নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো (কর্নেল সমগ্র) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
হত্যাকাণ্ড এবং অদ্ভুত তালা
কর্নেল আমার মুখ দেখেই কীভাবে বুঝেছিলেন কেউ টেলিফোনে হুমকি দিল, তা জানি না। অবিশ্যি এমন হতেই পারে, আমার মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠেছিল। কিন্তু হুমকি দিলে সেটা কেন কর্নেলের কাছে খুব ভালো হয়। এইতে একটু অবাক হয়েছিলাম। উনি কি এমন হুমকির জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন?
প্রশ্নটা বার দুই তুলে কোনও জবাব পাইনি। তবে আমার কপাল গুণে বৃষ্টিটা সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ থেমে গিয়েছিল। রাত নটায় জানালায় উঁকি মেরে দেখেছিলাম রাস্তায় জল প্রায় নেমে গেছে। তাই কর্নেলকে তাগিদ দিয়ে সকাল-সকাল ডিনার খেয়ে সল্টলেকে ফিরে গিয়েছিলাম।
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে কখনও রাত কাটাইনি এমন নয়। কিন্তু সমস্যা হল, সঙ্গে রাতের পোশাক না থাকলে ওই বিশালদেহী মানুষের রাতের পোশাক পরে শুতে হয়। সেটা আমার পক্ষে অস্বস্তিকর। তার পোশাকে আমার মতো আড়াইখানা লোক ঢুকে যেতে পারে। তা ছাড়াও ঘুম থেকে দেরি করে ওঠা আমার অভ্যাস। এদিকে ষষ্ঠীচরণ সাতটা বাজলেই আমাকে বেড-টি খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
সকালে টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল! তখন সাড়ে সাতটা বাজে। বিরক্ত হয়ে টেলিফোন তুলে অভ্যাস মতো বললাম, রং নাম্বার!
রাইট নাম্বার ডার্লিং!
হেসে ফেললাম। প্লিজ কর্নেল! এই ডার্লিং বলাটা আপনি ছাড়ুন তো! লোকেরা এই নিয়ে
ডার্লিং! পুরনো বাংলা প্রবাদ আছে, কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ। তোমার–মানে সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরির পৌষ মাসের খবর আছে।
কিন্তু সর্বনাশটা কার হল?
মোহনপুর রাজমন্দিরের সেবাইতমশাইয়ের।
তার মানে?
আজ ভোরে রাজমন্দিরের দরজার সামনে তার ডেডবডি পাওয়া গেছে। শিগগির চলে এস।বলেই কর্নেল মত বদলালেন। নাহ। আমাদের দমদম এরিয়ায় যেতে হবে। কাজেই তুমি বরং তৈরি হয়ে থাকো। আমি ট্যাক্সি করে তোমার কাছে যাচ্ছি। তারপর তোমাকে নিয়ে বেরুব।
কর্নেলের ফোনের লাইন কেটে গেল। কিন্তু তখনও আমি ফোন ধরে বসে আছি। এ তো ভারি অদ্ভুত ঘটনা! ভট্টাচার্যৰ্মশাইকে কাল বিকেলে বৃষ্টির সময় জলজ্যান্ত দেখেছি। আর উনি এখন ডেডবডি হয়ে গেলেন! সোনার বিষ্ণুমূর্তি হাতিয়েও চোর ওঁকে প্রাণে মারল কেন? উনি কর্নেলের কাছে এসেছিলেন, শুধু। এটাই কি তাকে হত্যার কারণ হতে পারে?
নাহ্। এক রহস্যভেদীর সঙ্গদোষে আমিও দেখছি রহস্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। আমার দরকার একটা জমকালো প্রতিবেদন, আজকাল সংবাদপত্রে পরিভাষার যাকে বলে ইনভেস্টিগেটিভ স্টোরি।
বিছানা ছেড়ে বাথরুমে গেলাম। তারপর ব্যাপারটা মাথা থেকে মুছে ফেললাম।
কর্নেল এলেন প্রায় সাড়ে আটটায়। বললেন, ই এম বাইপাসে দুর্ঘটনা লেগেই আছে। দুবার ট্যাক্সি বদল করতে হয়েছে। তুমি তৈরি তো?
তৈরি হয়েই ছিলাম। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পথে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম, নরহরি ভট্টাচার্যের মার্ডার হওয়ার খবর কি আপনি পুলিসসূত্রে পেয়েছেন?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, না। ছন্দা রায়চৌধুরী আমাকে সাতটা নাগাদ ফোনে জানিয়েছেন।
তিনি আপনার ফোন নাম্বার কী ভাবে জানলেন?
গত রাতে ভটচাযমশাই ওঁকে আমার কাছে আসার কথা বলেছিলেন। আমার ঠিকানা-ফোন নাম্বারও তাকে দিয়েছিলেন। ভটচাযমশাই কাল তোমাদের পত্রিকা অফিস থেকেই আমার ঠিকানা যোগাড় করেন, তা তুমি শুনেছ।
কিন্তু ফোন নাম্বার?
কর্নেল হাসলেন। আমি নিজে চোখে দেখে এসেছি, তোমাদের নিউজ ব্যুরোর চিফ অমরেশবাবুর টেবিলে কাচের তলায় আমার নেমকার্ড রাখা আছে। কাজেই ফোন নাম্বারের ব্যাপারে কোনও রহস্য নেই।
ছন্দা আপনাকে ডিটেলস কিছু কি জানিয়েছেন?
এখন কোনও কথা নয়। গাড়ি ড্রাইভ করার সময় তুমি কথা বললে আমার ভয় হয়। বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। ই এম বাইপাস আর এই ভি আই রোড, দুটো রাস্তায় বিপজ্জনক। নাহ। আস্তে চলল। অত তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।
গাড়ির গতি কমিয়ে বললাম, দমদম এলাকা আমার কাছে গোলকধাঁধা মনে হয়। আপনি মোহনপুর প্যালেসে কীভাবে পৌঁছুতে হবে জেনে নিয়েছেন তো?
ডার্লিং! মোহনপুর প্যালেসে আমি বছর পনের আগে বহুবার গেছি। কুমারবাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ আমার সুপরিচিত এবং বন্ধুস্থানীয় মানুষ। উনি আমার মতোই প্রকৃতিপ্রেমী।
বলেন কী!
হ্যাঁ। বিহারের মোহনপুরে ওঁর ঠাকুর্দার জমিদারি মহল ছিল। সেই বাড়িতেও একবার গিয়েছিলাম।
কিন্তু ভটচাযমশাইকে তো কাল আপনি এসব কথা কিছুই বললেন না?
নাহ। গাড়ি চালানোর সময় কথা নয়। আর শোনো। আমার মনে হচ্ছে, এই ধরনের রাস্তায় গাড়ি আস্তে চালানোই বিপজ্জনক। তোমার খুশিমতো ড্রাইভ করো!
আমার এই বৃদ্ধ বন্ধুর এ ধরনের খেয়ালের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। এই রকম মানুষকেই সম্ভবত আনপ্রেডিক্টেব ম্যান বলা হয়। ওঁর নির্দেশমতো গোলকধাঁধার ভেতর ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে যখন মোহনপুর প্যালেসে পৌঁছুলাম, তখন খুবই হতাশ হয়ে গেলাম। একটা এঁদো পুকুরের ধারে জরাজীর্ণ দোতলা বাড়ি। অবিশ্যি একটা ফটক আছে। ফটকে আটকানো মার্বেল ফলকটা পড়া যায় না। ফটক হাট করে খোলা। ভেতরটা জঙ্গল হয়ে আছে। সংকীর্ণ রাস্তায় কোন আমলে পাথরের ইট বসানো হয়েছিল। এখন খানাখন্দে হতশ্রী হয়ে গেছে। বাউন্ডারি ওয়াল মুখ থুবড়ে পড়েছে। সাবধানে এগিয়ে পোর্টিকোর তলায় গাড়ি দাঁড় করালাম। পোর্টিকোর যা অবস্থা, ভয় হচ্ছিল যে-কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়বে যেন। সামনে একটা অ্যাজবেস্টস চাপানো চালাঘরে একটা কালো অ্যামবাসাডার গাড়ি দেখে বুঝলাম, ওই গাড়ি চালিয়েই কাল বিকেলে ভটচাৰ্মশাই কর্নেলের বাড়ি গিয়েছিলেন। এবং ওটাই গাড়িটার গ্যারাজ ঘর।
সিঁড়ির মাথায় একটুকরো বারান্দা। সেখানে এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়েছিলেন। পরনে ছাইরঙা সাধারণ তাঁতের শাড়ি। মহিলাদের বয়স আঁচ করার সাধ্য আমার নেই। তবে মনে হল, এঁর বয়স তিরিশের কাছাকাছি। মুখে তীক্ষ্ণ লাবণ্য এবং ব্যক্তিত্ব আছে। আমরা নামলে তিনি নমস্কার করে মৃদুস্বরে কর্নেলকে বললেন, আপনার অনেক গল্প আমি শ্বশুর মশাইয়ের কাছে শুনেছি। আপনাকে দেখে সাহস পেলাম। আসুন!
কর্নেল বললেন, পুলিশ কি বডি নিয়ে চলে গেছে?
একঘন্টা আগে। পুলিসের মতে ব্যক্তিগত শত্রুতা! কারণ ভটচাঙ্কাকুর সঙ্গে নাকি পাড়ার লোকেদের সদ্ভাব ছিল না। আমি কিছু বুঝতে পারছি না। তবে কিছু লোক খানিকটা জমি জবরদখল করতে চেয়েছিল। উনি বিরোধী পক্ষের কিছু লোক নিয়ে তাদের বাধা দিয়েছিলেন।
কোনও ভিড় দেখলাম না কোথাও। কর্নেল সিঁড়িতে উঠতে উঠতে বললেন। একটা খুনোখুনি হলে আজকাল লোকেরা জটলা করে। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যেন কিছুই ঘটেনি।
ছন্দা বললেন, গেটের কাছে জটলা হচ্ছিল। পুলিস বডি নিয়ে যাওয়ার পর জটলা ভেঙে গেল। আসলে খুনোখুনি আজকাল লোকের যেন গা সওয়া হয়ে গেছে।
হলঘরে সেকেলে কিছু আসবাব আর দেয়ালে পেন্টিং সাজানো আছে। সবই বিবর্ণ এবং জীর্ণ। হলঘরের একধারে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। কর্নেল বললেন, ভটচাযমশাইয়ের ফ্যামিলি কোথায় থাকে?
ওঁর কোনও ফ্যামিলি ছিল না। বিয়ে করেননি। আমাদের ফ্যামিলির মানুষ হিসেবেই ছিলেন। বাজার করা, রান্নাবান্না সবই উনি করতেন। আমাকে সংসারের কোনও কাজে হাত লাগাতে দিতেন না। তাই–ছন্দা অশ্রু সম্বরণ করে বললেন, কাজের লোক রাখতে দেননি। এমন কি আমার মেয়ে টিনিকেও উনি রোজ গাড়িতে করে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। আবার স্কুল থেকে নিয়েও আসতেন।
আমি আসছি এ কথা কি আপনার শ্বশুরমশাইকে বলেছেন?
সিঁড়িতে ছন্দা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, উনি অসুস্থ মানুষ। ওঁকে কিছু বলিনি এখনও। পুলিসকেও ওঁকে ডিসটার্ব করতে নিষেধ করেছিলাম।
উনি কি এখনও জানেন না ভটচাযমশাই খুন হয়েছেন?
ছন্দা আস্তে বললেন, না, ওঁর সারারাত ঘুম হয় না। শেষ রাতে ঘুমোন। বেলা এগারোটার আগে ঘুম ভাঙে না। ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। ওঁকে খাওয়ানো যায়নি। কোনও ওষুধই উনি খান না। আসলে শ্বশুরমশাই খুব আত্মবিশ্বাসী মানুষ। উনি বলেন, ওঁর অসুখ মনের জোরেই সেরে যাবে।
কর্নেল একটু ইতস্তত করে বললেন, তা হলে কুমার বাহাদুর ঘুম থেকে না। জাগা অব্দি আমরা ওপরে যাচ্ছি না। বরং ততক্ষণ আমাদের মন্দিরে নিয়ে চলুন।
আগে অন্তত এক কাপ কফি
ধন্যবাদ। পরে হবে। আগে ঘটনাস্থল দেখা দরকার।
সিঁড়ি থেকে নেমে ছন্দা হলঘরের অন্যদিকে একটা দরজার তালা খুললেন। বললেন, এই দরজার ডুপ্লিকেট চাবি ভটচার্য কাকুর কাছে থাকত। উনি খুব ভোরে স্নান করে এই দরজা খুলে মন্দিরে পুজো করতে যেতেন।
একটা সংকীর্ণ করিডরের পর আবার একটা সিঁড়ি এবং নীচে একটুকরো উঠোনের প্রান্তে ছোট্ট একটা মন্দির দেখতে পেলাম। উঠোন ঘেরা উঁচু পাঁচিলটার অবস্থাও জরাজীর্ণ। মন্দিরের পাশে একটা দরজা দেখিয়ে ছন্দা বললেন, ওদিকে একটা পুকুর আছে। তবে বহুবছর ওই দরজাটা আমরা খুলি না। এই দেখুন! এখানে ভটচার্য্য কাকুর ডেডবডি পড়ে ছিল।
মন্দিরের সামনে একটুকরো খোলা বারান্দা। পুরোটাই মার্বেল পাথরে বাঁধানেনা। বারান্দার ওঠার জন্য মাত্র একটা ধাপ আছে। সেটা অবশ্য সিমেন্টের। কর্নেল বারান্দায় নীচে গিয়ে বললেন, বারান্দা কি ধোয়া হয়েছে?
পুলিস ধুয়ে দিতে বলে গেল। একটুখানি রক্ত ছিল। তাই ধুয়ে দিয়েছি।
বডি তো আপনিই দেখতে পেয়েছিলেন?
হ্যাঁ। তখন প্রায় ছটা বাজে। এখানে প্রচণ্ড মশা। তাই মশারি খাটাতে হয়। তার ওপর শেষ রাত থেকে লোডশেডিং ছিল। মশারি থেকে বেরিয়েছে, তখন কারেন্ট এল। তারপর জানালা দিয়ে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ভটচার্য কাকু উপুড় হয়ে মন্দিরের দরজার সামনে পড়ে আছেন। প্রথমে বুঝতে পারিনি কী হয়েছে। তক্ষুনি এখানে চলে এলাম। এসে দেখি, মাথার পেছনে চাপ-চাপ রক্ত। তখনও ওঁর পা দুটো নড়ছিল। তাই ওঁকে ধরে চিত করতে গেলাম। উনি অতিকষ্টে শুধু বললেন, বীরু! তারপর ওঁর শরীর স্থির হয়ে গেল।
কী বললেন? বীরু–
হ্যাঁ। বীরু। কিন্তু বীরু—
বলুন!
ছন্দা শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমার স্বামীর এক কলিগ ছিলেন। তাঁর নাম বীরেশ্বর সেন। আমার স্বামীর সঙ্গে এ বাড়িতে তিনি আসতেন। তাকে ও বীরু বলে ডাকত।
ছন্দা হঠাৎ চুপ করলে কর্নেল বললেন, আপনি বীরু কথাটা শুনেছিলেন তা হলে?
হ্যাঁ। কিন্তু বীরুবাবু তো আমেরিকায় থাকেন। মাস তিনেক আগে আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ তিনি জানতেন না। জানার পর চিঠিটা লিখে পাঠিয়েছেন।
চিঠিটা আছে আপনার কাছে?
খুঁজে দেখতে হবে।
কর্নেল মন্দিরের বারান্দায় ওঠার ধাপের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ভটচাযমশাই বলছিলেন, মন্দিরের দরজা লোহার। ঠিক তা-ই দেখছি। আর লকটা–ভারি অদ্ভুত লক তো!
ছন্দা বললেন, হ্যাঁ। মাথামুণ্ডু কিছু বোঝা যায় না। ওটা কীভাবে খোলা যায় তা জানতেন ভটচাকাকু, আর জানেন আমার শ্বশুরমশাই।
কর্নেল পকেট থেকে একটা নোট বই বের করে গোলাকার অদ্ভুত তালাটা আঁকতে ব্যস্ত হলেন।
লক্ষ্য করলাম, তালাটার মধ্যিখানে রোমান হরফে টি লেখা ছোট্ট বৃত্তটা একটা ন এবং সেই নক্টা উঁচু হয়ে আছে। তা ছাড়া তালাটা বসানো আছে লোহার দুটো কপাটের ঠিক মাঝখানে। দরজার আয়তন প্রায় ৬ ফুট লম্বা এবং প্রায় ৪ ফুট। চওড়া। তালাটা দরজা খুললে দু ভাগ হয়ে যায়।
লক্ষ্য করলাম, তালাটার মধ্যিখানে রোমান হরফে টি লেখা ছোট্ট বৃত্তটা একটা ন এবং সেই নক্টা উঁচু হয়ে আছে। তা ছাড়া তালাটা বসানো আছে লোহার দুটো কপাটের ঠিক মাঝখানে। দরজার আয়তন প্রায় ৬ ফুট লম্বা এবং প্রায় ৪ ফুট চওড়া। তালাটা দরজা খুললে দু ভাগ হয়ে যায়।
কর্নেল জুতো খুলে বারান্দায় উঠলেন। তারপর আতস কাচ বের করে কপাট পরীক্ষায় মন দিলেন। ছন্দা বললেন, মন্দিরের দরজাটা লোহার বলা হয় বটে, কিন্তু আমার ধারণা ওটা ইস্পাতের। কারণ ওতে কোথাও মরচে ধরতে দেখিনি।
কর্নেল নবটা কয়েকবার ঘুরিয়ে দেখে বললেন, সম্ভবত এতে কোনও সূক্ষ্ম ব্যালান্সের ব্যাপার আছে। নবটা খুবই মসৃণ। লেটারগুলো এক জায়গায় স্থির দেখাচ্ছে। কিন্তু নব ঘোরালেই ওগুলো যেন পিছলে যাচ্ছে একটার পর একটা। অসাধারণ কারিগরি কৌশলে এটা তৈরি করা হয়েছিল।
কর্নেল নেমে এসে জুতো পরলেন। তারপর হঠাৎ বারান্দার ধাপের নীচে বাঁদিকে ঝুঁকে পড়লেন। আঙুল দিয়ে কী একটা পরীক্ষা করে দেখে বললেন, আপনি কি কোনও ওয়াশিং পাউডার দিয়ে বারান্দা ধুয়েছেন?
ছন্দা বললেন, না তো! এমনি দু বালতি জল ছিটিয়ে ধুয়েছি।
হু। বডি কী অবস্থায় ছিল বলুন?
ছন্দা আঙুল দিয়ে দেখালেন। দরজার কাছে মাথা আর শরীরের বাকি অংশ লম্বালম্বি পড়ে ছিল। পা দুটো ছিল এই ধাপের ওপর।
কর্নেল নিজের আঙুল দেখতে দেখতে বললেন, একটু জল চাই।
ওই ট্যাপের জলে হাত ধুয়ে নিন। কিছু নোংরা লেগেছে কি? এখানে নোংরা। কিছু থাকার কথা নয়। রোজ ভটচাকাকু দুবেলা মন্দির আর উঠোন পরিষ্কার করতেন।
কর্নেল উঠোনের কোণে কয়েকটা ফুলগাছের পাশে একটা ট্যাপ খুলে রগড়ে হাত ধুলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, খুনি খুব ধূর্ত। বারান্দার ওই ধাপে গ্লিসারিন জাতীয় কোনও আঠালো পিচ্ছিল লিকুইড জিনিস ছড়িয়ে রেখেছিল।
ছন্দা চমকে উঠলেন।সে কী! কেন?
ভটচাযমশাই খালি পায়ে মন্দিরে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যাবেন। তখন তার মাথার পেছনে মোক্ষম আঘাতের সুযোগ পাওয়া যাবে। তিনি দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে কাজটা তত সহজ হত না, যতটা সহজ হয়েছে উনি পড়ে যাওয়ার ফলে। বলে কর্নেল ঘড়ি দেখলেন। চলুন! এবার চা বা কফি কিছু খাওয়া যাক। আমি অবিশ্যি কফিরই ভক্ত।
ছন্দা করিডরে ঢুকে বললেন, শ্বশুরমশাইয়ের কাছে শুনেছি আপনি কফির ভক্ত। কিন্তু আমার অনুরোধ কর্নেলসায়েব! আমাকে আপনি তুমি বলে ডাকবেন।
ঠিক আছে। তো ছন্দা, তুমি কি কাল রাতে ভটচাযমশাইকে বলেছিলে যে আমি কুমার বাহাদুরের পরিচিত?
বলেছিলাম। শুনে উনি খুব অবাক হয়েছিলেন। ছন্দা হলঘরের সেই দরজায় তালা এঁটে দিয়ে এগিয়ে গেলেন। দোতলার বারান্দায় উঠে একটা ঘরের দরজা। দেখিয়ে আস্তে বললেন, এই ঘরে শ্বশুরমশাই থাকেন। পাশের ঘরে আমি আর, টিনি থাকি। আমার ঘর থেকে ওঁর ঘরে ঢোকা যায়।
ভটচাযমশাই কোন ঘরে থাকতেন?
ওই যে দেখছেন! শেষ দিকের ঘরে।
ছন্দা একটা ঘরের সামনে গিয়ে ডাকলেন, টিনি! টিনি!
কর্নেল বারান্দার রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে চারপাশটা দেখছিলেন। একটু হেসে বললেন, আপনার মেয়ে নীচে স্কিপিং করছে।
ছন্দা দেখে নিয়ে বললেন, দেখছ কাণ্ড? কখন হলঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেছে। দরজা ভেজিয়ে রেখেছে বলে টের পাইনি। আপনারা ভেতরে এসে বসুন। কর্নেল বললেন, বাহ্! টিনি স্কিপিং করতে করতে মজার ছড়া বলছে তো।
ছড়াটা শুনতে পেলাম–
নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো।
তবেই তোমার পোয়া বারো।…
