ঋজুদার সঙ্গে লবঙ্গি বনে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

বহুদিন পরে এলাম রে। ভারী ভাল লাগছে। জানিস। ঋজুদা বলল।

আমি বললাম, কত বছর পর?

এই বাংলোতে? তা প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর হবে। যদিও এর আশেপাশে এসেছি পনেরো বছর আগেও।

ভটকাই বলল, জায়গার কী নাম রে বাবা! বাঘ্যমুণ্ডা। বাঘের মাথা নাকি?

দারুণ নাম। যাই বলিস। আরও দারুণ নাম আছে। বাঘ্যমুণ্ডা। মানুষখেকো বাঘে-খেকো মানুষদের নাম, যারা ভূত হয়ে যায়। কালাসাণ্ডি জেলাতে। ঋজুদা বলল।

আমরা শুনে হেসে উঠলাম সকলে।

এই বাংলোতে আমি একবার শীতকালে ছিলাম। তার আগের বছরই আমাদের বিশেষ পরিচিত মানিক, মানিক দাস, সুধীরঞ্জন দাস মশায়ের ছোট ছেলে, টেস্ট-পাইলট সুরঞ্জনদার ছোট ভাই, এই বাংলোতে ছিলেন সপরিবারে। ঢেঙ্কানল রাজ্যের নিনিকুমারও। মানিকবাবু এখানেই মারা যান।

বাঘের হাতে? তিতির উৎকণ্ঠিত হয়ে শুধোল।

না। যদিও সেই বছরই একটি বড় বাঘ মেরেছিলেন মানিকবাবু এবং এই বাংলোতেই। সামনের ওই গাছ দুটোতে টানা দিয়ে তার চামড়া ছাড়ানো হয়েছিল রাতের বেলা হ্যাজাকের আলোতে কিন্তু বাঘের হাতে মারা যাননি।

তুমি জানলে কী করে কোন্ গাছটাতে টানা দিয়েছিল? ভটকাই শুধোল।

আমিও যে এসেছিলাম সে বছরে। তবে বাঘ্যমুণ্ডাতে ছিলাম না। ছিলাম, অঙ্গুল শহরে। কটকের সুরবাবুদের বাড়িতে। সম্বলপুরে যে পথ চলে গেছে অঙ্গুল হয়ে, সেই পথের উপরে তাঁদের বাড়ি।

তা হলে? জানলে কী করে বাঘ মারার খবর?

অঙ্গুলের ফরেস্ট কনট্রাকটরদের মুখে খবর পেয়েই জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল সকলে মিলে মানিকবাবুকে কনগ্রাচুলেট করতে গিয়ে দেখি ড্রেসিংগাউন পরে বাংলোর হাতায় বাঘের চামড়া ছাড়ানোর তদারকি করছেন মানিকবাবু আর নিনিকুমার। মানিকবাবুর স্ত্রী ও দুই মেয়েও ছিলেন। মানিকবাবুর স্ত্রী ছিলেন আমাদের পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের ইনসপেকটর জেনারেল শ্রীহীরেন্দ্রনাথ সরকারের কন্যা। সুরঞ্জনদা এবং সরকারসাহেব আমাদের প্রথম যৌবনে টালিগঞ্জের গলফ ক্লাব রোডের রাইফেল ক্লাবে আসতেন মাঝে-মাঝেই। অনিল চ্যাটার্জি আসতেন। মহিষাদলের শক্তিপ্রসাদ গর্গ। জোর আড্ডা ছিল তখন।

সন্ধে হয়ে আসছিল। বাংলোর সামনে একটু দূরে কুয়ো। বাঘ্যমুণ্ডা বস্তির মেয়েরা সন্ধের আগে জল ভরে নিচ্ছিল রাতের মতো। ঘড়া কলসির ধাতব আওয়াজ ভেসে আসছিল। এ-অঞ্চলে অনেক গাছ আছে, যেগুলোকে দেখলে মনে হবে তাল বা ইংরেজি পাম গাছ কিন্তু আসলে এগুলো অন্য গাছ।

লেসার ইন্ডিয়ান হর্নবিলসরা জোড়ায়-জোড়ায় ডানা-না-নাড়িয়ে গ্লাইডিং করে ভেসে যাচ্ছিল পশ্চিমের আকাশে। অস্তগামী সূর্যের লাল আলোতে মোহময় গা-ছমছমে দেখাচ্ছিল পাহাড়শ্রেণী আর গভীর জঙ্গলের রেখাকে। এই অঞ্চলে হাতি ও গাউর, ওড়িয়া নাম গন্ধ, প্রচুর আছে। বাঘও আছে।

ভটকাই আঙুল তুলে তালগাছের মতো গাছগুলোকে দেখিয়ে বলল, কী গাছ ওগুলো ঋজুদা?

পাইপটা মুখ থেকে নামিয়ে অ্যাশট্রেতে রেখে ঋজুদা বলল, এগুলোকে বলে সল্প গাছ। এর ফল থেকে স্থানীয় লোকেরা তাড়ির মতো একরকম পানীয় তৈরি করে। তার ক্রিয়া একেবারে মারাত্মক। আমি একবার দশপাল্লার বিড়িগড়ে, খন্দমাল-এর অন্তর্গত, খন্দদের বাসভূমিতে কজন খন্দকে দেখেছিলাম এই সল্প রস খেয়ে শালপাতাদের তাস করে বড় একটা শালগাছের তলায় বসে তাস খেলতে খেলতে খেলতে হঠাৎই একজনের মনে হল, অন্যজন জোচ্চুরি করছে। আর যায় কোথায়? সঙ্গে-সঙ্গে টাঙ্গির এক কোপে ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে দিল বেচারির। নিরুপায় সাক্ষী হিসেবে পরে থানা-পুলিশের ঝকমারিও কম পোয়াতে হয়নি আমাকে।

তিতির বলল, দুর্গা মহান্তি আর রাজেনদা কিন্তু এখনও ফিরল না।

চিন্তিত গলায় ঋজুদা বলল, তাই তো দেখছি। তবে এতক্ষণে এবিকাকু আর ফুটুদাদেরও তো ফেরা উচিত ছিল। গাড়ি বা জিপ খারাপ হল নাকি?

কঘণ্টা লাগবে কটক থেকে আসতে?

ভটকাই শুধোল।

আজকাল এমন চমৎকার সব রাস্তা হয়ে গেছে। আগে অনেকক্ষণই লাগত। সময় লাগছে আসলে ফুটুদার জন্যে। ঢেঁকি স্বর্গে নিয়েও যেমন ধান ভানে ফুটুদাও তাই। ঠিকাদার মানুষ। ফেরার পথে চৌদুয়ার, হিন্দোল, ঢেঙ্কানল, অঙ্গুল সব জায়গাতেই একবার থামতে-থামতে আসবে তো?

তিতির বলল, ফেরার সময় পম্পাশরের মোড় থেকে দুর্গা মহান্তি আর রাজেনদাকে তুলে আনতে ভুলে যাবেন না তো?

ওরা তুললে কী হবে, দুর্গা মহান্তিরা পথের উপরেই বসে থাকবে হয়তো। নইলে অন্ধকারে পুরুনাকোটের মুখ থেকে বাঘ্যমুণ্ডা অবধি হেঁটে আসার সাহস পাবে না ওরা। এখানে হাতি খুব।

ভটকাই বলল, ওদের এত সাহস আর এতেই ভয় পাবে?

জঙ্গলের মানুষেরা যতই সাহসী হোক, রাত নামার পর তারা ঘরের বাইরে বেরোয় না। অবশ্য শিকারে গেলে আলাদা কথা। কিন্তু শিকার তো এখন বন্ধই বলতে গেলে। খালি হাতে, বাতি ছাড়া অন্ধকারের পর কারও বনে-জঙ্গলে চলাফেরা করা উচিত নয়।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো করতেন। তিতির বলল।

তিনি সাধক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তা ছাড়া জঙ্গলের সমস্তরকম ভয় সম্বন্ধে উনি হয়তো সচেতন ছিলেন না। নয়তো সচেতন থেকেও হয়তো গ্রাহ্য করতেন না। ওঁর কথা আলাদা।

আর তুমি?

ঋজুদা হেসে বলল, আমার কাছে তো মন্ত্রগুপ্তি আছে।

বাজে কথা। ভটকাই বলল।

এই ভটকাইকে নিয়ে আমরা সকলেই মহা ঝামেলায় পড়েছি। ঋজুদাকে ও মোটেই মান্যগণ্য করছে না। ঋজুদার সঙ্গে নিনিকুমারীর বাঘ মারতে গিয়ে কাগা-বগা-না-মারা শিকারি বাঘিনী দিয়ে অ্যাকাউন্ট ওপেন করার পর থেকেই ভটকাই বাবাজির বোলচাল আরও তেজ হয়েছে। একে নিয়ে আমরা সমস্তক্ষণ টেনশনে ভুগি। ঋজুদার হাসিই দেখেছে। রাগ তো দ্যাখেনি!

নকুল ভেতর থেকে চা নিয়ে এল আমাদের জন্যে, সঙ্গে মুচমুচে করে ভাজা বড় নিমকি, আলুর ঝাল-তরকারি আর লেবুর আচার। তিতির চা খায় না। দুগ্ধপোষ্য শিশু। তার জন্যে গ্লাসে করে দুধ।

ঋজুদা বলল, যাই বলিস তিতির, পশুরাজ্যেও কিন্তু বড় হয়ে ওঠার পর দুধ খাওয়ার রেওয়াজ নেই। মানুষেরা কেন এই বদভ্যাস ছাড়ে না, ভেবে পাই না।

ঋজুদার কথায় আমরা হেসে উঠলাম।

তিতিরও হাসল। তারপর বলল, কথাটা ভাববার মতো। কিন্তু পশুদের মায়েরাই যদি না দেয়, তা হলে বেচারিরা দুধ পাবে কোত্থেকে!

এটাও একটা ভাববার মতো কথা। ঋজুদা বলল।

ঋজুদার কথা শেষ হতে-না-হতে বাংলোর চওড়া বারান্দায় যেখানে আমরা বসে ছিলাম, তার বাঁ দিক থেকে হাতির বৃংহণ ভেসে এল।

গরমের দিন। সূর্য ডোবার পরে হাওয়া যেন পাগল হয়ে উঠেছে। বনুময় ঝরা পাতা, লাল ধুলো এবং ঝরা ফুল ঝাঁট দিয়ে বেড়াচ্ছে দৌড়ে-দৌড়ে। দুটো পেঁচা বাংলোর পেছনের মিকুনিয়া গাছ থেকে প্রচণ্ড জোরে উড়ে-উড়ে ঝগড়া করতে-করতে ঘুরে-ঘুরে দূরে চলে গেল কুয়োটার কাছে।

ভটকাই আধখানা নিমকি মুখে দিয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, টেনশান।

কেন? হাতি?

না রে। যদি পেঁচা দুটো কুয়োয় পড়ে যায় তা হলেই কেলো। বল?

ভটকাইয়ের ভাবনাচিন্তার রকমটাই এরকম। আর যাই হোক, কেউই ওর ওরিজিনালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

এমন সময় দূর জঙ্গলের মধ্যে জিপের এঞ্জিনের আওয়াজ শোনা গেল। পুরুনাকোট আর টুকা যাওয়ার মোড়ের কাছ থেকে এলে পুরুনাকোট থেকে নতুন ফরেস্ট বাংলো যেদিকে, সেদিকের পথে বোস্টম নালাকে পাশে রেখে এলে কিছু চড়াই-উতরাই পড়ে। তবু এ রাস্তাটিতে অনেক বাঁক আছে। জিপ টপ গিয়ারে দিয়েই আবার থার্ড গিয়ারে ফেলে দিচ্ছেন ফুটুদা। এঞ্জিনের শব্দে পরিষ্কারই বোঝা যাচ্ছে। ঋজুদার গাড়িটা চালাচ্ছে ফুটুদার ড্রাইভার।

এল ওরা।

ভটকাই বলল।

দেখা যাক, এখন গ্রেট দুর্গা মহান্তি কী সংবাদ নিয়ে আসে আমাদের জন্য। ঋজুদা বলল।

দুপুরের পর থেকেই আমরা ওদের পথ চেয়ে ছিলাম। সকাল আটটাতে লবঙ্গি থেকে আট-দশজন লোক পায়ে হেঁটে এসে পৌঁছেছিল হাতির খবর দিতে। ঋজুদা বলেছিল দুঃখ করে, আমার কপালে পৃথিবীর কোনও জঙ্গলেই অবিমিশ্র ছুটি কাটানো নেই। এসেছিলাম তোদের নিয়ে মহানদীর দুপাশের জঙ্গলকে নতুন করে দেখতে, তোদের চেনাতে, তা না দ্যাখ, মাত্র একদিন কাটতে-না-কাটতেই এই বিপত্তি।

লবঙ্গির মানুষেরা অনেক কাকুতি-মিনতি করল। হাতিটাকে রোগ ডিক্লেয়ার করা হয়েছে জেলা কর্তৃপক্ষ থেকে। মারার চেষ্টাও করেছেন ভুবনেশ্বর ও কলকাতার দুজন শিকারি। অঙ্গুলের ডি. এফ. ও-ও ঋজুদাকে অনুরোধ করেছেন। লবঙ্গির লোকেদের সঙ্গে পম্পাশরের লোকও ছিল পাঁচজন। হাতিটা নাকি পম্পাশরেও এসে ঝামেলা করেছে। মানুষ মেরেছে এ পর্যন্ত পাঁচজন। তিনজন পুরুষ। দুজন মেয়ে। বাড়ি-ঘর ভেঙেছে অগুনতি। গোর-মোষ আছড়ে মেরেছে কুড়িটা।

ওরা বড় গরিব যে, তা মনে হল ওদের জামাকাপড় আর চেহারাতেই। ঋজুদা এসেছে যে বেড়াতে, সে-খবর ডি. এফ. ও. সাহেবের অফিস থেকে ফরেস্ট-গার্ডই এনে ওদের দিয়েছে কাল। বাস সার্ভিস আছে অস্কুল থেকে পম্পাশর হয়ে, পুরুনাকোট হয়ে। সেই বাস চলে যায় মহানদীর পারে টিকরপাড়াতে। তারপর টিকরপাড়াতে বাঁশের ভেলাতে মহানদী পেরিয়ে ওপারে নানান জায়গায়। বৌধ, ফুলবানী, দশপাল্লা ইত্যাদি জায়গাতে।

ঋজুদার উপরে সকলেরই যেমন ডিম্যান্ড দেখছি তাতে মনে হচ্ছে এ-যাত্রা আমাদের ফ্যামিলিয়ারাইজেশান ট্যুরের এখানেই ইতি। তিতির সখেদে বলল।

ফুটুদারা এসেই বললেন, চান করতে ঢুকছি। সারাদিন গাড়িতে একেবারে ঝলসে গেছি।

সারাদিন মানে?

ওই হল। কটক থেকে বেরিয়েছিলাম খাওয়া-দাওয়ার পর। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর গরম আরও বেশি লাগে। এই কথা বলেই ফুটুদা বাথরুমে চলে গেলেন।

এবিকাকুও অন্য বাথরুমে।

ফুটুদার পাখির আহার। তবে এবিকাকু ঋজুদার সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দিয়ে খেতে পারেন, যখন খান। আর পদেরই বা কী রকমারি!

দুর্গাদা আর রাজেনদা মালপত্র সব নামিয়ে-টামিয়ে মুখ-হাত ধুয়ে নিল কুয়োতলায়, তারপর বারান্দায় এল।

ঋজুদা বলল, চা-টা খেয়ে তারপরেই এসো। তারপরে শুনব। তোমাদের কাহিনী তো আর ছোট হবে না।

ওরা চলে গেলে ঋজুদা বলল, মুখ-চোখ দেখে মনে হল, এখানের ক্যাম্প তুলে আমাদের লবঙ্গিতেই যেতে হবে কাল-পরশু।

কী করে বুঝলে?

বুঝলাম। অনেক বছরের সঙ্গী এরা। কিছু তো বুঝব মুখ-চোখ দেখে।

ভটকাই বলল, হতি কী যে মারে লোকে! অত বড় জানোয়ার। তাকে মারতে আর বাহাদুরি কী? ওর চেয়ে তো স্নাইপ মারা সোজা।

ঋজুদাকে এমন করে বলল ও, তাতে আমি বললাম,  ফ্লুক-এ একটা বাঘ মেরে দিয়ে তোর বোলচাল খুব বেশি হয়েছে।

ঋজুদা বলল, ‘হাতি রোগ’ হয়ে গেলে তার মতো সাঙ্ঘাতিক জানোয়ার খুব কমই হয়। এ তো দলের হাতির নয় যে, ধীরেসুস্থে ভাল ট্রফি দেখে ভাল করে এইম নিয়ে নিজে অ্যাডভান্টেজাস্ পজিশন বেছে নিয়ে ভাইটাল জায়গা দেখে গুলি করলি আর পড়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে অন্যান্যরা হুড়মুড় করে পালিয়ে গেল। রোগ হাতিকে তোর খুঁজতে হবে না। সেই তোকে খুঁজে বের করবে। অতবড় জানোয়ার চড়াই-উতরাই সব জায়গাতে যে কী জোরে, দৌড়তে পারে আর কতখানি নিস্তব্ধ হয়ে নিঃসাড়ে জঙ্গলের মধ্যে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, অনড় শুড়টি চকিতে বিদ্যুৎচমকের মতো নেমে এসে কখন যে কার ভবলীলা শেষ করে দেবে তা যার অভিজ্ঞতা নেই সে বুঝতেও পারবে না। হাতি-শিকার সকলের পক্ষে সহজ নয়। হাতি সম্বন্ধে জ্ঞানও বেশি লোকের নেই।

আমি বললাম, ঋজুদা, লালজির কথা বলো। ওরা তো জানে না।

অসমের গৌরীপুরের ছোটকুমার লালজির সমস্ত জীবনই কেটেছিলো হাতিদেরই সঙ্গে। গত মার্চ মাসে উনি মারা গেলেন। ওঁর মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গে একটি জ্ঞানভাণ্ডারও মুছে গেল। অথচ আমাদের এমনই পোড়া দেশ যে, ওঁকে নিয়ে কোনও ডকুমেন্টারি ছবি অথবা একটি টেলিফিল্মও হল না। ভাবলেও দুঃখ লাগে। আর কত হাজার মিটার ফিল্ম যে প্রতিদিন ফালতু নেতাদের ছবি তুলে খরচ হচ্ছে!

নাম কী ছিল ওঁর?

ভাল নাম প্রকৃতীশচন্দ্র বড়ুয়া। ডাক নাম লালজি। হাতি মারতেন না উনি। হাতি ধরতেন। হাতি খেদিয়ে বেড়াতেন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের প্রথম দিকের, সাইলেন্ট পিকচারের সময় থেকেই; একজন দিকপাল ছিলেন প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া; তাঁরই ছোট ভাই হলেন লালজি।

তাই? ভটকাই বলল।

কলকাতায়ও কয়েকজন ভাল হাতি-শিকারি আছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ও আছে। যেমন, ধূতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরি, জর্জ ট্র এবং চঞ্চল সরকারের। চঞ্চলের সঙ্গে রঞ্জিতও যায়। চঞ্চল যত রোগ হাতি মেরেছে, তত খুব কম শিকারিই মেরেছেন। ওর বাড়িতে একদিন নিয়ে যাব তোদের। এলিয়ট রোডে থাকে। হাতির দাঁত আর পায়ের কালেকশান দেখে অবাক হয়ে যাবি। চঞ্চল ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের বড় ঠিকাদার। ধূতিকান্তবাবু অধ্যাপক, বরেন্দ্রভূমের নামী জমিদার বংশের ছেলে। চেহারাটিও চমৎকার। আর জর্জ ট্রব হল নামকরা ডেনটিস্ট। ওর বাবার পসার পেয়েছে ও। বাবা ছিলেন অসমের চা-বাগানগুলোর ডেনটিস্ট। এক বাগান থেকে অন্য বাগানে তখনকার দিনে মোষের গাড়িতে করে ঘুরে-ঘুরে রোগী দেখতেন। জর্জ শিশুকাল থেকেই বাবার সঙ্গে ঘুরে-ঘুরে শিকারি হয়েছিল।

ওঁদের মধ্যে ডাকবে নাকি কাউকে?

যদি তেমন দেখি, আমার দ্বারা যদি এই হাতি মারা না হয়, তবে ওঁদেরই কাউকে খবর পাঠাতে হবে শেষ পর্যন্ত।

তিতির বলল, তুমি যদি হাতির পেছনেই ঘুরে বেড়াও তা হলে আমাদের তো এ-যাত্ৰা মহানদীর দুপাশের জঙ্গল দেখাই হবে না। পনেরো দিনের জন্যে আসা, তার মধ্যে তো চারদিন চলেই গেল।

দেখি। তিনদিন সময় দেব। না পারলে, আমরা চলে যাব, ওঁদেরই কাউকে আসবার জন্যে নিমন্ত্রণ জানাতে বলব অঙ্গুলের ডি. এফ. ও. সাহেবকে, এবং ডিভিশনাল কমিশনারকেও।

রোগ হয়ে যাওয়া মানে কী ঋজুদা? এ কি কোনও রোগ? ভটকাই শুধোল।

ঋজুদা হেসে উঠল ভটকাইয়ের কথা শুনে।

আমরাও হাসলাম।

তিতির বলল, না হে বোকামশায়। রোগ মানে গুণ্ডা। শুধু হাতিই নয়, যে-সমস্ত জানোয়ার যূথবদ্ধ, মানে দলে থাকে, তাদের প্রত্যেক দলে একজন করে সর্দার থাকেই। হাতি, গাউর (ইন্ডিয়ান বাইসন), শম্বর, বারাশিঙা, চিতল ইত্যাদি জানোয়ারেরা দলে থাকে। যা বললাম, তাদের প্রত্যেক দলে একজন করে সর্দার থাকে। সর্দার সবসময়েই পুরুষ হয়। মানুষের মধ্যে অবশ্য মেয়েরাও হতে পারেন, যেমন ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন। সে-কথা ভাবলে মনে হয়, জানোয়ার না হয়ে মানুষ হওয়াতে খুব বেঁচে গেছি। যাই হোক, দলে যখন কোনও উঠতি যুবক বলশালী হয়ে ওঠে, তখন দলের সদারি নিয়ে সদারের সঙ্গে তার খিটিমিটি লাগে। তারপর একদিন এক চূড়ান্ত লড়াই বা ডুয়েল হয় তাদের মধ্যে।

একদিন বলিস না তিতির। ঋজুদা বলল।

ঠিক বলেছ। ওই লড়াই একদিন আরম্ভ হয় ঠিকই, কিন্তু তা যে একদিনেই শেষ হয় এমন নয়। কখনও কখনও চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। কখনও সর্দার জেতে, কখনও বা উঠতি-সর্দার। কখনও লড়াই শেষ হয় অন্য পক্ষের মৃত্যুতে। এক পক্ষ মরে গেলে ঝামেলা চুকে যায়। কিন্তু যখন এক পক্ষ অন্য পক্ষের কাছে সেই সাঙ্ঘাতিক লড়াইয়ে হেরে গিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েও বেঁচে যায়, তখনই বিপদের সূত্রপাত হয়। সে শরীরের ক্ষত নিয়ে, মনের জ্বালা নিয়ে, জঙ্গলের গভীরে গিয়ে, প্রথমে বিশ্রাম নিয়ে তার ক্ষতগুলি সারিয়ে নিতে চায়। সুস্থ হয়ে গেলেও অনেক সময়ই সম্পূর্ণ সুস্থ হয় না। তবে কোনও-কোনও সময় হয়ও। কিন্তু সে যে দল-তাড়িত, অপমানিত সেই অপমান ও গ্লানির কথা সে কোনও সময়েই মন থেকে মুছতে পারে না। তখন অনেক সময় ক্ষতবিক্ষত অবস্থাতেই মানুষের বা গোরু-মোষের বা যানবাহনের কাছাকাছি এলে সে সঙ্গে-সঙ্গে আক্রমণ করে। মানুষকে মেরে ফেলে।

হাতির কবলে পড়ে যাদের মৃত্যু হয়, বাঘ বা ভাল্লুকের হাতে মৃত্যুর চেয়েও তা বীভৎস। হাতি মানুষকে তালগোল পাকিয়ে দেয়। মুখ ঢুকে যায়, হাত-পা ঢুকে যায় পেটের মধ্যে। কখনও খুঁড়ে জড়িয়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে দেয়। কখনও-বা আছাড় মারে। তারপর পা দিয়ে থেঁতলে থেঁতলে রাগ মেটায়। মানুষের বাসস্থান চালাঘর ভেঙে তছনছ করে দেয়। ছাদ-চাপা পড়ে মরে মানুষ। গোরু-মোষের অবস্থাও সেরকমই করে। জিপগাড়ি বা গাড়ি ধাক্কা মেরে খাদে ফেলে দেয় বা দুমড়েমুচড়ে তাদের, তোমার ভাষায় বলতে গেলে, জিওগ্রাফিও পালটে দেয়। বাস বা ট্রাকও গুণ্ডা হাতির সামনে পড়ে গেলে রেহাই পায় না। মানুষখেকো বাঘের হাত থেকে না হয় শক্তপোক্ত ঘরের দরজা বন্ধ করে বাঁচা যায় কিন্তু হাতির বাসস্থান যেরকম জঙ্গল-পাহাড়ঘেরা এলাকাতে হয়, তা ভারতের বা আফ্রিকারও যে-কোনও অঞ্চলেই হোক না কেন; পাকা বাড়ি প্রায় কোথাও থাকে না। সেইসব গ্রামঞ্চলের বাড়ি নামেই বাড়ি। তাই হাতির হাত থেকে ঘরে থেকেও তাদের বাঁচার উপায় থাকে না।

দিন রাতের কোন সময় যে কোন গ্রামে গুণ্ডা উপস্থিত হবে, তাও আগে থেকে বলা যায় না। রোগ হাতির আতঙ্ক সাঙ্ঘাতিক আতঙ্ক। তা ছাড়া, বাঘ-ভাল্লুককে গ্রামের লোকেরা যথেষ্ট সাহসী বলে বিষমাখানো তীর বা বল্লম দিয়ে মারলেও মারতে পারে, কিন্তু হাতির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে পারে এমন কোনও অস্ত্রই ওদের নেই। রাতের বেলা হলে হাতিকে আগুন দেখিয়ে ভয় দেখায়। কিন্তু যে হাতি রোগ হয়ে গেছে, তার মনে এত জ্বালা-যন্ত্রণা থাকে যে, তার মৃত্যুভয়ও লোপ পেয়ে যায়।

ঋজুদা তিতিরকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তোদের মনে আছে তিতির, সিমলিপালের জেনাবিল বাংলোর সামনে তিন-চারশো গজ দূরে একটি হাতির কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখেছিলাম আমরা?

আমি আর তিতির একসঙ্গে বলে উঠলাম মনে আছে।

তা হলে তোদের এও মনে আছে যে, জেনাবিল বস্তির লোকেরা বলেছিল যে, কোনও দলের সর্দার আর উঠতি-সদারের মধ্যে লড়াইয়ের ফয়সালা হয়েছিল ওখানে।

হ্যাঁ, বলেছিল। তিতির বলল।

হাতিদের খুব বুদ্ধি হয়, না? ভটকাই শুধোল।

হাতির বুদ্ধির নানারকম গল্প শোনা যায়। সত্যিই বুদ্ধিমান প্রাণী হাতি। লালজিকেও আমি এই প্রশ্ন করেছিলাম।

কোথায়?

তখন উনি উত্তরবাংলার গোরুমারা অভয়ারণ্যের কাছে মূর্তি নদীর পাশে তাঁর একটি গণেশ এবং একটি মাকনা হাতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধে ক্যাম্প করেছিলেন বুনো হাতি খেদিয়ে দেবার কড়ার নিয়ে।

কী বলেছিলেন লালজি? আমি শুধোলাম।

ঋজুদা হেসে বলল, লালজি বলেছিলেন, হাতির যদি এতোই বুদ্ধি থাকত, তা হলে সে তো ডি. এফ. ও-ই হত।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম ওই কথাতে।

এমন সময় দুর্গাদা আর রাজেনদা বারান্দায় এসে উঠল। ওদের পায়ের তলাটা কর্কশ হয়ে গেছে শিশুকাল থেকে শীত-গ্রীষ্ম পাহাড়-জঙ্গলে হেঁটে-হেঁটে। সিমেন্ট-বাঁধানো বারান্দায় খসস খসস শব্দ হল কর্কশ পায়ের।

ঋজুদা বলল, দুর্গা, এই হ্যারিকেনটা ভিতরে নিয়ে যাও তো। আজ শুক্লানবমী। চাঁদটা কী দারুণ উঠেছে পাহাড়ের রেখা আর ঘন বনকে আলো করে। এই ব্যারিকেনের আলো চোখের উপর পড়াতে তা দেখা পর্যন্ত যাচ্ছে না।

রাজেন বিড়বিড় করে বলল, এটি সাপপ অচ্ছি গণ্ডা গণ্ডারে।

কঁড় সাপপ? ঋজুদা বলল।

কঁড় সাপপ নাহি আইজ্ঞা? তম্প সাপপ অছি জুড়ে।

মানে, কী সাপ নেই তাই বলুন। একজোড়া শঙ্খচূড় সাপও আছে।

ঋজুদা বলল, হউ! সাপ মানে আচ্ছি তাংকু মনেরে, মত্বে কাঁই কাটিবাকু আসিবি সে? নেই যা দুর্গা, সে বত্তিটা।

মানে হল, হোক। সাপেরা আছে তাদের মনে, খামোখা আমাকে কামড়াতে আসবে কেন? বাতিটা নিয়ে যা দুর্গা।

বাতি নিয়ে যাওয়ার পর শুক্লানবমীর রাত যেমন স্পষ্ট উজ্জ্বল হল, নির্জনতাও যেন বেড়ে গেল অনেক। কলকাতায় লোডশেডিং হয়ে গেলেই নির্জন হয়ে যায় শহর। সেটা অবশ্য লক্ষ লক্ষ ফ্যান আর হাজার এয়ারকন্ডিশনারের শব্দ বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্যও হতে পারে। কিন্তু আলোর সঙ্গে শব্দের কোনও আপেক্ষিক সম্পর্ক আছে কি নেই এ নিয়ে গবেষণা হওয়া বোধহয় দরকার। সম্পুর্ক যে আছে এই কথা কোনওদিন কোনও বিজ্ঞানী হয়তো প্রমাণও করবেন। কে জানে!

ঋজুদা বলল, কঁড় দেখিলি দ্বিজ-জনে লবঙ্গি যাইকি, ক। শুনিবি।

গলা খাঁকরে নিয়ে দুর্গাদা আর রাজেনদা একসঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করল।

আরে! পিলেমানে কোরাস গীত ধরি পাইলু যে!

ঋজুদা হেসে বলল।

রাজেনদা একটু লাজুক প্রকৃতির। সে বলল দুর্গাদাকে, তু সববে ফ্যাকটো তাংকু কহি দে।

ফ্যাকটো শব্দটি ইংরেজি। রাজেনদারা কথায় কথায় ফ্যাকটো শব্দটি ব্যবহার করে।

দুর্গাদা যা বলল, তা শুনেই তো নাড়ি ছেড়ে যাবার যোগাড়।

হাতিটা নাকি ধোপ যেমন পুকুরের পাটে ধাঁই-ধপাধপ করে কাপড় কাচে, তেমনই করে লোকজন গাইবলদ শুড় জড়িয়ে তুলছে আর কাঁচছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *