স্ত্রী? অবাক হলুম। কাগজে মিঃ সিংয়ের ছবি দেখেছিলুম মনে আছে। কিন্তু তিনি তো প্রৌঢ়! আর আরাধনা সিংয়ের বয়স বড় জোর তেইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে হবে!

 

শুধু বললাম–কী আশ্চর্য!

 

আরাধনা বললেন–আশ্চর্য নয়, ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। যে র‍্যাকেট উনি ভাঙতে সাহায্য করেছিলেন, তার সব লোক মোটেও ধরা পড়েনি। তারাই সেই থেকে ওঁর পিছনে লেগে আছে। অনেকবার একটুর জন্যে প্রাণে বেঁচে গেছেন। যেমন আজকের ঘটনা।

 

ওঁকে থামতে দেখে বললুম-থামবেন না প্লিজ, বলে যান।

 

আরাধনা এরপর যা বললেন, শুনে আতঙ্কে শরীর কাঠ হয়ে গেল। হাত ঘেমে রাইফেলটা পিচ্ছিল হয়ে উঠল।…

 

ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে এই : শৈলাবাসটা কমাস আগে শৈলেশ কিনেছেন। একজন বিদেশি প্ল্যান্টার ছিলেন এটার মালিক। অনেক খরচা করে একটা ফোন ও ইলেকট্রিক লাইনও টেনে এনেছিলেন বাড়িটা অব্দি। যাই হোক, নির্জন পাহাড়ী জঙ্গলে সভ্যতার সবরকম সুখসুবিধা এখানে রয়েছে। কেনার পর মাঝে মাঝে স্ত্রীকে নিয়ে শৈলেশ এখানে এসে কাটিয়ে যান। সঙ্গে আরো দুজন আসে–পরিচারিকা লতা আর বাবুর্চি-কাম-ভৃত্য রঘুবীর। এবার এসেছে গতকাল বিকেলে। একটা ল্যান্ডমাস্টার গাড়ি করেই শৈলেশ এখানে আসেন।

 

…আজ বিকেলে, তখন বেলা আড়াইটে–আচমকা একটা জিপ আসে। তারপর জনাচার সশস্ত্র লোক জিপ থেকে দৌড়ে আসছে দেখে এঁরা দরজা বন্ধ করে দেন। শৈলেশ জানালার ফাঁক দিয়ে রিভলবারের গুলি ছোড়েন। তারাও কয়েকবার গুলি ছোড়ে। দেয়ালে লাগে। তারা দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তখন তারা বারান্দার ইলেকট্রিক লাইন আর ফোন লাইনটা কেটে রেখে চলে যায়।

 

ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর শৈলেশ দরজা খোলেন। কিন্তু সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, ওদিকের ঘরে লতা আর রঘুবীর ছিল, তাদের কোনো পাত্তা নেই। তাহলে কি ওদের তারা খুন করে গেল? অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোনো পাত্তা পাওয়া গেল না। তখন শৈলেশ হীরাকুণ্ডা থানায় যাবেন বলে পিছনের গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করলেন। আরাধনা অবাক হলেন দেখে যে স্বামী তাঁকে ফেলে পাগলের মতো একা গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন।

 

…..আরাধনা গাড়ির পেছনে-পেছনে কিছুদূর ছুটে যান এবং চেঁচামেচি করেন। কিন্তু শৈলেশকে যেন ভূতে পেয়েছিল। একা এই জঙ্গলে অসহায় স্ত্রীকে ফেলে রেখে চলে গেলেন।

 

…..আরাধনা অগত্যা কী আর করেন। প্রতিমুহূর্তে স্বামীর ফেরার প্রতীক্ষায় কাটাচ্ছেন। অথচ ভদ্রলোক এখনও ফিরলেন না…

 

ঘটনাটা শুনে কিছুক্ষণ আতঙ্কে চুপচাপ থাকার পর আমি শুধু বললুম আশ্চর্য তো! মিঃ সিং আপনাকে এমনি করে একা ফেলে রেখে গেলেন?

 

আরাধনা করুণ মুখে বললেন–উনি বরাবর ওইরকম খামখেয়ালি আর গোঁয়ার। ঝোঁক উঠলে দেবতাদেরও সাধ্য নেই ওঁকে কেউ ম্যানেজ করে।

 

কিন্তু আপনাকে একা ফেলে? বলে আমি ওঁর মুখের দিকে তাকালুম। আরাধনার চোখে জল দেখা যাচ্ছিল। এবার দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আমার ওপর ওঁর তো কোন মায়া-মমতা নেই মিঃ চৌধুরী। আমি ওঁর শখের পোশা জানোয়ার মাত্র। আপনি জানেন না, আমি কীভাবে কাটাচ্ছি।

 

বুঝলুম, ভদ্রমহিলা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। নার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ গেছে, এবার তার বিস্ফোরণ ঘটছে। তাই দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরের ব্যাপারটা বেরিয়ে পড়ছে। সেটাই তো স্বাভাবিক। একজন ধনী প্রৌঢ় তার মেয়ের বয়সী এক মহিলাকে নিতান্ত শখ অথবা স্রেফ উপভোগ ছাড়া আর কেনই বা বিয়ে করবেন? কিন্তু যে মানুষ অমন দেশপ্রেমিক তিনি একটু মানবপ্রেমিক হলে কী ক্ষতি ছিল?

 

আরাধনা মুখ নামিয়ে হু-হু করে কাঁদছেন। কী বলে সান্ত্বনা দেব, ভেবে পেলুম না। কর্নেল বুড়ো এখন পাশে থাকলে চমৎকার ম্যানেজ করতে পারতেন! তিনিই বা কোথায় উধাও হয়ে রইলেন?

 

চুপচাপ বসে ঐ কান্না শোনা কঠিন। তাই সান্ত্বনা দিয়ে বললুম-মিসেস সিং। প্লিজ! এ অবস্থায় কেঁদে শুধু মনোবল হারানো। আপনি শান্ত হোন! আমি যখন এসে পড়েছি, তখন কোনো চিন্তা করবেন না।

 

আমার কথা শুনে মুখ তুললেন আরাধনা। কোত্থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে শান্তভাবে বললেন, আপনাকে ভগবান আমার জন্যে পাঠিয়েছেন। মিঃ চৌধুরী। এতক্ষণ আপনি না এলে আমি নিশ্চয় আত্মহত্যা করে বসতুম!

 

ব্যস্তভাবে একটা কিছু বলতে যাচ্ছি, হঠাৎ বাইরে বাতাসের শনশন শব্দ শোনা গেল। তারপর একমাত্র খোলা জানালাটা জোরে নড়ে উঠল। (ওই জানলাটা খুলে রাখার কারণ যে বাইরের কোনো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, তা ততক্ষণে বেশ টের পেয়ে গেছি।) আরাধনা দ্রুত উঠে গিয়ে জানালা বন্ধ করে দিলেন। তারপর বললেন–প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আজকাল ওই ঝড়টা ওঠে। পাহাড়ী আবহাওয়া বড় খামখেয়ালি! দেখুন না, হয়তো বৃষ্টিও শুরু হবে।

 

বাইরে চাপা শনশন শব্দটা বাড়তে শোনা যাচ্ছিল। কর্নেলের জন্যে এবার উদ্বেগ জাগল মনে। বেঘোরে প্রাণ খোয়ালেন না তো হটকারি গোয়েন্দাবর? এইসব পাহাড়ী ঝড়বৃষ্টি যে কী সাংঘাতিক, তাও তো ওঁর অজানা নয়। সেপ্টেম্বর মাসে একটু বৃষ্টিতেই পাহাড়ে বড় বড় ধস নামে। আমার শরীর আবার শিউরে উঠল।

 

আরাধনা তখন সামলে উঠেছেন। অনেকটা সপ্রতিভ দেখাচ্ছে ওঁকে। বললেন–কিচেন আর ডাইনিং বারান্দার ওপাশে। সেই লাঞ্চের পর এখনও একফোঁটা চা বা কফি খাওয়া হয়নি। মিঃ চৌধুরী কীভাবে মাননীয় অতিথির সকার করব, জানি না।

 

আমরা পরস্পর ইংরিজিতেই কথা বলছি। আরাধনার মুখের গড়নে পর্বতকন্যার আদল। মিশনারিদের দৌলতে বহুকাল আগে এসব পাহাড়ে সভ্যতা ও ইংরিজি ঢুকে পড়েছে। কিন্তু আরাধনার ইংরিজিতে বিলিতিয়ানার ছাপ এত স্পষ্ট যে মনে হল নির্ঘাত কনভেন্টে পড়া মেয়ে। আমার ইংরিজি এদিকে এমন ভারতীয়, কহতব্য নয়।

 

ওঁর কথা শুনে চাকফির নেশা মাথায় চড়ে। গেল। ব্যস্ত হয়ে উঠে বললুম–আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে কিচেনে গিয়ে অনায়াসে চা-কফির ব্যবস্থা করা যায়!

 

আরাধনার মুখে এতক্ষণে হাসি ফুটল। বললেন–হ্যাঁ, আপনার কাছে অস্ত্রশস্ত্র আছে। আর আমার ভয় করার কিছুই নেই। চলুন, যাওয়া যাক।

 

বলে হঠাৎ ঘুরে একটা টেবিলের দিকে এগোলেন আরাধনা।–এক মিনিট। মোমবাতি নিই। কারেন্ট বন্ধ হলে এগুলো কাজে লাগে। তাই রাখা আছে।

 

দরজা খুলে বেরোলুম দুজনে। মধ্যেকার দশফুট বাই পনের ফুট খোলা বারান্দামতো জায়গায় পা দিতেই ঝড়ের ধাক্কা লাগল শরীরে। টর্চ জ্বেলে দেখলুম, ওপাশের ঘর অর্থাৎ ডাইনিং কাম-কিচেনের দরজা বাইরে থেকে শুধু আটকানো আছে মাত্র।

 

আরাধনা ততক্ষণে আলোকিত বেডরুমের দরজাটা লক করে দিয়েছেন। মহিলা বুদ্ধিমতী কোনো সন্দেহ নেই।

 

ডাইনিং ঘরটা বেডরুমের ডবল। ওপাশে কিচেন ও কাউন্টার। গ্যাসলাইনও রয়েছে দেখলুম। আরাধনা উনুনটা পরীক্ষা করে দেখে বললেন–ঠিক আছে। গ্যাসলাইনটা ওরা নষ্ট করে যায়নি।

 

আমি ডাইনিং টেবিলে মোমবাতির সামনে আরাম করে বসলুম। গ্যাসের নীল আগুনে আরাধনা কেটলি চড়িয়ে দিলেন। তারপর কাববোর্ড খুলে কাজে ব্যস্ত হলেন। মোটামুটি ডিনারও খাওয়া যাবে–এই আশায় উৎফুল্ল হয়ে আমি কর্নেল ও সব বিপদের কথা বেমালুম ভুলে গেলুম, আর ঠিক তখনই জোর বৃষ্টির শব্দ কানে এল। ছাদের ওপর দড়বড় করে প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। তারপর কাছাকাছি বাজ পড়ল। তারপরই শুরু হল মেঘগর্জন। বাড়িটা ওই তুমুল প্রাকৃতিক তাণ্ডবে কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকল।

 

কর্নেল গোল্লায় যাক–মনে মনে একথা বলে টেবিলে রাখা রাইফেলটা তুলে একবার দেখে নিলুম তৈরি আছে কি না। তারপর তাকালুম আরাধনার দিকে। ওঁর মুখের একটা পাশে মোমের আলো পড়েছে। ফরসা নিটোল গাল আর ঠোঁটের অংশ দেখা যাচ্ছে। গাউনের কিছুটা সরে ওঁর বুকের একটা দিকও চোখে পড়ছে। মনে হল, ব্রেসিয়ার পরেন না আরাধনা। আজকাল এ ফ্যাশান এদেশে চালু হয়েছে–যদিও আমাদের গ্রামের মেয়েরা এবং আগের দিনে তো অনেককেই, দারিদ্র শ্রম ইত্যাদি কারণে ব্রেসিয়ার পরতেন না। আরাধনার দৈহিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলুম। সেই সময় উনি ঘুরে আমার দিকে তাকালেন। মিষ্টি হেসে বললেন–একই সঙ্গে অল্পস্বল্প ডিনারটাও সেরে নেওয়া যাক। কী বলেন?

 

সানন্দে জবাব দিলুম–অবশ্যই।

 

এরপর টেবিলে কয়েক প্রস্থ খাবার এল এবং তার ফাঁকে ফাঁকে কথা চলতে থাকল দুজনের।

 

–মিঃ চৌধুরী কি বিবাহিত?

 

না।

 

কবে বিয়ে করবেন?

 

–ভেবে দেখিনি।

 

ঝড়টা একটু কমেছে মনে হচ্ছে না?

 

–মনে হচ্ছে!

 

বৃষ্টি কিন্তু জোর হচ্ছে। নির্ঘাত ধস ছাড়বে সবখানে।

 

–যা বলেছেন!

 

–মিঃ চৌধুরী, তার মানে আমরা একেবারে বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব! বুঝতে পারছেন? যাবজ্জীবন দ্বীপন্তর কিন্তু! (হাসি)।

 

–সর্বনাশ!

 

–সর্বনাশের কী আছে? আমার ভাঁড়ারে প্রচুর খাবার আছে। আর সঙ্গিনী হিসাবে নিশ্চয় আমি খুব একটা অযোগ্য নই?

 

–মোটেও না, মোটেও না! (নার্ভাস হয়ে হাসছিলুম)

 

–আজকের রাতটা কিন্তু আপনাকে একটা বড় কাজ দেব।

 

নিশ্চয়ই তো! ঠিকই তো!

 

–আপনার স্মার্টনেসটা কিন্তু চলে গেছে মিঃ চৌধুরী।

 

–ও, হ্যাঁ। মানে আমি ব্যাপারটা ভাবছি!

 

–কী ব্যাপার?

 

–আপনার এই বিপদ। ওদিকে আমার সেই কর্নেল ভদ্রলোক…

 

–ধরে নিন না, আমরা ধসের ফলে বিচ্ছিন্ন। কিছু করার নেই।

 

–তা যা বলেছেন।

 

–ওকি! আপনি তো কিছু খাচ্ছেন না!

 

না, না। খাচ্ছি তো!

 

খান। মাঝে মাঝে আমাদের ভীষণ স্বার্থপর হয়ে যাওয়া ভালো। এতে এক রকম স্যাডিজম আছে।

 

–নিশ্চয়, নিশ্চয়!

 

–এই সময় বাড়ির কাছাকাছি কোথাও ভয়ঙ্কর শব্দে বাজ পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে আরাধনা ছিটকে সামনের চেয়ার থেকে চলে এসে আমার পাশে বসলেন। তারপর টেবিলে মুখ রেখে ঝুঁকে পড়লেন। আঁতকে উঠলুম। ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন নাকি? দুহাতে ওর কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিলুম মিসেস সিং! মিসেস সিং!

 

আরাধনা সোজা হয়ে বসে কড়া চোখে বললেন–কে মিসেস সিং? আমি আরাধনা–জাস্ট এ লোনলি গার্ল! আমার কেউ নেই, কিছু নেই!

 

ওরে বাবা! এ যে যথার্থ হিস্টিরিয়ার লক্ষণ। ভদ্রমহিলা অমন ভয়ানক ঘটনার পর নিশ্চয় তলে তলে মানসিক বিকৃতিতে ভুগছিলেন–এবার সেই বিকৃতিটা আত্মপ্রকাশ করেছে, তাতে কোনো ভুল নেই। আমি ওঁর পিঠে হাত রেখে বললুম-আপনি নিশ্চয় অসুস্থ বোধ করছেন।

 

করছি। প্লিজ, আমাকে ওঘরে নিয়ে চলুন। এমন ক্লান্ত বিপন্ন কণ্ঠস্বরে অভিভূত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু ওঁর খাদ্য অধভুক্ত পড়ে রইল যে!

 

অগত্যা ওকে সাহায্য করতে হাত বাড়ালুম। কিন্তু একেবারে অবশ শরীরে আমার কাঁধে ভেঙে পড়লেন। তারপর দেখি, গড়িয়ে পড়ছেন, তখন ওঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে কোনার একটা সোফায় শুইয়ে দিলুম। চোখ বুজে পড়ে রইলেন। টেবিল থেকে জলের গ্লাস নিয়ে যেই কাছে গেছি, উনি চোখ খুললেন। তারপর বললেন

 

–আমি কোথায়?

 

–আপনারই বাড়িতে। মানে…

 

আরাধনা আমাকে কথা বলতে দিলেন না। একটা হাত বাড়িয়ে রোগা আদুরে গলায় বললেন–আপনি আমাকে ধরে রাখুন না প্লিজ। বড় ভয় করছে।

 

আহা বেচারা! মায়ায় গলে গিয়ে এবং লোভে তো বটেই আরাধনার মাথাটা তুলে আমার উরুর ওপর রাখলুম। কোনো আপত্তি এল না। বরং এবার মিঠে হুকুম হল কপালে হাত বুলিয়ে দিন না প্লিজ!

 

আড়ষ্ট ও কাপ হাতে ওঁর সুন্দর কপালে হাত বুলোতে থাকলুম। বাইরে ঝড়বৃষ্টি তখনও থামেনি। মাঝে মাঝে মেঘ ডাকছে। বাড়িটা কেঁপে উঠছে। জীবনে এমন অদ্ভুত রাত আর একটাও আসেনি।

 

হঠাৎ আরাধনা এক কাণ্ড করে বসলেন। দুহাত নিজের মাথার উপর দিয়ে বাড়িয়ে আমার গলা আঁকড়ে ধরলেন। তারপর আমার মাথাটা টেনে নামালেন। তারপরই আমার ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটে চেপে ধরলেন। চুমু খাওয়া–বিশেষ করে এই আশ্চর্য সুন্দরী যুবতীর ঠোঁটের চুমু, নিশ্চয় এক দুর্লভ সৌভাগ্য; কিন্তু মানসিক প্রস্তুতি না থাকায় ব্যাপারটা আমাকে হতচকিত করে ফেলল। আরাধনা কিন্তু পাগলের মতো আমার ঠোঁটটা দিয়ে কেলেঙ্কারি শুরু করেছেন ততক্ষণে।

 

তার ফলে অনিবার্যভাবে শারীরিক উত্তাপ জাগছিল আমার। একটু পরে আরাধনা ধনুকের মত বেঁকে আমার দিকে ঘুরলেন এবং উঠে বসলেন। তারপর বুকে মাথা গুঁজে হিপিয়ে হিপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। এতক্ষণে আমার ভুলটা ভাঙল।

 

না–এ কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এক অতৃপ্ত যুবতী, স্বামী প্রৌঢ় ও গোঁয়ার, আজকের এই মারাত্মক ঘটনা, তারপর এই নির্জন পরিবেশে আমার মতো এক রাইফেলধারী যুবক–এই উপাদানগুলো মিলেমিশে যা ঘটা উচিত তাই ঘটেছে। বন্যায় ভেসে যেতে একটুকরো খড়কুটো পেলেই তা আঁকড়ে ধরা মানুষের স্বভাব।

 

আমি পরম স্নেহ ও প্রেমে ওর মুখটা দুহাতে তুলে একটি এক মিনিটের চুমু দেওয়ার পর বললুম-আরাধনা লক্ষ্মীটি, শান্ত হও। চলো আমরা কফিটা নিয়ে বরং বেডরুমে যাই।

 

আরাধনা উঠল। এখন সে আমার প্রেমিকা ছাড়া আর কী! কফির ট্রে নিয়ে আমরা দুজনে বেডরুমে ফিরে গেলুম। দরজাটা ভেতর থেকে আটকানো হল।

 

সেফায় পাশাপাশি এবার দুজনে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে কফি খাচ্ছি, হঠাৎ আরাধনা বলল–চৌধুরী, আমি কিন্তু তোমার সঙ্গে কলকাতা যেতে চাই।

 

বললুম-বেশ তো।

 

–বেশ তো নয়। কথা দাও, আমাকে নিয়ে যাবে!

 

–দিলুম।

 

–এই শৈলেশ লোকটা নিজেই আসলে সেই ‘স্মাগলিং র‍্যাকেটের অন্যতম নেতা, চৌধুরী তোমাকে জানিয়ে দিচ্ছি। ওর বিশ্বাসঘাতকতায় এখন দলের বাকি লোকেরা–যারা ফেরারী হয়েছিল, প্রতিশোধ নিতে খেপে গেছে। আমি এই শয়তানের পাল্লায় পড়ে শেষ হয়ে গেছি। আমাকে বাঁচাও, তুমি।

 

–তা আর বলতে? তবে কর্নেল…

 

ড্যাম ইওর কর্নেল। আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি চৌধুরী। তোমাকে দেখামাত্র টের পেয়েছি, সারাজীবন যাকে খুঁজছি, সে এই! তুমি আমাকে ফেলে যাবে না তো?

 

–পাগল! আমিও তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি আরাধনা।

 

–ওঃ চৌধুরী! কী ফাইন ছেলে তুমি! চলো, এবার শুয়ে পড়া যাক্। হ্যাঁ, বিছানায় যাবার জন্য তখন আমি খুব ব্যস্ত। তবে আসল কারণ, কেন হঠাৎ যেন ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু সবে সে আমার হাত ধরে বিছানায় টেনে নিয়ে গেছে, আমি প্যান্ট-শার্ট খুলতে শুরু করেছি, হঠাৎ বাইরে ঝড় বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। আরাধনার মুখে চমক লক্ষ্য করলাম। তারপরই কাদের পায়ের ধুপ-ধুপ শব্দ ভার্সল কাঠের পাটাতনে। এবং দরজায় ধাক্কা পড়ল। কে ভারী গলায় ডাকতে থাকল–আরাধনা! দরজা খোল!

 

আরাধনা আমার দিকে ইশারা করল–চুপ!

 

সে কী! নিশ্চয় ওটা মিঃ সিংয়ের গলার আওয়াজ। আমি ব্যস্তভাবে চাপা গলায় বললাম–তোমার স্বামী এসেছেন যে!

 

আরাধনা ফিসফিস করে বলল–আমার স্বামীর গলা আমি চিনি। ও অন্য কেউ। কক্ষনো দরজা খুলবে না। বরং তুমি জানলার ফাঁক দিয়ে একবার গুলি ছুঁড়ে জানিয়ে দাও যে আমরা নিরস্ত্র নই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *