শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৪)

সামন্ত বললেন, “নকুলচন্দ্র যে রোজই রাত তিনটে থেকে সাড়ে তিনটের মধ্যে বাথরুমে যেত, আমার ধারণা সদানন্দ সেটা জানতেন। গভীর রাত, কেউ কোথাও জেগে নেই, খুন করবার পক্ষে এর চেয়ে চমৎকার সময় আর কী হতে পারে। আমার বিশ্বাস, সদানন্দ এর মধ্যে ঠিক করে ফেলেছিলেন যে, অনেক চেষ্টা করেও নকুলকে যখন তাড়ানো যাচ্ছে না, তখন তাকে খুনই করবেন তিনি। সেইজন্যেই সেদিন মোটামুটি তিনটে নাগাদ তাঁর দোতলার ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। একতলার ঘর থেকে নকুল বেরিয়ে এল। বাথরুমের মধ্যে আলো জ্বলে উঠল। সদানন্দও তাঁর লোহার বল বসানো লাঠিটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে কয়েক ধাপ নীচে নেমে এলেন। বাথরুমের আলো নিবিয়ে নকুল যখন সিঁড়ির পাশ দিয়ে তার ঘরের দিকে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সদানন্দ তার মাথা ফাটিয়ে দেন। নকুল একটা চিৎকার করবারও সুযোগ পায়নি, মাথায় লাঠির বাড়ি পড়বার সঙ্গে-সঙ্গে সে মেঝের উপরে লুটিয়ে পড়ে।’

কৌশিক বলল, “কাট। এই দৃশ্যটা আবার নতুন করে টেক করতে হবে। কিন্তু তার আগে স্ক্রিপ্টের এই অংশটা একটু অন্যভাবে লেখা দরকার।”

সামন্ত বললেন, “তার মানে?”

কৌশিক বলল, “মানে আর কী, ব্যাপারটা একেবারে ফিল্মের স্ক্রিপ্টের মতো লাগছে। এইখানে যদি ‘ক্যাঅ্যাচ’ করে একটা দরজা খোলার সাউন্ড লাগিয়ে দেন, কি সদানন্দবাবু তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার ঠিক আগেই যদি ক্যামেরা চার্জ করে দেখিয়ে দেন যে, একটা দেওয়াল ঘড়ির ছোট কাঁটাটা তিনটের ঘরে এসে পৌঁছেছে, তো সে ভারী জমাট ব্যাপার হবে।”

সামন্ত বললেন, “অর্থাৎ আমার থিয়োরিটা আপনার বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছে না, কেমন?”

কৌশিক কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ভাদুডিমশাই এমন কটমট করে তার দিকে তাকালেন যে, সে আর মুখ খুলল না।

ভাদুড়িমশাই তখন সামন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ-সব ছেলে-ছোকরাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু যায়-আসে না মিস্টার সামন্ত। আপনি যা বলছেন বলুন। নকুল তো মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ল। তারপর?”

সামন্ত বললেন, “তারপর আর কী, যমুনা আর বিষ্টুচরণ যদি তখন জেগে থাকত, তা হলে মেঝের উপর নকুলের পড়ে যাবার শব্দ শুনেই তারা যে-যার ঘর থেকে ছুটে আসত নিশ্চয়। কিন্তু কপাল ভাল সদানন্দবাবুর। দুজনেই তখন ঘুমিয়ে ছিল। নকুলচন্দ্রের পড়ে যাবার শব্দ তারা শোনেনি, তাই ছুটেও আসেনি।”

“তারপর?”

“কাজ সমাধা করে সদানন্দ আবার নিঃশব্দে উপরে যান। উঠে গিয়ে বেশ-খানিকক্ষণ সেখানে কাটিয়ে তারপর রোজকার মতোই পাঁচটা বাজবার খানিক আগে আবার নীচে নেমে আসেন। চিৎকারটাও করে ওঠেন তখনই। এমন একটা ভাব দেখান, যেন ডেডবডিটা এই তিনি প্রথম দেখলেন। বুঝতেই পারছেন, সবটাই একেবারে প্ল্যান-মাফিক ব্যাপার।”

কৌশিক বলল, “কিন্তু সদানন্দবাবুর হাত থেকে লাঠি আর টর্চ তো পড়ে গিয়েছিল। ও-দুটো জিনিস কখন পড়ল, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। বিশেষ করে লাঠিটা। তার কারণ, ওটাকেই আপনি মার্ডার-ওয়েপন বলে সন্দেহ করছেন।”

সাম বললেন, “সন্দেহ করবার কারণ নেই, তা তো নয়।”

আমি বললুম, “কিন্তু সদানন্দবাবু তো বলছেন, কুসুমবালা যমুনা আর বিষ্টুচরণের সামনেই ওই লাঠি আর টর্চ তাঁর হাত থেকে খসে পড়ে গিয়েছিল।”

সামন্ত বললেন, “যমুনা আর বিষ্টুচরণ কিন্তু সে-কথা বলছে না। তারা বলছে, চিৎকার শুনে তারা যখন বেরিয়ে আসে, তখনই তারা নকুলের ডেড-বড়ির পাশে টর্চ আর লাঠি পড়ে থাকতে দেখেছিল। কুসুমবালা অবশ্য সদানন্দের কথা সমর্থন করছেন। কিন্তু তিনি যে তাঁর স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে সেটা করছেন না, এমন কথা কে বলবে।”

ভাদুড়িমশাই চুপ করে আছেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে আমি বললুম, “আপনার ধারণাও কি তা-ই? অর্থাৎ স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে কুসুমবালা মিথ্যে কথা বলছেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো হতেই পারে। স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে স্ত্রী একটা মিথ্যে কথা বলবেন, এ তো খুবই স্বাভাবিক।”

আমি একেবারে নিবে গেলুম। দেখলুম সামন্তমশাই হাসছেন। বিজয়ীর হাসি। বললেন, “আপনি তা হলে আমার থিয়োরিটাই মেনে নিচ্ছেন তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও কিন্তু মেনে নিচ্ছি না।”

এবারে সামন্তের নিবে যাবার পালা। বললেন, “কেন?”

“কী করে মেনে নেব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একে তো ওই লাঠিটাই যে মার্ডার-ওয়েপন, এখনও সেটা নিশ্চিতভাবে আমরা জানতে পারিনি, তার উপরে আবার আপনার থিয়োরির মধ্যে অন্য একটা ফাঁক রয়েছে।

“একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

“বলছি। ফাঁকটা ছোট, কিন্তু ভাইটাল।”

ভাদুড়িশাই আবার একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ ধোঁয়া ছাড়লেন কিছুক্ষণ। তারপর আধাআধি যখন খাওয়া হয়েছে, তখন সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে বললেন, “মাত্র একটা কথাই আমরা নিশ্চিতভাবে জানি। সেটা এই যে, নকুলচন্দ্র মারা গিয়েছে মোটামুটি রাত তিনটের সময়। মাথায় আঘাত করা হয়েছিল, তাতেই তার মৃত্যু ঘটে। সে মেঝের উপর পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার ফলে একটা শব্দ হয়েছিল। শব্দ শুনে যমুনা আর বিষ্টুচরণ ছুটে আসতে পারত। কিন্তু আসেনি। কেন আসেনি? না শব্দটা শুনতেই পায়নি তারা। কেন শোনেনি? না যে-যার ঘরে তারা দুজনেই তখন ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু তারা না শুনলেও শব্দটা যে কেউই শোনেনি, তা কিন্তু নয়। সদানন্দবাবু শুনেছিলেন। নিজের থেকেই আপনাকে তিনি সেটা জানিয়েছেনও। তাই না?”

সামন্ত বললেন, “তা জানিয়েছেন বটে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যি বলতে কী, তিনি এটা জানিয়েছেন বলেই আমি একটু ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছি। ধরা যাক আপনি যা বলছেন, সেটাই ঠিক। অর্থাৎ সদানন্দবাবুই খুনি। তিনটের সময় নীচে নেমে এসে সিঁড়ির দু’ধাপ উপর থেকে তিনি নকুলচন্দ্রের মাথা ফাটিয়ে দেন। নকুলচন্দ্র মেঝেতে পড়ে যায়। শব্দ হয়। কিন্তু যমুনা আর বিষ্টুচরণ ছুটে আসে না। তাতেই সদানন্দবাবু বুঝে যান যে, তারা ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু তা-ই যদি তিনি বুঝে গিয়ে থাকেন, তা হলে আর এমন কথা তিনি বলতে যাবেন কেন যে, দোতলা থেকে শব্দটা তিনি শুনেছিলেন? কেউ যখন শব্দটা শোনেনি, তখন তাঁরও তো ব্যাপারটা চেপে যাবার কথা। কিন্তু তিনি চাপলেন না। বললেন যে, শব্দটা শুনেছিলেন তিনি। অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বীকার করে বসলেন বাড়ির মধ্যে সবাই যখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে, তখন একা তিনি জেগে ছিলেন। কখন জেগে ছিলেন? না, খুনটা যখন হচ্ছে, তখনই। এ যে আগ বাড়িয়ে ধরা দেবার ব্যাপার, এ তো সদানন্দবাবুরও না-বুঝবার কথা নয়। খুনি কি কখনও এ-ভাবে আগ বাড়িয়ে ধরা দেয়? না মশাই, তাঁকে যে খুনি হিসেবে সন্দেহ করা হতে পারে, এটা বুঝেও এই যে তিনি নিজে। থেকেই একটা ভাইটাল ইনফর্মেশন আপনাকে দিয়ে দিলেন, এতেই আমার একটু ধাঁধা লেগে যাচ্ছে। কী ানে হচ্ছে জানেন?”

“কী মনে হচ্ছে?”

“মনে হচ্ছে যে, ইউ আর বার্কিং আপ দি রং ট্রি।”

“অর্থাৎ আপনি বলতে চান যে, সদানন্দবাবু খুনি নন?”

“না, তাও আমি বলছি না। সদানন্দবাবুর মোটিভ ছিল, সুযোগও ছিল। সুতরাং তাঁকে তো আপনি সন্দেহ করতেই পারেন। কিন্তু আমার বলবার কথাটা এই যে, ও-দুটো জিনিস আর-কারও ছিল কি না, সেটাও আপনার খুব ভাল করে ভেবে দেখা উচিত। অস্ত্রবিদ্যা কে কেমন শিখেছে, তার পরীক্ষা দেবার সময় অর্জুন যেমন সব-কিছু বাদ দিয়ে শুধু পাখিটাকেই দেখছিলেন……ভুল বললুম, পাখিরও সবটা তিনি দেখছিলেন না, দেখছিলেন শুধু পাখির মুন্ডুটিকে, আপনিও তেমনি সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু সদানন্দবাবুকেই দেখছেন। কিন্তু আপনি তো অর্জুন নন, আপনি পুলিশ অফিসার গঙ্গাধর সামন্ত। আপনার উচিত তাই চারদিকে নজর রাখা। … না না, সদানন্দকে সন্দেহ করে আপনি কিচ্ছু অন্যায় করেননি, তবে কিনা সন্দেহের জালটাকে এবারে আর-একটু ছড়িয়ে দিন।”

সামন্ত বললেন, “কথাটা আপনি ঠিকই বলেছেন, কিন্তু সন্দেহ করবার মতো আর-কাউকে তো এ-ক্ষেত্রে পাচ্ছি না। নকুলকে খুন করবার সুযোগ হয়তো যমুনারও ছিল, বিষ্টুচরণেরও ছিল। কিন্তু শুধু সুযোগ থাকাটাই যথেষ্ট নয়, একটা মোটিভও থাকা চাই। তা সেটা না ছিল যমুনার, না ছিল বিষ্টুচরণের।”

কৌশিক বলল, “কিরণমামার কাছে আজই দুপুরে শুনলুম যে, রাত দুপুরে বাড়ি ফিরে নকুল নাকি বউয়ের উপরে খুব চোটপাট করত।”

সামন্ত আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা আপনি কোত্থেকে জানলেন কিরণবাবু?”

বললুম, “সদানন্দবাবুই বলেছেন। পাড়ার আর-পাঁচজনও যে ব্যাপারটা জানে না, তা নয়।”

কৌশিক বলল, “চোটপাট নাকি রোজই করত। তা মারধোরও কি মাঝে-মাঝে করত না?”

সামন্ত বললেন, “বাস, সেটাই অমনি খুন করবার মোটিভ হয়ে গেল? আর তা ছাড়া যেভাবে খুন করা হয়েছে তাতে মনে হয় না যে, এটা কোনও স্ত্রীলোকের কাজ।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তা হলে বাকি রইল বিষ্টুচরণ। তার কোনও মোটিভ থাকা সম্ভব নয়?”

একগাল হেসে সামন্ত বললেন, “আদৌ সম্ভব নয়। আরে মশাই, যে-গোরু দুধ দিচ্ছে, তাকে সে কেন মারতে যাবে? বিষ্টুচরণ গরিবঘরের ছেলে, চাকরি-বাকরি জোটাতে পারেনি, ভগ্নিপতির কাছে আশ্রয় মিলেছে, তাই দু’বেলা দুমুঠো খেতে পাচ্ছে। নকুল যে মরল, এতে সেই আশ্রয়টাই তার ঘুচে গেল। না মশাই, ভগ্নিপতির মৃত্যুতে বিষ্টুচরণের কোনও স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে না, বরং সে বেঁচে থাকলেই তার লাভ ছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একেবারেই কি স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে না? যমুনা কি তার স্বামীর ব্যাবসা সামলাতে পারবে? আর কমলি তো নেহাতই শিশু। খোঁজ নিয়ে দেখুন, বোন আর ভাগ্নির অভিভাবক সেজে সে তার ভগ্নিপতির মাছের ব্যাবসাটা হাতাতে চায় কি না।”

গঙ্গাধর সামন্ত তাঁর দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটিকে দুদিকে আন্দোলিত করে বললেন, “সে-গুড়েও বালি। ব্যাবসার জমা-খরচের আর অন্য সব কাগজ।এ আটক করেছি তো। তা সেখানে দেখছি জমার ঘরে ঢুটু। পুরোটাই ধারের কারবার আর সেই ধারের পরিমাণ হাজার পনরো তো হবেই। আসলে নকুলচন্দ্রের মেজাজ যে ইদানীং খিঁচড়ে ছিল, সেটা এইজন্যেই। দেনার দায়ে লোকটার মাথার চুল পর্যন্ত বিকিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। ও-ব্যাবসা কে হাতাতে যাবে?”

ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “মার্ডার-ওয়েপনের কোনও হদিশ হল?”

“পেয়েছি তো অনেক কিছুই। ইট, পাথর, নোড়া, হাতুড়ি, বাটখারা। অর্থাৎ কিনা যা দিয়ে মাথা ফাটানো যায়, এমন বিস্তর জিনিস। তার উপরে সদানন্দবাবুর ওই লাঠি তো আছেই। কালই সব পরীক্ষা করতে পাঠিয়ে দিয়েছি। মনে হয় আগামী কাল বিকেল নাগাদ রিপোর্ট পেয়ে যাব।”

“পেলে আমাকে জানাবেন, কেমন?”

“নিশ্চয় জানাব।”

গঙ্গাধর সামন্ত উঠে পড়লেন। ডাক্তার গুপ্তকে বললেন, “আপনি চলুন। আপনাকে আপনার বাসায় নামিয়ে দিয়ে আমি থানায় ফিরব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *