রাত তখন তিনটে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

ঊনিশ

সাড়ে আটটায় বেরিয়ে পড়ার কথা। তাই ঘুম থেকে উঠে, মুখ-হাত ধুয়ে স্নান সেরে নিয়ে কাঁটায় কাঁটায় আটটায় সময় একতলায় ডাইনিং হলে এসে হাজির হয়েছিলুম। এসে দেখি ভাদুড়িমশাই আর সদানন্দবাবু আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, একেবারে ঠিক-সময়ে এসে গেছেন। তা হলে খাবার দিতে বলি, কেমন? সাড়ে আটটাতেই কিন্তু বেরিয়ে পড়ব।”

 

বললুম, “সে তো বেরুতেই হবে। গৌতমের ওখান থেকে কাল টেলিফোনে যা বললেন, তা কি আর ওভারহিয়ার করিনি ভাবছেন? কাকে ফোন করেছিলেন, জানি না, তবে সকাল নটা থেকে দশটার মধ্যে তাকে যে আবার ফোন করবেন, সেটা জানি।”

 

ব্রেকফাস্ট এসে গিয়েছিল। নিমকি আর আলু-মরিচ। প্লেট থেকে একটা নিমকি তুলে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “শাবাশ কিরণবাবু, আপনার কান দুটো তা হলে ফের অ্যাকটিভ হয়ে উঠেছে দেখছি। এবারে চোখ দুটোকেও যদি একটু অ্যকটিভেট করে তোলেন তো বড্ড ভাল হয়। … না না, মোটেই ঠাট্টা করছি না। আজকের দিনটা আপনাকে একটু অ্যালার্ট থাকতে হবে।”

 

সাড়ে আটটায় কিন্তু বেরিয়ে পড়া গেল না। টেবিল ছেড়ে আমরা যখন উঠবার উপক্রম করছি, ঠিক সেই মুহূর্তে এক ভদ্রমহিলা ডাইনিং হলে এসে ঢুকলেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে আসুন, বেহনেজি। তা হলে দানাপুর এক্সপ্রেসেই এলেন? কোনও কষ্ট হয়নি তো?”

 

“না, ভাদুড়িদা,” ভদ্রমহিলা বললেন, “বাঙ্গালোর থেকে যাত্রা করবার আগে কলকাতায় এক বন্ধুকে ফোন করে বলেছিলাম, শনিবার রাতে দানাপুর এক্সপ্রেসে একটা বার্থ চাই। তার সঙ্গে রেলের লোকের জান-পয়ছান আছে, তাই ভি.আই.পি. কোটা থেকে লাস্ট মোমেন্টে একটা ব্যবস্থা করতে পারল।”

 

ইনিই যে চৌধুরিজির বড়িদিদি জানকী দেবী, সেটা বুঝতে পেরেছিলুম। ভদ্রমহিলার পরনে সাদা সিল্কের থান, মাথার চুলও ধবধবে সাদা। বাঁ হাতে একটি রিস্টওয়াচ, ডান হাত খালি। কপালে শ্বেতচন্দনের ফোঁটা। বয়স বোধহয় ষাট-পঁয়ষট্টির মতো। সব মিলিয়ে বেশ সম্ভ্রম উদ্রেক করবার মতো চেহারা।

 

ভাদুড়িমশাই গলার স্বর নামিয়ে বললেন, “একটি কথা জিজ্ঞেস করছি, বেহেনজি, কিছু মনে করবেন না। আপনি যে হঠাৎ এইভাবে বাঙ্গালোর থেকে এখানে চলে আসবেন, সেটা চৌধুরিজি জানতেন?”

 

জানকী দেবী হেসে বললেন, “না। মুকুন্দবাবুকে বলে দিয়েছিলাম, একমাত্র আপনাকে ছাড়া দুসরা-কাউকে যেন না জানায়। কেন, ভাইয়া কুছু ঝামেলা করছে?”

 

“এখনও করেননি।” ভাদুড়িমশাই চিন্তিত গলায় বললেন, “কিন্তু অ্যাকসিডেন্ট আর চুরির ব্যাপারে সব কথা আপনি জানেন তো?”

 

“কানাহাইয়াজির মুকুট আর সোনার নেকলেস চোরি হয়েছে, সেটা জানি। মুকুন্দবাবুই জানিয়েছেন।”

 

“আর অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারে?”

 

“সেটা বোধহয় আপনার চেয়ে একটু বেশি জানি। কিন্তু কতটা বেশি জানি, সেটা আপনাকে বলব না। কিউকি আমার তো সবই অন্যের মুখে শোনা কথা, তার মধ্যে গলতি থাকতে পারে। আমি তো আনপড় আওরত, কোনটা সচ আর কোনটা ঝুট তা সব সময় বুঝে উঠতে পারি না।”

 

কথাটা শুনে ভাদুড়িমশাই বিষণ্ণ হাসলেন। তারপর বললেন, “আমার বিশ্বাসের কথাটা বলব?”

 

“বলুন।”

 

“আমার বিশ্বাস, আপনি যা জেনেছেন, সেটা ঠিকই জেনেছেন, বেহেনজি। জেনে যে খুব কষ্ট পেয়েছেন তাও বুঝতে পারি।”

 

জানকী দেবীর ভুরু কুঁচকে গেল। বললেন, “মুকুন্দবাবু কিছু বলেছেন আপনাকে?”

 

“তা-ই কখনও বলেন?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তিনি এ-বাড়ির নিমক খান না? তবে হ্যাঁ, তাঁর মুখ ফসকে দুটো কথা বেরিয়ে গিয়েছিল বটে। ‘অগস্ট মাস’ আর ‘বিকেলবেলা’। তার মধ্যে আবার এই অগস্ট মাসের কথাটা দেখলুম মধুপুরের লোকেরাও জানে, ওটা না-বললেও কোনও ক্ষতি ছিল না। বাকি রইল ‘বিকেলবেলা’। তা, বেহেনজি, আপনি তো আমাকে জানেন, অ্যাকসিডেন্ট যে কখন হয়েছিল, রাত্তিরে না বিকেলে, নিজের চেষ্টাতেই সেটা আমি ঠিক বার করে ফেলতুম। তবে কিনা তাতে হয়তো আরও একটা দিন সময় নষ্ট হত, মুকুন্দবাবু সেটা বাঁচিয়ে দিয়েছেন।”

 

“অর্থাৎ সত্যিই ওটা বিকেলবেলায় হয়েছিল?”

 

“কখন হয়েছিল সেটা আসল কথা নয়, বেহেনজি,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোথায় হয়েছিল আর কী করে হয়েছিল, সেটাই হচ্ছে আসল কথা। তা সেই আসল কথাটা যদি আমি জানিয়ে দিই, চৌধুরিজি তা হলে খেপে যাবেন না তো?”

 

“খেপে যাবে কেন?”

 

“বাঃ, যা তিনি চেপে রাখতে চান, সেটাই তো তখন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। খেপে গিয়ে তিনি তো একটা ঝামেলা তখন পাকাতেই পারেন।”

 

জানকী দেবী হেসে বললেন, “ভাইয়াকে যেটা বলবার, সেটা আমার সামনে বলবেন। তা হলে আর কোনও ঝামেলা হবে না।”

 

ভাদুড়িমশাইও এবার হেসে ফেললেন। বললেন, “একমাত্র আপনাকেই যে উনি ভয় পান, তা আমি জানি। ঠিক আছে, তা হলে আজ বিকেল চারটে নাগাদ ওঁকে সঙ্গে নিয়ে গেস্ট হাউসের দোতলায় চলে আসুন, যা বলবার তখনই বলা যাবে। আপনি যখন রয়েছেন, তখন আর ভাবনা কী, আই শ্যাল জাস্ট গিভ হিম আ বিট অব মাই মাইন্ড।”

 

“তার মানেটা কী হল? ওঁকে বকাঝকা করবেন?”

 

“তা একটু করব বইকী।” হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু বেহেনজি, এখন আর আমি দাঁড়াতে পারছি না। একবার গিরিডি যেতে হবে। খুব জরুরি দরকার।”

 

.

 

স্পিডোমিশারের কাঁটাটাকে ডাইনে ঝুলিয়ে দিয়েও গিরিডিতে পৌঁছতে-পৌঁছতে প্রায় দশটা বেজে গেল। গৌতম তখন বাড়িতে ছিল না। তবে দোতলায় উঠে বুঝলুম যে, আমরা যে সকালবেলায় আসব, বাড়ির লোকেরা তা জানে। গৌতমের স্ত্রী বলল, “বসুন, মেসোমশাই। চা খেয়ে তারপর ফোন করবেন।”

 

ভাদুড়িমশাই ডায়াল করতে-করতে বললেন, “তোমার চা আনতে আনতে আমার কথা বলা শেষ হয়ে যাবে।”

 

কথাটা ভুল বলেননি। রবিবার, লাইনে ভিড় নেই, প্রথমবারের চেষ্টায় বম্বের লাইনটা পাওয়া গেল না বটে, কিন্তু দ্বিতীয়বার ডায়াল করবার পরেই ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে যে-রকম হাসি ফুটতে দেখা গেল, তাতে বুঝলুম, কানেকশন পেয়ে গেছেন। আবার সেই একতরফা কথাবার্তা।

 

“ফাইভ জিরো ডাবল এইট। রিপিট ফাইভ জিরো ডাবল এইট। যা-যা জানতে পেরেছ, বলে যাও।”

 

“হোয়াট? এক নম্বর পার্টি থানায় এসে সারেন্ডার করেছে? আজ সকালে?”

 

*

 

“ঠিক আছে, আপাতত আর ও নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। কিন্তু সেকেন্ড পার্টি এখন কোথায় আছে, কী করছে, সেটাও জানা দরকার। পুলিশে একটু খোঁজ নিতে পারবে?”

 

*

 

“কী বললে? খোঁজ নিয়েছিলে? নো ট্রেন্স সিন্‌স জুন? ভাল, ভাল! নাউ হোয়াট অ্যাবাউট দ্য থার্ড বার্ড?”

 

*

 

“আছে? ওই নামেই আছে? বাঃ, চমৎকার। তা তুমি ছুটি চাইছিলে না? যাও, এবারে বউকে নিয়ে হপ্তাখানেকের জন্যে গোয়া থেকে ঘুরে এসো। কালই চলে যাও।”

 

*

 

“ও ইয়েস, অফ কোর্স ইট উইল বি এক্সপেন্স অ্যাকাউন্ট। গোয়া থেকে ঘুরে এসে এয়ার-টিকিট আর হোটেলের বিল ব্যাঙ্গালোরের অফিসে পাঠিয়ে দিয়ো।…থ্যঙ্কস আ লট অ্যান্ড হ্যাপি জার্নি।”

 

রিসিভার নামিয়ে রেখে, একগাল হেসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা যা খবর পাবার দরকার ছিল, সব পেয়ে গেছি। বাস, জিগ-স পালের ঘুঁটিগুলো এবারে ঠিক-ঠিক জায়গায় বসে যাবে।”

 

গৌতমের স্ত্রী চা নিয়ে এসে ঘরে ঢুকেছিল। ট্রেটাকে সেন্টার টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাইকে বলল, “লাইন পেলেন মেসোমশাই?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “লাইন পেয়েছি, কথা বলাও শেষ।”

 

বললুম, “তা হলে কি এবারে চা খেয়ে মহেশমুণ্ডায় ফিরে যাব?”

 

“এখানে তো আপাতত আর কোনও কাজ নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে হ্যাঁ, গৌতমের সঙ্গে দেখাটা হয়ে গেলে ভাল হত। কাল রাত্তিরের গাড়িতে তো কলকাতায় ফিরছি, রিজার্ভেশনটা হল কি না, সেটা জানা দরকার।”

 

গৌতম প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘরে এসে ঢুকল। ভাদুড়িমশাইয়ের শেষ কথাটা সে শুনতে পেয়েছিল নিশ্চয়। সোফায় এসে বসতে-বসতে বলল, “রিজার্ভেশন হয়ে গেছে। দুটো লোয়ার বার্থ, একটা আপার।”

 

বেড-টি আর ব্রেকফাস্ট মিলিয়ে সদানন্দবাবুর দু’কাপ চা ইতিমধ্যেই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। থার্ড কাপ খাবেন বিকেলবেলায়। সুতরাং এখন আর তিনি চা খেতে রাজি হলেন না। তাতে ভালই হল। দুধ-চিনি মিশিয়ে তাঁর কাপটাই তুলে দেওয়া হল গৌতমের হাতে।

 

চা খেতে-খেতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহে গৌতম, রিয়াকে আজ দেখতে গিয়েছিলে তো?”

 

“সেখান থেকেই তো ফিরছি। পেশেন্টের অবস্থা ভাল দেখলুম না মেসোমশাই। কথাই বলতে চায় না। চাউনিও সেই আগের মতোই ভেকান্ট। দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে একেবারে গুম হয়ে বসে আছে।”

 

“কাগজের টুকরোটার কথা তোমার মনে ছিল তো?”

 

“বিলক্ষণ।” গৌতম হেসে বলল, “মেঝের উপরে ফেলে রেখে এসেছি। অ্যাজ পার ইনস্ট্রাকশন।”

 

চা খাওয়া শেষ হতেই আমরা উঠে পড়লুম। নীচে নেমে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এস.পি.-র বাংলোটা একবার ছুঁয়ে যাব ভাবছি। না না, গাড়ি থেকে আপনাদের নামতে হবে না, ভিতরে গিয়ে জাস্ট একটা ধন্যবাদ জানিয়ে চলে আসব।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “সেটা তো জানানোই উচিত। ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে খুবই কো-অপারেট করেছেন।”

 

তো তা-ই হল। এস. পি.-র বাংলোয় ঢুকে ভাদুড়িমশাই তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার গাড়িতে এসে উঠলেন। তাতেও অবশ্য মিনিট কুড়ি সময় গেল। আমি আর সদানন্দবাবু এই কুড়িটা মিনিট গাড়ির মধ্যেই বসে ছিলুম, নামিনি।

 

মহেশমুণ্ডায় যখন ফিরলুম, তখন সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। মুকুন্দবাবু গেস্ট হাউসের ডাইনিং হলে বসে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। বললেন, “আপনাদের খাবার কি উপরে ভেজে দিব?”

 

ভেজে দেওয়া মানে যে এ-ক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া, সেটা বুঝতে সদানন্দবাবুর আর এ-যাত্রায় কোনও ভুল হল না। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “তার আর দরকার কী, রান্না যদি হয়ে গিয়ে থাকে তো একেবারে খাওয়ার পাট চুকিয়ে তারপর উপরে উঠলেই তো হয়।”

 

বুঝতে পারলুম, জল-হাওয়ার গুণে ভদ্রলোকের খিদেটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠেছে।

 

খাওয়ার পরে মুকুন্দবাবুও আমাদের সঙ্গে দোতলায় উঠে এসেছিলেন। বললেন, “বড়িদিদির সঙ্গে আপনাদের দেখা হয়েছে?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “হয়েছে। এবার আপনাকে একটা কথা বলি?”

 

“বলুন।”

 

“আজ আর আপনি এ-দিকে আসবেন না। এটা আপনার ভালর জন্যেই বলছি।”

 

কথাটা শুনে মুকুন্দবাবু যে অবাক হয়ে গেছেন, সে তাঁর মুখ দেখেই বোঝা গেল। কেন যে তাঁকে আজ আর এ-দিকে আসতে বারণ করা হচ্ছে, তা আর তিনি জিজ্ঞেস করলেন না, একটুক্ষণ বিভ্রান্তভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর নিঃশব্দে নীচে নেমে গেলেন।

 

ভাদুড়িমশাই তাঁকে দেড়তলার ল্যান্ডিং অব্দি এগিয়ে দিয়ে ফিরে আসবার পরে জিজ্ঞেস করলুম, “ওঁকে আসতে নিষেধ করলেন কেন?”

 

“মালিক যেখানে ধমক খাবে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার ত্রিসীমানায় কোনও কর্মচারীর না-আসাই ভাল। তবে যখন আসবার, তখন উনি ঠিকই আসবেন। …যান, আপনারা গিয়ে বিশ্রাম করুন। চারটের সময় চৌধুরিজিকে সঙ্গে করে বেহেনজিকে এখানে আসতে বলেছি। ইচ্ছে হলে ততক্ষণ আপনারা ঘুমিয়ে নিতে পারেন।”

 

জানকী দেবী আর চৌধুরিজি যে ঠিক চারটের সময়েই চলে আসবেন, সেটা ভাবতে পারিনি। আমরা অবশ্য তার খানিক আগেই ড্রইং রুমে এসে বসেছি। সদানন্দবাবুর খিদের ব্যাপারটা নিয়ে হালকা দু’একটা কথা হচ্ছিল। তারই মধ্যে দুই ভাইবোন এসে ঘরে ঢুকলেন। জানকী দেবী বললেন, “আপনাদের চা খাওয়া হয়ে যায়নি তো?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না। আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলুম।”

 

“ভালই হল। চায়ের কথা আমি নীচে বলে দিয়ে এসেছি। এখুনি দিয়ে যাবে।”

 

চৌধুরিজি বললেন, “অ্যাকসিডেন্টের বেপারে আপনি কী জানতে পারলেন?”

 

ভাদুড়িমশাই তক্ষুনি যে এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলেন না, তার কারণ, বেয়ারা ইতিমধ্যে চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে এসে ঢুকেছিল। সেন্টার টেবিলে ট্রেটা রেখে সে চলে যাবার পরে বললেন, “যা জেনেছি, সত্যিই কি সেটা আপনি শুনতে চান?”

 

“কেন শুনব না? আমি আপনাকে কাজে লাগালাম না? সেটা তা হলে লাগালাম কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মিথ্যে কথা, আপনি আমাকে অ্যাকসিডেন্টের তদন্ত করতে নয়, স্রেফ দুটো চুরির তদন্ত করতে বলেছেন। আসলে আপনি ভাবতেই পারেননি যে, অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারটা নিয়েও আমি মাথা ঘামাতে বসব।”

 

“ঠিক আছে। সেটা মানলাম। কিন্তু বেকার ওটা নিয়ে মাথা ঘামাতে বসলেন কেন, সেটা বুঝলাম না।”

 

“কেন যে মাথা ঘামাতে বসলুম, তা তো কালই আপনাকে বলেছি। অ্যাকসিডেন্ট আর চুরি, দুটোর মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে। আপনি সেটা বুঝতে পারেননি বলেই অ্যাকসিডেন্টটা কখন ঘটেছে, কোথায় ঘটেছে আর কীভাবে ঘটেছে, সেটা আপনি চেপে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু এই করে যে নিজের বিপদ আপনি নিজেই আরও বাড়িয়ে তুলেছেন, সেটুকু বুঝবার মতো বুদ্ধিও আপনার নেই। ইউ আর অ্যান আটারলি স্টুপিড ফেলো!”

 

চৌধুরিজির চোখ দুটো একেবারে দপ করে জ্বলে উঠল হঠাৎ। দাঁতে দাঁত ঘষে তিনি বললেন, “বাস, আর কুছু আমি শুনতে চাইছি না। আমাকে হেল্প করতে হবে না, আপনার কাজ খতম, আপনি চলে যেতে পারেন। আমার বাড়িতে বসে আমাকেই আপনি গালমন্দ করবেন, সেটা আমি বরদাস্ত করব না।”

 

সোফা ছেড়ে চৌধুরিজি উঠে পড়বার উপক্রম করছিলেন, জানকী দেবী তাঁর হাত ধরে ফের বসিয়ে দিয়ে বললেন, “আরে বেওকুফ, তু মরনে মাংতা কেয়া? চুপচাপ বৈঠ যা! নেহি তো…”

 

নইলে যে তিনি কী করবেন, জানকী দেবীকে তা আর বলতে হল না। যেটুকু বলেছিলেন, তাতেই কাজ হল। চৌধুরিজি বললেন, “ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায়। কিসিকো যানেকা জরুরত হ্যায় নেহি, ম্যায় হি সবকুছ ছোড়কে চলা যাউঙ্গা।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনি কেন যাবেন? আর মাত্র একটা দিন, তারপর তো আমরাই চলে যাচ্ছি। কালই আমরা কলকাতায় ফিরব, তার রিজার্ভেশনও হয়ে গেছে।”

 

জানকী দেবী বললেন, “সে কী, কাজ শেষ না করেই আপনি চলে যাবেন?”

 

“কাজ তো শেষ হয়ে গেছে,” ভাদুড়িমশাই হালকা গলায় বললেন, “চৌধুরিজি রেগে গিয়ে বলেছেন বটে, কিন্তু কথাটা তাই বলে ভুল বলেননি, এখানে আমাদের কাজ সত্যিই খতম। তদন্তের কাজ আর কিছু বাকি নেই, বেহেনজি। বাকি শুধু হাতে-নাতে চোর ধরবার কাজ। তা চৌধুরিজির মিথ্যোটা যখন ধরতে পেরেছি, তখন চোরও ধরে দিতে পারব!”

 

ভেবেছিলুম ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে চৌধুরিজি আবার ফোঁস করে উঠলেন। কিন্তু তা তিনি উঠলেন না। তার বদলে শান্ত গলায় বললেন, “আমি মাফি মাঙছি, ভাদুড়িসাব। কিন্তু মিছা কথা কেন আমাকে বলতে হয়েছিল, সেটা কি আপনি বুঝতে পারলেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও পেরেছি, চৌধুরিজি। আর সেই জন্যেই আপনাকে যতই না কেন বোকা ভাবি, এখন আর খুব খারাপ লোক আমি ভাবতে পারছি না। আর-কিছু না হোক, পারিবারিক সম্মানের কথাটা আপনার মাথায় ছিল। ইউ ডিড হোয়াট দ্য হেড অভ আ ফ্যামিলি শুড ডু। তো আপনি যা করেছিলেন, আপনার দিদিকে সেটা বলা যেতে পারে।”

 

জানকী দেবী বললেন, “কী হয়েছিল ভাদুড়িদাদা?”

 

“কী হয়নি, সেটাই বরং আগে বলি। অ্যাকসিডেন্টটা সেপ্টেম্বর মাসে হয়নি। ওটা অগস্ট মাসে হয়েছিল। হাইওয়েতে হয়নি। অন্য কোথাও হয়েছিল। উল্টোদিক থেকে আসা কোনও ট্রাকের সঙ্গে হয়নি। ধাক্কা লেগেছিল ফিয়াট গাড়ির পিছনে। ঘটনাটা রাত্তিরে ঘটেনি। বিকেলবেলায় ঘটেছিল। … কী চৌধুরিজি, আমি কি ভুল বলছি?”

 

“না। কিন্তু কোথায় ঘটেছিল কীভাবে ঘটেছিল, সেটা আপনি বুঝতে পেরেছেন?”

 

“তাও বোধহয় পেরেছি। আমার অনুমান, যা কিছু ঘটবার তা ঘটেছিল এই বাড়ির মধ্যেই। ঘটনাটা আমি যেভাবে ভিওয়ালাইজ করছি, সেটা এইরকম। শাটার খুলে গ্যারাজ থেকে গাড়ি বার করে আনা হল। শাটার আবার নামিয়ে দেওয়া হল। শাটারের সামনে রঘুনন্দন দাঁড়িয়ে আছে। সে তার বউয়ের গাড়ি চলানো শেখা দেখছে। স্টিয়ারিং হুইলে রিয়া। পাশে ড্রাইভার। গাড়ি এবারে সামনে এগোবে। খানিকটা এগোলও। কিন্তু তার পরে আর এগোল না। তার বদলে দারুণ স্পিডে ব্যাক করে গ্যারাজের শাটারে গিয়ে ধাক্কা মারল। রঘুনন্দন মরে যেতে পারত। মরেনি, সে তার ভাগ্য। কিন্তু সত্যি কি তার স্পাইনাল কর্ড ভেঙে গেছে চৌধুরিজি?”

 

“না।” চৌধুরিজি বললেন, “ওটা মিছা কথা। তবে ডান পায়ের থাই-বোন ভেঙেছে, আর বাঁ-পায়ের মালাইচাকি।”

 

“তৎক্ষণাৎ ধানবাদে কি পাটনায় নিয়ে গিয়ে বড় হাসপাতালে ভর্তি করাননি কেন?”

 

“পুলিশ-কেসের ভয়ে, লোক জানাজানির ভয়ে।” চৌধুরিজি বললেন, “আমার বাড়িতে আমার বহু আমার বেটাকে গাড়িচাপা দিল, এটা জানলে লোকে কী বলত? সব লোক হাসাহাসি করত না? টিটকারি দিত না?”

 

জানকী দেবী বললেন, “আরে বেওকুফ, তোর টিটকারির ভয়টাই বড় হল? তো রঘুনন্দনকে তুই কলকাতায় নিয়ে গেলি না কেন?”

 

চৌধুরিজি অস্ফুট গলায় বললেন, “সেটাই নিয়ে যাব ভাবছি বড়িদিদি। বহুকেও নিয়ে যেতে হবে, তবিয়ত তারও ভাল যাচ্ছে না, তাকেও ডাক্তার দেখানো দরকার।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বহুকে নিয়ে যেতে চান, সে ভালই। তবে তাকে আর বোধহয় ডাক্তার দেখাতে হবে না। রিয়ার অসুখ আমার মনে হয় দু-এক দিনের মধ্যে সেরে যাবে।”

 

চৌধুরিজি বললেন, “আপনি সেটা কী করে জানলেন, ভাদুড়িসাব?”

 

“দু’দিন দেখলে আপনিও জানতে পারবেন, চৌধুরিজি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কিন্তু সে-কথা থাক। আমি তো বলেছি যে, অ্যাকসিডেন্ট আর চুরি, এ দুটো ব্যাপার আলাদা নয়, ইন্টারলিংকড। এবারে বরং চুরির কথায় আসি। চুরি তো গিয়েছে একটা সোনার মুকুট আর একটা সোনার নেকলেস। তো আপনার বাড়িতে একটা হিরের নেকলেসও আছে নাকি?…কী হল, অমন হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কেন?”

 

চৌধুরিজির চোয়াল সত্যি ঝুলে পড়েছিল। সেটাকে আবার যথাস্থানে ফেরত পাঠিয়ে তিনি বললেন, “আছে। সেটার দাম কতো হবে বলতে পারবেন?”

 

“কী করে বলব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “জিনিসটা তো চোখেই দেখিনি। দেখলে হয়তো বলতে পারতুম।”

 

“ঠিক আছে। আপনারা বসুন। আমি এনে দেখাচ্ছি।” চৌধুরিজি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মিনিট দশেক বাদে যখন ফিরে এলেন, তখন তাঁর অবস্থা একেবারে ঝড়ে-ভাঙা বটগাছের মতো। সোফার উপরে ধপ করে বসে পড়ে শূন্য চোখে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সেটা নাই।”

 

জানকী দেবী সম্ভবত কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মুখ না খুলতেই ভাদুড়িমশাই তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “চুপ বেহেনজি। ওটা যে থাকবে না, তা আমি আন্দাজ করেছিলুম। কিন্তু না, এখন আপনারা একটিও কথা বলবেন না।” তারপর চৌধুরিজির দিকে তাকিয়ে বললেন, “হিরের নেকলেসটা যে নেই, সেটা কি চৌধুরানিকে আপনি বলেছেন? কিংবা বহুকে?”

 

চৌধুরিজি একেবারে ডুকরে উঠলেন। “কাউকে বলিনি। কী করে বলব? ওটার কিম্মত কম-সে কম আট-দশ লাখ হবে। হায় হায়, আমার সর্বনাশ হয়ে গেল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি আপনাকে আগেই সাবধান করে দিয়েছিলুম। বলেছিলুম যে, আরও চুরি হবে। বলিনি?”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের হাত দুখানা জড়িয়ে ধরে চৌধুরিজি বললেন, “হাঁ, সেটা আপনি বলেছিলেন। কিন্তু এখুন আমার কী হবে ভাদুড়িসাব?”

 

“সেটা কাল বলতে পারব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেহেনজিকে নিয়ে এখন আপনি বাড়ি চলে যান। লেকিন কাউকে কিছু বলবেন না। আজ আর আমার সঙ্গে দেখা করবার দরকার নেই।…আর হ্যাঁ, পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা মোড়ক বার করে সেটা চৌধুরিজির দিকে এগিয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন তো, এটা আপনাদের জিনিস কি না।”

 

মোড়ক খুলে চৌধুরিজি অস্ফুট গলায় বললেন, “আরে, এটা তো আমার শাদির অঙ্গঠি। এটা আপনি কোথায় পেলেন?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কোথায় পাওয়া গেছে, সেটা এখন জানতে চাইবেন না। তবে আমি পাইনি। পেয়েছেন আমাদের বন্ধু সদানন্দবাবু।”

 

কথাবার্তার প্রথম দিকটায় চৌধুরিজি যখন দপ করে একবার রেগে ওঠেন, সদানন্দবাবুর মুখ যে তখন একেবারে পাংশুবর্ণ ধারণ করেছিল, সেটা লক্ষ করতে আমার ভুল হয়নি। পরে চৌধুরিজি নরম হয়ে পড়বার সঙ্গে-সঙ্গে সদানন্দবাবুও তাঁর ব্যক্তিত্ব আবার একটু-একটু করে ফিরে পেতে থাকেন। আংটিটা যে তিনিই পেয়েছেন, ভাদুড়িমশাই এ-কথা বলবার পরে আর এক মুহূর্তেও দেরি করলেন না, সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে একগাল হেসে সদানন্দবাবু বললেন, “ ইয়েস, আই ফাউন্ড ইট ইন এ জাঙ্গল।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *