পাহাড়ি বিছে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৪)

সদানন্দবাবু সোফায় বসে পা দোলাচ্ছিলেন। কিন্তু ‘ভূত’ শব্দটা কানে যাবার পরে আর তিনি এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। এ-সব ক্ষেত্রে যা তিনি করে থাকেন, তা-ই করলেন। অর্থাৎ, ঝোলানো পা দুটিকে সড়াক করে সোফার উপরে টেনে নিলেন। তারপর ঢোক গিলে বললেন, “ধুর মশাই, ভূত বলে কিচু আচে নাকি?”

 

“আছে বোস-জেঠু,” কপট গাম্ভীর্যের গলায় কৌশিক বলল, “আপনার সোফার তলাতেই আছে। তা নইলে আপনি পা দুটোকে হঠাৎ উপরে তুলে নিলেন কেন? সোফার তলা থেকে হাত বাড়িয়ে ভূতে আপনার ঠ্যাং টেনে ধরবে, এই ভয়ে নিশ্চয়?”

 

কৌশিককে ধমক দিয়ে মালতী বলল, “আঃ, কী ছেলেমানুষি করছিস! তুই দেখছি বোসদাকে পাগল করে ছাড়বি!”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “যাচ্চলে, এদের জ্বালায় দেখছি আসল ব্যাপারটা চাপা পড়ে যাচ্ছে! হঠাৎ ভূতদর্শনের কথা উঠল কেন, দাদা? রঘুনন্দনকে দেখে কিছু মনে পড়ল?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রঘুনন্দন এখানে আসার আগেই আর-একটা কথা বলেছিলুম। মনে পড়ছে?”

 

“কী সম্পর্কে?”

 

“চেহারার মিল নিয়ে কথা হচ্ছিল না?”

 

“তা তো হচ্ছিল।”

 

“সেই সব শুনতে-শুনতেই অনেক দিন আগেকার একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায়। তোমরা কখনও গোয়া থেকে জাহাজে করে বোম্বাই গিয়েছ?”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “দু’ বার গিয়েছি। প্রথম বার গিয়েছিলুম একটা মেডিক্যাল কনফারেন্সে, আর দ্বিতীয় বার স্রেফ বেড়াতে। মালতী সেবারে সঙ্গে ছিল। দু’ বারেই অবশ্য জাহাজে করে বোম্বাই আসি।…কী গো, তোমার মনে নেই?”

 

“তা কেন থাকবে না,” মালতী বলল, “পানাজিতে যে সেবারে আমরা মিরামার বিচের একটা হোটেলে ছিলুম, তাও মনে আছে।”

 

আমি বললুম, “গোয়া থেকে বাই সি বোম্বাইয়ে গেছি আমিও। তবে দুবার নয়, এক বার। পানাজি থেকে জাহাজে উঠে পরদিন সকালে বোম্বাই পৌঁছেছিলুম। চমৎকার জার্নি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সারাটা রাত কি ঘুমিয়ে কাটিয়েছিলেন?”

 

“একদম ঘুমোইনি।” হেসে বললুম, “সেই আমার প্রথম সি-জার্নি। তার একটা থ্রিল তো থাকেই। হয়তো সেইজন্যেই ঘুম হল না। তা ছাড়া রাতটাও ছিল চাঁদনি, অ্যারাবিয়ান সি’র উপরে জ্যোৎস্না যেন খেলা করে বেড়াচ্ছিল।”

 

“কবিত্ব রাখুন। ঘুম তো হল না, তা হলে সময়টা কীভাবে কাটালেন?”

 

“ক্যাবিনে শুয়ে না-থেকে দোতলার ডেক-এ চলে আসি। তারপর রেলিংয়ের ধারে একটা চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখে রাত কাটাই।”

 

“বাঃ, তা হলে হয়তো আপনার মনে আছে যে, পানাজি থেকে জাহাজ একেবারে টানা বোম্বাইয়ে আসে না।”

 

“তা তো আসেই না, মাঝপথে কয়েকটা জায়গায় থেমে কিছু যাত্রী তুলে নেয়।”

 

“রাইট।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই রকমেরই একটা জায়গার নাম হচ্ছে দেউলগিরি। জেটি নেই বলে জাহাজকে সেখানে পাড় থেকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয় আর পাড়ের যাত্রীরা নৌকোয় করে এসে ডেক থেকে ঝোলানো দড়ির সিঁড়ি বেয়ে জাহাজে ওঠে।”

 

দেউলগিরি নামটা মনে নেই।” আমি বললুম, “তবে দুটো জায়গার যাত্রীরা যে নৌকো করে এসে জাহাজে উঠেছিল, এটা ভুলিনি।”

 

“ওরই একটা তা হলে দেউলগিরি। চেহারার মিল নিয়ে কথা হচ্ছিল না? তখন সদানন্দবাবুর গপ্পো শুনতে-শুনতে হঠাৎ এই দেউলগিরির এক সায়েন্টিস্ট ভদ্রলোকের কথা আমার মনে পড়ে যায়। দেউলগিরি থেকে একইসঙ্গে আমরা বোম্বাইয়ে আসছিলুম, পাড় থেকে উঠেওছিলুম একই নৌকোয়, কিন্তু জাহাজে ওঠার আগেই ঘটে যায় এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। ভদ্রলোক সেদিন মারা পড়তে বসেছিলেন।”

 

সুরিন্দর বেদী অনেকক্ষণ একটাও কথা বলেননি, চুপচাপ অন্যদের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। এবারে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কস্তি পাটি খা গয়ি ক্যা?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নৌকো উলটে যায়নি, তবে কিনা সেদিন খুব উলটো-পালটা হাওয়া দিচ্ছিল, ফলে এমনিতে যদিও অ্যারাবিয়ান সি খুবই শান্ত থাকে, সেদিন মাঝে-মাঝেই ঢেউ উঠছিল বেশ পেল্লায় সাইজের। নৌকো থেকে দড়ির সিঁড়ি বেয়ে জাহাজে ওঠবার সময় হঠাৎ সেই রকমের একটা ঢেউয়ের ধাক্কা লেগে নৌকোটা আচমকা লাফিয়ে ওঠে, আর আমাদের সহযাত্রী এই সায়েন্টিস্ট ভদ্রলোকটি টাল সামলাতে না-পেরে জলে পড়ে যান।”

 

মালতী বলল, “আরে সব্বনাশ, তারপর?”

 

“তারপর আর কী,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমাকেও সঙ্গে-সঙ্গে নৌকো থেকে জলে ঝাঁপ দিতে হয়। নৌকোর একজন ছোকরা-মাঝিও ইতিমধ্যে জলে নেমে পড়েছিল। দুজনে মিলে অনেক কষ্টে তাঁকে ফের নৌকোয় তোলা হল। ভদ্রলোক অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তবে জাহাজে তো একজন ডাক্তার থাকেই। ডেকের ওপরে উপুড় করে শুইয়ে ফেলে পিঠে ডলাই-মলাই করে ভদ্রলোকের পেট থেকে তিনি জল বার করে দেন। কিছু ওষুধপত্তরও দিয়েছিলেন। না, জ্ঞান ফিরে আসতে তারপর আর দেরি হয়নি।”

 

সদানন্দবাবুর নজর সর্বদা ডিটেল্সের দিকে। তিনি বললেন, “কিন্তু আপনি তো ভিজে চুব্বুস হয়ে গেসলেন, মশাই। তার কী হল? ভিজে জামাকাপড় পরেই বোম্বাই অব্দি চলে এলেন?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমি কি আমার সুটকেস হাতে নিয়ে জলে ঝাঁপ দিয়েছিলুম নাকি? সেটা তো নৌকোতেই ছিল। জাহাজে উঠে সুটকেস খুলে জামাকাপড় পালটে নিই। জল থেকে যাঁকে উদ্ধার করে আনি, তাঁকে অবশ্য সুটকেস-সুদ্ধু নৌকোয় তোলা যায়নি। ফলে, আমারই একটা পায়জামা আর শার্ট তাঁকে ধার দিতে হয়।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “ওঃ, খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন, দাদা। ভদ্রলোক তো মারা পড়তেনই, আপনারও সেদিন মস্ত ফাড়া গেছে। জলের টানে যদি জাহাজের চাকার কাছে গিয়ে পড়তেন, তা হলে আর বেঁচে ফিরতে হত না।”

 

“ভগবান রক্ষে করেছেন।” কপালে হাত ঠেকিয়ে মালতী বলল, “কালই কালীঘাটে গিয়ে পুজো দিয়ে আসব। কিন্তু কই, এই এত বড় একটা ঘটনার কথা তো তুমি আগে কখনও বলোনি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বোঝো ব্যাপার! ওরে, এ কি আজকের কথা নাকি? পঁচিশ বছর আগে ঘটেছিল।”

 

কৌশিক বলল, “ভদ্রলোক যে সায়েন্টিস্ট, তা তুমি জানলে কী করে? আগে থাকতে পরিচয় ছিল?”

 

“আগে থাকতে ছিল না। বিগ্রহ-চুরির একটা ব্যাপার নিয়ে সেবারে আমাকে দেউলগিরি যেতে হয়। গিয়ে আলাপ হয় এই মানুষটির সঙ্গে। ভদ্রলোক জিওলজিস্ট, বোম্বাইয়ের একটা কলেজে ভূবিজ্ঞান পড়াতেন, কিন্তু কিছুদিন বাদেই এর ঝোঁক চলে যায় প্যালিয়ন্টোলজি অর্থাৎ জীবাশ্মবিদ্যার দিকে। জীবাশ্ম বুঝলি তো? ফসিল।”

 

হেসে বললুম, “আমাদের নিয়ে এই হয়েছে মস্ত মুশকিল। যতক্ষণ না ইংরিজিটা বলে দিচ্ছেন, বাংলা কথাটারও অর্থ ততক্ষণ আমরা অনেকেই ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন, বুঝে না-ওঠার কী আছে? জীব কথাটা তো সবাই জানে, আর অশ্ম মানে পাথর। দুয়ে মিলে মানে দাঁড়াল পাথর-হয়ে-যাওয়া জীব। তা সে-জীব গাছও হতে পারে, আবার অন্য-কোনও প্রাণীও হতে পারে। এতে না-বোঝার তো কিছু নেই।”

 

“তা নেই, দাদা,” অরুণ সান্যাল বললেন, “তবে কিনা জীবাশ্ম বড়ই খটোমটো বাংলা, তাই ফসিলই বলুন, কানে আর-একটু ভাল শোনাবে।”

 

“ঠিক আছে। তো যা বলছিলুম,…দেউলগিরিতে আমি গিয়েছিলুম বিগ্রহ-চুরির তদন্ত করতে আর ইনি গিয়েছিলেন ফসিলের খোঁজে। কার কাছে নাকি খবর পেয়েছিলেন যে, ওখানে একটা ঢিবি খুঁড়ে এমন দু’-চারটে ডালপালা পাওয়া গেছে যা পাথরের মতো শক্ত। সেই খোঁজেই যাওয়া। কিছু অবিশ্যি পাননি, তাই জাহাজে পরদিনই বোম্বাই ফিরে যাবেন। শুনে আমি বললুম যে, আমিও পরদিনই বোম্বাই ফিরছি, ভালই হল, একসঙ্গে ফেরা যাবে। তার পরে তো মাঝরাত্তিরে জাহাজে উঠতে গিয়ে ওই বিপত্তি।”

 

কৌশিক বলল, “ভদ্রলোক সুস্থ হয়ে উঠবার পর আর কোনও কথা হয়নি তোমার সঙ্গে?”

 

“হয়েছিল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভদ্রলোক ম্যারেড, তবে বউ মারা গেছে, বছর পাঁচেকের একটি ছেলে আছে অবিশ্যি, কিন্তু বাপ তো ভবঘুরের মতো, মাহিমে একটা ফ্ল্যাটে থাকেন, তবে সে নামেই থাকা, আজ যদি পুণে যাচ্ছেন তো কাল ঔরঙ্গাবাদে, ছেলে তাই বাপের কাছে থাকে না, সে নৈনিতালে তার মামাবাড়িতে মানুষ হচ্ছে। ভদ্রলোক যে তাই নিয়ে খুব ভাবিত, এমনও মনে হল না। বললেন, মামাবাড়িতে তো ভালই আছে, ওর বড়মামা মিঃ ত্রিপাঠী ওখানকার নামজাদা ডাক্তার…তা ওরাই কোনও ইস্কুলে-টিস্কুলে ভর্তি করে দেবে নিশ্চয়, আমি আর ও নিয়ে ভেবে মরি কেন।”

 

“তারপর?”

 

“তারপর আর কী, বোম্বাইয়ে নেমে জেটিঘাট থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিলুম, কেস কর্নারে আমাকে আমার হোটেলে নামিয়ে দিয়ে উনি সেই ট্যাক্সি নিয়ে মাহিমে চলে গেলেন।”

 

“বাস্?” আমি বললুম, “কিন্তু আমাদের কথা তো হচ্ছিল চেহারার মিল নিয়ে। তার সঙ্গে আপনার এই বিজ্ঞানী ভদ্রলোকের সম্পর্ক কোথায়? এঁর কথা হঠাৎ আপনার মনে পড়ল কেন?”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “পরে আর এঁর সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হয়নি?”

 

“না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বোম্বাইয়ের কাজ সেরে বাঙ্গালোরে ফেরার হপ্তাখানেক বাদে একদিন আপিসে এসে দেখি, টেবিলের উপরে একটা প্যাকেট পড়ে রয়েছে। বড়সড় প্যাকেট, ব্রাউন পেপারে মোড়া, উপরে আমার নাম-ঠিকানা আর পোস্টাফিসের ছাপ। তা সেই প্যাকেটের ভিতর থেকে কী বেরোল জানো?”

 

সদানন্দবাবু ফ্যাসফেসে গলায় বললেন, “বোমা?”

 

“আরে না মশাই, বোমাটোমা নয়, আমার সেই পায়জামা আর শার্ট। মানে জাহাজে উঠে ভদ্রলোককে যা পরতে দিয়েছিলুম আর কি। সে দুটো তিনি ধোবাবাড়ি থেকে কাচিয়ে, ইস্ত্রি করিয়ে ফেরত পাঠিয়েছেন। সঙ্গে একটা চিরকুট। তাতে লেখা : থ্যাঙ্কস আ লট ফর অল দ্যাট ইউ হ্যাভ ডান ফর মি!”

 

বললুম, “ভদ্রলোক যে খুবই কর্তব্যপরায়ণ, সেটা বোঝা গেল। কিন্তু এর সঙ্গেই বা চেহারার মিলের কী সম্পর্ক?”

 

ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “এই আপনার মস্ত দোষ, কিরণবাবু, আগেই বড্ড অস্থির হয়ে পড়েন। প্রশ্ন যদি করতেই হয় তো পরে করবেন, সবটা আগে শুনুন তো। আমার কথার শেষটুকু তো এখনও বলাই হয়নি।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “বলুন, বলুন।”

 

“দেউলগিরিতে যাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, সেই সায়েন্টিস্ট ভদ্রলোকের পিতৃপরিচয় জানতে পারা গেল মাত্র পাঁচ বছর আগে। তাও একেবারে আকস্মিকভাবে জানতে পারলুম। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে যদি না মির্জাপুরে যেতুম, তা হলে জানাই হত না।”

 

কৌশিক বলল, “মির্জাপুর যে শেষ পর্যন্ত এসে যাবে, আমি কিন্তু সেটা আগেই বুঝতে পেরেছিলুম।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বটে? তা কী করে বুঝতে পারলি?”

 

‘না…মানে ইয়ে….ঠিক যে বুঝতে পেরেছিলুম তা নয়,” আমতা-আমতা করে কৌশিক বলল, “ওই মানে আন্দাজ করেছিলুম আর কি।”

 

“ঠিকই আন্দাজ করেছিলি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে বাকিটা শোন। মির্জাপুরে সেবারে ছিলুম মাত্র তিনটে দিন। তার মধ্যে একদিন যে নন্দন মিউজিয়ামে গিয়েছিলুম, তা তো বলেছি। এটাও বলেছি যে, শ্যামনন্দন মিশ্র মশাই নিজেই সেখানে আমাকে সব কিছু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। অমন মিউজিয়াম সত্যিই এ-দেশে দুটি নেই। স্রেফ বিভিন্ন যুগের হরেক রকমের পাথরের জিনিসপত্রের কালেকশন। ফসিলও প্রচুর। কিন্তু সেটা কোনও কথা নয়। আসল কথাটা হল, পাথরের ওই আশ্চর্য কালেকশন যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখব, সেই মনই সেদিন আমার ছিল না। থাকবেই বা কী করে, শ্যামনন্দন মিশ্রকে দেখেই যে আমি চমকে গিয়েছিলুম।”

 

“কেন?”

 

“চমকে গিয়েছিলুম দেউলগিরির সেই সায়েন্টিস্ট ভদ্রলোকের সঙ্গে শ্যামনন্দন মিশ্রের চেহারার মিল দেখে। অমন মিল বড়-একটা চোখে পড়ে না। মনে হয়েছিল সেই সায়েন্টিস্ট ভদ্রলোকই হঠাৎ যেন বেদম বুড়িয়ে গিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।”

 

এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই, তারপর বললেন, “আমার চমকে যাওয়ার ব্যাপারটা শ্যামনন্দন মিশ্রের নজর এড়ায়নি। ম্লান হেসে বললেন, ‘আপনি সম্ভবত হরির কথা ভাবছেন। হরিনন্দন আমার ছেলে। বেঁচে থাকলে তার বয়েস এখন পঞ্চাশ বছর হত। আপনি তাকে চিনতেন?

 

“বললুম, খুব না। নেহাতই দু-এক দিনের পরিচয়। সেও কুড়ি বছর আগের কথা। চেহারাটা অবশ্য স্পষ্ট মনে আছে। ইন ফ্যাক্ট, তাঁর তো মারা যাবার মতো বয়েস হয়নি। কীসে মারা গেলেন? কঠিন কোনও অসুখ হয়েছিল?”

 

“শুনে শ্যামনন্দন বললেন, ‘অসুখ-টসুখ নয়, অ্যাকসিডেন্ট। ওয়েস্টার্ন ঘাট রেঞ্জে রাধানগর বলে একটা জায়গা আছে, সেখান থেকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে সাঁতারার দিকে যাচ্ছিল। পথে অ্যাকসিডেন্ট। একটা ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা লাগে। কিছু করবার ছিল না… হরি ডায়েড অন দ্য স্পট।…. তাও তো অনেক দিন হয়ে গেল…কুড়ি বছর।’ একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন শ্যামনন্দন মিশ্র। তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কী জানেন, আমার এই ছেলেটা ছিল অ্যাকসিডেন্ট-প্রোন। ছেলেবেলা থেকে এতবার এত দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে যে, সব সময়েই ওকে নিয়ে আমি বড় দুশ্চিন্তায় থাকতুম। এই দেখুন না, মারা তো গেল সেভেন্টিওয়ানের মে মাসে, ঠিক তার এক মাস আগেই জলে ডুবে মরতে বসেছিল। বম্বে থেকে বাই সি যদি গোয়া যান তো পথের মধ্যে দেউলগিরি বলে একটা জায়গা পড়বে। তো সেই দেউলগিরি থেকে বোম্বাই আসবে বলে জাহাজে উঠতে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি খেয়ে জলে পড়ে যায়।…কী বলবেন একে? নিয়তি?”

 

“আমি কিছুই বললুম না। এমনকী, অ্যারাবিয়ান সি’তে সেভেন্টিওয়ানের এপ্রিল মাসের সেই দুর্ঘটনা যে আমার চোখের সামনেই ঘটেছিল, তাও না।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “তারপর?”

 

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “তারপর আর কী, প্রোফেসর শ্যামনন্দন মিশ্র আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাঁর মিউজিয়াম দেখালেন। অবাক করে দেবার মতো কালেকশন। অজস্র রকমের ইমপ্লিমেন্টস আর আর্টিফ্যাক্টস। সবই পাথরের। নানান ধরনের পাথর। হলুদ, লাল, সাদা, সবুজ নীল। পাথর যে এত সব রঙের হয়, তা-ই জানতুম না। আর জিনিসপত্রগুলোও নানান রকমের। তার মধ্যে দুটো জিনিস দেখে একেবারে তাজ্জব হয়ে গেসলুম।”

 

কৌশিক বলল, “কী জিনিস?”

 

“একটা হল একটা কুড়ুলের মাথা। স্টোন-এজ অর্থাৎ প্রস্তর-যুগের জিনিস। কোথায় পাওয়া গেল, সেটা পরে বলছি, তার আগে আর-একটা কথা বলে নিই। ভিনসেন্ট বলের নাম শুনেছিস?”

 

“না।”

 

“নাইনটিন্থ সেঞ্চুরির মস্ত বড় জিয়োলজিস্ট। পশ্চিমবঙ্গে ইনি প্যালিয়োলিথিক এজ অর্থাৎ প্রত্ন-প্রস্তর যুগের দু-দুটো ইমপ্লিমেন্টের খোঁজ পান। দুটোই কুডুলের মাথা। একটা পেয়েছিলেন হুগলির এক গ্রামে আর অন্যটা পেয়েছিলেন রানিগঞ্জের এক কয়লা খনিতে। সে-দুটোর কোনওটাই অবশ্য এ-দেশে নেই, যদ্দুর জানি দুটোই বিলেতে চালান হয়ে গেল।”

 

“আর মির্জাপুরের মিউজিয়ামে যেটা দেখলে, প্রোফেসর মিশ্র সেটা কোথায় পেয়েছিলেন?”

 

“এটাও পাওয়া গেল আমাদেরই পশ্চিমবঙ্গের আর-একটা কয়লা-খনিতে।”

 

‘কোন কয়লা খনিতে?”

 

“অজয়ের ধারে পাণ্ডবেশ্বর বলে একটা জায়গা আছে, কখনও গেছিস?”

 

“যাইনি, তবে নাম শুনেছি।”

 

“ওই পাণ্ডবেশ্বর থেকে মাইল কয়েক দূরে মাদারবনি কয়লা-খনিতে। আসলে অবশ্য খনির ভেতর থেকে এটা পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেল কুলি-ধাওড়ায় এক মজুরের বাড়িতে। তারই কাছে শোনা গেল যে, খনির মধ্যে কয়লা কাটতে-কাটতে এটা পাওয়া যায়।”

 

“প্রোফেসর মিশ্র এটার খোঁজ পেলেন কীভাবে?”

 

“খোঁজ প্রোফেসর মিশ্র পাননি, পেয়েছিল তাঁর ছেলে হরিনন্দন। তার ফসিল খোঁজার নেশার কথা তো আগেই বলেছি। ওই ব্যাপারেই কার কাছে কী খবর পেয়ে মৃত্যুর বছর দুই-তিন আগে একবার পাণ্ডবেশ্বরের ওদিকে চলে গিয়েছিল। গিয়ে ফসিলের বদলে ওই কুড়ুলের খোঁজ পেয়ে যায়। আসলে সেও তো জিয়োলজিস্ট। তাই, কুড়ুলটা যে লোহার নয়, পাথরের, আর সেটা যে খনির মধ্যে চাপা পড়ে ছিল, এইটে শুনে তার সন্দেহ হয়। পরে জিনিসটা দেখে আন্দাজ করে নেয় যে, এটা মামুলি জিনিস নয়, স্টোন এজের ইমপ্লিমেন্ট। কুড়ুলের মাথা নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসে বাপকে দেখাতে তিনি কনফার্ম করেন যে, তা-ই বটে, এটা প্যালিয়োলিথিক এজের জিনিস।”

 

“ওরেব্বাবা!” কৌশিক বলল, “তার মানে তো হাজার-হাজার বছর আগেকার ব্যাপার!”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “হাজার-হাজার কেন, লক্ষ-লক্ষ বছর হওয়াও বিচিত্র নয়। ইউরোপে স্টোন-এজ শুরু হয়েছিল নাকি পনেরো-কুড়ি লক্ষ বছর আগে। যদি ধরে নিই যে, এখানে অন্তত লাখ-দশেক বছর আগে শুরু হয়েছিল, তা হলেও তো ওই কুড়ুলের বয়েস পাঁচ-দশ লাখ বছর হতেই পারে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমার মাতা ঘুরচে, মশাই। আপনি যা বলচেন, তাতে তো মনে হচ্চে যে, আমারই কোনও অতিবৃদ্ধ প্ৰ-প্ৰ-প্ৰ…”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রপিতামহ।”

 

“হ্যাঁ, প্রপিতামহ।” সদানন্দবাবু বললেন, “ওই কুড়ুল দিয়ে আমারই কোন অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ…” একটা আর্মাডিলো অর্থাৎ পিপীলিকাভুক কিংবা গোসাপ মেরে সেদিনকার মতো ক্ষুন্নিবৃত্তি করেছিলেন কি না? করতেই পারেন।…কিন্তু স্টোন-এজের কুড়ুলের কথা থাক। প্রোফেসর মিশ্রের মিউজিয়ামে সেদিন পাথরের তৈরি দ্বিতীয় যে জিনিসটা দেখি, সেটা দেখেও আমার তাক লেগে গেল। তবে তার বয়েস লক্ষ বছর তো নয়ই, হাজার বছরও নয়। মেরেকেটে দু-পাঁচশো বছর হবে।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “সেটা কী?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “শ্বেতপাথরের একটা কাঁকড়াবিছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *