এগার
রাত্তিরের খাওয়া ন’টার মধ্যেই চুকিয়ে ফেলেছি। এখন সাড়ে ন’টা বাজে। ড্রইং রুমে আমরা বসে আছি। কিন্তু কেউই কোনও কথা বলছি না। ভাদুড়িমশাই চিন্তামগ্ন। আমি একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছি। সদানন্দবাবু উশখুশ করছেন। মাঝখানে একবার, সম্ভবত আমাকে শুনিয়ে, যদিও অনেকটা স্বগতোক্তির মতন করে, এইরকমের একটা কথা বলেছিলেন যে, অকারণে আর রাত জেগে লাভ কী, এবারে শুয়ে পড়লেই তো হয়। তাতে আমি বলেছিলুম, ‘বেশ তো, ঘুম পেয়ে থাকলে আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। সদানন্দবাবু তবু জায়গা ছেড়ে নড়েননি। চৌধুরিজি কাল ওই যে একটা ‘পিরেত’-এর কথা বলেছেন, শিউজির মন্দিরের ধারে-কাছে এককালে যার দেখা পাওয়া যেত, ভদ্রলোক তাতে বোধহয় ঘাবড়ে গিয়ে থাকবেন, ফলে এখন বসে-বসে হাই তুলছেন, কিন্তু একা-একা বেডরুমে গিয়ে শুয়ে পড়বার মতো উৎসাহ পাচ্ছেন না।
স্তব্ধতাটা ভাদুড়িমশাই-ই ভেঙে দিলেন। বললেন, “কোনও থই পাচ্ছি না, মশাই।”
“চুরির?”
“না, না, চুরির একটা ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মুকুটটার কথাই ধরুন। তালাবদ্ধ ঘরের ভিতর থেকে ওটা চুরি হয়েছে, কিন্তু তার জন্যে তালা ভাঙার দরকার হয়নি। তা এটা কি হতেই পারে না?”
সদানন্দবাবুর ঘুম-ঘুম ভাবটা কেটে গিয়েছিল। ঝুঁকে পড়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কীভাবে পারে?”
“যার বাড়ি, সে-ই যদি ওটা চুরি করে, তো ডুপ্লিকেট চাবির দরকার হয় না।”
“বলেন কী মশাই,” সদানন্দবাবু অস্ফুট গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “চৌধুরিজিই ওটা চুরি করেছেন?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তিনিই যে চুরি করেছেন তা কিন্তু আমি বলিনি। আমি একটা সম্ভাবনার কথাই বলছি মাত্র। এই যেমন, চৌধুরিজির পক্ষেও মুকুট সরানো মোটেই অসম্ভব ছিল না। ঘুমন্ত স্ত্রীর আঁচল থেকে চাবির রিং খুলে নিয়ে তিনি মুকুটটা সরিয়ে ফেললেন, তারপর আবার নিঃশব্দে ঘরে ফিরে স্ত্রীর আঁচলে রিংটাকে বেঁধে রেখে তাঁর পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন, এইভাবে যদি ব্যাপারটাকে দেখি তো তাতেও কিন্তু যেটাকে আপনারা মস্ত একটা ধাঁধা বলে ধরে নিয়েছেন, তার একটা উত্তর মিলে যায়।”
“চৌধুরিজি চুরি করবেন কেন?” এটা সদানন্দবাবুর প্রশ্ন।
“করতে তো অনেক কারণেই পারেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কারণের কি খুব-একটা অভাব ঘটছে? প্রথমত, তাঁর ব্যাবসার অবস্থা যে কীরকম, তা আমরা জানি না। সেখানে টাকার দরকার হয়ে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, দিদির কথায় সংসারী হয়েছেন বটে, কিন্তু ভিতরে-ভিতরে যে আগেকার সেই উচ্ছৃঙ্খল জীবনের প্রতি তাঁর একটা টান আজও রয়ে গেছে, সে তো তাঁর কথা শুনেই বোঝা যায়। তা তার জন্যেই যে হঠাৎ কিছু টাকার দরকার হয়নি, তা-ই বা আমরা ধরে নিচ্ছি কেন?… না না, কারণের কিছু অভাব নেই। তবু বলি, এ-সবই সম্ভাবনা। নিশ্চিত করে কিছুই যখন জানি না, সম্ভাবনাগুলোকে তখন খতিয়ে দেখছি মাত্র।”
“কিন্তু,” আমি বললুম, “চৌধুরিজি চুরি করলেন, আবার চৌধুরিজিই সেই চুরির কিনারা করবার জন্যে আপনাকে ডেকে আনলেন, এটা কী করে হয়?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিরণবাবু, আপনার তো দেখছি গোড়ায় গলদ। চৌধুরিজি আবার আমাকে ডাকলেন কোথায়, ডেকেছেন তো তাঁর দিদি।”
“তা হলে কি চুরিটা যে তাঁর ভাইয়েরই কীর্তি, এটা জেনেও জানকী দেবী আপনাকে ডেকে পাঠালেন?”
“যাচ্চলে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না, কিরণবাবু। সত্যিই আপনি দিনে-দিনে একটা বাঁধাকপিতে পরিণত হচ্ছেন। চুরিটা যে চৌধুরিজির কীর্তি, আমার কথা থেকে কি এইটে আপনি বুঝলেন? আমি কিন্তু অমন কথা একবারও বলিনি। আমি শুধু বলছিলুম যে, তালাবন্ধ ঘরের ভিতর থেকেও অনেকভাবে অনেক কিছু সরানো যায়, তার জন্যে মন্তর-তন্তর কি ম্যাজিকের দরকার হয় না। আর তা ছাড়া, আমি যে ঠিক চুরির কথাই ভাবছিলুম, তাও নয়।”
“তা হলে কীসের কথা ভাবছিলেন?”
“আমি ভাবছিলুম অ্যাকসিডেন্টের কথা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মুকুট আর নেকলেস চৌধুরিজি সরিয়েছেন কি না জানি না, তবে এটা ঠিক যে, অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারে তিনি আমাদের সত্যি কথা বলেননি।”
“এ-ব্যাপারে এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে? এমনও তো পারে যে, ওঁর কথাটাই ঠিক। অ্যাকসিডেন্টের খবর উনি পুলিশকে জানাননি, সেটা মেনে নিচ্ছি। তাই বলে যে ওটা আদৌ হয়নি, তাও নয়। গৌতম বলছে, হয়েছিল। মুকুন্দবাবু বলছেন, হয়েছিল। চৌধুরিজিও বলছেন, হয়েছিল। ফারাকটা শুধু কখন হয়েছিল, তাই নিয়ে। গৌতম আর মুকুন্দবাবুর কথা যদি সত্যি হয়, তা হলে ওটা অগস্ট মাসে হয়েছিল। আর চৌধুরিজি বলছেন, ওটা সেপ্টেম্বরের ঘটনা। তা গৌতম আর মুকুন্দবাবুর কথাই যে ঠিক, আর চৌধূরিজির কথা বেঠিক, এটা আপনি ভাবছেন কেন? উলটোটাও তো হতে পারে।”
কথা বলতে-বলতে লক্ষ করছিলুম যে, ভাদুড়িমশাই মৃদু-মৃদু হাসছেন। আমি চুপ করতে তিনি বললেন, “আপনার কথাটা তো শুনলুম, এবার আমার কথাটা বলতে পারি?”
“বিলক্ষণ।”
“ইশকুলের অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের কথা মনে আছে?”
“অ্যাঁ?” সদানন্দবাবু সম্ভবত নিজের কানকেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলেন না, তাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলেন, “কার কথা?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ইশকুলে যে মাস্টারমশাই আপনাদের অঙ্ক শেখাতেন, তাঁর কথা মনে আছে তাঁকে?”
তিনি যে ভুল শোনেননি, এইটে বুঝতে পারায় সদানন্দবাবুর বিমূঢ় ভাবটা কেটে গিয়েছিল। একগাল হেসে বললেন, “তা আর থাকবে না, খুব মনে আছে। উঃ, ডেঞ্জারাস টিচার ছিলেন, মশাই। একবার একটা সিমপ্লিফিকেশনের অঙ্ক ভুল করায় এমনভাবে আমার কান মুচড়ে দেন যে, তারপর পুরো তিনদিন আমি কিচ্ছু শুনতে পাইনি। কানের মধ্যে সারাক্ষণ শুধু ভোঁ-ভোঁ করত। উরেব্বাপ রে বাপ, তাঁকে মনে না থেকে পারে? আর একবার তো…”
ভাদুড়িমশাই বুঝতে পেরেছিলেন যে, সদানন্দবাবুর ইশকুল-জীবনের দুঃখের কাহিনী সহজে শেষ হবার নয়, তাই হাতের ইঙ্গিতে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখুন কিরণবাবু, অঙ্কের ক্লাসে আপনিও নিশ্চয় মারধর খেয়েছেন, কিন্তু সে-সব কথা আমি শুনতে চাইছি না। অঙ্কের উত্তর কার ভুল হয়েছে আর কার নির্ভুল হয়েছে, মাস্টারমশাইরা সেটা চটপট কীভাবে বুঝে ফেলতেন মনে পড়ে?”
“বললুম, নিশ্চয় পড়ে। ইন ফ্যাক্ট, ইটস আ ভেরি সিম্পল মেথড। নির্ভুল উত্তর সবসময়েই একরকমের হয়, কিন্তু ভুল উত্তর কক্ষনো এক রকমের হয় না। যাদের উত্তর একরকমের হত, মাস্টারমশাই ধরে নিতেন যে, তারা নির্ভুল উত্তর লিখেছে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাস বাস, এটাই আমি শুনতে চাইছিলুম। অ্যাক্সিডেন্টটা কবে হয়েছিল, এই যে প্রশ্ন, এরও নির্ভুল উত্তর একেবারে একইরকম হবার কথা। তা গৌতম আর মুকুন্দবাবুর উত্তর একরকমের হয়েছে বলেই ধরে নিচ্ছি যে, এটাই নির্ভুল উত্তর।”
আমার একটু সংশয় তবু থেকেই যাচ্ছিল। তাই বললুম, “কিন্তু দুটো লোক যদি ষড় করে একই রকমের মিথ্যে কথা বলে, তা হলে? তখনও কি মিথ্যেটাকে সত্যি বলে ধরে নিতে হবে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই তো, মাথাটা খুলে গেছে দেখছি। দশচক্রে ভগবান ভূত হয়ে যান, আর সত্যি-মিথ্যের ওলট-পালট ঘটিয়ে দেওয়া যাবে না? যায়, যায়, তাও যায়। কথামালার সেই গল্পটার কথা ভাবুন। বামুন ছাগল নিয়ে চলেছে, তাই দেখে পাঁচটা দুষ্টু লোকের মাথায় দুর্বুদ্ধি গজিয়ে উঠল যে, বামুনকে বোকা বানিয়ে ছাগলটাকে হাতিয়ে নেওয়া যাক। তা কী করল তারা? না পথের মধ্যে নানান জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বামুনকে দেখে একের পর এক জিজ্ঞেস করতে লাগল, ও ঠাকুরমশাই, কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় চললেন? বোকা বামুন ভাবল, পাঁচটা লোক যখন একই কথা বলছে, তখন তো আর তা মিথ্যে হতে পারে না, নির্ঘাত এটা কুকুরই বটে।”
বললুম, “এক্ষেত্রেও তো এমন হতে পারে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, এক্ষেত্রে তা হতে পারে না। কথাটা এই জন্যে বলছি যে, মুকুন্দবাবু মে হ্যাভ অ্যান অ্যাক্স টু গ্রাইন্ড, আর সেই জন্যে তিনি ইচ্ছে করে একটা ভুল তথ্য আমাদের দিলেও দিতে পারেন, কিন্তু গৌতম তা করবে কেন? তার তো এ-ব্যাপারে কোনও স্বার্থই নেই।”
সদানন্দবাবু বললেন, “স্বার্থ না থাক, রাগ তো থাকতেই পারে। অ্যাকসিডেন্ট হল অথচ তাকে না-ডেকে কল দেওয়া হল অন্য ডাক্তারকে, তার জন্যে তিনি রেগে যাননি তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “রেগে যায়নি, অবাক হয়েছে। আপনি হতেন না? ধরুন আপনি যদি এদের হাউস-ফিজিশিয়ান হতেন, অথচ এইরকমের একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে আপনাকে কিচ্ছু না-জানিয়ে আর-একজন ডাক্তারকে ডেকে তার হাতে চিকিৎসার ভার তুলে দেওয়া হত, তা হলে আপনি সেটাকে একটা স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নিতেন? না, সদানন্দবাবু, এটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বাড়ির ডাক্তারকে কেউ এভাবে এড়িয়ে যায় না। এরা যে এড়িয়ে গেছে, গৌতমের অবাক হবার সেটাই হচ্ছে আসল কারণ। তার মনে হয়েছে যে, সবটাই কেমন যেন একটা হাশ-হাশ ব্যাপার। কিন্তু তার জন্যে সে মিথ্যে কথা বলবে কেন? না না, আমি তাকে অনেক বছর ধরে চিনি, সে মিথ্যে কথা বলবে, এটা বিশ্বাসের যোগ্য নয়।”
“তা হলে?”
“তা হলে আর কী, আমাদের ধরে নিতে হবে যে, গৌতম আর মুকুন্দবাবুর কথার সঙ্গে চৌধুরিজির কথা যখন ট্যালি করছে না, তখন চৌধুরিজিই মিথ্যে কথা বলছেন।”
বললুম, “কিন্তু কেন? এতে তাঁর লাভ কী?”
“সেটাই তো বুঝতে পারছি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। …না মশাই, উপর-উপর যা মনে হচ্ছিল, ব্যাপারটা তত সহজ নয়।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। একটা সিগারেট ধরালেন। নিঃশব্দে শেষ করলেন সেটাকে। তারপর বললেন, “এইটুকু তো জায়গা, কিছু-একটা ঘটলে সেটা সঙ্গে-সঙ্গে জানাজানি হয়ে যাবার কথা। অথচ, কাণ্ড দেখুন, এক্ষেত্রে সেটা হয়নি। হাইওয়ের উপরে একটা অ্যাকসিডেন্ট হল, অথচ পুলিশ সেটা জানল না। যে-লোকটা গাড়ি চালাচ্ছিল, তার স্পাইনাল কর্ড ভেঙে গেল, অথচ ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানকে সেটা জানানো হল না। এদিকে আবার বড়লোক-বাপের একমাত্র ছেলে, কোথায় তার জন্যে বেস্ট পসিবল মেডিক্যাল এডের ব্যবস্থা করা হবে, তা নয়, অপারেশন করানো হল একটা কোয়াককে দিয়ে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তার উপরে আবার তালাবদ্ধ ঘর থেকে কিষুনজির মুকুট আর আয়রন-চেস্টের ভিতর থেকে নেকলেস উধাও হয়ে গেল!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটা নিয়ে পরে ভাষা যাবে। আগে এই অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারটা একটু ভাল করে বোঝা দরকার।”
“কিন্তু চৌধুরিজি যা বললেন, তাতে তো মনে হল, চুরিটাই তাঁর প্রবলেম।”
“চুরি আরও হবে। মানে তার চেষ্টা হবে। কিন্তু সেটাও পরের ব্যাপার। অন্তত আমার তা-ই ধারণা। আমার মনে হচ্ছে, দুর্ঘটনাটা কবে হল আর কোথায় হল, সবচেয়ে আগে সেটা আমাদের বোঝা চাই।”
বললুম, “সেটা তো আমরা জানি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কবে হয়েছে, সেটা শুধু জানি। হয়েছে অগস্ট মাসে। মুকুন্দবাবুর কথা যদি সত্যি হয়, তবে চৌঠা অগস্ট। কিন্তু কোথায় হয়েছে, সেটার বিষয়ে এখন আর আমি তত নিশ্চিত নই।”
“কেন,” আমি বললুম, “তাও তো আমরা শুনেছি। অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে হাইওয়ের উপরে, মানে পরেশনাথের কাছে রাস্তাটা যেখানে ডাইনে ঘুরে ধানবাদের দিকে চলে গেছে, সেইখানে। এটাও তো গৌতমই বলেছে।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “হ্যাঁ, এটাও গৌতমেরই কথা বটে, কিন্তু শোনা-কথা। আমার ধারণা, গৌতমের এই শোনা কথাটা নির্ভুল নয়। ওখানে যদি অ্যাকসিডেন্ট হত, তা হলে পুলিশ তা জানতে পারত। কিন্তু তাদের খাতায় ওখানে অমন কোনও অ্যাকসিডেন্ট যে ঘটেছিল, তার কোনও উল্লেখই নেই।”
“তা হলে?”
“তা হলে সন্দেহ হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, অ্যাকসিডেন্টটা আসলে অন্য জায়গায় ঘটেছিল। কিন্তু, যে-কোনও কারণেই হোক, চৌধুরিজি সেটা চেপে যেতে চাইছেন। শুধু তা-ই নয়, একটা ভুল জায়গার কথা বলে সকলের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন অন্যদিকে।”
“এটা তিনি কেন করছেন?”
“সত্যি যে করছেন, তা কিন্তু আমি বলিনি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অন্তত বলবার সময় এখনও আসেনি। আসলে আই ওয়াজ জাস্ট থিঙ্কিং অ্যালাউড। মানে ভাবছিলুম যে, একটা ঘটনা কোথায় ঘটেছে, সেটা যদি উনি চাপা দিতে চান তো কী করবেন? অন্যদের দৃষ্টি কি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইবেন না? সেটাই তো স্বাভাবিক।”
বললুম, “বেশ তো, ধরে নেওয়া গেল যে, অ্যাকসিডেন্টটা অন্য জায়গায় ঘটেছিল। কিন্তু সেটা চেপে যেতে হবে কেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা যদি বুঝতে পারি তো এই জিগ-স পাজলের প্রথম ঘুঁটিটা একেবারে ঠিক-জায়গাতেই বসে যাবে। আর তা যদি বসে, তো বাদবাকি ঘুঁটিগুলোকেও ঠিকঠাক জায়গায় বসিয়ে দেওয়া খুব একটা শক্ত হবে না। কিন্তু আর না, প্রায় এগারোটা বাজতে চলল; যান এবারে শুয়ে পড়ুন।”
ড্রইংরুম থেকে উঠে বেডরুমের দিকে পা বাড়াচ্ছি, হঠাৎ ভাদুড়িমশাই পিছন থেকে ডেকে বললেন, “ওহো, একটা কথা আপনাদের বলাই হয়নি। বিকেলবেলায় চৌধুরানির সঙ্গে কথা শেষ করে যখন হ্যাংগিং ব্রিজ দিয়ে চলে আসছিলুম, তখন যদি একবার ঘুরে দাঁড়াতেন, তো এক পলকের জন্যে একটি মুখ আপনাদের চোখে পড়ত।”
“কার মুখ?”
“একটি মেয়ের। বয়স মনে হল বছর-কুড়ির বেশি হবে না।”
“কার মেয়ে? চৌধুরিজির?”
“যতদূর জানি, রঘুনন্দনই রামাশ্রয় চৌধুরিজির একমাত্র সন্তান। এটি সম্ভবত রঘুনন্দনের বউ। চৌধুরিজির পুত্রবধূ।”
“কী করছিল?”
“জানলার গরাদে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু কিছু যে দেখছিল, এমন মনে হল না। ওই যাকে ভেকান্ট লুক বলে, সেই রকমের চাউনি।”
“কিছু মনে হল?”
ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “কী আবার মনে হবে। মেলাঙ্কোলিয়ার রোগী, ওই রকমের চাউনি হওয়াই তো স্বাভাবিক।”
বেডরুমে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে, তারপর বাথরুমটা ভাল করে দেখে এসে সদানন্দবাবু যখন নিচু হয়ে খাটের তলাটাও পরীক্ষা করছেন, তখন হেসে বললুম, “বাথরুম আর খাটের তলা এগজামিন করবার আগেই যে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়েছেন, এটা মশাই বুদ্ধির কাজ করেননি।”
সদানন্দবাবু তক্ষুনি ঘুরে দাঁড়িয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেলন, “এ-কথা কেন বলছেন?”
“সত্যিই যদি কেউ বাথরুমে কি খাটের তলায় লুকিয়ে থাকত, তা হলে ধরা পড়বামাত্র সে অ্যাটাক করত না আপনাকে? সেক্ষেত্রে আপনি চটপট পালাতেন কী করে? দরজাটা তো আগেই বন্ধ করে রেখেছেন। ছিটকিনি খুলতে খুলতে সে এসে আপনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ত না?”
“রসিকতা করবেন না, মশাই,” সদানন্দবাবু বেজার গলায় বললেন, “এটা হাসির ব্যাপার নয়। একটু কশাস থাকাই ভাল।…আর হ্যাঁ, শিয়রের জানলা দুটোও বন্ধ করে দিচ্ছি।”
“কেন, ভূতের ভয়ে?”
“না, ঠান্ডার ভয়ে।” সদানন্দবাবু বললেন, “নিজের কথা ভাবছি না, আমার লোহা-পেটানো শরীর। কিন্তু এখন কার্তিক মাস। হিম পড়ছে, জানলা খুলে রাখলে আপনার ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।”
সদানন্দবাবু যে বাথরুমের আলো নেবাতে রাজি হলেন না, সেই-সঙ্গে ঘরের মধ্যেও একটা ডিম আলো জ্বেলে রাখলেন, সেও অবশ্যই আমার কথা ভেবে!
