ঋজুদার সঙ্গে আন্ধারী তাড়োবাতে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

এক

কী সুন্দর হ্রদটা, না? কী নাম বললে? তাড়োবা হ্রদ? তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, হ্যাঁ। ভারতে আর কোনও অভয়ারণ্যেই এত বড় ও সুন্দর হ্রদ নেই।

ভটকাই বলল, শুনেছি রানথামবোরে আছে। রাজস্থানের রানথামবোরে।

রানথামবোরে আমি গেছি। সে হ্রদ এই হ্রদের চেয়ে অনেকই ছোট। তা ছাড়া সেটি হ্রদ নয়, পুকুর গোছের ব্যাপার। রাজার শুটিং লজ ছিল। রানথামবোরের দুর্গও ছিল। হয়তো পরিযায়ী পাখিরা এসে বসবে বলে, এবং রাজস্থানের প্রখর রুখু গ্রীষ্মে লজের কাছে ওই জলা থাকাতে একটু ঠান্ডাও হবে বলেই খোঁড়া হয়েছিল ওই পুকুরটি।

আমি বললাম, আরও একটা কারণ হয়তো ছিল।

তিতির বলল, কী কারণ।

রুক্ষ্ম প্রকৃতির মধ্যের জংলি জানোয়ারেরা জল খেতে আসত ওই জলাতে, শিকারের সুবিধা হত হয়তো।

ঋজুদা বলল, তা মনে হয় না। তখনকার দিনে রাজা-রাজড়ারা অঢেল এবং দৃষ্টিকটু সংখ্যাতে শিকার যে করতেন তা ঠিক, সেই শিকারের পরিমাণ অনেক সময়েই লজ্জাকরও হয়ে উঠত কিন্তু তারা তবুও অধিকাংশ সময়েই শিকার করতেন শিকারের আইন মেনেই। তৃষ্ণার্ত জানোয়ার যখন জল খেতে আসে তখন তাকে মারাটা কোনও ভাল শিকারির কাজ নয়।

ভটকাই বলল, ভালই ব্যাপার। জল খেতে আসার সময়ে তাদের মারাটা খারাপ কাজ আর জল খেয়ে ফিরে যাবার সময়ে মারাটা ভাল কাজ। নিজেদের চোখ-ঠারার এর চেয়ে কু-দৃষ্টান্ত বোধ হয় খুব বেশি নেই।

ঋজুদা হেসে বলল, ভালই বলেছিস।

তারপরে বলল, তা নয়। ব্রিটিশ আমলে আমরা যখন আইন মেনে শিকার করতে দেখেছি জেঠুমনিদের তখন তো গরমের সময়ে সব শিকার করাই বারণ ছিল। তখন ছিল closed-season. শিকারেও closed-season ও open-season ছিল। তা ছাড়া, ভারতের সব জঙ্গলেই বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ ছিল পয়লা জুলাই থেকে তিরিশে সেপ্টেম্বর। বেড়াতে যেতেন হয়তো কেউ কেউ এবং বনবিভাগের আমলারা যেতেন কাজে কিন্তু অন্যদের ঢোকা মানা ছিল। শিকারের তো প্রশ্নই ওঠে না। এখনও সব জঙ্গলই ওই সময় বন্ধ থাকে।

তাই? তিতির বলল।

হ্যাঁ। তবে রানথামবোরের জলার সঙ্গে ওই তাড়োবা হ্রদের এক ব্যাপারে মিল আছে।

কোন ব্যাপারে?

ভটকাই জিগ্যেস করল।

ভটকাই যে অনেকক্ষণ চুপ করে ধৈর্য ধরে ঋজুদার কথা শুনল তা দেখে অবাক হলাম। এবারে নাগপুরে আসার পর থেকেই দেখছি ওর চরিত্রে চাপল্য কিছু কমেছে। ঋজুদার প্রশ্রয়ে ক্রমেই ও একটি বাঁদরে পরিণত হচ্ছে। মাঝে মাঝে সত্যিই অসহ্য লাগে।

এই দুজায়গার জলেই কুমির আছে। মানুষ নামলে তো ধরেই, এমনকী পাড়ে উঠে এসেও ধরে। আর জলে নামলে তো কথাই নেই। শম্বর বা হরিণেরা গরমের সময়ে জল খেতে নামলে তাদের হাঁটু বা গোড়ালি কামড়ে ধরে টেনে নিয়ে যায়। একে কুমিরের সঁতের কামড়, তার উপরে জলে ডুবে দমবন্ধ হয়ে মরার কষ্ট।

ঈসস।

তিতির স্বগতোক্তি করল।

মহারাষ্ট্রের এই তাড়োবা টাইগার রিজার্ভ কিন্তু আমাদের দেশের অন্যতম পুরনো অভয়ারণ্য। বেতলা, হাজারিবাগ, কাজিরঙ্গা ইত্যাদিরা এর জন্মের অনেকেই পরে জন্মেছে। গোঁন্দ আদিবাসীদের বাস ছিল এই পুরো অঞ্চলে। আগে এই সব অঞ্চলকে বলত চান্দা। এখনও চন্দ্রপুর বলে বড় জায়গা আছে। ওখানের প্রবল প্রতাপ গোঁন্দ রাজাদের সকলেই সমীহ করত। তাদের রমরমা ছিল নাগপুর অবধি বিস্তৃত–আগের বিদর্ভ আর কী! ফেরার সময়ে আমরা চন্দ্রপুর হয়ে ফিরব নাগপুরে। তখন দেখবি ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টের একটি থার্মাল স্টেশানও আছে সেখানে।

বাঃ!

আমি বললাম।

তিতির বলল, ঋজুকাকা তুমি প্রথম কবে এসেছিলে এখানে?

সে কি আজকের কথা! তখন আমি স্কুলে পড়ি। জেঠুমনির সঙ্গে এসেছিলাম। তখনও গোঁদের বস্তিগুলোকে অভয়ারণ্য এলাকার মধ্যে থেকে বনবিভাগ সরিয়ে নেননি। সেই সময়ে এখানে একটা কানা বাঘ গোন্দদের গোরু-মোষ তো মেরে শেষ করছিলই, মানুষ ধরাও আরম্ভ করেছিল। কানিটকার সাহেব, এস. পি. কানিটকার, তখন মধ্যপ্রদেশের বনবিভাগের একজন হোমরাচোমরা ছিলেন। জেঠুমনির পূর্ব-পরিচিত। নাগপুরে জেঠুমনি একটা বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন সেবারে। নাগপুরের বাঙালিদের স্কুল ও লাইব্রেরি তাকে নিমন্ত্রণ করেছিল। নাগপুর ক্লাবে জেঠুমনির সঙ্গে হঠাৎ এক রাতে কানিটকার সাহেবের দেখা হওয়াতে জেঠুমনিকে অনুরোধ করেছিলেন বাঘটা মেরে দিতে।

ভটকাই, বলল, কেন মধ্যপ্রদেশে কি শিকারির খরা চলছিল যে কলকাতায় জেঠুমনিকে উনি ওই বাঘ মারার অনুরোধ করলেন? গোয়েন্দার মতো প্রশ্ন করল ঋজুদাকে। রীতিমতো অপ্রতিভ করে দিল।

শিকারির অভাব কোনওদিনই কোথাওই ছিল না। কিন্তু শিকারি মাত্রই যে সম্ভ্রান্ত তা বলা যায় না। অনেক শিক্ষিত শিকারিও চুরি করে জানোয়ার মারেন। শিকারের শখ ঘোড়ার শখের চেয়েও সাংঘাতিক। তোর রেসুড়ে বড়মামুর থেকে আমার শিকারি জেঠুমনি অনেক বিপজ্জনক হতে পারতেন। কিন্তু হননি তাঁর সংযম ছিল বলে। তোর বড়মামু যেমন নর্থ ক্যালকাটার তেরোটি বাড়ি ঘোড়ার শখে বেচে দিলেন জেঠুমনিও শিকারের শখে অনেক বিপজ্জনক ও বে-আইনি কাজ করতে পারতেন। কানিটকার সাহেব তা জানতেন বলেই জেঠুমনিকেই অনুরোধ করেছিলেন। তা ছাড়া অভয়ারণ্যর মধ্যে বাঘ শিকারের অনুমতি দেওয়ার মধ্যে অনেক ঝুঁকিও ছিল। বিধানসভাতে এবং লোকসভাতেও প্রশ্ন উঠতে পারত। কানিটকার সাহেবের চাকরি চলে যেতে পারত। মধ্যপ্রদেশের কোনও শিকারিকে এই অনুরোধ করলে ব্যাপারটা জানাজানিও হয়ে যেতে পারত। নানা কথা ভেবেই ওই অনুরোধ তিনি জেঠুমনিকে করেছিলেন চুপিসারে কাজ যাতে হাসিল হয়।

ভটকাই বলল, উপন্যাসের চেয়ে উপক্রমনিকা লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কানা বাঘটা মেরেছিলেন শেষ পর্যন্ত জেঠুমনি?

জেঠুমনি মারেননি তার বকলমে আমিই মেরেছিলাম।

ভটকাই বলল, ছিঃ ছিঃ। তুমি! একটা কোটেশানের বইয়ে পড়েছিলাম, “When a man kills a tiger, he calls it sport but when a tiger kills a man he calls it ferocity.” বেচারি কানা বাঘ!

বেশি ফিলসফাইজিং কোরো না ভটকাই।

তিতির বলল।

তোর বড় জ্ঞান বেড়েছে। বাড়ও বেড়েছে।

আমি বললাম।

ঋজুদা বলল, তোরা ওর পেছনে লাগলি কেন। ও খারাপ কিছু তো বলেনি।

ইতিমধ্যে বাংলোর বাইরে একটি গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। টায়ারের নীচে কাঁকরের কিরকির শব্দ।

তিতির বলল, ওই প্রদীপকাকুরা এলেন। আমরা এবার জঙ্গল দেখতে যাব তো? নাকি আরও চা খাবে তোমরা?

না, না, এবারে যাওয়া যাক। তাড়োবাতে রাত নেমে গেলে জঙ্গলে ঘোরাটা বে-আইনি। সন্ধে সাতটার পর জঙ্গলে থাকা মানা।

তাই!

হ্যাঁ।

প্রদীপকাকু, মানে নাগপুরের প্রদীপ গাঙ্গুলি, তাপস সাহা এবং সঞ্জীব গাঙ্গুলি একটি কালিস গাড়ি থেকে নামলেন। বাংলোর বারান্দাতে উঠে ঋজুদাকে বললেন, চা-টা খাওয়া হল? এবার কি বেরোবেন নাকি দাদা? ঘণ্টা দুয়েক ঘোরা যাবে।

ঋজুদা বলল, চলো চলল। আর দেরি করে কী হবে।

প্রদীপদা বললেন, আপনার জন্যে এই এয়ারকন্ডিশানড কালিস গাড়িটা আনিয়েছি। টাটা সুমোতে আসতে আপনার কষ্ট হয়েছে। এই কালিস গাড়িটা উঁচু আছে। তা ছাড়া ইন্ডিপেন্ডেন্ট সাসপেনশান। এ গাড়িতে বসে জানোয়ার দেখতেও সুবিধা হবে।

ভটকাই ফিসফিস করে আমাকে বলল, Qualis, কালিস। কালিস মানে কী রে?

আমি জবাব দিলাম না।

আমরা টাটাসুমোতে এসেছিলাম, সেটাও অবশ্য এয়ারকন্ডিশানড। যদিও জানুয়ারি মাসের শেষ কিন্তু মাঝে মাঝেই গরম হয়ে যাচ্ছে আবহাওয়া।

ঋজুদা বলল, জঙ্গলে ঘুরতে এখন কোন গাড়ি সবচেয়ে ভাল বলো তো প্রদীপ?

কোন গাড়ি?

মাহিন্দ্রর বোলেরো। সবদিক দিয়ে ভাল গাড়ি। টাটা সুমোর সামনের সিটটা একটু ছোট। লম্বা চওড়া মানুষের বসতে অসুবিধে। কালিসও অবশ্য ভাল গাড়ি কিন্তু বোলেরোর মতো নয়। তা ছাড়া দিশি গাড়ি। দেশের জিনিস যদি পাওয়া যায় তবে বিদেশি জিনিস ব্যবহার না করাই ভাল।

কেন টাটা সুমোও তত দিশি।

তা ঠিক, তবে বোলেরো নয়। বোলেরোর চেয়েও ভাল গাড়ি আনছে মাহিরা, নাম Scorpion।

মানে, বিছে? ভটকাই বলল।

হ্যাঁ। গাড়ির মতো গাড়ি। আগামী বছরেই এসে যাবে।

টয়োটা কালিসও তো দেশেই তৈরি হচ্ছে।

হলে কী হয়! তাদের মুনাফা তো সব জাপানেই চলে যাবে। মারুতির মালিকানাও তো এখন বেশিটাই জাপানি। তাদের মুনাফাও জাপানে যাবে। থাম্বস আপ, পেপসি, কোকাকোলা এইসব কোম্পানির পয়সা যাবে আমেরিকাতেই।

সত্যি! ভটকাই বলল, ছাতার বিশ্বায়ন করে দেশের কোন উপকারটাই বা হল! দিশি ব্যবসাগুলো সব লাটে উঠল। তা ছাড়া, ওরা যদি অনেক ভারতীয়কে চাকরি-টাকরি দিত তাহলেও না হয় বোঝা যেত, এখন তো কম্পুটারের ঝিং-চ্যাক যুগ। খুব অল্প লোকেই মস্ত মস্ত কারখানা চালানো যায়।

তিতির বলল, সত্যি কথাই। মুনাফাও তো বিদেশে চলে যাচ্ছে, দেশের লোকের কর্মসংস্থানও হচ্ছে না তবে এই বিদেশিদের কাছে দরজা-জানলা খুলে দিয়ে দেশের উপকার কতটুকু হল?

প্রদীপকাকু আমাদের জাতীয়তাবাদী আলোচনার মধ্যেই বললেন, চলুন দাদা, এবারে ওঠা যাক।

প্রদীপকাকু, তাপসকাকু, আর সঞ্জীবকাকু গিয়ে ফরেস্টার সাহেবের জিপে উঠলেন। একজন ফরেস্ট গার্ড উঠল আমাদের কালিস-এর পিছনে। ঋজুদা সামনে আর আমরা তিনজন পেছনে। চলল গাড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *