রাত তখন তিনটে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

ছয়

রামাশ্রয় চৌধুরি বারোটা নাগাদ বিদায় নেন। গৌতম এল সাড়ে বারোটায়। গাড়ি নিয়ে এসেছিল। চৌধুরিজি যে আমাদের ব্যবহারের জন্য তাঁর ফিয়াট গাড়িটা রেখে গেছেন, এই খবর শুনে বলল, “তা হলে আর আমার গাড়িতে উঠে আপনাদের দরকার নেই। আর তা ছাড়া বাড়ি ফেরার পথে আমাকে এক জায়গায় একটু থামতেও হবে। বুড়ো এক পেশেন্ট রয়েছেন, তাঁকে দেখে ফিরব। আপনারা একটা নাগাদ চলে আসুন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “চৌধুরিজির ড্রাইভার তোমার বাড়ি চেনে তো?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে না চিনুক, আমি তো চিনি। ঠিক আছে গৌতম, তুমি আর দেরি কোরো না, বেরিয়ে পড়ো। তৈরি হয়ে নিয়ে আমরা একটু বাদেই রওনা হচ্ছি।”

 

গৌতম চলে গেল। আমরা যে আর এখানে ফিরব না, গেস্ট-হাউসের কেয়ারটেকারকে সে-কথা জানিয়ে, গোছগাছ সেরে, চৌকিদার বাবুর্চি আর বেয়ারার বখশিশ মিটিয়ে একটার আগে আমরা রওনা হতে পারলুম না। গৌতমদের বাড়িতে পৌঁছলুম দেড়টা নাগাদ। গৌতম দেখলুম বাড়ির বাইরে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা গাড়ি থেকে নামতে জিজ্ঞেস করল, “এত দেরি হল যে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলো, ভিতরে গিয়ে বসা যাক। তখন কথা হবে।”

 

আমরা যে আর গেস্ট-হাউসে ফিরব না, খাওয়ার পরে একটু বিশ্রাম নিয়ে চারটে নাগাদ রামাশ্রয় চৌধুরির বাড়িতে চলে যাব, গৌতমকে সে-কথা আগে বলা হয়নি। এখন সব কথা শুনে গৌতম বলল, “বুঝেছি, এইজন্যেই কাল মা’কে আপনি বলেছিলেন যে, কখন কোথায় থাকবেন তার ঠিক নেই।… তা, চৌধুরিজি যখন এত করে বলছেন, তখন ওঁর ওখানে থাকাই তো ভাল। জেনারেটার ওখানেও আছে, তাই লোডশেডিং হলে কষ্ট পেতে হবে না।”

 

“বাড়িটা কোথায়?”

 

“মহেশমুণ্ডার ওদিকে। বিশাল বাড়ি। সব মিলিয়ে তা অন্তত বিঘে-পঁচিশেক জমি তো হবেই। তার মধ্যে পুকুর আছে, মন্দির আছে, মঠ আছে, ফুলবাগান আছে। পিছন দিকে অচার্ডও আছে একটা।”

 

গৌতমের স্ত্রী এসে বলল, “খেতে দেওয়া হয়েছে, মেসোমশাই, আপনারা আসুন।”

 

খেতে-খেতেই কথা চলতে লাগল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “লোকটা দেখলুম বেশ হুঁশিয়ার। কার গাড়িতে কাল আমরা মধুপুর থেকে এখানে এসেছি আর আসবার পথে কোথায় গাড়ি থামিয়ে কার দোকানে চা খেয়েছি, সে-খবরও ইতিমধ্যে ওর কাছে পৌঁছে গেছে।”

 

গৌতম হেসে বলল, “তা কেন পৌঁছে যাবে না? চারদিকেই তো ওঁর লোক। তা ছাড়া, জায়গাটাও তো ছোট, সব খবরই তাই চটপট ছড়িয়ে যায়।”

 

“কাল যে তুমিই ওকে ফোন করেছিলে, সেটাও বোধহয় জেনে যাবে?”

 

“তা বোধহয় যাবে না।”

 

“কেন?”

 

“কলটা আমি এখান থেকে করিনি। নিজেই যে করেছিলুম, তাও নয়। অন্যকে দিয়ে করিয়েছিলুম। তারপরে আবার যে-নাম্বার থেকে করিয়েছিলুম, সেটা যদি ট্রেস করতে পারেও তা হলে খুব হকচকিয়ে যাবে। কেননা, তার পরে ও আর এগোতে পারবে না।”

 

“এ কথা কেন বলছ?”

 

“এইজন্যে বলছি যে, কাল রাত্তিরে যার বাড়ি থেকে ফোনটা ওঁকে করা হয়েছিল, সেই মাইকা-ব্যবসায়ী ওঁর ঘোরতর শত্রু। বাক্যালাপ বন্ধ।”

 

ভাদুড়িমশাই খেতে-খেতেই কিছু একটা ভেবে নিলেন। তারপর বললেন, “চৌধুরিজির পুত্রবধূ তো তোমার পেশেন্ট, রোজই নাকি অন্তত একবার তাকে গিয়ে তোমার দেখেও আসতে হয়। আজ গিয়েছিলে?”

 

“সকালের দিকে গিয়েছিলুম।”

 

“অসুখটা কী?”

 

“সে তো কালই আপনাদের বললুম, মেলাঙ্কোলিয়া। কারও সঙ্গে কথা বলে না, কিছু জিজ্ঞেস করলে যে বুঝতে পারে তাও মনে হয় না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।”

 

“এটা কবে থেকে হয়েছে?”

 

“সম্ভবত বিয়ের সময় থেকেই এটা ছিল। তবে রঘুনন্দনের অ্যাকসিডেন্টের পর থেকে যে বেড়ে গেছে, তাতে সন্দেহ নেই। প্রচণ্ড ডিপ্রেশানে ভুগছে।”

 

“রঘুনন্দন কে?”

 

“রামাশ্রয় চৌধুরির একমাত্র ছেলে।”

 

খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। হাত-মুখ ধুয়ে আমরা ড্রইং রুমে চলে আসি। গৌতম বলে, “আড়াইটে বাজে। চারটের আগে তো রওনা হচ্ছেন না। একটু গড়িয়ে নিন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না রে, বাবা, এখন যদি শুই তো ঘুম এসে যাবে। আর একবার যদি ঘুমিয়ে পড়ি তো গোটা দিনটাই মাটি। এমন গা-ম্যাজম্যাজ করবে যে, কোনও কাজই করতে পারব না। তার চেয়ে বরং আর দু-একটা কথা জেনে নেওয়া যাক।”

 

গৌতম বলল, “কী জানতে চান বলুন। তবে গোলমেলে কোনও কথা জিজ্ঞেস করবেন না কিন্তু।”

 

“তা কেন করব,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তুমি যে ও-বাড়ির ডাক্তার, তা আমি ভুলে যাচ্ছি না। আর তা ছাড়া গোলমেলে প্রশ্ন যদি করিও, তুমি তার জবাব না দিলেই তো গোল মিটে যাচ্ছে। এই যেমন রঘুনন্দনের কী একটা অ্যাকসিডেন্টের কথা বলছিলে না? যদি জিজ্ঞেস করি যে, সেটা কীসের অ্যাকসিডেন্ট, কবে হল, কী করে হল, তা হলে কি সেটা খুব গোলমেলে প্রশ্ন বলে তোমার মনে হবে?”

 

গৌতম হেসে বলল, “তা কেন মনে হবে? এ তো খুবই স্বাভাবিক প্রশ্ন। ওটা কার-অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপার। রঘুনন্দন গাড়ি চালিয়ে ধানবাদ যাচ্ছিল। হাইওয়ের উপরে একটা ট্রাক তাকে ধাক্কা মারে। গাড়ি উলটে যায়। এটা মাঝরাত্তিরের ঘটনা।”

 

“মাঝরাত্তির খুব আলগা কথা। ঠিক কখন এটা ঘটেছিল জানো?”

 

“রাত দুটোর সময়। চৌধুরিজির কাছে অন্তত এইরকমই শুনেছি। তো যা বলছিলুম, অ্যাকসিডেন্টে রঘুনন্দনের স্পাইনাল কর্ড ভেঙে যায়। মরেই যেত। কিন্তু চৌধুরিজিরই একটা ট্রাক সেই সময়ে উলটো দিক থেকে আসছিল। পথের ধারে যে-গাড়িটা উলটে পড়ে ছিল, ট্রাকের লোকদের সেটা চেনা। রঘুনন্দন তখন টোটালি সেন্‌সলেস। মালিকের ছেলেকে সেই অবস্থায় ট্রাকে তুলে নিয়ে তারা চৌধুরিবাড়িতে পৌঁছে দেয়।”

 

“রঘুনন্দনের সঙ্গে আর কেউ ছিল না?”

 

“কেউ না। কী একটা কাজে সে নাকি একাই ধানবাদে যাচ্ছিল।”

 

“এটা কতদিন আগেকার ব্যাপার?”

 

“গত অগস্ট মাসের।”

 

“এখন সে চলাফেরা করতে পারে?”

 

“একেবারেই না। কখনও পারবে বলে মনেও হয় না। এইয্যা, একটা বেফাঁস কথা বলে ফেললুম।” দাঁতে জিভ কেটে গৌতম বলল, “দেখবেন মেসোমশাই, কথাটা আবার চৌধুরিজির কানে না ওঠে। ঠিক উনি ভেবে বসবেন যে, এটা প্রফেশনাল জেলাসি।”

 

“কেন, রঘুনন্দনের চিকিৎসার ভার উনি তোমাকে দেননি?”

 

“দিলেও আমি নিতুম না। বলতুম, চৌধুরিজি, আপনার ছেলেকে আপনি কলকাতা কিংবা পাটনায় পাঠিয়ে দিন। আর নয়তো সেখান থেকে বড় কোনও সার্জেনকে এখানে আনিয়ে নেবার ব্যবস্থা করুন। এটা একটা মেজর অপারেশনের ব্যাপার, এ নিয়ে ছেলেখেলা করবেন না।”

 

“ওঁর তো অঢেল পয়সা, তবু কোনও বড় সার্জেনকে আনাননি?”

 

“তা তো আনানইনি, এমনকি যাঁর অপারেশনের হাত মোটামুটি ভাল, ধানবাদ থেকে সেই মেজর চতুর্বেদীকেও একটা• কল দিয়ে এখানে আনিয়ে নিলেন না। অপারেশন করালেন ওঁর চেনা এক হাতুড়ে ডাক্তারকে দিয়ে। তার ফল যা হবার তা-ই হয়েছে।”

 

খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “চৌধুরিজির পুত্রবধূটির চিকিৎসার ভার কবে তোমার হাতে আসে?”

 

“প্রথম কল পাই গত জুলাই মাসে।…দাঁড়ান মেসোমশাই,” গৌতম তার সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বলল, “আমি তো একটা ডে-বুক মেনটেন করি, আমার চেম্বার থেকে এক্ষুনি সেটা একবার দেখে আসছি, তা হলে একেবারে এগজ্যাক্ট ডেটটা বলে দিতে পারব।”

 

দোতলার ড্রইংরুম থেকে তক্ষুনি একতলায় নেমে গেল গৌতম। সেখানে তার চেম্বার। চেম্বার থেকে একটা ডায়েরি নিয়ে ফের ঘরে ঢুকে তার পাতা ওলটাতে-ওলটাতে হঠাৎ এক জায়গায় থেমে গিয়ে বলল, “পেয়ে গেছি…ইলেভেনথ জুলাই…আর আজ হচ্ছে ফিফ্থ নভেম্বার…তার মানে প্রায় চার মাস আগে ওকে আমি প্রথম দেখতে যাই।”

 

“রঘুনন্দনের সঙ্গে ওর বিয়েটা হয়েছে কবে?”

 

“গত মে মাসে।” গৌতম বলল, “বিয়েটা বোম্বাইয়ে হয়। রিয়া সেখানকার মেয়ে। বরযাত্রী পার্টির সঙ্গে বোম্বাইয়ে যাবার জন্যে চৌধুরিজি আমাকে অনেক রিকোয়েস্ট করেছিলেন। কিন্তু হাতে কয়েকটা জরুরি কেস ছিল বলে তখন আমি যেতে পারিনি। এমনকি ছেলে-বউকে নিয়ে গিরিডিতে ফিরে চৌধুরিজি যে রিসেপশনের ব্যবস্থা করেন, তাতেও আমার যাওয়া হল না।”

 

“কেন?”

 

“একটা কনফারেন্স উপলক্ষে সেই সময়ে আমাকে উটি যেতে হয়। ফিরে এসে শুনলুম খুব ধুমধাম হয়েছিল।”

 

শুনে আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “গৌতম, তুমি একটা কথা বলেছ। মেলাঙ্কোলিয়াই বলো আর ডিপ্রেশানই বলো, চৌধুরিবাড়ির পুত্রবধূটির এই যে অসুখ, তোমার ধারণা এটা তার বিয়ের সময় থেকেই ছিল। এটা তোমার কেন মনে হচ্ছে, একটু বুঝিয়ে বলবে?”

 

গৌতম হেসে বলল, “এ তো খুবই সহজ কথা, মেসোমশাই। বোম্বাইয়ের মেয়ে যদি শোনে যে বিয়ের পরে তাকে গিরিডিতে গিয়ে স্বামীর ঘর করতে হবে, তা হলে সে ডিপ্রেশানে ভুগবে না?”

 

সদানন্দবাবু এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি, চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিলেন। এবারে আর মুখ না-খুলে পারলেন না। বেজার গলায় বললেন, “কারেক্ট। কী বলব মশাই, আমারই তো কেমন একটা ডিপ্রেশান-ডিপ্রেশান লাগছে।”

 

কথাটা যে ভাদুড়িমশাইয়ের কানে পৌঁছেছে, এমন মনে হল না। গৌতমের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “তা চৌধুরিমশাই বম্বে থেকে পুত্রবধূ আনতে গেলেন কেন? ধারে-কাছে কি উপযুক্ত পাত্রীর কিছু অভাব ঘটেছিল?”

 

“তা আমি কী করে বলব?” গৌতম বলল, “আমি শুধু একটা ব্যাপারে একটু তাজ্জব বনে গিয়েছিলুম। আমি ওদের হাউস-ফিজিশিয়ান, ও-বাড়ির প্রতিটি লোকের অসুখ-বিসুখের ব্যাপারে চৌধুরিজি আমার পরামর্শ নেন। অথচ গত অগস্ট মাসে ওঁর ছেলের এই যে এত বড় একটা অ্যাকসিডেন্ট হল, আমাকে উনি একবার কনসাল্ট পর্যন্ত করলেন না। লোক পাঠিয়ে আমাকে ডাকিয়ে নিয়ে না যান, অন্তত একটা ফোন তো করতে পারতেন। তাও করেননি। কী করলেন? না একজন কোয়াককে ডাকিয়ে এনে তার হাতে তুলে দিলেন একটা মেজর অপারেশনের দায়িত্ব। তার ফলও ওঁকে ভুগতে হচ্ছে। ছেলেটা তার নর্মাল লাইফ আর ফিরে পাবে কি না, ঈশ্বর জানেন।”

 

গৌতমের বউ একটা ট্রের উপরে কফির সরঞ্জাম সাজিয়ে নিয়ে ঘরে এসে ঢুকল। সদানন্দবাবু বললেন, “অসম্ভব। আমি এখন কফি খাব না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “খাবেন না। কিন্তু আমি খাব। সম্ভবত চাটুজ্যেমশাইও খাবেন।”

 

কফি শেষ করে আমরা উঠে পড়লুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “গৌতম, সম্ভবত আর-একবার তোমার সঙ্গে কথা বলবার দরকার হবে।… না, না, তুমি ও-বাড়ির ডাক্তার, ওখানে যে আমার সঙ্গে খুব বেশি কথা বলা তোমার পক্ষে সমীচীন হবে না, তা আমি বুঝি। কিছু যদি জানবার থাকে তো আমিই তোমার এখানে চলে আসব।…কিন্তু আজ আর নয়, সাড়ে চারটে বাজে, এবারে রওনা হওয়াই ভাল, চৌধুরিজি সম্ভবত আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন।”

 

টুকিটাকি দু-একটা জিনিস কিনবার দরকার ছিল। গিরিডির বাজার-এলাকার একটা দোকান থেকে সে-সব কিনে নিয়ে যখন মহেশমুণ্ডার চৌধুরি-বাড়িতে গিয়ে পৌঁছই, তখন সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। নভেম্বর মাস, বিকেল ইতিমধ্যেই ফতুর হয়ে গেছে, তবে সূর্যদেবকে যে চিতায় চড়ানো হয়েছে, তার আগুন একেবারে সর্বাংশে নিবে যায়নি। নীচের পৃথিবীতে অন্ধকার আস্তে-আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে বটে, কিন্তু চৌধুরিদের পুরনো আমলের বিশাল অট্টালিকার দোতলা থেকে ছাত পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছে তার লাল আভা। হঠাৎ দেখলে ভ্রম হয় যে, বাড়িটার ঊর্ধ্বাংশ যেন দাউ-দাউ করে জ্বলছে।

 

দেউড়ি পেরিয়ে লাল মোরামের রাস্তা। সেটা মূল বাড়ির গাড়িবারান্দার তলায় গিয়ে পৌঁছেছে। যে মানুষটি সম্পর্কে রামাশ্রয় চৌধুরির কথায় আজ সকালবেলায় প্রশ্রয়মিশ্রিত একটা ছদ্ম ক্রোধ প্রকাশ পেয়েছিল, এবং বয়স ‘আসি’ হওয়া সত্ত্বেও যাঁকে দেখে আমি পঞ্চাশ বছরের প্রৌঢ় বলে ভুল করেছিলুম, সেই মুকুন্দবাবু দেখলুম গাড়িবারান্দার তলায় দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা গাড়ি থেকে নামবার উপক্রম করছিলুম। তিনি আমাদের নামতে দিলেন না। ড্রাইভারকে বললেন, “আরে বেওকুফ, এখানে গাড়ি থামালি কেন? সিধা গেস্ট-হাউসে নিয়ে যা। রাজাবাবু সেখানে এঁদের জন্যে অপেক্ষা করছেন।”

 

মূল বাড়ির পিছনেই গেস্ট হাউস। সেটাও দোতলা। একতলাটা বিচ্ছিন্ন হলেও একটা হ্যাংগিং ব্রিজ দোতলায় এই বাড়ি দুটোকে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে, সেটা আমার নজর এড়াল না। গেস্ট-হাউসের একতলা থেকে একটা চওড়া সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। ল্যান্ডিংয়ের সামনেই ড্রইংরুম। রামাশ্রয় চৌধুরি সেখানে একটা সোফায় বসে ছিলেন। আমরা গিয়ে ঢুকতেই দাঁড়িয়ে উঠে হাত জোড় করে বললেন, “আরে আসুন আসুন ভাদুড়িসাব। আসুন চাটার্জিসাব। আসুন বোসসাব। তারপর দেখুন এই গরিবখানা আপনাদের পসন্দ হয় কি না।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এ তো দেখছি তোফা ব্যবস্থা।”

 

চৌধুরিজি বললেন, “লেকিন শোবার ব্যাপারে থোড়া অসুবিস্তা হবে।”

 

বললুম, “কেন, অসুবিধ-ক্রীসের?”

 

“ওখানে তো তিনটা বেডরুম ছিল। কী, ছিল না?”

 

“তা ছিল বটে।”

 

“আমি জানি। এখানে কিন্তু দু’টা বেডরুম। তার একটা আপনাদের দুজনকে শেয়ার করতে হবে। কী, পারবেন না?”

 

সদানন্দবাবু একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে বললেন, “খুব পারব, খুব পারব। ও নিয়ে আপনি একটুও ভাববেন না, চৌধুরিজি। একটা ঘর কম পড়েছে তো কী হয়েছে? কেয়া, মহাভারত কি তাতে অশুধ হো গিয়া? আমি আর কিরণবাবু একই ঘরে শোব অখন!”

 

বুঝলুম ঘর একটা কম পড়ায় তিনি খুশিই হয়েছেন। নইলে আবার মাঝরাত্তিরে তাঁকে লজ্জার মাথা খেয়ে সেই আমার ঘরেই এসে ঢুকতে হত।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ-বাড়ির একতলায় কারা থাকে?”

 

চৌধুরিজি বললেন, “একতলায় গেস্ট-হাউসের কিচেন আর ডাইনিং হল। নোকর উকর ছাড়া রাত্তিরে আর কেউ থাকে না।”

 

“দুটো বাড়ির কিচেন আলাদা?”

 

“বিলকুল আলাদা। আমাদের বাড়িতে মাছ-মাংস চলে না, কিন্তু এখানে চলে। আপনাদের যা খেতে ইচ্ছা হয়, কুককে বলবেন, সে বানিয়ে দিবে।…একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। রাত্তিরে আপনারা ঘুমান কখন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিছু ঠিক নেই। ক্লান্ত বোধ করলে দশটাতেই ঘুমিয়ে পড়ি। আবার কখনও-কখনও রাত বারোটা-একটা পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়।”

 

“তো ঠিক আছে,” চৌধুরিজি বললেন, “এখন চা দিতে বলে দিচ্ছি। চা খেয়ে আপনারা একটু আরাম করুন। আটটায় আপনাদের ডিনার দেবে। আমি আসব ন’টার সময়। তখন কথা হবে।”

 

চৌধুরিজি উঠে পড়লেন। ভাদুড়িমশাই তাঁর ঘরে গিয়ে ঢুকলেন, আমরা আমাদের ঘরে। যেমন ঘর, তেমন বাথরুমটিও পরিচ্ছন্ন। একটু গরম বোধ হচ্ছিল। তাই স্নান সেরে বেরিয়ে এসে সদানন্দবাবুকে বললুম যে, ইচ্ছে করলে তিনিও তাঁর বৈকালিক স্নানটা সেরে নিতে পারেন। তাতে তিনি বললেন, “স্নান? সন্ধের সময়? এই নভেম্বর মাসে? পাগল?”

 

খানিক বাদেই বেয়ারা এসে বলল, চা দেওয়া হয়েছে। চায়ের সঙ্গে বিস্তর প্যাড়া আর কালাকাঁদ দেওয়া হয়েছে দেখলুম। সদানন্দবাবু চা খেলেন না, তবে প্লেট ভর্তি মিষ্টির দিকে তাকিয়ে যেভাবে হাসলেন, তাতে বুঝলুম, আপ্যায়নের এই প্রথম কিস্তি দেখে তিনি যারপরনাই খুশি হয়েছেন। প্লেট থেকে আস্ত একটা প্যাড়া মুখের মধ্যে চালান করে দিয়ে চোখ বুজে বললেন, “আঃ, এ মশাই দেওঘরের প্যাড়া না হয়ে যায় না। সেই কবে ছেলেবেলায় খেয়েছিলুম, কিন্তু তার স্বাদ এখনও ভুলিনি।”

 

ভদ্রলোকের স্মৃতিশক্তি যে অসাধারণ, সেটা স্বীকার করতেই হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *