শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(২)

সদানন্দবাবুর মুখে যে কিছু-কিছু মেঘ জমতে শুরু করেছিল, সে-কথা আগেই বলেছি। ব্যাপারটা আমি প্রথম লক্ষ করি চার-পাঁচ বছর আগে। রবিবার। সকালবেলা। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে বাজার করতে গিয়েছি, সেখানে ফলপট্টিতে হঠাৎ সদানন্দবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভদ্রলোক আমাকে দেখে হাসলেন, দুটো-চারটে কথাও হল, কিন্তু লক্ষ করলুম। হাসিটা একটু শুকনো, কথাবার্তাতেও যেন আগেকার সেই প্রাণখো “ ভাবটা আর নেই। ভণিতা না করে জিজ্ঞেস করলুম, “ব্যাপারটা কী, বলুন তো?”

“কীসের ব্যাপার?”

“এই মানে কেমন যেন ঝিম মেরে রয়েছেন। মিসেসের সেই বাতের কষ্টটা আবার বেড়েছে নাকি?”

ভদ্রলোক তাতে ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “না মশাই, সে সব কিছু নয়, গিন্নি মোটামুটি ভালই আছে।”

“তা হলে?”

“তা হলে আবার কী, মাঝে-মধ্যে একটু গম্ভীরও হতে পারব না? ও কথা থাক, আপনি তো রোজ বৈঠকখানা বাজারে যান, আজ হঠাৎ এ-দিকে?”

বললুম, “বৈঠকখানা বাজারে রবিবার বড্ড ভিড় হয়, তাই আর আজ ওদিকে যাইনি।”

এর পরে আর কোনও কথা হল না। বুঝতে পারলুম কিছু একটা হয়েছে ঠিকই, তবে ভদ্রলোক সেটা চেপে যেতে চাইছেন। এ-সব ক্ষেত্রে বেশি-কিছু বলতে যাওয়াও ঠিক নয়, তাই আর কথা বাড়ালুম না, ফলপট্টিতে যা কেনাকাটা করার ছিল সেটা চুকিয়ে ফের বাজারে গিয়ে ঢুকলুম।

বাড়ি ফিরে বাজারের থলি দুটো বাসন্তীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললুম, “সদানন্দবাবুর সঙ্গে দেখা হল।”

“কোথায়?”

“বাজারে। তা তুমি তো প্রায়ই ও বাড়িতে যাও, কিছু জানো?”

অবাক হয়ে বাসন্তী বলল, কী জানব?”

“এই মানে ভদ্রলোককে কেমন যেন বেজার ঠেকল।”

বাসন্তী বলল, “এই ব্যাপার? আমি ভাবলুম কী না কী! তা একটু বেজার তো উনি হতেই পারেন।”

“তার মানে?”

“মানে আর কী,” বাসন্তী বলল, “এই যে সারাজীবন আমরা ভাড়াবাড়িতে কাটিয়ে গেলুম, নিজের বাড়ি তৈরি করতে পারলুম না, এখন দেখছি একপক্ষে সেটা ভালই হয়েছে।”

বাসন্তীর অনেক গুণের মধ্যে এই একটা মস্ত দোষ। সব কথাই সে ঘুরি-েপেঁচিয়ে বলে, ফলে কী যে বলছে চট করে সেটা বোঝা যায় না।

বললুম, “কথাটা একটু বুঝিয়ে বলবে?”

“বুঝিয়ে বলার তো কিছু নেই। এ তো খুবই সহজ কথা। ধরো কলকাতা শহরে তোমার যদি একটা বাড়ি থাকত আর ভাড়াটে বসাতে চাও না বলে সেই বাড়ির একতলাটা যদি তুমি খালি ফেলে রাখতে আর পাড়ার ছেলেরা যদি এসে তোমাকে বলত যে, মেসোমশাই আপনার একতলাটা তো ফাঁকাই পড়ে রয়েছে, ওটা আমাদের দিয়ে দিন, আমরা ওখানে আমাদের ড্রামাটিক ক্লাব করব, তো তুমি বেজার হতে না?”

“পাড়ার ছেলেরা সদানন্দবাবুকে তা-ই বলেছে বুঝি?”

“কুসুমদি তো তা-ই বললেন।”

কুসুমদি মানে কুসুমবালা বসু। সদানন্দবাবু স্ত্রী। ভদ্রমহিলার শুনেছি অনেক গুণ। ছেলেপুলে হয়নি বলে হাতে বিস্তর সময় ছিল, সেই সময়টাকে নষ্ট না করে তিনি রান্না, সেলাই, এমব্রয়ডারি ইত্যাদি হরেক বিদ্যার চর্চা করেছেন। দেশি বিদেশি নানান রকম রান্না জানেন, পাড়ায় মেয়ে-বউরা সে-সব তাঁর কাছে শিখতেও যায়। তা ছাড়া যায় ব্লাউজ পাঞ্জাবি শার্ট স্কার্ট ইজের প্যান্ট ফ্রক ইত্যাদির ছাঁটকাট আর সেলাইয়ের ব্যাপারে তালিম নিতে। বাসন্তীও যায়।

বললুম, “ও বাড়িতে শেষ কবে গিয়েছিলে?”

“পরশু দুপুরে।” বাসন্তী বলল, “সোয়েটার বোনার একটা নতুন প্যাটার্ন শিখতে গিয়েছিলুম। তা কথায়-কথায় কুসুমদি বললেন, এ’কী উৎপাত হল বলো তো ভাই, হইচই চিৎকার-চেঁচামেচি সহ্য হয় না বলে একতলাটা ভাড়া দিইনি, এখন পাড়ার ছেলেরা এসে বলছে যে, একতলাটা তাদের ড্রামাটিক ক্লাবের জন্যে ছেড়ে দিতে হবে।”

“ওরেব্বাবা, সে তো আরও মারাত্মক ব্যাপার। ড্রামাটিক ক্লাব মানেই তো রিহার্সাল আর রিহার্সাল মানেই তো তুমুল হট্টগোল। বলতে গেলে আমাদের সামনেই তো ওদের বাড়ি। কান্ডটা কী হবে, সেট বুঝতে পেরেছ?”

বাসন্তী বলল, “পারব না কেন। ওখানে যদি ড্রামাটিক ক্লাব হয় তো তার রিহার্সালের ঠেলায় শুধু সদানন্দবাবুদের কেন, আমাদের কানও ঝালাপালা করে ছাড়বে।”

“এর চেয়ে ভাড়াটে বসানো অনেক ভাল ছিল।”

“ছিলই তো। কুসুমদিও সে-কথা বুঝতে পেরেছেন। বলছেন যে ভাড়াটে বসালে আজ আর এই ঝঞ্ঝাটে পড়তে হত না।”

“তা সেটা তো এখনও বসানো যায়।”

“যায়ই তো। সদানন্দবাবু শুনলুম দালালও লাগিয়েছেন তার জন্যে। বলেছেন যে, সেলামি চাই না, ভাড়াও যা পারে দিক, তবে কিনা দেরি করা চলবে না, সামনের মাসের পয়লা থেকেই ভাড়াটে বসাতে হবে।”

হেসে বললুম, “বোঝো ব্যাপার। কলকাতা শহরে আজকাল বাড়ি ভাড়া বলতে গেলে পাওয়াই যায় না, দুখানা ঘরের জন্যে লোকে মাথা খুঁড়ে মরছে আর এদিকে সদানন্দবাবুর অবস্থা দ্যাখো, না চান বেশি ভাড়া, না চান সেলামি, স্রেফ একটি ভাড়াটে পেলেই ভদ্রলোক এখন বর্তে যান।”

একটু অপেক্ষা করতে পারলে নিশ্চয় মোটামুটি শিক্ষিত আর ভদ্র একটি পরিবারকে ভাড়াটে হিসেবে পাওয়া যেত। তাড়াহুড়োর ফলে সেটা পাওয়া গেল না। সদানন্দবাবুকে সেজন্যে দোষ দেওয়া অর্থহীন, ভদ্রলোকের সত্যিই তখন অপেক্ষা করবার অবস্থা নয়। একেবারে শিরে-সংক্রান্তি অবস্থা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভাড়াটে বাছাবাছি করতে গেলে যে কালক্ষেপ হবার সম্ভাবনা, একতলাটা তার মধ্যে হয়তো হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

তা নকুলচন্দ্র বিশ্বাস যে আজ থেকে মোটামুটি চার বছর আগে ৫ নম্বর পীতাম্বর চৌধুরি লেনের একতলার তাড়াটে হয়ে এই গলিতে এসে ঢুকেছিল এই হচ্ছে তার ইতিহাস। দিনটার কথা এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে। সেও ছিল এক রবিবার। অফিসে আমার অফ ডে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পাট ঢুকেছে। মে মাসের মাঝামাঝি। আষাঢ়স্য প্রথম দিনটিকে যদি বর্ষাকালের সূচনা-দিবস বলে গণ্য করি তো সেই হিসেবমতো বর্ষা নামতে এখনও অন্তত মাস খানেক বাকি, অথচ গত পনরো দিনের মধ্যে একটিবারও কালবৈশাখীর ঝড় ওঠেনি, ফলে তাপাঙ্ক যেন চড়চড় করে চড়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় পিচ-টিচ গলে গিয়ে একেবারে একাক্কার। মনে হচ্ছিল দুপুরের গনগনে রোদ্দুরে গোটা শহর যেন ঝলসে যাচ্ছে। তার আঁচ থেকে বাঁচবার জন্যে জানলা-দরজা বন্ধ করে আমাদের শোবার ঘরটাকে একেবারে অন্ধকার করে নিয়ে, মেঝের উপরে একটা বালিশ ফেলে সদ্য তখন আমি দিবানিদ্রার উদ্যোগ করছি, এমন সময় বাসন্তী এসে বলল, “দেখে যাও।”

রাস্তার দিকের বারান্দায় গিয়ে দেখলুম সদানন্দবাবুর বাড়ির সামনে একটা ঠেলাগাড়ি এসে থেমেছে। ঠেলার পাশে যারা দাঁড়িয়ে আছে, দেখলেই বোঝা যায় যে, তারা স্বামী-স্ত্রী। স্বামীটির বয়স বছর চল্লিশ, বউটির বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি হবে না। দুপুরের রোদ্দুরে দরদর করে ঘামতে ঘামতে তারা ঠেলাওয়ালার সঙ্গে ধরাধরি করে মালপত্রগুলিকে একটা-একটা করে বাড়ির ভিতরে নিয়ে ঢোকাচ্ছে। সদানন্দবাবুও উপর থেকে নেমে এসে তাদের সাহায্য করছেন সাধ্যমতো। মিনিট পনরো-কুড়ির মধ্যে সবকিছু ভিতরে ঢুকে গেল।

সদানন্দবাবু আমাদের দেখতে পেয়েছিলেন। যথারীতি হাসলেন। মনে হল, হাসিটা যেন আর তত ক্লিষ্ট নয়। আমিও হাসলুম। কিন্তু কোনও কথা হল না।

ঠেলাওয়ালা ভাড়া নিয়ে চলে গেল। বউটি আগেই বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। এবারে ভাড়াটেকে নিয়ে সদানন্দবাবুও রাস্তা থেকে ভিতরে ঢুকলেন। সদর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ভাড়াটের নাম কী, আগে কোথা? থাকত, কাজকর্ম কী করে, সে-সব কথা তখনও আমি কিছুই জানি না।

পরদিন জানা গেল।

মনে আছে যে, অন্যান্য দিনের তুলনায় সেদিন অনেক সকাল-সকাল আমাকে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তে হয়েছিল। বলতে গেলে প্রায় ভোরবেলাতেই বাসন্তী আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে বলেছিল যে, কাজের মেয়েটি আজ আর আসতে পারবে না বলে খবর পাঠিয়েছে, তাই আমাকেই যেতে হবে হরিণঘাটার দুধ আনতে।

চটপট মুখ-চোখ ধুয়ে রাস্তায় বেরিয়েছি, সদানন্দবাবুর সঙ্গে দেখা।

বললুম, “কোথায় গিয়েছিলেন?”

“দুধ আনতে। রোজই তো এই সময়ে আমি দুধ নিয়ে ফিরি।”

“তাই বুঝি? আমি দেখছি কিছুই জানি না।”

একগাল হেসে সদানন্দবাবু বললেন, “কী করে জানবেন? আপনার ঘুমই তো মশাই সাতটার আগে ভাঙে না। তা আজ এত সকাল-সকাল উঠে পড়েছেন যে।”

বললুম, “কাজের মেয়েটি আসেনি। তাই আমাকেই আজ দুধ আনতে হবে।”

“ভাল ভাল, খুব ভাল।” সদানন্দবাবু বললেন, “কাজের মেয়েটি যদি মাঝে-মাঝেই এইরকম কামাই করে তো খুব ভাল হয়। রোজ না হোক, অন্তত মাঝে-মাঝে তা হলে আর আপনার সকাল-সকাল না উঠে উপায় থাকে না।”

কথাটার উত্তর না দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলুম, পিছন থেকে সদানন্দবাবু আবার ডাকলেন। বললেন, “একটা কথা আপনাকে বলা হয়নি। নকুল কিন্তু লোকটি নেহাত খারাপ নয়।”

“কে নকুল?”

“ওই কাল দুপুরে যাকে দেখলেন। নকুল বিশ্বাস… মানে একতলাটা যাকে ভাড়া দিলুম আর কি। ভাড়া অবিশ্যি খুবই কম, মাত্র একশো টাকা। তা কী আর করা যাবে, খুব তাড়াহুড়ো করে ভাড়াটে বসাতে হল তো, নইলে নিশ্চয় অনেক বেশি ভাড়া পাওয়া যেত।”

বললুম, “তা যেত বই কী।”

সদানন্দবাবু বললেন, “ তা হোক, আমি তো আর টাকার জন্যে ভাড়া দিইনি, ভাড়া না-দিলে গোটা একতলাটাই ওই বখাটে ছেলেগুলো দখল করে নিত, তাই দিয়েছি। ভাড়া নাহয় কমই পেলুম, হল্লাবাজির হাত থেকে বাঁচলুম তো, সে-ই ঢের।” তারপর একটু থেমে বললেন, আর তা ছাড়া একশো টাকার বেশি দেবেই বা কী করে?”

আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। এর পরে গেলে হয়তো শুনতে হবে যে, দুধ ফুরিয়ে গেছে। বললুম, “পরে কথা বলব, এখন চলি।”

দুধ নিয়ে বাড়ি ফিরে বাসন্তীকে বললুম “শুনেছ?”

রান্নাঘর থেকে বাসন্তী বলল, “কী শুনব?”

“সদানন্দবাবু তাঁর একতলাটা মাত্র একশো টাকায় ভাড়া দিলেন।”

“শুনেছি।”

বললুম “তুমি তো বলো কুসুমদির মতন মানুষ নাকি হয় না, অথচ কই, তোমাকে তো একবারও ওঁদের একতলাটা ভাড়া নেবার কথা বলেননি।”

“বলেছিলেন তে।”

“সে কী, এখানে আমরা তিনশো টাকা ভাড়া দিচ্ছি, তার জায়গায় একশো টাকাতেই হয়ে যেত। তবু রাজি হলে না?”

কাজের মেয়ে না-আসার জন্যেই বোধহয় বাসন্তীর মেজাজ বিশেষ ভাল ছিল না। রান্নাঘর থেকেই চড়া গলায় বলল, “কেন রাজি হব? একে তো একটা বাড়ি করতে পারোনি, তার উপরে আবার দোতলার ফ্ল্যাট থেকে একতলায় নামাতে চাইছ। কিনা ভাড়া মাত্তর একশো টাকা! তোমার লজ্জা করে না?”

ওরেব্বাবা, এ তো দেখছি রেগে একেবারে যজ্ঞিবাড়ির উনুন হয়ে রয়েছে। আর কথা না বাড়িয়ে বাইরের ঘরে এসে খবরের কাগজের হেডলাইনে চোখ বুলোতে লাগলুম।

খানিক বাদেই সদানন্দবাবু এলেন। বললেন, “অসময়ে এসে বিরক্ত করলুম না তো?”

বললুম, “আরে না মশাই, কী যে বলেন। বসুন, চায়ের কথা বলে আসছি।”

সদানন্দবাবু বললেন, “আপনার যদি খেতে হয় তো খান, আমি এখন চা খাব না। আমার সেকেন্ড কাপ অলরেডি খাওয়া হয়ে গেছে। আর থার্ড কাপ খাব সেই বিকেলবেলায়। আপনি তো জানেনই যে, তিন কাপের বেশি চা আমি খাই না, ‘ওটাই হচ্ছে লিমিট।”

সত্যি কথা বলতে কী, সদানন্দবাবু যে এখন চা খাবেন না, এইটে জেনে ভারী স্বস্তি পাওয়া গেল। বাসন্তীর যা মেজাজ দেখলুম, তাতে তাকে চায়ের কথা বলতে বিশেষ ভরসা হচ্ছিল না।

বললুম, “তখন দুধ আনতে যাচ্ছিলুম তো, তাই তাড়া ছিল, আপনার কথা ঠিকমতো শোনা হয়নি। তা ভাড়াটে তা হলে ভালই পেয়েছেন?”

সদানন্দবাবু বললেন, “তা-ই তো মনে হচ্ছে। আমি মশাই শান্তিপ্রিয় লোক, আমদানি না হয় একটু কমই হল, লোকটা মোটামুটি ঠান্ডা স্বভাবের হলেই আমি খুশি। তা নকুলকে তো ঠান্ডা স্বভাবের লোক বলেই মনে হচ্ছে। এখন দেখা যাক।”

“আগে ওঁরা কোথায় থাকতেন?”

“শ্রীমানী মার্কেটের পাশের গলিতে। একটা মাত্তর ঘর নিয়ে থাকত। তাতে অসুবিধে হচ্ছিল। নকুলের কাছে লোকজন আসে, তা ঘর তো একটাই, বাইরের লোককে ঘরে ঢুকিয়ে কথাবার্তা বলতে হলে বউয়ের অসুবিধে হয় তাই দু-কামরাওলা ফ্ল্যাট খুঁজছিল।

“কী করেন ভদ্রলোক?”

“অর্ডার সাপ্লাই। ডালহৌসি-পাড়ার অফিসে-অফিসে ঘুরে খোঁজ নেয় কার কী দরকার, তারপর মাল সাপ্লাই করে। ওই আর কি সস্তায় মাল কিনে কিছুটা মার্জিন রেখে বিক্রি করার ব্যাপার। খুব একটা হাতিঘোড়া রোজগার করে বলে মনে হয় না, তবে চলে যায়!”

ভাড়াটে হিসেবে নকুলের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট যা বুঝলুম সেটা অবশ্য এই যে তারা লোক মাত্র দুটি।

ণদানন্দবাবু উঠে পড়লেন। তারপর চলে যেতে-যেতে দরজা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বললেন, “কী জানেন, সংখ্যাটা যে আর বাড়বে, তাও মনে হয় না। বউটির বয়েস অন্তত তিরিশ তো হবেই, তা এখনও যখন ছেলেপুলে হয়নি, তখন আর কবে হবে?”

ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন। খানিক বাদে বাসন্তী এসে ঘরে ঢুকল। বললুম, “সদানন্দবাবু এসেছিলেন।”

“কী বললেন?”

“বললেন যে উনি যেমন নিঃসন্তান, ওঁর ভাড়াটেরও তেমনি নাকি ছেলেপুলে হবার কোনও সম্ভাবনা নেই। ভদ্রলোককে খুব খুশি বলে মনে হল।”

বাসন্তী হেসে বলল, “খুশি তো হবেনই। যেমন বাড়িওয়ালা, তেমনি ভাড়াটে। এ তো একেবারে সোনায় সোহাগা।”

তা এও হল চার বছর আগের কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *