রাত তখন তিনটে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

আট

হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম বারোটা বাজে। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজগুলো বেশ তাড়াতাড়িই মিটে গেছে, কী বলেন? মোটামুটি একটা নাগাদ মহেশমুণ্ডায় ফিরতে পারব!’

 

ভোর ছ’টাতেই মহেশমুণ্ডার চৌধুরিবাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলুম। তখন থেকে গত ছ’ঘন্টার মধ্যে যা-যা ঘটেছে তার একটা রেজিউমে অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত বিবরণী এখানে দিয়ে রাখি। গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে দেউড়ি পর্যন্ত হেঁটে আসতে হয়। সেখানে ফিয়াট গাড়ির পাশে যে-লোকটি দাঁড়িয়ে ছিল, আমাদের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিয়ে সে বলে, রাজাবাবু কাল রাত্তিরেই গাড়িটা গারাজ থেকে বার করে রেখে গিয়েছেন।

 

গাড়ি নিয়ে গিরিডিতে আসতে-আসতে সাড়ে ছটা বাজে। প্রথমে যাই গৌতমদের বাড়িতে। এখানে এস.পি.-র কোয়ার্টার্স কোন দিকে, তার কাছে সেটা জেনে নেওয়া হয়। ভাদুড়িমশাই বলেন, এস.পি.কে একটা ফোন করে জানিয়ে দাও যে, এখুনি আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। …ও কী, হাঁ করে তাকিয়ে রইলে কেন? ভাবছ তিনি আমাকে চেনেন কি না? অফ কোর্স হি নোজ মি।”

 

গিরিডির সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব পুলিশ সুরেশ প্রসাদের কোয়ার্টার্সে পৌঁছই সাতটা নাগাদ। মনে হল আমাদের জন্যেই তিনি অপেক্ষা করছিলেন। গাড়ি গিয়ে তাঁর বাংলোর কম্পাউন্ডে ঢুকতেই হন্তদন্ত হয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এসে বললেন, “আরে আসুন আসুন, মিস্টার ভাদুড়ি। ডাক্তারবাবু এইমাত্র ফোন করেছিলেন।”

 

গাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা তাঁর ড্রইংরুমে গিয়ে ঢুকলুম। সুরেশ প্রসাদের বয়স তিরিশ বত্রিশের বেশি হবে না। হাসিখুশি আই. পি. এস. অফিসার। বেয়ারাকে ডেকে চায়ের অর্ডার দিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তারপর…কী ব্যাপার? গিরিডিতে কবে এলেন? দরকারটাই বা কী পড়ল?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পরশু এসেছি। এখন একটা ব্যাপারে তোমার সাহায্য চাই।”

 

“ওরে বাপ রে,” মিঃ প্রসাদ হেসে বললেন, “পিতাজির কাছে আপনার কথা যা শুনেছি, তাতে বলতে পারি, আপনার মতন সরিফ আদমির জন্যে কুছু করতে পারাটা একটা মস্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমার যদি ক্ষমতা থাকে তো নিশ্চয় মদত করব।”

 

“এখান থেকে যে রাস্তাটা ধানবাদের দিকে চলে গেছে, তাতে পরেশনাথ পাহাড়ের কাছাকাছি এলাকায় গত চার মাসের মধ্যে যে-কটা কার-অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, তার একটা হিসেব চাই।… না না, সব অ্যাকসিডেন্টের খবর আমি চাইছি না, শুধু সেই রকমের অ্যাকসিডেন্টের কথা জানতে চাইছি, যাতে একটা প্রাইভেট কার ইনভল্ড।”

 

“সময়টাকে আর-একটু কমিয়ে আনতে পারেন না? ওখানে আমাদের যে ফাঁড়ি রয়েছে, তাতে কাজের লোক তো বেশি নেই। চার মাসের হিসাব দিতে তাদের দম নিকলে যাবে।”

 

“অল রাইট,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “লেট্স ন্যারো ইট ডাউন টু জাস্ট টু মানথস, অগস্ট অ্যান্ড সেপ্টেম্বর।”

 

চা এসে গিয়েছিল। সুরেশ প্রসাদ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “খবরটা আপনি কখন চান?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ফাঁড়িতে টেলিফোন আছে?”

 

“তা আছে, কিন্তু রাইট নাউ দ্যাট লাইন ইজ আউট অব অর্ডার। লোক পাঠিয়ে খবর আনতে হবে।”

 

“তার দরকার হবে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি নিজেই সেখানে যাচ্ছি। তুমি শুধু ফাঁড়িতে যিনি চার্জে আছেন, তাঁকে একটা চিঠি লিখে দাও। তাতে বলে দেবে যে, ওই দু’মাসের রেকর্ড যেন আমাকে দেখতে দেওয়া হয়।”

 

মিঃ প্রসাদ তক্ষুনি চিঠি লিখে দেন। চিঠি নিয়ে আমরা যখন গাড়িতে উঠছি, তখন বলেন, “কী ব্যাপার বলুন তো? কোনও ইনস্যুরেন্স ক্লেম?”

 

গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন সে-সব কিছু জানি না। তবে মনে হচ্ছে, শিগগিরই হয়তো আবার তোমার সাহায্য চাইতে হবে। দেবে তো?”

 

মিঃ প্রসাদ হেসে বললেন, “উইথ প্লেজার।”

 

গিরিডি শহরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে আমাদের ফিয়াট ছুটল পরেশনাথের পাহাড়ের দিকে। একটা কথা এখানে বলা দরকার। এস.পি.-র কোয়ার্টার্সে যে চা খেলুম, তাতে দুধ চিনি মেশানো ছিল। সদানন্দবাবু কিন্তু অম্লানবদনে সেই চা গলাধঃকরণ করেছেন। সম্ভবত পুলিশ সাহেবের বাড়ি বলেই এ নিয়ে কোনও আপত্তি তোলেননি। এমনিতে তো মাথা কুটেও তাঁকে হালকা লিকার ছাড়া আর কিছু খাওয়ানো যায় না।

 

গিরিডিতে আগে শহরের সীমানা ছাড়ালেই শালজঙ্গল শুরু হয়ে যেত। সে-সব দিন আর নেই। গিরিডি এখন জেলা-শহর। ফলে একদিকে যেমন তার গুরুত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে তেমন বেড়েছে তার লোকসংখ্যা আর আয়তন। সেই সঙ্গে বিস্তর শালজঙ্গলও যে লোপাট হয়ে গেছে, সে তো দেখতেই পাচ্ছি।

 

পরেশনাথ পাহাড়ের কাছে রাস্তাটা যেখানে ডাইনে বেঁকে ধানবাদের দিকে চলে গেছে, সেখানে পৌঁছতে খুব-একটা সময় লাগল না। পুলিশ ফাঁড়িটাও দেখতে পাওয়া গেল। ফাঁড়ির সামনে যে-লোকটি রাইফেল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, প্রথমে সে আমাদের বিশেষ পাত্তা দেয়নি বটে, কিন্তু আমরা যে এস.পি. সাহেবের বাংলো থেকে তাঁর চিঠি নিয়ে এখানে এসেছি, এ-কথা বলবার সঙ্গে- সঙ্গেই দেখলুম, তার মুখের চেহারা একেবারে পালটে গেছ। লম্বা একটা সেলাম ঠুকে তৎক্ষণাৎ সে আমাদের ফাঁড়ির মধ্যে নিয়ে যায়।

 

ফাঁড়ির যিনি চার্জে ছিলেন, এস.পি.-র চিঠি পড়ে তিনি নড়েচড়ে বসেন। একজন লোককে ডেকে অগস্ট আর সেপ্টেম্বরের ডায়েরি-বই আনবার ফরমাস দিয়ে বলেন, “আপনারা চা খাবেন তো?” সদানন্দবাবু ইতিমধ্যে তাঁরা ব্যক্তিত্ব অনেকটাই ফিরে পেয়েছিলেন। তাই তিনি আর চা খেতে রাজি হন না।

 

ডায়েরি-বুক প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই এসে যায়। তাতে দেখা যায়, ওই দু’মাসের মধ্যে কাছাকাছি এলাকায় যাতে প্রাইভেট কার ইনভল্ড ছিল, এমন রোড অ্যাকসিডেন্টের সংখ্যা মোট বাইশটি। গাড়ির নম্বর আর ওনারের নাম তো রেকর্ড করা আছেই, অ্যাকসিডেন্টে যারা নিহত কিংবা আহত, তাদের নামও সেখানে লেখা রয়েছে দেখলুম। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার এই যে, কোনও গাড়িরই ওনার হিসেবে রামাশ্রয় চৌধুরির নাম সেখানে নেই। আহত ব্যক্তিদের তালিকার মধ্যে রঘুনন্দন চৌধুরির নামও সেখানে খুঁজে পাওয়া গেল না।

 

পুলিশ অফিসারটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা বাইরে চলে এলুম। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “রঘুনন্দনের নাম যে ওখানে পাওয়া যাবে না, সে আমি কাল রাত্তিরেই বুঝতে পেরেছিলুম।”

 

জিজ্ঞেস করলুম, “কী করে বুঝলেন?”

 

“কেন, আপনি কিছু বুঝতে পারেননি?”

 

“কই, না তো।”

 

“কী করে পারবেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বয়েস বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ল্যাজারুস হয়ে যাচ্ছেন যে। চোখ-কান তাই আর সেই আগের মতো খোলা রাখতে পারছেন না।”

 

এর পরে আর কী বলা যায়। চুপ করে যেতে হল।

 

ফিরতি পথে প্রথমে যাই এস. পি. সুরেশ প্রসাদের বাড়িতে। মিঃ প্রসাদ বললেন, “কাজ হল?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “খোদ পুলিশ সাহেবের চিঠি নিয়ে গিয়েছি, কাজ না হয়ে পারে? খুব উপকার হল, সুরেশ। কিন্তু যা বলেছি, সেটা মনে রেখো। খুব শিগগিরই আবার হয়তো তোমার সাহায্য নিতে হবে।”

 

মিঃ প্রসাদ বললেন, “সে তো আমার মস্ত সৌভাগ্য। যখন যা দরকার হয় বলবেন। এখানে উঠেছেন কোথায়?”

 

“পরশু এখানকার একটা গেস্ট হাউসে এসে উঠেছিলুম। কাল বিকেল থেকে মহেশমুণ্ডায় আছি।”

 

“মহেশমুণ্ডায় আবার কোথায় উঠলেন?”

 

“রামাশ্রয় চৌধুরির বাড়িতে। ভদ্রলোককে চেনো?”

 

নামটা শুনে মিঃ প্রসাদের ডান চোখের ভুরু একটু উপরে উঠে গিয়েছিল। পরক্ষণেই সেটা আবার যথাস্থানে ফিরে আসে। মিঃ প্রসাদ হেসে বলেন, “না চিনে উপায় আছে? লোকটির কিন্তু খুব একটা সুনাম নেই। একটু সাবধানে থাকবেন।”

 

পুলিশ সাহেবের কোয়ার্টার্স থেকে আমরা গৌতমের বাড়িতে আসি। গৌতম তখন সদ্য একটা কল থেকে ফিরেছে। বলল, “এস. পি.-র সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”

 

“তা হয়েছিল। তুমি গিয়েছিলে কোথায়?”

 

“মহেশমুণ্ডায়। সেখানে তো রোজই একবার যেতে হয়। তা আজ দুপুরে মাইল দশেক দূরে একজন রুগিকে দেখতে যেতে হবে। মহেশমুণ্ডার কাজটা তাই সকালেই সেরে এলুম। কিন্তু কই, আপনাদের তো ওখানে দেখতে পেলুম না। এস. পি. -র ওখানেই আটকে গিয়েছিলেন বুঝি?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না হে, এস. পি.-র সঙ্গে কথা বলে পরেশনাথ পাহাড়ের ওদিকে একবার যেতে হয়েছিল।”

 

“কেন, ওখানে আবার কী?”

 

“কিছুই না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোমাকে কি এক্ষুনি আবার বেরুতে হবে? দুপুরবেলা কোথায় যেন রুগি দেখতে যেতে হবে বললে।”

 

“সে তো এখুনি বেরুচ্ছি না। খাওয়া-দাওয়া করে দেড়টা-দুটো নাগাদ বেরুব।”

 

“তা হলে একটু বোসো। একটা কথা জিজ্ঞেস করবার আছে। কাল তুমি বলেছিলে যে, রঘুনন্দনের গাড়িটার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল অগস্ট মাসে। তুমি কি ঠিক জানো যে, ওটা অগস্টেই হয়েছিল?”

 

“তা জানি বই কী।” গৌতম বলল, “একা আমি কেন, আরও অনেকেই জানে।”

 

“রঘুনন্দনের বউয়ের চিকিৎসা করতে তুমি তো ও বাড়িতে জুলাই মাস থেকেই যাতায়াত করছ। তাই না?”

 

“ফার্স্ট কল যে জুলাই মাসের এগারো তারিখে পেয়েছিলুম, সে তো কালই আপনাকে বলেছি। তখন অবশ্য রোজ গিয়ে দেখে আসবার দরকার হত না। হপ্তায় একবার করে যেতুম। অগস্ট মাসের প্রথম দিকে একদিন গিয়ে রঘুনন্দনের অ্যাকসিডেন্টের খবর পাই। রিয়ার যে ডিপ্রেশানের কথা বলেছি, সেটাও তখন থেকে হঠাৎ আরও বেড়ে যায়।”

 

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। বললেন, “রিয়ার কথায় পরে আসা যাবে। আপাতত রঘুনন্দনের ব্যাপারটা বুঝে নিই। তুমি বলছ, রঘুনন্দনের এই অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছিল অগস্ট মাসে। এদিকে চৌধুরিজি কাল রাত্তিরে বললেন, এটা সেপ্টেম্বর মাসের ব্যাপার। এগজ্যাক্ট তারিখটাও জানিয়ে দিলেন। তেসরা সেপ্টেম্বর।”

 

গৌতম বলল, “বলেন কী!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিকই বলছি। বিশ্বাস না হয় তো এঁদের দুজনকে জিজ্ঞেস করে দ্যাখো। এঁদের সামনেই চৌধুরিজি কাল ওই সেপ্টেম্বর মাসের কথাটা বলেছেন। এঁরা অবশ্য গরমিলটা ধরতে পারেননি। কী করেই বা পারবেন। তুমি যে কাল দুপুরেই অগস্ট মাসের উল্লেখটা করেছিলে, তা বোধহয় এঁদের মনে ছিল না।”

 

গৌতম বলল, “অ্যাকসিডেন্ট হল অগস্ট মাসে, আর চৌধুরিজি সেটাকে সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা বলে চালিয়ে দিলেন? স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার!”

 

“দাঁড়াও, দাঁড়াও,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এর পরের ব্যাপারটা আরও স্ট্রেঞ্জ। চৌধুরিজি বললেন, অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছিল পরেশনাথ পাহাড়ের কাছাকাছি রাস্তাটা যেখানে ডাইনে বেঁকে ধানবাদের দিকে চলে গেছে, সেইখানে। অথচ রঘুনন্দনের অমন কোনও অ্যাকসিডেন্ট ওখানে আদৌ হয়নি। অগস্টেও না, সেপ্টেম্বরেও না।…কী হল, অমন হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেন? আমি কিন্তু বাজে কথা বলছি না, গৌতম। যা বলছি, তা ওখানকার পুলিশ ফাঁড়ির খাতাপত্তর দেখেই বলছি। ওই দু’মাসে ওই এলাকায় যে বাইশটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, রঘুনন্দন তার একটাতেও ইনভল্ড নয়।”

 

গৌতম বলল, “তা হলে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে এর থেকে কয়েকটা সিদ্ধান্ত আমরা করতে পারি। এক, অ্যাকসিডেন্টটা ওখানে হয়েছিল, কিন্তু পুলিশের সেটা নজর এড়িয়ে যায়।”

 

গৌতম বলল, “হতেই পারে না। আমাকে তো রাত্তিরেও ওদিকে মাঝে-মধ্যে কল-এ যেতে হয়। তাই এটা আপনাকে বলতে পারি যে, ওই এলাকায় সারারাত্তির পুলিশ-পেট্রলের ব্যবস্থা থাকে। ইদানীং চুরি ডাকাতি বেড়ে গেছে না? পেট্রলের কড়াক্কড়ও সেইসঙ্গে বেড়েছে।”

 

“তা হলে আমার দু’নম্বর সিদ্ধান্ত, অ্যাকসিডেন্টটা ওখানেই হয়েছিল, কিন্তু যে-কোনও কারণেই হোক, ঘুষ দিয়ে পুলিশের মুখ বন্ধ করবার ব্যবস্থা হয়, যাতে তারা ওটা রেকর্ড না করে।”

 

গৌতম বলল, “সেটা সম্ভব।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এতেই কিন্তু তাবৎ সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাচ্ছে না। দেয়ার ইজ ইয়েট অ্যানাদার পসিবিলিটি।”

 

বললুম, “সেটা কী?”

 

“অ্যাকসিডেন্ট একটা হয়েছিল ঠিকই, এবং গৌতমের কথা যেহেতু চৌধুরিজির কথার তুলনায় অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য, তাই আমার ধারণা সেটা অগস্ট মাসেই হয়েছিল। তবে সেটা ওখানে হয়নি।”

 

“কোথায় হয়েছিল?”

 

“ঈশ্বর জানেন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমি একটা কথা বলব?”

 

“বলুন।”

 

“আচ্ছা, এমন হওয়া কি একেবারেই অসম্ভব যে, অ্যাকসিডেন্ট ফ্যাক্সিডেন্ট সব বাজে কথা, স্রেফ সবাইকে ধোঁকা দেবার জন্যে রঘুনন্দনকে ওইভাবে শুইয়ে রাখা হয়েছে? তেমনটা কি হতেই পারে না?”

 

গৌতম হেসে বলল, “হবে না কেন, সবই হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে হয়নি। অ্যাকসিডেন্টটা জেনুইন, অপারেশনও হয়েছিল। আমি তো ডাক্তার। আমাকে ধোঁকা দেওয়া সহজ নয়। শুধু একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারছি না। আমি ওদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, অথচ এক্ষেত্রে আমি খবরটা পেয়েছিলুম অ্যাকসিডেন্টের দু’দিন বাদে। খবরটা আমাকে একেবারে সঙ্গে-সঙ্গেই দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু চৌধুরিজি সেটা দেননি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও-কথা থাক। এখন একেবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন করি। রামাশ্রয় যে খুব একটা সত্যবাদী লোক নন, সে তো তাঁর কালকের কথা থেকেই বোঝা গেল। অগস্টকে যিনি সেপ্টেম্বর বানিয়ে দেন, এর পরে আর তাঁর উপরে বিশ্বাস রেখে এগোনো যাবে না। ও-বাড়িতে তা হলে কার কথা আমি বিশ্বাস করব?”

 

গৌতম বলল, “মুকুন্দবাবুকে একবার বাজিয়ে দেখতে পারেন। …ওঃ হো, আপনাদের তো কিছু খেতেই বলা হল না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন আর কিছু খাওয়াবার চেষ্টা কোরো না। বারোটা বাজতে চলল। এবারে উঠে পড়তে হবে।”

 

আরও খানিকক্ষণ কথা বলে আমরা উঠে পড়লুম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *