অন্য শিকার (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
বুড়ো শিকারি দু নাক ভরে টেনে শীতের সকালের বনের স্নিগ্ধ সুগন্ধি হিমেল নিশ্বাস নিল। তারপর বুনো গোলাপের উপর জমে-থাকা শবনমকে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে নাড়িয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো রামধনু করে উড়িয়ে দিল, চারিয়ে দিল সবুজের আর লালের এই দেশে। তারপর আবার পাহাড় চড়তে লাগল।
পেছন-পেছন তুরু। কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা মন্ত্রমুগ্ধ, কিছুটা ক্লান্ত আর সব থেকে বেশি অবাক হয়ে। এই বুড়ো এবারে একটা খতরা বানাবেই বানাবে। তার জন্য তার নিজেরই কোনও বিপদ ঘটে যাবে। মা তাকে মানা করেছিল এত করে। বাবার বন্ধু এই বাপ্পা। এতদিনের সঙ্গী বাবার। মরে যাওয়া সোজা। খুব সোজা। মরতে ভয় পায় না তুরু। ভয় যদি কর্তব্য না করতে পারে! কর্তব্যবিমুখ মানুষে আর মরা মানুষে তফাত কী? তুরু তাইই বোঝে। তার বাবা তাকে তাইই শিখিয়ে গেছিল। এই বুড়োর কাছে, বাপ্পার কাছে তাদের পরিবার নানাভাবে ঋণী। অনেক নুন খেয়েছে। শুধু নুনই নয়, খেয়েছে ভালবাসা দু আঁজলা ভরে। বুড়ো যতদিন আছে, ততদিন শোধ দিতে পারুক আর না-ই পারুক, স্বীকার তো করবে! তা নইলে মানুষ কী! তুরুর মা বলেন, দুটি হাত, দুটি পা, দুটি চোখ আর একটি মুখ থাকলেই মানুষ মানুষ হয় না। তুরু মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে চায়, যতদিনই বেঁচে থাকুক না কেন। এই মানুষ হতে গিয়ে বাঁচা যদি না-ই হয়, তবে নাই-ই বা হল!
তুরু টুপিটা রেখে গেল টেবিলে। রাইফেল, গুলি, পাইপের তামাকের, টিন। সবই যেমন তেমন পড়ে রইল।
বাপ্পা যেন মনে মনে অন্য কোথাও চলে গেছে।
দূর ছাই!
মনে-মনে বলল তুরু।
এই পাহাড়টাও মস্ত। পাহাড়ে অনেক গুহা। গুহা আর রক-শেলটার। তার মধ্যে হাজার-হাজার বছর আগে প্রাগৈতিহাসিক সব মানুষ বাস করত। লাল আর হলুদ রঙে তারা নানারকম ছবি এঁকে গেছিল সেই সব গুহার গায়ে গায়ে। বাইসন, শম্বর, আর বুনো বুড়ো দাঁতাল শুয়োরদের শিকারের ছবি। পাথরের অস্ত্র দিয়ে শিকার করত তখন। আগুন আবিষ্কার হয়নি। সে সব অনেক হাজার বছর আগের কথা।
যে-গুহাতে বুড়হা-বাঘার বাস, তার সামনেই মস্ত একটা কালো পাথরের চ্যাটালো চাতাল। আদিবাসী গোঁন্দ ছেলের বুকের মতো। তার উপরে দুটি থাবা মেলে বসে ছিল বুড়ো বাঘটা।
মাঘী সন্ধ্যার নরম পাটকিলেরঙা রোদ পাহাড়ের গায়ের আর নীচের ঘন জঙ্গলের গায়ে শেষবারের মতো হাত রেখেছিল। একটু পরেই সূর্য পশ্চিমের পাহাড়টার আড়ালে চলে যাবে। শূন্যে তাদের আত্মা পাদুটি দুলিয়ে দুলিয়ে ডুবন্ত সূর্যকে ধাওয়া করে দিগন্তবেলার সূর্যের ধতি-মায়ের কপালের মস্ত এক টিপেরই মতো লাল গোলকের মধ্যে ঢুকে যাবে একদল টি-টি পাখি। কাঁপতে কাঁপতে, ডাকতে ডাকতে হট্টিটি-হুট-টি-ট্টি-টি-হুঁট।
ঔৎসুক্যের প্রতীক যেন এই পাখিগুলো!
যে-পাহাড়ে বুড়ো বাঘা বসে ছিল, সেই পাহাড়ের নীচের উপত্যকায়, একুট দূরে মেমসাহেবর মতো ফর্সা, নরম, চলকে-চলা সুন্দরী বানজার নদী। এঁকেবেঁকে চলে গেছে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বিন্ধ্য, সাতপুরা আর মাইকাল পর্বতশ্রেণীর মিলনস্থানের খোঁজে।
নদীর পাশে, উঁচু ডাঙায় ছির ঘাসের খোলা সুগন্ধি প্রান্তরে একটা সাদা তাঁবু। তাঁবুর সামনে ত্রিপলের ফোল্ডিং টেবলের কছে চেয়ার পেতে বসে আছে সেই বুড়ো-শিকারি। সাদা হয়ে গেছে তার চুল-দাড়ি। অথচ ছিপছিপে, মজবুত তার শরীরের গড়ন। বুড়ো বাঘারই মতো। রোদে জলে চাঁদে পুড়ে শিকারির গায়ের রঙ তামাটে হয়ে গেছে। মুখে একটা পাইপ। সামনে কলাই-করা মগে কফি। শিকারির কাছেই, বাঁ-দিকে আসন্ন হি-হি শীতের রাতের জন্যে তৈরি হচ্ছে তুরু, একটি হা-হা-হাসি অল্পবয়সী গোঁন্দ ছেলে। বুড়ো শিকারির একমাত্র অনুচর সে। আগুন করার বন্দোবস্ত করছে কাঠকুটো এনে। একটা জংলি আমগাছের মস্ত বড় গুঁড়ি ফেলে রাখা আছে সেখানে। গুঁড়িটার আধখানা পুড়ে গেছে গত কদিনের রাতের ধিকিধিকি আঁচে।
নদীর দিকে উদাস চোখে চেয়ে ছিল বুড়ো শিকারি। কনে হাওয়ায় তার দাড়ি নড়ছে এপাশ ওপাশ। মানুষটার চেহারা দেখলে বোঝা যায় না যে, সে শিকারি। কবি বা গাইয়ের মতো হাবভাব তার। তার দু চোখভরা ভালবাসা। পাখির জন্যে, নদীর জন্যে। এমনকী, মনে হয়, বাঘের জন্যেও।
বুড়ো বাঘটা তার গুহার, ঠিক নীচের চাতালের সামনে বসে বুড়ো শিকারিকে দেখছিল। শিকারি জানে না যে, বাঘ তাকে বাজপাখির মতো পাহাড়ের উপর থেকে দেখছে। চাতালে বসে বাঘটা নীচের ঘন জঙ্গল আর নদীতে ঘেরা অনেকখানি এলাকাই দেখতে পায়। দেখতে পায়, কোথায় শম্বর বা বারাশিঙার দল চরছে ছির ঘাসের লালচে ফুলে-ভরা বনে। কোথায় বাইসনের বাচ্চা মায়ের দুধ খাচ্ছে লাফিয়ে লাফিয়ে; মাকে বিরক্ত করে। দেখছে, বানজার নদীর কোন্ জায়গা দিয়ে চিতল হরিণের ঝাঁক বা বুড়ো শুয়োরের দল তাদের চঞ্চল খুরে-খুরে বানজার নদীর রুপোলি জল ছিটিয়ে বনে ঢুকল। কোথায় একলা দলছুট বারাশিঙার বাচ্চা ভীরু পায়ে ইতিউতি ঘুরছে।
অনেকদিনই শজারু খায় না বুড়ো বাঘটা। আর বাঁদরও। বাঁদরদের উপর খুব রাগ তার। মানুষেরা নাকি সব বাঁদরেরই বাচ্চা। শুনেছিল, এক বাঘিনীর, কাছে। মুখ বদলাবার জন্যে আজ সে ভাবছে যে, পাহাড়ের নীচের মস্ত ঝাঁকড়া পিপ্পলগাছটার উপরে যে বাঁদরের দলের বাসা, সেখানে গিয়ে উপরে তাকিয়ে কয়েকবার হালুম-হুলুম করবে। ঘন বনের মধ্যে বড় বাঘের হালুম-হালুম ডাক শুনে মানুষেরই নাড়ি ছেড়ে যায়, তা তুচ্ছ মর্কটের কথা! ভয়ের চোটে হাত-পায়ের মুঠি শিথিল হয়ে যাবে বিস্তর বাঁদরের বুড়হা বাঘার ডাক শুনেই। চি চি-চ্যা চ্যাঁ-খ্যাঁক্-খরর-খরর-খরর-খক্ করবে ঝাঁপাঝাঁপি করতে করতে বাঁদরগুলো দু-চারটে, পাকা আমেরই মতো, ডাল-ফসকে ঝরে পড়বে নীচে। তখন বুড়ো বাঘা ক্যাঁক করে গলা টিপে ধরবে একটার। তারপর বনের গভীর শিশিরভেজা অন্ধকারে টেনে নিয়ে গিয়ে ভোজ লাগাবে।
তুরু! বুড়ো শিকারি ডাকল।
বাপ্পা। উত্তর দিল তুরু, আগুন জ্বালতে জ্বালতে, জড়োকরা শুকনো পাতায়।
কাল কিন্তু খুব ভোরে বেরোব আমি।
কোনদিকে?
যেদিকে বুড়হা বাঘার পায়ের ভাঞ্জ মিলিয়ে যেতে দেখলাম আজ। তার আস্তানাটা যে কোথায়, তা না জানলে যে হচ্ছে না। বড়ই সেয়ানা বাঘটা। বোদে বাঁধলাম, ছাগল বাঁধলাম, তাদের ছুঁল না পর্যন্ত!
হঁ! তুমি তো জানোই যে, অনেক শিকারিই ওকে মারার চেষ্টা করেছে আগে। কত সাহেব-সুবো। মুক্কির সাজানা সাহেব। ঠুঠা বাইগা। দেবী সিং। জাত শিকারি সব। হুঁশিয়ার হয়ে গেছে বাঘটা। মাচা থেকে অনেক বারই গুলি চলেছে ওর উপর। চালাক হয়ে গেছে খুব। হুঁশিয়ার! তুমিও।
হুঁ! কফির কাপে চুমুক দিয়ে, শিকারি বুড়ো বলল। মানুষের কাছাকাছি এলে সকলেই ধূর্ত হয়ে যায়। মানুষের মতো ধূর্ত জানোয়ার যে আর নেই। বুঝলি তুরু।
তা ঠিক। কিন্তু কী হবে? বাপ্পা?
কী, কী হবে?
এই বুড়হাবাঘাকে মেরে তোমার কী হবে? বাঘ তো সারাজীবনে অনেকই মারলে। তোমার সাহসের কথা রাইপুরে, বিলাসপুরে, জবলপুরে, এমনকী ভোপালেও কে না জানে? আমার বাবার সঙ্গেই তো কত শিকার করলে তুমি। শখ কি মেটেনি এখনও? কী চাও তুমি বাপ্পা?
বুড়ো চুপ করে রইল।
কী চাও? আরও নাম? খবরের কাগজের পাতায় ছবি ছাপতে তোমার?
তুরু শুধোল আবার।
বুড়ো হাসল। বলল, নাম কোনও ব্যাপারই নয় রে তুরু। যারা নামের বা যশের যোগ্যই নয়, তারাই চিরদিন নাম-যশের পেছনে মানসম্মান চুলোয় দিয়ে দৌড়োয়।
তবে? কিসের ব্যাপার এটা? তোমরা এত শিকার করলে বলেই তো শুনতে পাচ্ছি বাঘ শিকার করা একেবারেই বন্ধ করে দেবে মধ্যপ্রদেশ সরকার। এই বুড়ো বাঘ তো আমার বাবাকে খায়নি! তোমারও তো ক্ষতি করেনি কোনও। অন্য একটা বাঘ আর বাঘিনী তো সুফকর আর মুক্কির কাছে আমাদের টোপ-দেওয়া দুদুটো গাবদা-গোবদা বোদে মেরে এবং খেয়ে সাবড়ে দিল। না তুমি নিজে বসলে মাচায়, না আমাকে বসতে দিলে। গত দশদিনে দু-দুটো বাঘ হুম্মচকে পটকে দেওয়া যেত। পারমিটে সময় তো আছে আর মাত্র পাঁচদিন। একমাত্র ওই বুড়ো বাঘাকেই তোমার মারতে হবে, এমন জেদ ধরেছ যে কেন তুমি, তা তুমিই জানো। একটা ভাল বারাশিঙা মারলে না, শম্বরও মারলে না একটাও; মুক্কি আর সুফকর বস্তির লোকেরা কত মাংস খেতে পারত। তোমাকে সত্যিই বুঝি না আমি বাপ্পা। আমার নিজের বাবা মরে গিয়ে বড়ই বিপদে ফেলে গেল আমাকে। তোমাকে বোঝা ভারী মুশকিল।
সব কথা সবার বোঝার নয় রে তুরু। সব কথা বোঝার চেষ্টাও করিস না কখনও, জীবনে সুখী যদি হতে চাস।
তুরু চুপ করে রইল। উত্তর দিল না।
এবার আগুনটা জোর হলে খিচুড়ি চাপা। কী আছে আর? বুড়ো শিকারি বলল।
কী আর থাকবে? শিকারই করলে না কিছু। আমি পয়েন্ট টু টু রাইফেল দিয়ে একটা খরগোশ মেরেছিলাম। সেটাকে ছাড়িয়ে ঝলসে নেব। পাথুরে নুন আর লঙ্কা আছে।
আমি খাব না। তুই-ই খাস্।
কেন? খাবে না কেন?
মাটি-মাটি গন্ধ লাগে আমার। খরগোশের গায়ে মাটি-মাটি গন্ধ।
পৃথিবীর সব কিছুতেই তো মাটি-মাটি গন্ধ। পৃথিবী যে ধরতি-মা।
তা জানি। কিন্তু মাটির গন্ধ ভাল লাগে না আমার।
তো খাবে কী?
কেন? খিচুড়ি!
শুধু-শুধু?
শুধু-শুধুই। বুড়োদের বেশি খেতে নেই। আমি কি তোর মতো জোয়ান? আমি যে তোর বাবার চেয়েও অনেক বড় রে বয়সে। আমি যে বুড়ো থুথথুরে।
এতই বুড়ো তো এই বুড়ো বাঘাকে মারা জন্যে দাঁতে দাঁত দিয়ে পড়ে থাকার দরকার কী তোমার? ফিরে যাও না রায়পুরে।
যাব। বুড়ো বলল।
তোমাকে বুঝি না একটুও।
কেই বা কাকে বোঝে? নিজেকেও কি তুই বুঝিস? ভাবিস যে, বুঝিস! তুই বুঝিস না তোকে। আমিও বুঝি না আমাকে।
জানি না, তোমার এই একগুঁয়েমি, এই জেদ, ভাল লাগে না আমার।
যার জেদ নেই, সে কি মানুষ?
খারাপ জেদ খারাপ। ভাল জেদ ভাল। আমার মা বলে। মা তো তোমাকেও বলল সেদিন।
কী?
বলল না? এই বাঘটার হাতে দশজন শিকারি মারা গেছে গত পনেরো বছরে। এই বুড়ো বয়সে একে মারার জেদ ভাল নয়। বলেনি? কী দরকার? সুখে থাকতে ভূতে কিলানোর? এ-বাঘকে মারতে পারে এমন শিকারিই নেই। সারা দেশের কথা আমি জানি না। ভারতবর্ষ তো মস্ত দেশ। মুখ্যু আমি। অন্তত মধ্যপ্রদেশে নেই। মাঝখান দিয়ে তোমারই প্রাণটা যাবে।
বুড়ো শিকারি তুরুর কথার উত্তর দিল না কোনও।
বলল, তাঁবুর ভিতর থেকে আমার রাইফেল, গুলি, মাথার টুপিটা আর পাইপের তামাক নিয়ে আয় তো তুরু। আর কফিটা খেয়ে নে। পটে অনেক কফি আছে। বিস্কিট আছে প্যাকেটে। খাবি-দাবি ভাল করে তো এখন তোরাই। ছেলেমানুষ যারা।
কফি-টফি বেশি খাই না আমি, তুরু বলল। বাথানে গিয়ে বিকেলে আমি মোষের দুধ খেয়ে এসেছি। বাথানের আহিররা বলল যে, একটা ছুকরি বাঘিনী আর তার দুটো বড়-হয়ে-যাওয়া বাচ্চা তাদের বাথানে কাল রাতে নাকি খুবই হামলা করেছে। ওই বাঘিনী আর বাচ্চাদুটোকে মারতে বলেছে অনেক করে। তোমার কাছে কাল ভোরে অনেক ভেট-টেট নিয়ে আসবে ওরা। দুধ, ঘি, মাখন, সর, মুরগি।
ওরা এলে ওদের ফিরিয়ে দিস।
কেন? পারমিটে তো দুটো বাঘ আছেই তোমার। দাওই না মেরে। তুমি না মারো, অন্তত আমাকে ইজাজত দাও; কাল রাতেই সাবড়ে দিচ্ছি। বাথানের বাইরে একটা বোদে বেঁধে দিলেই হল। দেখতে হবে না আর। আসবে, আর সঙ্গে-সঙ্গে কড়কে দেব। আমার বাপ কী করে সোজা করে গুলি করতে হয় তা তো শিখিয়ে গেছে। আর কিছু শেখাক আর না-ই শেখাক। শুধু তোমার দোনলা বন্দুকটা ধার দিও আমাকে একরাতের জন্যে। আমার একনলাটা নিয়ে বড় বাঘের মোকাবিলা করার সাহস হয় না।
না।
গম্ভীর গলায় সাদা-দাড়ি বুড়ো শিকারি বলল।
বাপ্পা! কেন না? না কেন?
না বলেছি, না। বড় বেশি কথা বলিস তুই তুরু। এবারে চুপ কর। রান্না হয়ে গেলে থালা করে দুহাতা খিচুড়ি এনে দিবি আমাকে। ব্যস্। খেয়েই শুয়ে পড়ব। কাল ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে যাব। তোর যেতে হবে না আমার সঙ্গে। আহিররা তোর জন্যে ভেট-টেট নিয়ে আসবে বলছিলি। তুই ওসব নিয়ে নিস। পরে দেখা যাবে। যদি বেঁচে থাকি তো দেব তোকে মারতে।
তুমি একাই যাবে? পায়ে হেঁটে? একা! অত বড় বাঘ! এ যে বুড়ো বাঘা?
তা কী করা যাবে? যে বাঘ মড়ি করে না, মাচা থেকে যাকে কায়দা করার কোনওই উপায় নেই, যে হাঁকোয়া কালে হাঁকাওয়ালাদেরই মেরে দিয়ে লাইন ক্রস্ করে বেরিয়ে যায়, তাকে হেঁটে ছাড়া আর কীভাবে মারা যেতে পারে?
না। একা যাবে না বাপ্পা।
ঠিক করেছি, কাল থেকে একাই যাব। সময় ফুরিয়ে আসছে। আজ রাত পোয়ালে, থাকবে মোট পাঁচটা দিন। সময় বড় তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি আর কিছুই ফুরোয় না।
এই পাঁচদিন শেষ হলেও তোমার জীবনে আরও অনেক সময় বাকি থাকবে বাপ্পা।
যে-সময় নিয়ে কিছুই করার নেই, থাকে না, তা থাকা না-থাকা সমান। সে সময় নয়; সময়ের বোঝা।
কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে গেলে ক্ষতিই বা কী? আমি কি আনাড়ি? আমি ভিতু কি? কোনও বিপদ হলে, একটা বেশি বন্দুক থাকলে তো ভালই। কী? ভাল না?
কিছু-কিছু ফয়সালা থাকে তুরু, কী বলব; তোর জীবনেও হয়তো সেসব ফয়সালার দিন আসবে; প্রত্যেক মানুষের জীবনেই আসে, একবার নয়, অনেকবারই; যখন সেই সময় আসে, তখন একা-একাই তার মোকাবিলা করতে হয়। তখন সঙ্গে যদি একদল লোকও থাকে, তবুও তাকে একাই। সে একাই। আসলে, আমরা সকলেই একা। জানলি! ভীষণই একা। যা-কিছুর মানে আছে, মানে থাকে একজন মানুষের জীবনে, সেই সবকিছুই তাকে একা-একাই করতে হয়।
বুঝি না তোমার এসব বড় বড় কথা বাপ্পা।
বলেছি তো। সব কথা তোর বোঝার জন্যে নয়।
বুড়ো শিকারির চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
বুড়ো বলল, এ নিয়ে আমি আর কোনও আলোচনা তোর সঙ্গে করতে চাই তুরু। যা আমি বলব, তাইই হবে। এমন বন্দোবস্তেই আমি চিরদিন অভ্যস্ত।
তাই হোক। আমার কী? তবে, তোমার হরকত দেখে মনে হচ্ছে, এই বানজারের বালিতেই তোমার চিতা সাজিয়ে তোমায় জ্বালিয়ে দিয়ে আমার ফিরতে হবে সীওনীতে। লোকে বলবে, কী বাহাদুর তুরু! ধনুয়া শিকারির ব্যাটা তুরু এমনই শিকারি যে, বাপ্পাকেও মারিয়ে ছাড়ল বুড়হা বাঘাটার হাতে!
তারপরই রীতিমত রেগে তুরু বলল, তুমি কি জানো না যে, বুড়হাবাঘাকে কেউই মারতে পারেনি? পারবেও না। শুনে নাও তুমি। আমার এই-ই শেষ কথা বাপ্পা; তুমিও না। মরবে তুমি। তারপর যা খুশি তোমার তাই-ই কোরো।
আগুনটা জোর হয়েছিল ততক্ষণে। বুড়ো শিকারির চোখদুটি চকচক করছিল। দু চোখ তুলে সে আগুনের লাল হলুদ সবুজ নীল উজ্জ্বল সাদা রঙা লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠা শিখাগুলির দিকে চেয়ে রইল। বুড়ো শিকারির মুখটা স্থির। চোখের দৃষ্টি আগুনের সঙ্গে মিশে গেল।
আগুন এক দারুণ সাপুড়ে। কত রঙ্গ আর কত মাপেরই অসংখ্য সাপ যে আছে তার ঝুলিতে! যার দেখার চোখ আছে, সেই-ই দেখতে পায়।
ভাবছিল তুরু। চুপ করে আগুনের দিকে চেয়ে।
একটা হলুদ কাঠের টুকরো দিয়ে বাড়ি মারল তুরু ধিকিধিকি-জ্বলা জংলি আমের গুঁড়িতে। সঙ্গে সঙ্গে তুবড়ি জ্বলে উঠল চিড়বিড় শব্দ করে। বুড়োর স্বপ্ন ছিটকে গেল। কাঠের মধ্যেও কত লোহাচুর থাকে! ভাবল তুরু। নইলে এমন তুবড়ি ওঠে কী করে!
বুড়ো শিকারি তবু তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে আগুনের দিকে।
তুরু মনে মনে বলল, দেখে নাও। এই আগুনেই ছাই হয়ে যাবে তুমি। ছাই হবে, তোমার ওই জেদে। শিকার তো বড়লোকদের একটা খেলাই। কত শিকারিই সে দেখল তার বাবার আমল থেকে। খাওয়া-দাওয়া, গান বাজনা, মজা, দল বেঁধে শিকার। হরিণ, শম্বর, পাখি; সবরকমের। বাঘ যদি মারা যায় কোনওরকম ঝুঁকিই না নিয়ে, তবেই বাঘ। নইলে ওই সবেই তারা সন্তুষ্ট। কিন্তু বুড়ো শিকারির এ আবার কী রকম শিকার! এ যে দেখছি কার্মা-নাচা মেয়েদেরই মতো গোঁ। জেদের শেষ কথা। গাঙ্গারিয়া বা গান্ধালা ফুল খোঁপায় গুঁজব না; আমাদের পলাশ ফুলই চাই। চাই। চাই। চাইই।
বুড়ো নিথর হয়ে বসে ছিল আগুনের দিকে চেয়ে।
