ষোল
চৌধুরানি সম্পর্কে যা কল্পনা করে রেখেছিলুম, বাস্তবের সঙ্গে সেটা মেলেনি। মুলচাদজির ক্ষেত্রেও কল্পনায় আর বাস্তবে দেখলুম বিস্তর ফারাক। একে মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী, তায় আবার সেকেলে নাম। ফলে আমি ধরেই রেখেছিলুম যে, ইনি একজন মধ্যবয়সী স্ফীতোদর ব্যক্তি না হয়ে যান না। এঁর পরনে থাকবে ফিনফিনে মিলের ধুতি, গায়ে থাকবে গলাবদ্ধ কোট। সেই পোশাকে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে ইনি এঁর গদিতে বসে থাকবেন। আমার মনশ্চক্ষে এই যে চিত্রখানি ভাসছিল, এর একটি অংশের সঙ্গেও ব্যস্তবের কোনও মিল খুঁজে পেলুম না। মুলচাঁদজির বয়স মনে হল পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। ছিপছিপে যুবাপুরুষ, পরনে ধপধপে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি, পায়ে হালকা চপ্পল। বাড়িটির আর্কিটেকচারাল প্যাটার্নে যে কোনও জবরজং ব্যাপার নেই, বরং হাল-ফ্যাশানের ছিমছাম ভাবটাই স্পষ্ট হয়ে ফুটেছে, আর সামনের লন ও তার চারপাশের ফ্লাওয়ার বেডগুলিও যে যৎপরোনাস্তি পরিচ্ছন্ন, সেটা আগেই লক্ষ করেছিলুম, পরে দারোয়ান আমাদের যে ড্রইং রুমে এনে পৌঁছে দিল, সেটিও দেখলুম আধুনিক কায়দায় সাজানো। সিলিংয়ের রঙের সঙ্গে ম্যাচ-করানো হালকা-সবুজ কার্পেট, আসবাবপত্রের কোনওটাই খুব ভারী নয়, অফ-হোয়াইট দেওয়ালে ওঁ-এর মধ্যে বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণের বদলে ভ্যান গখের সূর্যমুখীর প্রিন্ট।
মূলচাদজি তাঁর বসবার ঘরের দোরগোড়াতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমরা গিয়ে পৌঁছবামাত্র ‘আসুন আসুন’ বলে মহাসমাদরে আমাদের ভিতরে নিয়ে বসালেন। তারপর ইন্টারকমে পাঁচ গেলাশ লস্সির ফরমাশ দিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি চৌধুরির বাড়িতে উঠতে গেলেন কেন? আমার ইখানে থাকলেই তো ঠিক হত।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার এখানে কী করে থাকব? তাঁর হয়ে কাজ করছি, তিনি আমার ক্লায়েন্ট।”
মুলচাদজি হেসে বললেন, “হাঁ হাঁ, সেটা মানছি। কিন্তু আমরাও কি আপনার ক্লায়েন্ট আছি না?”
“সে কী। আপনার হয়ে কাজ করেছি? কই, মনে পড়ছে না তো।”
“ঠিক আছে, আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি।” মূলচাঁদজির চোখে স্পষ্ট কৌতুক, “মুম্বইয়ের বিজনেসম্যান শ্যামচাঁদ লোহিয়ার কথা আপনার মনে পড়ে?”
“বিলক্ষণ। তাঁর আয়রন-সেফ থেকে একটা ভ্যালুয়েবল ডকুমেন্ট উধাও হয়ে গিয়েছিল। ব্যাঙ্গালোর থেকে আমাকে ডাকিয়ে নিয়ে গিয়ে তিনি সেটা আমাকে উদ্ধার করে দিতে বলেন।”
“বাস বাস!” মুলচাদজি বললেন, “ওতেই হবে। শ্যামচাদজি আমার বড়া ভাইয়া। তাঁর কাছে আপনার কথা আমি শুনেছি। তো এখন বলুন, আমি যে বলেছি যে, আমরাও আপনার ক্লায়েন্ট সেটা কি ভুল বলেছি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, ভুল কেন বলবেন? তা এ-যাত্রায় তো আর জায়গা পালটানো যাচ্ছে না, আবার যদি এদিকে কোনও কাজ পড়ে যায় তো তখন নাহয় আপনার এখানেই ওঠা যাবে।”
লস্সি এসে গিয়েছিল। মুলচাদজি বললেন, “নিন, আগে লস্সি খেয়ে নিন। তারপর বলুন যে, আপনার জন্যে আমি কী করতে পারি।”
“করতে তো অনেক কিছুই পারেন,” লস্সির গেলাশে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু করবেন কি না, সে-ই হচ্ছে প্রশ্ন।”
,যেন ভারী অবাক হয়ে গেছেন ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে, চোখ দুটোর এইরকম একটা ভঙ্গি করে মুলচাঁদজি বললেন, “সে কী, আপনি আমাদের অত বড় একটা উপকার করলেন, ভ্যালুয়েবল যে ডকুমেন্টটা ফিরে পাবার কোনও আশাই ছিল না, সেটা উদ্ধার করে এনে দিলেন, আর আমি আপনার জন্যে কিছু করব না? হোয়াট ডু ইউ টেক মি ফর, মিঃ ভাদুড়ি? অ্যান আনগ্রেটফুল ফেলো? আরে ছিছি, এ আপনি কী বলছেন? বলুন আপনার জন্যে কী করতে হবে। সাধ্যে থাকলে নিশ্চয় করব।”
“বিশেষ কিছুই করতে হবে না, শুধু গোটাকয়েকে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”
গৌতম বুদ্ধিমান ছেলে। আলোচনা অন্যদিকে মোড় ফিরবার সঙ্গে-সঙ্গে সে বুঝতে পেরে গিয়েছিল যে, এবারে যে-সব কথাবার্তা হবে, তার মধ্যে তার না-থাকাই ভাল। সে দুই বাড়িরই ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, সুতরাং পাছে কোনও অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়, এই ভয়ে সে এক চুমুকে তার লস্সির গেলাশ নিঃশেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কিছু মনে করবেন না, একটা জরুরি কেস রয়েছে, আমি চললুম।”
গৌতম বেরিয়ে যেতে মুলচাদজি বললেন, “বেশ তো, কী জিজ্ঞাস করবেন করুন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রশ্ন করবার আগে একটা কথা বলে রাখি। যদি কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে আপনার অসুবিধা থাকে, তো স্পষ্ট করে সেটা আমাকে বলবেন। বাট ফর হেভেন’স সেক, ভুল উত্তর দেবেন না।”
শুনে মুলচাদজি একেবারে হো-হো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “ভুল উত্তর মানে মিছা উত্তর তো? মিঃ ভাদুড়ি, হোয়াই আর ইউ ট্রায়িং টু বি সো পোলাইট? বলুন যে, আপনার ভয় আছে আমি মিছা কথা বলতে পারি। ঠিক?”
ভাদুড়িমশাই মৃদু গলায় বললেন, “অনেকেই বলে। আপনার দাদাও গোড়ায়-গোড়ায় বলতেন। পরে যখন বুঝতে পারেন যে, কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে, খুব সহজেই সেটা আমি ধরে ফেলি, তখন থেকে আর বলতেন না।”
মুলচাঁদজি বললেন, “দাদার কী দোষ, মিঃ ভাদুড়ি? আমরা বেওসা করি, মিছা কথা বলা আমাদের হ্যাবিট। তো ঠিক আছে, আপনি তো আর ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে আসেন নাই, আমার খাতা ভি দেখতে চাইছেন না, তা হলে আপনাকে কেন মিছা কথা বলব? না না, আপনার কী জিজ্ঞাস করবার আছে করুন, যদি জানি তো কারেক্ট আনসার দিব, আর না জানলে বলব জানি না।”
“থ্যাঙ্ক ইউ,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে প্রশ্ন করি?”
“করুন।”
“চৌধুরিজির সঙ্গে আপনার ঝগড়াটা কীসের?”
“উত্তরটা বোধহয় চৌধুরিজিই আপনাকে দিতে পারবেন।” মূলচাদজি হেসে বললেন, “প্রশ্নটা তাই তাকে করলেই ভাল হত।”
“তাঁকে কী করে করব? তিনি তো এখানে নেই।”
“কোথায় গেছেন?”
“আসানসোলে। আমি অন্তত সেইরকমই শুনেছি।”
“ভুল খবর।” মুলচাদজি বললেন, “আসানসোলে নয়, চৌধুরিজি গেছেন ধানবাদে। কেন গেছেন, তাও জেনে রাখুন। ইয়ার-বন্ধুদের সঙ্গে ফূর্তি করতে গেছেন। খুব সম্ভব আজ বিকেলে ফিরবেন।”
“আপনি এ-সব খবর কোথায় পেলেন?”
“ধানবাদে আমার লোক আছে। তারা খবর দেয়। আসানসোলে ভি লোক আছে। সেখানে গেলে তারা খবর দিত।”
“অর্থাৎ তাঁর পিছনে আপনি লোক লাগিয়ে রেখেছেন, কেমন?”
“না, না,” মুলচাদজি অবাক হবার ভান করে বললেন, “এটাকে লোক লাগাবার বেপার বলে : ভাবছেন কেন? আমি বেওসা করি না। তাই আর-পাঁচটা বেওসায়ির খবর আমাকে রাখতে হয়। তারা কে কোথায় গেল কী করল, সব জানতে হয়। তার উপরে আবার চৌধুরিজি আমার সাথ রিলেশনটা ভাল রাখেন নাই। তাঁর উপরে তাই নজর রাখতে হবে না?”
“রিলেশনটা খারাপ হল কেন?”
“তা তো বলতে পারব না। তবে এটা খেয়াল করেছি যে, ওঁর লেড়কার শাদির পর থেকেই উনি আমার সঙ্গে বাতচিত বিলকুল বন্ধ করে দিয়েছেন। দেখা হলে কম সে কম ‘রাম-রাম লোহিয়াজি’ তো বলবেন। সেটুকু কার্টসি পর্যন্ত নাই, সির্ফ মুখ ঘুরিয়ে চলে যান।’
“হঠাৎ একদিন এইভাবে কথাবার্তা বন্ধ করে দিলেন, অথচ তার কোনও কারণ নেই?”
“কারণ কুছু আছে বলে তো জানি না। তবে হ্যাঁ, আন্দাজ একটা করতে পারি।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আন্দাজটা কী করেছেন, সেটাই বলুন।”
“দেখুন, ওঁর লেড়কার যখন শাদি হল, তখন বরাত-পার্টির সঙ্গে চৌধুরিজি আমাকে মুম্বই যাবার জন্যে রিকোয়েস্ট করেছিলেন। কিন্তু আমার বিজনেসের বেপারে তখন একটা ঝামেলা চলছিল, তাই আমি যেতে পারিনি। পরে যখন এখানে রিসেপশান হল, তখন তাতেও আমার যাওয়া হল না। কেন হল না? না তখন আমাকে পাটনা যেতে হয়েছিল। তো উনি বোধহয় ভাবলেন, ওঁকে ইনসাল্ট করার জন্য আমি যাইনি।”
“আপনাদের ফ্যামিলিতে তো আরও লোক রয়েছেন। তাঁরা গিয়েছিলেন নিশ্চয়?”
মুলচাদজির কথায় এতক্ষণ লেশমাত্র জড়তা ছিল না। এইবারে তাঁর উত্তরে যেন একটু অস্বস্তির ছোঁয়া লাগল।
এক মুহূর্তে চুপ করে থেকে বললেন, “না, আমার ফ্যামিলি থেকেও কেউ যায়নি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন? না-যাওয়ার কোনও কারণ ছিল? আই মিন রিসেপশানে যাবার জন্যে চৌধুরিজি যেভাবে আপনাদের নেমন্তন্ন করেছিলেন, তাতে কি ত্রুটি ছিল কোনও?…মানে ওই যাকে আমরা দায়সারা ব্যাপার বলি আর কি! এটাও কি সেই রকমের নেমন্তন্ন?”
“আরে না না,” মুলচাদজি বললেন, “সেটা যদি বলি তো মিছা কথা বলা হবে, মিঃ ভাদুড়ি। ওঁরা পুরানো জমিন্দার ফ্যামিলি, আদব-কায়দা ওঁর ভালই জানা আছে, সে-সব উনি আমার কান পাকড়ে শিখলাতে পারেন।”
“সো এভরিথিং ওয়াজ ইন অর্ডার?”
“হাঁ হাঁ, সেটা আমি হাজারবার মানব। ইনভিটিশন কার্ড নিয়ে নিজে আমার বাড়িতে এলেন, ওয়াইফকে ভি সঙ্গে নিয়ে এলেন, দো বাক্স লাড্ডু ভি নিয়ে এসেছিলেন। না না, কুছু গলতি ছিল না।”
“তা হলে?” ভাদুড়িমশাই বলেন, “তা হলে ওঁর রিসেপশানে আপনারা কেউ গেলেন না কেন? আপনাকে নাহয় একটা জরুরি কাজ পড়েছিল বলে পাটনায় যেতে হয়েছিল, কিন্তু আপনার স্ত্রী তো এখানে ছিলেন। তিনি কিংবা বাড়ির আর-কেউ গিয়ে তো নেমন্তন্ন রক্ষা করতে পারতেন। অথচ আপনি বলছেন আপনাদের ফ্যামিলি থেকে কেউই যায়নি। ব্যাপারটা কী বলুন তো? ওয়াজ দেয়ার এনি স্পেসিফিক রিজন?”
কথাটার তক্ষুনি-তক্ষুনি কোনও উত্তর দিলেন না মুলচাদজি। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ভাদুড়িসাব, বড়া ভাইয়ার কাছে শুনেছি যে, ইউ আর এ ভেরি ইন্টেলিজেন্ট ম্যান। তো এখন দেখছি বড়া ভাইয়া যা বলেছে ঠিকই বলেছে। গপসপ করতে করতে একেবারে ঠিক জায়গাতেই পৌঁছে গেছেন আপনি। তো ঠিক আছে, আপনি চৌধুরিজির হয়ে কাম করতে এসেছেন, লেকিন আমাদেরও আপনি দৃশমন না। ইউ হ্যাভ ওয়ার্কড ফর আওয়ার ফ্যামিলি অলসো। দ্যাটস হোয়াই আই কনসিডার ইউ টু বি আ ফ্রেন্ড। সো আই শ্যাল নট কনসিল এনিথিং। শুধু একটা কথা দিন। চৌধুরি-বাড়ির রিসেপশানে কেন আমরা যাইনি, সেটা আমি আপনাকে বলব, কিন্তু সেটা আর কাউকে আপনি বলতে পারবেন না।”
নিশ্চয় কোনও গোপন কথা। পাছে আমরা থাকলে সেটা বলতে কোনও অসুবিধে হয়, সদানন্দবাবুর হাতে একটা হ্যাঁচকা টান মেরে তাই সোফা ছেড়ে উঠে পড়েছিলুম, কিন্তু হাতের ইঙ্গিতে ভাদুড়িমশাই আমাদের বসতে বলায় ফের বসে পড়তে হল। ভাদুড়িমশাই মুলচাদজিকে বললেন, “দে আর ক্লোজ ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ক্যান কিপ আ সিক্রেট, সুতরাং যা বলবার এঁদের সামনেই বলতে পারেন, কথাটা চাউর হবে না।”
মুলচাদজি চোখ তুলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন। তাঁর চাউনিতে যে বেশ খানিকটা দুষ্টুমি মাখানো রয়েছে, সেটা বুঝতে কোনও অসুবিধা হল না। বললেন, “চাউর হলে কিন্তু আমার কুনো নুকসান নাই।”
“লোকসানটা তবে কার?”
“আপনার এখানকার ক্লায়েন্টের। মানে চৌধুরিজির। আসল কথাটা লোকে যদি জানতে পারে তো ছিছি করবে।”
“আসল কথাটা কী?”
“সেটা আমি আপনাকে বলব।” মুলচাঁদজি বললেন, “কিন্তু আবার বলছি, এটা চাউর হওয়া চলবে না। কিউকি চৌধুরিজির কুনো নুকসান হোক, সেটা আমি চাই না।”
“ঠিক আছে, আই গিভ ইউ মাই ওয়ার্ড, ও-বাড়ির সম্পর্কে আপনি যা-ই বলুন, সেটা গোপন থাকবে।”
মুলচাদজি বললেন, “তা হলে শুনুন মিঃ ভাদুড়ি, রিসেপশানে যাবার জন্যে আমার ওয়াইফকে আমি অনেকবার করে বলেছিলাম। আমি যখন যেতে পারছি না, কাজ পড়ে গেছে বলে আমায় পাটনায় যেতে হবে, তখন অন্তত তাঁর যে সেখানে পাঁচটা মিনিটের জন্যে হলেও একবার যাওয়া উচিত, আর না-গেলে যে আমাদের রিলেশন খারাপ হয়ে যেতে পারে, সেটা তাঁকে বলতে আমার ভুল হয়নি। কিন্তু তিনি গেলেন না।”
‘কেন গেলেন না?”
“এই জন্যে গেলেন না যে, মুম্বই থেকে রঘুনন্দন যাকে শাদি করে আনল, আমার ওয়াইফ তাকে আগে থেকেই চিনতেন।”
ভাদুড়িমশায়ের মুখ দেখে মনে হল, তিনি কিছু-একটা আন্দাজ করেছেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ না-করে বললেন,”বাস, স্রেফ এইজন্যে গেলেন না? তাও কি হয় নাকি?”
সদানন্দবাবু চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিলেন, এতক্ষণ কোনও কথা বলেননি। কিন্তু এই ধরনের কথা শুনলে যে-কোনও বৃদ্ধের যা মনে হয়, তাঁর চিত্তে নিশ্চয় সেই ধরনের কোনও সন্দেহ উঁকি দিয়ে থাকবে। ফলে তিনি আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। একটু ঝুঁকে বসে নিচু গলায় বললেন,”কেউ কি কোনও ভাংচি দিয়া?”
“বাংচি?” মুলচাদজি বললেন, “ইসকা ক্যা মতলব?”
বললুম,”যাচ্চলে, সদানন্দবাবু তো দেখছি আর-এক বখেড়া বাধিয়ে দিলেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “হি ওয়াজ জাস্ট থিংকিং অ্যালাউড। তো হ্যাঁ, যে-কথা হচ্ছিল। ব্রাইডকে আগে থেকে চিনলে বউভাতের রিসেপশানে যাওয়া চলবে না, এটা তো কোনও যুক্তি হল না, মুলচাদজি। দেয়ার ইজ আ ক্যাচ সামহোয়্যার। সেটা কী, একটু খুলে বলুন।”
“আমি তো সব খুলেই বলছিলাম,” মুলচাদজি হেসে বললেন, “মাঝখান থেকে এই বাংচি এসে গণ্ডগোল করল। আমার ওয়াইফ যে চৌধুরিজির রিসেপশানে যান নাই, তার কারণ, রিয়াকে তিনি চিনেন, কিন্তু আচ্ছি লেড়কি বলে চিনেন না।…কী হল মিঃ ভাদুড়ি? বেপারটা বুঝতে আপনার অসুবিধা হচ্ছে? ঠিক আছে, তা হলে আরও খুলে বলি। আমার ওয়াইফ ভি মুম্বইয়ের মেয়ে। পড়ালিখা সেখানেই করেছেন। লছমনদাস জয়পুরিয়ার নাম আপনি শুনে থাকবেন মিঃ ভাদুড়ি।”
“বোম্বাইয়ের রুথ মার্চেন্ট?”
“হাঁ, আমার ওয়াইফের পিতাজি। রেডিমেড গার্মেন্টসের হোলসেল বিজনেস আছে ওঁর। রিটেল দুকান ভি দুটা আছে। একটা মাহিমে, একটা বান্দ্রায়। তো রিয়ার বাবা পীতাম্বর সিং ছিলেন বান্দ্রার দুকানটার ম্যানেজার। ডিফলকেশনের চার্জে তাঁর নোকরি চলে যায়। বিজনেস সার্কলে এ-সব কথা চাপা থাকে না। ক্যাশ ভেঙে যে তাঁর নোকরি গেছে, সেটা সবাই জেনে গেল, ফলে আর-কোথাও তিনি চাকরি পেলেন না। নিজে একটা দুকান করবার কৌসিস করেছিলেন, কিন্তু মার্কেটের ব্যাপার জানেন তো, একবার যার নামে ডিজনেস্ট বলে একটা ছাপ পড়ে গেল, কে আর তাকে ক্রেডিটে মাল দিবে? কেউ দিল না। ফলে দুকানে ভি লালবাতি জ্বলল। অ্যান্ড দেন হি ডিড সামথিং টেরিবল।”
“কী করলেন?”
“হি টানৰ্ড হিজ ফ্ল্যাট ইনটু আ গ্যামলিং ডেন।”
“এটা কবেকার ব্যাপার?”
“চার-পাঁচ সাল আগেকার।” মুলচাদজি বললেন, “রিয়ার বয়েস তখুন আর কত হবে? নট মোর দ্যান সিক্সটিন অর সেভেনটিন। অ্যান্ড পীতাম্বর সিং স্টার্টেড ইউজিং হিজ ডটার অ্যাজ আ বেইট। আপনি অবাক হচ্ছেন মিঃ ভাদুড়ি, বাট দ্যাট ইজ হোয়াট হি ডিড। নিজের বেটিকে টোপ হিসেবে লাগিয়ে সে রইস আদমিদের নিজের গ্যামলিং ডেনের মধ্যে টেনে আনত।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এর মধ্যে রঘুনন্দন আসছে কোত্থেকে?”
মুলচাদজি বললেন, “আসবার কথা ছিল না। কিন্তু এসে গেল। চৌধুরিজির ছোটা ভাই রঘুবীর যে মুম্বইয়ে থাকে, সেটা আপনি জানেন?”
“জানি।”
“রঘুবীর সেখানে শেয়ার মার্কেটের ব্রোকার। চৌধুরিজি তাঁর লেড়কাকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, দো-চার সাল চাচার কাছে থেকে কাজকাম শিখলে সে লায়েক হয়ে ফিরতে পারবে।”
“এটা কবেকার কথা?”
“করিব তিন সাল হবে।” মুলচাদজি বললেন, “রঘুনন্দন ইখানেই পড়ালিখা করত। হি পাসড হিজ বি. কম. এগজামিনেশন ইন নাইনটিন এইট্টি এইট, অ্যান্ড দেন হিজ ফাদার সেন্ট হিম টু মুম্বই।”
“তারপর?”
“তারপর যা হবার সেটাই হল। মুম্বইয়ে গিয়ে মাথা ঘুরে গেল রঘুনন্দনের। ইয়ার-বন্ধু জুটে যেতে দের হল না। তারপর অল সর্টস অব ভাইসেস স্টার্টেড কামিং। দে কেম ওয়ান আফটার অ্যানাদার। শরাব ধরল, জুয়া ধরল, মহালছমির রেসের মাঠে যেতে শুরু করল, তারপর পীতাম্বরের গ্যামলিং ডেনেও গিয়ে হাজির হল একদিন।”
“রিয়ার সঙ্গে সেইখানেই ওর আলাপ?”
“হাঁ, হাঁ,” মুলচাঁদজি বললেন, “পয়সাওয়ালা আদমির লেড়কা, সেটা যখন বুঝতে পারল, তখন পীতাম্বর তার লেড়কিকে তার সাথ আলাপ করিয়ে দিবে না? আলাপ হল, মুহব্বত হল, পীতাম্বরের ফ্ল্যাটে রঘুনন্দন মাঝে-মাঝে রাত কাটাতে শুরু করল। তারপর একদিন ডিক্লেয়ার করল যে, রিয়াকে সে শাদি করতে চায়।”
“আপনার স্ত্রী এ-সব কথা জানলেন কী করে?”
“একেলা আমার ওয়াইফ কেন জানবে,” মুলচাদজি হেসে বললেন, “ইন ফ্যাক্ট ইট ওয়াজ ভেরি ইজি ফর হার টু নো। একে তো পিতাজির মকান বান্দ্রায়, আবার পীতাম্বরও ওই বান্দ্রাতেই থাকে। তার উপরে আমার ছোট শালি আর রিয়া একই ইশকুল পড়ত।…তাদের কথা ছোড়ে দিন, মিঃ ভাদুড়ি, বান্দ্রা এরিয়ায় এমন একটা পানবিড়ির দুকানবালা পর্যন্ত নাই, এই স্ক্যান্ডালটার কথা যে জানে না। রঘুনন্দন ইজ আ ফুল। বুদ্ধটা বুঝল না যে, যাকে সে শাদি করল, তার আগে আরও বহু লোকের সাথ সে রাত কাটিয়েছে। লেকিন তারা হুঁশিয়ার আদমি, তাই ফূর্তি করে কেটে পড়েছে, আর রঘুনন্দন সিখানে ফূর্তি করতে গিয়ে ফেঁসে গেল।’
আলোচনাটা এতই অস্বস্তিকর যে, অনেকক্ষণ ধরেই আমার উঠে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু ভাদুড়িমশাই দেখলুম নির্বিকার। বললেন, “আপনার স্ত্রী কি এইজেন্যই ও-বাড়ির রিসেপশানে যাননি?”
মুলচাদজি বললেন, “এগজ্যাক্টলি। আমাকে তো পাটনায় চলে যেতে হল। যাবার আগে আমার ওয়াইফকে অনেক করে বুঝালাম যে, অন্যের লেড়কা কী করল না-করল তাতে তুমার কী, আমাদের ইখানকার বিজনেস কমিউনিটির মধ্যে একটা গুড রিলেশান রাখবার জন্যেও তুমার যাওয়া দরকার। তবু গেল না। কেন গেল না, সেটা আপনি বুঝে নিন।…অ্যাজ ফার অ্যাজ শি ইজ কনসার্নড রিয়া ইজ নাথিং বাট আ প্রস্টিটিউট।”
“বাস, আপনারা নেমন্তন্ন রাখলেন না বলে চৌধুরিজিও আপনার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিলেন!”
“হাঁ হাঁ, সেটাই তো খুব আপসোসের ব্যাপার হল।” মুলচাদজি বললেন, “ওর সঙ্গে আমার যে একটা বিজনেস ডিল চলছিল সেটা পর্যন্ত তার জন্যে হতে পারছে না। নেগোশিয়েশন একদম বন্ধ হয়ে গেছে।”
“ডিলটা কীসের?”
“কথা ছিল, ওর ইখানকার সিনেমা হলটা আমি কিনে নিব। তার জন্য ভাল টাকা দিতে আমি রাজি ছিলাম। ওটাকে রিনোভেট করা দরকার। কিন্তু তার জন্যে তো আট-দশ লাখ খৰ্চা করতে হবে। সে টাকা ওঁর নাই। শুনে আমি বললাম, ওটা আমাকে বেচে দিন। মনে হল, উনি রাজি আছেন। কিন্তু এখন তো কথাই বন্ধ। আপনি চেষ্টা করে দেখুন না।”
“কীসের চেষ্টা?”
“একটা মিটমাট করিয়ে দিবার। পাঁচটা কথার ফাঁকে একসময় চৌধুরিজিকে বলবেন যে, আমার ওয়াইফের বোখার হয়েছিল, তাই রিসেপশানে যেতে পারে নাই।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমার তরফে যেটুকু যা চেষ্টা করবার, আমি করব। কিন্তু মুলচাদজি, আপনাকেও একটু চেষ্টা করতে হবে যে।”
“কী করতে হবে বলুন, আমি করে দিব।”
“একটু চেষ্টা করে আপনার স্ত্রীকে এটা বোঝাতে হবে যে, অভাবে পড়েই হোক কি অন্য কোনও চাপে পড়েই হোক, কেউ একবার একটা খারাপ কাজ করে ফেললেই যে সে চিরকালের জন্যে খারাপ হয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। কে খারাপ, সেটা ওভাবে বাছতে গেলে কিন্তু ঠক বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে।”
মুলচাদজি একেবারে অট্টহাস্য হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “ঠিক বাত, ঠিক বাত। তো আমরা এই কথা বলি না। আমরা বলি, লোম বাছাই করতে গেলে কম্বল সাফ হয়ে যাবে। আমি আমার ওয়াইফকে সেটা সমঝাবার চেষ্টা করব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
ভাদুড়িমশাইয়ের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। মুলচাদজির বাড়ি থেকে যখন আমরা বেরিয়ে এলুম তখন সাড়ে বারোটা বাজে।
