কুড়ি
জানকী দেবী আর চৌধুরিজি যখন বিদায় নিলেন, তখন সন্ধে হয়ে গেছে। ওঁরা চলে যাবার পরে সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আংটিটা আপনি জঙ্গলের মধ্যে পেয়েছেন বললেন কেন?”
আমি বললুম, “ওটা তো আপনি বুগেনভিলিয়ার তলায় যেখানে একটা ঝোপের মতন হয়ে আছে সেইখানে পেয়েছেন, তাই না?”
সদানন্দবাবু মাথা চুলকে বললেন, “আসলে ‘বুশ’ বললেই ঠিক হত। কিন্তু শব্দটা তখন মনে পড়েনি। এঃ হে, বড্ড ভুল হয়ে গেছে।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তাতে কোনও ক্ষতি হয়নি। বরং আংটিটা ওই যে ওখানে পেয়েছেন, ওটাই হচ্ছে আসল কথা। খুব উপকার হয়েছে, মশাই।”
বললুম, “আজ আর কোথাও বেরুবার নেই তো?”
“না। দোতলা ছেড়ে এখন আর একতলাতেও নামছি না। রাতের খাবারটাও বরং দোতলায় দিয়ে যেতে বলুন। আটটার মধ্যেই দিয়ে দিক। তা হলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে পারব।”
ডিনার ঠিক আটটাতেই এসে গেল। খাওয়া শেষ হতে হতে সাড়ে আটটা। কাজের লোকটি এসে থালাবাসন নিয়ে চলে যাবার পর ড্রইং রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যান, এবারে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”
বললুম, “এত তাড়াতাড়ি?”
“তাড়াতাড়ি যখন উঠতে হবে, তখন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়াই তো ভাল।”
“তাড়াতাড়ি উঠতে হবে?” সদানন্দবাবু অবাক চোখে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কত তাড়াতাড়ি?”
“রাত আড়াইটের সময়।” ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সওয়া দুটোর সময় আমি আপনাদের ঘরের দরজায় টোকা দেব। সঙ্গে-সঙ্গে আপনি বেরিয়ে আসবেন। ঘরের দরজা বন্ধ করবার দরকার নেই। খুলতে গেলে শব্দ হতে পারে। আর হ্যাঁ, আলো জ্বালা চলবে না।”
সদানন্দবাবু কাতর গলায় বললেন, “আমি যে একটা ডিম আলো জ্বেলে রেখে ঘুমোই।”
“সেটা যখন রোজই জ্বলে, তখন আজও জ্বলুক। কিন্তু অন্য কোনও আলো জ্বালবেন না।” বললুম, “তারপর?”
“তারপর আপনাকে সঙ্গে করে আমি নীচে নামব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সদানন্দবাবু বরং উপরেই থাকুন, ওঁর তখন নীচে নামবার দরকার নেই।”
“ওরে বাবা,” সদানন্দবাবু চাপা গলায় আর্তনাদ করে উঠলেন, “আপনারা একতলায় নেমে যাবেন আর অন্ধকারে একা আমি দোতলায় বসে থাকব? তা হলে তো আমি ভয়েই মরে যাব, মশাই।”
“সরি, সদানন্দবাবু,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যে পোশাকে আমরা নীচে নামব, তা আমার সঙ্গে মাত্র দু’ সেটই আছে। আপনি অতএব উপরেই থাকবেন। আর তা ছাড়া, এটাও আপনি জেনে রাখুন, বিপদ যদি ঘটেই, তবে সেটা নীচে ঘটবে, উপরে ঘটবে না!”
সদানন্দবাবু চুপ করে রইলেন। ভাদুড়িমশাইয়ের শেষ কথাটা শুনে তিনি যে খুব নিশ্চিন্ত বোধ করছেন, ভদ্রলোকের মুখ দেখে তা অবশ্য মনে হল না। তবে শুয়ে পড়বার পরে খানিক বাদে তাঁর মৃদুমন্দ নাসিকাগর্জন শুনে বুঝতে পারলুম যে, যতই ভয় পেয়ে থাকুন, তাঁর নিদ্রার তাতে কোনও ব্যাঘাত ঘটেনি।
আমার চোখে ঘুম এল না। সাড়ে নটা থেকে দুটো, এই সাড়ে চার ঘন্টা সময় যে বিনিদ্র শয্যার কীভাবে কাটল, তা একমাত্র আমিই জানি। দরজায় টোকা পড়তে রেডিয়াম-ডায়ালের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, ঠিক সওয়া দুটোই বাজে। ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলুম। ভাদুড়িমশাইকে প্রথমে দেখতেই পাইনি। না-পাওয়াই স্বাভাবিক। তার কারণ আপাদমস্তক তিনি আঁটো কালো পোশাক পরে আছেন। কালো পায়জামা, কালো গেঞ্জি, কালো বাঁদুরে টুপি। তার ভিতর থেকে শুধু চোখ দুটো বেরিয়ে আছে। আমার হাতেও এক সেট কালো পোশাক তুলে দিয়ে চাপা গলায় বললেন, “চটপট পরে ফেলুন। এখুনি নীচে নামতে হবে।”
পোশাক পালটে, অন্ধকারের মধ্যেই সিঁড়ির ধাপগুলোকে ঠাহর করে নিতে-নিতে পা টিপে-টিপে আমরা নীচে নামলুম। ভাদুড়িমশাইয়ের বাঁ হাতে কালো রঙের ফুটখানেক লম্বা একটা রাবার কশ। ডান হাতে কালো চামড়ার প্ল্যাডস্টোন ব্যাগ। ব্যাগের মধ্যে কী কী থাকে, আমি জানি। থাকে নাইলনের এক বান্ডিল দড়ি আর কিছু ন্যাকড়া। কখনও-কখনও একটা রিভলভারও থাকে। আমার হাতে পাঁচ-ব্যাটারির কালো টর্চ। কিন্তু যতক্ষণ না তিনি জ্বালতে বলছেন, ততক্ষণ সেটা জ্বালা যাবে না।
যেভাবে দোতলা থেকে একতলায় নেমেছিলুম, ঠিক সেইভাবেই একতলার ডাইনিং হলের দরজা খুলে একেবারে নিঃশব্দে গেস্ট হাউস থেকে বাইরে বেরিয়ে এলুম আমরা। সামনে ড্রাইভওয়ের ধারে একটা বিশাল বড় ছাতিম গাছ। তার আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম। কৃষ্ণপক্ষের রাত। আকাশে চাঁদ নেই। থাকার মধ্যে আছে অগুন্তি নক্ষত্র। কিন্তু যতই ঝিকমিক করুক, অন্ধকার তাতে একটুও কাটছে না। সামনেই চৌধুরিবাড়ির পিছন দিক। অন্ধকারের মধ্যে তার আবছা অবয়বটা শুধু আন্দাজ করতে পারছিলুম। আর কিছু যে ঠাহর করতে পারব, তার উপায় নেই। এমন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার সম্ভবত একমাত্র মফস্বলেই দেখা যায়। আমার বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করে শব্দ হচ্ছিল, বুঝতে পারছিলুম যে, একটা-কিছু ঘটতে চলেছে। তার আর খুব দেরিও হয়তো নেই।
একেবারে হঠাৎই আমার পাশ থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলেন ভাদুড়িমশাই। একটা ঝটাপটির শব্দ শুনলুম। তারপরেই সব আবার স্তব্ধ। পরমুহূর্তেই ভাদুড়িমশাই আবার আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমার ডান হাতে হাত রেখে চাপা গলায় বললেন, “আলো জ্বালবেন না। ভয়ের কিছু নেই। লোকটা অজ্ঞান হয়ে গেছে। মিনিট পনেরোর মধ্যে জ্ঞান ফিরবে না। তবু যদি ফিরে আসে তো ঘাবড়াবেন না, এই রাবার কশটা রাখুন, নড়াচড়া করলেই এটা দিয়ে ওর মাথায় আর-এক ঘা ঝেড়ে দেবেন।”
ড্রাইভওয়ের উপরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে-থাকা লোকটার পাশে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই আবার সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। অন্ধকার ততক্ষণে আমার চোখে অনেকটা সয়ে এসেছে। তাই বুঝতে অসুবিধে হল না যে, ভাদুড়িমশাই চৌধুরিবাড়ির পিছনে সেই বুগেনভিলিয়ার ঝাড়টার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
ফিরে এলেন মিনিট পাঁচ-সাত বাদে। বললেন, “দেখুন তো কটা বাজে।”
হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললুম, “তিনটে। কারেক্ট সময় তিনটে দুই।”
“তা-ই হবার কথা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিন, এবারে টর্চ জ্বেলে ওর হাত-পা বেঁধে ফেলুন। এই নিন দড়ি আর ন্যাকড়া। মুখের মধ্যে যতটা পারেন, ন্যাকড়া গুঁজে দিন। লোকটা যেন চেঁচাতে না পারে। কেউ জেনে ফেললেই চিত্তির।”
টর্চ জ্বেলেই চমকে উঠেছিলুম। যে-লোকটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, আপাদমস্তক তার পরনেও কালো পোশাক। মুখ থেকে কালো বাঁদুরে টুপিটা সরিয়ে দিতে অবশ্য দ্বিতীয়বার চমকে উঠতে হল। রিয়াকে যে ড্রাইভিং শেখায়, এ তো সেই হাজারিলাল।
মুকুন্দবাবু যে এই সময়েই ঘটনাস্থলে এসে হাজির হবেন, তাও আমি আঁচ করতে পারিনি। মুকুন্দবাবুর সঙ্গে একজন পালোয়ান-মতন লোকও এসেছে দেখলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, আপনি ঠিক সময়েই এসে পড়েছেন দেখছি।”
মুকুন্দবাবু বললেন, “দুপুরবেলা আপনি বলিয়ে দিলেন যে, এই সময় আসতে হবে, আর আমি আসব না? সেটা কি হতে পারে?”
“যাকে নিয়ে এসেছেন, সে বিশ্বাসী তো?”
“বিলকুল। মরে গেলেও ভুখনের মুখ থেকে একটা কথা বার হবে না।”
“ঠিক আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভুখনকে তা হলে বলুন যে, হাজারিলালকে দোতলায় তুলে দিক। চারটে বাজতে চলল। রাত আর বেশি বাকি নেই। ওকে উপরে তুলে দিয়েই আপনারা চলে যান। বেশিক্ষণ এখানে থাকাটা আপনাদের ঠিক হবে না।”
হাজারিলালের শরীরটাকে একটা ঝটকা মেরে কাঁধে তুলে নিয়ে ভুখন তাকে গেস্ট হাউসের দোতলায় পৌঁছে দিল। তার পরেই তাকে সঙ্গে করে মুকুন্দবাবু নীচে নেমে পেলেন। হাজারিলালের জ্ঞান ইতিমধ্যে ফিরে এসেছিল। এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছিলও সে। কিন্তু চাউনি দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে, কিছুই সে ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারছে না।
সদানন্দবাবু ঘুম থেকে ওঠেন সাড়ে চারটের সময়। আজও উঠেছিলেন। তারপর, তিনিও যেহেতু কিছুই ঠাহর করতে পারেননি, তাই মুখে-চোখে জল দিয়ে, ভাদুড়িমশাইয়ের ঘরে আলো জ্বলছে দেখে, চৌকাঠে পা দিয়েই তিনি চমকে যান। ভদ্রলোককে এর আগে কখনও স্ট্যামার করতে দেখিনি। দেখলুম চোখ কপালে তুলে তোতলাতে তোতলাতে বললেন, “কী কী কী ব্যাব্যাপার মম্মম্ম… “ জিভে জড়িয়ে যাওয়ায় ‘মশাই’ শব্দটা আর শেষ পর্যন্ত বলতেই পারলেন না।
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “নেহাত মুখের মধ্যে কাপড় গোঁজা রয়েছে, নইলে হাজারিলালও এই একই প্রশ্ন করত। কিন্তু কিরণবাবু, আর ওকে বোবা বানিয়ে রেখে লাভ কী। কাপড় বার করে নিন, গোটাকয়েক প্রশ্ন করব।”
বললুম, “যদি চেঁচায়?”
“চেঁচাক না। চেঁচাবার সঙ্গে-সঙ্গেই রাবারের ওই ডান্ডাটা দিয়ে ওর মাথায় এক ঘা বসিয়ে দেবেন। ওহে হাজারিলাল, চেঁচাবে নাকি?”
হাজারিলাল দু’দিকে মাথা নাড়ল।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, লক্ষ্মী ছেলে। দিন কিরণবাবু, ওর মুখের ন্যাকড়া বার করে দিন। তারপর চামচে করে একটু জলও খাইয়ে দিন ওকে। নইলে কথা বলতে পারবে না।”
কথা বলবার ক্ষমতা ফিরে পেয়ে হাজারিলাল প্রথমেই বলল, “আমি একবার নীচে যাব।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কেন যাবে, তা আমি জানি। কিন্তু গেলেও তো সে জিনিস আর পাবে না হাজারিলাল। কী, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না? তা হলে দ্যাখো।”
প্ল্যাডস্টোন ব্যাগ খুলে ভাদুড়িমশাই যা বার করে আনলেন, তাতে আমাদের চোখ একেবারে ধাঁধিয়ে যাবার উপক্রম। হিরের নেকলেস। বাঁ হাতে সেটিকে তুলে ধরে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝতেই পারছ, কোনও ভুল হয়নি। তোমার হুকুম একেবারে অক্ষরে-অক্ষরে তামিল করা হয়েছিল। ঠিক তিনটের সময়েই ঝুপ করে এটি আকাশ থেকে পড়ল, আর আমিও একেবারে সঙ্গে-সঙ্গে এটি তুলে নিলুম। …তা এইবার কানহাইয়ার মুকুট আর সোনার নেকলেসটিও যদি পেয়ে যাই, তা হলে আর কোনও ভাবনা থাকে না। সে দুটো জিনিস কোথায়?”
হাজারিলাল বলল, “তা আমি কী করে বলব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে বরং আমিই বলি, কেমন? আমার বিশ্বাস, জিনিস দুটো আর কারও কাছে তোমার পাঠাবার কথা ছিল। কিন্তু তুমি পাঠাতে পারোনি। কিংবা পাঠাওনি। এইজন্যে পাঠাওনি যে, চোরের উপর বাটপাড়ি হতে পারে, এই ভয়টা তোমার ছিলই। কিংবা এমনও হতে পারে যে, সবটা তুমি একাই মেরে দিতে চেয়েছিলে। বোধহয় এই শেষের কথাটাই ঠিক। তা হলে তো ও দুটো জিনিস তোমার কাছেই থাকবার কথা। কী, ভুল বললুম?”
হাজারিলাল বলল, “আমি কিছু জানি না।”
“অর্থাৎ জানো, কিন্তু বলবে না।” হঠাৎ পালটে গেল ভাদুড়িমশাইয়ের গলা। এতক্ষণ হালকা গলায় কথা বলছিলেন, এবারে গম্ভীর হয়ে বললেন, “জিনিস দুটো কোথায় আছে বলো, নইলে মুশকিলে পড়বে।”
“কী আর মুশকিলে পড়ব? চুরি করিনি, তবু আমাকে জেলে পাঠাবেন এই তো?”
“না রে বাপু,” ভাদুড়িমশাইয়ের গলায় আবার সেই হালকা মেজাজ ফিরে এল, “গুড কনডাক্টের জন্যে যে-লোক পুরো মেয়াদ না-খেটে আগেই ছাড়া পেয়ে গেছে, আর কি তাকে জেলে পাঠানো যায়? আর তা ছাড়া, পুলিশের যা রকম-সকম আজকাল দেখছি, হয়তো তোমাকে আদালতে প্রোডিউসই করবে না। থানা-হাজতেই হয়তো পিটিয়ে মেরে ফেলবে। তা যে মারবে না, তার তো কোনও গ্যারান্টি নেই।”
হাজারিলালের মুখে এবারে যা ফুটে উঠল, সেটা একেবারে নির্ভেজাল আতঙ্ক। নভেম্বরের শেষ রাত্রি। বাতাস রীতিমত ঠাণ্ডা। কিন্তু দেখলুম তার কপালে ঘাম জমে উঠতে শুরু করেছে। ভাদুড়িমশাইও সেটা লক্ষ করেছিলেন। বললেন, “কম্বল দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে পিটিয়ে মারবে। যাতে শরীরে কোনও দাগ না থাকে। তারপর তোমার গলায় একটা দড়ি বেঁধে কড়িকাঠ থেকে ঝুলিয়ে দিয়ে বলবে, সুইসাইড করেছে। এমন তো আজকাল আকছার হয়। জানো না?”
হাজারিলাল যে এত সহজে ভেঙে পড়বে, তা ভাবিনি। কিন্তু তা-ই পড়ল। শুকনো ঠোঁটের উপরে জিভটাকে বার-দুই বুলিয়ে নিয়ে বলল, “জিনিস দুটো ফেরত পেলে কি আমাকে ছেড়ে দেবেন?”
“একেবারে ছেড়ে হয়তো দেব না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু কেউ যাতে তোমার হাড়গোড় ভেঙে না দেয়, সেটা দেখব। হাড়গোড় কি শুধু পুলিশেই ভেঙে দেয়, হাজারিলাল? ভুখনকে চেনো তো?”
“চৌধুরিজির পাইক? ও তো ডাকাত ছিল।”
“জানো দেখছি। তো ওর হাতে যদি তোমাকে ছেড়ে দিই তো পুলিশ ডাকতে হবে না। যা করবার ভুখনই করতে পারবে।…আরে, অত ভয় পাচ্ছ কেন? জিনিস দুটোর হদিশ জানিয়ে দাও তো পুলিশকেও ডাকব না, ভুখনকেও ডাকব না।”
মুকুট আর সোনার নেকলেসের খোঁজ জানাতে হাজারিলাল এর পরে আর দেরি করেনি। শিবমন্দিরের পাশে একটা বেলগাছের তলায় মাটির হাতখানেক নীচে হাজারিলাল তার চোরাই মাল পুঁতে রেখেছিল। ভাদুড়িমশাই যখন জিনিস দুটোকে সেখান থেকে উদ্ধার করে আনেন, তখন সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। তবে বাড়িসুদ্ধ মানুষজনের মধ্যে কারও তখনও ঘুম ভাঙেনি।
গেস্ট হাউসে ফিরে এসে সোনার মুকুট আর সোনার নেকলেস তাঁর গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগে ঢুকিয়ে, হাজারিলালের হাত আর পায়ের বাঁধন খুলে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “নাঃ, তোমাকে আটকে রেখে লাভ নেই। তুমি গুণী মানুষ, তোমাকে তাই ছেড়েই দিচ্ছি, হাজারিলাল। বলতে পারো, সৎভাবে জীবন কাটাবার এটাই তোমার শেষ সুযোগ। তবে একটা কথা তোমাকে বলে দিচ্ছি। বোম্বাইয়ে ফিরে যেয়ো না। সেখানে গেলে নেকিচাঁদ মাখিজার গ্যাঙের হাতে তুমি খুন হবে।”
মাথা নিচু করে ঘর থেকে হাজারিলাল বেরিয়ে গেল।
সদানন্দবাবু বললেন, “ওকে গুণী লোক বললেন কেন? ছেড়েই বা দিলেন কেন? ও তো ঘোর বদমাস।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার মানে লোকটাকে আপনি চিনতে পারেননি।…কিরণবাবু, আপনি পেরেছেন?”
বললুম, “না তো। আগে কখনও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”
“চেহারা পালটে গেছে, তাই চিনতে পারেননি। আমি কিন্তু ঠিকই চিনেছিলুম।’
“কে লোকটা?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আনোয়ার পাশা।”
সদানন্দবাবু বললেন, “অ্যাঁ, সেই ম্যাজিশিয়ান? মানে মিসেস সান্যালের …মানে আপনার বোনের বন্ধুকে….।”
“হ্যাঁ,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঘটনাচক্রে নিজেই আজ ইঁদুর হয়ে গেছে বটে, তবে মালতীর বন্ধু সুলোচনাকে একদিন এই লোকটাই বেড়াল বানিয়ে দিয়েছিল। ম্যাজিশিয়ান হয়তো সত্যিই খুব বড় নয়, তবে হিপনোটিস্ট হিসেবে ওর তুলনা হয় না।”
