শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৭)

সদানন্দবাবুই যে নকুলচন্দ্রকে খুন করেছেন, আমার পক্ষে এ-কথা বিশ্বাস করা খুব শক্ত। ভদ্রলোককে আমি চিনি, দশ বছর ধরে তাঁকে বলতে গেলে প্রায় রোজই দেখছি। তা একটা মানুষের ধাতটা যে ঠিক কীরকম, সে রগচটা না ঠান্ডা মাথার লোক, হাঙ্গামাবাজ না শান্তিপ্রিয়, তা বোঝার পক্ষে—আমার তো মনে হয়—দশ কেন, পাঁচটা বছরই যথেষ্ট। আমার বিশ্বাস, তিনি পরোপকারী, সজ্জন, উপরন্তু খুবই নিরীহ ব্যক্তি। মাঝেমধ্যে একটু রেগে যান ঠিকই, রেগে গেলে ‘হ্যান, করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা’ বলেনও বটে, কিন্তু খুন তো খুন, কাউকে একটা চড়চাপড় মারাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

তবে কিনা বাইরে থেকে যাঁকে নেহাত ভালমানুষ বলে মনে হয়, খুন-টুন করা যে তাঁর পক্ষে একান্তই অসম্ভব একটা ব্যাপার, নিশ্চিত হয়ে তা-ই বা বলি কী করে? বললে সে-কথা আপনারা শুনবেনই বা কেন? তার উপরে আবার গল্পটা যেখানে শোনাচ্ছি, সেই কলকাতা শহরে সম্প্রতি খুব সমারোহ সহকারে চ্যাপলিন উৎসব হয়ে গেল। চ্যাপলিনের শতবর্ষ উপলক্ষে তাঁর যে-সব ছবি আবার নতুন করে দেখানো হল, তার মধ্যে মঁসিয়ে ভের্দুও ছিল বই কী। আপনারা সে-ছবি দেখেছেন নিশ্চয়। কেউ-কেউ হয়তো একাধিকবার দেখেছেন। ফলে আপনারা জেনেই গিয়েছেন যে, এমনিতে যে-লোক নেহাতই নিরীহ, এত নিরীহ যে, একটা পোকাকেও পিষে মারতে পারে না, সে-ও খুন করতে পারে। তাও একবার নয়, বারবার। সুতরাং সদানন্দবাবুকে যদি এক্ষুনি আমি একটা গুড কন্‌ডাক্ট সার্টিফিকেট দিয়ে দিই, তো সেটা আপনারা মেনে নেবেন না।

আর তা ছাড়া যাকে অকুস্থল বলা হয়, ঘটনাটা ঘটার সময়ে আমি যে সেখানে কিংবা তার আশেপাশে হাজির ছিলুম, তাও তো নয়। ফলে কিছুই আমি স্বচক্ষে দেখিনি। সবই আমার শোনা কথা। কিছুটা সদানন্দবাবুর কাছে শুনেছি, কিছুটা অন্যদের কাছে। অন্যদের কথা পরে হবে, আগে বরং সদানন্দবাবুর কাছে যা শুনেছি, সেটাই বলব।

কিন্তু তারও আগে বলা দরকার, শনিবার ভোরবেলায় একটা ভয়ংকর আর্তনাদ শুনে যখন পারুল আমাদের ঘরে এসে আমাকে জাগিয়ে দিয়ে বলে যে, পাঁচ-নম্বর বাড়িতে নিশ্চয় কিছু হয়েছে, এক্ষুনি আমার সেখানে যাওয়া উচিত, আর তার কথা শুনবামাত্র আমি ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে নীচে নেমে সদর-দরজা খুলে একছুটে রাস্তা পেরিয়ে যখন ও বাড়িতে গিয়ে ঢুকি, তখন সদানন্দবাবুকে আমি ঠিক কী অবস্থায় দেখেছিলুম। ভদ্রলোক তখন সিঁড়ির কয়েক ধাপ উপরে একেবারে পাথরের একটা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন। সিঁড়ির তলায় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছে যমুনা আর বিষ্টুচরণ। যা-ই দেখুক, সেটা তাদের শরীরের আড়ালে পড়ে যাওয়ায় অন্তত সেই মুহূর্তে আমি দেখতে পাইনি। স্পষ্ট করে আমি দেখতে পাচ্ছিলুম শুধু সদানন্দবাবুকেই। তাঁর মাথার উপরে কড়া পাওয়ারের একটা ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলছে। তার আলোয় আমার মনে হল যে, ভদ্রলোকের মুখ একেবারে মড়ার মতন ফ্যাকাশে। চোখের দৃষ্টিও কেমন বিহ্বল। যেন কোনও কিছুই তিনি ঠিক দেখছেন না বা বুঝে উঠতে পারছেন না। সেই অবস্থাতেই হঠাৎ তিনি ধপ করে সেই সিঁড়ির ধাপের উপরেই বসে পড়লেন।

এ হল শনিবার ভোরবেলাকার ঘটনা। মনে হয় কথা বলবার মতো অবস্থাই তখন সদানন্দবাবুর ছিল না। বাইরের লোকেদের মধ্যে আমি আর আমার পাশের বাড়ির শম্ভুবাবুই ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথম পৌঁছই। পরে এক-এক করে আরও অনেকে এসে পড়েন। মোটামুটি ছ’টার মধ্যেই বাড়ির বাইরে রাস্তার উপর ভিড় জমে যায়।

যমুনা আর বিষ্টুচরণের আড়ালে পড়ে গিয়েছিল বলে নকুলের লাশটা প্রথমে আমার চোখেই পড়েনি। ফলে আমি মিনিট খানেকের মধ্যে বুঝেই উঠতে পারিনি যে, ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছে। সেটা বুঝলুম শম্ভুবাবু গিয়ে বিষ্টুচরণকে একপাশে সরিয়ে দেবার পর।

তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ আর ছেচল্লিশের দাঙ্গায় এই শহরের রাস্তাঘাটে নিত্য যেসব দৃশ্য আমি প্রত্যক্ষ করেছি, তাতে আর এখন একটা মৃতদেহ দেখে আমার শিউরে ওঠার কথা নয়। নকুলকে দেখে তবু যে আমি শিউরে উঠেছিলুম, তার কারণ নিশ্চয় এই যে, আমারই বয়সী আরও অনেকের মতো এখনও আমি একটা ইট কিংবা পাথরের মতো নিশ্চেতন পদার্থে পরিণত হইনি।

সিঁড়ির নীচে চিত হয়ে নকুল পড়ে আছে। শম্ভুবাবু এগিয়ে গিয়ে উবু হয়ে বসে, তার নাড়িতে হাত রাখলেন। তারপর মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ডেড।”

নকুল যে বেঁচে নেই, সে তার চোখ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলুম। আমার বুকের মধ্যে দমাস-দমাস করে মুগুর পেটার শব্দ হচ্ছিল। ঠোঁট শুকিয়ে গিয়েছে, দুই কানের ভিতর দিয়ে বইছে গরম হাওয়া। অনেক কষ্টে প্রায় অস্ফুট গলায় শম্ভুবাবুকে বললুম “আপনি একটু থাকুন এখানে, আমি ডঃ চাকলাদারকে সব জানাচ্ছি, তারপর থানায় একটা ফোন করে দিয়ে এখুনি আবার ফিরে আসব।” রাস্তায় নামতেই চোখে পড়ল যে, বাসন্তী আর পারুল সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। দুজনে প্রায় একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করল “কী হয়েছে?”

বললুম, “সর্বনাশ হয়েছে।” তারপর উপরে এসে ফোনের ডায়াল ঘোরাতে লাগলুম।

ফোন আজকাল চট করে পাওয়া যায় না। ড. চাকলাদার কাছেই থাকেন, তাঁকে পেতে দেরি হয়নি, কিন্তু থানার লাইন পেতে পেতে মিনিট দশেক লাগল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, পাঁচটা পঁয়ত্রিশ। ওদিক থেকে যিনি ‘হ্যালো’ বললেন, গলা শুনেই বোঝা গেল যে, তিনি ঘুমোচ্ছিলেন তাঁর ঘুমের আমেজ এখনও কাটেনি।

বললুম, “আমি পীতাম্বর চৌধুরি লেন থেকে কথা বলছি। আমার নাম কিরণ চট্টোপাধ্যায়, আমি জার্নালিস্ট, দৈনিক সমাচার পত্রিকায় কাজ করি।”

“জার্নালিস্ট? খবর চাইছেন নিশ্চয়? না, আমাদের এলাকায় কাল রাত্তিরে বড়-কিছু ঘটেনি। রাস্তা থেকে গোটা দুয়েক মাতাল ধরে এনে লক-আপে পুরে দিয়েছি। আর আছে একটা রোড-অ্যাক্সিডেন্টের কেস। তাও মাইনর অ্যাক্সিডেন্ট, কেউ মারা-টারা যায়নি। ব্যস, আর কোনও খবর নেই।”

বললুম, “আরে মশাই, আমি খবর চাইছি না, খবর দিতে চাইছি। আমাদের রাস্তায় হঠাৎ একজন মারা গেছে। মনে হচ্ছে আপনাদের ও. সি.-র একবার আসা দরকার।”

“আমি ও. সি.। কী হয়েছে বলুন তো? মার্ডার?”

“তা তো জানি না। মার্ডার হতে পারে, অ্যাকসিডেন্টও হতে পারে। ঠিক কী যে হয়েছে, সেটা আপনারা এসে ঠিক করুন।”

“ঠিক আছে, আমরা যাচ্ছি। একটা কথা জিজ্ঞেস করি, ব্যাপারটা কোথায় ঘটেছে? মানে রাস্তায় না বাড়ির মধ্যে?”

“বাড়ির মধ্যে।”

“যে বাড়িতে ঘটেছে, আপনি কি তার কাছেই থাকেন?”

“খুবই কাছে। বলতে গেলে এটা আমাদের একেবারে উল্টো-দিকের বাড়ি।”

“তা হলে তো ভালই হল। আমরা একটু বাদেই ওখানে পৌঁছে যাব। কিন্তু তার আগে আপনি কাইন্ডলি একবার ওখানে গিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিন যে, ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে, সেখান থেকে কেউ যেন কিছু না সরায়। মানে যা-কিছু যেখানে যেমনভাবে আছে, ঠিক সেইখানে ঠিক তেমনিভাবেই যেন থাকে। আর হ্যাঁ, ডেডবডিটাকেও যেন কেউ টাচ না করেন। এটা জানিয়ে দিতে আপনার কোনও অসুবিধা হবে?”

“কিছুমাত্র না। এখুনি ওখানে গিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি।”

ফোন নামিয়ে রাখলুম। পরক্ষণেই মনে হল, ভাদুড়িমশাই তো কলকাতাতেই আছেন। তাঁকে একবার ব্যাপারটা জানানো দরকার।

কপাল ভাল, এবারে আর লাইন পেতে দেরি হল না। দুচার কথায় যা জানাবার জানাতেই তিনি বললেন, “সম্ভবত আপনি চাইছেন যে, আপনার বন্ধু সদানন্দবাবুকে সাহায্য করবার জন্যে আমি একবার যাই। কিন্তু আমি এখন যাব না। আমার বদলে যাকে পাঠাচ্ছি, তাকে দেখলেই আপনি চিনতে পারবেন।”

বাসন্তী আর পারুল ইতিমধ্যে উপরে উঠে এসেছিল। পাশেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল তারা। চুপচাপ আমার কথা শুনে যাচ্ছিল। ফোন নামিয়ে রাখতে বাসন্তী বলল, “ও-বাড়িতে অত কান্নাকাটি হচ্ছে কেন? কী হয়েছে? সদানন্দবাবুর কিছু হয়নি তো?”

বললুম, “সদানন্দবাবুর কিছু হয়নি। তবে যা ভয় করছি তা যদি সত্যি হয় তো ভদ্রলোক বিপদে পড়ে যাবেন। নকুল মারা গেছে।”

পারুল বলল, “সে কী! কখন মারা গেল? কী হয়েছিল?

বললুম, “কিছু জানি না। আমি একবার ও-বাড়িতে যাচ্ছি।”

বাসন্তী বলল, “আমিও তোমার সঙ্গে যাব।” তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর যাবার দরকার নেই। তুই নিজের জন্যে এক কাপ চা বানিয়ে নে। কাল বিকেলে যে পায়েস করেছিলুম তার খানিকটা ফ্রিজে রয়েছে। সন্দেশও রয়েছে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে পড়তে বসে যা।”

আমি আর বাসন্তী চটপট নীচে নেমে রাস্তার উপরের ভিড় ঠেলে পাঁচ নম্বরে গিয়ে ঢুকলুম। ছ’টা বাজে। কিন্তু যতই বেলা বাড়ুক, মধ্য-কলকাতার এইসব এঁদো গলির অন্ধকার যেন আর কাটে না। সিঁড়ির উপরকার কড়া-পাওয়ারের আলোটা তখনও জ্বলছে। নইলে নিশ্চয় চৈত্র মাসের সকাল ছ’টাতেও জায়গাটা একেবারে অন্ধকার হয়ে থাকত।

নকুলের মাথার পাশে মেঝের উপরে চাপ-চাপ রক্ত। আগে এটা চোখে পড়েনি। বাসন্তী যে ভয় পেয়ে গিয়েছে সে তার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলুম। তাকে বললুম “তুমি আর এখানে দাঁড়িয়ে থেকো না, উপরে চলে যাও।”

শম্ভুবাবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। বাসন্তী উপরে যাবার পরে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “থানায় খবর দিয়েছেন?”

বললুম “দিয়েছি। ওরা একটু বাদেই এসে পড়বে। কিন্তু সদানন্দবাবুকে দেখছি না যে?”

“ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে; বললেন যে, শরীরটা অস্থির-অস্থির করছে। মাথাটা বোধহয় একটু ঘুরে গিয়েছিল। একবার একটু বমিও করে ফেললেন। ওঁকে উপরে নিয়ে শুইয়ে দিয়েছি।”

পাড়ার যাঁরা ভিতরে এসে ঢুকেছিলেন, থানায় খবর দেওয়া হয়েছে শুনেই তাঁরা একে-একে সরে পড়তে লাগলেন। কী হয়েছে, সেটা জানবার জন্যে কারও কৌতূহলই কিছু কম নয়, কিন্তু যেমন কৌতূহল তেমনি অল্প-বিস্তর ভয়ও আছে প্রায় প্রত্যেকেরই। পুলিশ এসে জেরা করবে, মামলা হলে সাক্ষী দিতে বলবে, সাধ করে কে আর এ-সব ঝঞ্ঝাটে নিজেকে জড়াতে চায়।

শম্ভুবাবুকে ব্যতিক্রম বলেই গণ্য করতে হবে, তিনি গেলেন না। জিজ্ঞেস করলুম, “আপনার আজ অফিস নেই?”

“আজ তো শনিবার। আমার ছুটি। একবার অবশ্য বাজারে যাবার দরকার ছিল, তা সে কাল গেলেও চলবে।”

“ভালই হল, আপনি তা হলে আর-কিছুক্ষণ এখানে থেকে যান। ও হ্যাঁ, থানা থেকে বলল যে, কেউ যেন এখান থেকে কিছু না সরায়। ডেডবডিটাও না ছোঁয়।”

দেওয়ালের ধারে বসে হাপুস নয়নে যমুনা কাঁদছিল। বিষ্টুচরণ তার ঘরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথাটা মূলত ওদেরই উদ্দেশে বলা, কিন্তু শুনতে পেল কি না, কে জানে।

শম্ভুবাবু বললেন, “পুলিশ না আসা পর্যন্ত আপনিও এখানে থাকবেন তো?”

বললুম “থাকব। তবে এখন একটু উপরে যাচ্ছি। সদানন্দবাবুর অবস্থাটা একবার দেখে আসা দরকার।”

দোতলায় এসে দেখলুম, সদানন্দবাবুকে তাঁর খাটের উপরে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মাথার কাছে দাঁড়িয়ে কাজের মেয়েটি বাতাস করছে তাঁকে। সদানন্দবাবুর স্ত্রী একদিকে একটা চেয়ারে বসে আছেন। পাশের চেয়ারে বসে বাসন্তী তাঁর সঙ্গে কথা বলছিল, আমি গিয়ে ঘরে ঢুকতে জিজ্ঞেস করল, “থানা থেকে এসেছে?”

বললুম, “না। পুলিশ কি এত তাড়াতাড়ি আসে নাকি?”

সদানন্দবাবু আমাকে দেখে ম্লান হাসলেন। বললুম “কেমন আছেন এখন?”

ক্লান্ত গলায় ভদ্রলোক বললেন, “অনেকটা ভাল। মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গিয়েছিল।”

“যাবারই কথা। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে না তো?”

“না।”

“তা হলে ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলুন দেখি।”

আবার হাসলেন সদানন্দবাবু। সেই ম্লান হাসি। তারপর বললেন, “কী আর বলব বলুন, সবই আমার গ্রহের ফের।”

বললুম, “সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে যে, এই নিয়ে আপনি একটা ঝঞ্ঝাটে না জড়িয়ে যান। ঠিক কী হয়েছিল?”

সদানন্দবাবু উঠে বসতে যাচ্ছিলেন। আমি বাধা দিয়ে বললুম, “ওঠবার কোনও দরকার নেই। তাড়াহুড়ো করবারও না। যা বলবার আস্তেসুস্থে বলুন।”

অতঃপর তিনি যা বললেন, আপনাদেরও আমি সেটাই জানাচ্ছি।

চৈত্র মাস। রাত্তিরে বেজায় গরম পড়েছিল, তা ছাড়া মাঝরাত্তিরে মত্তাবস্থায় বাড়িতে ফিরে নকুলচন্দ্র কালও এমন হই-হট্টগোল বাধিয়ে দিয়েছিল যে, সদানন্দবাবুর ঘুম ভেঙে যায়। টর্চ জ্বেলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছিলেন, রাত তখন একটা। তারপরে আর ভাল করে ঘুম হয়নি, ওই একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে ছিলেন আর কি। মনে হয়, তার বেশ কিছুক্ষণ বাদে এই মোটামুটি তিনটে নাগাদ একতলায় কিছু একটা ভারী জিনিস পড়ে যাবার শব্দও শুনেছিলেন। কিন্তু সেটা যে কীসের শব্দ তা বুঝতে পারেননি। ভাল করে ঘুমোতে না-পারলেও রোজ যেমন ওঠেন তেমনি আজও ঠিক সাড়ে চারটেতেই তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েন। স্টোভ ধরিয়ে তাতে জলের কেতলি বসিয়ে দেন। জলটা ফুটতে-ফুটতেই রোজকার মতো ধুয়ে নেন মুখ-চোখ। তারপর হালকা এককাপ লিকার খেয়ে, জামাকাপড় পাল্টে রোজকার মতোই মর্নিং ওয়াকে বেরুবার জন্যে যখন নীচে নামেন, পাঁচটা বাজতে তখনও মিনিট পাঁচেক বাকি। সিঁড়িটা অন্ধকার। উপর থেকে সুইচ টিপে সিঁড়ির আলো জ্বেলে নীচে নামা যায়। কিন্তু সিঁড়ির আলোটা তিনি কোনওদিনই এইসময় জ্বালেন না। আজও জ্বালেননি। না জ্বালবার কারণ আর কিছুই নয়, সিঁড়ির আলো জ্বালাবার আর নেবাবার জন্য যে টু-ওয়ে সুইচের ব্যবস্থা আজকাল প্রায় সব বাড়িতেই দেখা যায়, সদানন্দবাবুর বাড়িতে সেটা নেই। তাই উপর থেকে আলো জ্বেলে নীচে নামলে আর নীচ থেকে সেটা নেভাবারও উপায় নেই। মর্নিং ওয়াক শেষ করে যতক্ষণ না তিনি আবার বাড়িতে ফিরে আসছেন ততক্ষণ সেটা জ্বলতেই থাকবে। ভদ্রলোক অনেকদিন ধরেই ভাবছেন যে, একটা টু-ওয়ে সুইচের ব্যবস্থা করে নেবেন, কিন্তু এখনও সেটা করা হয়নি। অগত্যা তাঁকে টর্চ জ্বেলে নীচে নামতে হয়। ছোট্ট পকেট-টর্চ। আজ তার বোতাম টিপেই বুঝলেন যে, ব্যাটারির তেজ ফুরিয়ে এসেছে। একে তো ম্যাড়মেড়ে আলো, তায় ছানি কাটাবার পর থেকে চোখেও ভাল দেখতে পান না, খুবই সতর্কভাবে পা ফেলতে ফেলতে তাই নীচে নামছিলেন তিনি। কিন্তু বারো-চোদ্দো ধাপ নেমেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। ম্লান আলোতে আবছামতন তিনি দেখতে পান যে, সিঁড়ির শেষ ধাপের ঠিক সামনেই একটা লোক মেঝের উপরে হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে আছে। লোকটা যে নকুলচন্দ্র সে-কথা বুঝতে তাঁর কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল। তারপরেই তিনি বিকটভাবে চেঁচিয়ে ওঠেন।

নকুল যে মারাই গিয়েছে, চিৎকার করে উঠবার মুহূর্তেও অবশ্য সদানন্দবাবু তা বুঝতে পারেননি। তাঁর চিৎকার শুনে সিঁড়ির দু’দিকের দুটো ঘর থেকে যখন যমুনা আর বিষ্টুচরণ ছুটে বেরিয়ে আসে তখনও না। তিনি ভেবেছিলেন, মোদো-মাতাল লোকটা হয়তো শেষ-রাত্তিরে একবার বাথরুমে যাবার জন্যে টলতে টলতে তার ঘর থেকে বেরিয়েছিল; তখন, কিংবা বাথরুম থেকে বেরিয়ে আবার ঘরে ফিরবার সময়ে, অন্ধকারের মধ্যে দেওয়ালে ধাক্কা লেগে আর টাল সামলাতে পারেনি, আছাড় খেয়ে মেঝেতে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা যে তা নয়, আরও ভয়াবহ, একটু বাদেই তা বোঝা গেল। চিৎকার শুনে কুসুমবালারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ তিনি দোতলায় তাঁদের শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সিঁড়ির আলোটা জ্বেলে দেন। টর্চের ম্যাড়মেড়ে আলোয় সবকিছু এতক্ষণ স্পষ্ট দেখা যায়নি। এবারে ইলেকট্রিকের আলো জ্বলে উঠতেই দেখা গেল যে, মেঝের উপর চাপ-চাপ রক্ত, আর সেই রক্ত নেমে এসেছে নকুলচন্দ্রের মাথা থেকেই। যেমন নিথর, নিস্পন্দ হয়ে সে পড়ে আছে; তাতেই সদানন্দ বুঝতে পেরে যান যে, সে বেঁচে নেই। তাঁর এক হাতের লাঠি ও অন্য হাতের টর্চ খসে পড়ে যায়। সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে তিনি তখন দ্বিতীয়বার চেঁচিয়ে ওঠেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *