ঋজুদার সঙ্গে স্যেশেলসে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

বলেই, ভটকাই উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড়টা বাঁ দিকে একটু কাত করে শরীরটাও বাঁ দিকে হেলিয়ে দুটো পা অসমানভাবে ফেলতে ফেলতে ঋজুদার স্যুইটের ড্রইং রুমের কার্পেটের ওপরে হেঁটে দেখাল।

ঋজুদা বলল, সন্দেহ নেই যে, মঁসিয়ে পঁপাদুর হাঁটার ঋতি ঠিক এরকমই।

ঋতি? ঋতি কী?

আমি বললাম।

ভটকাই বলল, সবিনয় নিবেদন পত্রোপন্যাসের নায়িকা। জানিস না?

সবিনয় নিবেদন আমি পড়িনি।

ভটকাই বলল, অন্যায় করেছ। কলকাতাতে ফিরেই পড়ে ফেলো।

ঋজুদা বলল, GAIT! তোরা এমনই সাহেব হয়েছিস রুদ্র যে, ইংরেজি শব্দ দিয়ে তোদের বাংলা শব্দের মানে বোঝাতে হয়। সত্যি!

তারপরই বলল, তুই ওর গেইট কোথায় লক্ষ করলি ভটকাই?

কেন? তোমার বিশপ লেফ্রয় রোডের ফ্ল্যাটে যখন এসেছিল।

মানে? ফ্ল্যাটের মধ্যে ও আর কতটুকু হেঁটেছিল?

ওই লিফট পর্যন্ত তো হেঁটেছিল। তাতেই দেখে নিয়েছি।

তারপরে বলল, ঋজুদা, রুদ্র আমাকে যতই আওয়াজ দিক না কেন, তোমার কাছে আসার আগে, আমি শার্লক হোমস আর শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় গুলে খেয়ে এসেছি।

হু। তাই তো দেখছি।

হেসে বলল, ঋজুদা!

তারপরে বলল, থ্যাঙ্ক ঊ্য ভটকাই। এখন ‘পাইরেট আর্মস’-এ ডিনার খেতে যাওয়ার আগে আমার কতগুলো কাজ করার আছে। সেগুলো যতক্ষণ করছি একটাও কথা বলবি না।

ঠিক আছে।

ঋজুদা ফোনটা তুলে একটা নাম্বার ডায়াল করল। করে, ফোনের অ্যামপ্লিফায়ারের সুইচটা দিয়ে দিল যাতে কথোপকথন আমরাও শুনতে পারি।

ওদিক থেকে রিসিভার ওঠাতেই ঋজুদা বলল, শুভ ইভনিং মাদাম ব্লঁশ। আমি বোস বলছি। আপনি আজকে তো অবশ্যই, এবং এরপরেও কয়েকদিন রাতে হোটেলে থাকবেন না। আমার অনুরোধ। অন্য কোথাও চলেও যেতে পারেন, যদি পারেন। আফ্রিকাতে, জাক-এর কাছে।

ওপাশ থেকে উনি বললেন, কেন?

আপনার বিপদ হতে পারে। আপনি রাতে একেবারেই একা থাকেন, সব লোকজনই তো চলে যায়, তাই না?

তা যায়। কিন্তু প্রালে বড় শান্তির জায়গা। এখানে কীসের ভয়?

পিয়ের ওই ম্যাপগুলো লোক পাঠিয়ে কি আপনার কাছ থেকে নিয়ে গেছে?

না তো। এখনও কেউ আসেনি।

মাদমোয়াজেল ব্লঁশ, দয়া করে শুনুন যা বলছি। পিয়ের আজ সকালে বোটে করে মাহেতে ফিরে যায়নি। সে প্রালেঁতেই ছিল। আপনাকে সে মিথ্যা কথা বলেছে। তাতেই আমার চিন্তা হচ্ছে। পিয়ের আজ আমাদের সঙ্গেই শেষ প্লেনে ফিরেছে। পরে যখন দেখা হবে তখন সব আপনাকে বুঝিয়ে বলব। অনেক কথাই বলার আছে। কিন্তু আমার একটা দায়িত্ব আছে, তাই অনুরোধ করছি আপনাকে। প্লিজ, অন্য কোনও বন্ধুর বাড়িতে, জেটির কাছে, বা অন্য কোনও হোটেলে গিয়েই থাকুন রাতটা, কটা রাত। আপনার হোটেলটা বড় নির্জন। যদি জাক-এর কাছে তানজানিয়াতে চলে যেতে পারেন তবে তো ভালই! এখান থেকে ডার-এস-সালাম হয়ে আরুশার ফ্লাইট তো রোজই আছে।

তা তো জানিই। নির্জনতা ভালবাসি বলেই তো প্রালের এই নির্জনে জায়গা কিনে হোটেলটা বানাই। আমি কোথাওই যাব না।

আমার কথাটা আরেকবার ভেবে দেখবেন মাদাম ব্লঁশ। প্লিজ।

ওও! উ মাস্ট হ্যাভ গন ক্রেজি মিস্টার হ্যান্ডসাম। হু অন আর্থ উইল হার্ম মি? আই হ্যাভন্ট হার্মড এনি বডি। নো, নেভার।

কথাটা এত জোরে জোরেই বললেন যে, আমাদের কানেও ধাক্কা লাগল।

শেষে বললেন, নেভারদিলেস, থ্যাঙ্ক ঊ্য ভেরি ভেরি মাচ ঋজু, ফর দ্য কনসার্ন উ্য হ্যাভ শোন ফর মি। নাউ, গুড নাইট মিস্টার হ্যান্ডসাম। মে গড ব্লেস উ্য।

ঋজুদার মুখটা কালো হয়ে গেল।

বলল, মে গড ব্লেস উ্য ট্যু।

কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে থাকলাম।

আমি বললাম, ব্যাপারটা কী?

ঋজুদা বলল, পরে বলব। বলেছি না এখন কথা না বলতে।

আমি অপ্রতিভ হয়ে চুপ করে গেলাম।

তারপর ঋজুদা আর একটা নাম্বার ডায়াল করল।

হাই কার্লোস।

বলল, ঋজুদা।

কার্লোস বলল, ইয়েস মঁসিয়ে বোস। প্লিজ অর্ডার।

কাউকে এখানে পাঠিয়ে তুমি আর্মসগুলো ফেরত নিয়ে নাও।

সেকী! কেন? ইওর মিশান ইজ ডেঞ্জারাস। ওরকম পাগলামি কোরো না।

ঋজুদা বলল, না, না। আমার মনে হয় না এ সবের কোনও প্রয়োজন আছে।, না বলেছি তো। বিপদের কিছুই এতে আমি দেখছি না। মিছিমিছি। বিদেশ-বিভুঁইয়ে আনলাইসেন্সড পিস্তল-রিভলভার সঙ্গে রেখে কি মারা পড়ব নাকি। পুলিশে ধরলে কত বছরের জন্যে জেলে পুরে দেবে? আর না, না। বলছিই তো। কখন পাঠাবে তোমার লোক? না না, আমরা ডিনার খেতে যাব বাইরে…না, কোথায় যাব তা এখনও ঠিক করিনি…

তারপর বলল, তোমার লোককে চিনব কী করে?

কী করবে? তোমার ওই গাড়িটা নিয়েই আসবে, যে আসবে? ও। সে দেখতে কেমন? স্যেশোলোয়া? বেঁটে? মোটা? টাক আছে? ও কে। না, না আমার ঘরেই পাঠাবে। সব আমার কাছেই আছে।

বাইই। গুডনাইট।

ভটকাই বলল, ওর সেই গাড়ি মানে, সেই ভ্যানটা?

হ্যাঁ।

আমি বললাম, কী যে করছ ঋজুদা বুঝতে পারছি না। খালি হাতে ওই দোর্দণ্ড ক্ষমতাবানদের সঙ্গে আমরা লড়ব কী করে?

সব বোঝার দরকার নেই। নাইলনের কালো দাড়িগুলো এনেছিস তো? ফাঁসগুলো ঠিক মতো লাগানো আছে?

সব ঠিকঠাক।

ক্লোরোফর্মের শিশিগুলো?

আমি বললাম, তাও ঠিকঠাক।

ঠি। আ।

ভটকাই বলল। মানে, ঠিক আছে।

উত্তেজিত হলে, ও কোনও শব্দেরই শেষ অক্ষর উচ্চারণ করে না।

আমাদের হাতিয়ার হারানোর দুঃখটা সামলে নিয়ে ভটকাই বলল, খালি হাতে আবার কী? এসেছ ন্যাংটো, যাইবে ন্যাংটো মাঝখানে কেন গণ্ডগোল?

ঋজুদা বলল, তোদের ব্যাগগুলো আমার ঘরে পৌঁছে দিয়ে তোরা তোদের ঘরে গিয়ে বোস। কার্লোসের লোক চলে গেলে তোদের ডেকে নেব।

ঠি। আ।

বলে, ভটকাই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

ঋজুদা আমার দিকে চেয়ে হাসল। বলল, ডাকামাত্রই ফিরে আসবি। জরুরি কথা আছে।

একা আসব?

না রে। যা দেখছি, তাতে এখন তো আর তাকে বাদ দেওয়া যাবে না। সেই তো নেতা হয়ে গেছে। নারে রুদ্র, ভটকাই অনেকই উন্নতি করেছে। ওকে আমাদের দলে রিক্রুট করার কৃতিত্ব কিন্তু সবটাই তোর।

আমার কী কৃতিত্ব। তোমার ট্রেইনিং পেয়েই তো হয়েছে। তা ছাড়া সত্যিই ও খুব বুদ্ধিমান। ভাল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ার সুযোগ পেলে ও আরও..

হাঃ। একটা পূর্ণ বাঁদর হত। খুব সম্ভবত… ঋজুদা বলল।

তারপর বলল, যার ভাল হওয়ার সে নিজের গুণেই ভাল হয়, পারিবারিক পটভূমির, পরিবেশের, প্রতিবেশের এবং ঐতিহ্যের গুণে। স্কুলের গুণেই যদি সকলেই ভাল হয়ে যেত তবে ঘুষখোর, ঘুষের দালাল, কাট-মানি মাস্টার, ওষুধে আর খাবারে ভেজাল-দেওয়া ব্যবসায়ীদের ছেলেরা আর সব রাজনীতিকদের ছেলেরাই সমাজের মাথা হত! তা তো হয় না। হয় কি?

না, তা অবশ্য সব সময়ে হয় না।

সব সময়ে কী রে? খুব কম সময়েই হয়। বড়লোক হওয়াই তো মানুষের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয় রে রুদ্র। ভটকাইয়ের মতো বাংলা-মিডিয়াম স্কুলে পড়া ভারতীয় ছেলেরা যদি মানুষ হয়ে উঠতে পারে, তা হলেই জীবন সার্থক হবে। এই হতভাগা দেশেরও প্রকৃত উন্নতি হবে।

একটু চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঋজুদা বলল, মীর-সাহেবের সেই একটা শায়েরি আছে না? ইহাঁ আদম নেহি হ্যায়, সুরত এ আদম বহত হ্যায়।

মানে?

মানে, এখানে মানুষ নেই। মানুষের মতো দেখতে অনেক প্রাণী আছে।

ঋজুদার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে আমি চলে এলাম।

জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বো ভাঁলো সমুদ্রতট আলোতে আলোময় হয়ে রয়েছে। সমুদ্রের হাওয়ায় গাছপালা উথাল-পাথাল করছে। কালো ছায়ার প্রবালের সাদা বালির ওপরে এক্কা-দোক্কা খেলছে। তটের ও পাশে ছুঁতে-নীল সমুদ্রকে এখন কালো দেখাচ্ছে। আলোর বৃত্তর বাইরে অন্ধকারকে সবসময়েই ঘোরা বলে মনেই হয়।

পনেরো মিনিট পরে ফোনটা বাজল। ঋজুদার ফোন। বলল, আমি যাচ্ছি। তোদের ঘরে।

আমি উঠে দরজা খুললাম। ঋজুদার ঘর আমাদের ঘর থেকে চার-পাঁচটা ঘর পরে। ঋজুদা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পরে বলল, হঠাৎ মনে হল, আমার ঘর বাগডও হতে পারে। তাই তোদের ঘরেই এলাম।

‘বাগড’ মানে?

ভটকাই বলল।

মানে। কথাবার্তা টেপ করার জন্যে, ফোনের কথাও টেপ করার জন্যে যন্ত্রপাতি রাখা থাকতে পারে।

আমি বললাম।

এত বড় হোটেল অ্যালাও করবে?

টাকা রে ভটকাই, টাকা। আগেকার দিনে গুণে আর স্বভাবে জগৎ বশ হত, এখন হয় টাকাতে। শুধুই টাকাতে।

তারপর বলল, ইংরেজি শব্দ যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভাল। এখানে বাংলা বলনেওয়ালা কেউ আছে বলে তো মনে হয় না।

আ মরি বাংলা ভাষা!

ভটকাই বলল।

তুমি মাদাম ব্লঁশকে সাবধান করলে কেন?

আমরা দুজনে একই সঙ্গে বললাম।

ভদ্রমহিলাকে খুন করতে পারে।

কে?

পিয়ের।

কেন?

অকারণেই। সম্পূর্ণ মিছিমিছি।

তারপর ভটকাইকে বলল, কিছু বুঝলি ভটকাই?

না।

অ্যাস্টভ আইল্যান্ডে গুপ্তধন আদৌ পোঁতা নেই। মাদাম ব্লঁশ যা বলেছেন সবই আদ্যিকালের গপ্পো, লোকের এরকম ধারণা আগে ছিল। পিয়েরই আগের দিন মাদামকে এ সব গল্প আরেকদফা শুনিয়ে গেছে। মহিলা সরল, কিছুই বুঝতে পারেননি। আসলে, আমাদের সেখানে পাঠাতে পারলে ওদের কাজ হাসিল করতে সুবিধে হবে। আমার দৃঢ় ধারণা, মাহের দক্ষিণ দিকের প্রায় পরিত্যক্ত নির্জন তটে অথবা লা-ডিগ আইল্যান্ডে এমনকী প্রালেঁতেও গুপ্তধন থাকতে পারে। প্রালেঁতে সবসুদ্ধ আঠারোটি তটভূমি আছে, যার অনেকগুলিই পরিত্যক্ত। পিয়ের, আমাদের ভাঁওতা দেওয়ার জন্যেই গেছিল মহিলার হোটেলে। ও ভেবেছিল, ও খুব চালাক। সত্যিই যদি অ্যাস্টভ আইল্যান্ডেই গুপ্তধন পোঁতা থাকত, তা হলে সেই ম্যাপ সে অমনভাবে কাছা-খোলার মতো ফেলে যেত না। সম্পত্তিও তার বাবার নয়। অন্য মানুষদের। বাবার হলেও কেউ অমন করত না। আমি যে মঁসিয়ে ব্লঁশকে চিনি এবং ওদের ওখানে গতবারে এসে সাতদিন কাটিয়েও ছিলাম, তা ও জানে। মাদাম ব্লঁশ ম্যাপের কথা ও তার নির্দেশও আমাকে দিয়েছেন এ কথাও সে জেনে গেছে। তোরা তো শুনলিই মহিলা বললেন, ফোনে। এখন ও ভদ্রমহিলাকে খুন করলে, ও নিশ্চিত হতে পারে যে, আমি অবশ্যই ভাবব যে, ম্যাপটা সত্যি। এবং গুপ্তধনও অ্যাস্টভ আইল্যান্ডেই আছে।

তোমাকে সে কথা বিশ্বাস করবার চেষ্টাতে ভদ্রমহিলাকে খুন করবে পিয়ের? বলো কী?

আমি বললাম।

আমার মনে হচ্ছে করবে এবং এই নাটকের যবনিকা এখনই টানা যেতে পারে, যদি আমরা পিয়ের অথবা যারা নিয়োগ করেছে তাদের, হাতেনাতে ধরতে পারি। তাতে মাদাম ব্লঁশের প্রাণটাও বাঁচবে এবং আমাদের কাজও হাসিল হবে।

কী করে?

পিয়ের বা তার অনুচরকে পুলিশ জেরা করলেই ওদের পেছনে কারা আছে তা বেরিয়ে পড়বে। বেরিয়ে পড়বে গুপ্তধনেরও হদিস। হয়তো।

কিছুই বুঝলাম না। আমি বললাম। আমরা তো জানি যে পিয়েরের পিছনে আছে জাকলিন প্লুজেঁ। তাঁর হয়েই কাজ করছে পিয়ের।

ঋজুদা একটু চুপ করে থেকে বলল, না। ভটকাই ঠিকই সন্দেহ করেছিল। জলদস্যু ইঁদুলের পুতি মঁসিয়ে পঁপাদু, ডাবল-ক্রশ করেছে আরেক ডাকাত দেনির পুতি মঁসিয়ে ব্লঁদাকে এবং ভিলেন বানিয়েছে ম্যাপের তৃতীয় টুকরো যার কাছে ছিল, সেই ফ্রেদরিকের বংশধর মাদমোয়াজেল জাকলিন প্লুজেঁকে। পিয়ের, মাদমোয়াজেল প্লুজেঁর নয়, মঁসিয়ে পঁপাদুরই লোক। প্লুজেঁর সঙ্গে ভৈঁয়সার পুরনো ঝগড়াকে কাজে লাগিয়ে দুজনের কাছেই মিথ্যে বলে ও নিজেই মঁসিয়ে ব্লঁদা ও মাদমোয়াজেল ভৈঁয়সাকে মিছিমিছি জড়িয়েছে এতে। ওঁদের কাছ থেকে আমাদের নাম করে মোটা টাকাও নিশ্চয়ই নিয়েছে। ওদের দুজনকে খুনও করতে পারে ও। প্লুজেঁকেও করতে পারে খুন। যাদের নিজেদের অর্থোপার্জনের যোগ্যতা নেই, অথচ টাকার প্রয়োজন এবং লোভ আছে প্রচণ্ড, তারা টাকার জন্য সব কিছুই করতে পারে। তাদের অসাধ্য কিছু নেই। আসলে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে গতরাতে আমি অনেকই চিন্তা করেছি। আমার ধারণা, গুপ্তধনের আসল ম্যাপটির সবচেয়ে জরুরি টুকরোটি ইদুলের লকারেই ছিল, মানে যিনি মঁসিয়ে পঁপাদুর পূর্বপুরুষ। প্লুজেঁ এবং ব্লদাঁকে ঠকাবার জন্যেই সে আমাদের কাছে এই সব গল্প বানিয়ে বলেছে। যাই হোক, আজ রাতেই আমরা সত্যি-মিথ্যা সবই জেনে যাব। পাইরেট আর্মস’-এ ডিনার খাওয়ার জন্যে আমি ওঁকে নেমন্তন্ন করেছি।

কাকে? পিয়েরকে না মঁসিয়ে পঁপাদুকে?

না রে। মাদমোয়াজেল প্লুজেঁকে। মিসেস মেক্যাঞ্জিকেও নেমন্তন্নও করেছি। খুঁজে এই হোটেলে আদৌ ওঠেননি। তবে এখানে এসেছেন ঠিকই। উঠেছেন এখানকার আর এক দারুণ হোটেল প্ল্যান্টেশন ক্লাব’-এ।

সে হোটেলটা কোথায়?

বো ভাঁলো বিচ-এই।

মাদমোয়াজেল প্লজেঁর মতো অতি-ধনী মহিলা ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাভিনিউতে ওই সাধারণ ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁ পাইরেট আর্মস-এ আসবেন?

ভটকাই সন্দেহ প্রকাশ করে বলল।

ঋজুদা বলল, বুদ্ধিমতী বলেই আসবেন। পাদু বা ব্লঁদা কেউই সন্দেহই করবে না যে মাদমোয়াজেল প্লুজেঁর মতন বহু লক্ষ কোটিপতি তরুণী ভাড়ার ট্যাক্সি করে ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাভিনিউর ওপরে ওইরকম একটা জনগণের রেস্তোরাঁতে গিয়ে ডিনার খাবেন।

তা মিসেস মেক্যাঞ্জিকে ডাকলে কেন?

ভটকাই বলল।

আছে, কারণ আছে। প্লুজেঁর কেনিয়া এবং তানজানিয়াতে যে ট্যুর অ্যান্ড সাফারি কোম্পানি আছে, তারই ম্যানেজার ছিলেন মিসেস মেক্যাঞ্জির স্বামী ডনাল্ড। তিনি মারা গেছেন দুবছর আগে। আর মাদাম ব্লঁশের স্বামী জাক এখন ম্যানেজার ওই কোম্পানিরই। মাদমোয়াজেল প্লুজেঁ তো আমাকে চেনেন না। মাদাম ব্লঁশ এবং মিসেস মেক্যাঞ্জি তাঁদের স্বামীদের সূত্রেই আমাকে ভাল করে চেনেন। আমি তো একাধিকবার ওঁদের দুজনের কাছে থেকেও গেছি এখানে। এবং প্রালেঁতেও। প্রয়োজনে, মাদমোয়াজেল প্লুজেঁ মিসেস ব্লঁশের সঙ্গেও কথা বলে নেবেন আমাকে বিশ্বাস করার আগে। তা ছাড়া, আমরা তো ওঁর বন্ধুই। শত্রু তো নই। তবুও ওঁর যাতে কোনও সন্দেহই না হয়, তাই ওঁকে ডেকেছি।

আমি আর ভটকাই চুপ করে রইলাম।

প্ল্যানটা বুঝতে কি খুবই অসুবিধে হচ্ছে তোদের?

না, তা নয়। তবে এই প্ল্যান কি তুমি কলকাতাতে বসেই করেছিলে?

আমি বললাম।

নিশ্চয়ই। নইলে এত দূরের বিদেশি শহরে কেউ একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে আসতে রাজি হয়? এ তো আর আদিগন্ত বিশ্বটাঁড় জঙ্গুলে আফ্রিকা নয়। জঙ্গল আমার নিজের জায়গা। সে, যে জঙ্গলই হোক। মেক্যাঞ্জি এবং ব্লঁশ দুজনেই যে জ্যাকলিন প্লুজেঁর বাবার আমল থেকেই ওঁদের সঙ্গে যুক্ত তা তো আমি আগেই জানতাম। এবং খুব সম্ভবত মঁসিয়ে পঁপাদু সে খবর রাখত না। তাই সাহস পেয়েছিলাম এই গুরুদায়িত্ব নিতে। তবে মঁসিয়ে পঁপাদু যে ওদের ডাবল-ক্রস করবে, সেটা ভাবতে পারিনি। আর পিয়েরটা যে একটা দাগি খুনি, তাও নয়। এখন দেখা যাক।

মনে হয় মাদমোয়াজেল প্লুজেঁ বন্ধু হিসেবে অত্যন্তই ক্ষমতাবান হবেন।

ভটকাই বলল।

ওঁর মাধ্যমে স্থানীয় পুলিশের সাহায্যও পাওয়া যাবে। কিন্তু আমি আসলে জাকলিন প্লুজেঁর শত্রু হিসেবে আসিনি। ওঁকেও আমি একবার তানজানিয়াতে দেখেছিলাম। নিজস্ব ছোট্ট প্লেন থেকে নেমে সেরেঙ্গেটিতে ‘সেরোনারা লজে’র দিকে যাচ্ছিলেন। একটি সাদা ভোক্সওয়াগন কম্বি গাড়ি করে। জাক তখন ওঁকে দেখিয়ে আমাকে বলেছিল, দ্যাখ ঋজু! উনিই আমার মালকিন। ওই পঁচিশ বছর বয়সী মেয়েটিই পৃথিবীব্যাপী এতবড় সাম্রাজ্যের মালিক। অথচ খুবই বিনয়ী, ভদ্র এবং বুদ্ধিমতী। তখনই ওঁর প্রতি এক বিশেষ দুর্বলতা জন্মে গেছিল আমার। এখানে আসার মূল উদ্দেশ্যই ছিল যে, ব্যাপারটা আমি মিটমাট করে দিতে পারব। মানে, আর্বিট্রেটররা যেমন করেন। যাতে, খুনোখুনি পর্যন্ত না গড়ায়। প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতা এনে দেব। কিন্তু এসে দেখছি ইঁদুলের পুতি এই মঁসিয়ে পঁপাদুই হচ্ছে যত নষ্টের গোড়া। এবং এখন তো আমার মনে হচ্ছে যে আমাকে যা কিছু সে বলেছে, এ পর্যন্ত তার সবই। বানানো। মঁসিয়ে ব্লঁদারও চেহারা পর্যন্ত দেখলাম না এখনও। সেও কিছু জানে কি না আদৌ কে জানে!

এখন কী করতে বলো আমাদের তুমি?

ভটকাই বলল।

দেখি ডিনার খেতে গিয়ে জাকলিন প্লুজেঁকে বলে যদি একটা দ্রুতগামী বোট জোগাড় করতে পারি, তবে আমরা রাতারাতিই প্রালেঁতে পৌঁছে গিয়ে মাদাম ব্লঁশের হোটেলের তিন পাশে পাহারা দিতে পারি।

পিস্তল, রিভলভারগুলো তো সব ফেরত দিয়ে দিলে কার্লোসকে। তা পাহারাটা দেবে কী দিয়ে? শুধু হাতে?

ভটকাই বিরক্ত গলায় বলল।

তোর বুদ্ধি তো একটু আগে বেশ ছিল, এখন কমে গেল কেন?

ঋজুদা বলল।

মানে?

আমরা নিরস্ত্রীকরণ কেন করলাম নিজেদের? যাতে, পিয়ের এবং পাদুও নিজেদের সশস্ত্র রাখার প্রয়োজন না বোধ করে। তা ছাড়া, আমরা যে কোনওরকম এনকাউন্টারেরই আশঙ্কা করছি না, সে কথাও ওদের কাছে স্পষ্ট হবে আমাদের ব্যবহারে। তাই, যদি ওদের সঙ্গে কোনওরকম লড়াইয়ে যেতেই হয়, তা হবে খুবই সামান্য। বুদ্ধিই আমাদের অস্ত্র। বুঝেছ?

বুঝেছি।

তেমন মনে করলে, জাকলিনকে বলব অস্ত্র জোগাড় করে দিতে। পপাদু যদি ওই সব দিতে পারে, তবে জাকলিন ইচ্ছে করলে জাহাজসুদ্ধ অস্ত্রশস্ত্র দিতে পারে। তার অতখানি ক্ষমতা।

তা ঠিক।

আমরা দুজনেই বললাম। তবু আমার মনে হতে লাগল ঋজুদা বড় বেশি কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এতগুলো যদি’র উপরে ভরসা করা কি ঠিক? কতগুলো যদি যে নদীতে যাবে তা আগে থাকতে কে বলতে পারে!

ঋজুদা নাকি সকলকেই বলে দিয়েছিল ট্যাক্সি নিয়ে আসতে এবং দামি গয়নাগাটি না পরতে। জাকলিন প্লুজেঁকে এমনিতেই অনেকেই চেনেন। তাই তাঁকে বিশেষ করে বলেছিল সাদামাঠা হয়ে যেতে। তবে তাঁকে চেনেন বড় বড় হোটেলে যাতায়াতকারীরা, ‘পাইরেট আর্মস’-এর মতো সাধারণ জায়গাতে কারওই তাঁকে। চেনার কথা নয়।

মিসেস মেক্যাঞ্জি আগেই পৌঁছে গেছিলেন। টেবিলও ওঁর নামেই বুক করা ছিল। বয়স্কা এবং মোটা হলেও মুখের মধ্যে এক ভারী আলগা সৌন্দর্য ছিল। ঠাকুমা-ঠাকুমা ভাব। আমরা তিনজনে যেতেই দাঁড়িয়ে উঠে উনি আমাদের অভ্যর্থনা করলেন।

ওপেন-এয়ার এবং খোলামেলা রেস্তোরাঁর এই সুবিধে যে, এখানে কারও কথা গোপন থাকে না বলেই কেউ কারও কথাকে গোপন ভাবেই না। যে সব ইটিংহাউসের নাম খুব বেশি, দামি, হোটেলের মধ্যে বা অন্যত্রও, সেখানে রীতিনীতি মানা, খুব আস্তে কথা বলা, এসব জরুরি। পথের ওপরের খোলা রেস্তোরাঁর আবহাওয়াই আলাদা। তা দেখে এবং জেনে, ভটকাই-এর খুবই ফুর্তি হল।

এমন সময় দেখা গেল, একটি ফেডেড-জিনস আর হালকা নীল রঙা একটা হাতকাটা সিল্কের গেঞ্জি পরে, সুন্দরী ছিপছিপে একটি মেয়ে ট্যাক্সি থেকে নামল। তার পায়ে ছিল নীল-রঙা গল্ক শু। তাঁকে দেখেই মিসেস মেক্যাঞ্জি দাঁড়িয়ে উঠে অভ্যর্থনা করলেন। মেয়েটির চুল ছেলেদের মতো ছোট করে কাটা। হাতে একটা হালকা নীলরঙা চামড়ার ব্যাগ।

মিসেস মেক্যাঞ্জি, তাঁর ফার্স্ট নাম হচ্ছে জাঁ, ঋজুদার সঙ্গে জাকলিনের আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, মিট মিস্টার ঋজু বোস, ফ্রম কালকুত্তা, ইন্ডিয়া। মাই হাব্বি কলস হিম ‘মিস্টার হ্যান্ডসাম।

সার্টেনলি হি ইজ হ্যান্ডসাম।

‘ইজ’ শব্দটির ওপরে বেশি জোর দিলেন জাকলিন।

ঋজুদা দাঁড়িয়ে উঠে ওঁর হাত ধরে হ্যান্ডশেক করল।

ঋজুদা বলল, হোয়াটস ইওর ড্রিঙ্ক?

আই ডোন্ট ড্রিঙ্ক, থ্যাঙ্ক ঊ্য।

মিসেস মেক্যাঞ্জি বললেন, মিস্টার হ্যান্ডসাম ইজ নট সাজেস্টিং দ্যাট উ্য হ্যাভ আ হার্ড ড্রিঙ্ক। হি ডাজ নট ড্রিঙ্ক আইদার। বাট আই অ্যাম কোয়াইট শ্যওর দ্যাট উই উড লাইক টু স্লিট আ বটল অফ গুড ফ্রেঞ্চ হোয়াইটওয়াইন উইথ মি। মিঃ হ্যান্ডসাম ইজ দ্য হোস্ট।

জাকলিন বললেন, না, না সে কী! আমি তো হোস্টেস।

ঋজুদা হেসে বলল, ওয়েল ম্যাম, আই মে বী আ পুওর ইন্ডিয়ান বাট আই অ্যাম নট দ্যাট পুওর নট টু আফর্ড আ মিল ফর উ্য টু।

জাকলিন দুটি হাতে একটি শব্দহীন তালি বাজিয়ে বলল, ওয়েল, আই ন্যু সিন্স মাই চাইল্ডহুড দ্যাট হ্যান্ডসাম ইজ হোয়াট হ্যান্ডসাম ডাজ। বাট, ইটস ওনলি অন দিস ইভিনিং দ্যাট আই রিয়্যালাইজ হাউ ইজ দ্যাট প্রভাব।

তারপর হেসে বললেন, ওক্কে ফাইন। আই উইল শেয়ার আ বটল অফ হোয়াইট ওয়াইন উইথ মিসেস মেক্যাঞ্জি। বাট হাউ বাউট, মিস্টার বোস?

আই অ্যাম আ টিটোটালার লাইক উ্য।

সার্টেনলি নট টু নাইট। ড্য মাস্ট কিপ আস কোম্পানি।

ঋজুদা আবার হাসল।

ভটকাই গলা নামিয়ে আমার কানে কানে বলল, ঋজুদার এই হাসি দেইখ্যা আমরাই মনে মনে প্রেমে পড়তাছি তো এই সুন্দরী কন্যা! কী করে তুই রোদদুর?

আমি আর কী বলি, গলা আরও নামিয়ে বললাম, ঠিকই কইছস তুই।

ঋজুদা হাসি থামিয়ে বলল, ওক্কে। প্রেটি ইজ হোয়াট প্রেটি ডাজ।

আমি ভেবে দেখলাম, আমার আর ভটকাইয়ের এবারে কেটে পড়াই ভাল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভটকাই হঠাৎই ঘোষণা করল, ঋজুদা আমরা হোটেলে যাচ্ছি।

সে কী? কেন?

হোটেলের খাওয়া এরচেয়ে অনেক ভাল হবে। তা ছাড়া এখানে তোমরা যা ইংরেজির তুবড়ি ফুটোচ্ছে, আমরা মন খুলে পেট পুরে খেতে পারব না।

তারপরই বলল, কিন্তু আমরা সাইন করলে হোটেলে খেতে দেবে তো?

নিশ্চয়ই।

জাকলিন বলল, হু আর দিজ ইয়াংস্টারস?

দে আর নট স্টারস জাকলিন। দে আর প্ল্যানেটস। আই অ্যাম আ টুইঙ্কলিং স্টার। গ্রেট গাইজ। দে হ্যাভ বিন উইথ মি ইন আলমোস্ট অল পার্টস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড, টু শুট ম্যান ইটিং টাইগারস, টু সলভ মিসট্রিজ অফ থেফট অ্যান্ড ডেথ অ্যান্ড অলসো টু হেল্প ঊ্য গেট দ্য ট্রেজারস।

জাকলিন দুটি মৃণাল-ভুজ ওপরে ছুঁড়ে বলল, ওঃ দ্যাটস প্লেনডিড।

আমি বললাম, থ্যাঙ্ক ট্য। কিন্তু এবার আমরা হোটেলেই ফিরে যেতে চাই। আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে।

আমরা চেয়ার ছেড়ে উঠতেই ওঁরা সকলেই চেয়ার ছেড়ে উঠলেন।

ভটকাই বলল, দ্যাখ, ভদ্রতা কাকে বলে দ্যাখ।

তুই দ্যাখ। কিন্তু মেয়েদের ওঠার নিয়ম নয়।

তাই?

হ্যাঁ। তোকে স্পেশ্যাল খাতির দেখাল।

ঋজুদা বলল, ‘জিঞ্জার এল’ একরকমের লেমনেড, আদার রস দিয়ে তৈরি। লালচে দেখতে। হোটেলে গিয়ে খাওয়ার আগে অবশ্যই অর্ডার করিস। আমি এখানে অর্ডার ক্যানসেল করে দিচ্ছি।

ঠিক আছে।

আমি বললাম।

ভটকাই বলল, ঋজুদা শোনো। বলেই বলল, আরে এঁদের বসতে বলো না। এ কী!

ঋজুদা হেসে, ওঁদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, দে ফিল এমবারাসড। প্লিজ বি সিটেড।

ঋজুদা টেবিল ছেড়ে এগিয়ে এসে বলল, কী হল?

ভটকাই বলল, আমার কথাটা মনে আছে তো?

কোন কথা? ঋজুদা চিন্তিতমুখে বলল।

আঃ। সেই কথাটা

ভটকাই বলল।

এবার ঋজুদা বিরক্ত গলাতে বলল, কোন কথাটা বলবি তো?

সেই বিয়ের কথাটা। করবে তো বিয়ে?

কাকে?

আকাশ থেকে পড়ে, বলল, ঋজুদা।

তুমি বড্ডই ভুলে যাও। মিস্টার হ্যান্ডসামের সঙ্গে মিস প্রেটির বিয়ে না হলে কার সঙ্গে হবে?

ঋজুদার দু’কান লজ্জাতে লাল হয়ে গেল। জাকলিন হয়তো শুনে থাকবে কথাটা।

ঋজুদা বলল, আমি যাওয়া অবধি জেগে থাকবি। কথা থাকবে। কাজও থাকতে পারে।

ঠি। ছে।

ভটকাই বলল।

.

হোটেলের রিসেপশনে ঢুকতেই দেখি আঁসিয়ে পাদু সামনের সোফাতে বসে আছেন।

আমরা দুজনেই ওঁকে দেখে অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, মরিশাস থেকে কবে এলেন। উনি মিথ্যা কথা বললেন। বললেন, একটু আগে। আমাদের সঙ্গে ঋজুদাকে না-দেখে বিরক্ত মুখে আমাদের কাছে ডাকলেন হাতের ইশারা করে।

বিরক্ত মুখে বললেন, মঁসিয়ে বোস কোথায়?

ভটকাই সঙ্গে সঙ্গে বলল, মিসেস মেক্যাঞ্জির কাছে।

সেখান থেকেই তো আমি আসছি। উনি তো একা বেরিয়ে গেছেন প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে।

কে বলল?

কে আবার! তাঁর মেইড।

তাই?

অবাক হওয়ার ভান করলাম আমি।

তোমরা কোথা থেকে আসছ?

আমরা গেছিলাম পাইরেট আর্মস-এ ডিনার খেতে।

কেন এত ভাল হোটেলে না খেয়ে সেখানে কেন?

আপনার পয়সা বাঁচাতে। মঁসিয়ে বোস বললেন, আপনি মানুষ ভাল বলেই আপনার দিকটাও আমাদের দেখা উচিত।

পিয়েরের সঙ্গে তোমাদের দেখা হয়েছে?

না তো। তিনি দেখতে কেমন? কিন্তু দেখা না হলেও তাঁকে খুঁজতে চারজন লোক গাড়ি করে সেখানে গেছিল।

সেখানে মানে?

মানে, পাইরেট আর্মস’-এ লোকগুলোর সঙ্গে পিস্তল ছিল প্রত্যেকেরই। তারাই তো মঁসিয়ে বোসকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল। হোটেলের মালিক পুলিশেও ফোন করেছেন। আপনি যান না, খুঁজে দেখুন মঁসিয়ে বোসকে। এদিকে আমাদের সব পিস্তল, রিভলভারগুলো মঁসিয়ে বোস কার্লোসকে ফেরত দিয়ে দিতে বলেছেন। ওগুলো সঙ্গে থাকলে কি আমাদের সামনে থেকে মঁসিয়ে বোসকে তুলে নিয়ে যেতে পারে?

তোমাদের মোবাইল ফোন কোথায়?

আমাদের এবং মঁসিয়ে বোসের মোবাইল ফোনও তারা কেড়ে নিয়েছে। আপনি এখন ফোন করলে ওই লোকগুলোই ধরবে। করে দেখুন না একবার।

ভটকাই চিন্তিত মুখে বলল, কী যে করি আমরা!

পঁপাদু বলল, জেন্টস রুমে চলো। বলেই, লবির জেন্টস টয়েলেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমরাও গেলাম পেছন পেছন। ভিতরে কেউ ছিল না। উনি কোমর থেকে একটা গুলিভরা মাউজার পিস্তল দিলেন আমাকে। আর একটা গুলিভরা ম্যাগাজিন। তারপর ভটকাইকে বললেন, আমার ঘরে চলো, তোমাকে একটা দেব।

তারপর একটু চুপ করে কী ভেবে নিয়ে বললেন, কিন্তু সে লোকগুলো কার লোক বলে ধারণা তোমাদের?

ভটকাই ফট করে বলল, পিয়েরের।

পঁপাদু আকাশ থেকে পড়ে বললেন, পিয়েরের? মাই গুডনেস। রাসকেলটা। প্লুজেঁর দলে ভিড়ে গেছে।

তারপরই বললেন, তোমাদের মনে হওয়ার কারণ?

কী মনে হওয়ার?

ওই যে! ওরা পিয়েরের লোক?

আমি বললাম, পিয়ের কেমন দেখতে বলুন তো? ওদের মধ্যেই তো একজন ছিল যার নাম পিয়ের! সেই তো অন্যদের অর্ডার দিচ্ছিল। সেই লোকটা খুব লম্বা, রোগা, বাঁ হাতের কব্জির কাছে টাটু করা আছে সাপ-ব্যাঙের।

তাই নাকি? তা তারা কোনদিকে গেল?

গেল তো উল্টোদিকে। কিন্তু বলছিল তো যে ঋজু বোসকে খতম করে বো ভাঁলো বে হোটেলেই আসবে। আপনি যে এখানে আছেন তা কি ওরা জানে?

মঁসিয়ে পঁপাদুর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বললেন, চলো, তোমরা আমার ঘরে। তোমাদের ঘরের চাবিটাও নিয়ে নাও।

ঘরের দিকে যেতে যেতে নিজের মনেই বললেন, এই জন্যেই খারাপ চরিত্রের মানুষদের কখনও বিশ্বাস করতে নেই। এরা টাকার জন্যে কখন যে কাকে ডাবল-ক্রস করবে তার কোনও ঠিক নেই।

ভটকাই বিশুদ্ধ বাংলায় বলল, ওরে ধোয়া তুলসী পাতা, তুই নিজে কী?

মঁসিয়ে পঁপাদু চমকে উঠে বললেন, হোয়াট?

ও বলল, ঠিকই বলেছেন আপনি।

আই সি।

মঁসিয়ে পঁপাদুকে খুবই নার্ভাস দেখাচ্ছিল। ওঁর ঘরে ঢুকেই উনি ড্রয়ার খুলে দুটো বড়ি খেলেন। বললেন, আমি হাইপারটেনশনের রোগী। তারপর সেই ড্রয়ার থেকেই একটি রুপোর-বাটের ছোট পিস্তল বের করে দিলেন গুলিভরা। সম্ভবত পয়েন্ট টু টু বোরের। গুলিভরা একটা ম্যাগাজিনও দিলেন। ভটকাই সসম্মানে বাও করে সেটা নিল।

তারপরই উনি খাটের ওপরে জুতোসুদ্ধ শুয়ে পড়ে টাইটা একটানে খুলে ফেলে দিলেন খাটের একপাশে। পরক্ষণেই উঠে, জল খেলেন জাগ থেকে সোজা। ঢকঢকিয়ে। তারপরই ফ্রিজ খুলে একটা লাল রঙের পানীয়ভর্তি বোতল বের করলেন। করে, বললেন, চলো এবার তোমাদের ঘরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *