অন্য শিকার (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

বুড়হা-বাঘাটা তখনও সেই চ্যাটালো কালো পাথরের উপরেই বসে ছিল। এখন অন্ধকার হয়ে গেছে। সূর্য ডুবলে যে-তারাটা সবচেয়ে আগে ওঠে, সেটা জ্বলজ্বল করছে। আকাশে আরও কত তারা। বাঘেদের ভাষা নেই মানুষের মতো। বাঘেদের ভাবনাগুলি তাদের মৃত্যুর সঙ্গেই গলে পচে যায়। শকুনে শেয়ালে হায়নায় ছিঁড়ে খায়। মানুষ যা ভাবে, তা লিখে রেখে যেতে পারে। সেদিক দিয়ে মানুষরা খুবই ভাগ্যবান। বাঘেদের ভাষা নেই, সাহিত্য নেই; তাই কৃত্তিকা, রোহিণী শতভিষা, স্বাতী, কারওই নাম জানে না তারা। কিন্তু চেনে তাদের। অন্ধকার রাতে পথভোলা বাঘেরাও তারাদেরই দিকে চেয়ে পথ চিনে নেয়।

লেখাপড়া শেখেনি বুড়হা বাঘা। মনের ভাব প্রকাশ করে বাঘেরা, অঙ্গভঙ্গি করেই। চোখ দিয়ে। অথবা কয়েকটি মাত্র শব্দ করে। মানুষেরা অবশ্য বড় বেশিই কথা বলে। ভাষা আছে বলেই তা নষ্ট করা ঠিক নয়। এত কথা বলার প্রয়োজন বা কী ছিল? তাই-ই বোধ হয় খুব কমই সময় পায় ওরা ভাবনার। না ভাবলে, যে-কোনও প্রাণীই বোধহয় বুদ্ধিতে খাটো হয়ে যায়। মানুষও।

বাঘা ভাবে। বাঘেরা রাতে এবং অনেক সময় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস চুপ করেই থাকে। চোখ দিয়ে দেখে, কান দিয়ে শোনে। আর ভাবে। শুধু ভাবেই। বাঘের মতো নীরব জানোয়ার, কম কথা বলা জানোয়ার বনে-পাহাড়ে খুব কমই আছে। অথচ সে সবসময়ই সক্রিয়। সবসময়ই কিছু-না-কিছু করছে। একমাত্র ঘুমুবার সময়টা ছাড়া, এই চুপচাপ বাঘেরা।

চারধার অন্ধকার হয়ে গেছে। নীচের জঙ্গল থেকে একটানা ঝিঁঝির ডাক ভেসে আসছে। পাহাড়ের নীচেই, তার যাতায়াতের পথের পাশে একটা মস্ত শিমূলগাছ আছে। তার জন্মের পর থেকেই সে দেখে আসছে এই গাছটাকে। যদিও ছোটবেলায় বুড়হা-বাঘা এই গুহাতে থাকত না। থাকত, বাজার নদীর ওপারের অন্য একটি গুহাতে। সেই গুহাটিরই কাছে, বছর পনেরো আগে সাদা মানুষদের ছুলোয়া শিকারে তার মা আর তার বোন মারা পড়ে। একই সঙ্গে। এক শীতের সকালে। কড়াক্কড় করে বাজ পড়ার মতো শব্দ হয়েছিল কয়েকটা। নদীর একটা সোঁতার মধ্যে গা-ডুবিয়ে দূর থেকে বুড়হা-বাঘা দেখেছিল যে, যন্ত্রণায় কারাতে কারাতে তার মা স্থির হয়ে গেল। রক্তে লাল হয়ে গেল জায়গাটা। ঘন লাল রক্তে ভিজে গেল ঝোপঝাড়ের গাঢ় সবুজ।

অনেকই জানোয়ারের রক্ত খেয়েছে বুড়হা-বাঘা। আজ অবধি। শুধু বাঘেরই রক্ত খায়নি কখনও। যদি কাছাকাছি থাকত তখন, হয়তো খেয়ে দেখত ও। বোনটা নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারেনি। ঘাড়ে গুলি লেগেছিল তার। চিত হয়ে স্থির হয়ে শুয়ে ছিল দুপা উপরে তুলে একটা গিলিরি ফুলের ঝোপের পাশে।

দুঃখ হয়নি বাঘটার একটুও। ভয় হয়েছিল। ভয়ের মুখে, দুঃখ-টুঃখ সব ঝড়ের মুখে ঝরাপাতার মতোই উড়ে যায়। বিলাসী মানুষের মতো দুঃখ-দুঃখ নেইও বাঘেদের। ভয় আছে। রাগ আছে। আর আনন্দও আছে। খিদে-তৃষ্ণা আছে সব রকমেরই। মান-অভিমান, আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ, উচ্চাশা, হতাশা, ঈর্ষা, এসব ফালতু ব্যাপার। দুপেয়ে মানুষদেরই ব্যাপার। বাঘেদের কিছুমাত্রই নেই ওসব বাড়তি বোধ।

বড় নির্ঝঞ্ঝাট জীবন ওদের।

সেই দুর্ঘটনার পরেই, একা, জোয়ান, প্রকাণ্ড বাঘটা পালিয়ে চলে এসেছিল এই গুহাতে। এই গুহাতেই বুড়ো হল জোয়ান। সব জোয়ানই বুড়ো হয় একদিন। এই গুহাটা সত্যিই খুব দুর্গম। মাত্র একদিক দিয়েই পৌঁছনো যায় এখানে। অন্য তিন দিকেই দুর্ভেদ্য ন্যাড়া পাহাড়। যেদিক দিয়ে আসা যায়, সেদিক দিয়েও কোনও শিকারি উঠে আসার অনেক আগে তার শব্দ পাওয়া যাবে। কোনও শিকারিই অবশ্য আজ অবধি আসেনি এখানে। এলে, সে বুড়ো বাঘার এগারো নম্বর হত। গত বছর, গরমের এক রাতে অন্য এলাকার একটা বাঘ এসেছিল। সমস্ত রাত এবং পরের দিন সকাল দশটা অবধি দুজনের লড়াই চলেছিল। লড়াই করতে করতে পাহাড়ে গড়িয়ে গেছিল তারা। গাছপালা, ঘাস-পাথর সব নড়ে গেছিল। দেওতা, ঘামসেনবাওয়ার ঘুম ভেঙে গেছিল। লড়াই শেষ হলে, বুড়হা বাঘা মরা বাঘটাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গার একটা খাঁজ থেকে নীচের উপত্যকায়। যেখানে, সাদা-দাড়ি শিকারি তার সাদা তাঁবুর সামনে কালো রাতে বসে আছে এখন; সাদা নদীর পাশে। বুড়ো-বাঘার খুব ভাল লেগেছিল।

বাঘেরা নামেই বুড়ো হয়; আসলে নয়। সত্যি-সত্যি বুড়ো হাওয়ার আগেই মরে যায় তারা। বুড়োদের জায়গা নেই জঙ্গলে। তা ছাড়া দুটো বড় বাঘ কখনওই এক এলাকাতে থাকতে পারে না। বাঘেরা মানুষের মতো সামাজিক নয়। দুর্বল এবং প্রত্যাশী যারা, তাদেরই দরকার সমাজকে। বড় বাঘ সমাজের তোয়াক্কা করে না, ভীরু চিতল হরিণী বা ভিখিরি, পরনির্ভর, ইতর, স্বার্থান্বেষী মানুষের মতো।

এই বুড়ো শিকারির সঙ্গে বুড়হা-বাঘার ফয়সালা আছে। মানুষের মতো দুপেয়ে জানোয়ারের এত দম্ভ সহ্য করা যায় না। কারও দম্ভই সহ্য করেনি বুড়হা বাঘা।

গত আটদিন ধরেই বাঘটা লক্ষ করছে যে, বুড়ো-শিকারি তাকে ছায়ারই মতো অনুসরণ করছে। গতকাল গুহা-ফিরতি পথে সে শিকারির নরম জুতোর ছাপ দেখেছিল তারই পায়ের দাগের উপর। অনেকদূর অবধি সেই কারণেই শিকারিকে ছুপকি দেওয়ার জন্যে সে ইচ্ছে করেই বানজারের জলে নেমে গেছিল। যেন, পায়ের ভাঞ্জ দেখে শিকারির মনে হয়, নদী পেরিয়ে ওপারেই চলে গেছে বুড়হা বাঘা। তারপর নদীর জলের মধ্যে দিয়ে, তার বুক-অবধি ভিজিয়ে, হি-হি শীতের রাতে আধ মাইলটাক উল্টোদিকে গিয়ে অনেক চোরাপথে চড়াই ভেঙে ফিরে এসেছিল নিজের গুহার দিকে। গুহার হদিস যদি এই বুড়ো শিকারি জেনে যায়, তাহলে বুড়হাবাঘার বিপদ আছে।

একথা না-বোঝার মতো বোকা সে নয়।

দশ-দশটা শিকারি মানুষকে টুঁটি কামড়ে মেরেছে বুড়হাবাঘা। রাগেই। যদিও খায়নি কাউকেই। মানুষের অমন নরম প্যাতপেতে নোনতা মাংস খাওয়া না-খাওয়া সমান। আধঘন্টা পরই হয়তো খিদে পেয়ে যাবে। যা তার খাদ্য নয়, তা সে খেতেই বা যাবে কেন? বাঘেদের দেওতা ঘামসেনবাওয়া, বাঘেরা কী খাবে আর খাবে না তা ঠিক করে দিয়েছেন।

বুড়হাবাঘার মন ভাল নেই।

ওই সাদা-দাড়ি শিকারি যে কী চায়! কেন যে সে তার পিছু নিয়েছে এমন নাছোড়বান্দার মতো, তা কিছুতেই বুড়হা বাঘা বুঝে উঠতে পারছে না।

সে অনেকবারই মানুষের হাতে গুলি খেয়ে মরতে মরতে বেঁচে গেছে। মা, বোন এবং তার দুবউকেও সে তার গায়ের পাশে একেবারে দাঁড়ানো অবস্থাতেই গুলি খেয়ে মরতে দেখেছে। তাদের রক্তের রঙ এখনও চোখ থেকে মোছেনি বুড়হা-বাঘার। কুটিল ভীরু মানুষের হাতে সরল সাহসী বাঘেদের মৃত্যু বুড়হাবাঘার কাছে নতুন কিছু নয়। অবশ্য বদলা হিসেবে, তিনজন শিকারি মানুষকেও সে তার দিকে গুলি ছোঁড়ার পরেই মাচা থেকে নামিয়ে ফেলে, শেয়াল যেমন করে বর্ষাকালের পাড়হেন মাছের মাথা চিবোয় তেমনি করে চিবিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। আরও পাঁচজনকে মেরেছে ছুলোয়া শিকারের সময় মাটিতেই। তাকে মারতে এসে তারা ফওত হয়েছে। আরও দুজন ঘোড়ায় চড়ে মারতে এসেছিল তাকে। তাদেরও। ভয় পেয়ে সওয়ারহীন ঘোড়া চিহাহ্-চিহাহ করতে করতে ছুটে গেছে মুখে আতঙ্কের ফেনা তুলে।

তারপর থেকে মানুষকে সে এড়িয়েই চলে। মানুষের গোরু-মোষ-ঘোড়া কিছুই সে ধরে না আর। টোপ দিলেও না। ছাগল, কুকুর, এসব তো বড় বাঘের খাদ্যই নয়। ফিচেল্ চিতা-ফিতারা, শেয়াল-হায়েনারা, এসব ফিচলেমি করে। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন জানোয়ারের মধ্যে বুড়হা বাঘা খেতে ভালবাসত একমাত্র দিশি ঘোড়া আর গাধা। কিন্তু সেই সুস্বাদু, দিশি ঘোড়া-গাধার স্বাদও ইচ্ছে করেই ভুলে গেছে ওই ঝঞ্ঝাটিয়া মানুষদের এড়াবার জন্যে। কিন্তু তবুও এই সাদা-দাড়ি শিকারি কেন যে লেগেছে তার পিছনে! বুড়হা-বাঘা তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না; তার সব বুদ্ধি সামনের পায়ের দুথাবাতে জড়ো করেও।

আজ রাতে তাঁবুর মধ্যে সামনের আগুন একটু নিভু নিভু হলেই বুড়হা বাঘা গুহা থেকে নেমে প্রথমে ওইদিকেই যাবে। কাল রাতে একটা বারাশিঙা মেরে আধখানা খেয়ে এসেছিল। সেইদিকেও যাবে। খুবই সাবধানে। যদি বারাশিঙার মড়িটা সাদা দাড়ির দলের কেউ দেখে ফেলে থাকে, তাহলে তারা বুড়হাবাঘার জন্যে সেখানে ওৎ পেতে থাকতে পারে। তাই সরেজমিনে তদন্ত করতে আগে তাঁবুতে যাবে, তারপর খাওয়ার চিন্তা। আড়াল থেকে বুড়ো শিকারিকে দেখবে বুড়হা বাঘা ভাল করে। অনেকক্ষণ ধরে। তবে, তাকে মারবে না চোরের মতো চুরি করে। শিকারি-মানুষকে মারতে হলে, সে নিজে শিকারি বলেই সামনাসামনি মারবে এবং যদি সে ক্ষতি করে কোনও, তবেই। বাঘে আর মানুষে তফাত আছে। বুড়ো-বাঘা, ল্যাংড়া খোঁড়া আদৌ নয়, অথবা শজারুর কাঁটার ঘায়ে ঘেয়ো বা মানুষের গুলি-খেয়ে কঁকিয়ে-বেড়ানো লোম-ওঠা কোনও মানুষখেকো বাঘও সে নয়। বাঘেদের কুলাঙ্গার নয় সে। বড় বাঘা বরং বাঘেদের গর্বই! সব বাঘেরই ঠাকুর্দা সে। কারও কাছেই মাথা সে নোয়ায়নি। নোয়াবেও না কখনওই। না অন্য বাঘের কাছে, না অন্য কোনও জানোয়ারের কাছে; বুড়হাদেব আর ঘামসেনবাওয়ার ধরতিতে সবচেয়ে ধূর্ত, নিকৃষ্ট, কিন্তু সবচেয়ে ক্ষমতাশালী জানোয়ার যে মানুষ, তার কাছেও মাথা সে নোয়ায়নি কখনও। মাথা নোয়াতে শেখায়নি বাঘের রক্ত। যে বাঘ মাথা নুইয়ে বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকার জন্যে মাথা নোয়ায়, সে বাঘই নয়, বাঘের মতো চেহারার অন্য কোনও নিকৃষ্ট জানোয়ার।

অথচ ওই সাদা-দাড়ি বুড়ো শিকারিও তো মানুষ। যারা চাকরির জন্যে, দুমুঠো খেতে পাওয়ার জন্যে, নাম কেনার জন্যে, প্রাইজ পাওয়ার জন্যে, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি তাদের মাথা এর পায়ে তার পায়ে নুইয়েই বাঁচে, সেই সব ধূর্ত বাঁদরের বংশধরেরা, ঋজু, বুড়হা বাঘার চরিত্রর কতটুকু জানে? এক কণাও জানে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *