ঋজুদার সঙ্গে আন্ধারী তাড়োবাতে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ

তাড়োবাতে ফিরেই ভটকাই-এর তাড়নাতে সঞ্জীবকাকু আর তাপসকাকুদের মামাজিকে পাকড়াও করে গাড়ি নিয়ে চন্দ্রপুর যেতে হয়েছিল। ভটকাই নিজেও যেতে চেয়েছিল, ঋজুদার পারমিশান না পাওয়াতে যেতে পারেনি। চন্দ্রপুর এখান থেকে পঁয়তাল্লিশ কিমি। কোলসা থেকেও পঁয়তাল্লিশ কিমি। তিতির হানিমুন করতে যদি প্লেনে করে আসে অথবা ট্রেনে করে নাগপুরে তাহলে নাগপুর থেকে আন্ধারী-তাড়োবা পড়বে একশো পঞ্চাশ কিমি। কোলসাও হয়তো ওইরকমই পড়বে নভেগাঁও হয়ে না ঢুকে যদি মোহার্লি দিয়ে ঢোকে।

তারপর ভাবলাম, যার হানিমুন সে বুঝবে। আমি ভেবে মরি কেন? তা ছাড়া বলেছে ‘যদি কোনওদিন বিয়ে করি।যদিকে ফেলি নদীতে।

তাপসকাকুরা ব্রেকফাস্টও করলেন না। বললেন, ভটকাই-এর যা ফরমাশ তাতে দেরি করলে হবে না। চন্দ্রপুর গিয়েই বরং গরম গরম জিলিপি-সিঙ্গাড়া দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারব বাজার করতে করতে।

ভটকাই আমাদের পোলাও মাংস না খাইয়েই ছাড়বে না, যদি তাও নিজের রোজগারে খাওয়াত। ও এবং আমিও অথবা তিতিরও রোজগার তো এখনও কেউই করি না। কিন্তু অন্য ভাল মানুষের ঘাড় ভেঙে এই প্রকার অত্যাচার আমাদের একেবারেই পছন্দ হয় না। তবে খাই আমরাও যে, সে কথা ঠিক। মদত দেওয়ার দোষে আমরাও দোষী। তবে ঋজুদা, একমাত্র যে ভটকাই-এর এইসব বাঁদরামো বন্ধ করতে পারত, করে না। ঋজুদা অবশ্য এমন কোনও মানুষেরই আতিথেয়তা নেয় না যার উপরে তার দুশো ভাগ দাবি নেই। অথচ এই দাবিটা রক্তের আত্মীয়তার নয়, ব্যবসার নয়, স্বার্থর নয়, এই দাবি শুধুই স্বার্থহীন ভালবাসার। প্রদীপদারা সকলেই ঋজুদাকে শুধু মুখেই দাদা বলে না, নিজের দাদার মতোই ভালবাসে। শ্রদ্ধা করে।

ঋজুদা একদিন খুব দামি একটা কথা আমাদের খেলার ছলে বলে ফেলেছিল। বলেছিল, বুঝলি রে, এই সংসারে দেওয়াটা ভারী সোজা নেওয়াটাই ভারী কঠিন। যারা দেয়, বা যারা কারও জন্যে কিছু করে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই মনে করে যে, দিয়েই ধন্য করল বুঝি। আসলে তারা বোঝার ক্ষমতাই রাখে না যে, যাকে দিল তার বাহাদুরিটা অনেকই বেশি। নিতেও জানা চাই। যাঁরা, কেন? কেন? না, না। একী করছেন! এইসব বলেন নেওয়ার সময়ে, তারা নিতে জানেন না।

তারপর বলেছিল, তোরা রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়েছিস কেউ?

তিতির বলল, পড়েছি।

তবে তো পড়েইছিস, লাবণ্য অমিতকে সেই যে শেষ চিঠি লিখল, তাতে লিখছে ‘গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়’, ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকমই। দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারটা ভারি গোলমেলে।

তারপর বলল, প্রদীপ আর তাপস যদি আমাদের পোলাও মাংস খাইয়ে সুখী হয় তা হোকই না।

বাঃ রে। ওঁরা তো ভটকাই-এরই প্ররোচনাতে এই ঝকি নিতে বাধ্য হলেন।

তা হোকই না। ভাল কাজ কারওর প্ররোচনাতে করলেও তা ভাল কাজই।

তিতির বলল, তুমি আজকাল বড় গোলমেলে কথা বলো ঋজুকাকা, ঠিক বুঝতে পারি না।

পারবি রে পারবি। তোরা সব আজকালকার ছেলেমেয়ে। বাঙালির সাহেব-মেম ছেলেমেয়ে। তোরা বলিস boneless fish খাব, কাটা খেতে পারি না। আমার কথাগুলোও ওই মাছেরই মতো হয়ে যায়। কাঁটাওয়ালা। যে ছাড়িয়ে খেতে পারে, সে মানে বোঝে। যে পারে না, সে বোঝে না। সকলকেই যে সবই বুঝতে হবে তার মানেই বা কী আছে। আমার কথা না বুঝলেও তো তোর দিনযাপনের, আনন্দ-দুঃখের এতটুকু হেরফের হবে না। তবে এ নিয়ে মিছে চিন্তা কেন? এ প্রসঙ্গ থাক এখন। এখন বল দেখি মোহার্লির ইন্টারপ্রিটেশান সেন্টারটা কেমন দেখলি?

ভটকাই এইসব কথা শোনেনি। ভটকাই কিচেনে গেছিল। যুদ্ধ শুরু হবে ঘণ্টা দেড়েক বাদে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রস্তুতি কেমন তাই দেখতে গেছিল। যাকে বলে সরেজমিনে তদন্ত করা আর কী? নির্দেশনামা দিতে গেছিল। ফিরে এল কী যেন কুটুর কুটুর করে কামড়াতে কামড়াতে।

তোর মুখে কী? আমি বললাম।

গুটকা।

ছিঃ ছিঃ।

কেন? ছিঃ ছিঃর কী হল। দেশ সুদ্ধ লোকে, যাকে বলে আপামর জনসাধারণ খাচ্ছে তা খেলে ছিঃ ছিঃ করার কী আছে।

ওহে, তোমার যে ক্যানসার হবে। তিতির বলল।

গলায় তো হবে? ভটকাই বলল।

হ্যাঁ।

ঋজুদা পাইপ খায়, ঋজুদার জিভেও ক্যানসার হতে পারে। অনেকেরই হয়। যারা গুটকা খায় বা বেশি পান-জর্দা তাদের গলাতে ক্যানসার হতে পারে। আর তোমাদের মতো, যারা কিছুই খাও না কিন্তু কলকাতা শহরে বাস করো তাই। তোমাদের শরীরের যেখানে-সেখানে ক্যানসার হতে পারে। লাংগস-এ তো হতে পারেই, ব্রেইন-এ হতে পারে, যদি ব্রেইন থেকে থাকে, লিভারে হতে পারে, পাকস্থলীতে হতে পারে, নাকে কানে, হাতে পায়ে সর্বত্র হতে পারে। নিজেরা খাও না খেও না, তবে জ্ঞান দিও না বেশি।

আমি বললাম, কোনও ভদ্রলোক গুটকা খায় না। এই তথাকথিত ভদ্রলোকেরাই তো দেশটাকে ডোবাল। তোর গায়ে কি লেবেল মারা আছে যে তুই ভদ্রলোক? এই বাবুর্চিখানার মেহনতি ভাইয়েরা, এই কালিস গাড়ির ড্রাইভার মামাজি গুটকা খায় বা আমি খাচ্ছি বলেই কি তোর চেয়ে নিকৃষ্ট তারা অথবা আমি?

ঋজুদা হাসতে হাসতে বলল, তুই পড়াশোনা ছেড়ে রাজনীতিতে যা, তোর হবে ভটকাই।

পড়াশুনো ছেড়ে যাব কেন?

না, পড়াশুনো বেশি করলে আবার রাজনীতি করা যায় না তো।

ওসব পুরনো কথা। গ্রাজুয়েশনটা অন্তত করতে তো হবে। নইলে আজেবাজে নেতাও হ্যাঁটা দেবে। মানুষের সঙ্গে একাত্ম বোধ করি, তাদের সুখ দুঃখ বুঝি, তাদের সকলকে নিয়ে এক সঙ্গে চলতে চাই, তাদের সামনে নিজের বক্তব্য প্রাঞ্জলভাবে রাখতে পারি শুধু সেই জন্যেই যদি তোমরা আমাকে দোষী করো তাহলে আমার কিছুই বলার নেই।

আমরা সকলেই এবারে একসঙ্গে হেসে উঠলাম। তিতির তো ওর বক্তব্য রাখা’ শুনে হাততালিই দিয়ে উঠল। তিতির বলল, তোমার হবে।

হবে আবার কী? হয়ে গেছে। পাজ রসুন আদা গরমমশলা বাটা আরম্ভ হয়ে গেছে, কিসমিস এলেই কিসমিস বাছা আরম্ভ হয়ে যাবে, বেগুন বাসন্তীটা এই মধ্যপ্রদেশের এই জঙ্গলের বাবুর্চি বেচারারা কখনও রাঁধেনি, নামও শোনেনি। দেখলাম ফ্রিজে ভাল পরিমাণ দইও আছে। গতকাল সঞ্জীবদা নিষ্ঠুনদের বেগুন খাওয়াবেন বলে উমরেরের বাজারে যা বেগুন পেয়েছেন তার সবই প্রায় তুলে এনেছেন–অতএব বেগুনেরও কমতি নেই। সুতরাং এদের একটি টিপিক্যাল বাঙালি পদ রাঁধতে শিখিয়ে এলাম। তোমরা খেয়ে বলো। দুঃখের বিষয় এই যে এখানে নারকেল নেই, পাওয়াও যায় না। থাকলে তো নারকেল কুরে উপরে উপরে একটু ছড়িয়ে দিতাম। তবে বেগুন আমি লম্বা করে কেটে দিয়ে এসেছি, ওরা বেগুন হাতে পেলে তো চারকোণা টুকরো করে কেটে ফেলত। তাই রিসক নিলাম না। নিজেই কেটে রেখে এলাম। তবে এও জানি যে, পাঁচ দশ বছর পরে যদি এখানে ফিরে আসি তবে এরা বেগুন বাসন্তীই পরিবেশন করে নাম বলবে ‘বেগুন ভটকাই’। ওদের আমার নামটা ভারি পছন্দ হয়ে গেছে। তা ছাড়া জনপ্রতি, দুটি করে গুটকার প্যাকেট দান করেছি যে। বুঝলিরে রুদ্র, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়লেই লেজ গজায় না। মানুষের সঙ্গে, সব স্তরের মানুষের সঙ্গে যদি সমানভাবে এবং তাদের মতো করে মিশতেই না পারিস তবে লেখাপড়া শেখা না শেখা সমান।

এবারে চুপ করবি ভটকাই।

অশেষ ধৈর্যসম্পন্ন ঋজুদারও যেন ধৈর্যচ্যুতি ঘটল।

ভটকাই চুপ না করে বলল, নাগপুরে আমরা যেখানে উঠেছিলাম, সেই সেমিনারি হিলএর মহারাষ্ট্র স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ড-এর দারুশ গেস্ট হাউসের মালির নাম কি জানিস তোরা?

অবাক হয়ে আমি আর তিতির বললাম, কী?

হেমরাজ চিঞ্চিকেডে। ঋজুদা তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে তাও কি জানিস? পাইপের সুগন্ধি টোব্যাকো তাকে খইনি করে খেতে দিয়ে পুটুর পুটুর করে কত গল্প করেছে তার সঙ্গে তা জানিস?

ঋজুদা এবারে অবাক হয়ে বলল, তুই জানলি কী করে?

জানতে হয়।

তারপর বলল, তুমি তো আমাকে তোমার চেলা বলেই মানতে চাও না, আমি বড়লোক নই। বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ি, কিন্তু আমার মতো চেলা তোমার আর কেউই নেই। আমিও চিঞ্চিকেডের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি। ওর দাদু মানে ঠাকুরদা আন্ধারী-তাড়োবাতে ছিল। বহুদিন আগে। বনবিভাগে কাজ করত। ওর বড়পিসিকে একটি কানা বাঘে এই জঙ্গলে খেয়েছিল। মানুষখেকো বাঘ। আমি নাগপুরে ফিরে যখন হেমরাজ চিঞ্চিকেডেকে ডেকে বলব যে তুমিই সেই শিকারি যে ওই মানুষখেকো বাঘটিকে মেরেছিল তখন তোমার খাতির দেখবে তুমি!

ঋজুদা স্তম্ভিত হয়ে গেল।

বলল, কখন তুই এত গল্প করলি তার সঙ্গে। তোরা তিনজনে তো সব সময়েই একসঙ্গে ছিলি যদিও তিতির আলাদা ঘরে ছিল।

সেটা কোনও কথা নয়। তুমিও তো সব সময়ে কত মানুষ পরিবৃত ছিলে, তুমিই বা তার মতো ইতরজনের সঙ্গে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কখন এত গল্প করলে!

ঋজুদা হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, এ তো ভারি গোলমেলে ব্যাপার দেখছি। যাকগে এসব প্রসঙ্গ। মোহার্লির ইনফরমেশান আর ইন্টারপ্রিটেশান সেন্টার কেমন দেখলি তাই বল। সকলকেই জিগগেস করছি।

দুর্দান্ত। তিতির বলল।

পশ্চিমবঙ্গের রাজভাতখাওয়া এবং আফ্রিকার গোয়রাংগোররাতেও ইন্টারপ্রিটেশান সেন্টার দেখেছি কিন্তু এটি একেবারে অন্যরকম। রেঞ্জার নীতিন কাকোডকর-এর ইমাজিনেশান আছে। একটি গোঁন্দ মেয়ের ফোটোর ও বয়ানের মাধ্যমে যেমন করে বন বন্যপ্রাণী, প্রাকৃতিক সম্পদের কদর এবং তা রক্ষা করার বিষয়গুলি বুঝিয়েছেন আগন্তুকদের তার কোনও তুলনা নেই। আদিবাসী চারুকলা, নানা মোটিফ, ভিতরের এবং বাইরের কোরা রঙের দেওয়ালে কালো ও লাল রঙে আঁকিয়ে পুরো সেন্টারটাকেই এক অন্য উচ্চতাতে পৌঁছে দিয়েছেন। এমন গুণী, দরদি, মস্তিষ্ক এবং হৃদয়ওয়ালা রেঞ্জার দেশের সমস্ত জঙ্গলেই দরকার।

আমি বললাম।

তারপর বললাম, তোমার কিন্তু সি. সি. এফ. সাহেবকে এই নীতিন কাকোড়কর রেঞ্জার সম্বন্ধে জানানো উচিত। ওঁর খুব তাড়াতাড়ি উন্নতি হওয়া উচিত।

সত্যিই উচিত। তবে এখানের ডেপুটি রেঞ্জারেরও কৃতিত্ব থাকতে পারে কিছু। সেটা জিগগেস করে জানতে হবে।

প্রদীপদাদের সঙ্গে যিনি ঘুরছেন তার নাম কী?

তার নাম জি. কে. বশিষ্ঠ। লেখেন Washistha৷ আর অন্যজনের নাম এস. আর. গায়কোয়াড়। তাকে দেখিনি। নাগপুরে গেছেন।

ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে বলল।

তারপর ভটকাইকে বলল, এই যে কিচেন ম্যানেজার, এক কাপ কফি কি পেতে পারি? একটু দ্যাখ না?

বাই ওল মিনস।

ভটকাই বলল।

ভটকাই চলে গেলে ঋজুদা বলল, দ্যাখ, তোদের সঙ্গে মিশে ছেলেটা আদবকায়দা এবং ইংরেজিটাও কী দ্রুত শিখে নিচ্ছে। ও যদি তোদের মতো ভাল ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ার সুযোগ পেত তবে আরও কত ভাল হতে পারত।

মস্ত বাঁদরও হতে পারত ঋজুকাকা। তিতির বলল।

তারপর বলল, তুমি কি ভাব ভাল স্কুলে আজকাল সব ছাত্রই ভাল পরিবার থেকে, সৎ পরিবার থেকে আসে? অসৎ ব্যবসাদার, ঘুষখোর, ঘুষের দালাল, রাজনীতির মাস্তান, স্মাগলার এদের ছেলেমেয়েতেই এখন ভাল স্কুলের অধিকাংশ ভরে গেছে। লাখ লাখ টাকা ডোনেশান দিয়ে ছেলেমেয়েদের ভরতি করেছে তারা। যোগ্য ছেলেমেয়েরা ঢুকতে পারছে না। একটা সময় আসবে ঋজুকাকা যখন সমাজের মধ্যমণি হবে এই শ্রেণীর মানুষদের ছেলেমেয়েরাই। এই দেশের ভবিষ্যৎ খুবই খারাপ। তা ছাড়া, ছেলে বা মেয়ে ভাল বা মন্দ হয় নিজের পারিবারিক পটভূমির গুণে এবং নিজের নিজের ভাল হওয়ার জেদে। স্কুল যেমন তাকে অনেক সাহায্য করতে পারে আবার যার নিজের তাগিদ নেই তার কিছুমাত্রই উন্নতি করতে পারে না। ভটকাই ভাল হতে চায়, শিখতে চায়, তাই শিখেছে, শিখছে।

তা ঠিক। ঠিকই বলেছিস তিতির।

ভটকাই ফিরে এসে বলল, কফি আসছে। আজ লাঞ্চও খেতে খেতে দেরি হবে তাই সঙ্গে একটু ডালের বড়াও করে দিতে বললাম তোমাকে।

কী ডালের বড়া?

মটরের। সঙ্গে পেঁয়াজ কুঁচি কাঁচা লঙ্কা দিয়ে।

হাসি মুখে ঋজুদা বলল, আমি একা খাব? তোরা খাবি না।

আমরাও খাব। তোমার প্রসাদ বলে কথা। ভটকাইচন্দ্র বলল।

ঋজুদা বলল, আজকে বিকেলে একটু তাড়াতাড়ি করে বেরোতে হবে Ghost Tree ভাল করে দেখাতে হবে তোদের। এই গাছেদের জানিস তো? বিভিন্ন ঋতুতে গায়ের রং বিভিন্ন হয়। পত্রশূন্য যখন হয় তখনই এমন অদ্ভুত সাদা হয়ে যায়। এদের গায়ের আঠা দিয়ে নানারকম ওষুধ-বিষুধ তৈরি হয়, যে আঠার নাম Karu-Gum.

গাছগুলোর বটানিকাল নাম কি জানো ঋজুকাকা?

জানি।

কী? Sterculia Urens.

তারপর বলল, ওই যে মোহার্লি যেতে যোগাযোগের প্রাচীন স্তম্ভগুলি দেখলি, সেগুলি গোঁন্দ রাজারা চন্দ্রপুর থেকে মোহার্লি-খাটোডা-জামনি-চিমুর এবং উমরের হয়ে নাগপুর পর্যন্ত পথের পাশে গেঁথেছিলেন। ওইভাবে কমুনিকেশান চালু রাখতেন গো রাজারা। এখন বড় রাস্তার স্তম্ভগুলো হয়তো লোপাট হয়ে গেছে কিন্তু বনের মধ্যে এই মোহার্লির পথে এখনও সেগুলো অটুট আছে। আশ্চর্য! কতদিন আগেকার!

এই ইন্টারনেটের দিনে দড়ি টেনে ক্যুনিকেশানের কথা ভাবা যায়! বলল ঋজুকাকা! কম্যুনিকেশানের কী উন্নতিই না হয়েছে এখন।

আমি বললাম, সত্যি!

ভটকাই বলল, সত্যই সেলুকাস কী বিচিত্র এই দ্যাশ!

তারপর বলল, এই ওভার কম্যুনিকেশানই একদিন মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনবে। কোনও কিছুরই বাড়াবাড়ি ভাল নয়। দেখে নিস তোরা।

তিতির বলল, কথাটা সত্যিই ভাববার।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়াটা, বলাই বাহুল্য, খুবই জোর হল। ভটকাই-এর জয়জয়কার। প্রদীপদারা তো বেগুন বাসন্তী খেয়ে মুগ্ধ। পাঁঠাটাও খুবই ভাল এনেছিলেন সঞ্জীবকাকুরা। ইনটেলিজেন্টদের মাংস খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি কখনও তবে পাঠাদের মধ্যে এমন পাঁঠা বেশি খাইনি।

তাপসকাকু বললেন ঋজুদাকে, ভটকাইকে আমরা আপনার সঙ্গে যেতে দেব, নাগপুরে আটকে রাখব দু-তিনদিন। আমাদের স্ত্রীদের ও বেগুন বাসন্তী এবং অন্যান্য রান্না শিখিয়ে দেবে। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে চলে এসেছে এই প্রবাসে ঘর করার জন্যে। মা-ঠাকুরমার কাছে থেকে ভাল বাঙালি রান্না শেখার সুযোগ ও সময়ও পায়নি ওরা।

ভটকাই বলল, আপনারা খেতে জানেন না, তাই বউদিরা রাধেন না। নিশ্চয়ই সব রান্নাই জানেন। গাইয়ের মতো রাঁধুনিকেও প্রশংসা করে করে গাওয়াতে হয় এবং রাধাতে হয় তবে না ভিতরের আসল জিনিসটা বেরুবে।

তিতির বলল, সাবাস। এবারে কিন্তু ঋজুদা ভটকাই একেবারে অপ্রতিরোধ্য, সব ব্যাপারেই।

আমি বললাম, একশোতে দুশো।

প্রদীপদা বললেন, না। রাঁধতে অনেকেই জানতে পারেন কিন্তু অল্প বয়সে এরকম বড় একটা দেখা যায় না।

ও সব ব্যাপারেই এঁচড়ে পাকা।

আমি বললাম।

ভটকাই বলল, বেশি ট্যাক ট্যাক করিস না। রাতে লুচি, আলুর চোকা, লিভারের চাট আর পেঁপের প্লাসটিক চাটনি করতে বলেছি। বেশি পেছনে লাগলে সব কেঁচিয়ে দেব।

সঞ্জীবকাকা বললেন, তোমার বাবুর্চি-বাহিনীর সঙ্গে তোমার একটা ছবি তুলে দিতে হবে খাওয়া শেষ হলেই। ওদেরও ছবির কপি পাঠিয়ে দেব ডেপুটি রেঞ্জারের কাছে। তার ছবিও তো থাকবে।

তার কীসের ছবি?

বুনো কুকুরদের স্নিফার ডগ-এর ট্রেনিং দিচ্ছেন সকালবেলা, তার ছবি।

তাই?

বলে, হেসে ফেলল ঋজুদা।

বিকেলে এক কাপ করে চা খেয়েই আমরা সাড়ে চারটে নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। বেরোবার আগে আমরা তো বটেই সঞ্জীবকাকুরাও ঋজুদাকে বললেন, আজকে জঙ্গল থেকে ঘুরে এসেই সেই কানা বাঘের গল্পটা কিন্তু শুনব ঋজুদা।

প্রদীপ কাকু বললেন এই সেশানে কি হবে?

হবে না কেন? যতক্ষণে বাঘ শিকার না হচ্ছে আমরা ছাড়ব না। তাপসকাকু বললেন।

আমি সকলকে পোটাটো ফিঙ্গার-চিপস উইথ টোমাট্যো গার্লিক সস সাপ্লাই করে যাব। সঙ্গে চা এবং কফি, যার যা পছন্দ। টার্টার সস থাকলে জমে যেত। কিন্তু মালমশলা যে নেই, বানাব কী করে।

ভটকাই বলল।

তুমি গল্প শুনবে না?

তিতির শুধোল ভটকাইকে।

শুনব নিশ্চয়ই।

তবে এতসব রান্নাবান্না করবে কে?

আমার সৈন্যদল। সব ফিট করে দেব। জেনারাল কি নিজে হাতে রাইফেল চালায় নাকি কখনও? ডাইরেকশান দিয়ে দেব আর তার একজিকুশানটা দেখবি তোরা।

ঠিক আছে এবারে কথা বন্ধ করে গাড়িতে ওঠো।

ঋজুদা ফরমান জারি করল।

আজ বিকেলে একেবারে অন্য দিকে গেলাম আমরা। এদিকটাতে আগে কখনও আসিনি। বিষেনদাদা তাড়োবা হ্রদের মধ্যে কুমির নাক উঁচিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তা দেখাল।

‘এই কুমির তোর জলে নেমেছি’ খেলাটা খেলব? ছেলেবেলাতে যেমন খেলতাম বন্ধুদের সঙ্গে? তিতির বলল।

আজ্ঞে না। এ কুমির সেই কুমির নয়। একবার পা কামড়ে ধরে টেনে নিয়ে গেলে কারওর-ই করার কিছুই থাকবে না। ভটকাই-এর গল্প শুনলি না। মাত্তামতাই একটা কুমির।

ইঁহাকি মগ্‌গর সব খতরনাক হ্যায়। হরসাল জংলি জানোয়ার তো পাকড়াতাহি হ্যায় আদমিভি এক-দো পাকড় লেতা। ইয়ে পানিকি নজদিক যানা বিলকুল নেহি চাহিয়ে।

শম্বর, নীলগাই আর বাইসনও অনেক হয়েছে এখানে। চোরা শিকার সম্ভবত একদমই হয় না। খুবই টাইট-অ্যাডমিনিস্ট্রেশান, কোর এরিয়াতে অবশ্যই। Buffer-এলাকা আর পার্ক-এর পেরিফেরিতে কেমন অবস্থা জানা নেই। ঋজুদা বলল।

সংখ্যাতে বেড়েছে চিতল। হাজারে হাজারে আছে, কানহা এবং পালামৌতে যেমন আছে। তবে পালামৌতে এখন কেমন আছে কে জানে। জঙ্গিগোষ্ঠীর ছেলেরা শুনতে পাই মাংসের জন্যে হরিণ শম্বরও মারছে। জঙ্গলের মালিক এখন তারাই।

আজও একটা ভাল্লুক দেখা গেল এবং বেশ কয়েকটা শুয়োর। গতকাল সকালের সে বরাহ বাবাজিকে দেখা গেল না। কোন নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছে সে খবরটা তো আমাদের জানা নেই। দিন দশ পনেরো লাগবে তার আবার স্বাভাবিক হতে, যতই টগবগিয়ে সে পালাক না কেন, জখম তো কম হয়নি।

মনে হল এখানে পাখি কম। সে কথা বলতেই বিষেনদাদা প্রতিবাদ করে বলল, এখানে একশো পঁচানব্বই রকম পাখি আছে। গাড়ির শব্দে কি পাখির ডাক শোনা যায়। পাখির ডাক শুনতে হলে জঙ্গলের মধ্যে সকালে বা সন্ধেবেলা চুপ করে বসে থাকতে হবে। তবে তিতিরের টিউ টিউ এবং বটের বাহিনীর পথ পেরুনোও কেন শোনা বা দেখা গেল না তাই ভাবছিলাম।

তিতির বলল, এখানে আর কী কী আছে?

আছে একচল্লিশ রকমের জানোয়ার, মানে mammals, তিরিশ রকমের সাপ, বিছে ইত্যাদি, ছাব্বিশ রকমের মাকড়শা, চুয়াত্তর রকমের প্রজাপতি, তেইশ রকমের মাছ, তাড়োবা হ্রদ এবং বর্ষার আন্ধারীতে, আর পাঁচরকমের উভচর আছে।

উভচর মানে? স্যালামান্ডার? তিতির বলল।

ফ্লাইং-স্কুইরেলও উভচর। প্রথমজন জল ও স্থলে বিচরণ করে আর দ্বিতীয়জন হল ও শূন্যে।

ভটকাই বলল, বিষেনদাদা বনবিভাগের প্যামপ্লেট মুখস্থ করে আমাদের উপরে ঝেড়ে দিল। এত সব থোড়াই দেখা যায়।

এক সঙ্গে হয়তো দেখা যায় না তবে দেখা না গেলে বনবিভাগের কর্মীরা কি আর ব্রোশিওরে লিখতেন। দেখা কি সব অত সহজে যায় আড়াইদিনে! এই আমাদের শহুরেদের রোগ। সারা বছর শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্ত হেমন্ততে এঁরা এখানেই থাকেন দিন রাতের চব্বিশ ঘণ্টা। এঁদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের এই হারিকেন ট্যুরের অভিজ্ঞতা কি এক হতে পারে। জঙ্গলে এসে জঙ্গলকে সময় দিতে হয়, এ তো আর কুতুবমিনার দেখা নয়। সময় দিলে তবেই জঙ্গল নিজেকে খোলে মেলে। প্যাকেজ ট্যুর-এর ট্যুরিস্টদের মতোই আমাদের হাবভাব। জঙ্গলের প্রেমিককে অন্য প্রেমিকের চেয়েও অনেক বেশি ধৈর্য ও ভালবাসা দিতে হয়। হুট করে চলে যাব, আবার সব জানব দেখবও তা তো হয় না। ঋজুদা বলল।

আমরা সকলেই মানলাম কথাটা। বাংলা না বুঝলেও, মনে হল। বিষেণদাদাও ঋজুদার কথাগুলোর সারমর্ম বুঝে খুশি হল।

ঠিক সেই সময়ে একটা চমৎকার কাঠঠোকরা তার দুই ডানাকে চক্রাকার করে বাঁদিকের কোনও গাছের ডাল থেকে ডানদিকের জঙ্গলে উড়ে গেল। শেষ সূর্যের আলো তার বহুবর্ণ ডানার রঙের গুণকে গুণান্বিত করল। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম আমরা।

ঋজুদা বলল, এই তো তাড়োবাতে আসা সার্থক হয়ে গেল। আর কিছু দেখা যাক আর নাই যাক। আসল বনের মধ্যে এলেই যে ভাললাগা, বাঁশপাতার মধ্যে হাওয়ার মর্মর, পাতা খসার শব্দ, সকাল সন্ধের বনজ গন্ধ এই সবই তো যথেষ্ট। তারপর এবারে খুব কমই বা দেখলি কি তোরা? লেপার্ড থেকে শুরু করে চিতল। চৌশিঙা, বাইসন, নীলগাই, শুয়োর, ভাল্লুক মায় বুনো কুকুর পর্যন্ত। এই তো যথেষ্ট।

আর বাঘ! ভটকাই বলল।

আরে এমন মানুষ অনেক আছে ভারতের নানা গভীর বনের অভ্যন্তরের গ্রামের বাসিন্দা, যারা জন্মেছে জঙ্গলের মধ্যে মরেওছে জঙ্গলেই কিন্তু সারাজীবন একটাও বাঘের দেখা পায়নি। মানে, নিজে চোখে দেখেনি। কথায়ই বলে না, টাইগার লাক। বাঘ দেখতে ভাগ্য থাকা চাই। বাঘের জঙ্গলে এলেই বাঘ দেখা যায় না। যে সব জঙ্গলে বাঁধা মোষ খাইয়ে খাইয়ে বাঘকে গৃহপালিত পশুর মতো করে ফেলার হয়েছে, গলায় রেডিও কলার লাগিয়ে দিয়ে ক্লিপ-ক্লিপ শব্দ শুনে হাতির পিঠে ট্যুরিস্ট নিয়ে গিয়ে নির্ঘাৎ বাঘ দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেখানের বাঘ আর বাঘ নেই। জঙ্গলের মধ্যে স্বাভাবিক বাঘ দেখার উন্মাদনা, ভয়, উত্তেজনাই আলাদা। ওইরকম করে বাঘ দেখার চেয়ে সারাজীবন বাঘ না দেখার আক্ষেপ নিয়ে মরাও ভাল। রাজদর্শন কি সহজে হয়? তা ছাড়া বাঘ হল জাত শিকারি। তোকে সে দেখে যাবে, এপাশ থেকে দেখবে, ওপাশ থেকে দেখবে, সামনে থেকে দেখবে পেছন থেকে দেখবে অথচ তুই টেরটি পর্যন্ত পাবি না। এমনই হচ্ছে বাঘের হরকৎ। এমনি এমনিই কি সে বিশ্বসেরা জানোয়ার!

পথটা ডানদিকে একটা বাঁক নিয়েছে। তাড়াবার জঙ্গলে এমনিতে সমানভূমিতে যদিও অভয়ারণ্যর বাইরের এলাকা রুক্ষ, বন্ধুর ও পাহাড়ময়। তা ছাড়া এখানে অধিকাংশ পথও প্রায় সোজাই। পথের পাশে পাশে বানাওটি নুনি আর কুদরতি নুনি। অর্থাৎ Man made and Naturall বনবিভাগও ছোট ছোট পুকুর খুঁড়েছে সেই সব জায়গাতেও যাতে বনে বেড়াতে আসা ট্যুরিস্টদের জানোয়ার দেখানো যায়। আসলে অধিকাংশ ট্যুরিস্টরাই তো ভটকাইয়ের মতো। জঙ্গল দেখা মানে ভাবে জানোয়ার দেখা। দু-তিনদিনের মধ্যে জানোয়ার দেখতে না পেলে বলে ধুসস। বোগাস। এ জঙ্গলে কিসসুই নেই। জঙ্গল দেখতে জানে কজন মানুষ!

ডানদিকে পথটা পুরো ঘুরতেই শম্বর। শম্বরদের একটা দল। তবে সবই মেয়ে শম্বর। এই দলটাতে শিঙাল নেই। হয়তো আশেপাশে আছে, আমাদের দৃষ্টিগোচর হল না। কিছুক্ষণ আমাদের দেখে তারা দৌড়ে পালাল জঙ্গলের ভিতরে। তারা সরে যেতেই তাদের পেছনে মস্ত একটা Ghost Tree দেখা গেল। সত্যি? কী আশ্চর্য সাদা। যেন মনে হচ্ছে স্পেশাল সাদা স্নোসেম দিয়ে রং-মিস্ত্রিরা এসে পুরু করে রং লাগিয়ে গেছে।

মাঝে মাঝেই বড় বড় উইয়ের ঢিবি। ঢিবি মানে, গোলাকৃতি নয়, সোজা উঁচু হয়ে উঠেছে, ভাঙা ভাঙা। ভালুকবাবাজিরা তাতে নাক ঢুকিয়ে সোঁ সোঁ করে শুষে নিয়ে উই খায়।

বনবিভাগ জঙ্গলের মধ্যে যেখানে দোলা মতো আছে সেখানে আরও খুঁড়ে শুয়োর, শম্বর, বাইসনদের গা ডুবিয়ে থাকা বা wallowing-এর জন্যে তা আরও গভীর ও বিস্তৃত করে দিয়েছেন। আন্ধারী নদীর রেখাতেও যেখানে যেখানে গাড়হা আছে সেখানে সেখানেও ওরকম করে রেখেছেন তারা। বনের মধ্যে নানা ওয়াচটাওয়ার আর হাইডসও আছে। বনপ্রেমী যাত্রীরা যাতে উপরে উঠে তাতে বসে অথবা হাইড-এর আড়ালে লুকিয়ে থেকে জানোয়ার দেখতে পারেন সে জন্যে।

কত বাঁশ, না? তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, এই জঙ্গল তো বাঁশ আর সেগুনেরই। জানিস তো। বাঁশ গাছে তাদের জীবনে একবার মাত্র ফুল আসে। ফুল আসা কিন্তু ওদের কাছে সুখবাহী ঘটনা নয়। ফুল এলে বাঁশ গাছ মরে যায়। অবশ্য প্রাকৃতিক নিয়মে ফুলের থেকে বীজ ঝরে পড়ে নীচে এবং তা থেকে বৃষ্টির পর আবার নতুন বাঁশ গাছ জন্মায়। এই তাড়োবা-আন্ধারীতে শুনেছি উনিশশো বিরাশি-তিরাশিতে সব বাঁশ বনে ফুল এসেছিল এবং সব গাছই মরে গেছিল। এখন আমরা যে বাঁশ বন দেখতে পাচ্ছি তা ওই আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ঝরে-পড়া বীজ থেকে নতুন গজানো বাঁশঝাড়।

তারপর ঋজুদা বলল, এখনও তো গরম পড়েনি। গরম পড়ার আগেই জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে ‘ফায়ার লাইন’ করবে বনবিভাগের কর্মীরা বন কেটে। গরমের সময় দাবানল লাগলে যাতে হাওয়াতে আগুন এক জঙ্গল থেকে ছড়িয়ে অন্য জঙ্গলে যেতে না পারে তাই ছমিটার থেকে বারো মিটার জায়গা থেকে সব গাছগাছালি ঘাস পাতা নির্মূল করে দেয় বনবিভাগের লোক যাতে আগুন সেই ফাঁকা জায়গাতে এসে বুড়ির মতো বিড় বিড় করে মরে যায়, অন্য জঙ্গলে আর পৌঁছতে না পারে। ভারতে সব জঙ্গলেই এমন করা হয় চোত-বোশেখ-এর আগে আগেই। এই fire line করা বনবিভাগের কর্মীদের এক বিশেষ কাজ। অনেক সময়ে গাছও কাটতে হয়। দুভাবে কাটেন।

এক ক্লিয়ার ফেলিং আর অন্য কপিসিং ফেলিং। ক্লিয়ার ফেলিং মানে, যেখানে জঙ্গল একেবারে সাফ করে নতুন প্ল্যানটেশান করা হয়, আর কপিসিং ফেলিং মানে বেছে বেছে মার্কা মেরে দিয়ে গাছ কাটা। তাড়োবা দেখে মনে হচ্ছে এই বনে বেশ কিছুদিন হল সব felling-ই বন্ধ আছে ভবিষ্যতে কখনও হয়তো হবে। সচরাচর টাইগার প্রিসার্ভ বা অভয়ারণ্যের গাছ কাটা এমনিতেও হয় না, জানোয়ারদের এবং বিশেষ করে বাঘেদের অসুবিধা ও বিরক্তি না ঘটাতে।

মেলঘাট টাইগার প্রিসার্ভটা নাগপুরের কোন দিকে ঋজুদা?

আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ঠিক কোন দিকে তা ম্যাপ দেখে বলতে হবে। সে এলাকা পাহাড়ি কিন্তু নাগুরের কাছেই। আমাদের তো ওখানেই যাবার কথা ছিল কিন্তু সি. সি. এফ. সাহেব শেষ মুহূর্তে প্রদীপকে আন্ধারী তাড়োবাতেই যেতে বলেন। আমার অনুমান, এখানে ভি. আই. পি. বাংলোটি খুব ভাল বলেই। ভাবলেন, ঋজু বোসের মেলঘাটে যদি অসুবিধে হয়। তবে ভালই হয়েছে, আমি তাড়োবাতে এলেও তো এসেছি সেই কোন কালে আর তোরা তো দেখিসইনি।

আমরা তো মেলঘাটও দেখিনি।

সে তো আমিও দেখিনি। যাওয়া যাবে কখনও পরে। বলব প্রদীপকে। ৫৬

একবার এ তল্লাট ছেড়ে গেলে আর কি আসা হবে! কোথায় হুট করে চলে যেতে হবে তোমাকে গোয়েন্দাগিরি করতে বা শিকার করতে। তোমার সময় আবার কবে হবে তা ভগবান ছাড়া আর কেউ জানেন না।

তিনিই তো সর্বজ্ঞ। তিনি জানলেই হল।

আরে যদি যাইও তোদের মধ্যে কেউ কেউ তো যাবিই আমার সঙ্গে না কি? একা তো কতদিন হয়ে গেল আমি কোথাওই যাইনি। তোরা আমার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিস, পরনির্ভর হয়ে যাচ্ছি আমি, এটা আমার চরিত্রের পক্ষে ভাল নয়। না কি বুড়ো মেরে যাচ্ছি? কে জানে।

যাই বলো আর তাই বলল, আমাদের ফেলে কোথাওই যাওয়া চলবে না।

আমরা সমস্বরে বললাম।

সামনেই পথের উপরে শেষ বিকেলের একটি ছোট্ট সাদা মন্দির। তার মধ্যে লালরঙা দেবতার সিঁদুর চর্চিত মূর্তি দেখা যাচ্ছে।

তিতির বিষেণদাদাকে শুধোল, কোন দেবতার মন্দির?

বিষেণদাদা বলল, মারুতি।

ভটকাই বলল, মারুতি সুজুকি? এখানেও এই জঙ্গলেও তারা গাড়ি বিক্রি করে নাকি?

ঋজুদা হো হো করে হেসে উঠল। আমি চালাক চালাক মুখ করে চুপ করে রইলাম।

তিতির বলল, মারুতি মানেও জানো না? মারুতি গাড়ি তো খুব চড়ো দেখি।

সে মেজ জ্যাঠার গাড়ি। আমাদের কি গাড়ি আছে নাকি? ভটকাই বলল।

মারুতি হল পবন নন্দনের নাম। পবন দেবতা। হনুমানজি, বুঝেছ সবজান্তা মিস্টার ভটকাই।

অনেকক্ষণ পরে ভটকাই একটু ভেটকে গেল।

শুনে বলল, তাই?

ইয়েস। তিতির বলল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *