ঋজুদার সঙ্গে লবঙ্গি বনে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ভোর চারটেতে দুর্গাদা আর রাজেনদা চানটান করে তৈরি হয়ে আমাদের দুজনকেই ডেকে দিল। তখনও পুবের আকাশ ভাল ফরসা হয়নি।

ভটকাই পাশ ফিরে শুয়ে বলল, জ্বালালি। আমাকে না নিয়ে কেমন কী হয় দেখা যাবে।

বলেই, আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

আকাশে এখনও চাঁদ আছে। আমরা চান করে রাক্-স্যাকে অলিভ গ্রিন রঙের ট্রাউজার আর হাওয়াইন শার্টস-এর একটি করে চেঞ্জ, টর্চ এবং কটি বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে নিলাম।

এবিকাকু একটি মস্ত ঝুড়িতে আমাদের চারজনের জন্য তিনদিনের মতো কাঁচা রসদ, মায়-চাউচিনি পর্যন্ত গুছিয়ে দিয়েছিলেন। গত রাতে ফেয়ারওয়েল ডিনার এমনই হয়েছিল যে, দুপুরের আগে আমাদের দুজনের কারও খিদে পাবে বলে মনে হয় না। এবিকাকু নিজে দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধান করে কালকে রাঁধিয়েছিলেন। পোলাউ, মুরগির মাংস, টাটকা রুই মাছ ভাজা, স্যালাড এবং ঢেঙ্কানল থেকে আনা পোড়া-পিঠা। তবু এক কাপ করে চা এবং একটি করে ডিমের পোচ খেতেই হল, চান করার পর, বেরোবার আগে, এবিকাকুর পীড়াপীড়িতে।

জিপে যখন বসলাম গিয়ে, তখন পুবের আকাশ ফরসা হয়েছে। সমস্ত বন জেগে উঠেছে। আমাদের সি-অফ করার জন্য ফুটুদা, এবিকাকু, তিতির, ভটকাই এবং বাংলোর সমুদয় খিদমদগার জিপ অবধি এলেন।

গুড লাক বলল মিস্টার ভটকাই। মনে-মনে ব্যাড লাক উইশ করে।

তিতির বলল, রুদ্র, কিপ ইওর কুল।

এবিকাকু বললেন, হাতি তো খাওয়া যায় না, এই হৃতির মাংস আনতে বলছি না। দাঁত দুটো তো তোমাদেরই হবে। ভাল করে কেটে এনো। আর পা চারটেও গোড়ালির উপর থেকে। আমার অনেক দিনের শখ হাতির গোদা পায়ের মোড়ায় বসে লুঙ্গি পরে মুড়ি আর বাগবাজারের তেলেভাজা খাব।

ফুটুদা অতিশয় স্বল্পভাষী। মনের মধ্যে হাজার কথা কিলবিল করলে মুখ ফুটে একটা-দুটো কষ্টেসৃষ্টে বেরোয়। চোখ দুটোই বলে, যতটুকু বলার। বললেন, আচ্ছা, তা হলে..

স্টিয়ারিং-এ আমিই বসে ছিলাম। পাশে ঋজুদা। মুখে সদ্য-ধরানো পাইপ নিয়ে। রাইফেল দুটি বাক্স বন্ধ করা আছে। সেগুলো ও অন্যান্য মালপত্রসমেত পেছনে বসেছে দুর্গাদা আর রাজেনদা।

পুরানাকোটের দিকে জিপ চলেছে। বৈশাখের ভোরের হাওয়া ভারী মিষ্টি লাগে।

জঙ্গল এখনও ঠাণ্ডাই আছে। তা ছাড়া, ঘন সেগুন বনের মধ্যে দিয়ে পথ। বৈশাখের ঠাণ্ডা ভোরের হাওয়া এসে লাগছে চোখে-মুখে। আলো এসে পড়েনি এখনও পথে। বেলা দশটা বাজার পর থেকে গরম হয়ে উঠবে পথ আস্তে-আস্তে। তারপর হাওয়ার দাপাদাপি শুরু হবে। মনে হবে যেন স্কুল-পালানো ছেলের দল হুড়দাড় করে জঙ্গলময় পিটু খেলে বেড়াচ্ছে। হাওয়াটা নানারঙা শুকনো পাতাদের অগণ্য বহুরঙা ছাগলের মতো তাড়িয়ে উড়িয়ে আফ্রিকান মাসাই উপজাতির রাখাল ছেলের মতো বনময় দাপাদাপি করে বেড়াবে। বড়কি ধনেশ, কুচিলা খাঁই গাছেদের ডাল থেকে ডেকে উঠবে, হ্যাঁ-হঁ, হ্যাঁ-হ্যাঁ। কুম্ভাটুয়া পাখি, রং তার বাদামি কালো, লেজ ঝোলা; লাফিয়ে লাফিয়ে বনের ছায়ায় এক্কা-দোক্কা খেলবে একা-একা। গম্ভীর মুখে। যেন বউ মরে যাওয়া কোনও একলা বুড়ো। কাঁচপোকা উড়বে বুবঁঝুঁইইই আওয়াজ করে। নানারঙা প্রজাপতি স্বপ্নের বাগানে উড়বে আর বসবে। শব্দ হবে না কোনও। কাঠবেড়ালি হঠাৎ উল্লাসে চার পায়ে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে লেজটা ক্রমাগত ওঠাতে-নামাতে, নামাতে-ওঠাতে তারস্বরে অনেকক্ষণ ধরে ডাকবে চিররর-চি- চির, চিরির…। সারা বন সরগরম হয়ে উঠবে তার ডাকে। জিপের সামনে দিয়ে তাড়াতাড়ি পথ পেরোবে মস্ত লেজ নিয়ে ময়ূর আর ময়ূরী। শিমুল গাছতলাতে শিমুল ফুল খেতে খেতে কোটরা হরিণ হঠাৎ-আসা জিপের শব্দ শুনে চমকে উঠে সাদা লেজটি নাড়াতে-নাড়াতে দৌড়ে যাবে বনের গভীরে, তার সাবধান বাণী ছড়াতে-ছড়াতে, বাক! বাক! ব্বাক! ব্বাক!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *