ঋজুদার সঙ্গে স্যেশেলসে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

আমরা আমাদের ঘরে গিয়ে দরজা খুললাম। উনি ঘরে ঢুকেই জানালার পাশে রাখা রকিং-চেয়ারটাতে বসে বোতলটা খুলে ঢকঢক করে কিছুটা খেলেন, তারপর জানলার পর্দা সরিয়ে রাস্তার দিকে দেখতে লাগলেন। ওঁর মুখ আতঙ্কে ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

আমি ভটকাইয়ের বুদ্ধির তারিফ করার ভাষা খুঁজে পেলাম না কোনও।

ভটকাই বলল, আপনার কাছে একটা অটোমেটিক রাইফেল ছিল না? ইসরায়েলি উজি অথবা চাইনিজ এ কে ফর্টিসেভেন?

না, না। শুধু দুটোই ছিল। তোমাদের দিলাম। তোমরাই আমার বডিগার্ড। পিস্তল চালাতে জান তো?

আমি বললাম, চালিয়ে দেখাব?

আপনার হাতের বোতলটার গলাটা উড়িয়ে দেব?

বলেই, ভটকাই তার পিস্তলটা সেদিকে তাক করল।

উনি হাঁ হাঁ করে উঠলেন। আরে! কর কী? কর কী?

আমি বললাম, আপনাকে প্লুজেঁর লোক বা পিয়ের মারতে যাবে কেন? ঋজুদাকেও কি ওরা মেরে ফেলবে?

না না, মঁসিয়ে বোসকে মারতে যাবে কেন? তবে তাকে কোথাও আটকে রাখবে বোধহয়, যতক্ষণ না তাদের কার্যসিদ্ধি হয়।

কার্যটা কী?

আমি বললাম।

কার্যটা…

না। তোমাদের না বলেও উপায় নেই।

কী?

ভটকাই বলল।

উনি ওঁর কোটের বুকপেকেট থেকে পলিথিনে মোড়া একটি ছোট জিনিস বের করলেন। বললেন, আমি যদি মরেও যাই, তবু প্লুজেঁকে আমি দেব না এটা।

মাদমোয়াজেল মারিয়েল ভৈঁয়সাকেও দেবেন না?

না না, সে কে? নেপো। মেয়েরা ওরকম চুলোচুলি করেই। করে মরুকগে। তারা। বলেই আবারও খেলেন বোতল থেকে ঢকঢক করে।

আমি বললাম, জিনিসটা কী?

একটা ম্যাপের মাইক্রোফিল্ম।

কোন দ্বীপের?

আরিন্ডের। এখন সেখানে বার্ড স্যাংচুয়ারি। পাখি সে দ্বীপে চিরদিনই ছিল। অনেক ভেবেচিন্তেই ইদুল, ফ্রেদরিক আর দেনি ওই দ্বীপে গুপ্তধন পুঁতে রেখেছিল।

আপনার কাছে ম্যাপ আছে, তো এতদিন বসে রইলেন কেন? আমাদেরই বা মিথ্যে বললেন কেন? বলে, এই হয়রানি করালেন মিছিমিছি। এখন মিঃ বোস মানে মানে প্রাণ নিয়ে ফিরলে হয়।

ওই বার্ড স্যাংচুয়ারিতে লক্ষ কোটি ডলারের ট্রেজার থাকলেও প্রেসিডেন্ট রেনে ওখানে খোঁড়াখুঁড়ি করতে দেবেন না। ওই স্যাংচুয়ারির পাখি দেখতে এসে প্রতি বছর সারা পৃথিবীর ট্যুরিস্ট আর অরনিথলজিস্টরা কোটি কোটি ডলার দিয়ে যায় সরকারকে।

রেনে কে?

আরে! এই স্যেশেলস সোস্যালিস্ট-রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।

অরনিথলজিস্টটা কী জিনিস রে?

ভটকাই আমাকে জিজ্ঞেস করল।

পক্ষীবিশারদ।

ও।

মঁসিয়ে ঋজু বোসের সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ডের জানাশোনা আছে, তিনি একজন পৃথিবীবিখ্যাত ন্যাচারালিস্ট, তাই ভেবেছিলাম, ওঁকে এরমধ্যে টেনে এনে কোনওক্রমে যদি পারমিশনটা বের করা যায়।

ওঁর কী ইন্টারেস্ট?

ওঁকে অর্ধেক দিয়ে দিতাম।

ভটকাই আবার বাংলাতে বলল, অর্ধেক রাজত্ব দিতে বৎস, রাজকন্যা কি দিতে পারতে? সে তো এদিকে স্বয়ম্বর হয়ে বসে আছে। লেহ লকা।

মঁসিয়ে পঁপাদু চেয়ারে উঠে বসে রেগে বললেন ভটকাইয়ের দিকে চেয়ে, ছোকরা বলছে কী?

যা বলছে, সে আর বলবেন না। মঁসিয়ে ঋজু বোস এত বড়লোক হয়ে গেলে ও হার্টফেল করে মরে যাবে আনন্দে।

আমি বললাম।

তোমরা কি ভাবছ ঋজু বোস ট্রিলিয়নীয়র হলে তোমাদের কিছু দেবে? সে আশা দুরাশা। টাকার আঠা বড় আঠা। একবার পকেটে ঢুকলে আর বেরোতে চায় না। আরে আমার যত অসুখ সব তো সেই জন্যেই। সে কথা ভেবে ভেবেই।

ভটকাই বলল, হক কথা কইছেন কর্তা! বিষয়ই হইতেছে বিষ। এক্কেরে বিষ। আর বিষয়ের আশা হইতেছে বিষফোঁড়া। আঙুল বুলাইলে, সুড়সুড়ি লাগে।

মাইক্রোফিল্মটাকে দেখিয়ে আমি বললাম, এইটার জন্যেই আপনার প্রাণ বিপন্ন বলছেন আপনি?

তা ছাড়া কী? এইটা তোমাদের জিম্মায় রাখো। এইটা বাঁচাতে যদি দশজনকে গুলি করতে হয় কোরো। তারপর তোমার বাবা তো…

ভটকাই বলল, আমাদের একমাত্র বাবা ঋজু বোস। মরে গেলে আমরা অনাথ হয়ে যাব। আমরা দেড় বছরের ছোট-বড়।

তারপরে বলল, আপনার কাছেও একটা অন্তত অস্ত্র থাকা দরকার। আপনার ঘরে কি আর কিছুই নেই?

ভটকাইটা মহা ধূর্ত। এমনি ভাবে জেনে নিচ্ছে পঁপাদুর শক্তি আছে কি নেই, আমাদের প্রতিরোধ করবার।

নেই রে বাবা। পিস্তল-ফিস্তল ছোঁড়া আমার আসে না। ও দিয়ে…

বলেই আবারও খেলেন ঢকঢুকিয়ে। বোতল প্রায় শেষ।

আমি বললাম, ওটা কী খাচ্ছেন? আরেকটা আনাই? ওটা তো শেষ হয়ে গেল। আনাও। তবে, এ ঘর থেকে নয়। হোটেলের লোক জেনে যাবে আমি এখানে আছি। ওরাও হয়তো জেনে যাবে।

ওরা মানে?

মানে, পিয়ের এবং…

না, ও ঘর থেকেই অর্ডার করছি। চাবিটা দিন। আর ওই মাইক্রোফিল্মটা আপনার কাছে না-রাখাই ভাল। ওটাই তো খুঁজবে ওরা। আর যতক্ষণ না পাবে, আপনাকে মারবে না। কারণ, আপনি মরেই যদি যাবেন তা হলে গুপ্তধনের হদিস কে দেবে? তাই ওটা আমার কাছেই থাক। ওরা স্বপ্নেও ভাববে না যে, ওই অমূল্যরতন আপনি আমার মতো একজন ছোঁড়ার কাছে সাহস করে এবং বিশ্বাস করে রেখেছেন।

সেটা ঠিক। ছোঁড়ারা। তোমরা খুবই বুদ্ধিমান। ছেলের মতো ছেলে হয়েছে ঋজু বোস-এর।

Like father like sons

বোতল থেকে নামটা দেখে, লিখে নিল ভটকাই। তারপর মঁসিয়ে পঁপাদুর ঘরের দিকে চলে গেল।

একটু পরে, ফোনটা বাজল।

মঁসিয়ে পঁপাদু ধরতে যেতেই আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম। বললাম, ওরা জেনে যাবে আপনি এখানে আছেন।

উনি বললেন, ঠিক বলেছ। ঠিক।

তারপরই বললেন, ওঃ পিয়ের! পিয়ের। তার এতক্ষণে প্রালেঁতে পৌঁছে যাওয়ার কথা, আর সে কি না প্লুজেঁর সঙ্গে হাত মিলিয়ে…

প্রালেঁতে কী?

সে একটা কাজ আছে। রাতেই সেরে ফিরে আসার কথা। অবশ্য যা ঘটে গেল, তারপর সেই কাজটা নিরর্থকই হত। নাঃ, সবই গোলমাল হয়ে গেল।

সে গেছে কীসে করে?

প্রাইভেট বোটে। পৌঁছতে পৌঁছতে রাত একটা হবে। তারপরই বলল, আরে সে গেল আর কোথায়? সে তো উঁসিয়ে বোসকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। এখন ভয় হচ্ছে মঁসিয়ে বোসকেও না মেরে দেয়। যা ট্রিগার-হ্যাপি ও।

ও পাপ্পা। মাই পাপ্পা। বলে, আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম।

অভিনয় আর এ সব ফিচলেমি আমার আসে না। এ সব পারে ভটকাই। রিয়্যাল গ্রেট গাই। তবুও নিজের প্রতিভাতে নিজেই চমকে গেলাম।

ভটকাই একটু পরেই ফিরে এল বোতলটা নিয়ে। বলল, আপনার নামই সই করে দিয়েছি।

বেশ করেছ। মে গড ব্লেস উ।

বোতলটা পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে আবার ঢকঢক।

ভটকাই আমাকে বলল, বাবা আর মাকে খবর দিয়েছি।

কী করে?

কেন মো-ফো-তে।

বুঝলাম, মোবাইল ফোনের কথা বলছে।

বললাম, বাঃ।

কী বলছ তোমরা?

নাঃ, ভাইয়ের খিদে পেয়েছে তাই বলছে।

তা খাওনা তোমরা। অক্টোপাস আর কাঁকড়া খাও। এ হোটেলের খুব নাম আছে ওই দুই ডিশে।

আর আপনি?

আমি বিষ খাব।

আমি বললাম, অত কড়া জিনিস খাচ্ছেন একটু জল মিশিয়ে খেলে হত না।

নো। নেভার। জল আমি কখনও মেশাইনি। না দুধে, না হুইস্কিতে, না জীবনে। আমি নিট বেঁচেছি জীবনে। মরবও নিট। কেন যে মরতে বেশি লোভ করতে গেলাম।

ভটকাই বলল, ওরে নরাধম! ওরই জন্যে তো আমাগো শাস্ত্রে কইছে, লুভে পাপ, আর পাপে মৃত্যু। হঃ।

.

আমরা এয়ারপোর্টের ভিতরে অপেক্ষা করছি। প্লেনটা মরিশাস থেকে আসবে। এয়ার ইন্ডিয়ার প্লেন। ফেরার পথে আবারও মরিশাস হয়ে যাবে। যখন আসি, তখন মুম্বই থেকে সোজাই মাহেতে এসেছিল।

কোনও কারণে প্লেনটা আজ দেরি করছে। তাতে আমাদের কোনও ক্ষতি হয়নি। ভালই হয়েছে। এয়ারপোর্ট ফুল আর মালাতে ছেয়ে গেছে। অপেক্ষারত অন্য প্যাসেঞ্জারেরা ভাবছে হয়তো যে, আমরা কোনও রাজনৈতিক নেতা-টেতা।

ঋজুদা ভটকাই-এর মো-ফো পাবার পরই জাকলিন প্লুজেঁকে মাদাম ব্লঁশের প্রাণ যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছিল। সঙ্গে সঙ্গে জাকলিন স্যেশেলসের ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশকে মোবাইল ফোনে বলে দিয়েছিলেন। জেটিতে প্রালের পুলিশ থাকবে প্লেইন ড্রেসে একটা প্রাইভেট গাড়িতে এবং পিয়ের পৌঁছনোর পর থেকেই তার উপরে নজর রাখবে। মাদাম ব্লঁশের হোটেলের চারপাশে প্লেইন ড্রেসে পুলিশ থাকবে নারকেল বনে লুকিয়ে। অত রাতে পিয়ের মাদামের কম্পাউন্ডে ঢোকামাত্র তাকে ট্রেসপাসিং-এর অপরাধে গ্রেপ্তার করে মাহেতে নিয়ে আসবে এবং চার্জ যা দেওয়ার তা তো দেবেই মঁসিয়ে পঁপাদুর জবানবন্দি অনুযায়ী। সে জবানবন্দি পুলিশ নিয়েও এসেছে। মঁসিয়ে পঁপাদু পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে ঋজুদার মুখে থুথু ছিটিয়ে গেছেন ‘ডাবলসার’ বলে।

ঋজুদা খুবই অপ্রস্তুতে পড়ে ছিল। তারপর হেসে বলেছিল, ইউ আর রং মঁসিয়ে। ইউ আর আ ডাবলসার অ্যান্ড আই অ্যাম এ কোয়াড্রপল ক্রসার। মঁসিয়ে ব্লাঁ, এখন মার্সেইতে আছেন। জাকলিনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঋজুদাকে একটি দশ হাজার ডলারের চেক পাঠিয়েছেন আর অনেক গোলাপ। ফ্রেঞ্চ গোলাপ।

জাকলিনের কাছ থেকে টাকা নেয়নি ঋজুদা। জাকলিন আমাদের সকলকে পুজোর সময়ে পনেরদিনের জন্যে জিনিভাতে নেমন্তন্ন করেছেন। সেখান থেকে কসমস কোম্পানির সবচেয়ে ভাল ট্যুর বুক করে পুরো ইউরোপ দেখিয়ে দেবেন আমাকে আর ভটকাইকে। তারপর বেলজিয়ামের অস্টেন্ড থেকে জাহাজে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ইংল্যান্ডের ডোভার (সেই হোয়াইট রকস অফ ডোভারের বিখ্যাত ডোভার) হয়ে লন্ডন। সেখানে তিনদিন কাটিয়ে সেখান থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ধরে সোজা কলকাতা। ভাবলেও রোমাঞ্চ হচ্ছে।

আজ সকালে জাকলিন একটা সাদা সিল্কের ড্রেস পরে এয়ারপোর্টে এসেছেন। রুবির মালা, রুবির ইয়ারটপ, রুবির ব্রেসলেট। পায়ে একটা লাল জুতো। ইটালির গুচ্চির কি? মাথাতে লাল স্কার্ফ। হাতে লাল গোলাপের গুচ্ছ। গোলাপের গন্ধই ভাল, না জাকলিনের সারা শরীর থেকে যে পারফিউমের গন্ধ উঠছে তার গন্ধ ভাল, তা বুঝে উঠতে পারিনি আমি।

মঁসিয়ে পঁপাদু এবং পিয়েরকে অনেকই অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। চিটিং, মাদাম ব্লঁশকে পিয়েরকে দিয়ে খুন করবার চক্রান্ত, বিনা লাইসেন্সে অতগুলো পিস্তল, গুলি, ইনফ্রারেড দূরবীন রাখা। ইনফ্রারেড দূরবীন শুধু গোয়েন্দা, পুলিশ আর আর্মি রাখতে পারে। ব্যানড আইটেম, এ কে ফর্টিসেভেন রাইফেলেরই মতো। সঙ্গে থাকলে বম্বের ফিল্মস্টার সঞ্জয় দত্তর মতো জেলে পচতে হবে।

ভটকাই বলছিল যে, সঞ্জয় দত্তর না হয় সুনীল দত্ত বাবা ছিল, মঁসিয়ে পঁপাদুর তো বাবা নেই।

কার্লোসকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মারিয়েল ভৈঁয়সা এবং শাঁতাল এই সব চক্রান্তর কিছুমাত্র জানত না। ভৈয়সা অনেক টাকা দিয়ে সত্যি সত্যিই পার্টনারশিপে ব্যবসা করবে ও গুপ্তধন পাওয়া গেলে তার ভাগ পাবে, এ জন্যই পঁপাদুর সঙ্গে একটি বোঝাঁপড়াতে এসেছিল। জাকলিনের সঙ্গে ওর কোনও ঝগড়া নেই বরং মস্কোয় একটি স্কুলে একসময় ওরা দুজনে একসঙ্গে ব্যালে শিখত, তাই দুজনে দুজনকে চেনে এবং পছন্দও করে। পাদু ঋজুদাকে ও সব মিথ্যে করে লাগিয়েছিল।

মিসেস মেক্যাঞ্জি একটি লাইলাক-রঙা ড্রেস পরে এসেছেন আর হলুদরঙা ড্রেস পরে এসেছেন মাদাম ব্লঁশ, প্রালে থেকে। হাতে তাঁর অতি সুন্দর করে সাজানো একটি তোড়া। আমান্ডা-ক্রিশ্চিন-আলবো অর্কিডের। পাতাগুলো সাদা। মধ্যে লাল ফুটকি। আর ফুলটা লাল। নিশ্চয়ই ভিক্টোরিয়ার কোনও নামী ফুলের দোকান থেকে কিনেছেন।

সকলেই খুব খুশি। আমরাও। ঋজুদার উচিত ছিল জাকলিনের কাছ থেকে মোটা ফিজ নেওয়া। কিন্তু কিছুই নেয়নি। কেন কে জানে! টাকার চেয়েও দামি হয়তো কিছু আছে, তাই নিয়েছে বদলে। অথবা নেবে। যে কথা ঋজুদা বলতে চায় না, সেই কথা স্যেশেলসের অতিকায় কচ্ছপের মুখেরই মতো সে নিজে বের না করলে কারোরই সাধ্য নেই যে, টেনে বের করে।

জাকলিন এবং ওঁরা প্রত্যেকেই ‘মিস্টার হ্যান্ডসাম’ এবং তার দুই আসলি চেলা আর চামুণ্ডাকে ক’দিন মাহেতে থেকে যেতে বলেছিলেন, বেড়িয়ে-টেড়িয়ে যেতে।

আমরা তো খুশিই হতাম। কিন্তু গতকাল সকালেই ঋজুদার সেক্রেটারি ই-মেইলে খবর পাঠিয়েছে যে দিল্লি থেকে ডি. জি. টাইগার প্রোজেক্টস লম্বা ফ্যাক্স পাঠিয়েছেন। কলকাতা থেকে চিফ ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেনও তিনবার ফোন করেছেন। খুবই নাকি জরুরি দরকার।

ঋজুদা বলেছে, নিশ্চয়ই কোনও সিরিয়াস ব্যাপার। দেরি করা চলবে না।

অতএব……

এবারের আসল হিরো তো ভটকাই। সকলেই তাকে আদর করছে আর সে লজ্জাতে লাল হয়ে যাচ্ছে। অনেকগুলো সুইস-চকোলেটের বাক্স এবং নানা বিস্কিটের টিন আমরা উপহার পেয়েছি। এতই উপহার পেয়েছি যে, একস্ট্রা লাগেজ হয়ে গেছে। তবে, সে সবের দায়িত্ব নিয়েছেন জাকলিনের প্রাইভেট সেক্রেটারি।

সবই ভাল, ভটকাই শুধু আজ সকালে একটু কেলো করেছিল।

বলেছিল, কী টেনশান! কী টেনশান! স্যেশেলসে এসেও একদিন সুইমিং করতে পারলাম না।

তুই কি সাঁতার শিখেছিস? তোকে বলেছিলাম না যে আমার সঙ্গে আসতে হলে সাঁতার ইজ আ মাস্ট।

হেদোতে সাতদিন শিখেছিলাম তো। যে সাইকেল চালাতে জানে সে সাঁতারও জানে।

তার মানে?

তারপরই বলেছিল, ওই তো! জলের মধ্যে স্টিয়ারিং ঘোরানো আর পা দুটো ছোঁড়া। চলো চলো আজ একটু বো ভাঁলো সি বিচে সাঁতার কেটে যাই। স্যেশেলস-এর বো ভাঁলো সমুদ্রতটে এলাম অথচ সাঁতার কাটলাম না তা লোকে জানলে কী বলবে! ফিরে গিয়ে রক-এ বসে মিন্টে আর গদাদের চোখ কপালে তুলে দেব। ব্রেকফাস্টের আগে খিদেটাও চনমনে হবে। প্লেন তো প্রায় দুপুরে। চলো ঋজুদা, প্লিজ।

ঋজুদার মুড খুবই ভাল ছিল কাল রাত থেকেই। বলল, স্যুইমস্যুট এনেছিস?

আমার তো নেই। তাতে কী? তোমার একটা পাজামা পরে নেব।

পাজামা পরে পারবি সাঁতার কাটতে?

হুঃ। তোমার মঁসিয়ে পঁপাদুকে বিনাযুদ্ধে শুধু মুখের কথাতে কাত করে দিলাম আর শান্ত নীল সমুদ্রে প্রবালের বালির ওপরে সাঁতার কাটতে পারব না। এ তো সমুদ্র বলেই মনে হয় না। এ সব সাহেব-মেমদের পুরীতে আসতে বলো না। ঢেউয়ের রদ্দা খেয়ে হাড়গোড় ভেঙে যাবে। কায়দা সব বোঝা যাবে। আমি পুরীর চ্যাম্পিয়ন।

প্রায়ই যাস বুঝি?

না। একবার গিয়েছিলাম দেড়দিনের জন্যে। শোনো ঋজুদা। বেশিদিন থাকার দরকার হয় না। আমি মাহেতেই বা কদিন ছিলাম। রহস্য তো ভেদ করলাম! কী করিনি?

ঋজুদা বলল, একশোবার। তা হলে চলো সাঁতার কেটেই আসি। কী বলিস, রুদ্র?

আমারও স্যুইমস্যুট ছিল না। তবে ছোট শর্টস ছিল। ঋজুদার একটা ফিকে কমলা রঙের সুইমস্যুট ছিল। চেঞ্জ করে যখন সাদা সমুদ্রতটে সে দাঁড়াল না, নীল সমুদ্রের পটভূমিকাতে, তখন তাকে ওই পোশাকে দেখে আমরাই প্রেমে পড়ে গেলাম।

ভটকাই গলা নামিয়ে আমাকে বলল, হায় হায়! মাইয়া! তুমে এহনে কোথায় গ্যেলা গিয়া? একবার আইস্য দেইখ্যা যাও। মণি! দেইখ্যা যাও।

আমি বললাম, কার কথা বলছিস?

ইডিয়ট! আর কার কথা কম? জাকলিন, জাকলিন। আমার এহনে জাকলিনময় ভুবন। আমার নূতন-বৌদি।

ঋজুদা ছ’ফিট এক ইঞ্চি লম্বা। সুন্দর স্বাস্থ্যের জন্যে অতটা লম্বা দেখায় না। রোগাপটকা হলে তালধিড়িঙ্গি হয়ে যেত। ঋজুদার চোস্ত পাজামাও ভটকাইয়ের প্যাংলা শরীরে মেয়েদের সায়ার মতো ঢলঢল করছিল।

পারে দাঁড়িয়ে আমি মিচকি হাসি হাসতেই ও ডানহাতের দেড়খানা আঙুল তুলে বলল, পাকালাম। পাকালাম! অর্থাৎ, Wait and see! তামিলনাড়ুর কামরাজ নাদার স্টাইলে। তারপর, অতি সযত্নে পাজামার পা গুটোতে লাগল। গুটোতে গুটোতে দুটি পা-ই এমন উচ্চতাতে এল যে, মনে হতে লাগল ওটা পাজামা নয়, আমাদের পাড়ার ধুতি-পরে অফিস-যাওয়া ভবতারণবাবুর সাদা লং-ক্লথের আন্ডারওয়্যার।

ভটকাই অত্যন্ত স্মার্টলি একটা গান গাইতে গাইতে ‘এই কুমির তোর হলে নেমেছি’! বলে ছেলেবেলাতে আমরা যেমন কুমির কুমির’ খেলতাম, তেমনি করে জলে নামল। যে গানটা ও গাইছিল, সেটা একটা রবীন্দ্রসংগীত।

‘ওগো জলের রানী,
ঢেউ দিয়ো না, দিয়ো না ঢেউ, দিয়ো না গো
আমি যে ভয় মানি।
ওগো জলের রানী।

জলের মধ্যে ঋজুদা অনেক দূর চলে গেছে। আমি মাঝামাঝি জায়গাতে সাঁতার কাটছি। কী একটা হাঙরের নাম বলেছিল ঋজুদা যেন! সে প্ল্যাঙ্কটন খায়। তা ভাল কথা! কিন্তু মুখ বদলাবার জন্যে হঠাৎ যদি আমার একটা পা খেতে ইচ্ছে হয়? যাই হোক। দারুণ লাগছে কিন্তু। মাথার ওপরে স্যুটি-টার্নরা ডাকাডাকি করছে। দূরের জেটিতে কোনও স্টিম-বোট ভোঁ দিল। ঝকঝক করছে রোদ্দুর। ধীরে বইছে। সকালের শান্ত হাওয়া। ভারী চমৎকার লাগছে।

একবার পেছন ফিরে চেয়ে দেখি, ভটকাই নেই। নেই তো নেই। পরক্ষণেই মনে হল, কেন নেই? আড়াআড়ি তীরের দিকে সাঁতরে যেতে যেতে দেখলাম, ভটকাই একবার উঠছে আর একবার ডুবছে। তবে ভয়ের কিছু নেই, কারণ সেখানে জল এক কোমরও নয়। আমি ওর কাছে যেতেই ও চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়ল। আমি ওর হাত ধরে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে বালিতে টেনে তুলে ওর অবস্থা দেখে কাঁদব কী হেসে কুটিপাটি হতে লাগলাম।

ভটকাই, রণক্লান্ত, বিধ্বস্ত সৈনিকের মতো বালির ওপরে শুয়েছিল। সামনে পা ছড়িয়ে। আর তার পায়ের দৈর্ঘ্যের দেড়গুণ লম্বা ভেজা পাজামাটা নেতিয়ে লেপ্টে ছিল বালিতে। আসলে প্রথম ঢেউ লাগামাত্রই ভবতারণবাবুর অ্যামবিশাস আন্ডারওয়্যার লম্বা হতে আরম্ভ করেছিল। ঢেউয়ের আঘাতে ঋজুদার পাজামাও লম্বা হতে হতে যেই ভটকাইয়ের পা ছাড়িয়ে গেল, তখনি ভটকাই ধাঁই ধাঁই করে আছাড় খেতে লাগল। জলে দাঁড়িয়ে যতই আবার গোটাতে যায়, ততই আরও নেমে যায়। তারপরে ভিজে যাওয়াতে ভারী হয়ে গেল। আর গোটাতে, গেলেই সেই পাজির-পাঝাড়া পাদুর মন্ত্র-পড়া পাজামা আপত্তি করে সোজা হয়ে পড়ে যায়। এমনি করতে করতে পুরোটাই গেল খুলে। আর ধাঁই-ধপাধপ! ধাঁই-ধপাধপ! ধাঁই-ধপাধপ!

আমি কাছে যেতেই, ভটকাই বলল, তোরা কি স্পোর্টসম্যান নাকি? সেমসাইড গোল দিস, সাবোটাজ করিস, কুনোই টিম স্পিরিট নাই তগো। যা, গিয়া বল তোর ঋজুদাকে। হঃ।

.

একসময়ে প্লেন এল। আমরা উঠলাম। অনেক হ্যান্ডশেক, অনেক হাত নাড়া এবং…।

ঋজুদা জাকলিন প্লুজেঁর দু-চোখে দুটো চুমু খেল।

ঋজুদার সবই অদ্ভুত। চুমু খাওয়ার এত জায়গা থাকতে চোখে আবার কেউ চুমু খায় নাকি? ভটকাই বলল।

সিঁড়ি দিয়ে আমরা যখন প্লেনে উঠছি, আমি পেছনে আর ভটকাই আগে আগে, ঋজুদা আমার পেছনে পেছনে, ভটকাই নিচুস্বরে গাইতে লাগল–

চোখ গেল।
চোখ গেল।
চোখ গেল পাখি রে,
চোখ গেল পাখি।

প্লেনটা টেক-অফফ করার পরেই আসবার সময়ে যে অপূর্ব দৃশ্য দেখেছিলাম, তেমন দৃশ্যই আবার ফুটে উঠল। নীল, সবুজ, সাদা, লাল, কালো, কতরকমের ছায়া যে জলে, আর কত রঙের যে পাহাড় আর জঙ্গল। মনটা সত্যিই খারাপ হয়ে গেল।

ঋজুদা বলল, তোদের নিয়ে এখানে একবার শুধুই বেড়াতে আসব। আরিন্ড আইল্যান্ড যাওয়া হল না, যেখানে বার্ড স্যাংচুয়ারি, ‘ভ্যালি দ্য মেইতেও যাওয়া হল না, মাহেতে বো ভাঁপোর একটি জায়গাতে, যেখানে গুপ্তধন খোঁজাখুঁজি করছে। একটি কোম্পানি, সেই সব গুহা তোদের দেখানো হল না। খুব ভাল ক্রেওল খাবার পাওয়া যায় একটি ছোট্ট ঘরোয়া রেস্তোরাঁতে, নাম, মারি আঁতোয়ানেতে’, সেখানে তোদের নিয়ে গিয়ে খাওয়ানো হল না। সেখান থেকে ভিক্টোরিয়া শহরটা কী সুন্দর যে দেখায়! বেঁস্তোরাটা একটা পাহাড়ের ওপরে। ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাভিনিউতে মস্ত বড় স্যুভেনির মার্কেট আছে, সেখানে নানা রঙবেরঙা শাঁখ, প্রবাল, নারকোলের তৈরি জিনিস, জামাকাপড় ইত্যাদি পাওয়া যায়। তোরা তো স্যুভেনির বলতে কিছুই নিতে পারলি না।

ভটকাই বলল, ধাঁই ধাঁই করে আছড়ে পড়ে সারা শরীর ছড়ে গেছে, আমার এই একমাত্র স্যুভেনির। আর কী! আর তোমরা কে কী নিলে তা তোমরাই জানো।

আমরা হেসে উঠলাম।

আমি বললাম, আরিন্ড আইল্যান্ডে গিয়ে সামুদ্রিক পাখি দেখা হল না, এইটাই সবচেয়ে দুঃখের।

ভটকাই বলল, মাদমোয়াজেল প্লুজেঁকে বলল যে এখানে একটা দ্বীপ কিনে নিতে। শুনলাম তো যে কত দ্বীপ আনচার্টেড আছে। মাহেতে হেলিকপ্টার থাকবে। নিজের দ্বীপে হেলিকপ্টার করে গিয়ে নেমে নিজের বাংলোতে জম্পেশ করে অক্টোপাস আর কাঁকড়া খাবে, চিংড়ি মাছের মালাইকারি।

শুধু কি তাই? আরও কত্ত মাছ পাওয়া যায় এখানে। ম্যাকারেল তো খেলিই প্রাসেঁতে, তা ছাড়া আছে স্যামন, জব, টুনা এবং হাঙর। বুরজুয়া মাছ আছে। তা এখানের লোকে খুব তৃপ্তি করে খায়। বুর্জোয়ারা জানলে দুঃখ পেতে পারে।

প্লেনটা স্যেশেলস আইল্যান্ডসের দ্বীপমালার ওপরে রোদ-ঝকঝক দুপুরে একটা মস্ত বড় পাক মেরে আস্তে আস্তে ওপরে উঠতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরেই মেঘের ওপরে উঠে যাবে, তখন মেঘের গালচের ওপর দিয়ে চলবে প্লেন, নীচের সুন্দর পৃথিবীর কিছুই দেখা যাবে না। যা দেখা যাবে, তাও চেনা যাবে না পরিচিত নদী বা পাহাড় বলে।

ভটকাই বলল, আরিন্ড দ্বীপে কী কী পাখি দেখা যায় ঋজুদা?

অনেক পাখি। ব্রাউন নডি-টার্ন তো দেখলিই, লেসার-নডিও দেখলি। স্যুটি-টার্ন দেখলি, সাদাকালো।

স্যুটি বানান কী?

Sooty! ফেয়ারি-টার্ন বলে একরকম সুন্দর দুধসাদা উজ্জ্বল কালো চোখের টার্ন দেখা যায় এখানে, তবে স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জের মাঝামাঝি যে সব দ্বীপ আছে, সেখানেই শুধু দেখা যায় ওদের। জানিস তো, সুটি টার্ন-এর ডিম আবার সেশোলোয়াদের প্রিয় খাদ্য। ডিমের মধ্যে লাল ছিট ছিট থাকে। ফল-খাওয়া বাদুড়ও এদের প্রিয় খাদ্য।

এ মা! বাদুর!

ভটকাই মুখ ভ্যাটকাল।

হ্যাঁ রে! বাদুর, মেঠো ইঁদুর, বুনো শুয়োর, খরগোশ এ সবেরই মাংস তো খুবই ভাল। কম্যান্ডোদের এসবের মাংস খেতে শেখানো হয়। তারা তো মাটন বা চিকেন পায় না।

তাই?

হ্যাঁ।

পাখির মধ্যে আরও আছে–হোয়াইট-টেইলড ট্রপিক বার্ড। তাদের অবশ্য দেখা যায় আরিন্ড ছাড়াও কাজিন আইল্যান্ডে। ম্যাগপাই রবিন দেখা যেত কমবেশি সব গ্রানাইট দ্বীপেই। কিন্তু আজকাল প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশটা ভ্যারাইটি দেখা যায় ফ্রিগেট আইল্যান্ডে। স্যেশেলসের আরেক রকম পাখি হচ্ছে নীল-পায়রা। তাদের ঝুঁটিটা আবার লাল আর বুকের কাছে সাদা চিহ্ন। ঘাড়ের কাছটাও সাদা অবশ্য।

তারপরে ঋজুদা বলল, এখানের এক রহস্যময় পাখির কথা যে নাবিকেরা প্রথম দিকে এইসব দ্বীপে নেমেছিল, তারা উল্লেখ করে গেছে।

কী পাখি?

নীল-মুরগি।

তাই?

হ্যাঁ। হয়তো কায়মা বা আমাদের কাম পাখি, যার ইংরেজি নাম Moor hen দেখেছিল।

কিন্তু Moor hen তো জলা জায়গাতে, বিলে থাকে, সমুদ্র পারের পাখি তো তারা নয়।

কে জানে! পক্ষীবিশারদেরাই বলতে পারবেন।

তুমি পক্ষীবিশারদ নও?

আমি কিছুই নই। আমি মিস্টার গুলেড়উ।

ঋজুদা বলল।

মানে!

মানে আবার কী, যে গুল মারে।

তুমি কি গুল বাঘ?

ভটকাই বলল, হাসতে হাসতে।

তারপর ঋজুদা বলল, এ সব কথা থাক, এখন বল তো দেখি এ যাত্রায় তোদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী হল?

কী?

ভেবে বল।

অনেক ভেবেছি এ ক’দিন। আর ভাবতে পারছি না। ভেবে ভেবে মাথা জ্যাম হয়ে গেছে। তুমিই বলো।

মদের মতো খারাপ জিনিস নেই। দেখলি তো! মঁসিয়ে পঁপাদুর মতো ধূর্ত মানুষ মদের নেশাতে কীভাবে নিজের সর্বনাশ করল। জীবনে কখনও ও সব ছুঁবি না। বুঝেছিস।

হুঁ।

আমরা দুজনে একসঙ্গে বললাম।

জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমি উদাস হয়ে গেলাম। ঋজুদা টয়লেটে গেল সিটবেল্ট সাইন অফফ হয়ে যাওয়ার পরে।

জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে আমি উদাস হয়ে গেলাম। ভটকাই আমাকে লক্ষ করছিল।

বলল, কী রে! রোদ্র! মন খারাপ করছে এমন একটা স্বপ্নের দেশের মতো জায়গা ভাল করে না-দেখেই চলে যেতে হচ্ছে বলে!

না রে। সে জন্যে নয়।

তবে?

ঋজুদা যদি সত্যিই বিয়ে করে জাকলিনকে, তবে আমাদের দল ভেঙে যাবে।

তাই মনে হয় তোর?

মনে হবে না? নাটকের দল, যাত্রার দল, মাছ-ধরার দল, পর্বতারোহীর দল, শিকারির দল, সবই ভেঙে যায় দলের অধিকারী যদি বিয়ে করে।

কী করবি বল? আমাদের তো এ বিষয়ে কোনও হাত নেই। তবে হলে খারাপই বা কী? আরে ভাবী হো তো অ্যায়সা।

তোর কিন্তু ইংরেজিটা ভাল করে শিখতে হবে।

আরে রাইখ্যা দে তোর ছাতার ইংরাজি। আমি ফ্রেঞ্চও শিইখ্যা ফেলাইমু অমন একখান বৌদি যদি পাই।

এমন সময় ঋজুদাকে আসতে দেখা গেল।

কী আলোচনা হচ্ছিল রে?

হাসি হাসি মুখে ঋজুদা বলল।

ভটকাই বলল, এই বলছিলাম তুমি অধিকারী আর আমরা অনধিকারী।

তার মানে?

মানে কিছু নয়। আমাদের লাঞ্চ দেবে তো ঋজুদা এখন? সকাল থেকে হোটেলে এত লোক, এত ফুল, এত মালা একটু নিরিবিলিতে বসে যে ব্রেকফাস্টটা জমিয়ে খাব তার সুযোগ হল কই?

দেবে দেবে। এয়ারক্র্যাফট-এর পাইলট, কো-পাইলট এবং স্টুয়ার্ডরা কি দেখেনি যে আমরা কেমন ভি আই পি? অর্ধেক ফুল তো এয়ার হোস্টেসদেরই দিয়ে দিলাম। স্যেশেলস-এর ফুল আর অর্কিডের কদরই আলাদা। যারা রসিক, তাদের কাছে। দেখিসই না! আমাদের স্পেশাল খাতির করবে।

ভটকাই বলল, দেখাই যাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *