নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো (কর্নেল সমগ্র) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
চিচিং ফাঁক এবং বীরু
রাত সাড়ে নটা বাজে। আমি বাড়ি ফেরার জন্য উঠব ভাবছি, কর্নেল বললেন, এবার সাট্টাডন হাজারিলালকে নাড়া দিয়ে দেখা যাক কিছু বেরোয় নাকি।
বলে টেলিফোনের রিসিভার তুলে তিনি ডায়াল করলেন। একটু পরে সাড়া পেয়ে বললেন, নমস্তে হাজারিলালজি! আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।…আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। …আপনার এই প্রাইভেট নাম্বার আমি কুমারবাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরীর কাছে পেয়েছি। …না, না! আমি রিয়েল এস্টেট বিজনেস করি। তো শুনলাম আপনি কুমারবাহাদুরকে ছ-লাখ টাকায়…তাহলে ভুল শুনেছি। ন লাখই হবে। …না। আপনি শুনুন! দুর্গাপ্রসাদ সিংহের কাছে শুনেছি, মোহনপুর প্যালেস তার কাছে নাকি বন্ধক দেওয়া। আছে…নেই? আপনি ঠিক জানেন?…। বুঝেছি। তো আজ বীরেশ্বর সেন নামে এক ভদ্রলোক…না। বীরেশ্বরবাবু শুধু মন্দিরের অংশটা কিনতে চান। …সে কী! তাহলে ভদ্রলোক আমাকে মিথ্যা করে..কিন্তু ওঁর উদ্দেশ্য কী? …আপনি আসতে চান তো আসুন! কাল সকাল নটা থেকে সাড়ে নটার মধ্যে..হ্যাঁ। ঠিকানা লিখে নিন।
কর্নেলের কথাবার্তা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। একটু আশঙ্কাও জাগল। একজন সাট্টাডনকে বাড়িতে আসতে বলছেন। তার ওপর এইসব মিথ্যা কথাবার্তা।
ঠিকানা বলে টেলিফোন রেখে কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। মুখে মিটিমিটি হাসি।
বললাম, এ এক সাংঘাতিক খেলা কর্নেল। ওই লোকটাই যে আপনাকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে না আপনি কি জানেন?
কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, বীরেশ্বর সেনকে হাজারিলাল চেনে। কিন্তু সে বলল, বীরেশ্বর তার কট্টর শক্ত দুর্গাপ্রসাদের লোক। সে আমাকে বীরেশ্বর সম্পর্কে কিছু গোপন কথা জানাতে চায়। সেকথা টেলিফোনে নাকি বলা যাবে না। মুখোমুখি বলবে।
কিন্তু
নো কিন্তু! তুমি আরও ঝুলির বেড়াল দেখতে চাইলে কাল সকাল নটার আগেই চলে এস!…
উত্তেজনায় সে-রাতে ভাল ঘুম হল না। টেবিল ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। সাড়ে সাতটায় উঠে আটটার মধ্যে তৈরি হয়ে বেরুলাম। কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে দেখি, তখনও উনি ছাদে তার বাগানের পরিচর্যা করছেন। বাগানে যত রাজ্যের অদ্ভুত-অদ্ভুত ক্যাকটাস, অর্কিড আর নানা রকম উদ্ভিদ। এককোণে প্রজাপতিদের জন্য ছোট্ট কাঁচঘর। ডিম থেকে তিনটি পর্যায়ে বিবর্তনের পর রঙবেরঙের প্রজাপতি জন্মায়। সে এক বিচিত্র জগৎ।
উঁকি মেরে দেখলাম বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ গার্ডেনিয়ের পোশাক পরে হাঁটু দুমড়ে একটা টাবের কাছে বসে আছেন। টবে একটা অষ্টাবক্র ক্যাক্টাস। এ সময় আমাকে দেখলেই ওঁর জ্ঞান বিতরণ শুরু হয়ে যাবে। তাই নেমে এসে ড্রয়িং রুমে বসলাম। ষষ্ঠীচরণ বলল, দাদাবাবুর মুখ দেখে মনে হচ্ছে বেরেকফাস্টো হয়নি।
বললাম, না ষষ্ঠী! আমি বেরেকফাস্টো করেই বেরিয়েছি।
ষষ্ঠী হাসল, ব্রেকফাস্ট! বাবামশাই আমাকে ভেংচি কেটে বেরেকফাস্টো বলেন কিনা! তাই বাবামশাইকে ভেংচি কাটলাম।
বলেই সে দ্রুত পর্দা তুলে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছিলেন। সিঁড়িটা এই ড্রয়িং রুমের শেষপ্রান্ত থেকে চিলেকোঠায় উঠে গেছে।
কর্নেল আমার দিকে না তাকিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলেন। তারপর বাথরুম থেকে বেরিয়ে পর্দা তুলে ভেতরে গেলেন। মিনিট দশেক পরে সেজেগুজে ঝকঝকে চেহারায় বেরিয়ে এলেন। বললাম, আজ মর্নিং সম্ভাষণ করলেন না যে?
কর্নেল বললেন, তুমি যখন আমার শূন্যোদানে উঁকি দিচ্ছিলে, তখনই করেছি। তুমি শুনতে পাওনি!
আপনি আমার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে ছিলেন।
আমার পেছনেও চোখ আছে ডার্লিং!
অসম্ভব!
কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে বললেন, আমার কান-দুটোই পেছনের চোখ। তুমি জানো, যৌবনে গেরিলা যুদ্ধের তালিম নেওয়ার সময় আমার কান দুটো খুব প্রখর করতে হয়েছিল। কোনদিকে কী শব্দ হল, তা কিসের শব্দ এবং আমার কাছ থেকে তার দূরত্ব কত, এইসব শিখতে হত। যাইহোক, ষষ্ঠী ঠিকই বলছিল, তোমার বেরেকফাস্টো হয়নি। এখন সাড়ে আটটা বাজে। আমি রোজ নটায় ব্রেকফাস্ট করি। আজ এখনই সেরে নিতে হবে। কারণ নটার পর যে-কোনও সময় হাজারিলালের আবির্ভাব ঘটবে।…
হাজারিলাল এল পৌনে দশটায়। তাকে দেখে খুব অবাক হয়ে গেলাম। সাট্টাডন আজকাল একটা সাংঘাতিক কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের কয়েকজনকে আমার পেশার সুবাদে না দেখেছি এমন নয়। কিন্তু হাজারিলাল একে তো বয়সে তরুণ, তার ওপর রোগা টিঙটিঙে। পরনে যেমন-তেমন প্যান্ট-হাওয়াই শার্ট। মাথার চুলে সামান্য কেতা আছে। গায়ের রঙ কালো। চেহারায় অমায়িক হাবভাব। রাস্তাঘাটে ও ধরনের যুবক সর্বত্র দেখা যায়। ভিড় থেকে এদের আলাদা করে চেনা যায় না।
সে কর্নেলকে নমস্কার করে বিনীতভাবে বসল। কর্নেল আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। কিন্তু সে আমার দিকে মনোযোগ দিল না।
কর্নেল তাকে কফি খেতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু সে করফেঁড়ে বলল, আমি বাইরে কিছু খাই না।
তার কথায় এতটুকু অবাঙালি টোন নেই। কর্নেল বললেন, বলুন হাজারিলালজি! জয়ন্তের কাছে আমার কিছু লুকোনো থাকে না। তা ছাড়া আপনাকে কথা দিচ্ছি, খবরের কাগজে আপনার কোনও কথা ফাঁস করা হবে না।
হাজারিলাল বলল, দেখুন কর্নেল সরকার। আপনার পরিচয় আমি রাতেই পেয়ে গেছি। সব মহলে আমার চেনা-জানা লোক আছে। অন্য কেউ আমার সঙ্গে এভাবে জোক করলে আমি সহ্য করতাম না। কিন্তু আপনার মতো একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের দরকার আছে বলেই
কর্নেল জোরে মাথা নেড়ে বললেন, আমি ডিটেকটিভ নই। কথাটা আমার পছন্দ নয়। কারণ টিকটিকি কথাটা ডিটেকটিভের স্ল্যাং!
আমাকে আরও অবাক করে হাজারিলাল বলল, বাট আই নিড ইওর হেলপ কর্নেল সরকার!
বলুন কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?
হাজারিলাল একটু চুপ করে থাকার পর বলল, লোকে আমাকে সাট্টাডন বলে। ঠিক আছে। আমি সাট্টা-জুয়ার কারবারি। এ কারবার খারাপ না ভালো তা নিয়ে আমি ভাবি না। বেঁচে থাকতে হলে টাকা কামাতে হয়। যে যেভাবে পারে টাকা কামায়। তো দুর্গাপ্রসাদও কামায়। বাট ডু ইউ নো হাউ হি আর্নস্ এ লট অব মানি? সে দেশের ঠাকুরদেবতাকে ফরেনে স্মাগল করে। হাজারিলাল দু হাত কপালে রেখে ঠাকুরদেবতার উদ্দেশে প্রণাম করল। এবার বলুন কে বেশি পাপী? আমি, না দুর্গাপ্রসাদ?
বুঝলাম যে খুব ধর্মবিশ্বাসী। কর্নেল বললেন, দুর্গাপ্রসাদ বেশি পাপী।
হাজারিলাল বলল, আমি সাট্টা-জুয়ার কারবারি। প্রফিটের টাকায় আমি সোশ্যাল ওয়ার্ক করি। খেলার ক্লাব, মেডিক্যাল ইউনিট, মন্দির, আশ্রয় সব কিছুতে আমি টাকা দিই। লোকের হাউজিং প্রব্লেম আছে। তার জন্যই মোহনপুর প্যালস কিনে আমি মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং করতে চেয়েছি। একি আমার দোষ?
কখনই না।
তো মোহনপুর প্যালেসের মন্দিরে সোনার দেবতা আছেন। দুর্গাপ্রসাদ অনেক বছর থেকে সেই দেবতাকে চুরি করে ফরেনে স্মার্ করার চেষ্টায় আছে। তার সঙ্গে একটা কোম্পানির কন্ট্যাক্ট আছে।
জয় ট্রেডার্স?
হাজারিলাল তাকাল। দেন ইউ নো ইট!
হ্যাঁ। বীরেশ্বরবাবুর কথা বলুন।
বীরেশ্বর দুর্গাপ্রসাদের কনট্যাক্টম্যান। সে নরহরি ঠাকুরমশাইকে দিয়ে মোহনপুর প্যালেসের মন্দির থেকে দেবতা চুরির ধান্দায় ছিল। সেইজন্য আমি প্যালেসের জমি জবরদখলের জন্য পাড়ার কিছু লোককে লাগিয়েছিলাম। জবরদখল তারা সত্যি সত্যি করত না। ওটা আমার একটা ট্যাটিস। প্রেসার ক্রিয়েট করতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ঝামেলা দেখে কুমারবাহাদুর আমাকে প্যালেস বিক্রি করে দেবেন। উনি বিক্রি করতেই তো চান। পারছেন না শুধু দুর্গাপ্রসাদের জন্য। সে তাকে লোভ দেখাচ্ছে, আরও বেশি দাম দিয়ে প্যালেস কেনার লোক সে যোগাড় করে দেবে।
দুর্গাপ্রসাদের কাছে কুমারবাহাদুরের নাকি অনেক টাকা দেনা আছে?
থাকতে পারে। হাজারিলাল এবার চাপা গলায় বলল, দেড় মাস আগে খবর পেলাম, মোহনপুর প্যালেসের দেবতা যে-কোনও দিন চুরি যাবে। তখন বাড়ি কেনার ছল নিয়ে কুমারবাহাদুরকে সাবধান করে দিলাম।
কী সূত্রে আপনি খবর পেলেন?
হাজারিলাল বাঁকা হাসল। তা বলব না। শুধু জেনে রাখুন সব জায়গায় আমার লোক আছে। জয় ট্রেডার্সেও আছে। বীরেশ্বর তখন আমেরিকায় ছিল। স্মার্ল্ড মাল কীভাবে সে সেখানকার কাস্টমস্ ডিপার্টমেন্টের চোখের আড়ালে ডেলিভারি নেবে তার ধান্দায় ছিল। কিন্তু মাল ঠিক সময়ে পৌঁছাল না। কুমারবাহাদুর অ্যালার্ট ছিলেন। তাই নরহরি ঠাকুরমশাই হয়তো দেবতা চুরির সুযোগ পায়নি।
বুঝলাম। কিন্তু ঠাকুরমশাই খুন হয়ে গেলেন!
আমার লোক তার গায়ে হাত দেয়নি। কিন্তু পুলিস আমার লোকদের হ্যারাস করছে।
কিন্তু নরহরি ভট্টাচার্য খুন হলেন কেন?
খুন করেছে দুর্গাপ্রসাদের লোক। প্রথমে আমার সন্দেহ ছিল, ঠাকুরমশাই অ্যাডভান্স কিছু টাকা নিয়েছিল। কিন্তু দেবতা চুরি করে দিতে পারছিল না। সেই জন্য হয়তো রাগে দুর্গাপ্রসাদ তাকে মেরে ফেলেছে। বাট আই নিড ইওর হেল্প।
বলুন।
হাজারিলাল একটু পরে বলল, কাল বিকেলে আমার লোক বীরেশ্বরকে দুর্গাপ্রসাদের বাড়ি ঢুকতে দেখেছে। তাই আমার অন্যরকম সন্দেহ হচ্ছে। দেবতা চুরি করে ঠাকুরমশাই হয়তো দুর্গাপ্রসাদের লোককে দিয়েছিল। আর বাকি টাকা যাতে না দিতে হয়, সেইজন্য ঠাকুরমশাইকে খুন করা হয়েছে। তাছাড়া ঠাকুরমশাইয়ের মুখ বন্ধ করারও দরকার হয়েছিল। এখন আমি আপনাকে রিকোয়েস্ট করছি, দেবতা সত্যি চুরি হয়েছে কি না ইনভেস্টিগেট করে দেখুন। আর যদি চুরি হয়ে থাকে, তা যাতে স্মার্ল্ড না হয় তার ব্যবস্থা করুন। আপনার সব খবর আমি পেয়ে গেছি কর্নেল সরকার! ইউ আর দি রাইট পার্সন টু ডু ইট। হা–পুলিস যেমন আমাকে বিশ্বাস করে না, তেমনি আমিও পুলিসকে বিশ্বাস করি না। আই নো দেম ওয়েল।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন, দেবতা চুরি যায়নি। কুমারবাহাদুর কাল দুপুরে মন্দিরে গিয়ে দেখে এসেছেন। তখন আমি তার বাড়িতে ছিলাম।
হাজারিলাল গুম হয়ে বলল, মন্দিরের দরজা লোহার। ওতে একটা তালা আছে। আপনি কি দেখেছেন সেটা?
দেখেছি। তালাটা
হাত তুলে হাজারিলাল বলল, জানি। হাই টেকনলজির প্রসেসে তৈরি তালা। আমি বলি কী, আপনি কুমারবাহাদুরকে ইনসিস্ট করে থোক যেভাবে হোক, নিজের চোখে দেখুন দেবতা আছেন কি না।
কেন? কুমারবাহাদুর কি মিথ্যা বলেছেন আমাকে?
বলতেও পারেন।
কেন বলবেন?
বাড়ির দাম আমি ন-লাখ দিতে চেয়েছি। আর দেবতার দাম ধরা হয়েছে। তিরিশ লাখ। থার্টি নাইন লাখস্। ব্যস্। আর বেশি কিছু বলব না। বলে হাজারিলাল উঠে দাঁড়াল।
কর্নেলের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছিল। কুমারবাহাদুর তাঁদের পূর্বপুরুষের গৃহদেবতা বেচতে চান এ কথা আমার বিশ্বাস হয় না।
বিশ্বাস করা না করা আপনার ইচ্ছা। আচ্ছা! আমি চলি। আপনি আমাকে টেলিফোনে শুধু কথাটা জানিয়ে দেবেন। আপনাকে আমি দশ হাজার টাকা দেব। নমস্তে!
হাজারিলাল নমস্কার করে চলে গেল। কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। চুরুটেল নীল ধোঁয়ার একটা রেখা আঁকাবাঁকা হয়ে তাঁর টাক ছুঁয়ে ফ্যানের বাতাসে মিলিয়ে গেল।
হতবাক হয়ে বসেছিলাম। কিছুক্ষণ পরে বললাম, তাহলে সব রহস্য ফাঁস হয়ে গেল।
কর্নেল চোখ না খুলেই বললেন, মোটেও হল না। আরও জট পাকিয়ে গেল।
আর জট কোথায়?
কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন। তারপর হাত বাড়িয়ে টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করতে ব্যস্ত হলেন। সাড়া পেয়ে বললেন, ছন্দা! আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। তোমার শ্বশুরমশাই কি ঘুম থেকে উঠেছেন?..বাহ! ভালো খবর! এক বাহাদুরকে ফিরে পেয়ে আরেক বাহাদুর চাঙ্গা হতেই পারেন! তো বীরেশ্বর কি তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলেন?…শোনো! আমি তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি। শ্বশুরমশাইকে কিছু জানিও না এখন। উনি বিরক্ত হতে পারেন। তুমি নীচে অপেক্ষা করবে। রাখছি।
টেলিফোন রেখে কর্নেল বললেন, বীরেশ্বর ছন্দাদের বাড়িতে যাননি। টেলিফোনে ওকে বলেছেন, এখন ব্যস্ত বলে যেতে পারছেন না। সময় পেলে যাবেন। যাই হোক, চলো! বেরিয়ে পড়া যাক। এক মিনিট! আমার কিটব্যাগ আর অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে আসি। এটা একটা অভিযান জয়ন্ত!…
আমরা সাড়ে এগারোটা নাগাদ মোহনপুর প্যালেসে পৌঁছুলাম। ছন্দা পোর্টিকোর নীচে অপেক্ষা করছিল। হলঘর থেকে বাহাদুর বেরিয়ে এসে সেলাম দিল। একগাল হেসে বলল, কুমারসাবকে আমি থোড়াগোড়া হাঁটাতে পারছি কর্নিলসাব! হাত-পা মালিশ করে দিচ্ছি। আমি একরকম মালিশ জানি। আমার বাবার কাছে শিখেছিলাম। আমাদের পাহাড়ি মুলুকের বুঢ়া আদমিরা সবাই জানে। কফি পাহাড়ে থেকে ফিরে গেলে এইরকম আচানক হাত-পায়ে খিচ ধরে যায়। এইটা পেরালিসিস না আছে কর্নিলসাব!
ছন্দা বললেন, বাহাদুর! গেট বন্ধ করে দিয়ে এসো।
বাহাদুর বলল, কুমারসাব আমাকে এক কামে ভেজলেন। গেট বন্ধ করে যাচ্ছি। লেকিন কিছু দরকার থাকে তো বলুন।
কিছু দরকার নেই। শ্বশুরমশাই তোমাকে কোথায় পাঠাচ্ছেন?
বাহাদুর গুম হয়ে বলল, মানা আছে বহুরানিদিদি! বলতে পারব না।
সে চলে গেলে ছন্দা বাঁকা মুখে বললেন, বুঝেছি। আবার হাজারিলালের ফাঁদে শ্বশুরমশাই পা দিতে যাচ্ছেন। আপনারা আসুন!
কর্নেল চাপা গলায় বললেন, একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এসেছি ছন্দা। তোমার একটু সহযোগিতা চাই!
বলুন!
তুমি মন্দিরে যাওয়ার দরজাটা খুলে দাও। আর ওপরে গিয়ে তোমার শ্বশুরমশাইয়ের হাত মালিশ করো। আমি লক্ষ্য করেছি, বিছানায় উনি শুলে ওঁর ডানদিকে উত্তরের জানালা দিয়ে নীচে মন্দিরটা চোখে পড়ে। তুমি জানালার ধারে বসে হাত মালিশ করবে।
ছন্দা অবাক হয়ে শুনছিল। বলল, কিন্তু উনি আমাকে হাত মালিশ করতে যদি না দেন?
তুমি ইনসিস্ট করবে। তাহলে আমার ধারণা, উনি আপত্তি করবেন না।
ছন্দা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ঠিক আছে। আজ থেকে টিনির স্কুলে ছুটি শুরু হয়েছে। বরং টিনিকেও ওঁর পা মালিশ করতে বলছি। টিনিকে উনি বাধা দেবেন না! সেই সুযোগে আমিও কাজে লেগে যাব।
ইউ আর ইনটেলিজেন্ট।
ছন্দা মন্দিরে যাওয়ার দরজা খুলে দিয়ে বললেন, আমি তালা এঁটে দিচ্ছি। আপনারা লোহার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যাবেন। কাল দেখলাম, সিঁড়িটা এখনও মজবুত আছে।
করিডরে মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর কর্নেল বললেন, জয়ন্ত! তুমি দেয়াল ঘেঁষে চুপিচুপি পশ্চিমের ফুলগাছগুলোর আড়ালে যাও। ওখানে চুপচাপ বসে অপেক্ষা করো। ডাকাতি করতে যাচ্ছি দিন-দুপুরে। সাবধান!
চমকে উঠেছিলাম। কর্নেল! আপনি
ঠোঁটে আঙুল রেখে কর্নেল চোখে হেসে বললেন, বীরু!
তার মানে?
বীরু! ব্যস! আর কোনও কথা নয়।
ফুলগাছের আড়ালে গুঁড়ি মেরে বসে অবাক হয়ে দেখলাম, কর্নেল দিব্যি মন্দিরের দরজা খুলে ফেললেন। দরজার কপাটদুটো নিঃশব্দে লিফটের কপাটের মতোই দুধারে ঢুকে গেল। কর্নেলও ঢুকে গেলেন এবং মিনিট দুই পরে বেরিয়ে এলেন। তারপর মন্দিরের দরজার কপাট টেনে বন্ধ করলেন। ফুলগাছের কাছে এসে চাপা গলায় বললেন, আগে তুমি উঠে যাও।
বললাম, আশ্চর্য! আপনি চিচিং ফাঁক মন্ত্র জানেন দেখছি!
কর্নেল হাসলেন। চিচিং ফাঁক বীরু…
