রাইকমল (উপন্যাস) – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

শেয়ার করুনঃ

দুই 

রঞ্জনের মা কমলিকে বড় ভালবাসিত। তাহার নাম দিয়াছিল-হাস্যময়ী। রঞ্জনকে দিতে গিয়া আধখানা মণ্ড ভাঙিয়া সে কমলির হাতে দিত। কিন্তু সেদিন রঞ্জন যখন কমলির এঁটো কুল খাইয়া বাড়ি ফিরিল, তখন সে বলিল, রাক্ষুসী রাক্ষুসী, মায়াবিনী গো, ওরা ছত্রিশ জেতে বোষ্টম–ওদের কাজই এই। মুড়োঝাঁটা মারি আমি হারামজাদীর মুখে।

 

কুল-খাওয়ার ঘটনাটা দৈবক্রমে খোদ মহেশ্বর মোড়লের-রঞ্জনের বাপের নজরে পড়িয়াছিল। মহেশ্বরের বলদটা অকারণে ছুটিয়া আসে নাই। গরু চরাইতে গিয়াছিল। সে এই কুলগাছটার পাশেই একটা জঙ্গলের আড়ালে। হঠাৎ ব্যাপারটা দেখিয়া অকারণে সে বলদটার পিঠে সজোরে পাঁচন লাঠির এক ঘা বসাইয়া দিয়াছিল। সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া ভয়ে সে শিহরিয়া উঠিল। তার স্ত্রীর নিকটে সমস্ত প্ৰকাশ না করিয়া পারিল না। রঞ্জনের মা গালে হাত দিয়া বিষম বিস্ময়ে লম্বা টানা সুরে বলিয়া উঠিল, ওগো মা, কোথায় যাব গো, জাত মান দুই গেল যে! রাক্ষসী হারামজাদী কি নচ্ছার গো, মুড়োঝাঁটা মার মুখে। আর সে হারামজাদা গেল কোথা? ধরে–গোবর খাওয়াও তুমি।

 

মহেশ্বর বাধা দিয়া বলিল, চুপ চুপ, চেঁচিয়ে গাঁগোল করিস না। জ্ঞাতিতে শুনলে টেনে ছাড়ানো দায় হবে, পতিত করবে। ধমক খাইয়া রঞ্জনের মা তখনকার মত চুপ করিল। কিন্তু রঞ্জন বাড়িতে পদার্পণ করিবামাত্র নাথ নাড়িয়া, ঘন ঘন ভুরু তুলিয়া সে বলিল, বলি, ওরে ও মুখপোড়া, তোর রকম কী বল দেখি?

 

রঞ্জনও সমানে তাল দিয়া বলিল, খেতে দাও বলছি। গাল খেয়ে পেট ভরবে না। আমার। গাল খেতে আসি নাই আমি।

 

ঝঙ্কার দিয়া মা বলিয়া উঠিল, দেব-ছাই দেব মুখে তোমার। কমলির এঁটো কুল খেয়ে পেট ভরে নাই তোমার, শরম-নাশা জাত-খেগো!

 

সাপের মাথায় যেন ঈশের মূল পড়িল। উদ্ধত রঞ্জনের রক্তচক্ষু নত হইয়া মাটির উপর নিবদ্ধ হইয়া গেল। মহেশ্বর মোড়ল আড়ালেই কোথায় ছিল। সে এবার সম্মুখে আসিয়া চাপা। গলায় গর্জন করিয়া বলিল, হয়ে মরলি না কেন তুই? মুখ হাসালি আমার তুই! জাত নাশ করলি!

 

রঞ্জন নীরব হইয়া রহিল। তাহার নীরবতায় বাপের রাগ অকারণে বাড়িয়া গেল, সে বলিল, চুপ করে আছিস যে? কথার জবাব দে।

 

কিছুক্ষণ পর আবার সে গৰ্জিয়া উঠিল, তবু কথার জবাব দেয় না। আচ্ছা, আমিও তেমন লোক নই, তা জান তুমি। ত্যাজ্যপুতুর করব আমি তোমাকে-বাড়ি থেকে দূর করে দোব। কিন্তু জাত আমি দোব না।

 

তারপর আদেশের সুরে বলিল, খবরদার, আর যাবে না। ওদের বাড়ি। মা-বিটীদের ক্রিসীমেনা মাড়াবে না। আর। এই বলে দিলাম তোকে–হ্যাঁ।

 

আস্ফালন করিয়া মহেশ্বর চলিয়া গেল। রঞ্জন নীরবে নত দৃষ্টিতে সেইখানেই বসিয়া রহিল।

 

ঘুরিয়া ফিরিয়া মা আসিয়া এবার সান্ত্বনা দিয়া বলিল, মাঘ মাসেই বিয়ে দেব তোর। এমন বউ আনিব, দেখবি কমলি কোথায় লাগে!

 

রঞ্জন নীরবেই বসিয়া রহিল। মুড়ি বাহির করতে করতে মা ঘর হইতে বলিল, বলে যে সেই—

 

বেঁচে থাকুক চূড়া বাঁশি

রাই হেন কত মিলবে দাসী।

 

সুন্দর মেয়ের আবার ভাবনা!

 

রঞ্জন বলিয়া উঠিল, না।

 

মায়ের হাতের কাজ বন্ধ হইয়া গেল। সবিস্ময়ে বলিল, কি না?

 

বিয়ে আমি করব না।

 

প্রবলতর বিস্ময়ে আশঙ্কায় মা প্রশ্ন করিয়া বলিল, কি করবি তবে?

 

রঞ্জন উঠিয়া পড়িল। আঙিনাটা অতিক্রম করিতে করিতে সে বলিয়া গেল, বোষ্টম হব আমি।

 

বিস্ময়ে হতবাক রঞ্জনের মা কিছুক্ষণ পর সংবিৎ পাইয়া ডাকিল স্বামীকে, ওগো মোড়ল, ও মোড়ল!

 

 

 

রঞ্জন আসিয়া উঠিল রসকুঞ্জে। রসিকদাসের আখড়ার ওই নাম। রসকুঞ্জ এ গ্রামের সকলেরই সুপরিচিত স্থান। ছেলেদের সেখানে মিলিত তামাক, বুড়োদের মিলিত গাঁজা। কাহারও মিলিত বিচিত্র আকারের বাঁশের হুঁকা, কাহারও বা সাপের মত আঁকাবাঁকা নল; কাহারও লতাবেষ্টনীর জোড়া ডালের ছড়ি-ঠিক যেন দুইটি সাপে পরস্পরকে জড়াইয়া আছে। এই রকম বহু উদ্ভট সুন্দর সামগ্ৰী আবিষ্কার কবিয়া রসিকদাস সকলের মনোরঞ্জন করিত।

 

সেদিন রসিকদাস স্নানের পর দাড়ির বিন্যাস করিতেছিল, কাঁচাপাকা দাড়ির মধ্যে আঙুল চালাইয়া ফাঁস ভাঙিতেছিল। রঞ্জন আসিয়া ডাকিল, মহান্ত!

 

রসিক বলিল, রাইকমল-রঞ্জন যে হে! এস এস।

 

রঞ্জনকে সে ওই নামে ডাকে। রঞ্জন অনেক কথা মনে মনে ফাঁদিয়া আসিয়াছিল। কিন্তু সব কেমন গোলমাল হইয়া গেল। যেটুকু মনে ছিল, সেটুকুও লজ্জায় বলিতে পারিল না।

 

রসিকদোসই প্রশ্ন করিল, কি, তামাক খেতে হবে নাকি? ভাত খেয়েছ?

 

রঞ্জন একটা সুযোগ পাইল, সে বলিল, না। তোমার এখানেই খাব।

 

মহান্ত রসিকতা করিয়া বলিল, জাত যাবে যে হে!

 

ফস করিয়া রঞ্জন বলিয়া ফেলিল, বোষ্টম হব আমি মহন্ত।

 

মহান্ত তাহার মুখের দিকে চাহিয়া ঈষৎ হাসিল। তারপর উপভোগের ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়িতে নাড়িতে গুনগুন করিয়া গান ধরিয়া দিল–

 

জাতি কুল মান সব ঘুচাইয়া চরণে হইনু দাসী

 

রঞ্জন লজ্জায় রাঙা হইয়া ঈষৎ বিরক্তিভরে কহিল, ধোৎ! ধান ভানতে শিবের গীত! তোমার হল কি মহান্ত?’

 

মৃদু হাসিতে হাসিতে মহান্ত ঘাড়ু নাড়িয়া বলিল, রসিকের রস এসেছে।

 

আরও বিরক্ত হইয়া রঞ্জন বলিল, তা তুমি কি বলছি বল? আমাকে ভেক দেবে তুমি?

 

নির্বিকারভাবে রসিকদাস বলিল, রাইকমল বলে তো দোব।

 

রুষ্ট হইয়া রঞ্জন বলিল, কেন? কমলি কি তোমার হাকিম নাকি?

 

হাসিতে হাসিতে ঘাড় নাড়িয়া রসিক বলিল, হুঁ।

 

তবু যদি বগ-বাবাজী না বলত সে! রঞ্জন ক্রোধাভরে উঠিয়া পড়িল।

 

রসিকদাস তখনও তেমনই হাসিতেছিল, সে কথা কহিল না। রঞ্জন বলিল, বেশ, চললাম আমি তারই কাছে।

 

রসিকদাস গুনগুন করিতে করিতে দাড়িতে বিনুনি পাকাইতে আরম্ভ করিল।

 

 

 

কমলি তখন আখড়ায় জোড়া-লতার ছায়াতলে বসিয়া সেই কুলগুলি বাছিতেছিল, মাঝে মাঝে রঞ্জনকে প্রতারণা করার কৌতুক স্মরণ করিয়া আপনার মনেই সে হাসিয়া উঠিতেছিল। ও-পাড়ার ভোলা আসিয়া কমলির নিকটে বসিয়া বলিল, কমলি!

 

স্বরখানি তরঙ্গায়িত করিয়া অনাবশ্যক দীর্ঘ উচ্চারণে কমলি উত্তর দিল, কি!

 

ভোলা বলিল; এই এলাম। একবার।

 

নিষ্ঠুর ব্যঙ্গে ভোলার স্বরভঙ্গি অনুকরণ করিয়া কমলি বলিল, বেশ যাও একবার। সে ব্যঙ্গে ভোলা এতটুকু হইয়া গেল। হাঁটু দুইটি জড়াইয়া ধরিয়া সে নীরবে বসিয়া রহিল। কমলিও কুল বাছা রাখিয়া ভোলার ভঙ্গি অনুকরণ করিয়া বসিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। তারপর বলিল, বীদরের মত বসলি যে উপু হয়েঃ ভোলার লজ্জার আর পরিসীমা ছিল না। সে পলায়নের অজুহাত খুঁজতেছিল। কমলি বলিল, আমার কুলগুলো বেছে দে না ভাই। আমি একটু বসি।

 

ভোলা হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল। সে তাড়াতাড়ি কুল বাছিতে বসিল।

 

বিচিত্র খেয়ালী চপলা মেয়েটি অকস্মাৎ দুলিয়া দুলিয়া আরম্ভ করিল–

 

এক যে ছিল রাজা তিনি খান খাজা

তার যে রানী তিনি খান ফেনী

তাঁর যে পুত হাবাগোবা ভূত

মুখে খায় সার গালে খায়—

 

সঙ্গে সঙ্গে সে বাঁ হাতে চড় উঠাঁইয়াছিল। কিন্তু ভোলা চট করিয়া তাহার হাতখানা ধরিয়া ফেলিল। কমলির কলকণ্ঠে ধ্বনিত হইয়া উঠিল জলতরঙ্গের মত হাসি।

 

ভোলা বলিল, কমলি! স্বর তাহার কাঁপিতেছিল।

 

হাতখানি আকর্ষণ করিয়া কমলি বলিল, ছাড় ভোলা, ছাড়ি বলছি।

 

ভোলা বলিল, না।

 

কমলি মুক্ত ডান হাতে এক মুঠ কুল লইয়া ভোলার মুখের উপর ছুড়িয়া মারিয়া বসিল। পাকা কুলগুলি ছিতরাইয়া চটচটে শীসে ভোলার মুখখানা ভরিয়া গেল। কমলির হাত ছাড়িয়া ভোলা মুখ মুছিতে ব্যস্ত হইয়া পড়িল। কমলি সেই হাসি হাসিয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িতেছিল।

 

ঠিক এই সময়টিতেই বাহির হইতে ডাক আসিল, চিনি!

 

ভোলা দুর্বল মানুষ, সে রঞ্জনকে বড় ভয় করিত। ডাক শুনিয়া সে চমকাইয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি উঠিয়া সে বাহিরের দিকে ছুটিল। প্রবল কৌতুকে উচ্ছলা কমলি তাহাকে ডাকিল, যাস না ভোলা, যাস না। ভয় কিসের রে?—বলিতে বলিতে সে বাহিরের দরজায় আসিয়া দেখিল, এ মুখে পলাইতেছে ভোলা, বিপরীত মুখে দ্রুতগমনে চলিয়াছে রঞ্জন!

 

কমলি ডাকিল, লঙ্কা, লঙ্কা হে!

 

রঞ্জন উত্তর দিল না, একবার ফিরিয়া চাহিল না পর্যন্ত।

 

কমলি বুঝিল, রঞ্জন রাগ করিয়াছে, ভোলার সঙ্গে কথা বলিলেই রঞ্জনের মুখ ভার হয়, আজ তো ভোলার সঙ্গে বসিয়া সে হাসিতেছিল। কিন্তু এতটাও তাহার সহ্য হইল না। ভোলাকে ধরিয়া দু-ঘা দিলেই তো হইত! তা না, উলটা রাগ করিয়া যাওয়া হইতেছে! সে উচ্চকণ্ঠে বলিল, আচ্ছা-আচ্ছা এই হল। মনে থাকে যেন।

 

বলিয়াই সে ফিরিল; দুই পা ফিরিয়াই আবার সে দরজার মুখে আগাইয়া আসিয়া বলিল, আমি কারও কেনা বাঁদী নই।

 

বলিয়াই সে এদিকে মুখ ফিরাইয়া ভোলাকে ডাকিল, ভোলা, ভোলা! কিন্তু পথের বাঁকের অন্তরালে ভোলা তখন অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। আখড়ার মধ্যে ফিরিয়া কমলি আবার কুল বাছা শুরু করিল। একটা কুল হাতে লইয়া সে আপন মনেই বলিয়া গেল, ও-রে! চলে গেলিগেলিই। আমার তাতে বয়েই গেল। একেই বলে, আলুনো রাগ। তা রাগ করলি-করলি, নিজের ঘরে ভাত বেশি করে খাবি।

 

সে হাসিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু হাসির বদলে চোখে আসিল জল। অভিমানভরে সে পটাপট করিয়া কুলের বোঁটা ছাড়াইয়া চলিল।

 

কতক্ষণ পর কে জানে, কমলির হুঁশ ছিল না।

 

কামিনী ভিক্ষ হইতে ফিরিয়া চারিদিকে একবার দৃষ্টি বুলাইয়া লইয়া তিক্তস্বরে ভর্ৎসনা করিয়া কমলিকে বলিল, ও-মাগো! এখনও উনোনের মুখে কাঠ পড়ে নাই, জলের কলসি ঢনচন করছে! একি? বলি, হ্যাঁ লো কমলি, তোর রীতকরণের রকম কি বল দেখি?

 

কমলি অকারণে বিদ্রোহ করিয়া উঠিল, ঝঙ্কার দিয়া সে বলিল, পারব না, আমি পারব না; খেতে না হয় নাই দেবে।—বলিতে বলিতে সে কাঁদিয়া ফেলিল, বলিল, শুধুই বকুনি, শুধুই বকুনি। যার তার রাগ আমার ওপর। কেন, আমি কার কি করেছি!

 

কামিনী আশ্চর্য হইয়া গেল। সে তো এমন কিছু বলে নাই। তবু আদরিণী মেয়েটির কান্না তাহার সহ্য হইল না। মেয়ের পিঠে সস্নেহে হাত বুলাইয়া দিয়া সে বলিল, কিছু তো বলি নাই আমি তোকে মা। বলেছি, বুড়ো মানুষ তেতে-পুড়ে এলাম, এখন জল আনা, কাঠ যোগাড় করা–

 

চোখের জল চোখে তখনও ছলছল করিতেছিল, কমলির মুখে অমনিই হাসি দেখা দিল। বোধহয় খানিকটা লজ্জাও পাইল। তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছিয়া শূন্য কলসিটা কাঁখে তুলিয়া বলিল, জল নিয়ে আসি আমি-এলাম বলে।

 

মা হাসিল। ফুলের ঘা সয় না। তাহার কমলের!

 

কমলি চলিয়া যাইতেই আসিয়া প্ৰবেশ করিল মহেশ্বর মোড়ল–রঞ্জনের বাপ, সে যেন এই অবসরটুকুর প্রতীক্ষ্ণতেই কোথাও দাঁড়াইয়া ছিল। একেবারেই সে কামিনীর হাত দুইটি জড়াইয়া ধরিয়া একান্ত কাকুতিভরে বলিল, কামিনী, তোরও সন্তান আছে। আমার ওই একমাত্র সন্তান। আমার সন্তান আমাকে ফিরে দে কামিনী। তোর ভাল হবে।

 

সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিয়া সজল চক্ষে মহেশ্বর বলিল, বাড়ি থেকে সে পালিয়ে এসেছে। তার মাকে বলে এসেছে, বোষ্টম হবে।

 

কামিনী সমস্ত শুনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তারপর বলিল, এতদূর তো ভাবি নাই আমি মোড়ল। কিন্তু এখন ছাড়াছাড়ি করলে কি মেয়েরই আমার সুখ হবে? আমাকে কি মা হয়ে সন্তানের বুকে শেল হানতে বল তুমি?

 

মহেশ্বর বলিল, টাকা দেব আমি, তোমার মেয়েকে কিছু জমি লিখে দোব আমি কামিনী।

 

বাধা দিয়া কামিনী বলিল, ছি, আমার মেয়ের কি ইজ্জত নাই মোড়ল?

 

মোড়ল বলিয়া উঠিল, রাম রাম রাম! সে বললে জিভ খসে পড়বে আমার। কিন্তু ভেবে দেখা কামিনী, সন্তান তো আমারও। ওই একটি সন্তান।

 

একটু চিন্তা করিয়া কামিনী বলিল, যাও মোড়ল, আমি কমলিকে নিয়ে গা থেকে চলে যাব। তুমি তোমার ছেলেকে বাগিয়ে নিও।

 

বিষণ্ণভাবে মহেশ্বর বলিল, গাঁ থেকে চলে যেতে তো বলি নাই, কামিনী!

 

কামিনী বলিল, না। মেয়ের চোখের উপর রঞ্জনকে আমি রাখব না মোড়ল। আমি ভিখারি, কিন্তু মেয়ে তো আমার কম আদরের নয়। আর বেষ্টিম জাত, পথই তো আমাদের ঘর গো।

 

সহসা বাহিরে বেড়ার ধারে কি একটা শব্দ হইল। কি যেন সশব্দে পড়িয়া গেল। কামিনী ছুটিয়া বাহিরে আসিতে আসিতে বলিতেছিল, কে? কমলি?

 

সত্যই কমলি বেড়ার পাশে সিক্তবস্ত্রে দাঁড়াইয়া কাঁপিতেছিল। তাহার কাঁখের জলভরা মাটির কলসিটা পড়িয়া ভাঙিয়া গিয়াছে।

 

মহেশ্বর ক্রস্তপদে অপরাধীর মতই যেন পলাইয়া গেল। স্নেহ কোমল স্বরে কামিনী বলিল, কলসিটা ভেঙে গেল! যাক। আয়, ভিজে কাপড় ছেড়ে ফেলে।

 

কমলি হাসিয়া বলিল, না, জল আনি।

 

মা মেয়ের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, মেয়েটি তাহার সেই মেয়ে কমলিই বটে, কিন্তু হাসিটি তো তাহার নয়! কমলির মুখে এ হাসি তো সাজে না। কামিনীর বুকের ভিতরটা কেমন করিয়া উঠিল।

 

কমলি ঘাটের দিকে ফিরিয়াছিল, কামিনী বলিল, না।

 

এলাম বলে।

 

দাঁড়া। আমিও যাব। একটা ঘড়া লইয়া কামিনী বাহির হইয়া আসিল। পুকুরে অগাধ জল। কমলির অভিমান তার চেয়েও বেশি।

 

পথে যাইতে যাইতে কমলি বলিল, মা!

 

কি রে? সেই ভাল মা, চল, আমরা এখান থেকে চলে যাই।

 

কামিনী চমকিয়া উঠিল। কমলি কথাটা শুনিয়াছে। কিন্তু কথার উত্তর দিতে পারিল না। তখন তাহার চোখের কোণে রুদ্ধ অশ্রুর বান ডাকিয়াছে।

 

কমলি বলিল, রাসে নবদ্বীপে মেলা হয়। চল মা, তার আগেই আমরা চলে যাই। সন্তান হারানোর অনেক দুঃখ মা। নন্দরানীর দুঃখের কথা ভেবে দেখ।

 

কামিনী অবাক হইয়া গেল। কমলির দিকে চাহিয়া তাহার মনে হইল, কমলি যেন অকস্মাৎ কত বড় হইয়া উঠিয়াছে! মনে হইল, সে যেন তাহার সখীর সঙ্গে কথা বলিতেছে। সেও সব ভুলিয়া এই মুহূর্তটিতে অন্তরঙ্গ সখীর মতই প্রশ্ন করিয়া বসিল, তোর কি খুব কষ্ট হবে কমলি?

 

হাসিয়া কমলি বলিল, দূর!

 

মা বলিল, লজ্জা করিস না মা।

 

ধীরভাবে কমলি বলিল, না।

 

জল লইয়া ফিরিবার পথে কামিনী বলিল, নবদ্বীপে চাদের মত চাদ খুঁজে তোর বিয়ে দোব। আমি। সে যেন এতক্ষণে মনের মত শোধ তুলিবার উপায় পাইয়াছে।

 

ঘরে কলসি নামাইয়াই চটুল চঞ্চল গতিতে কমলি বাহিরের পথ ধরিল। মা বলিল, কোথায় যাবি আবার?

 

নবদ্বীপ যেতে হবে, বলে আসি বিগ-বাবাজীকে।-বলিয়া সহজভাবেই সে খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। ”

 

কামিনী। কিন্তু ওই হাসিতে সান্ত্বনা পাইল না। মেয়ে চলিয়া যাইতেই সে কাঁদিল বার বার চোখের জল মুছিল।

 

অন্যায় তাহারই। তাহারই সাবধান হওয়া উচিত ছিল। মেয়েকে এমনভাবে রঞ্জনের সঙ্গে মাখামাখি করিতে দেওয়া উচিত হয় নাই। এতটা সে ভাবে নাই; কিন্তু ভাবা উচিত ছিল। দুইটি কিশোর আর কিশোরী। বিচিত্র এর রীতি। কেমন করিয়া যে কোথায় বাঁধন পড়ে! পরান। ছাড়িলেও এ বাঁধন ছেড়ে না!

 

কমলি বাহির হইতে ডাকিল, মা, এই নাও, বললে বিশ্বাস করে না। তুমি বল, তবে হবে। কমলি বগ-বাবাজীকে লইয়া হাজির করিয়াছে।

 

কামিনী বলিল, বোসো মহান্ত, বোসো। কথা আছে, শোন। কমলি, যা তো মা, তোর ননদিনীর বাড়ি থেকে খানিকটা নুন নিয়ে আয় তো।

 

কমলিনী মাথা নাড়িয়া বলিল, ওই তো ঘরে সের দরুনে নুন রয়েছে।

 

তুই যা না, ওতে হবে না।

 

ওতে না হলে মণি দরুনে নুনেও তোমার মরণ হবে না। আমি পারব না।

 

যাও না মা, একটুখানি বেড়িয়েই এস না হয়। মায়ের কথা শুনলে বুঝি পাপ হয়?

 

এবার কমল হাসিয়া বলিল, আমার সামনেই বলতে পারতে মা। কমল তোমার শুকোত না। বেশ, আমি যাচ্ছি।

 

সে চলিল ননদিনীর বাড়ি। ননদিনী কাদু পাড়ার মোড়লদের মেয়ে, কমলির খেলাঘরের পাতানো সই ননদিনী। কাদু বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান, আদরে বর্ষার দাদুরীর মত সে মুখরা। হয়ত ভুল হইল, শুধু মুখরা বলিলে কাদুর প্রশংসা করা হয়। মেয়েটি মুখরার উপরে অপ্রিয়সত্যভাষিণী। লোকে বলে, নবজাত কাদুর মুখে তাহার মা নাকি মধুর প্রলেপ দিতে ভুলিয়াছিল। পাড়ার লোকে কাদুকে ‘সাত কুঁদুলী’র মধ্যে আসন দিয়াছে। ঘরে বসিয়া অনেকে তাহার মাথা খায়। ননদিনী পাতানো কমলিনীর সার্থক হইয়াছে। কাদুর ইহারই মধ্যে বিবাহ হইয়া গিয়াছে। গরিবের ছেলে দেখিয়া বিবাহ দিয়া তাহার বাপ জামাইকে ঘরেই রাখিয়াছে।

 

পথ হইতেই কাদুর গলা শোনা যাইতেছিল, ও মাগো! একেই বলে—যার ধন তার ধন নয়, নেপোয় মারে দই! আমি পান খাই, আমার বাপের পয়সায় খাই! তাতে তোমার চোখ টাটায় কেন বল তো?

 

কমলিনী বুঝিল, এ কোন্দল হইতেছে। কাদুর স্বামীর সঙ্গে। মা-বাপের অনুপস্থিতির সুযোগ পাইলেই পনের বছরের কাদু প্ৰবীণা গিন্নির মত কোমর বাঁধিয়া স্বামীর সঙ্গে কোন্দল জুড়িয়া দেয়। সে দুয়ারে ঢুকিয়াই গান ধরিয়া সাড়া দিল–

 

ননদিনীর কথাগুলি নিমে গিমে মালা

কালসাপিনীর জিহ্বা যেন বিষে আঁকাবাঁকা।

ও আমার দারুণ নানদিনী—

 

কাদু কোন্দল ছাড়িয়া শিথিল শব্দে হাসিয়া উঠিল। কমল বলল, কুঞ্জে প্রবেশ করতে পারি কুঞ্জশ্বরি?

 

কাদু বলিল, মর মর মর, ঢঙ দেখে আর বাঁচি না। আয় আয়।

 

তারপর তীব্রম্বরে স্বামীকে বলিল, ভারি বেহায়া তুমি। যাও না বাইরে। বউ এসেছে।

 

কমল প্রবেশ করিয়া বলিল, আহা, থাকুকই না বেচারি, যুগল দেখে চোখ সার্থক করি।

 

কাদু হাসিয়া কহিল, হ্যাঁ, এক হাতে কোদাল আর হাতে কাস্তে নিয়ে শ্যামকে মানাবে ভাল। বোস বোস ভাই। দিনরাত ব্যাজব্যাজ করছে, মালাম আমি। দাঁড়া, আমি পান নিয়ে আসি। দোক্তা নিবি, দোক্তা?

 

পান-দোক্তা মুখে পুরিয়া কমল বলিল, বিদায় নিতে এলাম ননদিনী।

 

সে কি? রাসে কোথাও যাবি বুঝি?

 

নবদ্বীপ।

 

কবে ফিরবি?

 

কমলিনীর চোখ সজল হইয়া উঠিল। সে স্নানকণ্ঠে বলিল, আর ফিরব না ভাই কাদু।

 

কাদু বলিয়া উঠিল, সে কি? কি বলছিস তুই বউ, আমি যে বুঝতে পারছি না।

 

অবরুদ্ধ ক্ৰন্দনে কমলিনীর ঠোঁট দুইটি থরথর করিয়া শুধু কাঁপিয়া উঠিল। কোনো কথা তাহার ফুটিল না।

 

তাহার হাত দুইটি চাপিয়া ধরিয়া কাদু বলিল, কি হয়েছে ভাই বউ? আমাকে বলবি না?

 

ধীরে ধীরে সমস্ত কথা বলিয়া কমলিনী বলিল, এত সব কথা তো কোনোদিন ভাবি নাই ভাই কাদু। কিন্তু আজ–

 

কথা সে শেষ করিতে পারিল না। আবার তাহার ঠোঁট দুইটি থারথার করিয়া কাঁপয়া উঠিল।

 

কাদু যেন অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিল। সে নীরবে বসিয়া রহিল। একটু পরে কমলিনী মৃদু। হাসিয়া বলিল, সে বলেছে, সে বিয়ে করবে না, জাত দেবে। তা ভাই, মা-বাপের ছেলে মা-বাপের থাক। আমরা এখান থেকে চলে যাই।

 

কাদু বলিয়া উঠিল, তা মোড়লও কেন বোষ্টম হোক না। বোষ্টম কি ছোট জাতি নাকি? না, তারা মানুষ নয়? আমি বলব রঞ্জনদার বাবাকে, আমি ছাড়ব না। ভারি তো, ওঃ।

 

কমলিনী বলিল, না। বার বার সে ঘাড় নাড়িল-না।

 

কাঁদু একটু চিন্তা করিয়া বলিল, এক কাজ কর বউ। হোক না রঞ্জনদাদা বোষ্টম। তখন ছেলের টানে–

 

বাধা দিয়া কমলিনী বলিল, ছি!

 

কাদু নীরবে নতমুখে বসিয়া রহিল। চোখ তাহার ছলছল করিতেছিল। কমল অকস্মাৎ হাসিয়া উঠিল, কাদুকে ঠেলা দিয়া বলিয়া উঠিল, ও মা, এ যে নতুন কাণ্ড! বউয়ের শোকে ননন্দ কীদে, মাছের মায়ের কান্না! শোন শোন ভাই, একখানা গান শোন!

 

মৃদুস্বরে সে গান ধরিল–

 

ও আমার দারুণ নানদিনী ও তুই পরম সন্ধানী

যেথায় যাব সেথায় যাবি লাগাইবি লেঠা

ছাড়ালে না ছাড়ে যেন শেয়াকুলের কাঁটা।

 

গানের অর্ধপথে কাঁদু তাহার হাত ধরিয়া বলিল, আর দেখা হবে না ভাই বউ?

 

হাসিয়া কমল বলিল, কেন হবে না? এই তো নবদ্বীপ। নন্দাইকে নিয়ে চলে যাবি-কেমন? কাদু বলিল, তিন বার করে যাব আমি বছরে–রাসে, দোলে, ঝুলনে। আজ কিন্তু তোর কাছে শোব ভাই রাত্রে।

 

কমলিনী হাসিয়া বলিল, নন্দাই?

 

কাদু বলিল, মর।

 

কমল তাহার চিবুকে হাত দিয়া আদর করিয়া বলিল, মরব। কিন্তু ‘সখি, না পুড়ায়ো রাধা অঙ্গ, না ভাসায়ো জলে–’

 

কাদু তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া, হাত দিয়া মুখ বন্ধ করিয়া দিল, না না। ও গান তুই গাস না। না।

 

আখড়াতে যখন সে ফিরিল, রসিকদাস তখনও বসিয়া ছিল। কমলকে দেখিয়া সে গান বাঁধিয়াছিল–

 

গোরার সেরা গোরাচান্দ চল দেখে আসি সখি!

 

কমল মৃদু হাসিয়া বলিল, গান ভাল লাগছে না বগ-বাবাজী।

 

রসিকও মৃদু হাসিল। বলিল, তাই তা হলে হবে রাইয়ের মা। চলে চল যত শিগগির হয়। রা বোষ্টম, আমাদের প্রভুর চরণতলই ভাল।

 

রাস্তায় বাহির হইয়া সে চলিতে চলিতে আবার গান ধরিল–

 

মথুরাতে থাকলে সুখে আসতে তারে বলিস নে গো।

তাতে মরণ হয় যদি মোর সুখের মরণ জানিস সে গো।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *