রায়বাড়ির প্রতিমা রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
মিঃ ভাদুড়ি আস্তে বললেন, আপনি কাঞ্চন সেনের ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে এসেছেন বলে আমার ধারণা। ভদ্রলোক কলকাতার এক বিখ্যাত জুয়েলারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন।
–চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানির এজেন্ট ছিলেন। চোরাই জুয়েলস কেনা-বেচার যোগসূত্র এই এজেন্টরা। মিঃ ভাদুড়ি! কাঞ্চন সেন এখানে এসে রায়বাড়িতে ওঠেননি, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
–আপনি সিওর?
–হ্যাঁ, আমার হাতে তথ্য আছে, কাঞ্চন সেন গত শুক্রবার এসে সেদিনই কলকাতা ফিরে যান। তারপর আবার শনিবার এখানে আসেন এবং সেদিনই কলকাতা ফিরে যান। রবিবার সন্ধ্যায় তাকে মার্ডার করা হয়। আগেই বলেছি, তার চেনা লোক তাঁকে মার্ডার করেছে।
–খুনিকে আজ রাত্রেই ধরে ফেলব।
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,–অবশ্য যদি সে কনকপুরে থাকে!
–দেখা যাক।
–কাঞ্চন সেনের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আমার একটা অতিরিক্ত দায়িত্ব আছে। আমি অনুশোচনায় ভুগছি মিঃ ভাদুড়ি! সেই কারণে তার খুনি শিগগির ধরা পড়ুক, এটা আমি চাই। হাতের কার্ড আমি নাকি পুলিশকে দেখাই না বলে পুলিশমহলে একটা ধারণা আছে। আমি আপনাকে অন্তত এ ব্যাপারে আমার হাতের কার্ড দেখাতে চাই।
মিঃ ভাদুড়িকে বিস্মিত লক্ষ করছিলুম। আমিও বিস্মিত। কারণ কর্নেলের মধ্যে এমন ভাবাবেগ আমি কখনও দেখিনি। মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–বলুন স্যার! আমার পক্ষ থেকে যতটা করা সম্ভব আমি করব।
কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর থেকে কাঞ্চন সেনের সেই কার্ডটা মিঃ ভাদুড়িকে দেখতে দিলেন। তারপর তিনি কার্ডটা ফেরত নিয়ে গত রবিবার বিকেলে তার অ্যাপার্টমেন্টে কাঞ্চন সেনের কার্ড ফেরত নিতে আসার ঘটনা সবটাই বললেন। কিন্তু কার্ডটা কীভাবে তার হাতে এসেছিল, সেই অংশটা চেপে গেলেন। মিঃ ভাদুড়ি! কাঞ্চন সেন আমাকে যে নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন, তা এখনই আপনাকে জানাচ্ছি না। আমার বিশ্বাস, এই নাম-ঠিকানা আপনারা নিজেরাই পেয়ে যাবেন। কাঞ্চন সেনের খুনি নিশ্চয় আমার বাড়ি পর্যন্ত গোপনে তাঁকে ফলো করে গিয়েছিল। তারপর সে কাঞ্চন সেনের ঘরে তার সঙ্গে দেখা করার ছলে যায়। আমার পরিচয় খুনি তার মালিকের কাছে আগেই পেয়েছিল।
–আপনি সিওর হলেন কী করে?
যথাসময়ে জানতে পারবেন। এরপর খুনি কাঞ্চন সেনের কাছে যায়। কার্ড হারিয়ে চাকরি যাওয়ার আশঙ্কায় কাঞ্চন সেনের মানসিক অবস্থা সুস্থ থাকার কথা নয়। আমার ধারণা, খুনির সঙ্গে তার বন্ধুতার সম্পর্ক ছিল। কারণ কনকপুর হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন কাঞ্চনবাবু। এমন হতেই পারে, কথায়-কথায় তিনি খুনিকে জানিয়েছিলেন, কার্ড আমার কাছে আছে। তা ফেরত পাওয়ার শর্তও মুখ ফসকে তিনি বলে ফেলেছিলেন। কাজেই মালিকের নির্দেশমতো খুনি চিরকালের জন্য তার মুখ বন্ধ করে দেয়। তারপর–
মিঃ ভাদুড়ি কর্নেলের কথার ওপর বললেন,–তারপর সে চিরকালের জন্য আপনার মুখও বন্ধ করার জন্য ওয়াটারড্যামের কাছে জঙ্গলে ওত পেতে বসে ছিল।
ঠিক তা-ই।–বলে কর্নেল ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়ালেন। একটা কথা। রায়বাড়ির দুই ভাই কে কোথায় চাবি লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা জিজ্ঞেস করেছিলেন কি?
ও. সি. মিঃ ভাদুড়িও উঠে দাঁড়ালেন। একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ। তবে ওঁরা একে অন্যকে লুকিয়ে গোপনে আমাকে জানিয়েছেন। দেখিয়েছেনও।
কর্নেল হাসলেন। বড়বাবু পুরোনো শাস্ত্রীয় বৃহৎ পঞ্জিকার ভিতরে গর্ত কেটে আর ছোটবাবু তাঁর ছড়ির ভিতরে চাবি লুকিয়ে রাখতেন।
–আমি আপনার কথায়.অবাক হচ্ছি না স্যার! শুনেছি, পিছনেও আপনার একটা চোখ আছে।
–নাঃ। প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদার আমার সোর্স, মিঃ ভাদুড়ি!
মিঃ ভাদুড়ি চেয়ার থেকে উঠে এলেন। আপনারা এখন কি সেচ-বাংলোয় ফিরে যাবেন?
–হ্যাঁ। দেখি, কোনো রিকশোওয়ালাকে রাজি করাতে পারি নাকি!
–ওদের তো একটা জিপগাড়ি আছে! আপনি বললেই নিশ্চয় পেতেন।
–ইঞ্জিনিয়ার মিঃ গোস্বামী গাড়িটা দিতে চেয়েছিলেন। আমি নিইনি।
–ঠিক আছে। রমেনবাবুকে বলছি, আমাদের গাড়িতে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবেন। শীতের রাত্রে ইরিগেশন বাংলোতে যেতে কোনো রিকশোওয়ালাই রাজি হবে বলে মনে হয় না।
পা বাড়িয়ে হঠাৎ কর্নেল ঘুরে দাঁড়ালেন। আস্তে বললেন,–কাল সকাল দশটা থেকে তৈরি থাকবেন। যে-কোনো সময় আপনার সদলবলে রায়বাড়ি যাওয়ার দরকার হতে পারে।
মিঃ ভাদুড়ি হাসলেন। আবার বলছি, অবাক হচ্ছি না স্যার! পুলিশ সুপার মিঃ রাজেশ কুমার আমাকে প্রায় হুমকি দিয়ে রেখেছেন, আপনার কাছে যা-কিছুই শুনি, যেন মাথা ঠিক রাখি। মাই গুডনেস! এক মিনিট স্যার! আপনাকে একটা ডায়রি করতে বলেছিলুম। ভুলে গেছি। স্বার্থটা আমারই। একটা আইনগত ভিত্তি থাকা দরকার।
তিনি টেবিলের কাছে গিয়ে একটা প্যাড টেনে নিলেন। আপনি সংক্ষেপে চিঠির মতো করে ঘটনাটা লিখে দিয়ে সই করুন। আমাকে অ্যাড্রেস করে লিখবেন। ততক্ষণে আমি রমেনবাবুকে জিপের ব্যবস্থা করতে বলি।…
সেচবাংলোয় ফিরে গিয়ে দেখি, হালদারমশাই নীচের ঘরে সোফায় বসে আছেন। পাশে একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগ। আমাদের দেখে তিনি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন–ওপরে চলেন কর্নেলস্যার। সব কইতাছি।
দোতলায় আমাদের ঘরে ঢুকে তিনি শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বললেন, সন্ধ্যাবেলায় হঠাৎ দুই ভাইয়ে কী লইয়া ঝগড়া বাধছিল। আমি থামাইতে গেছলাম। দুইজনেই আমারে কইলেন, ওনাগো ডিটেকটিভের দরকার নাই। আমিই নাকি ওনাগোর মইধ্যে গণ্ডগোল বাধাইতে আইছি। কর্নেলস্যার! আমারে অকারণে দুইজনে ইনসাল্ট করল। হেভি মিস্ত্রি!…
হালদারমশাইয়ের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল আমাদের পাশের ঘরে। সকাল আটটায় বাসুদেব ঠাকুর বেড-টি এনে আমার ঘুম ভাঙিয়েছিলেন। তিনি বললেন,–বড়সায়েব আর হালদারসায়েব ভোরবেলা বেড়াতে বেরিয়েছেন। ভোঁদাকে সঙ্গে নেননি বলে বেচারা মনমরা হয়ে বসে আছে।
ঠাকমশাই হাসতে-হাসতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বেড-টি খেতে-খেতে মনে পড়েছিল গত রাত্রে কর্নেল ও. সি. মিঃ ভাদুড়িকে আজ সকাল দশটা থেকে তৈরি থাকতে বলেছেন। যে-কোনো সময়ে তাকে সদলবলে রায়বাড়ি যেতে হতে পারে। তা হলে কি আজ হালদারমশাই-কথিত ‘হেভি মিস্ট্রি’-র পর্দা তুলবেন কর্নেল?
উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠেছিলুম। বাথরুম সেরে সেজেগুজে বারান্দায় গিয়ে বসেছিলুম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ও গোয়েন্দাপ্রবরকে গেটে ঢুকতে দেখলুম। ওপরে এসে কর্নেল অভ্যাসমতো সম্ভাষণ করলেন, মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
বললুম,–মর্নিং কর্নেল! হাড়কাঁপানো শীতের ভোরে হালদারমশাইকে ওয়াটারড্যামের হিম খাইয়ে জব্দ করেছেন। তাই না হালদারমশাই?
হালদারমশাই সহাস্যে বললেন,–আমাদের জব্দ করে কেডা? পঁয়তিরিশ বৎসরের পুলিশ-লাইফে অনেক ড্যাঞ্জারাস হিম খাইছি।
তিনি আমার পাশের চেয়ারে বসলেন। কর্নেল ঘরে ঢুকে গেলেন। বললুম,–প্রাতঃকৃত্য করবেন না?
–প্রাতঃকৃত্য কইরাই বাইরাইছিলাম।
চুপি-চুপি বললুম,–কর্নেল বলেননি, আজ দশটায় রায় বাড়ি যাবেন?
প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাসিমুখে বললেন,–ওয়েট অ্যান্ড সি।
একটু পরে ভোঁদা কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে এনে টেবিলে রাখল। তার মুখটা বেজায় গম্ভীর। সে চলে যাচ্ছিল। কর্নেল বেরিয়ে এসে ডাকলেন,–ভোঁদা! তুমি খেয়েদেয়ে তৈরি থেকো। আমরা সাড়ে ন’টা নাগাদ বেরুব। আর শোনো! আমাকে যে জিনিসগুলো দেখিয়েছিলে, সেগুলো একটা চটের ব্যাগে ঢুকিয়ে নেবে। রাত্রে সুখরঞ্জনবাবুকে বলে রেখেছি। তার কাছে চটের থলে পেয়ে যাবে।
ভোঁদার মুখে হাসি ফুটল। সে বলল,–সুকুবাবু কঁকপুরে পাঁজা কঁত্তে না? ছাঁইকেঁলে না?
–বুঝেছি। নটার মধ্যে উনি এসে যাবেন।
ভোঁদা থপথপ করে চলে গেল। বললুম,–কী ব্যাপার? ভোঁদা চটের ব্যাগে কী নেবে?
কর্নেল চেয়ারে বসে কফির পেয়ালা তুলে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন,–হেভি মিস্ট্রি! কী বলেন হালদারমশাই?
গোয়েন্দাপ্রবর শুধু বললেন,–হঃ!….
বেলা ন’টায় কর্নেলের নির্দেশমতো তৈরি হয়ে নীচে ডাইনিংরুমে গেলুম। আমাদের ব্রেকফাস্টের সময় সুখরঞ্জনবাবু সাইকেলে থলে ভর্তি বাজার করে ফিরলেন। তিনি হাসিমুখে ঘোষণা করলেন,–ঠাকমশাই! আজ সায়েবদের পাতে তাবড় তাবড় পাবদা মাছ সার্ভ করতে পারবেন। ভাগ্যিস, কেতো-জেলেকে বাজারে ঢোকার মুখেই ধরে ফেলেছিলুম।
ভোঁদা বলল,–সুকুবাবু! হুঁ-হঁ-হঁটের ব্যা–
সুখরঞ্জনবাবু কপট চোখ রাঙিয়ে বললেন,–এই ভোঁদড়টাকে নিয়ে পারা যায় না!
ব্রেকফাস্টের পর আমরা বেরিয়ে পড়লুম। ভোঁদার হাতে চটের থলেতে কী আছে কে জানে! সে যে কর্নেলের কাছ ঘেঁষে ভালুকের মতো হেঁটে চলল। আমরা প্রায় অর্ধেক রাস্তায় পৌঁছেছি, একটা জিপগাড়ি আসতে দেখলুম। কাছাকাছি এসে গাড়িটা দাঁড়াল। সাব-ইন্সপেক্টর রমেনবাবু নেমে ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাতে নির্দেশ দিলেন। তারপর কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–ও. সি. সায়েব আপনাকে খবর দিতে বলেছেন, যে লোকটার কথা আপনি বলেছিলেন, তাকে গত রাত্রে তিনটে নাগাদ অ্যারেস্ট করা হয়েছে।
–কোথায়?
–কৃষ্ণগঞ্জে। আমাদের সোর্স তাকে পরশু বিকেলে বাসস্ট্যান্ডে কৃষ্ণগঞ্জের বাসে চাপতে দেখেছিল। সেখানে ওর একটা ডেরা আছে।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–হালদারমশাই! আপনি খুশি হতে পারেন।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, আমি যার কথা কইছিলাম, সে ধরা পড়ছে?
–হ্যাঁ। ঠিক আছে রমেনবাবু! আমরা পায়ে হেঁটেই যাব। আপনি মিঃ ভাদুড়িকে আমার ধন্যবাদ জানাবেন।
রমেনবাবু বললেন,–গাড়ি থাকতে হাঁটবেন কেন স্যার?
–একটু সতর্কতা দরকার।
–বেশ তো! পাওয়ার সাবস্টেশনের কাছে আপনাদের নামিয়ে দিয়ে যাব। বলে রমেনবাবু ভোঁদার দিকে তাকালেন। এ কোথায় যাবে? মনে হচ্ছে, ইরিগেশন বাংলোতে একে দেখেছি।
–রমেনবাবু! এর নাম ভোঁদা। আমার ভাগ্য! একজন বিশ্বস্ত সহযোগী পেয়ে গেছি।
রমেনবাবু হাসতে-হাসতে বললেন,–আমরা পিছনে বসছি! জয়ন্তবাবু! মিঃ হালদার! আমাদের পিছনে বসতে হবে। ভোঁদা! তোর হাতে ওটা কী?
কর্নেল বললেন,–অ্যাটম বোমা রমেনবাবু! ওটা ছোঁবেন না প্লিজ!
কর্নেল সামনে বসলেন। আমরা পিছনে। এই জিপগাড়িটা গত রাতেরটা নয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের কাছে পৌঁছে গেলুম। আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা বাঁদিকে বাঁক নিয়ে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই আমাদের গাইড।
হালদারমশাই বললেন,–আপনারে যা কইছি কর্নেলস্যার! একটু দূরের থেইক্যা বাড়িখান দেখাইয়া দিমু। আমারে দেখলে ওনারা হয়তো আবার ইনসাল্ট করবেন!
–ঠিক আছে। তবে আপনাকে যেতে হবে ও-বাড়ি। আপনি লক্ষ রাখবেন। জয়ন্ত একসময়ে বেরিয়ে একটুখানি দাঁড়াবে। আপনি ঠিক তখনই সোজা গিয়ে ঢুকবেন।
খেলার মাঠের ডানদিক ঘুরে ছোট রাস্তা, তারপর বড় রাস্তা দিয়ে মিনিট দশেক হাঁটার পর হালদারমশাইয়ের নির্দেশমতো বাঁদিকে ঘুরে কিছুটা এগিয়ে গেলুম। এদিকটা কনকপুরের শেষপ্রান্ত মনে হচ্ছিল। একটা বিশাল বটগাছের তলায় শিবমন্দির। সেখানে দাঁড়িয়ে হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–ডাইনে রাস্তায় আউগাইয়া কারেও জিগাইবেন। গেট আছে। পুরানো দোতলা বাড়ি। উঁচা বাউন্ডারিওয়াল আছে। দ্যাখলেই বোঝবেন। গেটে ‘রায়ভবন’ লেখা আছে। আর কী কমু?
ডাইনে রাস্তাটা একসময় পিচে মোড়া ছিল। এখন খানা-খন্দে শ্রীহীন অবস্থা। পশ্চিমে এগিয়ে বাড়িটা চোখে পড়ল। দক্ষিণমুখী পুরোনো দোতলা বাড়ি। মাঝামাঝি গেট। ফাটলধরা গেটের মার্বেলফলকে ‘রায়ভবন’ লেখা। ওপরে বুগেনভেলিয়ার ঝাপি। গেটের মরচে ধরা গরাদের সামনে কর্নেল দাঁড়াতেই একটা লোক এসে বলল,–সায়েবদের কোথা থেকে আসা হচ্ছে আজ্ঞে?
কর্নেল বললেন, কলকাতা থেকে। সুদর্শনবাবুকে খবর দাও!
–ছোটবাবু ওদিকে পুকুরের মাছ ধরাচ্ছেন সার! বড়বাবুকে ডাকব?
–তাই ডাকো। ওপর থেকে কেউ বলল,–কে রে হরিপদ?
–বড়বাবু! এনারা কলকাতা থেকে এসেছেন।
বুগেনভেলিয়ার ঘন ঝাপির জন্য গেট থেকে দোতলা দেখা যাচ্ছিল না। কর্নেল বললেন,–এই কার্ডটা নিয়ে গিয়ে বড়বাবুকে দেখাও হরিপদ।
হরিপদ গেট খুলল না। গরাদের ফাঁক দিয়ে সে কর্নেলের হাত থেকে তাঁর নেমকার্ড নিয়ে চলে গেল। বললুম,–অদ্ভুত তো!
কর্নেল হাসলেন।–অদ্ভুত কিছু নয়। মুখ বুজে থাকবে।
প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এবং গায়ে শালজড়ানো একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখা গেল। তিনি করজোড়ে নমস্কার করে বললেন,–নমস্কার! নমস্কার! তা হলে সত্যিই কর্নেলসায়েবের পায়ের ধুলো পড়ল রায়বাড়িতে? ও হরিপদ! গেট খুলিসনি কেন হতভাগা! সায়েবকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস?
হরিপদ গেট খুলল। আমরা ভিতরে ঢুকলুম। কর্নেল বললেন, আপনি সুরঞ্জনবাবু?
–হ্যাঁ কর্নেলসায়েব! ইনি বুঝি সেই সাংবাদিক ভদ্রলোক? গত রাত্রে কলকাতা থেকে ঝন্টু ট্রাঙ্ককল করেছিল। আপনি পৌঁছেছেন কি না জিজ্ঞেস করছিল। আরে! এটা আবার কে?
কর্নেল বললেন, আমি ইরিগেশন বাংলোয় উঠেছি। ছেলেটি সেখানে কাজ করে। আমাদের রায়ভবন চিনিয়ে দেবে বলে একে নিয়ে এলুম। এর নাম ভোঁদা!
সুরঞ্জনবাবু বললেন,–অ্যাই ভোঁদা! বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছিস, বেশ করেছিস! তা সায়েবদের সঙ্গে তুই ঢুকলি কেন? বেরো বলছি!
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ভোঁদা আমার সারাক্ষণের সঙ্গী। আসবার পথে কিছু কেনাকাটা করেছি। ওর চটের ব্যাগে রাখা আছে।
সুরঞ্জনবাবু ঘুরে বললেন,–হরিপদ! হাঁ করে কী দেখছিস! বসবার ঘরের দরজা খুলে দে শিগগির! আসুন কর্নেলসায়েব! আর আপনার নামটা কী যেন?
আমি পকেট থেকে আমার একটা নেমকার্ড বের করে দিলুম। উনি পড়ে দেখে বললেন, হ্যাঁ, জয়ন্ত চৌধুরি। ঝন্টুই বলেছিল। আসুন! দেখতেই পাচ্ছেন, কী অবস্থায় বেঁচে আছি। স্কুল থেকে রিটায়ার করেছি দুবছর আগে। এখনও পেন্ডিং-এর ফাইল আটকে আছে। ভাগ্যিস কিছু জমিজমা, বাগান-পুকুর বাবা রেখে গিয়েছিলেন।
গাড়িবারান্দা দেখে বোঝা গেল, একসময় রায় পরিবারের গাড়ি ছিল। গাড়িবারান্দার তলা দিয়ে কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে গোলাকার ছোট্ট বারান্দায় উঠলুম। হরিপদ দরজা খুলে দিয়েছিল ততক্ষণে। ভিতরে ঢুকে দেখি প্রশস্ত একটা ঘর। একপাশে পুরোনো সোফাসেট। দেওয়ালে টাঙানো; পূর্বপুরুষদের অয়েলপেন্টিং অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তারপর চোখে পড়ল দুদিকের দেওয়াল ঘেঁষে কয়েকটা আলমারি। তাতে বাঁধানো প্রকাণ্ড সব বই ঠাসা আছে। কর্নেল সোফায় বসে বললেন–আপনার কাকা ওকালতি করতেন শুনেছি। আইনের বইগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, হ্যাঁ। কাকাবাবু কৃষ্ণনগর জনকোর্টে অ্যাডভোকেট ছিলেন। তাঁর গাড়ি ছিল। এখান থেকে গাড়িতে যাতায়াত করতেন। বাইশ কিলোমিটার দূরত্ব। বাবা নিষেধ করতেন। কৃষ্ণনগরে একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকতে পরামর্শ দিতেন। কিন্তু কাকা একটু জেদি মানুষ ছিলেন। আমাদের বংশের এই রোগটা আছে। তো শেষ অব্দি গাড়িই তাঁকে খেল।
–অ্যাকসিডেন্ট?
–হ্যাঁ। হরিপদ! বললুম না নান্টুকে খবর দে! আর মোনাঠাকুরকে বলে যা, সায়েবদের জন্য চা-টা শিগগির নিয়ে আসে যেন।
–আপনি বসুন!
–বসব। তা যা বলছিলুম। কাকাবাবু আসলে ভাবতেন, কনকপুর ছেড়ে দূরে থাকলে বাবা একা সব সম্পত্তি ভোগ করবেন।
–আপনার কাকাবাবুর ফ্যামিলি?
–সেটাই বলতে যাচ্ছিলুম। খুব ট্র্যাজিক ঘটনা। অ্যাকসিডেন্টের সময় তার গাড়িতেই কাকিমা আর তার ছেলে ছিল। বছর তিনেক বয়স। কাকিমার বাপের বাড়ি চণ্ডীতলায় পৌঁছে দিয়ে কাকাবাবুর কৃষ্ণনগর যাওয়ার কথা ছিল। আর কী বলব?
সুরঞ্জনবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, আপনারা বসুন! আমি আসছি।
তিনি ভিতরের দরজা দিয়ে চলে গেলেন। দেখলুম, ভোঁদা দরজার পাশে হাঁটুমুড়ে বসে আছে। কর্নেল ঘরের ভিতরটা দেখছিলেন। আস্তে বললেন, এই আইনের বইগুলোর দাম অন্তত সে-আমলেই লক্ষাধিক টাকা। এত বই! অথচ ভদ্রলোক এখানে বসেই ওকালতি করতেন!
বললুম,–এই এরিয়ার সব মক্কেল নিশ্চয় ওঁর হাতে ছিল।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে চাপাস্বরে বললেন, নাকি পূর্বপুরুষের মহালক্ষ্মীর জুয়েলস ওঁর এখানে থাকার কারণ? জয়ন্ত! সম্ভবত সুদর্শনবাবু জানেন না, দু-জোড়া চাবি ওঁর ঠাকুরদাই তার দুই ছেলের জন্য তৈরি করিয়েছিলেন।
বলে তিনি ছবিগুলো দেখতে গেলেন। ডাইনে ও বাঁয়ে আলমারির ওপরে উঁচুতে ছবিগুলো টাঙানো আছে। আর আলমারিগুলোর জন্য দুপাশের দেওয়াল ঢাকা পড়েছে। ওদিকে সম্ভবত কোনো জানলা নেই। কর্নেল ছবিগুলো দেখার পর সোফায় এসে বসলেন।
সেইসময় হন্তদন্ত হয়ে সুদর্শনবাবু ঘরে ঢুকলেন। কী আশ্চর্য! নমস্কার কর্নেলসায়েব! আপনি আসছেন না! এদিকে আপনার প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোক কাল একটা ঝামেলা বাধিয়ে এক কাণ্ড করে বসেছিলেন।
–কী কাণ্ড বলুন তো?
–এ বাড়ির কে নাকি ওঁকে গোপনে বলেছে, তিনবছর আগে আমার ঘরের তালা আমি নাকি নিজেই ভেঙেছিলুম। কিন্তু তার চেয়ে সাংঘাতিক কথা–গত মহালয়ার আগের দিন শৈলবালা পাঁচিলের কাছে একটা সাপ দেখে চ্যাঁচামেচি করছিল। তখন আমি নীচে নেমে গিয়েছিলুম। সেইসময় দাদা নাকি আমার ঘর থেকে আমার ছড়িটা নিয়ে সাপ মারতে আসছিল। হালদারবাবুকে কে এসব কথা বলেছে, জানি না। আমার মেজাজ তো জানেন! আপনাকে অলরেডি বলেছি সে কথা!
–আপনি আপনার দাদাকে চার্জ করে বসলেন?
-হ্যাঁ। তারপর দু-ভায়ে প্রায় হাতাহাতির উপক্রম। সেই সময় বাঞ্ছুদা নামে এক ভদ্রলোক–দাদার বন্ধু উনি এসে পড়ে মিটিয়ে দিলেন। ডিটেকটিভদ্রলোকের পরিচয় দিতুম না। কিন্তু রাগের বশে–বুঝতেই পারছেন!
-বাঞ্ছুবাবুই কি মিঃ হালদারকে চলে যেতে বললেন?
-উনি কী করে বলবেন? উনি দাদাকে যত, আমাকে তত বকাবকি করে চলে গেলেন। পুলিশ যা পারল না, একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ তা পারে? বাঞ্ছুদা ঠিকই বলেছেন মনে হল। সাপ মারবার জন্য দাদা আমার ঘর থেকে মোটা বেতের ছড়িটা আনতে যেতেও পারেন, এই ভেবে আমি দাদাকে খামোকা চার্জ করেছিলাম। কারণ সাপটা হরিপদ মারার পর আমার ঘরে গিয়ে ছড়িটা ব্র্যাকেটে একই অবস্থায় ঝোলানো দেখেছিলুম।
–আর সেই চাবির চাপা শব্দ শুনতে পেতেন তো!
–হ্যাঁ। বিকেলে ক্লাবে যাওয়ার সময় অভ্যাসমতো শব্দটা টের পেয়েছি।
–বাড়ির লোকেদের আপনারা জিজ্ঞেস করেননি, কে মিঃ হালদারকে এসব কথা বলেছে।
–করব না আবার? প্রত্যেকে মহালক্ষ্মীর দিব্যি কেটে বলেছে, সে বলেনি।
এইসময় শীর্ণকায় যে লোকটি চা-টা নিয়ে এলেন, তিনিই মোনাঠাকুর। সুদর্শনবাবু তাকে বললেন,–চা না কফি?
ঠাকুরমশাই বললেন,–বড়বাবু চা পাঠাতে বলেছিলেন! বলে তিনি চলে গেলেন।
সুদর্শনবাবু বললেন,–সরি কর্নেলসায়েব! আমার ঘরে আপনার জন্য কফি এনে রেখেছি।
–ঠিক আছে। চা-ই খাওয়া যাক। আপনার পুকুরে মাছ ধরার কাজ শেষ হয়েছে?
–দাদাকে যেতে বললুম। মাছের ব্যাপারীকে ওজন করে দিতে হবে। এদিকে আপনারা এসেছেন। এ বেলা দু-মুঠো–
বলে তার চোখ পড়ল ভোঁদার দিকে।–এই! কে রে তুই?
কর্নেল বললেন,–ইরিগেশন বাংলোয় কাজ করে ছেলেটা। আমি সঙ্গে এনেছি। কিছু কেনাকাটার ব্যাপার ছিল। তো আপনার কি মাছের ব্যাপারীর কাছে যাওয়া দরকার?
–একটুখানি দরকার বইকি। আপনারা চা খান। আমি শিগগির আসছি।
বলে সুদর্শনবাবু আবার হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। চায়ের কাপ হাতে কর্নেল উঠে গিয়ে আবার সেই ছবিগুলো দেখতে-দেখতে কখনও একটু থেমে, কখনও কয়েক-পা এগিয়ে আবার পিছিয়ে এসে একটু থেমে, ডাইনে থেকে বাঁদিকে ঘোরাঘুরির পরে সোফায় এসে বসলেন। আমি বললুম,–ছবিগুলো আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কেন বলুন তো?
কর্নেল সে-প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, তুমি বেরিয়ে গিয়ে গেটের ওখানে একটু দাঁড়িয়ে চলে এসো। গেট খুলে রাখবে। হালদারমশাই না এসে পড়লে নাটক জমবে না।
একটু দ্বিধার সঙ্গে তার নির্দেশ পালন করতে গেলুম।…
.
গোয়েন্দাপ্রবর ঘরে ঢুকে সোফার এককোণে বসলেন। তারপর কর্নেলকে দেওয়ালে টাঙানো একটা বিশাল ছবি দেখিয়ে বললেন,–রায়বাহাদুর!
কর্নেল বললেন,–বাঁ-দিকে তিননম্বর বলেছিলেন আপনি!
হালদারমশাই বললেন,–ঘরে আলো জ্বালে নাই ক্যান? ওনারা কই গেলেন?
–পুকুরের ধারে মাছ ধরিয়ে বিক্রি করছেন।
হালদারমশাই অমনই উঠে ছবিটার কাছে গেলেন। তখনই ফিরে এসে বললেন,–ভুল করছিলাম। চাইর নম্বর। রাত্রে এটুখানি দেখা। হঃ! রায়বাহাদুর। সুদর্শনবাবু আগের দিন কইছিলেন, ওনার ঠাকুরদার ঠাকুরদা রায়বাহাদুর ছিলেন।
ওঁদের এসব কথা বুঝতে পারছিলুম না। একটু পরে মোনাঠাকুর চায়ের সরঞ্জাম নিতে এসে হালদারমশাইকে দেখে কেন কে জানে মুচকি হেসে চলে গেলেন। তারপর এল হরিপদ। সে হালদারমশাইকে দেখে গম্ভীর মুখে বলল,আপনি আবার এসেছেন বাবুমশাই! আবার ঝামেলা বাধবে।
বলে সে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল। কর্নেল বলবেন,–তোমার কর্তাবাবুদের কাজ শেষ হয়নি হরিপদ?
–হয়েছে আজ্ঞে! ছোটবাবু আমাকে ঘরে আলো জ্বেলে দিতে বললেন। ওনারা এক্ষুনি এসে যাবেন।
সে চলে যাওয়ার একটু পরে দুই ভাই ঘরে ঢুকলেন। তারপর গোয়েন্দাপ্রবরকে দেখে দুজনেই থমকে দাঁড়ালেন। সুরঞ্জনবাবু গম্ভীরমুখে বললেন, আপনি আবার এসেছেন? কর্নেলসায়েব! ওঁকে চলে যেতে বলুন!
সুদর্শনবাবু দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন,–কেলেংকারি হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি! কর্নেলসায়েবের খাতিরে গায়ে হাত তুলছি না। বেরিয়ে যান বলছি। নইলে গোবিন্দকে ডাকব।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনারা মিঃ হালদারের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করেছিলেন। কিন্তু লিখিতভাবে কন্ট্রাক্ট বাতিল করেননি। প্রাইভেট ডিটেকটিভদের ব্যাপারে একটা সরকারি আইন আছে। আমাকে মিঃ হালদার বলছিলেন, কারণ দেখিয়ে কন্ট্রাক্ট বাতিল করতে হয়। তা না হলে উনি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
সুরঞ্জনবাবু বাঁকা হেসে বললেন, ঠিক আছে। আপনি যখন বলছেন, তা-ই করছি। নান্টু! একটা কাগজ এনে দাও।
সুদর্শনবাবু বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল এবার গম্ভীরমুখে বললেন, একজন স্থানীয় বিশিষ্ট লোককে ডাকতে হবে। তিনি কন্ট্রাক্ট বাতিলের কাগজে সাক্ষী হিসেবে সই করবেন। আপনার বন্ধুদের মধ্যে তেমন কেউ নিশ্চয় আছেন?
সুরঞ্জনবাবু বললেন,–এমন আইন আছে নাকি?
-আছে। আপনি পুলিশকে ফোন করে জেনে নিতে পারেন।
সুদর্শনবাবু এক্সারসাইজ খাতার একটা পাতা ছিঁড়ে এনে সুরঞ্জনবাবুকে দিলেন। সুরঞ্জনবাবু বললেন–নান্টু! কর্নেলসায়েব বলছেন, কন্ট্রাক্ট বাতিলের কাগজে কোনো বিশিষ্ট লোককে সাক্ষী রাখতে হবে। এই নাকি আইন।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ সুদর্শনবাবু! বরং আমার কথা যাচাই করতে থানায় টেলিফোন করুন। পুলিশকে বলুন আমি এখানে আছি। না-না! নিঃসন্দেহ হওয়া উচিত। আপনি ফোন করে আসুন।
লক্ষ করলুম, কর্নেল সুদর্শনবাবুর দিকে তাকিয়ে কথা বলার সময় চোখের ভঙ্গিতে যেন কী ইশারা করলেন। সুদর্শনবাবু ফোন করতে যাচ্ছেন দেখে সুরঞ্জনবাবু বললেন,–নান্টু! বাঙ্কুবাবুকেও একটা ফোন করে এখনই আসতে বলো! ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকছে। বাঙুরও আসা দরকার।
একপ্রান্তে সুরঞ্জনবাবুর অ্যাডভোকেট কাকার সেক্রেটারিয়েট টেবিল আছে। উল্টোদিকের চেয়ারে বসে তিনি বললেন,–বলুন কর্নেলসায়েব! কী লিখতে হবে।
কর্নেল বললেন,–বেশি কিছু না। বাংলায় লিখলেও চলবে। স্পষ্ট হস্তাক্ষরে লিখুন : প্রাইভেট ডিটেকটিভ শ্রী কে. কে. হালদার মহাশয়ের সহিত আমাদের গৃহদেবী মহালক্ষ্মীর গহনা উদ্ধারের জন্য যে চুক্তি করিয়াছিলাম, তাহা এতদ্বারা বাতিল করিলাম। কারণ তিনি এই কার্য করিতে গিয়া আমাদের পরিবারে অহেতুক মনোমালিন্য ও বিরোধ বাধাইয়া সমস্যার সৃষ্টি করিয়াছেন।
কর্নেলের এইসব কথা লিখতে সুরঞ্জনবাবুর মাত্র মিনিট পাঁচেক সময় লাগল। কাগজটা তিনি কর্নেলকে দিয়ে বললেন,–বাইশ বছর স্কুলমাস্টারি করেছি কর্নেলসায়েব! আশা করি বানান ভুল নেই!
কর্নেল কাগজটা তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন,–এর তলায় তারিখ দিয়ে আপনি ও সুদর্শনবাবু সই করবেন। বাঁদিকে সাক্ষী সই করবেন।
সুদর্শনবাবু একটু পরে ফিরে এলেন। বললেন,–ও. সি. থানায় ছিলেন। তিনি বললেন, আইনে এইরকম ব্যবস্থা আছে!
সুরঞ্জনবাবু বললেন–বাঙ্কুবাবুকে পেলে?
-হ্যাঁ। উনি এক্ষুনি আসছেন।
–এসো। আমি সই করেছি। তুমি তলায় সই করো। তারিখ লিখে দিয়ে।
দুজনে সই করার পর কর্নেল একটু হেসে বললেন,–মিঃ হালদার পূর্ববঙ্গের লোক। ওঁর সামনেই বলছি। একসময় পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। ওঁর দাপটে চোর-ডাকাতরা এলাকা ছেড়ে পালাত। আইনকানুন ওঁর মুখস্থ। উনি হঠাৎ এসে পড়বেন জানতুম না। এসেই আমাকে বলছিলেন, ক্ষতিপূরণের কে করবেন আপনাদের বিরুদ্ধে। আমি ওঁকে বুঝিয়ে শান্ত করেছি।
সুরঞ্জনবাবু বললেন,–কাল রাত্রে ঝন্টু ট্রাঙ্ককলে বলছিল, আপনাকে যেন এই কেসের দায়িত্ব দিই। আপনার সঙ্গে কি কন্ট্রাক্ট করতে হবে?
-নাঃ! সুদর্শনবাবু! আপনি বসুন। মিঃ হালদারের সঙ্গে নিষ্পত্তি হয়ে গেলে আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলব। তো বাঙ্কুবাবুর বাড়ি কতদূরে?
সুরঞ্জনবাবু বললেন,–তত কিছু দূরে নয়। ওই মোটরসাইকেলের শব্দ শুনছি। হরিপদ! ও হরিপদ!
হরিপদ দরজায় উঁকি মেরে বলল,–আজ্ঞে বড়বাবু!
-–গেট খুলে দে। বাঙ্কুবাবু আসছেন মনে হচ্ছে।
একটু পরে বাইরে মোটরসাইকেলের শব্দ থেমে গেল। সুরঞ্জনবাবু উঠে গিয়ে বললেন, –এসো বাঞ্ছু! বড্ড ঝামেলায় পড়ে গেছি।
তার সঙ্গে বেঁটে স্থূলকায় একজন ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। কর্নেলকে দেখেই উনি থমকে দাঁড়ালেন।–এঁরা কারা?
–কলকাতা থেকে ঝন্টু এঁদের পাঠিয়েছেন। উনি কর্নেলসায়েব! পরে বলছি।
–ডিটেকটিভদ্রলোক আবার এসে ঝামেলা পাকিয়েছেন?
সুরঞ্জনবাবু কাগজটা তাঁকে দেখিয়ে বললেন, এখানে তুমি উইটনেস হিসেবে একটা সই দাও বাঞ্ছু! নান্টু থানায় ফোন করেছিল। ও. সি. সায়েব বলেছেন এটাই নাকি আইন।
বাঞ্জুবাবু একটা চেয়ারে বসে সই করে দিলেন। সুরঞ্জনবাবু কাগজটা হালদারমশাইকে দিয়ে বললেন,–এবার দয়া করে কেটে পড়ুন মশাই।
হালদারমশাই কাগজটা কর্নেলকে দিয়ে বললেন,–আর-একবার দেইখ্যা দিন কর্নেলস্যার!
কর্নেল কাগজটা হাতে নিয়েছেন, এমনসময় ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি, এস. আই. রমেনবাবু এবং আরও একজন অফিসার ঘরে ঢুকলেন। বারান্দায় একদঙ্গল কনস্টেবলও এসে দাঁড়াল।
বাঙ্কুবাবু আড়ষ্টভাবে হেসে বললেন,–কী ব্যাপার স্যার? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না?
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–আপনার বাড়ি হয়েই আসছি দত্তবাবু! আপনাকে আমাদের দরকার।
বাঞ্ছারাম দত্ত করজোড়ে বললেন,–বলুন স্যার!
–কর্নেলসায়েব! আপনি এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আগে কথা বলে নিন।
কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর থেকে কাঞ্চন সেনের কার্ডটা বের করে বললেন,–দেখুন তো দত্তবাবু। এই কার্ডটা চিনতে পারেন কি না।
দত্তবাবু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন,–ওটা কীসের কার্ড স্যার?
কলকাতার বিখ্যাত চন্দ্র জুয়েলারি কোম্পানির এজেন্ট কাঞ্চন সেনের কার্ড। তাকে আপনি কয়েক লক্ষ টাকার জুয়েলারি বিক্রির খবর দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। গত সপ্তাহে শুক্রবার কাঞ্চনবাবু আপনার বাড়ি এসেছিলেন। কিন্তু জুয়েলারি তাকে সেদিন দেখানোর অসুবিধে ছিল বলেই আমার ধারণা। কারণ ওগুলো তখনও আপনার কাছে পৌঁছয়নি। তা ছাড়া, চোরাই জুয়েলারি। একটা ঝুঁকি ছিল, আপনি তা জানতেন। তাই জুয়েলারি চুরির দায় অন্যের কাঁধে চাপানোর জন্য আপনি কাঞ্চনবাবুর পকেট থেকে কোনো সুযোগে তার কার্ডটা চুরি করেছিলেন। কাঞ্চনবাবু কলকাতা ফিরে গিয়ে টের পান তার এজেন্ট-কার্ড চুরি গেছে। পরদিন শনিবার তিনি ২৯৭ আপনার কাছে এসেছিলেন। কিন্তু কার্ডের হদিস পাননি। রবিবার সুদর্শনবাবু তার মাসতুতো ভাই ঝন্টুবাবুর নির্দেশে কলকাতায় আমার কাছে গিয়েছিলেন। বাসে কিংবা ট্রেনে আপনার লোক তার ব্যাগে কার্ডটা গোপনে ভিড়ের মধ্যে গুঁজে দেয়। হা-সুরঞ্জনবাবু আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সুরঞ্জনবাবুই আপনাকে জানিয়েছিলেন, তার ছোটভাই কোথায় যাচ্ছেন। আপনি সুরঞ্জনবাবুর কাছেই জেনে নিয়েছিলেন, সুদর্শনবাবু ব্যাগে মহালক্ষ্মীর ছবি আমাকে দেখাতে নিয়ে যাবেন। সুদর্শনবাবু ছবি বের করলেই চন্দ্র জুয়েলারি কোম্পানির এই বিশেষ কার্ড বেরিয়ে পড়বে। সুদর্শনবাবু কার্ড দেখে চমকে উঠবেন। আমিও কার্ডটা দেখব। এই কার্ড দেখার পর সুদর্শনবাবু আমার সন্দেহভাজন হবেন। কিন্তু ছবি বের করার সময় কার্ডটা ছিটকে পড়েছিল সুদর্শনবাবুর পায়ের নীচে। তিনি তা লক্ষ করেননি। তিনি চলে যাওয়ার পর কার্ডটি আমি দেখতে পেয়েছিলুম। আর-একটা কথা। কাঞ্চনবাবু কার্ড হারানোর পর আমার কাছে গিয়েছিলেন। তিনি নিজের হাতে আপনার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন।
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–দত্তবাবুর সেই লোককে আমরা অ্যারেস্ট করেছি। সে জেরার মুখে সব স্বীকার করেছে। কাঞ্চনবাবু আপনাকে শনিবার এসে কার্ড না পেয়ে হুমকি দিয়ে গিয়েছিলেন, কার্ড না পেলে তিনি আপনাকে চোরাই জুয়েলারির কেসে ফাসাবেন। তাই রবিবার আপনার লোক, অর্থাৎ কুখ্যাত বাবু ঘোষকে আপনি কলকাতা পাঠিয়েছিলেন। সে কাঞ্চনবাবুর একসময় ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। অনেক চোরাই জুয়েলারি সে কাঞ্চনবার সাহায্যে বিক্রি করেছে। আপনার হুকুম ছিল, বেগতিক দেখলেই তাকে যেন বাবু ঘোষ খতম করে। শেষপর্যন্ত বাবু ঘোষ তা করেছে। তাকে আমরা খুনের দায়ে ধরেছি। এবার আপনার পালা! রমেনবাবু! বাঞ্ছারাম দত্তকে অ্যারেস্ট করুন।
রমেনবাবু বাঞ্ছারাম দত্তের কাছে এসে সহাস্যে বললেন,–আপনাকে গ্রেফতার করা হল। আপনি মানী লোক। চলুন! আমাদের গেস্টহাউসে থাকবেন। একটু কষ্ট হবে। কিন্তু উপায় কী?
বলে তিনি কনস্টেবলদের ডাকলেন, রামভকত! সুরেন্দ্র! এঁকে প্রিজনভ্যানে নিয়ে যাও। একমিনিট। কই দত্তবাবু! শালের ভেতর থেকে হাতদুটো বের করুন।
দত্তবাবুর দুটো হাতে তিনি হ্যান্ডকাফ এঁটে দিলেন। কনস্টেবলরা দত্তবাবুকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–রামভকত! দত্তবাবুকে একটু পরে নিয়ে যাবে। কর্নেলসায়েব! বলুন!
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–দত্তবাবু! আপনি পাঁচখালি এলাকার কালুখালিতে দশরথের কাছে অর্ডার দিয়ে একটা বেতের ছড়ি তৈরি করেছিলেন! অবিকল সুদর্শনবাবুর মতো ছড়ি।
দত্তবাবু বলার ভিতরে বললেন,–তাতে কী হয়েছে?
কর্নেল সবাইকে অবাক করে ভোঁদাকে বললেন,–ভোঁদা! তোমার থলে দাও!
ভোঁদা চটের থলেটা নিয়ে এল। কর্নেল থলেতে হাত ভরে যে জিনিসগুলো বের করলেন, তা একটা বেতের ছড়ির ভাঙাচোরা খানিকটা অংশ। শুধু ঘোরানো কালো রঙের বাঁটটা আস্ত আছে। কিছু অংশে মাটি লেগে আছে। বোঝা যায়, শুকনো কাদা।
কর্নেল হাসলেন। –এগুলো শ্রীমান ভেঁদার আবিষ্কার। দুর্গাপুজোর কিছুদিন আগে ভোঁদা সন্ধ্যার একটু আগে কনকপুর থেকে সেচবাংলোতে ফেরার সময় দুর থেকে দেখেছিল, দত্তবাবু জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তার মোটরসাইকেলে চেপে তার পাশ দিয়ে চলে গেলেন। এই ছেলেটা স্বভাবে খুব কৌতূহলী! ছোটবেলা থেকে সে সর্বচর। মঙ্গলবার ভোরে মর্নিংওয়াকে আমার সঙ্গে বেরিয়ে সে এই গোপন ঘটনাটা বলেছিল। তার সঙ্গে গিয়ে এগুলো একটা ঝোঁপের ভিতরে দেখতে পেলুম। তার ঢোলা প্যান্টের দুই পকেটে ভরে এগুলো তাকে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখতে বললুম। আমার মাথায় একটা থিয়োরি এসেছিল। তার সত্যতা যাচাই করতেই কালুখালিতে দশরথের কাছে গিয়েছিলুম। তার পর সিওর হয়েছিলুম।
সুদর্শনবাবু নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি ফুঁসে উঠলেন। তা হলে কিছুদিন ধরে আমার ছড়ির বদলে বাঞ্ছুদার ছড়িটা আমার ঘরের ব্র্যাকেটে ঝোলানো ছিল! ডিটেকটিভদ্রলোক ঠিক বলেছিলেন। সাপ মারার দিন কে দেখেছিল, দাদা আমার ঘর থেকে আমার ছড়িটা বের করে আনছিল! দাদা! এখনও বলছি, খুলে বলো! তুমিই ছড়ি বদল করেছিলে! হ্যাঁ-তুমি! তুমি! তুমি!
সুদর্শনবাবু দাপাদাপি জুড়ে দিলেন। ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি তাকে জোর করে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললেন,–চুপচাপ বসে থাকুন। চ্যাঁচামেচি পরে করবেন।
কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই! আপনার ব্যাগ থেকে এবার আপনার আবিষ্কৃত জিনিসগুলো বের করুন।
গোয়েন্দাপ্রবর তার ব্যাগের চেন খুলে খবরের কাগজের মোড়ক বের করলেন। তারপর তিনি মোড়ক খুললেন। দেখলুম, একগাদা আধপোড়া কাগজ। তিনি বললেন,–এগুলি আমি পাইছিলাম রায়বাবুগো পুকুরের পাড়ে। ঝোঁপের মইধ্যে লুকানো ছিল।
মিঃ ভাদুড়ি পরীক্ষা করে বললেন,–ছাপানো বইয়ের পাতা মনে হচ্ছে।
কর্নেল উঠে গিয়ে সেই রায়বাহাদুরের ছবির তলায় একটা আলমারির কাঁচের কপাট হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেললেন। তারপর বললেন,–হালদারমশাইয়ের কুড়িয়ে পাওয়া কাগজগুলো পরীক্ষা করে বুঝতে পেয়েছিলুম, আইনের বইয়ের পাতা। এ ঘরে ঢুকে দেখে নিয়েছি, এই দুটো প্রকাণ্ড বই লাইন থেকে একটু এগিয়ে ও পিছিয়ে আছে। অনেকদিন আগে রাখা বই আলমারির র্যাকে রাখলে ময়লার রেখা পড়বে। এই দুটো বই সেই রেখা মুখে দিয়েছে।
দুটো বই বগলদাবা করে তিনি টেবিলে রাখলেন। একটা বইয়ের ভিতরে চৌকো করে কাটা গভীর একটা অর্ধবৃত্তাকার অংশ বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু সেখানে কিছু নেই। কর্নেলকে চঞ্চল ও উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। তিনি দ্বিতীয় বইটা খুললেন। চৌকো গভীর গর্ত দেখা গেল। কিন্তু এটাতেও কিছু নেই।
মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–টেলড দিয়ে অনেক পরিশ্রম করে কাটা গুপ্তস্থান। কিন্তু শূন্য কেন?
কর্নেল বললেন,–এই বইটার মধ্যে মহালক্ষ্মীর হীরকখচিত সোনার মুকুট লুকানো ছিল। তাই এই বইয়ের গর্তটা অর্ধবৃত্তাকার। আর দ্বিতীয় বইটার মধ্যে মহালক্ষ্মীর জড়োয়া নেকলেস ছিল। এর গর্তটা চৌকো।
বলে কর্নেল ডাকলেন,–সুরঞ্জনবাবু!
সুরঞ্জনবাবু মুখ নামিয়ে বললেন,–বলুন!
–আপনি পুরোনো প্রকাণ্ড শাস্ত্রীয় পঞ্জিকার ভিতরের পাতা কেটে গর্ত করে নিজের চাবিদুটো লুকিয়ে রেখেছিলেন। ও. সি. মিঃ ভাদুড়িকে তা দেখিয়েছিলেন।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–আমারেও তা দ্যাখাইছেন উনি!
কর্নেল বললেন,–এ কাজে আপনার দক্ষতা আছে। কিন্তু আপনার কাকাবাবুর দুটি আইনের বইয়ের ভিতর লুকিয়ে রাখা দুটি জুয়েলস কোথায় গেল?
সুরঞ্জনবাবু ভাঙা গলায় বললেন,–আমি বুঝতে পারছি না। বিশ্বাস করুন! এ কী অদ্ভুত কাণ্ড।
সুদর্শনবাবু গর্জন করলেন,–নিজেরই চুরি করে লুকিয়ে রাখা জিনিস কোথায় গেল বুঝতে পারছ না? ন্যাকা? ও. সি. সায়েব! কর্নেলসায়েব! বাঞ্ছারাম দত্তের বাড়ি সার্চ করলেই মাল বেরিয়ে পড়বে। কাল বিকেলে ক্লাবে যাওয়ার সময় আমি দেখেছি, আমার মহাপুরুষ দাদা দত্ত-বাড়িতে চুপিচুপি ঢুকে গেল।
সুরঞ্জনবাবু মিনমিনে গলায় বললেন,–না-না! আমারও অবাক লাগছে, এ কাজ কে করল? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না।
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–তার মানে আপনি স্বীকার করছেন বইদুটোর মধ্যে মহালক্ষ্মীর মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস লুকিয়ে রেখেছিলেন?
সুরঞ্জনবাবু এবার দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলেন।–আমি পাপী। আমি মহাপাপী। ওই বাঞ্ছুর প্ররোচনায় আমি ফাঁদে পা দিয়েছিলুম।
এই সময় ভিতর থেকে এক ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর ঘরের ভিতরে চোখ বুলিয়ে সবাইকে দেখে নিয়ে বললেন, কী হয়েছে? এত কান্নাকাটি কীসের?
সুদর্শনবাবুও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন,বউদি! আমি কল্পনাও করিনি, আমার দাদা–
তাকে ভদ্রমহিলা ধমক দিলেন।–চুপ করো! দাদা-অন্তপ্রাণ একেবারে! তোমাকে সাবধান করে দিইনি, দত্তবাবু কেন দুবেলা রায়বাড়ি আসছে, খোঁজখবর নাও?
বুঝলুম, এই মহিলাই সুরঞ্জনবাবুর স্ত্রী শোভারানি। তিনি দত্তবাবুর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললেন,–বাঃ! বেশ মানিয়েছে এতদিনে। কত লোককে ফাঁদে ফেলে সর্বনাশ করে এবার নিজেই ফাঁদে পড়েছে বাঙুরাম। কই? কর্নেলসায়েব কোথায়?
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বললেন,–শোভাদেবী! আমি সব বুঝতে পেরেছি। চলুন। রায়বাড়ির গৃহদেবী মহালক্ষ্মীকে এবার আমরা গিয়ে দর্শন করি। হীরকখচিত সোনার মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস পরা ছবি আমি দেখেছি। এবার সেই প্রতিমাকে একই বেশে দেখতে পাব। মিঃ ভাদুড়ি! দত্তবাবুকে লক-আপে পাঠিয়ে দিন।
এই সময় হালদারমশাই খুব চাপাস্বরে কর্নেলকে বললেন,–আমারে হুমকি দেওয়া চিঠির হাতের লেখার সঙ্গে সুরঞ্জনবাবুর হাতের লেখার মিল দেখলাম।
কর্নেল হাসলেন।–হ্যাঁ, সেইজন্য এত কাণ্ড করতে হল।
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি এস. আই. রমেনবাবুকে নির্দেশ দিয়ে বললেন,–তপনবাবু! আমেদসায়েব! আপনারা এখানে থাকুন। আমরা আসছি। চলুন সুরঞ্জনবাবু! আপনার সম্পর্কে কী করা যায়, পরে ভেবে দেখা যাবে। সুদর্শনবাবু! আমার মনে হচ্ছে, এখনই আপনার ঘরে গিয়ে আপনার ছড়িটি পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
সুদর্শনবাবু সবার আগে হন্তদন্ত বেরিয়ে গেলেন।…
দোতলায় উঠে দেখি, সুদর্শনবাবু একহাতে তাঁর বেতের ছড়ি অন্য হাতে ছড়ির কালো বাঁট নিয়ে তেমনই হন্তদন্ত এগিয়ে আসছেন। তিনি হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন–আমার চাবি নেই! আমার চাবিদুটো চুরি গেছে।
শোভাদেবী ধমক দিলেন।–চুপ করো নান্টু! আর চাবি-চাবি কোরো না। তোমরা দুভাই জানো না। কিন্তু শৈলবালা সাক্ষী! মৃত্যুর আগের দিন শ্বশুরমশাই আমাকে দু-জোড়া চাবিই গোপনে দিতে চেয়েছিলেন। তখন আমার বয়স কম। সাহস করে চাবি রাখতে পারিনি। এবার থেকে আমার কাছে চাবি থাকবে।
সুরঞ্জনবাবু মিনমিনে গলায় বললেন,–আমার চাবিজোড়াও নিয়েছ তুমি?
চুপ! একটি কথাও নয়।–বলে তিনি কোমরের কাছ থেকে দুজোড়া চাবি বের করে সিঁড়ির পূর্বের ঘরের দরজা খুললেন। তারপর ভিতরে ঢুকে আলো জ্বেলে দিলেন। এঘরের কোনো জানলা নেই। দ্বিতীয় কোনো দরজাও নেই।
কনেমিঃ ভাদুড়ি এস. আহ.মর আসছি। চলুন সুরঞ্জনবাবু শুনার ঘরে গিয়ে দেখলুম আমাদের পিছনে ভোঁদাও উঠে এসেছে। চোখে চোখ পড়লে সে নিঃশব্দে হাসল।
শোভাদেবী দেওয়ালের মধ্যে বসানো আয়রনচেস্ট দুটো চাবির সাহায্যে খুললেন। তারপর মেঝেয় মাথা লুটিয়ে প্রণাম করে দুহাতে রুপোর চৌকো থালায় বসানো দেবী মহালক্ষ্মীকে বের করলেন। কষ্টিপাথরে তৈরি ছোট্ট প্রতিমার মাথায় রত্নখচিত মুকুট আর গলা থেকে হাঁটু অব্দি ঝোলানো জড়োয়া নেকলেস আলোয় ঝলমল করে উঠল।
সুরঞ্জনবাবু আর সুদর্শনবাবু মাথা লুটিয়ে প্রণাম করলেন। শোভাদেবী বললেন,–ও. সি. সায়েব, কর্নেলসায়েব। এবার আপনারা কী বলবেন, বলুন!
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি একটু হেসে বললেন, আপনার স্বামী রাজসাক্ষী হবেন! আর কী বলব? আপনার গোয়েন্দাগিরির কাছে হার না মেনে উপায় নেই। কী বলেন কর্নেলসায়েব? মিঃ হালদার?
কর্নেল চুপ করে থাকলেন। হালদারমশাই বললেন,–ঠিক কইছেন মিঃ ভাদুড়ি! এতদিনে বুঝলাম, ওনাগো ক্যান গৃহলক্ষ্মী কয়!
মিঃ ভাদুড়ি আমার দিকে ঘুরে বললেন-জয়ন্তবাবু! আপনি তো সাংবাদিক! আমার ধারণা, পুরো ঘটনাটি আপনি আপনাদের পত্রিকায় লিখবেন। তাই না?
কর্নেল সহাস্যে বললেন,–জয়ন্ত রোমহর্ষক গপ্পো লিখে ফেলবে। ওকে একটু সতর্ক করে দেওয়া উচিত।
বলে তিনি পিছনে ঘুরলেন। অ্যাই ভোঁদারাম! উঠে পড়ো বাবা! রায়বাড়ির মহালক্ষ্মী দেবী দর্শন করতে চেয়েছিলে। দর্শন হয়ে গেছে। আর কী?
ভোঁদা এতক্ষণ ধরে উপুড় হয়ে মেঝেয় মাথা ঠেকিয়ে ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে সে তেমনই নিঃশব্দে হাসল। সেই মুহূর্তে আমার মনে হল, প্রতিমার মূল্যবান রত্নরাজির চেয়ে একটি অনাথ, সরল ও নিষ্পাপ তরুণের এই হাসি অনেক বেশি উজ্জ্বল। অনেক বেশি মূল্যবান।…
