নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো (কর্নেল সমগ্র) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

বীরেশ্বর এবং ঝুলির বেড়াল

 

কুমারবাহাদুরের কাছে বিদায় নিয়ে কর্নেল যখন বেরুলেন, তখন প্রায় সওয়া বারোটা বাজে। ছন্দা আমাদের সঙ্গে হলঘরের দরজা অব্দি এলেন। বললেন, শ্বশুরমশাই বলছেন আসল মূর্তিই আছে। অথচ ভটচাকাকু বলেছিলেন, বিষ্ণুমূর্তি বদলে গেছে। কিছু বুঝতে পারছি না।

 

কর্নেল বললেন, তুমি তো বিয়ের পর থেকে গৃহদেবতাকে প্রণাম করতে যাও! তুমি কি মূর্তির কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য করোনি?

 

ছন্দা একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, অত কিছু লক্ষ্য করিনি। আমি মন্দিরের বারান্দা থেকে প্রণাম করে চলে আসি। কারণ মন্দিরের তালা খোলা এবং বন্ধ করার সময় কারও ওখানে থাকা বারণ। তবে

 

তবে কী?

 

কিছুদিন আগে ভটচাকাকু বিষ্ণুমূর্তির রঙ বদল এবং বুকের কাছে রেখা ফুটে ওঠার কথা বলেছিলেন। তাই ব্যাপারটা দেখার চেষ্টা করেছিলাম। মন্দিরের ভেতর ইলেকট্রিক আলো জ্বালানোর নিয়ম নেই। ভোরে এবং সন্ধ্যায় দুবার পুজোর সময় প্রদীপ জ্বালানো হয়। পরশু আর কাল ভোরে প্রণামের পর বুকের কাছে একটা সূক্ষ্ম রেখা চোখে পড়েছিল। রঙটাও একটু তামাটে দেখাচ্ছিল। অবিশ্যি আমার চোখের ভুলও হতে পারে।

 

জোর দিয়ে বলতে পারছ না তা হলে?

 

ছন্দা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন, রেখাটা হয়তো দেখেছিলাম।

 

তোমাদের হলঘরে শ্রীবিষ্ণুর যে ফোটো আছে, তাতে বুকের কাছে কোনও রেখা নেই।

 

ছন্দা চমকে উঠলেন। তারপর আস্তে বললেন, ভটচাকাকুকে মিথ্যাবাদী ভাবতে পারছি না।

 

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, তুমি বীরেশ্বরবাবুর চিঠিটা খুঁজে পেলে ওঁর ঠিকানাটা ফোনে আমাকে জানিয়ে দিয়ো। আর একটা কথা। তোমার শ্বশুর মশাই বীরেশ্বরবাবুকে চেনেন। তার সুপারিশেই উনি ভটচাযমশাইকে সেবাইত নিযুক্ত করেছিলেন। তুমি জানতে এ কথা?

 

না তো। ছন্দা অবাক হয়ে গেলেন। টিনির বাবাও আমাকে কিছু বলেনি।

 

তোমার বিয়ে হয়েছে দশ বছর আগে। তোমার শ্বশুরমশাইয়ের কাছে তা তিনি এখন কোথায় আছেন, এসব কথা উনি বলতে চাইলেন না। তুমি এ বিষয়ে কিছু জানো?

 

ছন্দা আবার চমকে উঠলেন। তিনি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন।

 

তার নাম কী?

 

জয়রাম শর্মা বলেই তাঁকে জানতাম। রাত্রে তিনি মদ খেয়ে মাতলামি করতেন। শ্বশুরমশাই তাকে মারধর করেছিলেন। তারপর তিনি নিখোঁজ হন।

 

জয়রাম শর্মা তাহলে মন্দিরের তালা খোলার কৌশল জানতেন!

 

হ্যাঁ। জানতেন। না জানলে পুজো করবেন কী ভাবে?

 

কিন্তু তিনি নিখোঁজ হলে তোমার শ্বশুরমশাই কি তালার কোনও রদবদল করেছিলেন?

 

টিনির বাবার কাছে শুনেছি, তালার নাম্বার সিস্টেম বদলাতে জানেন। কাজেই উনি ছাড়া আর কে বদলাবেন?

 

ঠিক আছে চলি।

 

কর্নেলকে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ই এম বাইপাসের মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালের জন্য গাড়ি দাঁড় করাতেই উনি হঠাৎ নেমে গেলেন এবং অবাক হয়ে দেখলাম, একটা খালি ট্যাক্সিও পেয়ে গেলেন। হয়তো তার সাদা দাড়ি দেখেই ট্যাক্সিচালকরা ওঁকে না করতে পারেন না। কিংবা উনি ট্যাক্সিচালকদের বশীভূত করার মন্ত্র-টন্ত্র জানেন। বরাবর এই ব্যাপারটা আমার কাছে রহস্যময় মনে হয়। অবিশ্যি মোহনপুর প্যালেসে ছোট্ট মেয়ে টিনি কর্নেলের সাদা দাড়ির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল!…

 

সেদিনই সন্ধ্যায় দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসে কর্নেলের টেলিফোন এল। জয়ন্ত! বাড়ি ফেরার পথে একবার দেখা করে যেও। ডিনার খাওয়া না-খাওয়া তোমার ইচ্ছা। তবে ইউ মে বি ইন্টারেস্টেড়!

 

উত্তেজিতভাবে বললাম, আবার কি কিছু ঘটেছে?

 

তেমন কিছু ঘটেনি। ফোনে হুমকি দেওয়াটা নতুন নয়।

 

তার মানে আজ আবার আপনাকে ফোনে কেউ হুমকি দিয়েছে!

 

হুমকির চেয়ে মজার কথা, ষষ্ঠী মিসেস অ্যারাথুনের বেড়ালটাকে খুব জব্দ করেছে।

 

হেসে ফেললাম। ওঃ কর্নেল! বেড়ালের ব্যাপারে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই।

 

বেড়ালকে অনেকেই অপছন্দ করে। কারণ এই খুদে চতুষ্পদ প্রাণীটি মাছ-মাংস-দুধের লোভ্র গোপনে হানা দেয়। কাজেই দুধের গ্লাস সাবাড় করতে এসে তা উল্টে গেলে মোহনপুর প্যালেসের একটা বেড়ালও জব্দ হতে পারে।

 

কর্নেল কথাগুলো বলেই ফোন রেখে দিলেন। পি পি শব্দ শুনতে পেলাম। কর্নেলের হেঁয়ালি করার অভ্যাস আছে। কিন্তু মোহনপুর প্যালেসের বেড়াল জব্দ হওয়াটা হেঁয়ালি হলেও অর্থবহ। চৌরঙ্গি এলাকার একটা হোটেলে ডাকাতির খবরটা লালবাজার পুলিস হেডকোয়ার্টার-সূত্রে টেলিফোনে জেনে নিয়েছিলাম। সেই খবর লেখা শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম। ইলিয়ট রোডে যখন পৌঁছুলাম, তখন প্রায় পৌনে আটটা বাজে।

 

তিনতলায় কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে দেখি, ড্রয়িংরুমে যথারীতি চুরুট কামড়ে ধরে টেবিলে ঝুঁকে আছেন এবং একটা কাগজে কী সব লেখালিখি করছেন। আমাকে দেখে মুখ তুলে সহাস্যে বললেন, বেড়াল ইন্টারেস্টিং প্রাণী। তবে আগে কফি খাও। কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে। ষষ্ঠী! কফি নিয়ে আয় শিগগির!

 

সোফায় বসে বললাম, মোহনপুর প্যালেসে বেড়াল জব্দ হওয়ার ব্যাপারটা আগে বলুন!

 

বলছি। আগে কফি।

 

ষষ্ঠী কফি নিয়ে এল। সে একগাল হেসে বলল, আজ পাজি বেড়ালটার লেজ ধরে ফেলেছিলাম দাদাবাবু! কিন্তু হাত ফসকে পালিয়ে গেলে কী হবে? খুব জব্দ হয়েছে। আর ভুলেও উঁকি দিতে আসবে না।

 

সে বেরিয়ে গেলে কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, মিসেস অ্যারাথুনের বেড়াল আর মোহনপুর প্যালেসের বেড়ালের মধ্যে বুদ্ধির তফাত আছে। ওই বেড়ালটা অবিশ্যি লেজ ধরতে দেয়নি। কিন্তু বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে।

 

প্লিজ কর্নেল! হেঁয়ালি শোনার মুড নেই।

 

কর্নেল এবার একটু গম্ভীর হলেন। বিকেলে ছন্দা ফোন করেছিল। তার শ্বশুরমশাই সন্ধ্যার আগে এক গ্লাস দুধ খান। দুধটা সে খাটের পাশে টেবিলে রেখে এসেছিল। একটু পরে গিয়ে সে অবাক হয়ে দেখেছে, দুধের গ্লাস উল্টে মেঝেতে পড়ে আছে এবং তার শ্বশুরমশাই রাগে ফুঁসছেন। কোথা থেকে একটা বেড়াল এসে তার দুধের গ্লাস উল্টে ফেলেছে। তার ডান হাত অকেজো।.বাঁ হাতে খপ করে বেড়ালটা ধরে রাগের চোটে তিনি আছাড় মেরেছেন। আছাড় খেয়েই বেড়ালটা মারা পড়েছে।

 

আমার উৎসাহ মিইয়ে গেল। বললাম, এটা কী এমন ইন্টারেস্টিং ব্যাপার! ওঁকে দেখেই তো মনে হচ্ছিল খুব রাগী আর গোঁয়ার মানুষ।

 

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। রাগী আর গোঁয়ার মানুষ তো বটেই। কিন্তু না এইজন্য তোমাকে আসতে বলিনি। ছন্দা বলল, আজ সকালের ফ্লাইটে বীরেশ্বর সেন কলকাতা এসেছেন। তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছেন। ছন্দা তাঁরে নরহরি ভট্টাচার্য খুন হওয়ার কথা জানিয়েছে, আমার কথাও বলেছে, আমার ফোন নাম্বার দিয়েছে। বীরেশ্বরবাবু কিছুক্ষণ আগে আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যে আমার কাছে আসছেন।

 

শোনামাত্র উৎসাহটা ফিরে এল। বললাম, হ্যাঁ। তাহলে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।

 

কর্নেল হাসলেন। তার চেয়েও ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, মৃগেন্দ্র এবং বীরেশ্বর যে কোম্পানিতে চাকরি করতেন, সেটা একটা অকশন কোম্পানি। নানা দেশে এই কোম্পানির ব্রাঞ্চ আছে। প্রাচীন অভিজাত ধনী পরিবারের মূল্যবান জিনিসপত্র বা ধনরত্ন কিনে নিলামে বিক্রি করেন ওঁরা। কুমারবাহাদুরের কাছে এই কোম্পানির নাম আজ তুমিও শুনেছিলে!

 

শুনেছিলাম মনে পড়ছে। কী যেমন নামটা

 

জয় ট্রেডার্স। নাম শুনে কিছু বোঝা যায় না। আমি আজ লাঞ্চের পর টেলিফোন গাইড দেখে ওঁদের টেলিফোন করেছিলাম। একটা পার্সোনাল কম্পিউটার কেনার ছল করতে হয়েছিল। তো ওঁরা জানিয়ে ছিলেন এখানে কম্পিউটার বিক্রি হয় না। ওটা একটা নিলামসংস্থা।

 

তাহলে রহস্য ঘনীভূত বলা চলে!

 

কর্নেল দাড়ি নেড়ে সায় দিলেন। ঘনীভূত তো বটেই! বরফের মতো ঘনীভূত।

 

তার মানে?

 

জল জমে ঘন হলে বরফ বলা হয়। বরফে তাপ ওঠে। খুব ভাপ উঠছে।

 

ওঃ কর্নেল! আপনি রসিকতা করছেন।

 

কর্নেল কফি শেষ করার পর চুরুট ধরিয়ে বললেন, রসিকতা কী বলছ ডার্লিং! ফোনে আমাকে বুড়ো ঘুঘু বলে গাল দিল কেউ। তারপর বলল, সাবধান! ফাঁদ পাতা আছে। ওই যে কথায় বলে, ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখনি!

 

এই সময় টেলিফোন বাজল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। হ্যাঁ। বলুন মিঃ নন্দী!..মর্গের রিপোর্টে তা-ই বলেছে নাকি? ধন্যবাদ।…আঁ! বলেন কী?…তাহলে আপনাদের থিওরি কারেক্ট। হা–সাট্টাডন লোকটার ফোন নাম্বার দিতে অসুবিধে আছে?…এক মিনিট। বলে কর্নেল টেবিলে রাখা প্যাডের পাতা ওল্টালেন। কলম বাগিয়ে ধরলেন। বলুন মিঃ নন্দী!…অসংখ্য ধন্যবাদ। রাখছি।

 

ফোন রেখে কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। বললেন, তোমার কৌতূহল স্বাভাবিক। দমদম নর্থ রেঞ্জের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর সুমন নন্দীকে তোমার অবিশ্যি চেনা উচিত।

 

নাম শুনেছি

 

। ওই এলাকার সব সাট্টাবাজের খবর ওঁর নখদর্পণে।

 

কর্নেলের কথার ওপর বললাম, নরহরি ভটচায সাট্টা খেলতেন নাকি?

 

কর্নেল জিভ কেটে বললেন, না, না! উনি সাট্টা খেলতেন না। ওই এলাকার এক সাট্টাডন হাজারিলাল আজ কথাপ্রসঙ্গে মিঃ নন্দীকে জানিয়েছে, সে মোহনপুর প্যালেস কেনার জন্য কুমারবাহাদুরের সঙ্গে অনেকদিন ধরে কথাবার্তা চালিয়ে আসছে। কুমারবাহাদুর বিক্রি করতে রাজি। কিন্তু হাজারিলালের কট্টর শত্রু জনৈক দুর্গাপ্রসাদ সিংহের সাহায্যে নাকি নরহরিবাবুই বাগড়া দিচ্ছিলেন। কুমারবাহাদুর এই দুর্গাদাসের কাছে বহু টাকা ধার করেছেন। এখন হাজারিলাল খুব খুশি। নরহরিবাবু মারা পড়েছেন। মোহনপুর প্যালেস গোপনে কিনে ফেলতে আর অসুবিধে নেই। দুর্গাদাসকে আর কে খবর দেবে যে, কুমারবাহাদুর বাড়ি বিক্রি করে দিচ্ছেন? যখন দুর্গাদাস সে খবর পাবে, তখন কুমারবাহাদুর তার দেনা শোধ করে দেবেন! হাজারিলালের যুক্তিটা হল এই।

 

পুলিস তাহলে হাজারিলালকে ধরছে না কেন? নরহরিবাবুকে খুন করার মোটিভ তো স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

 

কর্নেল হাসলেন। হাজারিলালকে ধরা শক্ত। তার মুরুব্বির জোর আছে, তাছাড়া সে নিজে বা তার লোক দিয়ে নরহরিবাবুকে খুন করেছে, তার প্রমাণ পুলিস পায়নি। শুধু অনুমানের ভিত্তিতে এসব লোককে ধরা যায় না।

 

মর্গের রিপোর্টের কথা বলছিলেন। ওতে কী বলা হয়েছে?

 

কোনও ভোঁতা আর শক্ত জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। মাথার পেছন দিকে একটা বিশেষ জায়গায় আঘাত করলে মৃত্যু অনিবার্য।

 

কর্নেল এবার ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। আমি একটা বিদেশী পত্রিকা তুলে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করছিলাম। বীরেশ্বর সেনের প্রতীক্ষা করতে করতে যেন সারা জীবন কেটে যাবে।

 

বীরেশ্বর এলেন সওয়া আটটায়। বেশ স্বাস্থ্যবান এবং স্মার্ট ঝকমকে চেহারা। পঁয়তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে বয়স। আলাপ-পরিচয়ের পর তিনি একটু গম্ভীর মুখে বললেন, আমি আপনার কাছে এসব ব্যাপারে আসতাম না কর্নেল সরকার! কিন্তু নরহরিকাকু মৃত্যুর সময় নাকি আমার ডাকনাম উচ্চারণ করেছিলেন। এটাই আশ্চর্য লেগেছে। ছন্দার মুখে একথা শোনার পর আমার মনে হল, আপনার সঙ্গে দেখা করা উচিত।

 

কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে কফির হুকুম দিয়ে বললেন, আগের ঠাকুরমশাই জয়রাম শর্মা নিখোঁজ হওয়ার পর আপনার সুপারিশেই নাকি নরহরিবাবুকে সেবাইত করা হয়েছিল?

 

বীরেশ্বর একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, মৃগেন আমার কলিগ এবং বন্ধু ছিল। সে-ই আমাকে একজন বিশ্বস্ত সেবাইত যোগাড় করে দিতে বলেছিল। তো নরহরিবাবু আমার ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে গৃহদেবতার পুজোর জন্য আসতেন। ওঁর এটাই ছিল একমাত্র জীবিকা। অনেক বাড়িতে পুজো করে বেড়াতেন। কাজেই মৃগেনকে আমি ওঁর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম। মৃগেন ওঁকে তার বাবার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। মৃগেনের বাবাকে আমি জ্যাঠামশাই বলি। উনি খুব বুদ্ধিমান এবং সতর্ক মানুষ। কথাবার্তা বলে সন্তুষ্ট হয়ে তবে উনি নরহরিবাবুকে কাজে বহাল করেছিলেন।

 

মোহনপুর প্যালেসে রাজমন্দিরে বিষ্ণুমূর্তি নিশ্চয় আপনি দেখেছেন?

 

ওঁদের নিয়মকানুন বড্ড কড়া। একবার মাত্র দেখেছিলাম। সে-ও সন্ধ্যাবেলায় বাইরে থেকে দেখা। প্রদীপ জ্বলছিল ভেতরে।

 

কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া হাত দিয়ে সরিয়ে আস্তে বললেন, ছ ইঞ্চি উঁচু মূর্তিটা নিরেট সোনার। ওজন প্রায় এক কিলোগ্রাম। চোখের তারায় দুটো পদ্মরাগ মণি বসানো আছে।

 

আমি অতকিছু লক্ষ্য করিনি। আমাদের গৃহদেবতা রাধাবল্লভ। অষ্টধাতুর বিগ্রহ।

 

মন্দিরের কপাট এবং তালা কি দেখেছেন।?

 

নাহ্। তবে মনে হয়েছিল, দরজার দুই পাশে কপাট দুটো ঢুকে গেছে। লিফটের দরজার মতো। আমি প্রণাম করেই মৃগেনের সঙ্গে চলে এসেছিলাম।

 

কোন পথে?

 

বীরেশ্বর তাকালেন। একটু পরে বললেন, কেন? হলঘর থেকে যে পথে। মন্দিরে যাওয়া যায়!

 

দোতলার পশ্চিমপ্রান্তে একটা লোহার সিঁড়ি দিয়ে নেমেও মন্দির যাওয়া যায়। ওটা দেখেছেন কি?

 

সিঁড়িটা দেখেছি। তবে পুরনো মরচে ধরা লোহার সিঁড়ি। আমি জানতাম না ওই সিঁড়ি দিয়ে মন্দিরে যাওয়া যায়। আপনার কাছেই প্রথম শুনছি।

 

আপনি কি আপনার কোম্পানির কাজেই আমেরিকায় ছিলেন?

 

হ্যাঁ। আমাকে নিউ ইয়র্ক ব্রাঞ্চে বদলি করা হয়েছিল। আবার কলকাতা হেড অফিসে ফিরে আসার অর্ডার গেল। তাই চলে এলাম।

 

ষষ্ঠীচরণ কফি আনল। বীরেশ্বর মার্কিনদের মতো শুধু লিকার ঢেলে নিলেন কাপে। কর্নেল বললেন, আপনাদের কোম্পানি জয় ট্রেডার্স নিলামে পুরনো দামী জিনিস বিক্রি করে।

 

বীরেশ্বরের চোখ দুটো জ্বলে উঠল হঠাৎ। গলার ভেতর বললেন, সো হোয়াট?

 

কর্নেল আস্তে বললেন, আমি আপনার সহযোগিতা চাই।

 

বাট হোয়াই আর ইউ-বীরেশ্বর থেমে গেলেন। একটু পরে বললেন, সরি! ইউ মে অ্যাস্ক মি এনি ড্যাম্ কোয়েশ্চেন ইউ লাইক।

 

অন্তিম মুহূর্তে নরহরিবাবুর বীরু বলার কি কোনও বিশেষ কারণ আছে বলে আপনি মনে করেন?

 

বীরেশ্বর মাথা নেড়ে বললেন, মাথায় কিছু ঢুকছে না। আমাকে নরহরিবাবু বীরু বলে ডাকতেন তা ঠিক। কিন্তু কেন উনি মৃত্যুর আগে বীরু বলেছেন, এটা আমারও প্রশ্ন।

 

কুমারবাহাদুর পক্ষাঘাত রোগে শয্যাশায়ী। তিনি–

 

ছন্দা ফোনে আমাকে বলেছে। আমি দেখা করতে যাব।

 

তিনি আজ একটা বেড়ালকে কে আছড়ে মেরে ফেলেছেন।

 

বীরেশ্বর আবার চোকে গেলেন। হোয়াই আর ইউ প্রেয়িং জোক্স কর্নেল সরকার?

 

নো জোক মিঃ সেন! এ একটা ঘটনা! কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, আপনি নিশ্চয় বাংলা প্রবচনটা জানেন, বেড়ালের নটা প্রাণ। অথচ এক আছাড়েই একটা বেড়াল মরে গেল। তার অপরাধ, সে কুমারবাহাদুরের দুধের গ্লাস উল্টে দিয়েছিল।

 

আপনি দেখেছেন?

 

না। ছন্দা টেলিফোনে জানিয়েছে।

 

ছন্দার একটা বদ অভ্যাস আছে। খুব রঙ চড়িয়ে কথা বলে। আপনি গিয়ে হয়তো দেখবেন ব্যাপারটা অন্যভাবে ঘটেছে।

 

ছন্দাকে আপনি আমেরিকা থেকে একটা চিঠি লিখেছিলেন!

 

সো হোয়াট? বীরেশ্বর আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। মৃগেনের ক্যান্সারে মৃত্যুর খবর ছন্দা দেয়নি। দৈবাৎ একজনের কাছে জানতে পেরে ওকে সান্ত্বনা দিয়ে চিঠি লিখেছিলাম।

 

চিঠিটা ছন্দা খুঁজে পাচ্ছে না।

 

খুঁজে পাচ্ছে না তো আমি কী করতে পারি বলুন? চিঠিটা গোপনীয় ছিল না।

 

আচ্ছা মিঃ সেন, দুর্গাপ্রসাদ সিংহকে আপনি নিশ্চয় চেনেন?

 

বীরেশ্বর কর্নেলের দিকে তাকালেন। একটু পরে বললেন, চিনি না বললে মিথ্যা বলা হবে। মৃগেনের বাবার বন্ধু উনি। বিগ বিজনেসম্যান। ওঁর বাড়ি বিহারের মোহনপুরে। সেখানে মৃগেনের পূর্বপুরুষের জমিদারি এস্টেট ছিল। কাজেই তাকে মৃগেনদের ফ্যামিলিফ্রেন্ড বলা চলে। মৃগেনই ও-বাড়িতে একদিন আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আপনি কেন এসব প্রশ্ন করছেন জানতে পারি কি?

 

নরহরিবাবুর হত্যারহস্য ফাঁস করতে চাই আমি। ছন্দার কাছে তো শুনেছেন। এটা আমার একটা হবি।

 

আমিও চাই খুনী ধরা পড়ুক। নরহরিবাবু সৎ মানুষ ছিলেন। এমনও হতে পারে, অন্তিম মুহূর্তে তিনি আমাকে খবর দিতেই বলেছিলেন। কারণ আমিই তাঁকে সো-কল্ড রাজবাড়িতে কাজ জুটিয়ে দিয়েছিলাম।

 

আপনি কি জানেন আগের সেবাইত জয়রাম শর্মা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান?

 

বীরেশ্বর মুখ নামিয়ে বললেন, পরে মৃগেন ও কথা বলেছিল। আগে জানলে আমি কখনও নরহরিবাবুকে ওদের বাড়িতে সেবাইতের কাজের জন্য সুপারিশ করতাম না। ওই সব তথাকথিত রাজপরিবারে ড্রাকুলার আস্তানা আছে।

 

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, একটা প্রব্লেম হল, নরহরিবাবুর থাকার ঘর সার্চ করে পুলিস আপনার একটা চিঠি পেয়েছে। চিঠিতে আপনি তাকে দুর্গাপ্রসাদ সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন।

 

বীরেশ্বর চমকে উঠেছিলেন। একটু নার্ভাস হয়ে বললেন, মৃগেনদের বাড়ির একটা অংশ কারা জবরদখল করতে চেয়েছিল। নরহরিবাবু বাধা দেওয়ায় তারা তাকে হুমকি দিয়েছিল। তাই আমি দুর্গাপ্রসাদের সঙ্গে তাকে যোগাযোগ করতে বলেছিলাম।

 

চিঠিতে এসব কথা নেই।

 

নেই মানে–খুব তাড়াহুড়ো করে চিঠিটা লিখেছিলাম।

 

এনিওয়ে! এতে বোঝা যাচ্ছে আপনাকে নরহরিবাবু চিঠি লিখতেন!

 

ওই একবার লিখেছিলেন। ছন্দার এটা জানা উচিত।

 

ছন্দা জানে না।

 

নিশ্চয় ছন্দা ভুলে গেছে। ওর এই একটা বদ অভ্যাস। আপনাকে অলরেডি তা বলেছি। বীরেশ্বর, ঘড়ি দেখে ফের বললেন, এই তুচ্ছ কারণে পুলিস আমাকে অ্যারেস্ট করে তো করুক। আই হ্যাভ গ্যাক্স টু ফেস এনি ড্যাম সিচুয়েশন। আচ্ছা! আমি উঠছি।

 

বলে উনি সটান উঠে দাঁড়ালেন এবং ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সৌজন্যসূচক কোনও বিদায় সম্ভাষণও করলেন না।

 

বললাম, একটা বেড়াল মারা পড়লেও ঝুলির ভেতর থেকে অনেক বেড়াল বেরিয়ে এল দেখছি!

 

কর্নেল হাসলেন। আর একটা মজার বেড়াল তোমাকে দেখাই। বীরেশ্বর সেন আজ মর্নিংয়ের ফ্লাইটে আসেননি। এসেছেন গতকাল বিকেলের ফ্লাইটে। দমদম এয়ারপোর্ট থেকে এ খবর জোগাড় করেছি।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *