অন্য শিকার (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

বনপথটি সেই উঁচু পাহাড়টির মধ্যে এমন করে সেঁধিয়ে গেছে যে, মনে হচ্ছে মৃত্যুর মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে জীবন, অথবা জীবনের মধ্যে মৃত্য।

বুড়ো ভাবতে-ভাবতে চলেছে, মানুষ কী নিয়ে বাঁচে? কেন বেঁচে থাকে মানুষ? শুধু কি রোজগার করারই জন্যে? শুধুই কি চাল, ডাল, তেল মশলারই জন্যে? মানুষ হয়ে জন্মানো কি শুধু এইটুকুরই জন্যে?

বাঘেরা রাতে জাগে দিনে ঘুমোয়। বুড়হা-বাঘার ঘুম আসছিল না। যদিও কাল সারারাত রোঁদে ছিল সে। এইক্ষণে গুহার মুখটিতে গাঢ় ঘুমেই শুয়ে থাকার কথা ছিল। শরীরের আধখানাতে রোদ এসে পড়ার কথা ছিল। মুখটিকে ছায়ায় রেখে শরীরটিকে রোদে টানটান করে শুয়ে থাকারই কথা ছিল এখন।

কিন্তু…নীল আকাশের অনেক উঁচুতে ঘুরে ঘুরে উড়ে-বেড়ানো একা বাজপাখিটা রোজই এই সময় তার তীক্ষ্ণ চোখে দেখতে পায় যে ঘুমন্ত ডোরাকাটা বাঘের সাদা তুলোর নরম লোমে-ভরা পেটটা উঠছে আর নামছে। কিন্তু আজ সকালে বাঘটা জেগে আছে। সামনের দুটি থাবায় মাথা রেখে সামনে চোখ মেলে চেয়ে আছে। বুড়হা বাঘাটার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলেছে যে, আজ সকালে কিছু একটা ঘটবে। অনেক রোদ-ঝলম শীত-সকালে আরামে ঘুমিয়েছে বাঘা। আজ সকাল, জেগে থাকার সকাল।

ছেলেটা বড় বোকা। এমন দেশ ছেড়ে চলে গেল একটু ভাল খাওয়া, ভাল থাকা, একটু ভাল পরার জন্যে। খাওয়া-পরাই কি সব মানুষের?

শিকারি হাঁটছিল। শীতের সকালের রোদেরও এক আলাদা গন্ধ আছে। যে-রোদে প্রজাপতি আর কাঁচপোকারা ওড়ে, যে-রোদে বন-বনানীর শিশিরভেজা মাকড়সার জালে জালে কুবের রাজার হিরে-মানিক ঝমলিয়ে ওঠে। ভিজে মাটির হিমেল গন্ধে নাক ভরে যাচ্ছে বুড়োর। পুটুস আর পাঁচমিশেলি বুনো ফুলের গন্ধে। তার পাইপের তামাকের গন্ধের সঙ্গে সেই গন্ধ মিশে যাচ্ছে।

ভারী পরিপূর্ণ, ভরন্ত একটি সকাল, প্রত্যাশাতে ভরা। মনে মনে বলল বুড়ো শিকারি।

বুড়ো কোনও দিনও কোনও পরীক্ষাতেই প্রথম হতে পারেনি। না স্কুল-কলেজের পরীক্ষাতে, না জীবনের পরীক্ষাতে। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ হয়েই কাটিয়ে দিয়েছে জীবন। তার জীবনের এই গভীর গ্লানি ও লজ্জা থেকে নিজেকে সে মুক্ত করবে আজ। প্রথম না হলে, প্রথম হয়ে বাঁচতে না পারলে, বাঁচার কোনওই মানে নেই। জীবনে পারেনি, পারল না; তাই-ই প্রয়োজনে মৃত্যুতেই সেই গ্লানি থেকে বাঁচাবে আজ নিজেকে। বুড়হা-বাঘাকে মেরে, প্রথম হবে। বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়াতে যায় আসে না কিছুমাত্রই, যদি না মানুষের মতো মানুষ না হল, প্রথম-হওয়া মানুষের মতোই না বাঁচল অথবা না মরল।

চঞ্চল সাত-বোন পাখিরা শোরগোল তুলেছে শীতের আড়ষ্ট ঝোপে-ঝাড়ে। নড়ছে চড়ছে। কুঁদুলে বোনেদের মতো সরে সরে বসছে এ ওর গায়ে। শিশিরভেজা ডানা সপসপ করে ময়ূর উঠল জংলি সাঁওয়া ধানের খেত থেকে উডে। বনমোরগের ঘন লাল আর হলুদ ডানায় রোদকণা ছিটকে গেল। পথের ডানদিকের বাইসন-চরুয়া মাঠে ধীর পায়ে চরে-বেড়ানো একদল বাইসনের মধ্যে একটি বুড়ো বাইসন জোরে নাক ঝাড়ল। সেই হঠাৎ-শব্দে ভয় পেয়ে গাছগাছালির মাথা ছেড়ে ছত্রাকারে ছড়িয়ে গেল ঝোড়ো-হাওয়ার মুখের ঝরাপাতার মতো নানা জাতের ছোট পাখিরা। বুড়ো-শিকারি ছায়াচ্ছন্ন জায়গাটা পেরিয়ে এখন পাহাড়তলির রৌদ্রালোকিত প্রান্তরে এসে পৌঁছল।

বুড়হা-বাঘা এতক্ষণে দেখতে পেল তাকে। সঙ্গে সঙ্গে সাদা-দাড়ি শিকারি, তার জাত-শিকারির ষষ্ঠবোধে বুঝতে পারল; কেউ নিশ্চয়ই তার মুখে চেয়ে আছে আড়াল থেকে।

কে? সে কে?

বুড়ো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে দেখতে-না পাওয়া তাকে, সেই অদৃশ্য চোখ দুটিকে ভাল করে দেখে নিতে দিল। এই খেলাতে, যার যার তাস প্রতিপক্ষকে দেখাতে হয়। মৃত্যু দেখে জীবনকে; জীবন মৃত্যুকে। বুড়হা-বাঘা ভাল করে দেখল বুড়ো শিকারিকে। গুহার সামনের চ্যাটালো কালো পাথরের আরামের বিছানা ছেড়ে বুড়হা-বাঘা সাবধানী থাবা মেলে মেলে উপর থেকে নিঃশব্দে নেমে আসতে লাগল। হলুদ-কালো আলখাল্লা পরা মযদূতেরই মতো।

মানুষ কিসে বাঁচে?

কী নিয়ে বাঁচে মানুষ? ডাবল-ব্যারে রাইফেলের দুব্যারেলে দুটি সফট-নোজড বুলেট পুরে নিতে নিতে বুড়ো শিকারি ভাবছিল। একের পর এক দিন, মাস, বছর মাড়িয়ে যাওয়ার নামই কি বেঁচে থাকা?

এবার আবারও ঘন বনের মধ্যে ঢুকতে হবে। এই রৌদ্রোজ্জ্বল সকালেও সেই বন প্রায়ান্ধকার। ভিজে স্যাঁতসেঁতে। মৃত্যুর গন্ধে ভরা। জীবনের উষ্ণ এলাকায় আরও কিছুটা দূর হেঁটে গিয়েই বুড়ো ঢুকে পড়ল মৃত্যুর গা-ছমছম্ শীতার্ত অন্ধকার এলাকাতে।

হঠাৎ।

যে-কোনও দুঃসাহসিক কাজই হঠাৎ না করলে করাই হয়ে ওঠে না।

বাঘটাও নেমে এসেছে ততক্ষণে সমতলে। এবার একটা শুকনো নালার বুক ধরে বালি-পাথরের উপরে উপরে সে এগিয়ে চলেছে। হনুমান, পাখি, প্রজাপতি, কাঠবিড়ালি সম্ভ্রমের সঙ্গে চেয়ে আছে তার চলার দৃপ্ত ভঙ্গির দিকে। বুড়ো শিকারির পথও এই নালাটার সঙ্গে মিশে গেছে। বুড়ো শিকারিকেও দেখছে বনের বাসিন্দারা। সম্ভ্রমের চোখে। বয়স শরীর ক্ষয় করে, কিন্তু মর্যাদা বাড়ায়, যাদের তা থাকে। মানুষটা অন্য দশটা মানুষের মতো নয় যে!

দুটো খরগোশ ঘাস খাচ্ছিল নদীর পাশের সবুজ একফালি মাঠে। বুড়ো বাঘাকে দেখেই, দৌড়ে পালিয়ে গেল তারা।

এই-ই বুড়হা বাঘার জীবনের অভিশাপ! ওকে দেখে সকলেই পালায়। পাখি, হরিণ, মানুষের মেয়ে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এই-ই দেখে আসছে। অথচ, কখনও-সখনও ও-ও একটু ভালবাসতে চায়, গল্প করতে চায় ওদের সঙ্গে, ওদের সমান হয়ে যেতে চায় বলে, শৌর্যে।

তাই মাঝে-মাঝে বড়ই অভিমান হয়। বনের এমন রাজা হয়ে লাভ কী? বনের সব প্রজারা যদি তাকে দেখামাত্র দৌড়তেই থাকে? রাজত্ব যদি রাজার একার হয়, প্রজাদের না হয় তবে তার দাম কী? এতদিনে একজন মানুষের খোঁজ পেয়েছে বুড়হা-বাঘা। যে না-পালিয়ে স্থির পায়ে তার দিকেই আসছে। তাকেই সেই মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে। একথা ভেবেই ভাল লাগছে বাঘার। উল্টো কিছু ঘটতে যাচ্ছে এতদিনে! সত্যি নিত্য?

বুড়ো শিকারি ভাবছিল যে, আজ দু-দুটো বাঘকে মারবে সে। ডান দিকের ব্যারেল ফায়ার করে মারবে বুড়হা-বাঘাকে, আর বাঁদিকের ব্যারেল ফায়ার করে মারবে তার পানাপুকুরের মতো জীবনের এই ঘটনাবিহনী একঘেয়েমিকে। যা কেউই আগে পারেনি। তাইই আজ করে, একদৌড়ে ফিনিশিং-টেপ বুক দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে, অনেক নীরব হাততালি আর অভিনন্দনের মধ্যে নিঃশব্দে বুড়হা-বাঘাকে মৃত্যুর মধ্যে সেঁধিয়ে দিয়ে প্রথম হবে সাদা-দাড়ি।

জীবনে যা পারেনি, মৃত্যুতে তাই-ই পারবে।

বুড়হা-বাঘাটাও বড় ক্লান্ত ছিল। অনেক বছর ধরে সেও বড় একঘেয়ে জীবনই কাটিয়ে আসছে। সেই ভিন্ এলাকার সাহসী বড় বাঘটাকে প্রচণ্ড লড়াই করে মেরে ফেলার পর তার জীবন বড়ই সাদামাঠা হয়ে গেছে। মানুষরাও কেউ ভয়ে তার কাছ মাড়ায় না। তার জীবনে কোনও ভয় নেই, অনিশ্চিতি নেই; চ্যালেঞ্জ নেই। শিকারিরা সবাই তাকে সেলাম জানিয়েই চলে গেছে দূর থেকে। স্বীকার করে গেছে, হয় তার হাতে মরে, নয় অপমানিত হয়ে যে বুড়হাবাঘাই শ্রেষ্ঠ। বুড়হা-বাঘার সম্মানে কেউই আর হাত দিতে আসেনি। শ্রেষ্ঠত্বর ক্লান্তিতে ক্লান্ত, বড় ক্লান্ত হয়ে গেছে বুড়হা-বাঘা। একঘেয়ে এই সম্মানের ক্লান্তি বড় ক্লান্তি। চিরদিন প্রথম হওয়ার এবং প্রথম হয়েই থাকাটা বড় বেশি বাজে; যদি না সেই প্রথমত্ব অটুট রাখতে সব সময়ই লড়াই করতে হয়। বহু বছর হয়ে গেছে কোনও শিকারিই গুলি ছোঁড়েনি তার দিকে তাক করে। তার সঙ্গে টক্কর দিতে আসেনি। আর কোনও বড় বাঘও তার এলাকায় ঢোকেনি সাহস করে। বুড়হা বাঘার নখে মরচে পড়ে যাচ্ছে। নখ দিয়ে সে শুধুই মাংস ছিঁড়ে পেট ভরায়। এই একঘেয়ে প্রথমত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায় বাঘটা।

বুড়ো-শিকারি বড় ভালবেসেছিল তার জীবনের পরিবেশকে। যেহেতু সে মানুষ, তাই শুধুই শ্বাস নিয়ে আর নিশ্বাস ফেলে সে বেঁচে থাকতে চায়নি। বাঁচতে চেয়েছিল, সব মানুষেরই যেভাবে বাঁচা উচিত। বাঁচার চেষ্টা করা উচিত।

শিকারি বড় ভালবেসেছিল এই দেশের বৈশাখের ভোরের হাওয়াকে, গ্রীষ্মের স্নিগ্ধ নীল-সবুজ তারাভরা উলা রাতকে, বসন্তের সকালকে, শ্রাবণের দুপুরকে আর শীতের সন্ধেকে। ভালবেসেছিল তার লাইব্রেরির বইগুলিকে, তার মৃতা স্ত্রীর চোখ দুটিকে, তাঁর নির্মল হাসিকে, তার শিশু-ছেলের হাতের পাতার উষ্ণতাকে। একসময়। অন্য কোনও মানুষের কাছেই তার চাইবার ছিল না কিছুই। অন্য দশজন মানুষ দুঃখ-কষ্ট বলতে যা বোঝে, বুডোের জীবনে তেমন কোনও দুঃখ-কষ্ট ছিল না। তবুও এক গভীর কষ্টে বুড়ো সবসময়ই ছটফট করেছে। সকলে যখন বলেছে, অনেক কিছুই তো হল তোমার, আর কী চাই, তখন বুড়ো বলেছে মনে মনে, মাথা নেড়ে; কিছুই তো হল না।

যা-কিছুই পেয়েছে সে-সব তো সে চায়নি! সে যে অন্য কিছু চেয়েছিল।

এবার নাকে মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছে বুড়ো শিকারি। যদিও বাঘের পায়ের শব্দ পায়নি, বাঘের গায়ের গন্ধ পায়নি। হাওয়াটা এখন স্থির। প্রকৃতি রুদ্ধ নিশ্বাসে স্তব্ধ। মাঝে-মাঝে হঠাৎ উঁচু গাছের পাতা খসে গিয়ে নীচে পড়ছে। সেই সামান্য শব্দতেই বনের আনাচকানাচ ভরে যাচ্ছে। শিশির আর বুনোফুল আর গাছেদের গায়ের সঙ্গে তার পাইপের তামাকের গন্ধ আর মৃত্যুর গন্ধ মিলেমিশে গেছে। দারুণ লাগছে বুড়োর।

এবার আবার বনপথের অন্ধকার সরে গেল।

বাঘটা মাথাটাকে নামিয়ে সামনের দুকাঁধের মাঝে ঢুকিয়ে নিল। জমির সঙ্গে মিশে গেল। তখন মনে হচ্ছিল যেন বাঘ নয়, বিড়াল। বাঘটা ছোট্ট এক হঠাৎ-দৌড়ে, নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গেল কিছুটা। তারপর একটা বড় কালো পাথরের পেছনে সারা শরীরটা আড়াল করে শুধু মাথাটা একপাশে বের করে জমির সঙ্গে লেপটে গেল একেবারে। লেজটা, সোজা লাঠির মতো শক্ত হয়ে পেছনে সমান্তরাল হয়ে রইল।

খুবই আনন্দ হচ্ছিল বাঘটার। ও বেঁচে আছে কি নেই তার পরীক্ষা হবে নতুন করে আজ। বেঁচে থাকলেই কিছু বেঁচে থাকা হয় না। বুড়হা-বাঘা, বুড়ো ঘেয়ো শম্বরের মতো যে বাঁচতে চায়নি। সেরা বাঘের মতোই বাঁচতে চেয়েছিল, যেমনভাবে বাঁচার খোঁজ অন্য সব বাঘ রাখে না। সব বাঘই বুড়হা-বাঘা হতে পারে না।

আসছে। এসে গেছে সেই সাদাদাড়ি শিকারি কাছে। শুকনো পাতা, কাঠকুটো এড়িয়ে, নিঃশব্দে অভিজ্ঞ সাবধানী পা ফেলে ফেলে, রাইফেলটাকে রেডি-পজিশনে ধরে এগিয়ে আসছে বুড়ো শিকারি। তার সাদা দাড়ি, সাদা চুলে, ঋষির মতো দেখাচ্ছে তাকে। বড়ই স্পর্ধা মানুষটার। দম্ভ হয়েছে বড়। আজকে তার দুই থাবার নীচে তার সব স্পর্ধা আর দম্ভ শুকনো পাতার মতো মুচমুচিয়ে গুঁড়িয়ে দেবে বুড়হা-বাঘা।

বুড়ো শিকারির তর্জনী ট্রিগার-গার্ডে। বুড়ো আঙুল, সেফটি ক্যাচে। বুড়হা-বাঘার বড়ই বাড় বেড়েছিল। মানুষকে সে তোয়াক্কাই করে না। বাঘ, সে যত বড়ই হোক, কখনও কি মানুষের সমান হতে পারে? রাইফেলের গুলিতে সেই গর্বিত বোকা বাঘটার বুক এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে আজ শিকারি। প্রমাণ করে দেবে অন্য মানুষদের কাছে যে, বেঁচে থাকা কাকে বলে তা বুড়ো-শিকারি জানত।

হঠাৎই নিঃশব্দ বনে আলো-ছায়া আর রঙের হোলি শুরু হয়ে গেল। লাল কালো হলুদ সবুজ পাটকিলে সাদা–সব রঙই নিঃশব্দে জীবনের পিছকিরির মুখে এসে মৃত্যুর দিকে দৌড়ে যেতে লাগল। সেই উৎসবের মধ্যে বুড়ো শিকারি পথের বাঁকে এসে পৌঁছতেই লাফ দিল বুড়ো-বাঘা। কোনাকুনি। বুড়ো শিকারির ডান কাঁধ আর গলার মাঝামাঝি কামড়ে ধরে এক ধাক্কায় তাকে নিয়ে নীচে পড়বে বলে।

বাঘটা লাফানোর সঙ্গে-সঙ্গেই বুড়ো শিকারিও চকিতে রাইফেলসমেত গোড়ালির উপর আধপাক ঘুরে গেল। একটাই গুলি করার সুযোগ পেল শুধু। গুলির আওয়াজ আর বুড়ো বাঘার গর্জন মিশে গেল। গুলিটা লাগল বাঘার গলার আর বুকের ঠিক মাঝামাঝি। দুটি ট্রিগার টানার সময় পেল না শিকারি। বুড়ো-শিকারিকে নিয়ে বুড়হা-বাঘা আছড়ে পড়ল নীচে ঝরাপাতা বিছোনো শীতের নরম হিমেল বনপথে জড়াজড়ি করে। ভয় পেয়ে কাঠঠোকরা উড়ে গেল রঙিন ঘুড়ির মতো। কাঠবিড়ালি দৌড়ে উঠল গাছের গুঁড়ি বেয়ে। ইতিউতি চাইল উপরে উঠে। সমস্ত জঙ্গল বাঘের ডাককে আর গুলির আওয়াজকে সমীহ জানিয়ে কলকাকলিতে সেলাম জানাল।

বুড়হা-বাঘার বুক ভেসে যেতে লাগল সাহসী বাঘের রহিস্ খানদানের রক্তে। বুড়ো-শিকারির বুক গলা ঘাড় ভেসে যেতে লাগল একজন মানুষের মতো মানুষের রক্তে। বুড়োর বুকে রক্তাক্ত দুটি থাবা রেখে, বেড়াল যেমন করে সাদা কবুতর ছিন্নভিন্ন করে, তেমন করে সাদা চুল সাদা দাড়ির বুড়োকে ছিঁড়তে লাগল বুড়হাবাঘা।

বড় ভাল লাগতে লাগল বুড়োর। এই রকমই কিছু ঘটবে যে, তা জানত মানুষটা। মৃত্যুরও তো ভালমন্দ থাকে।

রাইফেলটা বুড়োর হাত থেকে আলগা হয়ে এল। ভোরের সূর্যের আলো পড়েছিল চোখে, চোখ বন্ধ করে নিল। অনেক ঘুম জমেছিল। এখন নিজের রক্তের গন্ধের সঙ্গে নিজের দেশের মাটির গন্ধ, গাছের গন্ধ, ফুলের গন্ধ সব মিলেমিশে গেছে।

ছেলেটা…

ছেলেটা এমন সোনার দেশকে ফেলে, নিজের দেশকে ফেলে অন্য দেশে চলে গেল? একটু ভাল খাবে, ভাল পরবে, ভাল থাকবে বলে?…

ছিঃ ছিঃ…ছেলেটা…! তার ছেলে!

বুড়হা বাঘাটার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। রক্ত কুলকুচি করল সে। তারপর বুড়ো-শিকারির পাশে চিত হয়ে হঠাৎ শুয়ে পড়ল।

সূর্যটা ঠিক তার চোখেরই উপর একটা লাল বলের মতো ছোট থেকে বড় হতে হতে ক্রমশ আরও উজ্জ্বল হতে লাগল। পৃথিবীকে খেয়েই নেবে সূর্য আজ মনে হল। শীতের সূর্যকে বড় ভালবাসত বুড়হা বাঘা। কিন্তু জীবনে আজ এই প্রথম শীতের সূর্যকে তার ভাল লাগল না। সূর্য সবকিছুকে বে-আব্রু করে দেয়। মৃত্যুর মতো গোপন কিছুকেও।

ডান থাবার এক থাপ্পড়ে মাকাল ফলের মতো ফাজিল সূর্যটাকে ছিঁড়ে নামাবে বলে থাপ্পড় তুলল বুড়হা বাঘা। কিন্তু থাবা উঠল না। আরাম! আঃ কী আরাম!

বুড়ো-শিকারি তার ডান পাটা বুড়হা-বাঘাটার পেটের উপর তুলে দিল। ঘেন্নায় নয়, ভালবাসায়।

আঃ, কী আরাম!

বুড়হা-বাঘার শরীর থেকে তার তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয়গুলো এক এক করে ছুটি নিয়ে চলে যাচ্ছে। তার হালকা লাগতে লাগল খুব। বুড়হা বাঘা বলতে গেল গভীর আরামে গররররর…।

কিন্তু আওয়াজ বেরুল না।

সব প্রাণী আর মানুষই তাকে দূর থেকে দেখে ভয়ে ঘেন্নায় পালিয়ে গেছে চিরদিন। একটা মানুষ, তবু তার কাছে এসেছিল; তাকে চেয়েছিল। শেষের দিনে হলেও। ভাল, খুবই ভাল।

একটা কাঁচপোকা বুঁবুঁইইই.করে উড়ে এসে একবার মৃত বাঘটার মুখের কষে আরেকবার মৃত মানুষটার ঠোঁটের উপর বসল। উড়তে-বসতে লাগল। সামান্যক্ষণ। তারপরই বনে বনে খবর দিতে উড়ে গেল তার নীলচে পাখায় রোদ ছিটিয়ে…।

ঋজুদা এই অবধি বলে চুপ করে গেল। অনেকক্ষণ হল নিভে যাওয়া পাইপটা থেকে ছাই ঝেড়ে ফেলে নতুন করে আগুন জ্বালল। রুদ্র আর ভটকাই চুপ করে বসেছিল। রোদটা এখন জোর হয়েছে। হাওয়াও ছেড়েছে একটা। নানারঙা শুকনো পাতা উড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে জঙ্গলের পায়ের কাছে পাথর ও রুখ মাটির উপর সড়সড় আওয়াজ তুলে। একটা পাহাড়ী বাজ উড়ছে নীল আকাশে ঘুরে ঘুরে।

ঋজুদা পাইপটা ভরে লাইটার জ্বেলে আগুন জ্বালাল। তারপর একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল। বলল, আঃ। ভটকাই হঠাৎই বলল, আচ্ছা ঋজুদা, তোমার এই গল্পটির মরাল কী? এ তো জাস্ট একটা গল্পই নয়। কিছু নিশ্চয়ই বলতে চেয়েছ তুমি এই গল্পের মাধ্যমে।

কিছুমাত্র বলতে না চেয়েও গল্প বলা যায়। যা শুধু গল্প করার জন্যেই গল্প; অন্যভাবে বলতে গেলে কথার কথা। গাল-গল্পও হয়তো বা। তবে এই গল্পে কিছু বলতে চেয়েছি নিশ্চয়ই। তবে আমি তো আর লেখকটেখক নই, কী করে গল্প লিখতে হয় তা তো জানা নেই, তাই পেরেছি কিনা তা তোরাই বলতে পারবি। তোরাই বল? কী বলতে চেয়েছি?

একটু ভেবে ভটকাই বলল, বাঘের সঙ্গে লড়তে গেলে এইই নতিজা নিকলোয়।

ঋজুদা বলল, হিন্দী ছবি একটু কম দ্যাখ টিভিতে ভটকাই। নতিজা নিকলোয়। এ আবার কী রকম বাংলা?

না কেন? হালুয়া সহজেই নিকলোতে পারে আর নতিজা নিকলোতেই দোষ?

রুদ্র হেসে ফেলল ভটকাই-এর কথা শুনে। ঋজুদাও। ঋজুদা বলল, নাঃ। তুই একটি ইকরিজিবল। হিন্দী-নবীশ।

তারপর বলল, তুইই বল রুদ্র এবার, কী বলতে চেয়েছি এই অলেখকের গল্পে?

প্রত্যেক মানুষের মনের মধ্যে সে মানুষ সাধারণ অর্থে যতই সুখী হন না কেন, একধরনের অতৃপ্তি থাকেই। সেই অতৃপ্তিকে জয় করাই একজন সত্যিকারের মানুষের ধর্ম।

বাঃ, বেশ বলেছিস। হয়তো এও এই গল্পের সারমর্ম হতে পারত। কিন্তু আমি অন্যকিছু বলার চেষ্টা করেছি।

কী তা?

ভটকাই বলল।

বলতে চেয়েছি যে, একজন মানুষের মতো মানুষ অথবা একটি বাঘের মতো বাঘকে মেরে ফেলা যায়, ধ্বংস করা যায়; ছিঁড়ে টুকরো টুকরোও করে দেওয়াও যায় সহজেই কিন্তু হারানো যায় না তাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *