শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৫)

সদানন্দবাবু যে কী বলতে চাইছেন, কিছুই ঠাহর করতে পারলুম না। বললুম, “ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলুন তো।”

সদানন্দবাবু একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, সব তা হলে খুলেই বলি। দেখুন মশাই নকুল যে মোটেই সুবিধের লোক নয়, সে ওরা ভাড়াটে হয়ে আসবার এক বছর বাদেই আমি টের পেয়েছি। বলেছিল ওরা দুটিমাত্র প্রাণী এখানে থাকবে, অথচ বছরখানেক যেতে না যেতেই একটা উটকো লোককে আমার বাড়ির মধ্যে এনে ঢোকাল। তার মানে ওর কথার ঠিক নেই। না না, বিষ্টুচরণ যে খারাপ লোক তা আমি বলছি না। কাজকর্ম না খুঁজে ও যে পড়ে-পড়ে শুধু ঘুমোয় তাতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এমন তারস্বরে গান গাইবে কেন? তার উপরে আবার বছর দুয়েক আগে নলের একটা মেয়ে হয়েছে। রাত্তিরে সেটা এক-একদিন এমন ট্যা-ট্যা করে কাঁদে যে, আমার ঘুগ্মের বড় ব্যাঘাত হয়। আমি মশাই শান্তিপ্রিয় লোক, আমার গিন্নিটিও তা-ই, এতসব চিৎকার চেঁচামেচি আমাদের পছন্দ হয় না। তার উপরে আবার অশান্তি আজকাল আরও বেড়েছে।”

“আঁশটে গন্ধের কথা বলছেন তো?”

“আরে সে উৎপাত তো আছেই। মাছ যখন পচে, তখন তার গন্ধে আমাদের অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত মুখে উঠে আসে মশাই।”

কথাটা সেদিন বাসন্তীর কাছেও শুনেছি। হাসতে-হাসতে বাসন্তী বলছিল, “কুসুমদির কাছে আজ উলের একটা প্যাটার্ন তুলতে গিয়েছিলুম, তা পচা-মাছের দুর্গন্ধে তো বসতেই পারলুম না। কুসুমদিরও একেবারে পাগল-পাগল অবস্থা। শাড়ির আঁচল নাকের উপর চেপে ধরে পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছিলেন আর সদানন্দবাবুকে নাকিসুরে বলছিলেন, বিদেয় করো বিদেয় করো, আঁজই এই পাঁপ বিদেয় করো। প্যাটার্ন তুলব কী, আমি তখন পালাতে পরলে বাঁচি।’

সদানন্দবাবুকে বললুম, “আঁশটে গন্ধটা তো আর নতুন সমস্যা নয়, ওটা তো কিছুদিন ধরেই চলছে। নতুন অশান্তিটা কী হল?”

সদানন্দবাবু বললেন, “সেই কথাই তো বলছি। তা আপনি শুনছেন কই। ব্যাটা আজকাল বড্ড বাড়াবাড়ি করছে। মানে সবকিছুরই একটা মাত্রা থাকবে তো, তাও থাকছে না।”

ভদ্রলোকের সবই ভাল, কিন্তু মুশকিল এই যে বক্তব্যের চেয়ে ভূমিকাটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। বললুম, “অত বিতং দিয়ে কথা বলবেন না তো, স্পষ্ট করে বলুন যে কী হয়েছে।”

সদানন্দবাবু বললেন, “সে কী মশাই, কিছুই আপনার কানে যায় না নাকি।” তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, “অবশ্য যাবেই বা কী করে? রাত্তিরে তো আপনারা পিছনের দিককার ঘরে থাকেন, তাই না?”

“হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?”

“রাস্তার দিককার ঘরে যদি থাকতেন তো ঘুম ভেঙে যেত। উরে বাপরে বাপ্ সে কী চেঁচামেচি!”

“কে চেঁচামেচি করে?”

“কে আবার, ওই নকুল। ব্যাটা বরাবরই রাত করে ফিরত, তা আজকাল তো দেখছি রাত বারোটাও পেরিয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসেই চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, আর বউয়ের উপরে চোটপাট করতে থাকে। উপর থেকে যে আমি তাতে আপত্তি করিনি তাও নয়। বেশ কয়েকদিনই গলা চড়িয়ে বলেছি, ‘এ সব কী হচ্ছে, অ্যাঁ? এত হল্লা কিসের? এটা বস্তি নয়, এটা ভদ্রপাড়া।’ তা সে-সব কথা তো গেরাহ্যিই করে না। চেঁচাচ্ছে তো চেঁচাচ্ছেই, হল্লা করছে তো করছেই। ওরে বাবা রে বাবা, সে এক জগঝম্প কান্ড।”

“এত রাত করে ফেরে কেন, কখনও জিজ্ঞেস করেছিলেন?”

“তা করেছিলুম বই কী। রাত্তিরে তো আর নীচে নামতে ভরসা হয় না, তাই একদিন দিনের বেলায় দেখা হয়ে যেতে জিজ্ঞেস করেছিলুম যে বাড়ি ফিরতে আজকাল এত রাত হচ্ছে কেন?”

“তাতে কী বলল?”

“বলল যে, মহাজনের পাওনা মিটিয়ে ফিরতে হয় তো, তাই একটু রাত হয়ে যায়।” সদানন্দবাবু একটা চোখ একটু ছোট করে হাসলেন। তারপর গলার স্বর একটু নীচে নামিয়ে বললেন, “ও-ও বলল, আর আমিও বিশ্বাস করলুম! আসল কথাটা কী জানেন, ব্যাটা আজকাল খুব মাল টানছে।”

“তা টানুক না, আপনার পয়সায় তো আর টানছে না, তা হলে আর আপনার তা নিয়ে এত উতলা হবার দরকার কী? ওর ডানা গজিয়েছে তাই উড়ছে। তা উড়ুক না, আপনি তাতে বিচলিত হচ্ছেন কেন?”

সদানন্দবাবু অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “যাচ্চলে, আমি কেন বিচলিত হব? আরে না মশাই, কে মাল টানল না-টানল তাতে আমার কী। ও-সব নিয়ে আমি একটুও ভাবছি না। আমার সাফ কথা, যা করতে হয়, মুখ বুজে করো, হল্লাবাজি চলবে না। আর হ্যাঁ, বাড়ির মধ্যে পচা মাছের দুর্গন্ধ ছড়ানোও চলবে না। ওই আড়তটাকেও এখান থেকে সরাতে হবে।”

পারুল এসে ঘরে ঢুকল। বললুম “কী ব্যাপার, পড়া ছেড়ে উঠে এলি যে? কিছু বলবি?”

“মা বলছে, এবার চান করতে যাও, মার রান্না হয়ে গেছে।”

সদানন্দবাবু বললেন, “তা হলে চলি মশাই। আপনার অফিস যাবার টাইম হল।”

বললুম, “বসুন বসুন, পাঁচ মিনিট পরে গেলেও চলবে।” তারপর পারুলের দিকে তাকিয়ে বললুম, “তোর মাকে বল যে, বোসদা এসেছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলছি, মিনিট পাঁচেক বাদে কলঘরে ঢুকব।”

পারুল চলে গেল। সদানন্দবাবু বললেন, “মোট কথা, হল্লা যদ্দিন পর্যন্ত না বন্ধ হচ্ছে আর যদ্দিন পর্যন্ত না সরানো হচ্ছে এই মাছের আড়ত, আমিও তদ্দিন ছাড়ছি না।”

বললুম, “সেইজন্যেই যে জল আর লাইট কেটে দিয়েছেন, সে তো বুঝতেই পারছি।”

“ব্যাটারা ভারী দিয়ে জল আনাচ্ছে। সকালে যখন বাজার থেকে ফিরছে তখন আবার দেখলুম, এক হাতে বাজারের থলি, আর এক হাতে দুটো হ্যারিকেন।”

“লাইট যখন কেটে দিয়েছেন, তখন হ্যারিকেন আর হাতপাখা ছাড়া উপায় কী। কিন্তু এখনও বলছি, কাজটা আপনি ভাল করলেন না। শেষ পর্যন্ত একটা বিপদে না পড়ে যান।”

“সে তো পড়েইছি। না না, যা ভাবছেন তা নয়, নকুল এ নিয়ে কী করবে না-করবে জানি না, তবে এখনও থানা-পুলিশ করেনি।”

“বিপদটা তা হলে কীসের?”

“বিপদ একেবারে উল্টো দিকের।”

কথাটা যে সদানন্দবাবু গোড়াতেই বলেছিলেন, সেটা ভুলে গিয়েছিলুম। এতক্ষণে আবার মনে পড়ল। বললুম “হ্যাঁ হ্যাঁ, এইরকম একটা কথা আপনি বলছিলেন বটে, আমারই খেয়াল ছিল না। তা উলটো দিকের মানে কোন দিকের?”

একটু আগেও বেশ চড়া গলায় কথা বলছিলেন সদানন্দবাবু; এমন একটা ভাব দেখাচ্ছিলেন যেন নকুলচন্দ্রকে উচিত-শিক্ষা না-দিয়ে তিনি ছাড়বেন না। হঠাৎ যেন সেই ‘যুদ্ধং দেহি’ ভাবটা একেবারে মিলিয়ে গেল। মুখের উপরে আবার মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, ভঙ্গিটাও ভারী কুণ্ঠিত। বেজার গলায় ভদ্রলোক বললেন, “বিপদটা ঘটিয়েছেন আমার গিন্নিই।”

“তার মানে?” অবাক হয়ে বললুম, “আপনার মিসেস আবার কী বলছেন?”

কাঁচুমাচু হয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “বলছেন যে আমি মানুষ নই, একেবারে অমানুষ। আমার মধ্যে নাকি মনুষ্যত্ব বলতে কিছু নেই।”

ব্যাপারটা আসলে কী ঘটেছে, সেটা জানতে আমার ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল। অথচ সদানন্দবাবু যেভাবে অনাবশ্যক বিতং দিয়ে কথা বলেন, তাতে সন্দেহ হচ্ছিল যে, সমস্যাটা যে ঠিক কী, বিস্তর বাক্যব্যয় করেও তিনি সেটা ঠিক পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলতে পারবেন না। তাই মনে হল যে, ওর বাড়িতে গিয়ে সরাসরি ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার।

সদানন্দবাবুকে একটুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে তাই বৈঠকখানা থেকে রান্নাঘরে এসে বাসন্তীকে বললুম, “অফিসের আজ তেমন তাড়া নেই, ঘন্টাখানেক পরে গেলেও চলবে। চট করে একবার ও-বাড়ি থেকে ঘুরে আছি।”

বৈঠকখানায় ফিরে এসে সদানন্দবাবুকে বললুম, “চলুন আপনার মিসেসের সঙ্গে কথা বলব।” আমাদের বাড়ির প্রায় উল্টো দিকেই পাঁচ-নম্বর বাড়ি। গলিটা পার হয়ে বাড়িতে ঢুকে উপরে উঠে এলুম।

কুসুমবালা তাঁর শোবার ঘরের খাটের উপরে একটা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছেন। আমাকে দেখে হেসে বললেন, “আসুন আসুন। আমি কিন্তু উঠতে পারব না, বাতের ব্যথাটা আবার খুব বেড়েছে।”

বললুম, “না না, উঠতে হবে না।”

সদানন্দবাবু একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে আমাকে বসতে বসলেন। তারপর বললেন, “আমি তো দিনে তিন কাপের বেশি চা খাই না, তার মধ্যে দুকাপ ইতিমধ্যেই খাওয়া হয়ে গেছে। থার্ড কাপ খাব বিকেলে। কিন্তু আপনি তো আর অত হিসেব করে খান না, আপনার জন্যে একটু চা করি?”

বললুম, “আরে না মশাই চায়ের দরকার নেই। মিসেস বসুকে একটা কথা বলতে এসেছি। বলেই চলে যাব।”

কুসুমবালা হেসে বললেন, “আমার সঙ্গে আবার কী কথা?”

“সদানন্দবাবু যে একতলার লাইট কেটে দিয়েছেন, তাতে আপনারা আপত্তি আছে, তাই না?”

কুসুমবালার মুখ থেকে হাসিটা নিমেষে মিলিয়ে গেল। বললেন, “আছেই তো। এটা কি একটা মানুষের মতো কাজ হল?”

“এ কথা বলছেন কেন? কুলদের জন্যে আপনার এত ভাবনা কিসের?”

কুসুমবালা যেন ফুঁসে উঠলেন। বললেন, “ওদের জন্যে ভাবতে আমার বয়ে গেছে! না কিরণবাবু, আমি নকুলের কথাও ভাবছি না, যমুনার কথাও ভাবছি না, যমুনার নানা বিষ্টুর কথাও ভাবছি না। কিন্তু দু’বছরের একটা দুধের বাচ্চা. তার কষ্টের কথাটা তো একবার ভাবতে হবে।”

সদানন্দবাবু বললেন, “কমলির কথা বলছ? সে তো বলতে গেলে সারাটা দিন দোতলায় এসে তোমার কাছেই কাটায়।”

কুসুমবালা বললেন, “তা কাটায়। কিন্তু সারাটা রাত একতলায় তার মায়ের কাছে থাকে। চত্তির মাস, গরম পড়ে গেছে, গরমে কাল রাত্তিরে ওই মেয়েটা ঘুমোতে পারেনি। তা ছাড়া আমি জানি তো, মা’রাত্তিরে একবার হিটারে দুধ গরম করে ওকে খাইয়ে দিতে হয়। তা ইলেকট্রিক না থাকলে যেমন ফ্যান চলে না, তেমনি হিটারও চলে না। মাঝরাত্তিরে কাল তাই মেয়েটার নিশ্চয় কিছু খাওয়া হয়নি। তা এ-সব কথা কি তুমি ভেবে দেখেছিলে? একবারও ভাবোনি। দুম করে তুমি ইলেকট্রিকের লাইন কেটে দিলে। দিয়ে ভাবলে যে এই করে নকুলকে খুব জব্দ করা হল। কিন্তু নকুলকে জব্দ করতে গিয়ে একটা দুধের বাচ্চাকে যে কী কষ্টে ফেলা হল, তা ভেবেও দেখলে না। তুমি কি মানুষ? ছিছি!”

সদানন্দবাবুর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যে, তিনি একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছেন। আমার দিকে তাকিয়ে করুণ মুখে বললেন, “আপনি কিছু বলবেন না?”

“কী আর বলব? আমার তো মনে হয়, মিসেস বসু যা বলেছেন ঠিকই বলেছেন।”

উঠে পড়লুম। সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে একটা বাচ্চা-মেয়ের কান্নার শব্দ কানে এল। সেইসঙ্গে একটা মেয়েলি গলার ধমক। “থাক্, জেঠির দরদ যে কত সে তো বোঝাই গেছে, ফ্যানের হাওয়া খাওয়ার জন্যে আর তোমার উপরে গিয়ে কাজ নেই।”

বুঝতে পারলুম যে, কমলি তার জ্যাঠাইমার কাছে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে, কিন্তু তার মা তাকে যেতে দিচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *