কোনদিকে যাব এবারে?
ভটকাই-এর বকবকানি শুরু হল।
ঋজুদা যেন কী গভীর ভাবনাতে বুঁদ হয়ে গেল। ভটকাইয়ের কথার উত্তর না দিয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলল, জেটি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জেটিতে পৌঁছে গেলাম। ঋজুদা একটা বোটের সঙ্গে কথা বলে আমাদের নিয়ে উঠল। ট্যাক্সিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল, জেটিতে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে সব সময়ে, না সে-ই ফিরে আসবে আমাদের ফেরার সময়?
সে বলল, আমিই ফিরে আসব। যাবেন কোথায় জেটি থেকে? মাদাম ব্লঁশের হোটেলেই?
আমরা যাব এয়ারপোর্টে। কিন্তু ঋজুদা সে কথা বলল না তাকে। বলল, পৌনে পাঁচটা নাগাদ এসো। বকশিস দেব।
সে বলল, বকশিস লাগবে না। আসব।
বোট ছেড়ে দিল। সাদারঙা বোট। খুব শক্তিশালী ইঞ্জিন। মাথায় ছাদ আছে। নীচে আট-দশজনের বসার চেয়ার। সামনে-পেছনে ডেক। ইঞ্জিনরুম পেছনে।
একে ইঞ্জিনের শব্দ, তার ওপরে সমুদ্রের শব্দ আর হাওয়ায় কথাগুলো উড়ে যাচ্ছিল মুখ থেকে।
ভটকাই চিৎকার করে উঠল, ওটা কী পাখি ঋজুদা? লাল ঠোঁট, লাল লেজ।
ঋজুদা দেখে বলল, ওর নাম টুপিক বার্ড। কী সুন্দর-মসৃণ সাদা দেখেছিস। মনে হয়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিই। সামুদ্রিক পাখি। এদিকে কম দেখা যায়। আলডাবরাতে অনেক আছে।
আর ওই যে! পাড়ের খয়েরি-রঙা পাখিটা?
সেটাও দেখনি। ব্রাউন নডি-টার্ন। আমাদের দেশের ধনেশ পাখির যেমন গ্রেটার আর লেসার হয়, এই ব্লাউন-নডিদেরও দুটো ভ্যারাইটি। ছোটটাকে বলে লেসার। আর ওই দ্যাখ স্যুটি টার্ন। ওদের আরেকটা নাম হচ্ছে ওয়াইড-অ্যাওয়েক টার্ন।
কেন? ওরকম নাম কেন?
সবসময়েই তীক্ষ্ণ নজর। আর কিছু দেখলেই চিল-চিৎকার জুড়ে দেয়, তাই। অনেকটা আমাদের টিটি পাখি, মানে ল্যাপউইঙের মতো বলছ? হ্যাঁ। অনেকটা, তবে ওয়াইড-অ্যাওয়েক টার্ন-এর আওয়াজ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়।
ল্যাপউইঙের ডাকেও তো আমার গা ছমছম করে। বিশেষ করে রাতে। হুটিটি হুট। হুট। হুট। হুট।
ভটকাই বলল।
সাদাকালো। আরও একরকমের টার্ন দেখা যায় এখানে, তাদের নাম ফেরারি টার্ন। পুরো সাদা ঠোঁট, পা আর চোখ কালো। পাখি দেখতে গেলে আরিড আইল্যান্ডে যেতে হয়।
ওখানে একরকমের Ibis আছে, যা শুধুমাত্র ওখানেই পাওয়া যায়।
Ibis মানে?
ভটকাই বলল।
আঃ! একরকমের পাখি।
আমি বললাম।
তারপর ঋজুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, ওখানে মানে?
আলডাবরা দ্বীপপুঞ্জে। ওদের নামই, আলডাবরা স্যাক্রেড আইবিস।
স্যাক্রেড? তা পবিত্র কেন?
পবিত্র বলে, বোধহয় ওদের চোখের জন্যে। আশ্চর্য নীল চোখ ওদের। চায়না-ব্লু। আলডাবরাতে আরেকরকম পাখি দেখতে পাওয়া যায়, ছোট পাখি, হোয়াইট-থ্রোটেড রেইল। ও পাখিগুলো উড়তে পারে না। কত পাখিই তো উড়তে পারে না। তবে সেইসব পাখির প্রজাতি অবশ্য খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য। এই সামুদ্রিক দ্বীপগুলোতেই কিন্তু এই সব পাখি বেশি দেখতে পাওয়া যায়।
কীরকম?
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে একরকমের উড়তে না-পারা পাখি একসময়ে অনেক ছিল। এখন প্রায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। নাম ‘নেনে। আমাদের নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে আছে মেগাপড। ডোডো পাখি আছে মরিশাসে। স্যেশেলসের কাছেই। মরিশাস হয়েই আমাদের ফিরতে হবে মুম্বাইতে, যদি এয়ার ইন্ডিয়াতেই ফিরি।
যদি আদৌ ফিরি বলো। তোমার প্লুজেঁ আর পিয়ের যে কী খেলা খেলবে আর খেলাবে তা তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
আমি বললাম।
একেবারেই কি বোঝা যাচ্ছে না?
ঋজুদা বলল, রহস্যময় গলাতে, আমাদের দুজনের দিকেই তাকিয়ে।
তারপর বলল, নামগুলো অন্যদের সামনে না বলাই ভাল। অন্য নাম দে ওদের।
ভটকাই বলল, মাছের নাম দেব?
দে।
ল্যাটা আর পোটকা।
কে কোন জন?
প্লুজেঁ ল্যাটা আর পিয়ের পোটকা।
ওক্কে।
আমি বললাম, ওকথা বললে কেন ঋজুদা?
কী কথা?
কিছুই কি বোঝা যাচ্ছে না?
ঋজুদা পাইপটাকে নিজের ডানদিকের জুলপির কাছে একবার চুঁইয়ে বলল, ভাব। ভাব। ঈশ্বর মস্তিষ্ক দিয়েছেন, সেটাকে যতই কাজে লাগাবি ততই সেটা উর্বর হবে।
আমি আর ভটকাই অবাক হয়ে গেলাম। সকাল থেকে যা কিছুই ঘটেছে, তার সঙ্গে আমাদের রহস্য সম্বন্ধে বোঝাবুঝির সম্পর্ক কী যে তা কিছুই বুঝলাম না।
ঋজুদা বলল, ওই দ্যাখ টাকামাকা বে৷ টাকামাকা গাছগুলো দেখছিস। কী সুন্দর তটভূমি, দেখেছিস? পাউডারের মতো সাদা। বালিও প্রবালের গুঁড়ো।
ভটকাই বলল, যেখানে সৌন্দর্য সেখানেই ভয়। ফুল থাকলেই কাঁটা থাকবে। রামকুমারবাবুর গান শুনিসনি?
বিরক্ত হয়ে বললাম, কী গান?
যেমনি শুধোনো, অমনি ভটকাই চোখ-মুখ ভেটকে টপ্পা ধরে দিল:
গেলাম ফুল তুলিবারে, যত্নে মালা গাঁথিবারে
অমনি কাল ভুজঙ্গ দংশিল আমায়
এখন বাঁচি কি না বাঁচি, বল প্রাণে-এ-এ-এ-এ…
ঋজুদা বলল, টপ্পার দানা আর বেশি দিস না। বোট এবারে উল্টোবে। উল্টোলেই জলে পড়বি। আর জলে পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে হাঙর ক্যাচ করবে। এত গভীরে তো কেউ সাঁতার কাটে না!
হাঙর আসে না কি?
আসে বইকী! কম আসে। তবে ভটকাইয়ের টপ্পা শুনে আসতেও পারে।
কী হাঙর?
খুব সুন্দর দেখতে। ইস্পাতের মতো ছাই-ছাই রং আর গায়ে কালো ফুটি-ফুটি দাগ।
নাম কী?
হোয়েল শার্ক। তবে ওরা কিন্তু মাড়োয়ারি, গুজরাটিদের মতোই নিরামিষাশী। প্ল্যাঙ্কটন খেয়ে থাকে। বুঝলি তো। তবে মাড়োয়ারি-গুজরাটিরা যেমন মাঝেমধ্যে নিরামিষ-গণ্য করে ডিম খান, তেমন প্ল্যাঙ্কটনের মধ্যেও অনেক সময়ে তোর আমার মতো মানুষের পো আমিষও খেয়ে থাকে। অপরাধ ক্ষমার যোগ্য। কী বল?
প্ল্যাঙ্কটনটা আবার কী জিনিস?
ভটকাই জিজ্ঞেস করল।
প্ল্যাঙ্কটন-এর মানে, আমি বলতে গেলাম ভটকাইকে। কিন্তু ঋজুদা বলল, বলবি না।
তারপর ভটকাইকে বলল, একটা Webster-এর ডিকশনারি আজই কিনে নিবি, আর Roget-এর Thesarus of English Words and Phrases। অন্যে বলে দিলে, শেখা হয় না। যে-কোনও ইংরেজি শব্দর মানে তুই না জানলে বানানটা শুধু ঠিক করে জেনে নিবি তারপরে ডিকশনারি দেখবি। বাংলার ব্যাপারেও তাই করবি। সংসদের একটা অভিধান এবং এক সেট বঙ্গীয় শব্দকোষ, সাহিত্য আকাঁদেমির, হাতের কাছে রাখবি কলকাতাতে সব সময়। বাংলা তোর মাতৃভাষা বলেই তুই যে সে কারণেই সে ভাষাতে পণ্ডিত, এমন ভাবিস না। আমরা কেউই ইংরেজি তো ভাল জানিই না, বাংলাও জানি না। সব সময় নতুন নতুন শব্দ শেখার চেষ্টা করবি। শিখতে তো কোনও লজ্জা নেই। আমি তো চিতাতে ওঠার আগের মুহূর্ত অবধিও শিখতে রাজি আছি।
বোটটা যখন প্রালেঁর জেটির দিকে মুখ ফেরাল, তখন আমি বললাম, স্যেশেলসের পাহাড়গুলো দেখলে ভয় করে। কত বড় বড় পাথর। পূর্ব-আফ্রিকার সেরেঙ্গেটির Kopjeগুলো তো এদের কাছে পিঁপড়ে।
রুআহাতে তো Kopje ছিল না।
ভটকাই বলল।
কে বলল, ছিল না? সেখানেও ছিল। তুইতো আর রুআহা বা গুগুনোঞ্চম্বারের দেশেতে যাসনি। তবে সেরেঙ্গেটির Kopje অন্যরকম। রুদ্রর ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’তে আছে তার বর্ণনা। বানান Kopje, উচ্চারণ কিন্তু কোপি।
ঋজুদা বলল।
হায়। হায়। সোয়াহিলি ভাষাও দেখি কম যায় না ধাঁধায়।
ভটকাই বলল।
ঋজুদা বলল, এই সব দ্বীপেই গ্রানাইট পাথরের পাহাড়। কালোটাই বেশি। সাদা ও খয়েরিও আছে। হাজার বছরের জলের আর বরফের চাপে, হাওয়ার ফুৎকারে এরা ক্ষয়ে গেছে। কত বিচিত্র সব আকার নিয়েছে। মনে হয়, কোনও স্থপতিই বুঝি বানিয়েছেন অথবা ভাস্কর, বিশাল মাপের হাতুড়ি আর ছেনি দিয়ে। তা ছাড়া, যেহেতু অধিকাংশ তটভূমিই জনহীন, সে জন্যেও গা ছমছম করে।
তারপর বলল, জানিসতো, স্যেশেলসেও একজন নামকরা ভাস্কর আছেন। দারুণ কাজ করেন। যদি বেশিদিন থাকা হয়, তবে তাঁর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব তোদের। তাঁর স্টুডিয়োতেও নিয়ে যাব। তাঁর খ্যাতি পৃথিবীজোড়া।
নাম কী?
আমি জিজ্ঞেস করলাম।
মাহেতেই থাকেন তিনি। নাম Tom Bowers..
এখানের পাহাড়গুলো ফিল্ম-এ দেখা Guns of Navarone পাহাড়ের মতো। তাই না? এমন খাড়া যে, কেউই বোধহয় উঠতে পারে না।
ঋজুদা হেসে বলল, ঠিকই বলেছিস।
এইসব দ্বীপে কী কী গাছ আছে ঋজুদা?
আমি জিজ্ঞেস করলাম।
গাছ তো আছে অনেকরকম। আমি কি আর সর্বজ্ঞ? তবে যে কটি গাছ নিজের চোখে দেখেছি, তাদের কথাই বলতে পারি। যেমন ধর মাহগনি। এখানে Sangdragon নামের একরকমের বড় বড় গাছ হয়, তাদের নীচে নীচে চলে-যাওয়া ছায়াশীতল বনপথে চলতে ভারী আরাম। আরও কত গাছ আছে।
আর ফুল?
ফুলের কি শেষ আছে? লাল জবা। দারুণ দেখতে। কিন্তু জানিস তো, মাত্র একদিন থাকে গাছে, ফোঁটার পরে। হলুদ জবাও হয়, ডাবল। হাল্কা। গোলাপিরঙাও হয়। আর সাদা সাদা ছোট-ছোট ফ্যাঙ্গিপ্যানি ফুল যখন ফোটে, তখন সারা দ্বীপকে সুগন্ধে ভরে দেয় ছোটাছুটি করা হাওয়া।
আমি বললাম, জবা ফুলের ইংরেজি কী? জানিস?
অদম্য ভটকাই বলল, ‘জাভাপ্যানি’ তো!
আমি আর ঋজুদা হেসে উঠলাম ওর কথাতে।
ঋজুদা বলল, সত্যি! তোকে চিড়িয়াখানাতেই রাখা উচিত।
তা বলো। এখানে কি ডিকশনারি আছে সঙ্গে? আমার তো ইংলিশ-বেঙ্গলি নয়, বেঙ্গলি-ইংলিশ ডিকশনারি দরকার।
তাই কিনে নিয়ো একটা কলকাতা ফিরে।
বল না রুদ্র, জবা ফুলের ইংরেজি কী?
হাইবিসকাস।
শিখলাম।
এখানে এই নীল স্বচ্ছ জলের তলায় তলায় যে কতরঙা প্রবালের বাগান আছে, তা কী বলব। তোদের নিয়ে যাব গ্লাস-বটম বোটে করে অ্যান ম্যারিন ন্যাশনাল পার্ক দেখাতে। সেই বোটগুলোর একতলাটা থাকে জলের নীচে। দু’পাশে বিরাট বিরাট কাঁচের জানলা। কত রকমের মাছ, কত রকমের আর রঙের প্রবালের ফুল যে দেখতে পাবি। ওইখানেই থেকে যেতে ইচ্ছে করবে, সারাজীবন।
একটা প্রাসাদ আর রাজকন্যা থাকলে, থেকেই যেতাম।
খুঁজতে তো হবে। না খুঁজলে, পাবি কী করে? ওই জন্যই তো স্কুবা-ডাইভিং আর স্নারকেলিং শেখা দরকার, যাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে বেঁধে বহুক্ষণ জলের তলাতে পায়ে ব্যাঙের পায়ের মতো রাবারের-পা লাগিয়ে সাঁতরে বেড়িয়ে সমুদ্রের বুকে আঁতিপাতি করে খুঁজতে পারিস।
নাঃ। হত্যিই দেখতাছি শিখন লাগব। শিইখ্যা লমু অনে। কী কও মিস্টার রুদ্র?
তুমি শিখবানা? তুমি শিখলে আমিও শিখুম।
ভাল করে শিখলে Frogman হয়ে গিয়ে ব্যাঙের মতো জলের নীচে সাঁতরে গিয়ে শত্রুপক্ষের নোঙর করা জাহাজের তলপেটে ডিনামাইটের চার্জ বেঁধে দিয়ে এসে দূর থেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইস-এ ফাটাতে পারিস। ফ্রগমেনদের কাজ খুবই দুঃসাহসিক কাজ এবং তাদের মাইনেপত্তরও খুবই ভাল।
ভটকাই বলল, তা হউক গা। মানুষ হইয়া জন্মাইয়া ব্যাঙ হইতে যামু কোন দুঃখে! হাঃ। ছাড়ান দাও। যত্ত বাজে কথা তোমার।
টাকামাকা পেরিয়ে এলাম, এবার দ্যাখ Anselazion বিচ। এই বিচকে শুধু আমিই নই, অনেকেই বো ভাঁলোর চেয়েও সুন্দর বলেন।
লাল লাল ওই ফুলগুলো কী বলো তো? পাহাড়ে ফুটেছে, মাঝারি সাইজের গাছে? কৃষ্ণচুড়া?
ভটকাই শুধোল।
কী গাছ রুদ্র?
ঋজুদা উল্টে আমাকে জিজ্ঞেস করল।
কৃষ্ণচূড়া নয়, তবে কী গাছ বলতে পারব না। কৃষ্ণচূড়ার মতো নয়। অন্যরকম। এবং অনেক বেশি লাল।
এক্কেবারে হল্লা-গুল্লা লাল।
ভটকাই বলল।
নামটাও হল্লাগুল্লার। নাম শুনলে অজ্ঞান হয়ে যাবি।
কী? বলো না বাবা।
ফ্ল্যামবয়ান্ট।
অ্যাঁ? ফুলের নাম Flamboyant?
ইয়েস স্যার।
ওই যে দ্যাখ দ্যাখ রুদ্র, বোগেনভিলিয়া।
কই?
ওই যে রে।
হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে। আমাদের বোগেনভিলিয়াই।
কই?
বোগেনভিলিয়া কি তোমার মাতুল কেঠো মিত্তিরের সম্পত্তি? আমাদের মানে কী?
ভটকাই বলল।
মানে, ভারতের। ইডিয়ট।
আমি বললাম।
বোগেনভিলিয়া ভারতের নয়, সারা পৃথিবীর। যতদূর জানি, এগুলো আমেরিকান ট্রপিকাল লতা। শুধু এই গাছই কেন, তোদের কলমি শাক, লাউ, কুমড়ো, বেগুনও এখানে পাবি। প্রত্যেক বাড়িতেই হয়তো একটা করে সজনে গাছও দেখতে পাবি কিন্তু সজনে ডাঁটা খেতে এরা জানে না। বাজারেও কিনতে পাবি না।
আহা! ইহারা কী হারাইতেছে, ইহারা জানে না। এখান থেকে সজনে-ডাঁটা এক্সপোর্ট করার একটা ব্যবসা ফাঁদলে মন্দ হত না!
ওরিজিনাল ভটকাই বলল।
এখানে জামরুলও হয়, কিন্তু তাদের রং লাল। এখানের চড়াই পাখি লক্ষ করেছিস? পিঠ লাল। যখন লাফালাফি করে তখন ভারী সুন্দর দেখায়।
আম হয়?
হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, কখনও কখনও দেখা যায় গাছের ডালে বড় আম ফলে রয়েছে আর তার পাশেই আমের নবমুকুল।
তাই? তবে তো কলকাতা ফিরেই কথাটা চালু করতে হবে।
কী কথা?
‘এঁচড়ে পাকাই’ হয় না শুধু ‘মুকুলে পাকাও হয়।
এক, আদি এবং অকৃত্রিম ভটকাই বলল।
আমরা হাসলাম।
কলাও পাওয়া যায়?
যায় বইকী। কাল তোদের বাজারে নিয়ে যাব। তবে এখানের মানুষেরা তো ভটকাইয়ের মতো বাঁদর নয়, তাই কলা চেনে না।
মানে?
চেনে, কিন্তু চাঁপা কলা, কাঁঠালি কলা, আর মর্তমান কলার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা জানে না। ছোট কলাগুলো এখানে লাল লাল হয়। মর্তমান কলারও যা দাম, কাঁঠালি আর চাঁপা কলারও তাই দাম।
বাবা। সবই দেখছি হড়েগড়ে এক।
জ্যাঠামশাই ভটকাই বলল।
আচ্ছা, প্রালেঁতে কি হোটেল নেই ভাল?
অনেকই আছে।
সমুদ্র থেকে তো দেখা যাচ্ছে না একটাও।
লুকিয়ে আছে নারকেল বনের মধ্যে।
মানে?
মানে, পুরো স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জের নিয়ম হল, কোনও বাড়িই নারকেল গাছের চেয়ে উঁচু হতে পারবে না, সে ফাইভ স্টার হোটেলই হোক আর যাই হোক।
বাঃ! এমন আইন সব দেশেই করা উচিত। এখানের মানুষগুলোর বুদ্ধি তো আছেই, সৌন্দর্যবোধও আছে।
ভটকাই বলল।
কথাটা ঠিকই।
ঋজুদা বোট ঘুরোতে বলল। গল্পে গল্পে অনেকই দূরে এসে গেছি। আহা কী সুন্দর জলের রং। নীলের আর সবুজের যে কতরকম। আর জল একেবারে স্বচ্ছ। সাদা বালি, নীল স্বচ্ছ জল আর ঢেউয়ের সাদা ফেনা, পাড়ের ঝকঝকে সবুজ আর লাল মিলে চোখ ফেরানো যায় না।
জেটিতে ফিরতেই পাওয়া গেল সকালের সেই ট্যাক্সিকে। কথা রাখতে জানা ভদ্রলোকের মতোই অপেক্ষা করছিল সে। প্রাঁলে এয়ারস্ট্রিপে জেটি থেকে যাওয়ার সময়ে ঋজুদা মাদার ব্লঁশের হোটেলে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে বলল, ট্যাক্সিতে বোস, আমি এক সেকেন্ড আসছি।
কিছুক্ষণ পরেই মাদাম ব্লঁশ আর ঋজুদা বেরিয়ে এলেন। ঋজুদার হাতে একটা খাম ছিল। উনি হাত নাড়লেন। আমরাও। তারপর ঋজুদা উঠতেই ট্যাক্সি ছেড়ে দিল।
.
আমরা যখন প্রাঁলে এয়ারস্ট্রিপ থেকে আইল্যান্ডার প্লেনে করে এসে মাহে এয়ারপোর্টে নামলাম, তখন নীল সমুদ্রকে সোনার পাত দিয়ে মুড়ে দিয়ে সূর্যটা পশ্চিমে ডুবে যাচ্ছে।
গতকাল দুপুরে এখানে পৌঁছে এয়ারপোর্টের কাছেই যে বাড়িতে আমরা প্রথম নেমেছিলাম কার্লোস আসার আগে, সেই বাড়ির সামনে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে ঋজুদা ভিতরে ঢুকে গেল। একটু পরেই একজন মোটাসোটা, বয়স্কা মহিলার সঙ্গে ঋজুদা বেরিয়ে এল। আসতে আসতে যে-খামটা মাদাম ব্লঁশের কাছ থেকে এনেছিল, তার ওপরেই কী যেন লিখল ঋজুদা। ট্যাক্সিতে উঠে ঋজুদা বলল, থ্যাঙ্ক ঊ্য মিসেস মেক্যাঞ্জি।
মেক্যাঞ্জি নাম শুনেই বুঝলাম, স্কটল্যান্ডের মানুষ। কোন দেশের মানুষ যে এখানে এসে থিতু হয়নি! কালো, সাদা, হলুদ সব রকমের মানুষই আছে, এখানের পাখি আর ফুলেরই মতো।
‘বো ভাঁলো বে’ হোটেলে ঢোকার আগেই ঋজুদা পথে নেমে গেল। বলল, তোরা চলে যা। নিজেদের ঘরের চাবি নিয়ে ঘরে যা। আমার চাবি তোরা নিবি না। আমি পৌঁছে তোদের আমার ঘরে ডেকে নেব। কথা আছে।
আমরা রাতেও কি তোমার ঘরেই ডিনার খাব?
ভটকাই জিজ্ঞেস করল।
ওঃ। সত্যি ভটকাই!
ঋজুদা বলল। তারপর বলল, না। আজ আমরা ইন্ডিপেন্ডন্স অ্যাভেনুতে ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁ ‘পাইরেট আর্মস’-এ ডিনার খাব। তবে তার অনেক দেরি আছে। তোর পেটে কি দানো ঢুকেছে? এত ক্ষিদে আসে কী করে!
ঋজুদাকে নামিয়ে দিয়ে আমরা চলে গেলাম। রিসেপশন থেকে আমাদের ঘরের চাবি নেওয়ার সময়ে কাউন্টারে একটি মেয়ে বলল, তোমরা কি মিস্টার বোসের পার্টির?
আমি বললাম, না না, আমরা কারও পার্টির নই। কিন্তু কেন?
একটা মেসেজ আছে ওঁর নামে।
তা হবে। ওঁকেই দেবেন।
উনি কোথায়?
তা আমরা কী করে জানব?
ঘরে ঢুকে, ভটকাই বেশ কিছুক্ষণ চিৎপটাং হয়ে খাটের ওপর শুয়ে থাকল। তারপর বলল, ওঃ। সারাটা দিন যা ধকল গেল না শরীরের উপরে। ঋজু বোস ছেলেমানুষ, বুড়োর কষ্ট কী বুঝবে! যাই চানটা করেই নিই, নইলে ‘পাইরেট আর্মস’-এ ডিনারটা জমবে না।
আমি বিরক্ত হয়েই ছিলাম ওর ওপরে। কিছু না বলে, জানালার কাছে এসে দাঁড়ালাম। সমুদ্র আর তটভূমি তো দেখা যায়ই এখান থেকে, হোটেলের এনট্রান্সটাও দেখা যায়। ঋজুদা বলছিল, আগের বার যখন এসেছিল একবার আফ্রিকা ফেরত, তখন গাড়ি খুব কমই ছিল। কিন্তু এখন গাড়ি অনেক। এনট্রান্সটা দেখা যায় বটে কিন্তু গাড়ি থেকে যেখানে মানুষে বিরাট লবির সামনে নামে, সেখানটা দেখা যায় না। প্রকাণ্ড গোল ছাতার মতো ছাদ আছে প্রবেশদ্বারের ওপরে রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য, যে-কোনও ফাইভস্টার হোটেলেই যেমন থাকে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ির আসা-যাওয়া দেখতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পরে দেখি, ঋজুদা হেঁটে হেঁটে আসছে। কিন্তু গেটে না ঢুকে গেট পেরিয়ে আরও সামনে চলে গেল। সমুদ্রতটের পাশ দিয়ে পথ চলে গেছে পিচ-বাঁধানো। অনেক নারী পুরুষই তখন চান করছেন, অথবা তটে শুয়ে-বসে আছেন। তটের পাশাপাশি পথ ধরে ঋজুদা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল। একটু পরে তাকে আর দেখা গেল না।
ভটকাইয়ের স্নান হয়ে গেল। কিছুই করার নেই। তাই আমিও চলে গেলাম।
বাথরুমে ঢুকে, শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম ঋজুদার সেই কথাটার মানে। সেই যে বোটে বলল না? কিছুই কি বোঝা যাচ্ছে না? ঈশ্বর মাথা দিয়েছেন, মাথাটা খাটা।
‘কী যে বোঝা যাচ্ছে না’ তা মাথা অনেকক্ষণ শাওয়ারের ঠাণ্ডা জলের নীচে স্থির রেখেও বোঝা গেল না। কে জানে! আমার হয়তো মাথাই নেই। অথবা ভটকাই-এর সঙ্গদোষে, থেকেও কাজ করছে না।
এমন সময় ভটকাই দুমদাম করে দরজাতে ধাক্কা দিতে লাগল।
ছেলেটাকে নিয়ে, কেতাদুরস্ত জায়গাতে ওঠাই মুশকিল। ওইরকম শব্দ শুনে এক্ষুনি হয়তো সিকিউরিটির লোকেরা ছুটে আসবে ঘরে।
দরজাটা একটু ফাঁক করে বললাম, হলটা কী?
ও বলল, বস ইজ কলিং।
তাড়াতাড়ি গা-মাথা মুছে জামাকাপড় পরে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। তারপর ঋজুদার ঘরে গেলাম নিজেদের ঘর লক করে। যার যার পিস্তল, রিভলবার কোমরের হেলিস্টারে ঠিকই ছিল আর একটা করে গুলিভরা একস্ট্রা-ম্যাগাজিন জিনসের প্যান্টের হিপ পকেটে ঢুকে গেল।
বেল দিতেই ঋজুদা দরজা খুলল এসে।
বলল, বোস।
ঋজুদা মাদাম ব্লঁশের কাছ থেকে নিয়ে-আসা খামটা খুলে আমাদের একটা ফোটো দেখাল। একজন লম্বা ছিপছিপে সাহেবের ফোটো, মাদমোয়াজেল ব্লঁশের হোটেলের সামনে একটি অল্পবয়সী স্যেশেলোয়া মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে, তার কাঁধে হাত দিয়ে। একটি লাল গেঞ্জি এবং নীল জিনস পরে আছে মেয়েটি আর ওই সাহেব হলুদ গেঞ্জি আর বহুরঙা স্টাইপসের বারমুডা পরে। পায়ে রাবারের চটি।
ভাল করে চিনে রাখ চেহারাটা। এই হচ্ছে পিয়ের। যেদিন ছবিটা তোলা, সেদিনই মেয়েটা প্রালেঁতে জলে ডুবে মারা যায়।
অ্যাকসিডেন্ট না মার্ডার?
কী করে বলব!
ফোটোটাকে ও বাঁ হাতে নিয়ে নিজের চোখ থেকে দূরে প্রসারিত করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ভটকাই বলল, লোকটাকে আমি দেখেছি ঋজুদা।
আমি আর ঋজুদা অবাক হয়ে ভটকাইয়ের দিকে চেয়ে থাকলাম।
ঋজুদা জেরা করল। বলল, কোথায় দেখেছিস?
প্লেনে।
কোন প্লেনে?
আরে, প্রাঁলে থেকে আমরা যে প্লেনে ফিরে আসি, সেই প্লেনে। একটা ছাই-রঙা স্যুট পরেছিল, তার সঙ্গে ক্যাটক্যাটে লাল টাই। ওই বিচ্ছিরি টাইটার জন্যই আমার নজর পড়ে ওর দিকে। লোকটার বাঁদিকের কব্জিতে একটা কিম্ভুতকিমাকার ঘড়ি ছিল। সেই ঘড়িটা দেখতে গিয়েই দেখতে পেলাম যে, তার বাঁ-হাতের কব্জিতে নীল-রঙা টাটু করা। কী সব সাপ-ব্যাঙ আঁকা। আর এই দ্যাখো, এই ফোটেতেও বাঁ-কব্জির টাটু স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।
প্লেনের কোথায় বসেছিল লোকটা?
আমাদের পেছনে। তাই তোমরা দেখনি।
তা, তুই দেখলি কী করে?
আমার চোখ আছে তাই। ও যখন প্লেনের জন্য অপেক্ষা করছিল, তখনই ওকে লক্ষ করেছি।
ও কি আমাদের দেখছিল?
ঋজুদা সামান্য উদ্বিগ্ন গলায় বলল।
তা লক্ষ করিনি। তবে আমরা যেমন ওর ফোটো দেখছি, তখন ও-ও কিন্তু নারকেল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে একটা ফোটো বের করে একবার ফোটোটার দিকে আর একবার তোমার দিকে দেখছিল।
ঠিক দেখেছিস?
আমি ঠিকই দেখি ঋজুদা।
হুঁ।
ঋজুদা বলল।
তারপর বলল, তা হলে পিয়ের প্রালেঁতেই ছিল। বোটে করে ফিরে যায়নি সকালে। যা আশঙ্কা করেছিলাম, তাই।
কী ব্যাপার! খুলেই বলো না আমাদের।
গতরাতে মঁসিয়ে পঁপাদুকে আমি মরিশাস-এ ফোন করেছিলাম। তখনই ও জানাল যে প্লুজেঁ ‘বো ভাঁলো বে’ হোটেলে পৌঁছে গেছে জিনিভা থেকে তিনদিন আগেই। পিয়ের তো আগেই পৌঁছেছে।
আর কী বলল মঁসিয়ে পঁপাদু?
জিজ্ঞেস করল আগামীকালের প্রোগ্রাম কী?
তুমি কী বলেছিলে?
বলেছিলাম, প্রালে যাব সকাল সকাল। মাদাম ব্লঁশের কথাও বললাম। কারণ, তিনি আমার বহুদিনের পরিচিত। আমি আর ওঁর স্বামী জাক ব্লঁশ আফ্রিকার অনেক জায়গাতে শিকার করেছি একসময়ে একসঙ্গে। তখনও ও স্পোর্টসম্যান ছিল পেশাদার শিকারি হয়নি। এও বলেছিলাম যে, মহিলার কাছে যাব খবরাখবরের জন্যে। গুপ্তধন তো প্রালেতেও পোঁতা থাকতে পারে! আমার তো ধারণা, হয় প্রালে নয়, লা ডিগ আইল্যান্ডেই পোঁতা আছে। মাহেতেই থাকাটা আশ্চর্য নয়। সেভেন সিস্টার্স-এর কোনও আইল্যান্ডেও থাকতে পারে।
মঁসিয়ে পঁপাদু কী বলল তাতে?
আমি জিজ্ঞেস করলাম।
কিছুই বলল না।
ঋজুদা বলল।
তুমি কটা নাগাদ ফোন করেছিলে?
ছটা নাগাদ হবে। দ্য ইগলস্ রুস্ট থেকে ওই হোটেলে পৌঁছবার পরেই।
প্রালেঁতে মাদাম ব্লঁশের হোটেলে পিয়ের কখন পৌঁছেছিল?
তোরাও তো ছিলি। শুনলি না! উনি তো বললেন যে, রাত দশটা নাগাদ।
মাহে থেকে, ফেরি বোট নয়, প্রাইভেট বোটে প্রালে যেতে কতক্ষণ লাগে?
ভটকাই জিজ্ঞেস করল।
নির্ভর করে, কীরকম বোট তার উপর। আমরা যে ইঞ্জিন লাগানো বোটে প্রালের চারপাশে ঘুরলাম, অমন বোটে করে রাতে কেউই যায় না। বড় ও শক্তিশালী স্পিডবোট করে এলে ঘণ্টা তিনেক লাগার কথা।
তাহলে তোমার সঙ্গে মঁসিয়ে পঁপাদু যখন কথা বলল, সেই সময়ে পিয়ের যদি বেরিয়ে পড়ে থাকে, তবে তার পক্ষে রাত দশটাতে পারে এই হোটেলে পৌঁছনো অসম্ভব নয়। তুমি কী বলো?
আমি বললাম।
নয়।
ঋজুদা বলল!
আমি বললাম, ভটকাই, তুই গোড়াতেই একটা গলদ করছিস। বেসিক ফ্যাক্ট সব গোলমাল হয়ে গেছে তোর।
দ্যাখ রুদ্র, গোয়েন্দাগিরিতে ‘বেসিক ফ্যাক্ট’ বলে কিছু নেই। স্ট্যাটিক ফ্যাক্ট’-ও নয়। এখানে সবকিছুই বদলে যেতে পারে। ইকনমিক্সে একটা কথা আছে। ‘আনস্টেবল ইকুলিব্রায়াম। শুনেছিস কি? এই ক্ষেত্রেও সবই ‘আনস্টেবল’।
ভটকাই বলল, ইকনমিক্স-এর প্রফেসার-এরই মতো।
ঋজুদা ভটকাইয়ের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়েছিল। বলল, পিয়ের, মাদমোয়াজেল প্লজেঁর লোক, পাদুর লোক নয়। এটাকেই রুদ্র বলছে বেসিক ফ্যাক্ট। তুই বলতে চাস, ব্যাপারটা আনস্টেবল। এই তো?
হ্যাঁ।
ভটকাই বলল।
পুরো ব্যাপারটাকেই মিছিমিছি কমপ্লিকেটেড করছিস তুই ভটকাই।
ভটকাই বলল, তুমি কি মঁসিয়ে পঁপাদুকে প্রথমবারেই পেয়েছিলে? ফোনে?
না। যে নাম্বার পাদু দিয়েছিল সেই নাম্বারে করাতে একটি মেয়ে বলল, উনি বাইরে গেছেন, ফিরলেই মেসেজ দেবে।
তারপরে পাদুই তোমাকে রিংব্যাক করেছিল?
হ্যাঁ।
ঋজুদা বলল।
তুমিই ভৈঁসার হোটেলের নাম্বার দিয়েছিলে ওঁকে?
হ্যাঁ।
যখন মরিশাস থেকে পঁপাদুর কলটা এসেছিল তখন কি হোটেলের অপারেটর কি তোমাকে বলেছিল যে, কলটা ওভারসিজ কল?
ভটকাই বলল।
না। তা বলেনি।
তবে? তুমি জানলে কী করে যে মরিশাস থেকেই পপাদু তোমাকে ফোন করেছিল?
না, তা জানি না কিন্তু সেইরকমই কথা। তারপর বলল, তুই কী বলতে চাইছিস?
পঁপাদু মাহেতেই আছে। সে তোমাকে মিথ্যে বলেছিল।
ভটকাই বলল।
আমি বললাম, কী যা তা বলছিস ভটকাই। গোয়েন্দা তুই, না ঋজুদা? তুই দেখি সর্বজ্ঞ হয়ে গেছিস।
আমি ভটকাইকে চোখ দিয়ে ইশারা করে সংযত হতে বললাম।
ঋজুদা একটুও না রেগে বলল, আই থিঙ্ক ভটকাই হ্যাঁজ আ পয়েন্ট রুদ্র। হি ইজ শেপিং ইনটু আ ফাইন ডিটেকটিভ। এবার থেকে ভাবছি, বনে-জঙ্গলে তোকে নেব আর শহরে ওকে।
আমি একটু অভিমানের সঙ্গে বললাম, ভালই তো।
ভটকাই বলল, তাই কি হয় ঋজুদা? রুদ্র আমাকে হাত ধরে নিয়ে এল তোমার কাছে আর ওকে ছাড়া কি আমি এক পাও যেতে পারি? উঁহু, পাদমেকং ন গচ্ছামি। সবে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।
বাঃ। ফাইন।
বলল, ঋজুদা।
পরক্ষণেই ভটকাই আরেকটা বোমা ফাটাল। হঠাৎ বলল, মঁসিয়ে পঁপাদুকে আমি এখানেও দেখেছি।
ঋজুদা মুখ থেকে তাড়াতাড়ি পাইপ নামিয়ে বলল, কোথায় দেখেছিস?
এই হোটেলেই।
কীরকম?
আমার চোখ কপালে উঠে গেল।
মানে, স্পষ্ট দেখিনি। ও লবিতে আমার হাত দশেক আগে আগে হেঁটে যাচ্ছিল, তারপর বাঁ দিকের করিডরে ঘুরে গেল। আমি ছুটে গিয়েও আর দেখতে পেলাম না। ওখানে অনেকগুলো লিফট। আবার একটা থাই রেস্টুরেন্টে ঢোকারও দরজা আছে।
তারপরই ভটকাই ঋজুদাকে বলল, তোমাকে আমি দেখাচ্ছি কী করে সে হাঁটছিল।
