ঋজুদার সঙ্গে আন্ধারী তাড়োবাতে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

দুই

তাড়োবা হ্রদ-এর চারপাশ দিয়ে এই তাড়োবা টাইগার প্রিসার্ভ। এবং অভয়ারণ্য। পুরো নাম, তাড়োবা-আন্ধারী টাইগার প্রিসার্ভ। আন্ধারী একটি নদীর নাম।

মুম্বাই শহরের একটা পাড়ার নাম যেমন আন্ধেরী।

ভটকাই বলল।

না, সেটা আন্ধেরী, এনদীর নাম আন্ধারী। গান্ধারীর বোন বলতে পারিস। আমি বললাম।

এই আন্ধারীকে এখন দেখা পর্যন্ত যায় না। জলরেখা পর্যন্ত মুছে গেছে কিন্তু বর্ষাতে এর রূপ নাকি হয় প্রলয়ঙ্করী। ঋজুদা নাগপুর থেকে আসবার সময়ে বলছিল।

তাড়োবা নামের কি কোনও মানে আছে?

তিতির শুধোল।

জনশ্রুতি আছে যে এক সময়ে এই উষর বনময় অঞ্চলে একদল মানুষ এই বনের মধ্যে পিপাসার্ত হয়ে মরতে বসেছিল তখন জঙ্গলের দেবতা ‘তাভু’ ওদের স্বপ্নাদেশ দিলেন যে ওরা যদি একটা নরবলি দেয় তবে দেবতা ওদের জল দেবেন।

অত্যন্তই বাজে দেবতা বলতে হবে। Very mean।

তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, তারপরে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ওরা একজন মানুষকে বলি দিল। তারপরই জঙ্গলের মধ্যে দেবতা তাভুর দয়াতে এই বিশাল হ্রদ-এর সৃষ্টি বলে এর নাম তাড়োবা বলে প্রচারিত হল।

গাড়ি চলছিল। আগে আগে জিপ চলেছে। আমরা কাঁচ উঠিয়ে এয়ারকন্ডিশনার খুব কম করে চালিয়ে দিয়েছি পাছে ধুলো খেতে হয়। দুপাশেই বাঁশের জঙ্গল। অনেকটা অমরকন্টকের পথের অচানকমারের জঙ্গলের মতো। আমাদের উত্তরঙ্গে বা আসামে বা ওড়িশাতে যেমন মোটা মোটা বাঁশ হয়, ওড়িশাতে যাকে ‘ডবা বাঁশ’ বলে, সেরকম বড় বাঁশ গাছ নেই এখানে; এমনকী বাংলার গ্রামাঞ্চলে যে বাঁশঝাড় দেখি আমরা এই বাঁশগুলো তার চেয়েও অনেক সরু–মধ্যপ্রদেশের বাঁশের এই বোধহয় বিশেষত্ব। অনেকটা ওড়িশার ‘কন্টা বাঁশ’-এর মতো এগুলো।

ইচ্ছে আছে বড়মামার শান্তিনিকেতনের বাড়ির বাগানের জন্যে কটি চারাগাছ নিয়ে যাব ফেরার সময়ে।

পথের দুপাশেই বাঁশ। ভিতরে ভিতরে অন্য গাছ-গাছালি আছে, অসন, শাল, হলুদ, ধ, সিধা, অর্জুন, শিমূল, সেগুন ইত্যাদি। সেগুনই বেশি।

হঠাৎ একদল হৃষ্টপুষ্ট শম্বর, দলের সবকটিই মেয়ে-শম্বর বদিক থেকে ডানদিকে দৌড়ে রাস্তা পার হল।

ভটকাই বলল, জঙ্গলি ঘোড়া। দ্যাখ দ্যাখ।

তিতির বলল, ঘোড়া তো নয়, ঘোড়ার ডিম।

আমরা হেসে উঠলাম।

ভটকাই লজ্জা পেয়ে বলল, ঘোড়া নয়?

আমি বললাম, আজ্ঞে না। এগুলো শম্বর।

তার পরক্ষণেই একদল নীলগাই ডানদিকের জঙ্গল থেকে বাঁদিকের জঙ্গলে গেল ধড়ফড়িয়ে। এমন ধড়ফড় করে বলেই বোধহয় বিহারে এদের ‘ঘোড়ফরাস’ বলে। যদিও নামে নীলগাই মধ্যপ্রদেশের নীলগাইয়েদের চেহারাতে নীলের চিহ্নও নেই, যদিও অন্য অনেক রাজ্যের যেমন বিহারের, নীলগাইয়েদের চেহারাতে একটু নীলাভ ভাব থাকে।

ভটকাই বলল, এগুলো তো ঘোড়া!

আমি বললাম, হাজারিবাগের রাজডেবোয়াতে তো তুই দেখেছিস নীলগাই। তবুও চিনতে পারলি না?

অত ঘন ঘন জানোয়ার বেরিয়ে পড়লে চিনব কী করে।

আমরা সকলেই হেসে উঠলাম। ঋজুদাও।

পরক্ষণেই ঋজুদা বলল, চুপ কর। ডানদিকে দ্যাখ।

তাকিয়ে দেখি একটা বড় লেপার্ড ডানদিকের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বাঁদিকের জঙ্গলে যাবে বলে এগোচ্ছে। আগের জিপটা চলে যাওয়ার অপেক্ষাতেই সে ছিল। জিপটা এগিয়ে যেতেই সে পথ পেরুবার জন্যে পা ফেলেছে, প্রায় শব্দহীন এঞ্জিনের কালিস গাড়িটা ও নজরই করেনি।

ঋজুদা ডান হাত দিয়ে ড্রাইভার মামাজির স্টিয়ারিং ধরা ডান হাতে হাত ধুইয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে বলল। আমাদের গাড়ি আরও এগোলে লেপার্ড হয়তো রাস্তা না পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যাবে, শেষ বেলায় গোধূলি আলোতে তাকে রাস্তা পেরোতে দেখা যাবে না। হলও তাই। আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়তেই সে বড় বড় পা ফেলে লাল ধুলোর রাস্তাকে ডানদিক থেকে পেরিয়ে বাঁদিকে গেল। সে এক আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য।

সে বাঁদিকের ঘন বাঁশের জঙ্গলে মিলিয়ে যেতেই মৃদু গুঞ্জরন উঠল গাড়ির মধ্যে।

তিতির বলল, হোয়াট আ গ্রান্ড সাইট।

ভটকাই বলল, এমন দিনের আলোতে আর কখনও চিতা দেখেছ তুমি ঋজুদা?

অনেকবারই দেখেছি। যদিও চিতা, বাঘের চেয়েও অনেক বেশি সাবধানী এবং বেশি নিশাচর। তবে একবারের কথা বললে তোরা মজা পাবি।

বলো, বলো, আমরা ধরে পড়লাম।

আসামের তামাহাট থেকে যমদুয়ারের জঙ্গলে যাচ্ছি জেঠুমনির সঙ্গে। জেঠুমনি অত্যন্তই উদারহৃদয় মানুষ। যাওয়ার কথা ছিল জিপে কিন্তু সকলেই “আম্মা যাব” “আম্মা যাব” করাতে শেষ পর্যন্ত ট্রাক রিকুইজিশান করতে হল। ট্রাকে চড়ে, হোলডল, ঝুড়ি ঝুড়ি কমলালেবু, হাঁসের ডিম, নানারকম সবজি পাঁউরুটি, বিস্কিট, ঝুড়ি ভর্তি মুরগি নিয়ে যখন আমরা রাইমানা থেকে যমদুয়ারের দিকে ঢুকেছি তখন এমনই বিকেল। আর পঁয়তাল্লিশ মিনিট এক ঘণ্টার মধ্যেই সন্ধে নামবে। শীতকাল। আসামের বিরাট বিরাট শাল সেগুনের ফাঁকে ফাঁকে অস্তগামী সূর্যর আলোর লালচে আভা পশ্চিমাকাশে দেখা যাচ্ছে, এমন সময় দেখা গেল এক চিতা বাবাজি পথ পেরিয়ে অন্য দিকে যাচ্ছেন, এই চিতা বাবাজিরই মতন।

তা তোমরা গুলি করলে না কেউ? আমি জিজ্ঞেস করলাম। সে তো আর অভয়ারণ্য নয়।

গুলি কে করবে। সকলের বন্দুক রাইফেলই তো বাক্সবন্দি অবস্থাতেই ছিল। আর সেই সব বাক্সর ওপরে ছিল মুড়ির বস্তা, ফুলকপি, বাঁধাকপি। জেঠুমনির এক আর্কিটেক্ট বন্ধু হাতের কমলালেবুই ছুঁড়ে মারলেন চিতার দিকে। নিরামিশাষীর নৈবেদ্য। চিতা একটু অবাক দৃষ্টি হেনে সোঁদা সোঁদা গন্ধের বড় বড় মহীরুহের গায়ের কাছে বর্ষার পরে গজানো নিবিড় ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে অচিরেই মিলিয়ে গেল। অমন অপ্রস্তুতে কোনও চিতাই ফেলেনি আজ অবধি। তাড়োবা তো

অভয়ারণ্য। যমদুয়ারের জঙ্গল তো আর পঞ্চাশের দশকে অভয়ারণ্য ছিল না। কিন্তু কপালে ছিল না, লেপার্ড মারা হল না।

যমদুয়ার? বেড়ে নাম তো জায়গার।

ভটকাই বলল।

শুধু নামই নয়। সত্যি সত্যিই যমদুয়ার। পশ্চিমবঙ্গ, ভুটান আর আসামের সীমান্তে অবস্থিত সেই যমদুয়ার। বাঘ, হাতি, বুনোমোষ, চিতা, শম্বর, নানা হরিণ, কী ছিল না সেই জঙ্গলে। ভুটানের মহারাজা হেলিকপ্টার করে এসে নামতেন যমদুয়ারে শিকার করার জন্যে। পাশ দিয়ে সংকোশ নদী বয়ে গেছে। মানাসের ছোট বোনের মতো। তার স্বচ্ছ জলের নীচ দিয়ে মহাশোল মাছেদের ঝাক সাঁতরে চলে যেত আর পিংকহেডেড পোচার্ড থেকে শুরু করে নাকটা, গার্গনি, পিন-টেইল ইত্যাদি কত পরিযায়ী হাঁস এসে আস্তানা গাড়ত শীতকালে এই নদীতে। ভুটান থেকে ভুটানিরা পিঠে করে কমলালেবু বয়ে নিয়ে আসত। কচি শুয়োর, আরও কত কী। যমদুয়ারের কথা মনে হলেই রোমাঞ্চ জাগে মনে।

আমাদের তো নিয়ে গেলে না একবারও ঋজুকাকা।

তিতির বলল।

এখন আর যাবার উপায় আছে কি? আলফা ও বোডড়া জঙ্গিদের আড্ডা হয়েছে সেখানে, পালামৌতে যেমন হয়েছে এম.সি.সি.-র আড্ডা। এখন বনজঙ্গলের অধিকাংশই আর নিরাপদ নয়। বড় অস্থির এক সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা। জঙ্গল কেটে সাফ করে দিচ্ছে, জানোয়ার মেরে মাইলের পর মাইল জঙ্গল জানোয়ারহীন করে দিচ্ছে, গাছপালা কেটে মরুভূমি করে দিচ্ছে। ক্রুদ্ধ বাঘ যেমন লুকোনো শিকারির গুলি খেয়ে কে তাকে এমন ব্যথা দিল অদৃশ্যে থেকে তা বুঝতে না পেরে অন্ধ ক্রোধে তার নিজের লেজে কামড়ে ধরে, এই সব মানুষেরাও তেমনই।

তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, তাদের প্রতি অন্যায় ও অবিচার করা হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কালের পর কাল, যুগের পর যুগ অন্যায় করা হয়েছে কিন্তু তার প্রতিবাদ নিজের নিজের লেজে কামড় দিলে কি করা হবে? যা তাদেরই পরম সম্পদ, তাদের অস্তিত্বর সঙ্গে, তাদের অতীত ইতিহাস, লোকগাথা, তাদের পুরাণ তাদের গান ও নাচের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যা, তারই সবকিছুর সর্বনাশ সাধন করে তারা কী পাবে তা তারাই জানে। ওদের বোঝানো দরকার। সহানুভূতি, সহমর্মিতার সঙ্গে ওদের বোঝাও দরকার। ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড এইসব নতুন রাজ্যের জন্ম হল বটে কিন্তু ওই বিচ্ছিন্নতাবাদকে সুসংহত না করতে পারলে ভারতবর্ষ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। তাতে দেশ ও দেশবাসীর লাভ হবে না কোনওই।

তুমি বোঝাও না কেন?

আমি তো activist নই। রুদ্র যেমন তার কলম দিয়ে লিখেও অনেক অন্যায়ের উৎস মূলে আঘাত করতে পারে, সে তো আদিবাসীদের নিয়ে অনেক লিখেওছে, ও নিজে অনেক অন্ধকে পথ দেখাতে পারে আমার তো তেমন করার ক্ষমতা নেই। তা ছাড়া, তোরা তো জানিস, আমার আরও অনেক কিছু করতে হয়, মেধা পাটকার বা অরুন্ধতী রায় বা মহাশ্বেতা দেবীর মতো আন্দোলন করার সময় ও হয়তো মানসিকতাও আমার নেই। তাই আমি নীরব দর্শক হয়ে থাকি আর দুঃখ পাই। ওই পাগলপারা মানুষদের জন্যে দুঃখ পাই, ওই বৃক্ষহীন অরণ্যের মধ্যে দুঃখ পাই। জন্তু জানোয়ারহীন বনের জন্যে দুঃখ পাই, দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না আমি। জানি না, এই অন্ধ রোষের নিবৃত্তি কবে হবে।

অনেক গভীর বিষয়ে তলিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমরা আদার ব্যাপারী জাহাজের খবরে আমাদের দরকার কী?

দরকার আছে। সকলেই আদার ব্যাপারী বলে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে এই দেশ ছারেখারে যাবে। এই দেশ তো তোরও। একথা ভুলে গেলে চলবে কেন?

যাকগে, আমাদের তাহলে যাওয়া হবে না কখনও যমদুয়ারে?

রুদ্র দুদিকে দুহাত ছুঁড়ে বলল।

কখনও যাওয়া হবে কি না জানি না যমদুয়ারে, তবে শিগগিরি হবে না। এখন তো মানাস-এও যাওয়া যায় না, ছত্তিশগড়ের ও ঝাড়খণ্ড-এর অনেক জায়গাতেই যাওয়া যায় না। কত প্রিয় সব জায়গা, কত স্মৃতি, কত বনের কত মানুষের, সবই পিছনে ফিরে তাকালেই এখন স্বপ্ন বলে মনে হয়।

আমরা সকলেই চুপ করে রইলাম।

সামনেই একটা মস্ত তৃণভূমি জেগে উঠল। তাতে কম করে এক হাজার চিতল হরিণ চরে বেড়াচ্ছে। দৌড়াচ্ছে, খেলছে।

বাঃ। হরিণ তো খুব বেড়েছে এদিকে।

ঋজুদা স্বগতোক্তি করল।

গার্ড পিছন থেকে বলল, গার্ডদাদার নাম বিষেন, হ্যাঁ স্যার। হগ ডিয়ারও বেড়েছে প্রচুর। শম্বর নীলগাইও বেড়েছে। আর সামনের বাঁদিকে মোড় নিলেই হয়তো একটা বাঘিনীকে দেখতে পাব আমরা। তার রোদে বেরুবার সময় হয়েছে এখন। তিনটি বাচ্চাও আছে তার সঙ্গে। এখন অবশ্য বেশ বড়ই হয়ে গেছে। গত বছর রেঞ্জার সাহেব ভিডিও ক্যামেরাতে ছবি তুলেছিলেন, বাংলোতে আছে ক্যাসেটটা, আপনারা দেখতে পারেন, তখন বাচ্চাগুলো ছোট ছিল।

ঋজুদা বলল, মনে করিস তো রুদ্র, বাংলোতে ফিরে গিয়ে দেখতে হবে ফিল্মটা।

গার্ড বলল, শুধু হরিণ ও অন্যান্য তৃণভোজীই নয়, ঢোলও বেড়েছে এদিকে। তিন চারটে দল আছে।

তিতির বলল, তিন চারটে!

হ্যাঁ মেমসাহেব।

ভটকাই বলল, কী সব বলছ তোমরা বুঝছি না। ঢোল তো বাজায় জানি। ঢোল-এর আবার দলই বা কী আর বাড়-বাড়ন্তই বা কী?

আমরা হেসে উঠলাম সবাই। গার্ড বিষেন বাংলা বোঝে না। সে আমাদের হাসিতে যোগ দিতে পারল না।

তিতির বলল, ভাব তো দেখাও এমন, যেন সবজান্তা। ভারতের বনে জঙ্গলে ঘোরো আর ঢোল কাকে বলে জানো না?

ঋজুদা ভটকাইকে আরও হেনস্থা থেকে বাঁচানোর জন্যে বলল, ঢোল মানে হচ্ছে জংলি কুকুর। ইংরেজিতে যাদের বলে ওয়াইল্ড ডগস। তারা যে জঙ্গলে থাকে সেই জঙ্গলে বাঘও সাবধানে থাকে।

বাঘ অবশ্য আরও সাবধানে থাকে যেখানে ডাঁশ থাকে।

আমি বললাম।

ডাঁশটা আবার কী বস্তু?

ভটকাই রীতিমতো চুপসে গিয়ে বলল।

আমি ঋজুদা আর তিতির পুব-আফ্রিকাতে সেতসি মাছির কামড় খেয়ে দেখেছি। যদিও তা আদৌ সুখাদ্যের মধ্যে গণ্য নয়। কিন্তু তা বলে ভঁশের কামড়। খেলে কি আর বাঁচব!

তারপরই ঋজুদাকে বললাম তুমি তো পৃথিবীর তাবৎ খাদ্য-অখাদ্য খেয়েছ, ভঁশের কামড় কখনও খেয়েছ কি?

ঋজুদা হেসে বলল, একবার খেয়েছিলাম। একবারই যথেষ্ট আর খাবার কোনও ইচ্ছা নেই।

কোথায় খেয়েছিলে ঋজুকাকু?

তিতির বলল।

আরে ভঁশ ব্যাপারটা কী তা জানার জন্যে আমি যে হাঁসফাস করছি সেদিকে তো তোমাদের কারও খেয়াল নেই, নিজেরাই কথা বলে চলেছ।

আমি বললাম, শোনো মিস্টার সবজান্তা ভটকাই। উঁশ হচ্ছে আদি ও অকৃত্রিম ভারতীয়। একরকমের মাছি। কাটালে মাছির দশ বারো গুণ বড় হয়। তার কামড়ে বাঘের মতো জানোয়ার পর্যন্ত দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে জঙ্গল ছেড়ে পালায়।

জঙ্গলে কথা বলা বারণ কিন্তু আমাদের গাড়ির সব কাঁচই ওঠানো এবং আমরা নিচু গ্রামেই কথা বলছিলাম তাই সম্ভবত বাইরে গাড়ির আওয়াজ ছাপিয়ে সে শব্দ যাচ্ছিল না।

গার্ড বলল, দেখিয়ে সাহাব।

মামাজি গাড়ি দাঁড় করাতেই আমরা দেখলাম পথের বাঁদিকে জঙ্গলের মধ্যের একটা শুড়িপথ দিয়ে বেরিয়ে এসে চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে, যাকে বিহারে বলে নরপাঠা। জবরদস্ত শিঙাল শম্বর। তার শিঙের বাহার দেখার মতো। চেহারাতেও প্রায় ঘোড়ারই মতো। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম আমরা।

তিতির ফিসফিস করে ভটকাইকে বলল, দ্যাখো ভটকাই, ঘোড়ার ফার্স্ট কাজিন।

ঋজুদা স্বগতোক্তি করল, ঠিক এইরকম একটা শম্বর মেরেছিলাম ওড়িশার টুল্বকার জঙ্গলে। সেই জঙ্গলে কিছু পেল্লায় পেল্লায় বাইসন আর শম্বর ছিল বটে।

হাতিও ছিল বিস্তর।

তিতির বলল, এমন সুন্দর একটা প্রাণীকে মেরে তোমার অনুতাপ হয়নি ঋজুদা?

ঋজুদা একটু চুপ করে থেকে বলল, যখন মেরেছিলাম তখন আমি কলেজে পড়ি। ওই বয়েসে এক ধরনের বাহাদুরি-প্রবণতা থাকে সকলের মধ্যেই। তা ছাড়া ভাল শট হলে জেঠুমনি হ্যান্ডশেক করতে, পিঠ চাপড়ে দিতেন যাকে বলে pat on the back। তবে শুধু আমি একাই কেন কনজার্ভেশানের মস্ত বড় বড় প্রবক্তারা প্রথম জীবনে সকলেই শিকার করেছিলেন। ভাল শিকারিরাই পরে ভাল কনজার্ভেটর হন।

তিতির বলল, যেমন?

যেমন জিম করবেট, সালিম আলি, অ্যান রাইট। আরও অগণ্য নাম বলতে পারি।

ভটকাই বলল, যেমন তুমি।

কাদের সঙ্গে কার তুলনা!

ঋজুদা বলল।

ঋজুদা যাই বলুক, আমাদের কাছে ঋজুদাই হিরো নাম্বার ওয়ান। শম্বরটা আধ মিনিটটাক দাঁড়িয়ে থেকে দৌড়ে পথ পার হল। আর আন্ধারী-তাড়োবা অভয়ারণ্য বলেই বন্যপ্রাণীদের ভয় ভেঙে গেছে। অন্য জায়গা হলে শম্বর এতক্ষণ দাঁড়াতনা, মুহূর্তের মধ্যে পালাত এবং রাস্তাও পেরোত না, যে পথ দিয়ে এসেছিল সেই পথ দিয়েই ফিরে যেত।

অত বড় শিং আটকে যায় না জঙ্গলের ডালপালাতে?

ভটকাই শুধোল।

ঋজুদা হাসল, বলল, ছেলেবেলায় আমারও মনে এই প্রশ্ন জাগত। কিন্তু শুধু শম্বরই কেন, সব শিঙাল জানোয়ারই যখন জঙ্গলের মধ্যে দৌড়ে যায় তাদের শিংগুলি পিঠের উপর শুইয়ে দেয় প্রায়, মুখটা উঁচু করে। তাদের তখন দেখতে ভারী সুন্দর লাগে।

একটু পরেই সূর্য ডুবে গেল। এমন সময় হঠাৎ একটা ফ্ল্যাশ বা জ্বলে উঠল পথের বাপাশে।

কী ব্যাপার?

গার্ড বিষেন বলল, পথের ধুলোর নীচে অদৃশ্য তার পাতা আছে। যে কেউই এই পথ মাড়িয়ে যাবে, সে বাঘই হোক আর চিতা বা চোরা শিকারি বা তাদের গাড়ি, অটোম্যাটিক ক্যামেরাতে তাদের ছবি উঠে যাবে। পরদিন রেঞ্জ অফিসে এই ফিল্ম ডেভলাপ করা হবে।

বাঃ। চমৎকার ব্যাপার তো।

তিতির বলল।

ঋজুদাও বলল, তাড়োবাতে অনেক কিছুই আছে যা অন্য টাইগার প্রিসার্ভে নেই। বহু পুরনো তো এই প্রিসার্ভ। ওরা এখানে খুবই অর্গানাইজড।

ঋজুদার কথা শেষ হতে না হতে দেখা গেল পথের উলটোদিক থেকে একটা বিরাট ভাল্লুক, স্লথ বেয়ার গাড়ির দিকে আসছে। একেবারে ডোন্ট কেয়ার।

এ কীরে! কী চেহারা রে। এ যে দেখছি আমেরিকার ইয়ালোস্টোন ন্যাশানাল পার্ক-এর বাদামি ভাল্লুকের মতো পেল্লাই। ও কি কালিস গাড়ির সঙ্গে কুস্তি লড়বে না কি?

ভটকাই বলল।

ততক্ষণে ভালুক বাবাজি একেবারে কাছে এসে গেছে। কাছে আসতেই সে পেছনের দুপায়ে দাঁড়িয়ে উঠল। তার বুকের সাদা v চিহ্নটা পরিষ্কার দেখা গেল। v মানে ভিক্টরি, v মানে V.I.P.-র আদ্যক্ষর। সে আমাদের তার ভিজিটিং কার্ড দেখিয়ে জঙ্গলের ডানদিকে ঢুকে গেল।

গার্ড আমাদের দেখাল, এদিকে খুব বড় বড় উইয়ের ঢিপি আছে। উই খেতে যাচ্ছে। মহুয়ার সময় এখনও আসেনি। মহুয়ার সময়ে মহুয়া, আমের সময় আম, জামের সময় জাম, ভাল্লুকের এসব অত্যন্ত প্রিয় জিনিস।

সামনের জিপটাকে এবারে পেছনে আসতে বলে আমরা কয়েকটা নুনি দেখে বাংলোতে ফেরার পথ ধরলাম। নুনিগুলো বনবিভাগের বানানো। কিছু স্বাভাবিকও আছে। পাশে জলও আছে। ছোট ছোট পুকুর খুঁড়েছে। এই ঊষর মধ্যপ্রদেশে জল বিরল। অত বড় হ্রদ তাড়োবা অথচ কুমিরের জন্যে সেখানে জলে নামার উপায় নেই এদের।

কতগুলো কুমির আছে তাড়োবা হ্রদে? ঋজুদা গার্ডকে শুধোল।

সেনসাস তো নেহি কিয়া হ্যায় মঞ্জুরকা লিয়ে হুজৌর। খয়ের পঞ্চাশ-ষাট তো হোগা জরুর। হর সাল আট দশ গো হিরণ পাকড় লেতা হ্যায়।

বোঝে একবার ব্যাপারখান! ভটকাই ফুট কাটল।

ঋজুদা পথের দুপাশে কী যেন খুঁজছিল মাথা এপাশ ওপাশে করে। তারপরে হঠাৎই মামাজিকে বলল, গাড়ি থামাতে।

ঋজুদা বলল কাঁচগুলো নামা এবারে। এয়ারকন্ডিশনার বনধ কর দেনা মামাজি। বনের গন্ধ ও শব্দ নাকে আর কানে না গেলে জঙ্গলে এসে লাভ কী?

তারপর বলল, তোদের এইবার একটা জিনিস দেখাব যা তোরা কোথাওই দেখিসনি আগে, না অন্য কোনও জায়গায় দেখতে পাবি। ওই দ্যাখ, বলেই বাঁদিকে বনের গভীরে আঙুল তুলে বলল, ওই দ্যাখ ভূত।

সত্যিই তো! আমরা সবিস্ময়ে সকলে দেখলাম সদ্য-ডোবা সূর্যের মাছের রক্তধোওয়া একেবারে ফিকে লাল আলোর মধ্যে ধবধবে সাদা কী একটা দাঁড়িয়ে আছে। তিন চার মানুষ লম্বা, লম্বা লম্বা হাত ছড়িয়ে, অনেকগুলো হাত। মামদো ভূত দাঁড়িয়ে আছে।

ভটকাই বলল, ঈরে বাবা, ইটা কে গো?

তিতিরও যেন ভয় পেয়েছে মনে হল। বলল, এটা কী ভূত?

ঋজুদা বলল, ভূত-প্রেতের কি একরকম? ভুশন্ডির মাঠের কাঁড়িয়া পিরেত থেকে পালামৌর জঙ্গলের দারহা ভূত, যারা রাতের বেলা একা মানুষ পেলেই তাকে কুস্তি লড়তে বলে আর সে মানুষ কুস্তি লড়তে গেলেই খাপু খাপ খাপ খাপু করে ডাকতে ডাকতে রাতের আকাশে অদৃশ্য হয়ে যায়।

তারপর বলল, তোরা তো জানিসই ওড়িশার কালাহান্ডি জেলায়, বাঘডুম্বা ভূত আছে। অরাটাকিরির বাঘ মারতে গিয়ে সেই ভূতের কথা তো তোরা শুনেছিস। এই বন-পাহাড়ের প্রকৃত ভারতবর্ষ তো হ্যালোজেন আর মার্কারি ভেপারের আলো-জ্বালা ভারতবর্ষ নয়, কম্প্যুটার ইন্টারনেট আর বিশ্বায়নের ভারতবর্ষ নয়, এই হল আদিম ভারতবর্ষ। এই পথের দুপাশে কত গোঁন্দ সৈন্যের স্মৃতি, কত আহত সৈন্যের দীর্ঘশ্বাস, কত মৃত সেনার আত্মা আছে তা কে বলতে পারে।

তিতির অনুযোগের স্বরে বলল, ভাল হচ্ছে না ঋজুকাকা। বলোই না ওটা কী?

ঋজুদা একটু চুপ করে থেকে বলল, ওটা একটা গাছ। এখন গাছে পাতা নেই, তাই আরও ভয়াবহ দেখাচ্ছে। একটাও পাতা নেই এখন। এই গাছগুলোর নাম Ghost tree, অন্য নাম Karu-Gum tree, একরকমের আঠা হয় এই গাছ থেকে।

তারপরই পুরনো কথা মনে পড়ে যাওয়াতে বলল, যখন জেঠুমনির সঙ্গে এখানে এসেছিলাম তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। একটা গোঁন্দ মেয়েকে ধরে ছিল কানা বাঘে। বছরের এই সময়েই। আমি মাচা বেঁধে বসেছিলাম। একা। জেঠুমনিরই নির্দেশে। যাত্রাপার্টি আর মানুষখেকো বাঘ শিকার এক কথা নয়। এখানে বাঘও একা শিকারিও একা। দুজনের বুদ্ধি, ধৈর্য আর সাহসের পরীক্ষা দিতে হয় একা একা। ভয় পেলে জেঠুমনি বা পিসিমার নাম ধরে চেঁচিয়ে লাভ নেই। যখন মাচাতে বসেছিলাম, তখন লক্ষ করিনি। রাত নামলেই দেখি ধবধবে সাদা শাড়ি পরা ভূত পেত্নী চারিদিকে। কী ভয় যে পেয়েছিলাম, কী বলব। জেঠুমনি বলতেন, সমস্ত ভয়েরই উৎস হচ্ছে অজ্ঞতা। ভারী রাগ হচ্ছিল জেঠুমনির কথা মনে পড়ায় তখন। ভাবছিলাম, সেই রাতেই তো ভূতেরা আমাকে নিয়ে গেলি খেলবে। কাল অবধি বেঁচে থাকলে না জেঠুমনির কাছ থেকে এই ভয়ের উৎস জানা যাবে। তার আগেই তো দফা রফা।

সত্যি! না জানলে যে কোনও ভীরু ও অনভিজ্ঞ মানুষ জঙ্গলে হঠাৎ রাতের বেলা এই গাছ দেখে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। ভারী আশ্চর্য তো।

ঋজুদা বলল, এই আমাদের সুন্দর দেশ। বিরাট, স্বরাট দেশ ভারতবর্ষ। কত বৈচিত্র্য এখানে, কত কী জানার, শেখার। এক জীবনে আমরা এর কতটুকুই বা জানতে শিখতে পারব। এমন দেশে জন্মে মানুষে যে কেন বিদেশে ছুটি কাটাতে যায় আমি ভেবেই পাই না।

আমি বললাম, আমাদের মধ্যে অনেকেই বোধ হয় এক ধরনের হীনমন্যতাতে ভুগি। ভাবি, ইউরোপ আমেরিকা জাপান ঘুরে এসে বুঝি আমাদের লেজ গজালো।

ঠিক তা নয়। তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, বিদেশে যাওয়া দোষের নয় কিন্তু একজন ভারতীয়র চোখ দিয়ে বিদেশকে দেখতে হবে। আমাদের সঙ্গে তাদের কোথায় অমিল, তাদের জনসংখ্যা কত কম, তাদের নিয়মানুবর্তিতা, তাদের আত্মসম্মানজ্ঞান, তাদের স্বয়ম্ভরতা কত অন্যরকম আমাদের চেয়ে, তারা কত আত্মবিশ্বাসী, পরমুখাপেক্ষী বা পরদয়া-নির্ভর কত কম এই সবই জানতে বুঝতে হবে। তবেই না দেশ বেড়ানো সার্থক। নইলে, দেশে ফিরে চালিয়াতি করাই যায় শুধু, গরিব বন্ধু ও আত্মীয়দের কাছে ফাঁকা বাহাদুরিই নেওয়া যায়। তেমন দেশ দেখতে যাঁরা যান তাদের যাওয়া-না-যাওয়া সমান।

কাল দিনের বেলা আবার এসে এই ভূত-গাছকে ভাল করে দেখতে হবে। আমি বললাম।

ঋজুদা বলল, একটা নাকি? অজস্র আছে এই গাছ। তোদের কালকে হ্রদের ওপারে নিয়ে যাব–দেখবি। ওপারেই তো কানা বাঘটাকে মেরেছিলাম।

সেই বাঘ মারার গল্পটা আমাদের বলবে না?

ঋজুদা বলল, হবে ‘খন। প্রদীপরাও শুনতে চেয়েছিল। আমরা তো আছি এখানে তিনদিন, হবে হবে, সময়মতো হবে। সকলে এক সঙ্গে হলে বলা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *