বারো
এখানে এত পাখি ডাকে যে, ভোর হবার পরে আর খুব বেশিক্ষণ ঘুমিয়ে থাকা চলে না। আমি ঘুমকাতুরে মানুষ, কিন্তু শেষ রাত্তির থেকেই যদি কানের কাছে কিচির-মিচির চলতে থাকে তো কাঁহাতক আর বিছানার উপরে মটকা মেরে পড়ে থাকা যায়? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, পৌনে ছ’টা বাজে। সদানন্দবাবুর খাট ফাঁকা। চোখেমুখে জল দিয়ে বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে ভাদুড়িমশাইয়ের ঘরে উঁকি মেরে দেখলুম, তিনিও নেই। অর্থাৎ দু’জনেই বেরিয়ে পড়েছেন। একজন মর্নিং ওয়াক করতে, আর অন্যজন জগিং করতে।
নীচে এসে দেখলুম বেয়ারা টেবিল সাজাচ্ছে। আমাকে দেখে লোকটি বলল, “চা দেব সাব?”
বললুম, “একটু বাদে চা খাব। এখন একটু ঘুরে আসি।”
গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে পড়লুম। চৌধুরিদের বাড়ি অনেকটা সেকেলে ম্যানর-হাউসের মতো। নীচে উপরে সমানভাবে টানা। যেমন একতলায়, দোতলাতেও তেমন সামনে-পিছনে এক মুড়ো থেকে আর-এক মুড়ো অব্দি টানা চওড়া বারান্দা। তার নীচের খানিকটা অংশ রেলিং, উপরের বাদবাকি অংশে কাঠের ফ্রেমের মধ্যে হরেক রঙের কাচ বসানো। বারান্দার সেই কাঠের ফ্রেমের মধ্যে-মধ্যে জানলাও রয়েছে। দুটো জানলা খোলা। তাতেও দেখলুম লোহার শিক গাঁথা। ভাদুড়িমশাই সম্ভবত ওরই একটায় কাল চৌধুরিজির পুত্রবধূকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন। নামটাও মনে পড়ল। রিয়া।
যেখানে আমরা আছি, সেই গেস্ট হাউস এই বসতবাড়ির পিছন দিকে। বসতবাড়ির সামনে-পিছনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জমি। সামনের জমিতে যে একটা লন করবার চেষ্টা এককালে হয়েছিল, সেটা বোঝা যায়। পিছনের জমিতে অমন কোনও চেষ্টাও কেউ করেনি। এখানে-ওখানে কিছু ফুলগাছ আছে, বাদবাকি জায়গায় ঘাস ও আগাছা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। শিবমন্দিরটাও খুব বড় নয়। তার পিছনে একটা পুকুর। তারও পিছনে ফলের বাগান। সব মিলিয়ে জমি নেহাত কম হবে না। আর এই সব কিছুকে ঘিরে রয়েছে হাত আষ্টেক উঁচু কম্পাউন্ড-ওয়াল।
পিছন থেকে সামনের দিকে আসতে-আসতে বসতবাড়ির দিকে আবার চোখ পড়ল। পুরনো আমলের বাড়ি। বাইরে দেওয়ালের পলস্তারা এখানে-ওখানে খসে গেছে। সে-সব মেরামত করা দরকার। কার্নিসে দু-চারটে বটের চারা গজিয়েছে। এখনই যদি না উপড়ে ফেলা হয়, তবে ভিতরে-ভিতরে শিকড় চালিয়ে ওই চারাগাছই একদিন দেওয়ালে ফাটল ধরিয়ে দেবে। চৌধুরিজির তো মনে হয় টাকাপয়সার অভাব নেই, তা হলে এদিকে তাঁর খেয়াল নেই কেন? ভদ্রলোক বোধহয় ব্যাবসা নিয়েই মেতে আছেন, এ-সব দিকে নজর দেবার সময় পান না। একতলা থেকে বুগেনভিলিয়ার যে বিশাল ঝাড় সরাসরি দোতলায় উঠে গেছে, তারও কোনও যত্ন নেই। ডালপালা ঠিকমতো হেঁটে দিলে ওটা ফুলে-ফুলে ছেয়ে থাকত, এইভাবে ষাঁড়িয়ে গিয়ে আস্ত একটা জঙ্গল হয়ে উঠত না। নেহাতই এক-আধটা ফুল ফুটে আছে। পাপড়িগুলো লালে-সাদায় মেশানো। তাতে বুঝলুম, জাতে ওটা মেরি পামার।
বাড়ির সামনের দিকটা পিছনের তুলনায় কিছুটা পরিচ্ছন্ন। একতলার বারান্দায় হাতল-আঁটা বেঞ্চি পাতা। বারান্দা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে কাঠের চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার দিকে। মাঝপথে সিঁড়িটা যেখানে ভাঁজ হয়েছে, সেখানে একটা কোলাপসিবল গেটও চোখে পড়ল। দিনের বেলা বলেই গেট এখন খোলা, রাত্তিরে যে তালা লাগানো হয়, সে-কথা চৌধুরিজির কাছেই শুনেছি। রাস্তার দিকে কম্পাউন্ড ওয়ালের মাঝ বরাবর দেউড়ি। দেউড়ির একদিকে পরপর কয়েকখানা ঘর। সম্ভবত তাতে দরোয়ান আর মালি থাকে। অন্যদিকে পরপর তিনটে গ্যারাজ। গ্যারাজের সামনে লোহার শাটার। বসতবাড়ির সামনের জমি ঘিরে যে মোরামের রাস্তার কথা আগেই বলেছি, সেটা বেশ চওড়া। বোঝা যায় যে, গ্যারাজ থেকে গাড়ি বার করতে কিংবা বাইরে থেকে এসে গ্যারাজের মধ্যে গাড়ি ঢোকাতে যাতে কোনও অসুবিধে না হয়, সে-দিকে নজর রেখেই রাস্তাটা বানানো হয়েছিল।
দেউড়ি পেরিয়ে বাড়ির বাইরের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে চোখে পড়ল, ভাদুড়িমশাই দৌড়তে দৌড়তে বাড়ির দিকে আসছেন। কাছে আসতে জিজ্ঞেস করলুম, ‘জগিং শেষ হল?” উত্তরে তিনি মুখে কিছু বললেন না, হাতের ইঙ্গিতে তাঁকে অনুসরণ করতে বলে যেমন দৌড়চ্ছিলেন, তেমনই দৌড়তে দৌড়তে দেউড়ি পেরিয়ে বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে গেস্ট হাউসের দিকে চলে গেলেন। আমার এ-সব দৌড়ঝাঁপ পোষায় না। ধীরেসুস্থে হাঁটতে হাঁটতে যখন গেস্ট হাউসে গিয়ে পৌঁছলুম, ভাদুড়িমশাই ততক্ষণে দোতলায় উঠে তাঁর ঘরের মধ্যে ঢুকে গেছেন। দরজা বন্ধ। ভাবছি এই ফাঁকে দাড়িটা কামিয়ে নেব, এমন সময় আমাদের বেডরুম থেকে সদানন্দবাবু বেরিয়ে এলেন। বললুম, “ঘুম থেকে কখন উঠেছিলেন মশাই?”
“কলকাতায় যেমন উঠি। রাইট অ্যাট হাফ পাস্ট ফোর।”
“তারপর?”
“তারপর আর কী, এখানে তো আর নিজের হাতে চা বানিয়ে নেবার উপায় নেই, তাই মুখহাত ধুয়ে নীচে গিয়ে একটা মুশকো মতন লোককে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে বললুম, মেহেরবানি করকে এক কাপ চা বানিয়ে দাও তো ভাই। ব্যাটা দুধ-চিনি মেশাতে যাচ্ছিল। তা আমি নজর রেখেছিলুম তো, তাই আর ও-সব মেশাতে দিইনি। পাতলা এক কাপ লিকার খেয়ে পাঁচটা নাগাদ মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়ে পড়লুম।”
“নেড়িকুত্তা তাড়া করেনি?”
“একেবারেই যে করেনি, তা বলব না। খ্যাক খ্যাক করে দুটো নেড়িকুত্তা তেড়ে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু কাওয়ার্ড তো, হাতের লাঠিখানা উঁচিয়ে ধরতেই ব্যাটাচ্ছেলেরা তাদের পেছনের পায়ের মধ্যে ন্যাজ ঢুকিয়ে এমন দৌড় মারল যে, সে আর কহতব্য নয়।”
“ফিরলেন কখন?”
“রাইট অ্যাট সিক্স। দেখলুম যে, হাঁটতে হাঁটতে আপনি শিবমন্দিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আপনি অবশ্য আমাকে দেখতে পাননি।”
“স্নান করে নিয়েছেন?”
“এইমাত্র স্নান করে বেরোলুম। কটা বাজে বলুন তো?”
হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললুম, “সাতটা।”
“ওরেব্বাবা,” সদানন্দবাবু বললেন, “সদর-রাস্তায় ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি বললেন, সাড়ে সাতটায় ব্রেকফাস্ট দিতে বলে দিয়েছেন। যান যান, চান-টান করে রেডি হয়ে নিন।”
“কেন, স্নান না করে ব্রেকফাস্ট খাওয়া যায় না?”
“তা যায়, কিন্তু চানটা তা হলে করবেন কখন?”
“কেন, ব্রেকফাস্ট খাওয়ার খানিক বাদে।”
“তা বোধহয় হবে না মশাই,” সদানন্দবাবু বললেন, “মনে হচ্ছে আটটার মধ্যে বেরিয়ে পড়তে হবে।”
“ভাদুড়িমশাই তা-ই বললেন?”
“হ্যাঁ, তা-ই বলেছি।”
ভাদুড়িমশাই যে তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেটা বুঝতে পারিনি বলে হঠাৎ তাঁর গলা শুনে আমি চমকে উঠেছিলুম। ঘুরে দাঁড়িয়ে বললুম, “এত তাড়া কীসের?”
“দু-একটা কাজ আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে চাই। আটটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়ব।”
“গাড়ি পাওয়া যাবে তো?”
“যাবে। সকালবেলায় মুকুন্দবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কাল রাত্তিরেই তো তাঁকে গাড়ির কথা বলে রেখেছি। তবু আজও একবার মনে করিয়ে দিলুম। তিনি বললেন, কোনও অসুবিধে নেই। গাড়ি আমরা আটটাতেই পেয়ে যাব।”
সদানন্দবাবু বললেন, “যান যান, আর দেরি করবেন না। চান করে তৈরি হয়ে নিন।”
তৈরি হয়ে নিতে মিনিট কুড়ি পঁচিশের বেশি লাগেনি। ঘর থেকে বেরিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে বুঝলুম, সদানন্দবাবুকে নিয়ে ভাদুড়িমশাই একতলার ডাইনিং রুমে চলে গেছেন। নীচে নেমে সেখানে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসতে না বসতে সদানন্দবাবু বললেন, “আরে চাটুজ্যেমশাই, একটা কথা তো আপনাকে জানানোই হয়নি। আজ সকালবেলায়…”
ভাদুড়িমশাই তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “থাক, থাক, কথাটা এখন না জানালেও চলবে। চটপট এখন খেয়ে নিন তো।”
ফলে, সদানন্দবাবুর কথাটা আর শেষ হতে পারল না। তবে, হিঙের কচুরি আর আলুর দমের প্লেট সামনে এসে যাওয়ায় সদানন্দবাবুর কথা শুনতে আমি যে ঠিক সেই মুহূর্তে খুব উৎসাহ বোধ করছিলুম তাও নয়। শেষ আইটেম হিসেবে যে গোলাপি প্যাঁড়া এল, সেও দেখলুম চমৎকার।
মুকুন্দবাবু যখন এলেন, আটটা বাজতে তখনও মিনিট দশেক বাকি। গাড়ির চাবি ভাদুড়িমশায়ের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “এটা রাখুন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “গাড়িটা গ্যারাজ থেকে বার করে রাখা হয়েছে?”
“জি না,” মুকুন্দবাবু খুব সংকুচিত ভঙ্গিতে বললেন, “ড্রইভারের তো সাতটার মধ্যেই এসে যাবার কথা। লেকিন আসেনি। জানে তো যে, রাজাবাবু এখন ইখানে নেই, তাই কামে ঢিলা লাগিয়েছে। দেরি করে আসবে। আবার নাও আসতে পারে। কাল এসে বলতে যে, বেমারি হয়েছিল। গাড়ি বার করে সাফাই করে রাখবে, তা নয়, ডুব মারল। সবই তো বুঝেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে। গাড়ি আমি বার করে নেব। চলুন, তা হলে উঠে পড়া যাক। “ গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা গ্যারাজের কাছে চলে এলুম। মুকুন্দবাবু বললেন, “ফিয়াট গাড়িটা মাঝখানের গ্যারেজে থাকে। দাঁড়ান, আপনি কেন শাটার খুলবেন, আমি লোক ডেকে দিচ্ছি।”
দারোয়ান কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে ডাকতেই সে ছুটে এল। মুকুন্দবাবু বললেন, “শাটার উঠাও।”
শাটার তুলে দেওয়ার পরে ভাদুড়িমশাই ভিতরে ঢুকে স্টার্ট দিয়ে গাড়িটা আস্তে-আস্তে বার করে আনলেন। তারপর জানলার কাচ নামিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দাঁড়িয়ে আছেন কেন, আপনারা উঠে পড়ুন।”
মুকুন্দবাবু আমাদের উঠতে নিষেধ করে ভাদুড়িমশাইকে বললেন, “আপনি একটু নেমে আসুন তো ভাদুড়িসাব।”
গাড়ি থেকে নেমে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী ব্যাপার?”
“গাড়িটা গন্ধা হয়ে আছে না?” মুকুন্দবাবু বললেন, “এই গাড়ি চালিয়ে আপনারা যাবেন?… আরে নাটুয়া, গাড়ির ভিতর থেকে ঝাড়নটা বার করে ধূলা-উলা সাফ করিয়ে দে!”
গাড়ির গায়ে যে আলগা ধুলো-ময়লা লেগে ছিল, দারোয়ানকে দিয়ে সে-সব একেবারে পুরোপুরি সাফ না করিয়ে তিনি ছাড়লেন না। রওনা হতে-হতে সওয়া আটটা বেজে গেল।
দেউড়ি পেরিয়ে রাস্তায় পড়ে ডাইনে টার্ন নিয়ে খানিকটা গিয়ে মধুপুর-গিরিডি সড়কে পৌঁছে গাড়িটা বাঁ দিকের বদলে ডাইনে মোড় ফিরতে জিজ্ঞেস করলুম, “আমরা কি তা হলে এখন গিরিডিতে যাচ্ছি না?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না।”
“তা হলে কোথায় যাচ্ছি?”
“পরে হয়তো গিরিডিতে একবার যাবার দরকার হতে পারে। তবে আপাতত যাচ্ছি মধুপুর।”
“কেন?”
“সেখানে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা দরকার। বাহান্নবিঘার নাম শুনেছেন?”
“শুনেছি। সার আশুতোষ তো ওখানেই বাড়ি করিয়েছিলেন, তাই না?”
“কারেক্ট।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তবে আমার বন্ধুটি অত বিখ্যাত মানুষ নন। আর্মির ডাক্তার ছিলেন। অবসর-জীবনটা মধুপুরে কাটাচ্ছেন। থাকেন অবশ্য শুধু স্বামী আর স্ত্রী। ছেলেরা এখানে থাকে না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “বাঃ, এই ফাঁকে একটা নতুন জায়গাও দেখা হয়ে যাবে। একটু ঘুরে বেড়ানো যাবে তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বোধহয় যাবে না। বিকেলের মধ্যে একবার গিরিড়িতেও যাওয়া দরকার। সময বড় কম।…তো সদানন্দবাবু, খাবার টেবিলে যা আপনাকে বলতে দিইনি, সেই খবরটা কিরণবাবুকে এবারে জানিয়ে দিন।”
“আরে তাই তো,” সদানন্দবাবু একগাল হেসে বললেন, “বুঝলেন চাটুজ্যেমশাই, খবরটা যে কী, সে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।”
বললুম, “খবরটা আগে দিন তো!”
“আজ সকালে মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়ে আমি একটা হিরে-বসানো আংটি পেয়ে গেছি!”
“অ্যাঁ, হিরে.?” ঢোক গিলে বললুম, “ঠিক বলছেন তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “জিনিসটা আমি দেখেছি। দাম অন্তত দশ হাজার।”
