রাত তখন তিনটে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

সাত

চৌধুরিজি ঠিক ন’টার সময়েই এলেন। ডান হাতে লাঠি, বাঁ হাতে পানের ডিবে। মোটা বেতের লাঠিখানার মাথার দিকটা দেখে মনে হল রুপো দিয়ে বাঁধানো। ড্রইংরুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অসুবিধে কীসের, এ তো দিব্যি আছি।”

 

“না, না, ও কথা বলবেন না,” চৌধুরিজি বললেন, “দুটা ব্যাপারে একটু অসুবিধা হবে, আমি জানি। এক নম্বর অসুবিধা, ঘর ঠাণ্ডা রাখবার মেশিন আমার এখানে নাই। আর দু’ নম্বর অসুবিধা, আপনারা বাংগালি, মছলি খেতে পসন্দ করেন, কিন্তু হর কিসিমের মছলি এখানে মিলবে না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কেন, এ-বেলায় যে কাটা পোনা খেলুম, সে তো বেশ ভালই ছিল।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “দেখুন চৌধুরিজি, আমরা কাজ করতে এসেছি, আমাদের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে এত ব্যস্ত হবেন না।”

 

“এ-কথা কেন বলছেন?”

 

“গাণ্ডেপিণ্ডে খেয়ে যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি, আপনার কাজ তা হলে পণ্ড হবে। এবারে কাজের কথাটা বলুন। আপনার সমস্যাটা আসলে কী?”

 

প্রশ্নটার তক্ষুনি কোনও উত্তর দিলেন না রামাশ্রয় চৌধুরি। লাঠির উপরে হাতের পাতা ও হাতের পাতার উপরে থুতনি রেখে ড্রইংরুমের মেঝের দিকে তাকিয়ে তিনি মিনিট খানেক একেবারে ঝিম মেরে বসে রইলেন। তারপর ধীরে-ধীরে মুখ তুলে বললেন, “সমস্যা তো আমার একটা নয় ভাদুড়িসাব, এক রকমেরও নয়। প্রথম সমস্যা আমার ছেলেকে নিয়ে, দ্বিতীয় সমস্যা ছেলের বউকে নিয়ে। তো সে-দুটা প্রবলেমের কোনও সুরাহা আপনি করতে পারবেন না। তবে আমার বড়িদিদির কাছে যা শুনেছি, তাতে মনে হয়, যেটা আমার তিন নম্বর প্রবলেম, তার একটা সুরাহা আপনি হয়তো করলেও করতে পারেন।”

 

“সেটা কী?”

 

“আমাদের এই মকান থেকে দুটা অর্নামেন্ট চোরি হয়ে গেছে।”

 

“কী রকমের গয়না?”

 

“দশ ভরির একটা সোনার মুকুট আর সাত ভরির একছড়া সোনার নেকলেস।”

 

“অর্থাৎ মোট সতেরো ভরি সোনার জিনিস। সে তো অনেক টাকার ব্যাপার।”

 

“লাগভাগ সেভেন্টি থাউজেন্ড রুপিজ।” চৌধুরিজি বললেন, “কিন্তু আমি কি টাকার কথা ভাবছি? না, ভাদুড়িসাব, আপনি ভুল করলেন, আমি টাকার কথা ভাবছি না। জিনিস দুটা আমার ফিরত চাই।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অর্থাৎ এই গয়না দুটোর সঙ্গে একটা-কিছু সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে আছে, কেমন?”

 

চৌধুরিজি এতক্ষণ শান্তভাবেই কথা বলছিলেন। এবারে তাঁর গলায় একটু উত্তেজনার ছোঁয়া লাগল। বললেন, “থাকবে না? ওই মুকুট কার জানেন? ওটা কিষুনজির মাথার মুকুট। আমার দাদাজি ওটা গড়িয়ে দিয়েছিলেন।”

 

“আমাদের শোবার ঘরের জানলা দিয়ে পিছনে একটা মন্দির দেখা যায়। ওটাই কি আপনাদের কিষুনজির মন্দির?”

 

“না না, ওটা শিউজির মন্দির।” চৌধুরিজি বললেন, “কিষুনজি আছেন আমাদের বাড়ির মধ্যে। তাঁর জন্যে আলাদা ঠাকুর-ঘর আছে। সেখানে রোজ সকালে তাঁর পূজা হয়। লছমি-নারায়ণভি সেখানে আছেন। তাঁদেরও পূজা হয়।”

 

“পুজো কে করেন? বাইরে থেকে পুরুত আসে?”

 

“না না, পুরুত-উরুত আসে না। পূজা আমার স্ত্রীই করেন। বাড়ির জেনানা-লোক যে-রকম পূজা করেন, সেইরকম ব্যাপার। মালা গাঁথেন, চন্দন ঘষেন, ঠাকুরের গলায় মালা পরান, কপালে চন্দনের ফোঁটা লাগান, ধূপধুনা দেন, ঘন্টা বাজান, তারপর পরনাম করে বলেন, ‘সকলের ভালা করো, মঙ্গল করো।’ বাস, পূজা হয়ে গেল।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ওই আমাদের গেরস্ত বাড়িতে মেয়েরা যেমন লক্ষ্মীপুজো করে, সেই রকমের ব্যাপার আর কী।”

 

চৌধুরিজি বললেন, “ বোসসাব ঠিক বলিয়েছেন। তবে আপনারা লছমিবারে লছমি দেবীর পূজা করেন, আর আমাদের বাড়িতে কিষুনজি, লছমিজি আর নারায়ণজির পূজা সোমসে এতোয়ার হররোজ হয়।”

 

ভাদুড়িমশাই মাথা নিচু করে কিছু ভাবছিলেন। মাথা তুলে বললেন, “ঠিক আছে। এবারে নেকলেসটার কথা বলুন। ওটাও কি একটা ফ্যামিলি এয়ারলুমের ব্যাপার নাকি?

 

ভুরু কুঁচকে চৌধুরিজি বললেন, “কেয়া লুম?”

 

“মানে যেমন আপনাদের কিনজির মাথার মুকুট, তেমন এই নেকলেসটাও কি অনেক দিনের পুরনো জিনিস? ওরও কি একটা পারিবারিক হিস্ট্রি রয়েছে?”

 

চৌধুরিজির কোঁচকানো ভুরু নিমেষে আবার টান হয়ে গেল। বললেন, “হাঁ হাঁ, ঠিক বাত। হিস্ট্রি আছে। ওইটা আমার দাদাজির মায়ের নেকলেস। দাদার পিতাজি তাঁকে গড়িয়ে দেন। দাদাজির শাদির পরে ওইটা দিয়ে তিনি আমার দাদিকে আশীর্বাদ করেছিলেন। দাদি দিয়েছিলেন আমার মা’কে। মা দেন আমার ফার্স্ট ওয়াইফকে। কিন্তু তিনি তো বাঁচলেন না, তাই সেকেন্ড ওয়াইফ সেটা পেয়ে গেলেন। তারপর আমার লেড়কা যখন শাদি করে মুম্বই থেকে ফিরল, আমার সেকেন্ড ওয়াইফ ওই নেকলেস দিয়ে তখন বহুকে আশীর্বাদ করলেন। তো বাস, নেকলেসটাও চোরি হয়ে গেল।”

 

“মুকুট আর নেকলেস কি একই দিনে চুরি হয়েছে?”

 

“না।” চৌধুরিজি বললেন, “মুকুট চোরি হল সিতাম্বর মাসের সাত তারিখের রাত্তিরে। আমরা আট তারিখের সকালবেলায় সেটা বুঝতে পারলাম।”

 

“আর নেকলেস?”

 

“সেটা পিছলি মাহিনায় চোরি হল।”

 

“তার মানে অক্টোবরে?”

 

“হাঁ, ভাদুড়িসাব। ওইদিন দশেরা ছিল। বহুকে আমার ওয়াইফ সেইজন্য আয়রন চেস্টের চাবিটা দিয়ে বললেন যে, বহু, আজ দশেরা, শুভ দিন, তুমি সেই ভারী নেকলেসটা আজ পরে নাও। তো আয়রন চেস্ট খুলে সব কুছ নাড়াঘাঁটা করে তারপর বহু আমার ওয়াইফকে এসে বলল যে, সেটা পাওয়া যাচ্ছে না।”

 

ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি, চৌধুরিজি। এ-সব দামি গয়নাগাটি আপনারা ব্যাঙ্কের লকারে রাখেন না কেন? কিষুনজির মুকুটের কথা বুঝতে পারছি। ওটা বোধহয় দিনক্ষণ দেখে আপনারা পরাতেন না, বছরের মধ্যে তিন শো পঁয়ষট্টি দিনই তাঁর মাথায় ওটা শোভা পেত। কিন্তু যে-সব গয়না রোজ-রোজ পরবার জন্যে নয়, সেগুলো তো অনায়াসেই ব্যাঙ্কের লকারে রাখা যায়। বিশেষ করে এই সাতভরির নেকলেসের মতো গয়না। এগুলি কেন আপনারা ব্যাঙ্কের লকারে রাখেননি?”

 

প্রশ্ন শুনে চৌধুরিজি একেবারে হাঁ করে কিছুক্ষণ ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “কী বলছেন আপনি ভাদুড়িসাব? এ কি একটা জিজ্ঞাসা করবার মতো কথা হল? আমি গিয়ে ব্যাঙ্কের লকারে আমাদের সব গয়নাগাটি রেখে দিব, আর ওই শালা হারামি মুলুকচাঁদ সেটা জানবে না? জানলে সে গরমিন্টকে সেটা বলবে না? আর গরমিন্টও সাথ সাথ আমার লকারগুলান সিজ করবে না?”

 

“কেন সিজ করবে?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ তো চোরাই মাল নয়। তবে আর আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন?”

 

চৌধুরিজি বললেন, “আরে ছোড়েন, ভাদুড়িসাব, ছোড়েন। গরমিন্টকে আমার বিশোয়াস নাই।”

 

ভাদুড়িমশাই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন যে, এ-ব্যাপারে আর বাক্যব্যয় করে কোনও লাভ হবে না। সুতরাং প্রসঙ্গ পালটে জিজ্ঞেস করলেন যে, চুরির কথাটা পুলিশকে জানানো হয়েছে কি না। তাতে চৌধুরিজি বললেন, তা তিনি জানাননি, কেননা পুলিশকেও তিনি বিশোয়াস’ করেন না। “শালারা কামকাজ কুছু করে না, সির্ফ আমার ট্রাকগুলানকে আটক করে ঘুষ খায়।”

 

আজ দুপুরেই যাঁকে তাঁর ‘লুজ ক্যারেক্টার’ বলে মনে হয়েছিল, সেই রামাশ্রয় চৌধুরির সঙ্গে এ-ব্যাপারে আমাদের সদানন্দবাবু দেখলুম সম্পূর্ণ একমত। বললেন, “বড় খাঁটি কথা বলেছেন চৌধুরিজি। ব্যাটারা কোনও কম্মের নয়। চোর তো ধরতে পারেই না, এদিকে আবার যার কোনও দোষই নেই, নাহক তাকে হ্যারাস করে মারে। উঃ আমাকেই কি কম জ্বালান জ্বালিয়েছে মশাই।”

 

বুঝলুম, খুনের মামলায় সেই যে তাঁকে ভুল করে হাজতে পোরা হয়েছিল, সদানন্দবাবু সেটা এখনও ভুলতে পারেননি।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুলিশকে না-জানানোটা ভাল হয়েছে কি মন্দ হয়েছে, তা নিয়ে আমি এক্ষুনি কোনও মন্তব্য করব না, চৌধুরিজি। তবে একটা কথা বলি। যেমন আর-সব সার্ভিসে, তেমন পুলিশ-সার্ভিসেও ভাল মন্দ দু’রকমের লোকই আছে। কিন্তু সে-কথা থাক। এখন আমি কয়েকটা প্রশ্ন করব আপনাকে। সেই সঙ্গে আশা করব যে, প্রতিটি প্রশ্নের আপনি নির্ভুল উত্তর দেবেন। কোনও প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যদি আপনার পক্ষে সম্ভব না হয়, তবে খোলাখুলি সেটা আমাকে বলবেন। কিন্তু আর যা-ই করুন, ভুল উত্তর দেবেন না। ভুল উত্তর দিলে আমার পক্ষে কাজ করা শক্ত হবে, হয়তো আদৌ সম্ভব হবে না। তাতে আপনারই ক্ষতি। খুব বড় রকমের ক্ষতি। কথাটা কেন বলছি জানেন?”

 

“কেন বলছেন?”

 

“বলছি আমার একটা ধারণার জন্যে।”

 

একটুক্ষণের জন্যে আবার চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আমার ধারণা আপনার বাড়িতে চুরির পালা শেষ হয়ে যায়নি, সেটা শুরু হয়েছে মাত্র। এখানে আরও চুরি হবে। বেশ বড় রকমের চুরি। চোর হয়তো এই মুহূর্তে তার জন্যে তৈরিও হচ্ছে।”

 

চৌধুরিজি বললেন, “কী বলছেন আপনি, ভাদুড়িসাব?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সম্ভবত ভুল বলছি না। কিন্তু তাতে ঘাবড়ে যাবার তো কিছু নেই। চোর তৈরি হচ্ছে হোক, আমরাও তৈরি থাকব। ভুল উত্তর দিলে কিন্তু তৈরি থাকা শক্ত হবে।… প্রশ্নগুলি করি তা হলে?”

 

“হাঁ হাঁ, জরুর।”

 

“যে ঠাকুরঘরে কিষুনজির পূজা হয়, রাত্তিরে সেখানে কেউ থাকে?”

 

“না। তবে তার দরজায় তালা না লাগিয়ে রাত্তিরে আমরা ঘুমাতে যাই না।”

 

“পূজা তো আপনি বললেন, সকালবেলায় হয়। তা সকালে ঘরটা খোলা হয় কখন?”

 

“ভোর ছ’টা নাগাদ। তবে শীতকালে অনেকদিন সাড়ে ছ’টা বেজে যায়।”

 

“চুরি যে হয়েছে, সেটা কি সকালবেলাতেই ধরা পড়েছিল?”

 

“হাঁ, ভাদুড়িসাব। দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকেই আমার স্ত্রীর মনে হয় যে, কিছু-একটা গোলমাল হয়েছে। তার পরেই তিনি বুঝতে পারেন যে, কিষুনজির মাথায় সেই সোনার মুকুটটা নেই।”

 

“দরজার তালা খুলে তিনি ভিতরে ঢুকেছিলেন মানে? তালা কি যেমন লাগানো থাকে, সেদিনও তেমন লাগানো ছিল?”

 

“হাঁ, ভাদুড়িসাব।”

 

“অথচ আগের রাত্তিরে ঠাকুরঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে আপনারা যখন শুতে যান, মুকুট তখন যথাস্থানেই ছিল?”

 

“হাঁ, এটা আরও এই জন্যে আমার মনে আছে যে, মুকুটটা ঠিকমতো সিধা করে বসানো ছিল না। আমার স্ত্রী তো পূজায় বসবার আগে কিষুনজির কপালে চন্দনের ফোঁটা লাগান, তাঁর গলায় ফুলের মালাও পরিয়ে দেন, সেই সময়ে অসাবধানে তাঁর হাতের ঠেলা লেগে মুকুটটা হয়তো একটু সরে গিয়ে থাকবে। সেটাকে ঠিকমতো সিধা করে বসিয়ে, দরজায় তালা লাগিয়ে তারপর আমি শুতে যাই।”

 

“এ তো বড় আশ্চর্য ব্যাপার। রাত্তিরে আপনি তালা লাগিয়ে শুতে গেলেন, আর সকালবেলায় সেই তালা খুলে আপনার স্ত্রী ঠাকুরঘরে ঢুকে দেখলেন যে, সোনার মুকুট হাপিস হয়ে গেছে? মুকুট কি তা হলে ভূতে চুরি করল? এমন অদ্ভুত চুরির কথা তো কখনও শুনিনি!”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “যাচ্চলে। এ তো মহা মুশকিল হল। চোর হলে নাহয় ধরবার একটা চেষ্টা করা যেত, কিন্তু ওই যাদের নাম করতে নেই, তাদের তো ছাই ধরাও যায় না।”

 

চৌধুরিজি বললেন, “এ-বাড়িতে যে কোনওদিনই ভূতের উপদ্রব হয়নি, সেটা বলতে পারব না। একবার হয়েছিল। একটা পিরেতকে নাকি রাত্তিরবেলায় আমাদের বাড়ির পিছনে ওই শিউজির মন্দিরের ধারে-কাছে ঘুরতে দেখা যেত। আমার দাদাজির কাছে তার গল্প শুনেছি। কিন্তু সে তো অনেক কাল আগের ব্যাপার। এক ওঝাকে ডাকতে হয়েছিল। সে এসে খুব লাফঝাঁপ করে, মন্তর ঝাড়ে। তাতে সেটা ভেগে যায়। তারপরে আর আসেনি।”

 

সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলুম, ভদ্রলোকের মুখ একেবারে পাংশুবর্ণ ধারণ করেছে।

 

ভাদুড়িমশাইয়ের সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছিল। সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে তিনি আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলেন। অল্প-অল্প ধোঁয়া ছেড়ে পরপর রিং বানালেন গোটাকয়েক। তারপর বললেন, “গয়নাগাটি যে আয়রন-চেস্টে থাকে, বাড়ির মধ্যে সেটা আছে কোথায়?”

 

“কেন,” চৌধুরিজি বললেন, “আমাদের শোবার ঘরে। সেটাই সব থেকে সেফ জায়গা। তা ছাড়া সেটা তো দেওয়ালের সঙ্গে গাঁথা আছে। যে-সব অর্নামেন্ট রোজ পরা হয় না, তা ওই চেস্টের মধ্যে রাখি। বাড়িতে কোনও কামকাজ থাকলে কি বাইরে কোথাও কোনও ইনভিটেশন থাকলে বাড়ির মেয়েরা চেস্ট খুলে তার থেকে যে যার পসন্দমাফিক দু’চারটে অর্নামেন্ট বার করে পরে নেয়। ও-সব ভ্যালুয়েরবল অর্নামেন্ট হররোজ কেউ পরে না।”

 

“বাড়ির মেয়েরা বলতে তো আপনার স্ত্রী আর ছেলের বউ। তা-ই না?”

 

“হাঁ। এক মৌসিও আছে। লেকিন বুড্‌টি। তার লেড়কারা তাকে দেখে না, তাই আমার কাছে আছে।”

 

“পুরুষ বলতে?”

 

“আমি আর আমার ছেলে।”

 

“কাজের লোকজনের কথা বাদ দিচ্ছেন কেন?”

 

“হাঁ, তারা আছে। রান্না করবার জন্য একজন কুক ভি আছে। লেকিন তারা কেউ দোতলায় থাকে না। কাজকাম করে দিয়ে একতলায় নেমে যায়। তারপর সিঁড়িতে যে লোহার গেট আছে, তাতে আমরা তালা লাগিয়ে দিই। বাস, দোতলা বিলকুল সেপারেট হয়ে গেল।”

 

“আপনি কাজে বেরোন কখন?”

 

“সকালবেলায় নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে যাই। ফিরতে-ফিরতে একটা-দুটা বাজে। তখন খাই। আরাম করি। তারপরে ফিন বিকালে একবার বেরোতে হয়।”

 

“দু’বেলাই কাজ থাকে?”

 

“কাজ থাকে। কুছু-কুছু অকাজ ভি থাকে।

 

“অকাজটা কী ব্যাপার?”

 

চৌধুরিজির চোখে সেই কৌতুকটা আবার ঝিলিক মেরেই মিলিয়ে গেল। বললেন, “সেটা আর জিজ্ঞাসা করবেন না।”

 

এবারে ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “ঠিক আছে, ওটা আমার না-জানলেও চলবে। কিন্তু কয়েকটা কথা তো জানাই চাই। তার জন্য আপনার স্ত্রী, ছেলে আর বহুজির সঙ্গে কথা বলা দরকার।”

 

“কুছু যদি জিজ্ঞাসা করবার থাকে তো আমার ওয়াইফকে জিজ্ঞাসা করুন। লেড়কা আর বহুকে জিজ্ঞাসা করে কুছু লাভ নেই।”

 

“কেন?”

 

“বহুকে কুছু যদি জিজ্ঞাসা করেন তো সে সির্ফ আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে। কুছু বলবে না।” ভাদুড়িমশাই এটা গৌতমের কাছেই জেনেছেন। তবু না-জানার ভান করে বললেন, “তার মানে?”

 

“মানে কি আমিই জানি?” কপালে হাত ছুঁইয়ে চৌধুরিজি বললেন, “ডাক্তার দেখানো হচ্ছে। ডাক্তার যা বলছে, তারও মানে আমি বুঝি না। লেকিন ওইটাই তার বেমারি।”

 

“আর ছেলে?”

 

“ই-সব চোরির খবরই সে জানে না। আমরাই তাকে জানাইনি। কী করে জানাব? সিতাম্বর মাসের তিন তারিখ থেকেই সে বিছানায় পড়ে আছে। তার নড়বার চড়ার ক্ষমতাও নাই।”

 

এটাও আমরা জানি। ভাদুড়িমশাই কিন্তু এবারেও কিছু না-জানার ভান করে বললেন, “কেন?”

 

আবারও কপালে হাত ছুঁইয়ে চৌধুরিজি বললেন, “কেন আবার, আমার বদ নসিবের জন্য। গাড়ি নিয়ে রঘুনন্দন ধানবাদের দিকে যাচ্ছিল। পরেশনাথ পাহাড়ের কাছাকাছি রাস্তাটা যেখানে ডাইনে বেঁকে ধানবাদের দিকে চলে গেছে, সেইখানে অ্যাকসিডেন্ট হয়। বহোত ভারী অ্যাকসিডেন্ট। ডাক্তার ডাকলাম। অপারেশন হল। কিন্তু হাড্ডি এখনও জোড়া লাগল না। উঠতে পারে না। হাঁটতে পারে না। চোরির খবর তাকে বলা ভি হয়নি। সে কুছু জানে না। যা জিজ্ঞাসা করবার, আমার ওয়াইফকে করুন। বলেন তো কাল সকালে আমি বাড়িতে থাকব। দশটার সময় আপনি আমাদের দোতলায় চলে আসুন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল সকালে নয়, বিকেলে যাব। সকালে আমাদের অন্য একটু কাজ আছে। আপনি একটা গাড়ি দিতে পারবেন?”

 

“তা কেন পারব না?” চৌধুরিজি বললেন, “ড্রাইভার ভি দিয়ে দিব। রাত্তিরেই খবর পাঠিয়ে দিচ্ছি। সকাল সাতটার মধ্যে ড্রাইভার এসে যাবে।”

 

“ড্রাইভারের দরকার হবে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি গাড়ি চালাতে পারি। কিরণবাবুও পারেন। আর তা ছাড়া, আমরা বেরোচ্ছি তো ভোর ছ’টায়।”

 

“ঠিক আছে, তা হলে যে ফিয়াটটায় আজ এখানে এলেন, ওটাই নিয়ে নিন।” চৌধুরিজি তাঁর পকেট থেকে একটা কুপন-বই বার করে বললেন, “এটাও রাখুন। তেলের কুপন। আমার সই করা আছে। ইন্ডিয়ান অয়েলের যে-কোনও পেট্রল পাম্প থেকে তেল নিয়ে নেবেন।”

 

চৌধুরিজি বিদায় নিলেন রাত সাড়ে এগারোটায়। সদানন্দবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চলুন, শুয়ে পড়া যাক। বেশ শীত পড়েছে মশাই।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শীত? কই, তেমন মনে হচ্ছে না তো।”

 

বললুম, “বুঝতে পারছেন না, ওই যে শিবমন্দিরের আশেপাশে পিরেত ঘুরে বেড়াবার গল্প শুনলেন, সদানন্দবাবু সেইজন্যে আজ শোবার আগে জানালাগুলোকে বন্ধ করতে চান। পাছে আমি আপত্তি করি, তাই শীতের কথাটা গেয়ে রাখলেন।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ওঃ, সেই পিরেত? তা সেটা তো শুনলুম ভেগে গেছে, তবে আর তাকে নিয়ে সমস্যা কী? আসল সমস্যা তো দেখছি এই চৌধুরিজিকে নিয়ে।”

 

বললুম, “কেন?”

 

“তাও বুঝতে পারলেন না?” ভাদুড়িমশাই একেবারে হঠাৎই আবার গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “হি ইজ আ ড্যাম লায়ার। এত করে বললুম যে, আমার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নির্ভুল হওয়া চাই। তাও ব্যাটা না-হক একটা মিছে কথা বলে আমার খাটুনি বাড়িয়ে দিল!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *